পটলবাবু ফিল্মস্টার
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • নবম পাঠ (দ্বিতীয় গল্প)
গল্প
পটলবাবু ফিল্মস্টার
লেখক
সত্যজিৎ রায়
পাঠ
নবম পাঠ (সাহিত্য মেলা)
ধরন
চলচ্চিত্র বিষয়ক কিশোর গল্প
গল্পের সারাংশ ও মূলভাব
গল্পের মূল বিষয়: "পটলবাবু ফিল্মস্টার" গল্পটি একজন সাধারণ মধ্যবয়স্ক মানুষের হঠাৎ ফিল্মে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার কাহিনি। পটলবাবু বা শ্রী শীতলাকান্ত রায় একদা পাড়ার থিয়েটারে অভিনয় করতেন। কিন্তু সংসারের চাপে সেই শখ চাপা পড়ে যায়। হঠাৎ একদিন নিশিকান্তবাবুর মাধ্যমে খবর আসে একটি ফিল্মের শুটিংয়ে একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব টাক-পড়া লোকের প্রয়োজন। পটলবাবু রাজি হন।
শুটিংয়ের দিন দেখা যায় পটলবাবুর চরিত্রটি অত্যন্ত ছোট—একজন পথচারী যে কিনা 'আঃ' শব্দটি উচ্চারণ করবে মাত্র। প্রথমে তিনি অপমানিত বোধ করেন। কিন্তু তাঁর পুরনো নাট্যগুরু গগন পাকড়াশির উপদেশ মনে পড়ে যায়—'যত ছোটো অংশই হোক, শিল্পী হিসেবে নিজের সেরাটা দিতে হবে।' পটলবাবু সেই ছোট্ট চরিত্রটিতেও নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও অভিনয়-কুশলতা ঢেলে দেন। তাঁর অভিনয় দেখে পরিচালক ও কলাকুশলীরা মুগ্ধ হন। কিন্তু অর্থ নেওয়ার আগেই পটলবাবু সেখান থেকে চলে যান—কারণ এই আত্মতৃপ্তিই তাঁর কাছে আসল পুরস্কার।
মূলভাব: কাজ ছোটো বা বড়ো নয়—নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দিয়ে করলে ছোটো কাজও সাফল্যমণ্ডিত হয়। আত্মতৃপ্তিই সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি।
১. বন্ধনীতে দেওয়া একাধিক উত্তরের মধ্যে ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে বাক্যগুলি আবার লেখো
| ক্রমিক | প্রশ্ন | ঠিক উত্তর |
|---|---|---|
| ১.১ | পটলবাবু অভিনয়ের সময় সংলাপ হিসেবে বলেছিলেন | আঃ |
| ১.২ | অভিনয়ের সময় পটলবাবুর হাতে ছিল | যুগান্তর |
| ১.৩ | অভিনয়ের সময় পটলবাবুর নাকের নীচে সেঁটে সেওয়া হয়েছিল | বাটারফ্লাই গোঁফ |
| ১.৪ | পরিচালিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়েছিলেন পটলবাবু | বেরন মিত্তির-র |
| ১.৫ | করালীবাবুর বাড়িতে হয় | শ্যামাসংগীত, রবিবার সকালে |
২. নীচের এলোমেলো ঘটনাগুলি গল্পের ঘটনাক্রম অনুযায়ী সাজাও
সঠিক ক্রম:
- পটলবাবু সবে বাজারের খালিটা কাঁধে খুলিয়েছেন এমন সময় বাইরে থেকে নিশিকান্তবাবু হাঁক দিলেন, "পটল আছ নাকি হে?"
- তা আপনি তো বেশ পোড়খাওয়া দেখছি।
- দুরুদুরু বুকে পটলবাবু এগিয়ে চললেন অফিসের গেটের দিকে।
- ঠিক আধঘণ্টা পরেই পটলবাবুর ডাক পড়ল, এখন আর তাঁর মনে কোনো নিরুৎসাহের ভাব নেই।
- সে কী, টাকা না নিয়েই চলে গেল নাকি লোকটা?
- টাকার তাঁর অভাব ঠিকই—কিন্তু আজকের এই যে আনন্দ, তার কাছে পাঁচটা টাকা আর কী?
