ষষ্ঠ শ্রেণীর ইতিহাস বইয়ের প্রথম অধ্যায় "ইতিহাসের ধারণা"-এর সম্পূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর নিচে দেওয়া হলো। এখানে নদীমাতৃক সভ্যতা, আর্যাবর্ত, দাক্ষিণাত্য, ইতিহাস গণনার পদ্ধতি (খ্রিস্টাব্দ, খ্রিস্টপূর্বাব্দ), এবং ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)
-
পুরোনো দিনের কথা জানা যায় কোন বিষয় পড়লে?উত্তর: ইতিহাস
-
মানুষ সর্বপ্রথম কোন জিনিসের ব্যবহার শিখেছিল?উত্তর: পাথর
-
পাথরের ব্যবহারের পর মানুষ কিসের ব্যবহার শেখে?উত্তর: ধাতু
-
বিদ্যুতের ব্যবহার মানুষ কখন শেখে?উত্তর: অনেক পরে
-
ইতিহাসের গল্পের গোড়ার কথাগুলি কী কী?উত্তর: কবে, কেন, কীভাবে, কোথায়
-
পুরোনো দিনের অনেক সভ্যতা কীসের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল?উত্তর: নদী
-
'নদীমাতৃক' কথাটিতে 'মাতৃক' শব্দের অর্থ কী?উত্তর: মায়ের মতো
-
গল্পের বইতে লেখা পুরোনো দিনের সব কথাই কি ইতিহাস?উত্তর: না, সব কথা ইতিহাস নয়
-
ইতিহাসে মূলত কাদের কথা বলা থাকে?উত্তর: মানুষের কথা
-
মরুভূমির লোকেরা যাতায়াতের জন্য মূলত কোন প্রাণী ব্যবহার করেন?উত্তর: উট
-
নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের প্রধান যানবাহন কী?উত্তর: নৌকা
-
এক একটা জায়গায় ইতিহাসের রূপ এক এক রকম হওয়ার প্রধান কারণ কী?উত্তর: পরিবেশ ও ভূগোলের পার্থক্য
-
সমতল অঞ্চলে কোন শস্যের চাষ বেশি হয়?উত্তর: ধান
-
ভারতীয় উপমহাদেশ বলতে কী বোঝায়?উত্তর: একটি বিশাল অঞ্চল যা প্রায় মহাদেশের সমান
-
ভারতবর্ষের উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে কোন পর্বত ভাগ করেছে?উত্তর: বিন্ধ্য পর্বত
-
আর্যরা মূলত ভারতের কোন অংশে বসবাস করত?উত্তর: উত্তর অংশে (আর্যাবর্ত)
-
বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ দিকের অঞ্চলকে কী বলা হতো?উত্তর: দাক্ষিণাত্য
-
দাক্ষিণাত্যে মূলত কোন জাতির বসবাস ছিল?উত্তর: দ্রাবিড় জাতি
-
কাবেরী নদীর দক্ষিণ অংশকে কী দেশ বলা হতো?উত্তর: দ্রাবিড় দেশ
-
অনেক লম্বা একটা সময় বোঝাতে ইতিহাসে কোন শব্দ ব্যবহার করা হয়?উত্তর: যুগ
-
কুষাণ সম্রাটদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে ছিলেন?উত্তর: কনিষ্ক
-
কনিষ্কাব্দ বা শকাব্দ কবে গণনা শুরু হয়?উত্তর: ৭৮ খ্রিস্টাব্দে
-
গুপ্তাব্দ গণনা কে চালু করেন?উত্তর: প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩১৯-৩২০ খ্রিঃ)
-
হর্ষাব্দ কে চালু করেছিলেন?উত্তর: হর্ষবর্ধন (৬০৬ খ্রিঃ)
-
যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগের সময়কে কী বলা হয়?উত্তর: খ্রিস্টপূর্বাব্দ
-
হাজার বছরকে একসঙ্গে কী বলা হয়?উত্তর: সহস্রাব্দ
-
মাটির নীচের বা পুরোনো দিনের প্রত্নবস্তু যত্ন করে কোথায় রাখা হয়?উত্তর: জাদুঘরে (Museum)
-
এলাহাবাদ প্রশস্তি কোন গুপ্ত সম্রাটের সঙ্গে যুক্ত?উত্তর: সমুদ্রগুপ্ত
-
বাণভট্টের লেখা জীবনীমূলক গ্রন্থটির নাম কী?উত্তর: হর্ষচরিত
-
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার জন্য প্রধান ধর্মভিত্তিক সাহিত্য কোনটি?উত্তর: বৈদিক সাহিত্য
