📖 বই-টই
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • একাদশ পাঠ
কবিতা
বই-টই
কবি
প্রেমেন্দ্র মিত্র
ধরন
ছড়া / কৌতুক কবিতা
পাঠ
একাদশ পাঠ (সাহিত্য মেলা)
সম্পূর্ণ কবিতা
বই-টইটই পড়া যায় পড়তে কোথায়? বলিছ তবে শোনো, বই-এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে টই সে কোনা কোনা।
আর পাবে টই সকালবেলা বই থেকে মুখ তুলে, হঠাৎ যদি বাইরে চেয়ে মনটা ওঠে দুলে।
টই থাকে সব রোদ-মাথানো গাছের ডালে পাতায়, টই থাকে সেই আকাশ-ছোঁয়া খোলা মাঠের খাতায়।
টই চমকায় বিজলি হয়ে আঁধার-করা মেঘে, খই হয়ে টই ফোটে দিদিশা জলে বৃষ্টি লেগে।
টই কাঁশে সব ঘটে পাখির রং-বেরঙের পাখায়, খোকা-খুকুর মুখে আবার মিটিমিটি হাসি মাখায়।
বই পড়া খুব যত পারো সে তো পড়া টই, টই নইলে থাকত কোথায় এত রকম বই।
কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
সারমর্ম: "বই-টই" প্রেমেন্দ্র মিত্রের এক চমৎকার কৌতুকময় ও দার্শনিক ছড়া-কবিতা। কবি এখানে বই পড়ার পাশাপাশি 'টই' নামে এক কাল্পনিক জিনিস পড়ার কথা বলেছেন। 'টই' পড়া মানে কী? কবির মতে, 'টই' লুকিয়ে আছে বইয়ের মধ্যেই কোনায় কোনায়। আবার 'টই' পাওয়া যায়—বই থেকে মুখ তুলে বাইরে তাকালে—রোদ-মাথানো গাছের ডালে-পাতায়, আকাশ-ছোঁয়া খোলা মাঠের খাতায়। 'টই' চমকায় বিজলি হয়ে, ফোটে বৃষ্টির জলে। পাখির রঙিন ডানায়, শিশুর হাসিতে—সর্বত্রই 'টই' ছড়িয়ে আছে।
'টই' আসলে কী? 'টই' হল কল্পনা, কৌতূহল, বিস্ময়বোধ ও সৃষ্টিশীলতা। বই পড়া মানে শুধু অক্ষর পড়া নয়—বই পড়তে পড়তে যদি মনটা কল্পনার জগতে ডুব দেয়, বাইরের প্রকৃতির দিকে চেয়ে দেখে, তবে তবেই আসল 'টই পড়া' হয়। কবি বলতে চান—সারা বিশ্বটাই এক বিশাল বই, আর তাকে পড়তে হয় কল্পনা ও মুক্ত মন নিয়ে। 'টই' না থাকলে এত রকম বই-ই বা থাকত কোথায়?
কেন্দ্রীয় চেতনা: প্রকৃত শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়; বরং চারপাশের জগৎকে মনোযোগ দিয়ে দেখা, অনুভব করা ও কল্পনার চোখ দিয়ে পড়তে পারাই হল আসল 'টই পড়া'।
পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও প্রশ্নোত্তর
গভীর ব্যাখ্যা'টই' কোনও অভিধানের শব্দ নয়, এটি কবির সৃষ্টি। 'টই' হল কল্পনাশক্তি, কৌতূহল, বিস্ময়বোধ ও মুক্তচিন্তা। কবি এখানে বলেছেন—বই পড়া (অক্ষর জ্ঞান) তো সবাই করে, কিন্তু আসল ব্যাপার হল 'টই পড়া'। অর্থাৎ পড়তে পড়তে কল্পনার জগতে বিচরণ করা, নতুন কিছু ভাবা, বাইরের জগৎকে নতুন চোখে দেখা। "তাই তো কাটি ছড়া" অর্থ—এই ভাবনা থেকেই তিনি এই মজার ছড়াটি রচনা করেছেন। 'বই' আর 'টই'-এর মিল দিয়ে শব্দ নিয়ে খেলেছেন।
কবি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন—'টই পড়া' যায় কোথায়? তারপর উত্তর দিচ্ছেন—বইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে টই, তবে তা বইয়ের কোনো-না-কোনো কোণে (কোনা কোনা) লুকিয়ে। অর্থাৎ, বইয়ের প্রতিটি পাতায়, লাইনের ফাঁকে, শব্দের আড়ালে কল্পনা আর নতুন ভাবনা লুকিয়ে আছে। যে পাঠক কেবল অক্ষর পড়ে যায়, সে 'টই'-কে খুঁজে পায় না। কিন্তু যে মনোযোগ দিয়ে পড়ে, ভাবে, কল্পনা করে—সেই কেবল 'টই'-কে আবিষ্কার করতে পারে।
কবি বলছেন—'টই' কেবল বইয়ের ভেতরেই নয়, বাইরের জগতেও আছে। সকালবেলা বই পড়তে পড়তে একসময় যদি মুখ তুলে বাইরে তাকাও, আর মনটা যদি দুলে ওঠে (অর্থাৎ, বাইরের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পড়ে), তাহলেই 'টই'-কে পাওয়া যায়। বাইরের জগৎ—নীল আকাশ, সবুজ গাছ, রোদ, পাখির ডাক—এসবই এক বিশাল বই, যা পড়তে হয় চোখ-মন খোলা রেখে।
কবি প্রকৃতির বিভিন্ন জায়গায় 'টই'-এর সন্ধান দিয়েছেন:
- গাছের ডালে-পাতায়: রোদ-মাথানো গাছের সবুজ পাতায়।
- খোলা মাঠের খাতায়: আকাশ-ছোঁয়া খোলা প্রান্তরে।
- বিজলি হয়ে: আঁধার মেঘে বিদ্যুৎ চমকানোর মধ্যে।
- বৃষ্টির জলে: বৃষ্টি পড়লে খই (মুড়ি) ফোটার মতো যে বুদ্বুদ ওঠে, তাতে।
- পাখির ডানায়: রঙিন পাখির পাখায় রঙের বাহারে।
- শিশুর হাসিতে: খোকা-খুকুর মুখের মিটিমিটি হাসিতে।
অর্থাৎ, গোটা প্রকৃতি ও জীবনই 'টই'-তে ভরা, দরকার শুধু দেখার মতো চোখ আর অনুভব করার মতো মন।
এটি কবিতার চরম উপলব্ধি। কবি বলছেন—তোমরা যতই বই পড়ো না কেন, সে তো আসলে 'টই পড়া'। অর্থাৎ, প্রতিটি বইয়ের পেছনেই আছে কোনও না কোনও লেখকের কল্পনা, কৌতূহল, বিস্ময়—সংক্ষেপে, 'টই'। লেখকরা যদি তাঁদের 'টই' (কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতা) কাজে না লাগাতেন, তাহলে এত রকম বই থাকত কোথায়?
গভীর অর্থ: এই পৃথিবীতে যত জ্ঞানের ভাণ্ডার, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প—সবই এসেছে মানুষের কল্পনা ও কৌতূহল ('টই') থেকে। তাই 'টই' হল সব বইয়ের জননী।