বই-টই

প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত 'বই-টই' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, ব্যাখ্যা ও সমাধান | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

📖 বই-টই

প্রেমেন্দ্র মিত্র ছড়া / কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • একাদশ পাঠ

বই পড়া প্রকৃতি কৌতুক কল্পনা

প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪ - ১৯৮৮)

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক ও ছোটোগল্পকার। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথমা'। অন্যান্য বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ: 'স্রাট', 'ফেরারী ফৌজ', 'সাগর থেকে ফেরা'। উপন্যাস—'পাঁক', 'প্রতিশোধ', 'আগামীকাল' ইত্যাদি। কিশোর সাহিত্যে তিনি 'ঘনাদা' চরিত্র সৃষ্টি করে অমর হয়ে আছেন। এছাড়া বহু ছোটোগল্প ও ছড়ার রচয়িতা। বিজ্ঞান ও কল্পনার অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে তাঁর লেখায়।

📜

কবিতা

বই-টই

👤

কবি

প্রেমেন্দ্র মিত্র

🎭

ধরন

ছড়া / কৌতুক কবিতা

📚

পাঠ

একাদশ পাঠ (সাহিত্য মেলা)

সম্পূর্ণ কবিতা

বই-টই
বই তো পড়া টই পড়া কী? তাই তো কাটি ছড়া, বই পড়া সব মিছে-ই যদি না হয় টই পড়া।

টই পড়া যায় পড়তে কোথায়? বলিছ তবে শোনো, বই-এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে টই সে কোনা কোনা।

আর পাবে টই সকালবেলা বই থেকে মুখ তুলে, হঠাৎ যদি বাইরে চেয়ে মনটা ওঠে দুলে।

টই থাকে সব রোদ-মাথানো গাছের ডালে পাতায়, টই থাকে সেই আকাশ-ছোঁয়া খোলা মাঠের খাতায়।

টই চমকায় বিজলি হয়ে আঁধার-করা মেঘে, খই হয়ে টই ফোটে দিদিশা জলে বৃষ্টি লেগে।

টই কাঁশে সব ঘটে পাখির রং-বেরঙের পাখায়, খোকা-খুকুর মুখে আবার মিটিমিটি হাসি মাখায়।

বই পড়া খুব যত পারো সে তো পড়া টই, টই নইলে থাকত কোথায় এত রকম বই।

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

সারমর্ম: "বই-টই" প্রেমেন্দ্র মিত্রের এক চমৎকার কৌতুকময় ও দার্শনিক ছড়া-কবিতা। কবি এখানে বই পড়ার পাশাপাশি 'টই' নামে এক কাল্পনিক জিনিস পড়ার কথা বলেছেন। 'টই' পড়া মানে কী? কবির মতে, 'টই' লুকিয়ে আছে বইয়ের মধ্যেই কোনায় কোনায়। আবার 'টই' পাওয়া যায়—বই থেকে মুখ তুলে বাইরে তাকালে—রোদ-মাথানো গাছের ডালে-পাতায়, আকাশ-ছোঁয়া খোলা মাঠের খাতায়। 'টই' চমকায় বিজলি হয়ে, ফোটে বৃষ্টির জলে। পাখির রঙিন ডানায়, শিশুর হাসিতে—সর্বত্রই 'টই' ছড়িয়ে আছে।

'টই' আসলে কী? 'টই' হল কল্পনা, কৌতূহল, বিস্ময়বোধ ও সৃষ্টিশীলতা। বই পড়া মানে শুধু অক্ষর পড়া নয়—বই পড়তে পড়তে যদি মনটা কল্পনার জগতে ডুব দেয়, বাইরের প্রকৃতির দিকে চেয়ে দেখে, তবে তবেই আসল 'টই পড়া' হয়। কবি বলতে চান—সারা বিশ্বটাই এক বিশাল বই, আর তাকে পড়তে হয় কল্পনা ও মুক্ত মন নিয়ে। 'টই' না থাকলে এত রকম বই-ই বা থাকত কোথায়?

