Chapter 1.A: উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা এবং সাড়াপ্রদান
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি | 51 MCQ | 42 SAQ | 10 Broad Questions
উদ্ভিদের চলন
ট্যাকটিক, ট্রপিক এবং ন্যাস্টিক চলনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা
জে. সি. বসুর পরীক্ষা
লজ্জাবতী ও বনচাঁড়ালের সংবেদনশীলতা প্রমাণ
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
51 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
42 টি1. সংবেদনশীলতা (Sensitivity) কাকে বলে?
2. উদ্দীপক (Stimuli) কী?
3. বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকের একটি করে উদাহরণ দাও।
4. চলন (Movement) কাকে বলে?
5. গমন (Locomotion) কাকে বলে?
6. চলন ও গমনের মূল পার্থক্য কী?
7. গমনে সক্ষম দুটি উদ্ভিদের নাম লেখো।
8. উদ্ভিদ কোশে স্বতঃস্ফূর্ত প্রোটোপ্লাজমীয় চলন বা রোটেশন কোথায় দেখা যায়?
9. সারকুলেশন বা আবর্তগতি কোন উদ্ভিদে দেখা যায়?
10. লজ্জাবতী পাতার চলন কী ধরনের চলন?
11. বনচাঁড়াল উদ্ভিদে কী ধরনের চলন দেখা যায়?
12. আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা প্রমাণের জন্য কোন কোন যন্ত্র আবিষ্কার বা ব্যবহার করেন?
13. পালভিনাস (Pulvinus) বা উপাধান কী?
14. উদ্ভিদের বক্র সঞ্চালন (Movement of curvature) বলতে কী বোঝো?
15. ট্যাকটিক চলন (Tactic movement) কাকে বলে?
16. ফোটোট্যাকটিক চলন কী? উদাহরণ দাও।
17. কেমোট্যাকটিক চলন কী?
18. ট্রপিক চলন বা দিগ্নির্ণীত চলন কাকে বলে?
19. ফোটোট্রপিক চলন কাকে বলে?
20. উদ্ভিদের কাণ্ড ও মূল আলোর সাপেক্ষে কীরূপ আচরণ করে?
21. হাইড্রোট্রপিক চলন বা জলবৃত্তি কাকে বলে?
22. হাইড্রোট্রপিক চলনে উদ্ভিদের মূল ও কাণ্ডের আচরণ কীরূপ?
23. জিওট্রপিক চলন বা অভিকর্ষবৃত্তি কাকে বলে?
24. উদ্ভিদের পার্শ্বীয় মূলকে তির্যক অভিকর্ষবর্তী বলা হয় কেন?
25. ন্যাস্টিক চলন বা ব্যাপ্তি চলন কাকে বলে?
26. ফোটোন্যাস্টিক চলন কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
27. থার্মোন্যাস্টিক বা তাপব্যাপ্তি চলন কী?
28. নিকটিন্যাস্টি (Nyctinasty) চলন কী?
29. সিসমোন্যাস্টিক বা স্পর্শব্যাপ্তি চলন কাকে বলে?
30. কেমোন্যাস্টিক বা রসায়ন ব্যাপ্তি চলন কী?
31. উদ্ভিদের কোন চলন হরমোন (অক্সিন) দ্বারা প্রভাবিত হয়?
32. কোন চলনে উদ্ভিদের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন ঘটে?
33. উদ্দীপকের গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত চলন কোনটি?
34. উদ্দীপকের তীব্রতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত চলন কোনটি?
35. সুন্দরী গাছের শ্বাসমূলে কোন প্রকার ট্রপিক চলন দেখা যায়?
36. মসের শুক্রাণু এবং ফার্নের শুক্রাণুর চলন কী প্রকারের?
37. প্রতীপ আলোকবর্তী চলন কী?
38. লজ্জাবতী গাছের পাতায় স্পর্শ করলে কী ঘটে?
39. উদ্ভিদ কোশের প্রোটোপ্লাজমে কয় ধরনের চলন দেখা যায়?
40. আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কীভাবে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদের সাড়াপ্রদান প্রাণীদের মতোই?
41. বনচাঁড়ালের বিজ্ঞানসম্মত নাম কী?
42. লজ্জাবতীর বিজ্ঞানসম্মত নাম কী?
