ও আমার দরদী আগে জানলে

ভাটিয়ালি গান | জসীমউদ্দীন সংকলিত 'ও আমার দরদী আগে জানলে' গানটির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, সারাংশ ও সমাধান | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

⛵ ও আমার দরদী আগে জানলে

ভাটিয়ালি গান লোকসংগীত

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • নবম পাঠ • সংকলিত: জসীমউদ্দীন

নদী মাঝি বিরহ ভাটি অঞ্চল

ভাটিয়ালি গান ও জসীমউদ্দীন (১৯০৪ - ১৯৭৭)

ভাটিয়ালি: পূর্ববঙ্গের পল্লীগীতির একটি বিশেষ প্রকার। ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা ও শ্রীহট্ট জেলায় বিশেষভাবে প্রচলিত। বিশেষত ভাটিয়ালিতে তাল থাকে না, এ গান ছন্দপ্রধানও নয়। সাধারণত খোলা মাঠের রাখালের মুখে বা নদীর বুকের মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে এই গান শোনা যায়। প্রখ্যাত ভাটিয়ালি গায়কদের মধ্যে আব্বাসউদ্দীন, সিরাজ আলী, রশিদউদ্দীন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

জসীমউদ্দীন: বিখ্যাত কবি, গীতিকার, লোকসংস্কৃতি গবেষক। বাঙালি পাঠকের কাছে 'পল্লীকবি' হিসেবে অধিক পরিচিত। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে বিখ্যাত এই ভাটিয়ালি গানটি জসীমউদ্দীনের 'রঙিলা নায়ের মাঝি' গ্রন্থ থেকে গৃহীত।

🎵

গান

ও আমার দরদী আগে জানলে

🎭

ধরন

ভাটিয়ালি (লোকসংগীত)

📚

সংকলক

জসীমউদ্দীন

🏫

পাঠ

নবম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

গানের সম্পূর্ণ কথা

ভাটিয়ালি
লবঙ্গ লতিকার দেশে
যাবার ছিলো বাসনা
ওরে মাঝ দরিয়ায় নাও ভুলিলো
উপায় কী তার বলো না।

কলকল ছলছল আগে চল আগে চল
নাই বল তবু বল
ওরে মাঝি তুই কেন
হলি আজ বিমনা
ও তোর সামনে নাচে বিজলি লয়ে
কন্যা সোনার বরণা।

গানের সারমর্ম ও মূলভাব

সারমর্ম: "ও আমার দরদী আগে জানলে" (লুব্ধ লতিকার দেশে) একটি চিরন্তন ভাটিয়ালি গানের পঙ্ক্তি-খণ্ড। গানটিতে এক নদী-জীবনের কাহিনি, বিরহ ও প্রেমের সুর মেশানো আছে। মাঝি নদীর বুকে নৌকা চালাচ্ছে; গানের কথায় মিশে আছে \'লবঙ্গ লতিকার দেশে\'-র মায়াময় টান। মাঝ দরিয়ায় (নদীর মাঝপথে) যদি নাও (নৌকা) দিশা হারায় (\’ভুলিলো\’), তাহলে উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।

গানের শেষাংশে মাঝির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে—তোর সামনেই তো বিজলির আলোয় সোনার বরণ কন্যা নাচছে। তবু কেন তুই বিমনা (অন্যমনস্ক)? কলকল ছলছল শব্দে জল চলছে, কিন্তু মন যেন তবু বলে—আগে চল, আগে চল।

কেন্দ্রীয় চেতনা: ভাটিয়ালি গানের অন্তর্গত এই গানে একইসঙ্গে নদীর বুকে জীবনের অনিশ্চয়তা, আকর্ষণ ও বিরহের সুর ধ্বনিত হয়েছে। নদী এখানে জীবনপথেরই প্রতীক।

পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও প্রশ্নোত্তর

গভীর ব্যাখ্যা
১ "লবঙ্গ লতিকার দেশে / যাবার ছিলো বাসনা" — এর অর্থ কী?

