🌏 নানান দেশে নানান ভাষা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ • প্রধান গ্রন্থ: গীতরত্ন
গান
নানান দেশে নানান ভাষা
রচয়িতা
রামনিধি গুপ্ত
ধরন
টপ্পা গান
পাঠ
দ্বিতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)
গানের সম্পূর্ণ কথা
গীতরত্নবিনে স্বদেশীয় ভাষা পূরে কি আশা?
কত নদী সরোবর, কিবা ফল চাতকীর
ধরা জল বিনে কতু ঘুচে কি তৃষা॥
গানের সারাংশ ও মূলভাব
সারমর্ম: "নানান দেশে নানান ভাষা" রামনিধি গুপ্ত রচিত একটি স্বদেশপ্রেমমূলক টপ্পা গান। গানে কবি বলেছেন—এই পৃথিবীতে নানা দেশ, আর প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। কিন্তু নিজের দেশের ভাষা (মাতৃভাষা) ছাড়া মনের আশা কীভাবে পূর্ণ হতে পারে?
দ্বিতীয় স্তবকে তিনি একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। পৃথিবীতে অনেক নদী ও সরোবর (বড়ো জলাশয়) আছে। কিন্তু চাতক পাখির তৃষ্ণা মেটে কি সে সব নদী বা সরোবরের জলে? না। চাতক পাখি কেবল আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির (ধরা জল) স্বচ্ছ জল পান করেই তৃপ্ত হয়। তেমনি মানুষের হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটে কেবল নিজের মাতৃভাষাতেই—অন্য ভাষা যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন।
কেন্দ্রীয় চেতনা: নিজের দেশ, নিজের ভাষা ও নিজের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার কোনো বিকল্প হয় না।
পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ
গভীর ব্যাখ্যাঅর্থ: সারা পৃথিবী জুড়ে আছে কত দেশ—ভারত, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান। প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব ভাষা—বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জাপানি। কিন্তু নিজের দেশের ভাষা, অর্থাৎ মাতৃভাষা (স্বদেশীয় ভাষা) ছাড়া মনের সব আশা কি পূর্ণ হতে পারে?
ভাব: বক্তব্য স্পষ্ট—না, পারে না। অন্যের জিনিস দেখে লোভ করা বা অন্য ভাষা শিখে গর্বিত হওয়া যায়, কিন্তু আত্মার তৃপ্তি কেবল নিজ ভাষাতেই।
অর্থ: পৃথিবীতে কত বড়ো বড়ো নদী—গঙ্গা, পদ্মা, নীলনদ, আমাজন। কত বড়ো বড়ো সরোবর বা হ্রদ। কিন্তু চাতক পাখির তৃষ্ণা কি তাতে মেটে? না। চাতক এক অদ্ভুত পাখি—পৌরাণিক বিশ্বাসে, এই পাখি কেবল আকাশের বৃষ্টির জল (ধরা জল) পান করেই তৃপ্ত হয়। নদী বা সরোবরের জলে তার তৃষ্ণা মেটে না।
ভাব: ঠিক তেমনই—মানুষের মনের তৃষ্ণা, আত্মার পিপাসা মেটে কেবল মাতৃভাষার সুরে, স্বদেশের মাটির গন্ধে। অন্য দেশের ভাষা যতই উন্নত বা সমৃদ্ধ হোক, তা কখনোই মনের গভীর চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
শব্দার্থ ও টীকা
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| নানান | নানা, অনেক, বিবিধ (Many/Various)। |
| স্বদেশীয় | নিজের দেশের, স্বদেশের (Native)। |
| বিনে | ছাড়া, ব্যতীত (Without)। |
| সরোবর | বড়ো জলাশয়, হ্রদ, দিঘি (Lake/Pond)। |
| কিবা | কী-ই বা, কী-ই-বা আর (What even)। |
| চাতকী | চাতক পাখি—পৌরাণিক বিশ্বাসে যে কেবল বৃষ্টির জল পান করে। |
| ধরা জল | আকাশ থেকে ধরা বা পড়া জল, অর্থাৎ বৃষ্টির জল (Rainwater)। |
| তৃষা | তৃষ্ণা, পিপাসা (Thirst)। |
| ঘুচে | ঘোচে, দূর হয়, মেটে (Quench)। |
| কতু | কখনও, কোনোভাবেই কি? (Ever/At all)। |
অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর
সংক্ষিপ্তপৃথিবীতে অসংখ্য দেশ রয়েছে এবং প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব মাতৃভাষা বা প্রধান ভাষা আছে। উদাহরণ: বাংলা (বাংলাদেশ/ভারত), ইংরেজি (ইংল্যান্ড), ফরাসি (ফ্রান্স), জাপানি (জাপান), হিন্দি (ভারত), উর্দু (পাকিস্তান) ইত্যাদি।
\'স্বদেশীয় ভাষা\' বলতে নিজের দেশের ভাষা, অর্থাৎ মাতৃভাষাকে বোঝানো হয়েছে। কবির কাছে তা বাংলা ভাষা। এটি এমন এক ভাষা, যা জন্মের পর মায়ের মুখ থেকে শেখা।
চাতক পাখি কেবল বৃষ্টির জল পান করে, নদী বা সরোবরের জলে তার তৃষ্ণা মেটে না। তেমনই মাতৃভাষার প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ও আত্মিক আকর্ষণ এমনই—অন্য ভাষায় কখনো মন ভরে না।
\'ধরা জল\' অর্থ আকাশ থেকে ধরা/পড়া জল, অর্থাৎ খাঁটি বৃষ্টির জল (Rainwater), যা মাটি বা নদী স্পর্শ করেনি। পৌরাণিক মতে, চাতক পাখি কেবল এই জলই পান করে।
গানটির মূল বার্তা হল—পৃথিবীতে কত ভাষাই থাকুক না কেন, নিজের মাতৃভাষার মতো আপন আর কিছু নয়। আত্মার তৃপ্তি কেবল মাতৃভাষাতেই পাওয়া যায়, অন্য কোনো ভাষায় নয়।
এটি একটি টপ্পা গান। টপ্পা এক ধরনের হালকা-চালের, দ্রুত লয়ের সংগীত ধারা যা পাঞ্জাব থেকে বাংলায় আসে। রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) বাংলা টপ্পার প্রধান প্রবর্তক।
গানটির রচয়িতা রামনিধি গুপ্ত, যিনি নিধুবাবু নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রধান গীতি-সংগ্রহের নাম \'গীতরত্ন\'।