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (SAQ - 1 Mark)
-
ইতিহাসের প্রধান দুটি প্রশ্ন কী কী?উত্তর: কবে এবং কোথায়।
-
নদীমাতৃক সভ্যতা কাকে বলে?উত্তর: পুরোনো দিনের যেসব সভ্যতা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এবং যাদের জীবনে নদীর গুরুত্ব মায়ের মতো ছিল, তাদের নদীমাতৃক সভ্যতা বলে।
-
ভারতবর্ষ নামের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে বলে ধরা হয়?উত্তর: প্রাচীনকালে 'ভরত' নামক একটি জনগোষ্ঠীর নাম থেকে ভারতবর্ষ নামের উৎপত্তি। এর অপর অর্থ ভরতের বংশধর।
-
আর্যাবর্ত বলতে কোন অঞ্চলকে বোঝানো হতো?উত্তর: বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর অংশে যেখানে আর্যরা বাস করত, সেই অঞ্চলকে আর্যাবর্ত বলা হতো।
-
দাক্ষিণাত্য কী?উত্তর: বিন্ধ্য পর্বত থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভারতের দক্ষিণ অংশকে দাক্ষিণাত্য বলা হয়।
-
তুষার যুগ বলতে কী বোঝায়?উত্তর: হাজার হাজার বছর ধরে যখন পৃথিবীতে শুধু বরফ জমে ছিল, সেই দীর্ঘ সময়কালকে তুষার যুগ বলা হয়।
-
ইতিহাসে 'আনুমানিক' কথাটি কেন ব্যবহার করা হয়?উত্তর: পুরোনো দিনের অনেক ঘটনার সঠিক সাল-তারিখ জানা যায় না বলে অনুমান করে সময় নির্ধারণ করতে হয়, তাই 'আনুমানিক' শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
-
প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ কাকে বলে?উত্তর: যে সময়ে মানুষ লিখতে পারত না, এবং যে সময়ের ইতিহাস উপাদান ও অনুমানের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়, তাকে প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ বলে।
-
প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ কী?উত্তর: যে পুরোনো সময়ের লেখা পাওয়া যায় কিন্তু আজ পর্যন্ত তা পড়া সম্ভব হয়নি (যেমন- হরপ্পার লিপি), সেই সময়কে প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ বলে।
-
খ্রিস্টাব্দ কী?উত্তর: যিশু খ্রিস্টের জন্মের বছর থেকে যে সাল বা অব্দ গণনা শুরু হয়েছে, তাকে খ্রিস্টাব্দ বলে।
-
দশক এবং শতাব্দী বলতে কী বোঝায়?উত্তর: একসঙ্গে দশ বছর বোঝাতে 'দশক' এবং একসঙ্গে একশো বছর বোঝাতে 'শতাব্দী' বা 'শতক' বলা হয়।
-
আদিম মানুষ কীভাবে মনের ভাব প্রকাশ করত?উত্তর: কথা বলতে না পারায় আদিম মানুষ হাত-মাথা নেড়ে, অঙ্গভঙ্গি করে এবং গুহার গায়ে ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করত।
-
প্রত্নতাত্ত্বিক কাদের বলা হয়?উত্তর: যাঁরা মাটি খুঁড়ে পুরোনো দিনের হারিয়ে যাওয়া জিনিস বা উপাদান আবিষ্কার করেন এবং তা নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের প্রত্নতাত্ত্বিক বলা হয়।
-
প্রত্নবস্তু বা পুরাবস্তু কী?উত্তর: মাটি খুঁড়ে পাওয়া পুরোনো দিনের ঘরবাড়ি, বাসনপত্র, মুদ্রা, মূর্তি ইত্যাদি জিনিসগুলোকে প্রত্নবস্তু বা পুরাবস্তু বলে।
-
প্রত্নক্ষেত্র বলতে কী বোঝো?উত্তর: যে বড়ো অঞ্চল জুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটি খোঁড়ার কাজ চালান এবং পুরোনো উপাদান সংগ্রহ করেন, তাকে প্রত্নক্ষেত্র বলে।