"লবঙ্গ লতিকা" একটি কল্পিত রূপকথার দেশ। \’লবঙ্গ\’ মানে লবঙ্গ (একটি সুগন্ধি মসলা), আর \’লতিকা\’ মানে লতা বা কোমল নারী। মিলিয়ে এটি এক স্বপ্নময়, সুগন্ধময়, রূপকথার রাজ্যের নাম। মাঝি বলছে—আমার বাসনা ছিল সেই লবঙ্গ লতিকার দেশে যাওয়ার। অর্থাৎ, এক সুন্দর ও আদর্শ জীবনের স্বপ্ন দেখা।

২ "ওরে মাঝ দরিয়ায় নাও ভুলিলো / উপায় কী তার বলো না" — এখানে \’নাও ভুলিলো\’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

\’নাও ভুলিলো\’ বলতে বোঝানো হয়েছে—নদীর মাঝপথে এসে নৌকা দিশা হারিয়েছে বা পথ ভুলেছে। এটি কেবল নৌকার কথা নয়, বরং জীবনরূপী তরীর কথাও। যখন মানুষ জীবনের মাঝপথে এসে পথ হারিয়ে ফেলে, তখন উপায় কী? এই প্রশ্নই গানে ধ্বনিত হয়েছে।

৩ "কলকল ছলছল আগে চল আগে চল / নাই বল তবু বল" — এর অর্থ ব্যাখ্যা করো।

নদীর জল \’কলকল\’ ও \’ছলছল\’ শব্দ করে বয়ে চলেছে। জলের স্রোত যেন বলছে—\’আগে চল, আগে চল\’ (এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো)। কিন্তু মনের ভিতর অন্য কথা—\’নাই বল তবু বল\’। অর্থাৎ, মন হয়তো চুপ করে আছে, কিছু বলছে না; কিন্তু তবুও তাকে বলতে হবে—কেন এ পথে এলি?

৪ "ওরে মাঝি তুই কেন / হলি আজ বিমনা" — মাঝি কেন বিমনা হয়েছে?

\’বিমনা\’ অর্থ অন্যমনস্ক, উদাস, চিন্তামগ্ন। মাঝি বিমনা হয়েছে কারণ তার সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য—বিজলির আলোয় (ঠিকরে পড়া সূর্যকিরণ বা বিদ্যুৎচমক) এক সোনার বরণ (গৌরবর্ণা, উজ্জ্বল শ্যামা) কন্যা যেন নৃত্য করছে। এই মায়াবী দৃশ্যে মাঝির মন মুগ্ধ, বিভোর। তাই তার হাতের বৈঠা থেমে গেছে, মন হারিয়ে গেছে।

৫ "তোর সামনে নাচে বিজলি লয়ে / কন্যা সোনার বরণা" — এই চিত্রকল্পের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করো।

এটি ভাটিয়ালি গানের এক অনন্য চিত্রকল্প। গভীর নদীর বুকে যখন সন্ধ্যা নামে অথবা ঝড় ওঠে, আকাশে বিজলি চমকায়। সেই আলো যখন নদীর জলে প্রতিফলিত হয়, তখন মনে হয় যেন এক সোনার বরণ (স্বর্ণালী দেহকান্তিবিশিষ্ট) কন্যা বিজলির আলো হাতে নদীর বুকে নৃত্য করছে। মাঝি সেই দৃশ্য দেখে এতই বিমোহিত যে, নৌকা চালাতে ভুলে যায়।

৬ ভাটিয়ালি গানের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী?

ভাটিয়ালি গানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি:

  • এটি পূর্ববঙ্গের (ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট) পল্লীগীতি।
  • বিশেষত ভাটিয়ালিতে তাল থাকে না এবং এটি ছন্দপ্রধানও নয়—সুরের ঢেউয়ে ভেসে চলে।
  • সাধারণত নদীর বুকে মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে অথবা খোলা মাঠের রাখালের মুখে শোনা যায়।
  • বিষয় ও ভাববস্তুতে গভীর বৈচিত্র্য আছে—একদিকে দেহতত্ত্ব, অন্যদিকে শুদ্ধ জলাঙ্গীত।
  • এটি দুই বাংলারই নিজস্ব সম্পদ এবং নদীমাতৃক প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
  • প্রখ্যাত গায়ক: আব্বাসউদ্দীন, সিরাজ আলী, রশিদউদ্দীন প্রমুখ।
৭ জসীমউদ্দীন কেন এই গানটি সংগ্রহ করেছিলেন?

কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক জসীমউদ্দীন ছিলেন বাংলার লোকগানের একনিষ্ঠ সংগ্রাহক। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ \’রঙিলা নায়ের মাঝি\’-তে বাংলার নদীজীবন ও লোকগানের অপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়েছেন। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে এই ভাটিয়ালি গানটি শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।

শব্দার্থ ও টীকা

শব্দঅর্থ
লবঙ্গ লতিকাকল্পিত রূপকথার দেশ; সুগন্ধি মসলা ও লতার দেশ।
বাসনাইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা।
মাঝ দরিয়ানদীর মাঝপথ, মধ্য স্রোত।
নাও ভুলিলোনৌকা পথ হারিয়েছে, দিশাহারা হয়েছে।
কলকল ছলছলনদীর জলের ধ্বন্যাত্মক শব্দ (অনুকার)।
বিমনাঅন্যমনস্ক, উদাস, বিভোর।
বিজলিবিদ্যুৎ, বিজলির চমক।
সোনার বরণাস্বর্ণালী দেহকান্তিযুক্ত (গৌরবর্ণা); সুন্দরী নারী।

নদী আর জীবনের গান

ভাটিয়ালি গান বাংলার নদীমাতৃক সভ্যতার অমূল্য সম্পদ। নদীর বুকে মাঝির জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতির রূপ—সব মিলেমিশে একাকার এই গানে। "ও আমার দরদী আগে জানলে" গানটিও সেরকমই— জীবনের অনিশ্চয়তা, সৌন্দর্যের মুগ্ধতা আর এগিয়ে চলার চিরন্তন আকুতি ধ্বনিত হয়েছে এর প্রতিটি পঙ্ক্তিতে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'ও আমার দরদী আগে জানলে' একটি ভাটিয়ালি গান—যা পূর্ববঙ্গের পল্লীগীতির বিশেষ প্রকার। এটি বিখ্যাত কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক জসীমউদ্দীন (১৯০৪-১৯৭৭) সংকলিত 'রঙিলা নায়ের মাঝি' গ্রন্থ থেকে গৃহীত। গানটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের নবম পাঠে অন্তর্ভুক্ত। প্রখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গানটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।

ভাটিয়ালি গান পূর্ববঙ্গের (ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট) পল্লীগীতির বিশেষ প্রকার। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য: (১) এতে তাল থাকে না এবং এটি ছন্দপ্রধান নয়। (২) সাধারণত নদীর মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে বা খোলা মাঠের রাখালের মুখে শোনা যায়। (৩) বিষয় ও ভাববস্তুতে গভীর বৈচিত্র্য—একদিকে দেহতত্ত্ব, অন্যদিকে শুদ্ধ জলাঙ্গীত। (৪) এটি দুই বাংলারই নিজস্ব সম্পদ, নদীমাতৃক প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রখ্যাত ভাটিয়ালি গায়ক: আব্বাসউদ্দীন, সিরাজ আলী, রশিদউদ্দীন প্রমুখ।

'লবঙ্গ লতিকা' একটি কল্পিত রূপকথার দেশ। 'লবঙ্গ' মানে সুগন্ধি মসলা, আর 'লতিকা' মানে লতা বা কোমল নারী। মিলিয়ে এটি এক স্বপ্নময়, সুগন্ধময়, কল্পরাজ্যের নাম। গানে মাঝির বাসনা ছিল সেই মায়াময় দেশে যাওয়ার—যা আসলে পরিপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন এবং সুন্দরের প্রতি মানুষের চিরন্তন আকর্ষণেরই প্রতীক।