কেন্দ্রীয় চেতনা: প্রকৃত শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়; বরং চারপাশের জগৎকে মনোযোগ দিয়ে দেখা, অনুভব করা ও কল্পনার চোখ দিয়ে পড়তে পারাই হল আসল 'টই পড়া'।

পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও প্রশ্নোত্তর

গভীর ব্যাখ্যা
১ "বই তো পড়া টই পড়া কী? / তাই তো কাটি ছড়া" — 'টই' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

'টই' কোনও অভিধানের শব্দ নয়, এটি কবির সৃষ্টি। 'টই' হল কল্পনাশক্তি, কৌতূহল, বিস্ময়বোধ ও মুক্তচিন্তা। কবি এখানে বলেছেন—বই পড়া (অক্ষর জ্ঞান) তো সবাই করে, কিন্তু আসল ব্যাপার হল 'টই পড়া'। অর্থাৎ পড়তে পড়তে কল্পনার জগতে বিচরণ করা, নতুন কিছু ভাবা, বাইরের জগৎকে নতুন চোখে দেখা। "তাই তো কাটি ছড়া" অর্থ—এই ভাবনা থেকেই তিনি এই মজার ছড়াটি রচনা করেছেন। 'বই' আর 'টই'-এর মিল দিয়ে শব্দ নিয়ে খেলেছেন।

২ "টই পড়া যায় পড়তে কোথায়? / বলিছ তবে শোনো, / বই-এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে / টই সে কোনা কোনা।" — ব্যাখ্যা করো।

কবি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন—'টই পড়া' যায় কোথায়? তারপর উত্তর দিচ্ছেন—বইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে টই, তবে তা বইয়ের কোনো-না-কোনো কোণে (কোনা কোনা) লুকিয়ে। অর্থাৎ, বইয়ের প্রতিটি পাতায়, লাইনের ফাঁকে, শব্দের আড়ালে কল্পনা আর নতুন ভাবনা লুকিয়ে আছে। যে পাঠক কেবল অক্ষর পড়ে যায়, সে 'টই'-কে খুঁজে পায় না। কিন্তু যে মনোযোগ দিয়ে পড়ে, ভাবে, কল্পনা করে—সেই কেবল 'টই'-কে আবিষ্কার করতে পারে।

৩ "আর পাবে টই সকালবেলা / বই থেকে মুখ তুলে, / হঠাৎ যদি বাইরে চেয়ে / মনটা ওঠে দুলে।" — এর অর্থ কী?

কবি বলছেন—'টই' কেবল বইয়ের ভেতরেই নয়, বাইরের জগতেও আছে। সকালবেলা বই পড়তে পড়তে একসময় যদি মুখ তুলে বাইরে তাকাও, আর মনটা যদি দুলে ওঠে (অর্থাৎ, বাইরের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পড়ে), তাহলেই 'টই'-কে পাওয়া যায়। বাইরের জগৎ—নীল আকাশ, সবুজ গাছ, রোদ, পাখির ডাক—এসবই এক বিশাল বই, যা পড়তে হয় চোখ-মন খোলা রেখে।

৪ প্রকৃতিতে 'টই' কোথায় কোথায় লুকিয়ে থাকে?

কবি প্রকৃতির বিভিন্ন জায়গায় 'টই'-এর সন্ধান দিয়েছেন:

  • গাছের ডালে-পাতায়: রোদ-মাথানো গাছের সবুজ পাতায়।
  • খোলা মাঠের খাতায়: আকাশ-ছোঁয়া খোলা প্রান্তরে।
  • বিজলি হয়ে: আঁধার মেঘে বিদ্যুৎ চমকানোর মধ্যে।
  • বৃষ্টির জলে: বৃষ্টি পড়লে খই (মুড়ি) ফোটার মতো যে বুদ্বুদ ওঠে, তাতে।
  • পাখির ডানায়: রঙিন পাখির পাখায় রঙের বাহারে।
  • শিশুর হাসিতে: খোকা-খুকুর মুখের মিটিমিটি হাসিতে।