-
লেখমালা বা শিলালেখ কী?উত্তর: প্রাচীনকালে পাথর বা ধাতুর পাতে খোদাই করে যে লিপি লেখা হতো, তাকে লেখমালা বা শিলালেখ বলে। যেমন- অশোকের লেখ।
-
প্রশস্তি কাকে বলে?উত্তর: প্রাচীনকালে কোনো রাজার গুণগান করে পাথর বা ধাতুর পাতে যা খোদাই করা হতো, তাকে প্রশস্তি বলে।
-
মুদ্রা থেকে ইতিহাসের কী জানা যায়?উত্তর: মুদ্রা থেকে রাজার নাম, মূর্তি, সাল-অব্দ এবং সেই সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা জানা যায়।
-
প্রাচীন ভারতের শিল্পবস্তুকে মূলত কয়টি ভাগে ভাগ করা যায়?উত্তর: তিনটি ভাগে- স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং চিত্রকলা।
-
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার জন্য তিনটি বিদেশি বিবরণের নাম লেখো।উত্তর: গ্রিক, রোমান ও চিনা পর্যটক বা দূতদের বিবরণ।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (Broad Questions - 3/5 Marks)
-
ইতিহাস বুঝতে হলে ভূগোল জানা প্রয়োজন কেন? উদাহরণ সহ বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: মানুষের কাজকর্ম এবং জীবনযাপন মূলত তার পরিবেশ ও ভূগোল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই মানুষের তৈরি ইতিহাস বুঝতে হলে ভূগোল জানা অত্যন্ত জরুরি।
উদাহরণ:
১) নদীর ধারের মানুষ: যাঁরা নদীর কাছাকাছি থাকেন, তাঁদের যাতায়াত ও জীবনযাত্রায় নৌকার ব্যবহার বেশি। যেমন পশ্চিমবঙ্গের যানবাহনের ইতিহাসে নৌকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
২) মরুভূমির মানুষ: যারা মরুভূমি অঞ্চলে থাকেন, তাঁদের কাছে নদীর গুরুত্ব কম এবং যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম উট। যেমন রাজস্থানের ইতিহাসে উটের কথা উল্লেখ থাকে।
৩) খাদ্যাভ্যাস: সমতল অঞ্চলে ধান বেশি উৎপন্ন হয় বলে সেখানকার মানুষ ভাত খায়, অন্যদিকে শুষ্ক অঞ্চলে গম বেশি উৎপন্ন হওয়ায় রুটির প্রচলন বেশি।
এইভাবেই ভূগোলের পার্থক্যের কারণে এক একটি অঞ্চলের ইতিহাস আলাদা হয়। -
খ্রিস্টাব্দ এবং খ্রিস্টপূর্বাব্দ গণনা কীভাবে করা হয়? উদাহরণ দাও।
উত্তর: যিশু খ্রিস্টের জন্মকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের সাল গণনা করা হয়।
খ্রিস্টাব্দ: যিশু খ্রিস্টের জন্মের বছর থেকে যে সময় গোনা শুরু হয়, তাকে খ্রিস্টাব্দ বলে। এটি ছোটো থেকে বড়োর দিকে গোনা হয়। যেমন, ১, ২, ৩, ৪ করে ২০১৪, ২০১৫ ইত্যাদি।
খ্রিস্টপূর্বাব্দ: যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগের সময়কে খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলা হয়। এটি বড়ো থেকে ছোটোর দিকে গোনা হয়। অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২০১৪-এর পরের বছর হবে খ্রিস্টপূর্ব ২০১৩।
শতকের হিসাব: যিশুর জন্মের প্রথম ১০০ বছর হলো প্রথম শতক। ১০১ থেকে ২০০ বছর হলো দ্বিতীয় শতক। সেই নিয়মে ১৯০১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়কাল হলো বিংশ (২০) শতক।
-