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (৩ ও ৫ নম্বর)
10 টি1. উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা বলতে কী বোঝায়? আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর পরীক্ষাগুলির সাহায্যে উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
সংবেদনশীলতা:
পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন বা উদ্দীপকের (যেমন আলো, তাপ, স্পর্শ) প্রভাবে জীবদের সাড়া প্রদানের ক্ষমতাকে সংবেদনশীলতা বলে। উদ্ভিদ মাটি সংলগ্ন থাকলেও এরা উদ্দীপকের প্রভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চলন ঘটিয়ে সাড়া প্রদান করে।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর পরীক্ষা:
বিশিষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু Resonant Recorder, Electric Probe, এবং Crescograph নামক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রগুলির সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে এবং তারা প্রাণীদের মতোই উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। তিনি লজ্জাবতী (Mimosa pudica) এবং বনচাঁড়াল (Desmodium gyrans) উদ্ভিদে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা (electrical stimulation) প্রয়োগ করে দেখান যে উদ্দীপনা উদ্ভিদ কাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাতায় পৌঁছে পাতাকে নুইয়ে দিচ্ছে বা পাতার স্বতঃস্ফূর্ত চলন ঘটাচ্ছে। স্পন্দন মুক্ত অবস্থায় বনচাঁড়ালের পত্রবৃন্ত কেটে দিলে স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু উপাধানের (pulvinus) মাধ্যমে বিদ্যুৎ উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে আবার স্পন্দন ঘটে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া প্রাণীদের স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার মতোই কাজ করে।
2. ট্রপিক চলন বা দিগ্নির্ণীত চলন কাকে বলে? ফোটোট্রপিক চলন একটি পরীক্ষার সাহায্যে বুঝিয়ে দাও।
ট্রপিক চলন:
উদ্দীপকের উৎসের দিকে বা উদ্দীপকের গতিপথ অনুসারে উদ্ভিদ অঙ্গের যে বক্র চলন ঘটে, তাকে ট্রপিক চলন বা দিগ্নির্ণীত চলন বলে। যেমন আলোর দিকে কাণ্ডের বৃদ্ধি।
ফোটোট্রপিক চলনের পরীক্ষা:
উদ্দেশ্য: উদ্ভিদের বিটপ বা কাণ্ড যে আলোর উৎসের দিকে বৃদ্ধি পায় (অনুকূল আলোকবর্তী) তা প্রমাণ করা।
পদ্ধতি: টবসহ একটি সতেজ চারাগাছকে একটি অন্ধকার ঘরে জানলার সামনে রাখা হল। ঘরের অন্য সব জানলা-দরজা বন্ধ করে কেবল ওই জানলার একটি পাল্লা খুলে রাখা হল যাতে একদিক থেকেই আলো ঘরে প্রবেশ করতে পারে।
পর্যবেক্ষণ: কয়েকদিন পর লক্ষ করলে দেখা যাবে, গাছের কাণ্ড বা বিটপ অংশ সোজা বৃদ্ধি না পেয়ে যেদিক থেকে জানলার আলো আসছে সেদিকে বেঁকে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সিদ্ধান্ত: এই পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয় যে, উদ্ভিদের কাণ্ডের চলন অনুকূল আলোকবর্তী (Positively phototropic)।
3. হাইড্রোট্রপিক চলন বা জলবৃত্তি বলতে কী বোঝো? ভিজে কাঠের গুঁড়োর পরীক্ষার সাহায্যে এটি প্রমাণ করো।
হাইড্রোট্রপিক চলন:
উদ্ভিদ অঙ্গের চলন যখন জলের উৎসের গতিপথ অনুসারে হয়, তখন তাকে হাইড্রোট্রপিক চলন বা জলবৃত্তি বলে। মূল সাধারণত জলের উৎসের দিকে বাড়ে (অনুকূল জলবর্তী)।
পরীক্ষা:
উপকরণ: একটি তারের চালুনি, কিছু ভিজে কাঠের গুঁড়ো এবং কয়েকটি সদ্য অঙ্কুরিত ছোলা বা মটর বীজ।