৩. শুটিং-এর ঘটনা নিজের ভাষায় লেখো
পরিচালক বেরন মিত্তিরকে পটলবাবু নিজের একটি আইডিয়ার কথা বলতে গিয়ে প্রথমে ইতস্তত করছিলেন। কিন্তু সাহস করে বলেই ফেললেন। তাঁর মতে, হাতে যদি একটি খবরের কাগজ থাকে এবং তিনি যদি সেটা পড়তে পড়তে চলতে থাকেন আর হঠাৎ ধাক্কা খান, তাহলে অনমনস্ক ভাবটা আরও ভালোভাবে ফুটে উঠবে।
পরিচালক বেরন মিত্তির পটলবাবুর কথা পুরো শোনার আগেই উৎসাহের সঙ্গে সায় দিলেন এবং উপস্থিত সহকারীকে বলে পটলবাবুর হাতে 'যুগান্তর' পত্রিকাটি ধরিয়ে দিলেন। তারপর পটলবাবুকে খামের পাশে নির্ধারিত জায়গায় রেডি হয়ে যেতে বললেন। নায়ক চঞ্চলকুমারও প্রস্তুত ছিলেন। পটলবাবু তখন গোঁফ লাগিয়ে, হাতে খবরের কাগজ নিয়ে রেডি হয়ে দাঁড়ালেন।
৪. অনুৰূপ শব্দ খোঁজো
| প্রদত্ত শব্দ | গল্পে ব্যবহৃত সমার্থক/অনুরূপ শব্দ |
|---|---|
| উৎসাহহীন | নিরুৎসাহ |
| নিরালা | নিরিবিলি |
| অপ্রত্যাশিত | অভাবনীয় |
| নিরুপায় | নিরীহ |
| লাঞ্ছিত | অপমান |
| সম্মান | প্রতিপত্তি |
| প্রশংসা | তারিফ |
| পথিক | পথচারী |
৫. ইংরেজি শব্দের বদলে বাংলা শব্দ বসিয়ে বাক্য গঠন
| ক্রমিক | ইংরেজি শব্দ | বাংলা প্রতিশব্দ | নতুন বাক্য |
|---|---|---|---|
| ৫.১ | ইম্পটেন্ট | গুরুত্বপূর্ণ | বোঝোইনি ব্যাপারটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? |
| ৫.২ | ডায়ালগ | সংলাপ | এই, দাদুকে সংলাপ লিখে দে। |
| ৫.৩ | পেডেস্ট্রিয়ান | পথচারী | একজন অন্যমনস্ক, বদমেজাজি পথচারী... |
| ৫.৪ | ওয়েট | অপেক্ষা | তাহলে একটু ওদিকে সরে গিয়ে অপেক্ষা করুন। |
| ৫.৫ | ট্যাগোরস বার্থ | রবীন্দ্রজয়ন্তী | আজ তো রবীন্দ্রজয়ন্তী। |
| ৫.৬ | সাইলেন্ট | নীরব | নীরব। রোদ বেরিয়েছে। |
| ৫.৭ | থিয়েটার | নাট্যমঞ্চ | নাট্যমঞ্চ এর চেয়ে শতগুণ ভালো... |
| ৫.৮ | পোড়খাওয়া | অভিজ্ঞ | আপনি তো বেশ অভিজ্ঞ দেখছি। |
৬. বিশেষণগুলি দিয়ে উপযুক্ত বিশেষ্য সৃষ্টি করে বাক্য রচনা
| বিশেষণ | উপযুক্ত বিশেষ্য | বাক্য |
|---|---|---|
| দোহারা | যুবক | এক দোহারা যুবক রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। |
| ব্যস্ততম | দিন | বছরের এটাই সবচেয়ে ব্যস্ততম দিন। |
| আমুদে | লোক | নিশিকান্তবাবু খুব আমুদে লোক ছিলেন। |
| অন্যমনস্ক | ভাব | তার অন্যমনস্ক ভাব দেখে সবাই অবাক হলো। |
| দরকারি | কাজ | তোমার একটি দরকারি কাজ আছে। |
| গভীর | রাত | গভীর রাতে পাখিরা ঘুমায়। |
| নির্জন | বাড়ি | সন্ধ্যার পর জায়গাটা নির্জন বাড়ির মতো লাগে। |
| অভিভূত | মন | তার কথা শুনে মন অভিভূত হয়ে গেল। |
৭. বিশেষ্যগুলির আগে উপযুক্ত বিশেষণ স্থাপন করে বাক্য রচনা
| বিশেষ্য | উপযুক্ত বিশেষণ | বাক্য |
|---|---|---|
| প্রভাব | গভীর | তার উপর শিক্ষকের গভীর প্রভাব ছিল। |
