নানান দেশে নানান ভাষা

রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) রচিত 'নানান দেশে নানান ভাষা' টপ্পা গানটির সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ ও ব্যাখ্যা | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

🌏 নানান দেশে নানান ভাষা

রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) টপ্পা / আখড়াই গান

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ • প্রধান গ্রন্থ: গীতরত্ন

স্বদেশপ্রেম ভাষা বৈচিত্র্য নদী সরোবর টপ্পা

রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) (১৭৪১ - ১৮৩৯)

বাংলা টপ্পা সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান প্রবর্তক ও আখড়াই গানের আদিপুরুষ। 'নিধুবাবু' নামেই তিনি বাংলা সংগীত জগতে সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রধান গীতিসংগ্রহের নাম 'গীতরত্ন'। টপ্পা গানে তিনি এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন যা পরবর্তীকালে বাংলা সংগীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পাঞ্জাবি টপ্পার আদলে বাংলা ভাষায় তিনি যে গান রচনা করেন, তা ছিল সুরেলা ও ভাবপূর্ণ। তাঁর গানে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম ও প্রকৃতির প্রতি গভীর টানের প্রকাশ ঘটেছে।

🎵

গান

নানান দেশে নানান ভাষা

👑

রচয়িতা

রামনিধি গুপ্ত

🎼

ধরন

টপ্পা গান

📚

পাঠ

দ্বিতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

গানের সম্পূর্ণ কথা

গীতরত্ন
নানান দেশে নানান ভাষা।
বিনে স্বদেশীয় ভাষা পূরে কি আশা?
কত নদী সরোবর, কিবা ফল চাতকীর
ধরা জল বিনে কতু ঘুচে কি তৃষা॥

গানের সারাংশ ও মূলভাব

সারমর্ম: "নানান দেশে নানান ভাষা" রামনিধি গুপ্ত রচিত একটি স্বদেশপ্রেমমূলক টপ্পা গান। গানে কবি বলেছেন—এই পৃথিবীতে নানা দেশ, আর প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। কিন্তু নিজের দেশের ভাষা (মাতৃভাষা) ছাড়া মনের আশা কীভাবে পূর্ণ হতে পারে?

দ্বিতীয় স্তবকে তিনি একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। পৃথিবীতে অনেক নদী ও সরোবর (বড়ো জলাশয়) আছে। কিন্তু চাতক পাখির তৃষ্ণা মেটে কি সে সব নদী বা সরোবরের জলে? না। চাতক পাখি কেবল আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির (ধরা জল) স্বচ্ছ জল পান করেই তৃপ্ত হয়। তেমনি মানুষের হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটে কেবল নিজের মাতৃভাষাতেই—অন্য ভাষা যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন।

কেন্দ্রীয় চেতনা: নিজের দেশ, নিজের ভাষা ও নিজের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার কোনো বিকল্প হয় না।

পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ

গভীর ব্যাখ্যা
১ "নানান দেশে নানান ভাষা / বিনে স্বদেশীয় ভাষা পূরে কি আশা?"

অর্থ: সারা পৃথিবী জুড়ে আছে কত দেশ—ভারত, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান। প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব ভাষা—বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জাপানি। কিন্তু নিজের দেশের ভাষা, অর্থাৎ মাতৃভাষা (স্বদেশীয় ভাষা) ছাড়া মনের সব আশা কি পূর্ণ হতে পারে?

ভাব: বক্তব্য স্পষ্ট—না, পারে না। অন্যের জিনিস দেখে লোভ করা বা অন্য ভাষা শিখে গর্বিত হওয়া যায়, কিন্তু আত্মার তৃপ্তি কেবল নিজ ভাষাতেই।

২ "কত নদী সরোবর, কিবা ফল চাতকীর / ধরা জল বিনে কতু ঘুচে কি তৃষা?"

অর্থ: পৃথিবীতে কত বড়ো বড়ো নদী—গঙ্গা, পদ্মা, নীলনদ, আমাজন। কত বড়ো বড়ো সরোবর বা হ্রদ। কিন্তু চাতক পাখির তৃষ্ণা কি তাতে মেটে? না। চাতক এক অদ্ভুত পাখি—পৌরাণিক বিশ্বাসে, এই পাখি কেবল আকাশের বৃষ্টির জল (ধরা জল) পান করেই তৃপ্ত হয়। নদী বা সরোবরের জলে তার তৃষ্ণা মেটে না।

ভাব: ঠিক তেমনই—মানুষের মনের তৃষ্ণা, আত্মার পিপাসা মেটে কেবল মাতৃভাষার সুরে, স্বদেশের মাটির গন্ধে। অন্য দেশের ভাষা যতই উন্নত বা সমৃদ্ধ হোক, তা কখনোই মনের গভীর চাহিদা পূরণ করতে পারে না।

শব্দার্থ ও টীকা

শব্দঅর্থ
নানাননানা, অনেক, বিবিধ (Many/Various)।
স্বদেশীয়নিজের দেশের, স্বদেশের (Native)।
বিনেছাড়া, ব্যতীত (Without)।
সরোবরবড়ো জলাশয়, হ্রদ, দিঘি (Lake/Pond)।
কিবাকী-ই বা, কী-ই-বা আর (What even)।
চাতকীচাতক পাখি—পৌরাণিক বিশ্বাসে যে কেবল বৃষ্টির জল পান করে।
ধরা জলআকাশ থেকে ধরা বা পড়া জল, অর্থাৎ বৃষ্টির জল (Rainwater)।
তৃষাতৃষ্ণা, পিপাসা (Thirst)।
ঘুচেঘোচে, দূর হয়, মেটে (Quench)।
কতুকখনও, কোনোভাবেই কি? (Ever/At all)।

অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর

সংক্ষিপ্ত
১ গানটিতে \'নানান দেশে নানান ভাষা\' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

পৃথিবীতে অসংখ্য দেশ রয়েছে এবং প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব মাতৃভাষা বা প্রধান ভাষা আছে। উদাহরণ: বাংলা (বাংলাদেশ/ভারত), ইংরেজি (ইংল্যান্ড), ফরাসি (ফ্রান্স), জাপানি (জাপান), হিন্দি (ভারত), উর্দু (পাকিস্তান) ইত্যাদি।

২ \'স্বদেশীয় ভাষা\' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

\'স্বদেশীয় ভাষা\' বলতে নিজের দেশের ভাষা, অর্থাৎ মাতৃভাষাকে বোঝানো হয়েছে। কবির কাছে তা বাংলা ভাষা। এটি এমন এক ভাষা, যা জন্মের পর মায়ের মুখ থেকে শেখা।

৩ চাতক পাখির উদাহরণ কেন দেওয়া হয়েছে?

চাতক পাখি কেবল বৃষ্টির জল পান করে, নদী বা সরোবরের জলে তার তৃষ্ণা মেটে না। তেমনই মাতৃভাষার প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ও আত্মিক আকর্ষণ এমনই—অন্য ভাষায় কখনো মন ভরে না।

৪ \'ধরা জল\' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

\'ধরা জল\' অর্থ আকাশ থেকে ধরা/পড়া জল, অর্থাৎ খাঁটি বৃষ্টির জল (Rainwater), যা মাটি বা নদী স্পর্শ করেনি। পৌরাণিক মতে, চাতক পাখি কেবল এই জলই পান করে।

৫ গানটির মূল বার্তা কী?

গানটির মূল বার্তা হল—পৃথিবীতে কত ভাষাই থাকুক না কেন, নিজের মাতৃভাষার মতো আপন আর কিছু নয়। আত্মার তৃপ্তি কেবল মাতৃভাষাতেই পাওয়া যায়, অন্য কোনো ভাষায় নয়।

৬ গানটির ধরন কী?

এটি একটি টপ্পা গান। টপ্পা এক ধরনের হালকা-চালের, দ্রুত লয়ের সংগীত ধারা যা পাঞ্জাব থেকে বাংলায় আসে। রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) বাংলা টপ্পার প্রধান প্রবর্তক।

৭ গানটির রচয়িতা ও তাঁর প্রধান গ্রন্থের নাম কী?

গানটির রচয়িতা রামনিধি গুপ্ত, যিনি নিধুবাবু নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রধান গীতি-সংগ্রহের নাম \'গীতরত্ন\'।

স্বদেশ প্রেমের অমর গান

রামনিধি গুপ্তের এই ছোট্ট টপ্পা গানটি আকারে ছোটো হলেও ভাবার্থে অত্যন্ত গভীর। চাতক পাখি যেমন স্বচ্ছ বৃষ্টিজল ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনই প্রকৃত মানুষ তার মাতৃভাষার সুর ছাড়া বাঁচতে পারে না। পৃথিবীতে হাজারো ভাষার ভিড়ে নিজের মাতৃভাষার প্রতিই এই অটুট ভালোবাসা ও আস্থা গানটির প্রাণ।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'নানান দেশে নানান ভাষা\' গানটি বাংলা টপ্পা সঙ্গীতের প্রধান প্রবর্তক রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) (১৭৪১-১৮৩৯) রচিত। এটি একটি টপ্পা গান, যা তাঁর বিখ্যাত গীতি-সংগ্রহ \'গীতরত্ন\' থেকে নেওয়া হয়েছে। গানটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির \'সাহিত্য মেলা\' পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় পাঠে অন্তর্ভুক্ত।

গানটির মূলভাব: পৃথিবীতে নানা দেশ ও নানা ভাষা থাকলেও নিজের মাতৃভাষার (স্বদেশীয় ভাষা) মতো আপন আর কিছু নয়। কবি একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন—চাতক পাখির তৃষ্ণা নদী বা সরোবরের জলে মেটে না, মেটে কেবল আকাশের বৃষ্টির জলে। তেমনই মানুষের মনের তৃষ্ণা মেটে কেবল নিজের মাতৃভাষার সুরে; অন্য ভাষা তা পারে না। এটি স্বদেশপ্রেম ও মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগের গান।

চাতক পাখি পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী একমাত্র আকাশের বৃষ্টির জল পান করেই তৃপ্ত হয়—নদী বা সরোবরের জলে তার তৃষ্ণা মেটে না। কবি এই উপমা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের আত্মার তৃষ্ণা মেটে কেবল নিজের মাতৃভাষাতেই। পৃথিবীতে যত ভাষাই থাকুক, অন্য কোনো ভাষায় সেই আত্মিক তৃপ্তি ও মমত্ববোধ পাওয়া সম্ভব নয়।