Chapter 1: পৃথিবীর অন্দরমহল (Interior of the Earth)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 25 MCQ | 18 SAQ | 7 Broad Questions
🌍
ভূত্বক (Crust)
বাইরের পাতলা স্তর | সিয়াল ও সিমা
🌋
গুরুমন্ডল (Mantle)
ম্যাগমার আধার | সবচেয়ে পুরু
🔥
কেন্দ্রমন্ডল (Core)
নিফে (NiFe) | তরল ও কঠিন
♨️
ভূতাপ শক্তি
পরিবেশবান্ধব শক্তি
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
25 টি
1. পৃথিবীর বাইরের সবচেয়ে পাতলা স্তরটির নাম কী?
ক) ক) কেন্দ্রমন্ডল
খ) খ) গুরুমন্ডল
গ) গ) ভূত্বক
ঘ) ঘ) সিমা
ব্যাখ্যা: ভূত্বক (Crust) হল পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের পাতলা স্তর। এটি পৃথিবীর আয়তনের মাত্র ১% এবং ভরের ০.৪%। মহাদেশের নীচে এর গভীরতা প্রায় ৬০ কিমি এবং মহাসাগরের নীচে প্রায় ৫ কিমি।
2. মহাদেশীয় ভূত্বকের উপরের স্তরটির নাম কী?
ক) ক) সিমা
খ) খ) সিয়াল
গ) গ) নিফে
ঘ) ঘ) গুরুমন্ডল
ব্যাখ্যা: সিয়াল (SIAL) হল মহাদেশীয় ভূত্বকের উপরের স্তর। এটি প্রধানত সিলিকন (Si) এবং অ্যালুমিনিয়াম (Al) দ্বারা গঠিত। এই স্তরটি সিমার চেয়ে হালকা এবং সমুদ্রের নীচে অনুপস্থিত।
3. মহাসাগরীয় ভূত্বক প্রধানত কী দিয়ে গঠিত?
ক) ক) সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়াম
খ) খ) লোহা ও নিকেল
গ) গ) সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম
ঘ) ঘ) ক্যালসিয়াম ও কার্বনেট
ব্যাখ্যা: মহাসাগরীয় ভূত্বক সিমা (SIMA) নামে পরিচিত, যা প্রধানত সিলিকন (Si) এবং ম্যাগনেসিয়াম (Mg) দ্বারা গঠিত। এটি সিয়ালের চেয়ে ভারী। এর গভীরতা প্রায় ৫ কিমি এবং ঘনত্ব ২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি।
4. ভূত্বকের নীচে অবস্থিত স্তরটির নাম কী?
ক) ক) ভূত্বক
খ) খ) গুরুমন্ডল
গ) গ) কেন্দ্রমন্ডল
ঘ) ঘ) অশ্মমন্ডল
ব্যাখ্যা: গুরুমন্ডল (Mantle) ভূত্বকের নীচে অবস্থিত। এটি প্রায় ২,৯০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে অত্যাধিক চাপ ও তাপের কারণে পদার্থগুলি অর্ধ-তরল অবস্থায় থাকে, যাকে ম্যাগমা বলা হয়। ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির উৎস এখানে।
5. পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত স্তরটি কী নামে পরিচিত?
ক) ক) গুরুমন্ডল
খ) খ) ভূত্বক
গ) গ) কেন্দ্রমন্ডল
ঘ) ঘ) সিমা
ব্যাখ্যা: কেন্দ্রমন্ডল (Core) পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। এটি প্রধানত নিকেল (Ni) এবং লোহা (Fe) দ্বারা গঠিত, তাই একে নিফে (NIFE) বলে। এটি বহিঃকেন্দ্র (তরল) ও অন্তঃকেন্দ্র (কঠিন) এই দুই ভাগে বিভক্ত।
6. পৃথিবীর ব্যাসার্ধ কত কিলোমিটার?