পদ্ধতি: চালুনিটিতে ভিজে কাঠের গুঁড়ো রেখে তার মধ্যে বীজগুলি রেখে চালুনিটিকে শূন্যে ঝুলিয়ে দেওয়া হল।
পর্যবেক্ষণ: কয়েকদিন পর দেখা যাবে বীজগুলি অঙ্কুরিত হয়ে ভ্রূণমূলগুলি অভিকর্ষের টানে চালুনির ছিদ্র দিয়ে নীচের দিকে বেরিয়ে ঝুলে আছে। কিন্তু আরও কয়েকদিন পর দেখা যাবে, ভ্রূণমূলগুলি নীচের দিকে না বেড়ে ইউ-টার্ন নিয়ে পুনরায় বেঁকে চালুনির ছিদ্রে প্রবেশ করেছে।
সিদ্ধান্ত: প্রথমে অভিকর্ষের টানে মূল নীচে এলেও, পরে জলের খোঁজে (যেহেতু কাঠের গুঁড়ো ভিজে ছিল এবং বাতাস শুষ্ক ছিল) মূলগুলি জলের উৎসের দিকে বেঁকে যায়। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, মূলের চলন অনুকূল জলবর্তী (Positively hydrotropic)।
4. জিওট্রপিক চলন বা অভিকর্ষবৃত্তি কাকে বলে? একটি পরীক্ষার সাহায্যে উদ্ভিদের মূলের অনুকূল অভিকর্ষবর্তী চলন ব্যাখ্যা করো।
জিওট্রপিক চলন:
উদ্ভিদ অঙ্গের চলন যখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে অভিকর্ষের গতিপথ অনুসারে হয়, তখন তাকে জিওট্রপিক চলন বা অভিকর্ষবৃত্তি বলে। মূল পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের দিকে বাড়ে, তাই মূল অনুকূল অভিকর্ষবর্তী।
পরীক্ষা:
উপকরণ: একটি পেট্রিডিস, ভিজে তুলো, পিন এবং কয়েকটি সদ্য অঙ্কুরিত বীজ।
পদ্ধতি: একটি পেট্রিডিসে ভিজে তুলোর প্যাড রেখে তার ওপর কয়েকটি অঙ্কুরিত বীজ পিনের সাহায্যে বিভিন্ন দিকে (উপর, নীচ, পাশে) মুখ করে আটকে দেওয়া হল। এবার পেট্রিডিসটিকে একটি আংটার সাহায্যে টেবিলের ওপর খাড়াভাবে রেখে দেওয়া হল।
পর্যবেক্ষণ: কয়েকদিন পর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বীজের ভ্রূণমূলগুলির প্রাথমিক অবস্থান যেমনই হোক না কেন (অর্থাৎ মুখ যেদিকেই থাকুক), বৃদ্ধি পাওয়ার সময় প্রতিটি ভ্রূণমূল পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের দিকে বা নীচের দিকে বেঁকে অগ্রসর হয়েছে।
সিদ্ধান্ত: এই পরীক্ষা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, মূলের চলন সর্বদা অভিকর্ষের টানে নীচের দিকে ঘটে, অর্থাৎ মূল অনুকূল অভিকর্ষবর্তী (Positively geotropic)।
5. ন্যাস্টিক চলন বা ব্যাপ্তি চলন কাকে বলে? ফোটোন্যাস্টিক ও থার্মোন্যাস্টিক চলনের উদাহরণসহ সংজ্ঞা দাও।
ন্যাস্টিক চলন:
উদ্ভিদ অঙ্গের বক্র চলন যখন উদ্দীপকের গতিপথের উপর নির্ভর না করে উদ্দীপকের 'তীব্রতার' (Intensity) উপর নির্ভর করে নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সেই প্রকার চলনকে ন্যাস্টিক চলন বা ব্যাপ্তি চলন বলে। এটি হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয় না এবং এতে সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন ঘটে না।
ফোটোন্যাস্টিক চলন (Photonasty):
উদ্ভিদ অঙ্গের সঞ্চালন যখন আলোকের তীব্রতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তাকে ফোটোন্যাস্টিক বা আলোক ব্যাপ্তি চলন বলে।
উদাহরণ: পদ্ম, সূর্যমুখী ফুল দিনের বেলায় আলোর তীব্রতায় ফোটে আবার আলো কমে গেলে মুদে যায়। বিপরীতভাবে সন্ধ্যামালতি ও জুঁই ফুল কম আলোতে ফোটে।
থার্মোন্যাস্টিক চলন (Thermonasty):
উদ্ভিদ অঙ্গের সঞ্চালন যখন উষ্ণতার বা তাপের তীব্রতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তাকে থার্মোন্যাস্টিক বা তাপব্যাপ্তি চলন বলে।
উদাহরণ: টিউলিপ ফুলের পাপড়ি অধিক তাপে খোলে এবং কম তাপে মুদে যায়।
6. সিসমোন্যাস্টিক চলন ও কেমোন্যাস্টিক চলন বলতে কী বোঝো? উপযুক্ত উদাহরণ সহযোগে বুঝিয়ে দাও।