| অভিনয় | অসাধারণ | পটলবাবুর অসাধারণ অভিনয় সবাইকে মুগ্ধ করল। |
| ফরমাশ | গিন্নির | গিন্নির ফরমাশ মতো বাজার করতে হলো। |
| ঔদ্ধত্য | প্রচণ্ড | তার প্রচণ্ড ঔদ্ধত্য কেউ সহ্য করতে পারত না। |
| পরিশ্রম | কঠোর | কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সাফল্য আসে না। |
| সাফল্য | বিরাট | তার বিরাট সাফল্যের কথা সবাই জানে। |
| উৎকণ্ঠা | প্রবল | ফল বেরোনোর আগে প্রবল উৎকণ্ঠায় ছিলাম। |
| আত্মতৃপ্তি | পরম | ভালো কাজ করলে পরম আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। |
৮. সংখ্যাবাচক, অনির্দেশক ও পূরণবাচক শব্দ খুঁজে বার করো
| ক্রমিক | বাক্য | শব্দ | প্রকার |
|---|---|---|---|
| ৮.১ | পটলবাবুর তিনখানা বাড়ির পরেই থাকেন। | তিনখানা | সংখ্যাবাচক |
| ৮.২ | বছর তিরিশেক বয়স, লখা দোহারা চেহারা। | তিরিশেক | অনির্দেশক সংখ্যাবাচক |
| ৮.৩ | বাহান্ন বছর বয়সে ফিল্ম অভিনয় করার প্রভাব আসতে পারে... | বাহান্ন | সংখ্যাবাচক |
| ৮.৪ | পটলবাবুর ন'বছরের সাধের চাকরিটা কপূরের মতো উবে গেল। | ন'বছরের | পূরণবাচক |
| ৮.৫ | তারপর এই দশটা বছর... কী-না করেছেন পটলবাবু। | দশটা | সংখ্যাবাচক |
| ৮.৬ | সেইটের সামনে ঠিক সাড়ে-আটটায় পৌঁছে যাবেন। | সাড়ে-আটটায় | পূরণবাচক |
৯. বিশেষ্যগুলিকে বিশেষণ বদলে লেখো
| বিশেষ্য | বিশেষণ |
|---|---|
| উৎকণ্ঠা | উৎকণ্ঠিত |
| প্রয়োগ | প্রায়োগিক |
| উদ্ধরণ | উদ্ধৃত |
| বিরক্তি | বিরক্ত |
| দত্ত | দত্তক |
| ঔদ্ধত্য | উদ্ধত |
| অনুভব | অনুভূত |
| পরিবেশন | পরিবেশিত |
১০. শব্দগুলি দিয়ে নতুন বাক্য রচনা
- টক করে: নিশিকান্তবাবু টক করে পটলবাবুর কথা মনে পড়ে গেল।
- ধাক্কা করে: হঠাৎ ধাক্কা করে দরজাটা খুলে গেল।
- তিড়িং করে: পটলবাবু বাহান্ন বছর বয়সে তিড়িং করে লাফ দিয়ে উঠলেন।
- হস্তদস্ত হয়ে: চঞ্চলকুমার ক্যাশ ভাঙার খবর পেয়ে হস্তদস্ত হয়ে অফিসে ছুটলেন।
- ঠাহর করে: অনেকক্ষণ তাকিয়েও আমি জিনিসটা ঠাহর করতে পারলাম না।
- বিম্বিম করে: রোদের আলোয় জলের উপর বিম্বিম করছে সোনালি আভা।
- ফিসফিস করে: দুজনে মিলে ফিসফিস করে কী যেন কথা বলছিল।
- টুক করে: টুক করে কথাটা বলে ফেলেই সে চুপ হয়ে গেল।
১১. বিশেষণগুলিকে বিশেষ্যে বদলে লেখো
| বিশেষণ | বিশেষ্য |
|---|---|
| গভীর | গভীরতা |
| বিকৃত | বিকৃতি |
| নির্জন | নির্জনতা |
| সার্থক | সার্থকতা |
| সংযত | সংযম |
| নির্বিবাদী | নির্বিবাদিতা |
| তীক্ষ্ণ | তীক্ষ্ণতা |
| উচিত | উচিততা |
১২. নিম্নরেখাঙ্কিত অংশের কারক ও বিভক্তি নির্ণয়
| ক্রমিক | বাক্যাংশ | কারক | বিভক্তি |
|---|---|---|---|
| ১২.১ | আপনি এই ছায়াটায় দাঁড়ান একটু। | অধিকরণ কারক | 'য়' বিভক্তি (ছায়া + টা + য়) |