ক) ক) ১২,৭৪২ কিমি
খ) খ) ৬,৩৭০ কিমি
গ) গ) ৫,০০০ কিমি
ঘ) ঘ) ১০,০০০ কিমি
ব্যাখ্যা: পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব ৬,৩৭০ কিমি। অন্যদিকে, পৃথিবীর গভীরতম খনি (Mponeng) গভীরতা মাত্র ৩-৪ কিমি, যা ব্যাসার্ধের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
7. পৃথিবীর গভীরতম কৃত্রিম গর্ত (খনি)-র নাম কী?
ক) ক) কোলা সুপারডীপ বোরহোল
খ) খ) ম্পোনেং সোনার খনি
গ) গ) বিগ হোল
ঘ) ঘ) চিকেন ইটজা
ব্যাখ্যা: রাশিয়ার কোলা সুপারডীপ বোরহোল (Kola Superdeep Borehole) পৃথিবীর গভীরতম কৃত্রিম গর্ত, যা প্রায় ১২ কিমি গভীর। তবুও এটি পৃথিবীর ব্যাসার্ধের তুলনায় কিছুই নয়। সেখানে তাপমাত্রা এত বেশি (১৮০°C+) যে ড্রিল গলে যাচ্ছিল।
8. ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১৫°C হলে, প্রতি ৩৩ মিটার গভীরতায় তাপমাত্রা কত বাড়ে?
ক) ক) ১°C
খ) খ) ০.৫°C
গ) গ) ৩°C
ঘ) ঘ) ১০°C
ব্যাখ্যা: পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রতি ৩৩ মিটার গভীরতায় গড়ে প্রায় ১°C তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই হারে বাড়লে মাত্র ১২ কিমি গভীরে তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে কোন যন্ত্রই কাজ করতে পারে না।
9. আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে নির্গত গলিত অর্ধতরল উত্তপ্ত পদার্থকে কী বলে?
ক) ক) ম্যাগমা
খ) খ) লাভা
গ) গ) ভস্ম
ঘ) ঘ) বাষ্প
ব্যাখ্যা: আগ্নেয়গিরির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা গলিত অর্ধ-তরল উত্তপ্ত পদার্থকে লাভা (Lava) বলে। যখন এটি ভূগর্ভে থাকে, তখন ম্যাগমা (Magma) বলা হয়। লাভা ভূপৃষ্ঠে এসে ঠান্ডা হয়ে কঠিন আগ্নেয়শিলা তৈরি করে।
10. ভূগর্ভের তাপ শক্তিকে কী বলা হয়?
ক) ক) সৌর শক্তি
খ) খ) ভূতাপ শক্তি
গ) গ) জলবিদ্যুৎ
ঘ) ঘ) বায়ুশক্তি
ব্যাখ্যা: ভূগর্ভের তাপ থেকে প্রাপ্ত শক্তিকে ভূতাপ শক্তি (Geothermal Energy) বলে। পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপ ধীরে ধীরে বাইরের দিকে আসতে থাকে। আইসল্যান্ড তাদের বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৩০% এই ভূতাপ শক্তি থেকে পূরণ করে।
11. ভূতাপ শক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে এগিয়ে কোন দেশ?
ক) ক) আইসল্যান্ড
খ) খ) ভারত
গ) গ) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র
ঘ) ঘ) জাপান
ব্যাখ্যা: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র (USA) পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূতাপ শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অন্যদিকে আইসল্যান্ড তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অনুপাতে (প্রায় ৩০%) ভূতাপের ব্যবহারে এগিয়ে।
12. সিয়াল স্তরটি কোথায় অনুপস্থিত?
ক) ক) মহাদেশের নীচে
খ) খ) পর্বতের নীচে
গ) গ) মহাসাগরের নীচে
ঘ) ঘ) মালভূমির নীচে
ব্যাখ্যা: সিয়াল (SIAL) স্তরটি মহাদেশের নীচে থাকলেও, মহাসাগরের নীচে এটি অনুপস্থিত। মহাসাগরের তলায় সরাসরি সিমা (SIMA) স্তর অবস্থান করে, যার উপরে পাললিক শিলা ও জলরাশি থাকে।
13. কেন্দ্রমন্ডল প্রধানত কোন কোন ধাতু দিয়ে গঠিত?
