⛵ ও আমার দরদী আগে জানলে
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • নবম পাঠ • সংকলিত: জসীমউদ্দীন
গান
ও আমার দরদী আগে জানলে
ধরন
ভাটিয়ালি (লোকসংগীত)
সংকলক
জসীমউদ্দীন
পাঠ
নবম পাঠ (সাহিত্য মেলা)
গানের সম্পূর্ণ কথা
ভাটিয়ালিযাবার ছিলো বাসনা
ওরে মাঝ দরিয়ায় নাও ভুলিলো
উপায় কী তার বলো না।
কলকল ছলছল আগে চল আগে চল
নাই বল তবু বল
ওরে মাঝি তুই কেন
হলি আজ বিমনা
ও তোর সামনে নাচে বিজলি লয়ে
কন্যা সোনার বরণা।
গানের সারমর্ম ও মূলভাব
সারমর্ম: "ও আমার দরদী আগে জানলে" (লুব্ধ লতিকার দেশে) একটি চিরন্তন ভাটিয়ালি গানের পঙ্ক্তি-খণ্ড। গানটিতে এক নদী-জীবনের কাহিনি, বিরহ ও প্রেমের সুর মেশানো আছে। মাঝি নদীর বুকে নৌকা চালাচ্ছে; গানের কথায় মিশে আছে \'লবঙ্গ লতিকার দেশে\'-র মায়াময় টান। মাঝ দরিয়ায় (নদীর মাঝপথে) যদি নাও (নৌকা) দিশা হারায় (\’ভুলিলো\’), তাহলে উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।
গানের শেষাংশে মাঝির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে—তোর সামনেই তো বিজলির আলোয় সোনার বরণ কন্যা নাচছে। তবু কেন তুই বিমনা (অন্যমনস্ক)? কলকল ছলছল শব্দে জল চলছে, কিন্তু মন যেন তবু বলে—আগে চল, আগে চল।
কেন্দ্রীয় চেতনা: ভাটিয়ালি গানের অন্তর্গত এই গানে একইসঙ্গে নদীর বুকে জীবনের অনিশ্চয়তা, আকর্ষণ ও বিরহের সুর ধ্বনিত হয়েছে। নদী এখানে জীবনপথেরই প্রতীক।
পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও প্রশ্নোত্তর
গভীর ব্যাখ্যা"লবঙ্গ লতিকা" একটি কল্পিত রূপকথার দেশ। \’লবঙ্গ\’ মানে লবঙ্গ (একটি সুগন্ধি মসলা), আর \’লতিকা\’ মানে লতা বা কোমল নারী। মিলিয়ে এটি এক স্বপ্নময়, সুগন্ধময়, রূপকথার রাজ্যের নাম। মাঝি বলছে—আমার বাসনা ছিল সেই লবঙ্গ লতিকার দেশে যাওয়ার। অর্থাৎ, এক সুন্দর ও আদর্শ জীবনের স্বপ্ন দেখা।
\’নাও ভুলিলো\’ বলতে বোঝানো হয়েছে—নদীর মাঝপথে এসে নৌকা দিশা হারিয়েছে বা পথ ভুলেছে। এটি কেবল নৌকার কথা নয়, বরং জীবনরূপী তরীর কথাও। যখন মানুষ জীবনের মাঝপথে এসে পথ হারিয়ে ফেলে, তখন উপায় কী? এই প্রশ্নই গানে ধ্বনিত হয়েছে।
নদীর জল \’কলকল\’ ও \’ছলছল\’ শব্দ করে বয়ে চলেছে। জলের স্রোত যেন বলছে—\’আগে চল, আগে চল\’ (এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো)। কিন্তু মনের ভিতর অন্য কথা—\’নাই বল তবু বল\’। অর্থাৎ, মন হয়তো চুপ করে আছে, কিছু বলছে না; কিন্তু তবুও তাকে বলতে হবে—কেন এ পথে এলি?
\’বিমনা\’ অর্থ অন্যমনস্ক, উদাস, চিন্তামগ্ন। মাঝি বিমনা হয়েছে কারণ তার সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য—বিজলির আলোয় (ঠিকরে পড়া সূর্যকিরণ বা বিদ্যুৎচমক) এক সোনার বরণ (গৌরবর্ণা, উজ্জ্বল শ্যামা) কন্যা যেন নৃত্য করছে। এই মায়াবী দৃশ্যে মাঝির মন মুগ্ধ, বিভোর। তাই তার হাতের বৈঠা থেমে গেছে, মন হারিয়ে গেছে।
এটি ভাটিয়ালি গানের এক অনন্য চিত্রকল্প। গভীর নদীর বুকে যখন সন্ধ্যা নামে অথবা ঝড় ওঠে, আকাশে বিজলি চমকায়। সেই আলো যখন নদীর জলে প্রতিফলিত হয়, তখন মনে হয় যেন এক সোনার বরণ (স্বর্ণালী দেহকান্তিবিশিষ্ট) কন্যা বিজলির আলো হাতে নদীর বুকে নৃত্য করছে। মাঝি সেই দৃশ্য দেখে এতই বিমোহিত যে, নৌকা চালাতে ভুলে যায়।
ভাটিয়ালি গানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি:
- এটি পূর্ববঙ্গের (ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট) পল্লীগীতি।
- বিশেষত ভাটিয়ালিতে তাল থাকে না এবং এটি ছন্দপ্রধানও নয়—সুরের ঢেউয়ে ভেসে চলে।
- সাধারণত নদীর বুকে মাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে অথবা খোলা মাঠের রাখালের মুখে শোনা যায়।
- বিষয় ও ভাববস্তুতে গভীর বৈচিত্র্য আছে—একদিকে দেহতত্ত্ব, অন্যদিকে শুদ্ধ জলাঙ্গীত।
- এটি দুই বাংলারই নিজস্ব সম্পদ এবং নদীমাতৃক প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
- প্রখ্যাত গায়ক: আব্বাসউদ্দীন, সিরাজ আলী, রশিদউদ্দীন প্রমুখ।
কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক জসীমউদ্দীন ছিলেন বাংলার লোকগানের একনিষ্ঠ সংগ্রাহক। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ \’রঙিলা নায়ের মাঝি\’-তে বাংলার নদীজীবন ও লোকগানের অপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়েছেন। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে এই ভাটিয়ালি গানটি শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।
শব্দার্থ ও টীকা
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| লবঙ্গ লতিকা | কল্পিত রূপকথার দেশ; সুগন্ধি মসলা ও লতার দেশ। |
| বাসনা | ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা। |
| মাঝ দরিয়া | নদীর মাঝপথ, মধ্য স্রোত। |
| নাও ভুলিলো | নৌকা পথ হারিয়েছে, দিশাহারা হয়েছে। |
| কলকল ছলছল | নদীর জলের ধ্বন্যাত্মক শব্দ (অনুকার)। |
| বিমনা | অন্যমনস্ক, উদাস, বিভোর। |
| বিজলি | বিদ্যুৎ, বিজলির চমক। |
| সোনার বরণা | স্বর্ণালী দেহকান্তিযুক্ত (গৌরবর্ণা); সুন্দরী নারী। |