অর্থাৎ, গোটা প্রকৃতি ও জীবনই 'টই'-তে ভরা, দরকার শুধু দেখার মতো চোখ আর অনুভব করার মতো মন।

৫ "বই পড়া খুব যত পারো / সে তো পড়া টই, / টই নইলে থাকত কোথায় / এত রকম বই।" — শেষ স্তবকের মর্মার্থ লেখো।

এটি কবিতার চরম উপলব্ধি। কবি বলছেন—তোমরা যতই বই পড়ো না কেন, সে তো আসলে 'টই পড়া'। অর্থাৎ, প্রতিটি বইয়ের পেছনেই আছে কোনও না কোনও লেখকের কল্পনা, কৌতূহল, বিস্ময়—সংক্ষেপে, 'টই'। লেখকরা যদি তাঁদের 'টই' (কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতা) কাজে না লাগাতেন, তাহলে এত রকম বই থাকত কোথায়?

গভীর অর্থ: এই পৃথিবীতে যত জ্ঞানের ভাণ্ডার, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প—সবই এসেছে মানুষের কল্পনা ও কৌতূহল ('টই') থেকে। তাই 'টই' হল সব বইয়ের জননী।

টই পড়ার মন্ত্র

প্রেমেন্দ্র মিত্রের "বই-টই" ছড়াটি কেবল শিশু-কিশোরদের জন্য মজার কবিতা নয়, এটি শিক্ষা ও জীবনবোধের এক অনন্য দর্শন। কবি আমাদের শেখাতে চেয়েছেন—বই পড়া মানে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়, বই পড়া মানে কল্পনার ডানা মেলে দেওয়া, কৌতূহলী হওয়া, এবং চারপাশের জগৎকে নতুন করে আবিষ্কার করা। যতক্ষণ পর্যন্ত 'টই' আছে, ততক্ষণই জগৎ সুন্দর, জ্ঞান প্রাণবন্ত, আর বই অর্থবহ।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'বই-টই' কবিতাটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি ও 'ঘনাদা'-খ্যাত প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮) রচিত। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের একাদশ পাঠে অন্তর্ভুক্ত। 'টই' কবির সৃষ্টি—এর অর্থ কল্পনাশক্তি, কৌতূহল, বিস্ময়বোধ ও মুক্তচিন্তা। কবি বলতে চেয়েছেন, প্রকৃত পড়া মানে শুধু অক্ষর পড়া নয়; বরং কল্পনা ও কৌতূহল নিয়ে বই ও চারপাশের জগৎকে পড়তে পারাই হল আসল 'টই পড়া'।

কবির মতে, 'টই' লুকিয়ে আছে—রোদ-মাথানো গাছের ডালে-পাতায়, আকাশ-ছোঁয়া খোলা মাঠে, আঁধার মেঘে বিজলি চমকানোর মধ্যে, বৃষ্টির জলে খই ফোটার মতো বুদ্বুদে, পাখির রং-বেরঙের ডানায়, এবং শিশুদের মুখের মিটিমিটি হাসিতে। অর্থাৎ, সমগ্র প্রকৃতি ও জীবনই 'টই'-তে ভরা—দরকার শুধু দেখার মতো চোখ।

এই উক্তির গভীর তাৎপর্য হল—পৃথিবীতে যত বই, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প সৃষ্টি হয়েছে, সবই এসেছে মানুষের কল্পনা, কৌতূহল ও সৃষ্টিশীলতা ('টই') থেকে। কোনো লেখক বা বিজ্ঞানী যদি তাঁর 'টই'-কে কাজে না লাগাতেন, তাহলে এত বৈচিত্র্যময় জ্ঞানের ভাণ্ডার গড়ে উঠত না। তাই 'টই' হল সব বইয়ের উৎস ও প্রেরণা।