| ১২.২ | এবার পটলবাবু লোকটিকে দেখতে পেলেন। | কর্মকারক | 'কে' বিভক্তি |
| ১২.৩ | নরেশ একতাড়া চা নিয়ে পটলবাবুর দিকে এগিয়ে এল। | করণ কারক | 'য়ে' বিভক্তি (নিয়ে) |
| ১২.৪ | শশাঙ্ক তার হাতেখড়ি থেকে একটা সাদা পাতা ছিঁড়ে... | অপাদান কারক | 'থেকে' বিভক্তি |
১৩. একটি বাক্যে উত্তর দাও
১৪. চার-পাঁচটি বাক্যে উত্তর দাও
নিশিকান্তবাবুর মনে টক করে পটলবাবুর কথা পড়ে গিয়েছিল। কারণ তাঁর ছোটোশালার সঙ্গে দেখা হওয়া এক ফিল্মের লোক (নরেশ দত্ত) এমন একজনকে খুঁজছিলেন যিনি বছর পঞ্চাশ বয়সি, বেঁটেখাটো, মাথায় টাক—ঠিক পটলবাবুর মতো। এতদিন ধরে চেনা পটলবাবুর অবিকল ওই বর্ণনার সঙ্গে মিল থাকায় কথা মনে পড়েছিল।
পটলবাবু ফিল্মে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন। বাহান্ন বছর বয়সে তিড়িং করে লাফ দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন—\'কী যে লাফটা দিতেন চ্যাপলিন! আজ যেন পুনর্যৌবন লাভ করেছি।\'
তাঁর গিন্নি বাস্তববাদী মানুষ। স্বামীর এতদিনের নানা পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে দেখেছেন। তাই ঠাট্টা করে বলেন—\'গাছ না থাকতেই কাঁঠাল ভাঙতে যেও না\' অর্থাৎ বাড়াবাড়ি করাটা উচিত হবে না।
গগন পাকড়াশি পটলবাবুর নাট্যগুরু ছিলেন। তাঁর উপদেশের স্মৃতিই পটলবাবুর অভিনেতা-সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। গগন পাকড়াশির অমূল্য উপদেশ ছিল: \'একটা কথা মনে রেখো পটল। যত ছোটো পার্টিই তোমাকে দেওয়া হোক, তুমি জেনে রেখো তাতে কোনো অপমান নেই। শিল্পী হিসেবে তোমার কৃতিত্ব হবে সেই ছোটো পার্টি থেকেও শেষ রসটুকু নিংড়ে বার করে তাকে সার্থক করে তোলা। থিয়েটারের কাজ হলো পাঁচজন মিলেমিশে কাজ। সকলের সাফল্য জড়িয়ে নাটকের সাফল্য।\'
বক্তা পরিচালক বেরন মিত্তির। পটলবাবু যখন নিজের চরিত্রটি অভিনয় করেন—হাতে খবরের কাগজ নিয়ে, গোঁফে হাত বুলিয়ে, সঠিক সময়ে নায়কের ধাক্কা খেয়ে \'আঃ\' শব্দটি উচ্চারণ করে রাগত স্বরে ফিরে তাকিয়ে \'সাইলেন্ট\' বলে নিজের গন্তব্যে চলে যান—তখন তাঁর টাইমিং ও অভিনয়-নৈপুণ্য এতটাই নিখুঁত ছিল যে পরিচালক অত্যন্ত খুশি হয়ে এই মন্তব্য করেছিলেন।
এই উক্তির মধ্য দিয়ে পটলবাবুর আত্মতৃপ্তি ও শিল্পীসত্তার জয়ের পরিচয় পাওয়া যায়। এতদিন সংসারের টানাপোড়েনে, চাকরি-বাকরির চেষ্টায় তাঁর ভিতরের অভিনেতা ঘুমিয়ে ছিল। আজ ছোট্ট একটি দৃশ্যেও নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়ে তিনি বুঝতে গিয়েছেন প্রকৃত সার্থকতা কী। টাকা নেওয়া-না-নেওয়া মুখ্য নয়—নিজের কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করে যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া গেছে, সেটাই বড়ো।