সিসমোন্যাস্টিক চলন (Seismonasty):
স্পর্শ, ঘর্ষণ, আঘাত, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি উদ্দীপকের তীব্রতার প্রভাবে উদ্ভিদ অঙ্গের যে ন্যাস্টিক চলন হয়, তাকে সিসমোন্যাস্টিক বা স্পর্শব্যাপ্তি চলন বলে।
উদাহরণ: লজ্জাবতী (Mimosa pudica) লতার পাতা স্পর্শ করা মাত্র পাতার পত্রকগুলি দ্রুত নুয়ে পড়ে। কারণ পাতা উদ্দীপিত হলে স্ফীত পত্রবৃন্ত বা পালভিনাস (pulvinus) থেকে জল দ্রুত পার্শ্ববর্তী কোশে চলে যায়। ফলে রসস্ফীতি চাপ (Turgor pressure) কমে গিয়ে পত্রকগুলি মুদে যায়।
কেমোন্যাস্টিক চলন (Chemonasty):
কোনো রাসায়নিক পদার্থের (যেমন প্রোটিন, ইথার, ক্লোরোফর্ম প্রভৃতি) সংস্পর্শে উদ্ভিদ অঙ্গের যে ন্যাস্টিক চলন ঘটে, তাকে কেমোন্যাস্টিক বা রসায়ন ব্যাপ্তি চলন বলে।
উদাহরণ: পতঙ্গভুক উদ্ভিদ যেমন সূর্যশিশির (Sundew), কলসপত্রী ইত্যাদির পাতার কর্ষিকাগুলি পতঙ্গের দেহের প্রোটিনের সংস্পর্শে আসামাত্র দ্রুত বেঁকে গিয়ে পতঙ্গকে আবদ্ধ করে ফেলে। এটি রাসায়নিক তীব্রতার কারণে ঘটে।
7. ট্যাকটিক, ট্রপিক এবং ন্যাস্টিক চলনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো বা পার্থক্য লেখো।
ট্যাকটিক, ট্রপিক ও ন্যাস্টিক চলনের পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | ট্যাকটিক চলন | ট্রপিক চলন | ন্যাস্টিক চলন |
|---|---|---|---|
| চলনের ধরন | এটি একপ্রকার সামগ্রিক চলন (Locomotion) যেখানে উদ্ভিদ বা অঙ্গের স্থান পরিবর্তন হয়। | এটি একপ্রকার বক্র চলন, এতে উদ্ভিদের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন হয় না। | এটিও একপ্রকার বক্র চলন, এতে সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন হয় না। |
| উদ্দীপকের প্রভাব | উদ্দীপকের তীব্রতা ও গতিপথ উভয়ের প্রভাবে ঘটে। | শুধুমাত্র উদ্দীপকের উৎসের গতিপথ অনুসারে নিয়ন্ত্রিত হয়। | শুধুমাত্র উদ্দীপকের তীব্রতার উপর নির্ভর করে, গতিপথের ওপর নয়। |
| হরমোনের ভূমিকা | অক্সিন হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয় না। | এই চলন প্রধানত অক্সিন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত হয়। | এটি হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, মূলত রসস্ফীতি চাপের পরিবর্তনে ঘটে। |
| উদাহরণ | শৈবালের (ক্ল্যামাইডোমোনাস) আলোকের দিকে গমন (ফোটোট্যাকটিক)। | উদ্ভিদের কাণ্ডের আলোর উৎসের দিকে চলন (ফোটোট্রপিক)। | স্পর্শ করলে লজ্জাবতীর পাতা মুদে যাওয়া (সিসমোন্যাস্টি)। |
8. উদ্ভিদের রসস্ফীতি চাপজনিত (Turgor movement) চলনগুলি কীভাবে ঘটে? লজ্জাবতী ও বনচাঁড়ালের উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।
রসস্ফীতি চাপজনিত চলন:
উদ্ভিদের কিছু চলন বৃদ্ধির কারণে না ঘটে, কোশের ভেতরের জলের পরিমাণের হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে ঘটে। কোশে জল প্রবেশ করলে কোশ স্ফীত হয় (রসস্ফীতি বা Turgor pressure বাড়ে), আবার জল বেরিয়ে গেলে কোশ শিথিল হয়ে পড়ে। এর ফলে উদ্ভিদ অঙ্গের সঞ্চালন ঘটে।
লজ্জাবতীর সিসমোন্যাস্টি:
লজ্জাবতী গাছের পাতার নীচে স্ফীত অংশ থাকে যাকে উপাধান বা পালভিনাস বলে। পাতা স্পর্শ করলে বা আঘাত পেলে উদ্দীপনা এই পালভিনাস কোশে পৌঁছায়। সঙ্গে সঙ্গে পালভিনাস কোশ থেকে জল পার্শ্ববর্তী কোশ বা আন্তঃকোশীয় স্থানে বেরিয়ে যায়। ফলে রসস্ফীতি চাপ কমে যায় এবং পাতাগুলি নুয়ে পড়ে। উদ্দীপক সরে গেলে পুনরায় জল প্রবেশ করে পাতা আগের অবস্থায় ফেরে।