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সব জায়গায় গুছিয়ে লেখা অবস্থায় পাওয়া যায় না (যেমন হরপ্পা সভ্যতার লিপি আজও পড়া যায়নি)। তাই ইতিহাস রচনায় মাটি খুঁড়ে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম।
১) লেখমালা: পাথর বা ধাতুর গায়ে খোদাই করা লিপি (যেমন- অশোকের শিলালেখ, এলাহাবাদ প্রশস্তি) থেকে রাজাদের রাজত্বকাল ও শাসনব্যবস্থা জানা যায়।
২) মুদ্রা: মুদ্রা থেকে শাসকের নাম, সাল এবং অর্থনৈতিক অবস্থা জানা যায়। শক-কুষাণদের ইতিহাস মুদ্রা থেকেই বেশি জানা গেছে।
৩) শিল্পবস্তু (স্থাপত্য ও ভাস্কর্য): পুরোনো মন্দির, মূর্তি, বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ, গুহাচিত্র (যেমন- অজন্তা, ভীমবেটকা) থেকে সেকালের সমাজ ও সংস্কৃতির নিখুঁত পরিচয় মেলে। -
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে সাহিত্য উপাদানের ভূমিকা কী?
উত্তর: প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার অন্যতম প্রধান উৎস হলো সাহিত্য উপাদান। একে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: দেশীয় সাহিত্য এবং বিদেশি বিবরণ।
দেশীয় সাহিত্য: এর দুটি রূপ আছে- ধর্মভিত্তিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ।
- ধর্মভিত্তিক সাহিত্য: বৈদিক সাহিত্য, মহাকাব্য, পুরাণ, জৈন ও বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে প্রাচীন যুগের ধর্ম ও সমাজের কথা জানা যায়।
- ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য: ব্যাকরণ, চিকিৎসা, রাজনীতি বিজ্ঞান (যেমন- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র), এবং জীবনীমূলক গ্রন্থ (যেমন- বাণভট্টের হর্ষচরিত) থেকে সেকালের সমাজ ও রাজনীতির বাস্তব রূপ জানা যায়।বিদেশি বিবরণ: গ্রিক, রোমান এবং চিনা পর্যটকদের লেখা থেকেও প্রাচীন ভারতের চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। তবে অনেক সময় বিদেশিরা ভারতীয় সংস্কৃতি ঠিকমতো না বুঝেই বিবরণ লিখেছিলেন, তাই এগুলি যাচাই করে নিতে হয়।
-
প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ, প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ এবং ঐতিহাসিক যুগের মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: মানুষের লিপি বা লেখার ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করা যায়:
১) প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ: যে অতি প্রাচীন সময়ে মানুষ লিখতে ও পড়তে জানত না, সেই সময়কে প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ বলে। এই যুগের ইতিহাস কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের অনুমানের ওপর নির্ভর করে লেখা হয়।
২) প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ: একসময় মানুষ লিখতে শিখল এবং সেই সময়ের লিপি আমরা পেয়েছি, কিন্তু আজও সেই লিপি পড়া সম্ভব হয়নি। একে প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ বলে। যেমন- হরপ্পা সভ্যতা।
৩) ঐতিহাসিক যুগ: যে পুরোনো সময়ের লেখা বা লিপি পাওয়া যায় এবং ঐতিহাসিকরা তা পড়তে পেরেছেন, সেই সময়কালকে ঐতিহাসিক যুগ বলা হয়।