বনচাঁড়ালের প্রকরণ চলন:
বনচাঁড়াল (Desmodium gyrans) উদ্ভিদের যৌগিক পাতার তিনটি ফলক থাকে। এর মধ্যে মাঝেরটি বড়ো এবং দুই পাশের দুটি ছোটো। পরিণত অবস্থায় দুই পাশের ছোটো ফলক দুটির মূল কোশগুলিতে পর্যায়ক্রমে রসস্ফীতি চাপের হ্রাস ও বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে ফলক দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠানামা করতে থাকে। একে প্রকরণ চলন (Movement of variation) বলে।
9. ট্যাকটিক চলন কাকে বলে? ফোটোট্যাকটিক এবং কেমোট্যাকটিক চলন সম্পর্কে যা জানো লেখো।
ট্যাকটিক চলন:
আলো, তাপমাত্রা, রাসায়নিক পদার্থ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি বহিস্থ উদ্দীপকের প্রভাবে উদ্ভিদ বা উদ্ভিদ অঙ্গের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তনকে ট্যাকটিক চলন বা আবিষ্ট চলন (Tactic movement) বলে। এতে উদ্ভিদ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করে।
ফোটোট্যাকটিক চলন:
সমগ্র উদ্ভিদদেহ যখন আলোক উদ্দীপকের প্রভাবে স্থান পরিবর্তন করে, তাকে ফোটোট্যাকটিক বা আলোক অভিমুখী চলন বলে।
উদাহরণ: ক্ল্যামাইডোমোনাস, ভলভক্স ইত্যাদি এককোশী বা কলোনি গঠনকারী শৈবাল আলোর উৎসের দিকে সাতার কেটে এগিয়ে যায়। তবে আলো অত্যন্ত তীব্র হলে এরা আলোর বিপরীত দিকে গমন করে, যাকে প্রতীপ আলোকবর্তী চলন বলে।
কেমোট্যাকটিক চলন:
রাসায়নিক পদার্থের আকর্ষণে উদ্ভিদ গ্যামেট বা চলরেণুর সামগ্রিক স্থান পরিবর্তনকে কেমোট্যাকটিক চলন বলে।
উদাহরণ: মসের শুক্রাণু সুক্রোজের আকর্ষণে এবং ফার্নের শুক্রাণু ম্যালিক অ্যাসিডের আকর্ষণে আর্কিগোনিয়াম বা ডিম্বাণুর দিকে অগ্রসর হয়।
10. চলন ও গমনের মধ্যে পার্থক্য কী? উদ্ভিদের ক্ষেত্রে চলন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আলোচনা করো।
চলন ও গমনের পার্থক্য:
- চলন (Movement): জীব নির্দিষ্ট স্থানে স্থির থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা উদ্দীপকের প্রভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করে। এতে জীবের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন হয় না। এটি উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
- গমন (Locomotion): জীব স্বেচ্ছায় বা উদ্দীপকের প্রভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের দ্বারা সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করে। এতে সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন হয়। এটি সাধারণত প্রাণীদের বৈশিষ্ট্য (কিছু নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদ ছাড়া)।
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে চলনের গুরুত্ব:
উদ্ভিদ মাটি সংলগ্ন থাকায় প্রাণীদের মতো স্থান পরিবর্তন করে খাদ্য সংগ্রহ বা আত্মরক্ষা করতে পারে পণ্ডিত না। তাই বেঁচে থাকার জন্য চলন এদের অপরিহার্য:
১) খাদ্য ও জল সংগ্রহ: মূল অভিকর্ষ ও জলের টানে (জিওট্রপিক ও হাইড্রোট্রপিক চলন) মাটির গভীরে প্রবেশ করে জল ও খনিজ লবণ শোষণ করে।
২) সালোকসংশ্লেষ: কাণ্ড ও পাতা আলোর দিকে (ফোটোট্রপিক চলন) বৃদ্ধি পেয়ে সালোকসংশ্লেষের জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোক গ্রহণ করে।
৩) আত্মরক্ষা ও প্রজনন: স্পর্শে লজ্জাবতীর পাতা মুদে গিয়ে তৃণভোজী প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা পায়। পরাগযোগের সুবিধার জন্য কিছু ফুল নির্দিষ্ট আলো বা তাপে ফোটে (ফোটোন্যাস্টি)।