ক) ক) সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়াম
খ) খ) সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম
গ) গ) লোহা ও নিকেল
ঘ) ঘ) তামা ও দস্তা
ব্যাখ্যা: পৃথিবীর কেন্দ্রমন্ডল (Core) প্রধানত লোহা (Iron - Fe) ও নিকেল (Nickel - Ni) দ্বারা গঠিত। এই কারণে একে 'নিফে' (NiFe) বলা হয়। বাইরের কেন্দ্র তরল অবস্থায় এবং ভেতরের কেন্দ্র প্রচণ্ড চাপে কঠিন অবস্থায় রয়েছে।
14. পৃথিবী সৃষ্টির সময় কেমন ছিল?
ক) ক) কঠিন পাথর
খ) খ) প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড
গ) গ) জলমগ্ন গ্রহ
ঘ) ঘ) বরফাবৃত গোলক
ব্যাখ্যা: আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টির সময় ছিল একটি প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড। সময়ের সাথে সাথে উপরিভাগ ঠান্ডা হয়ে কঠিন ভূত্বক তৈরি হয়েছে, কিন্তু অভ্যন্তর এখনও উত্তপ্ত ও আংশিক তরল অবস্থায় আছে।
15. উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot Spring) কী?
ক) ক) ঠান্ডা ঝরনা
খ) খ) ভূতাপে গরম হয়ে ফুটন্ত জল বেরোনোর প্রাকৃতিক উৎস
গ) গ) কৃত্রিম ফোয়ারা
ঘ) ঘ) সমুদ্রের ঢেউ
ব্যাখ্যা: উষ্ণ প্রস্রবণ হল ভূপৃষ্ঠের ফাটল দিয়ে ভূগর্ভের গরম জল বেরিয়ে আসার প্রাকৃতিক উৎস। ভূগর্ভের জল ভূতাপের সংস্পর্শে এসে গরম হয়ে ফুটতে শুরু করে এবং চাপে উপর দিকে বেরিয়ে আসে।
16. ভূত্বকের প্রায় কত শতাংশ অক্সিজেন দ্বারা গঠিত?
ক) ক) ২১%
খ) খ) ৭৮%
গ) গ) ৪৭%
ঘ) ঘ) ৬০%
ব্যাখ্যা: ভূত্বকের প্রায় ৪৭ শতাংশ অক্সিজেন (Oxygen) দ্বারা গঠিত। বায়ুমন্ডলের চেয়ে অনেক বেশি অক্সিজেন পৃথিবীর ভূত্বকে নানা রাসায়নিক অবস্থায় মজুত রয়েছে। দ্বিতীয় প্রধান উপাদান হল সিলিকন।
17. ভূত্বকের গড় গভীরতা কত কিলোমিটার?
ক) ক) ৫ কিমি
খ) খ) ১৫ কিমি
গ) গ) ৩০ কিমি
ঘ) ঘ) ৬০ কিমি
ব্যাখ্যা: ভূত্বকের গড় গভীরতা প্রায় ৩০ কিমি। মহাদেশের নীচে এটি ৬০ কিমি পর্যন্ত গভীর হতে পারে, আর মহাসাগরের নীচে এটি মাত্র ৫ কিমি। ভূত্বক পৃথিবীর আয়তনের মাত্র ১%।
18. মহাদেশীয় ভূত্বকের গড় ঘনত্ব কত গ্রাম/ঘনসেমি?
ক) ক) ২.৭
খ) খ) ২.৯
গ) গ) ৩.০
ঘ) ঘ) ৫.৫
ব্যাখ্যা: মহাদেশীয় ভূত্বক (সিয়াল) সিমার চেয়ে হালকা এবং এর গড় ঘনত্ব ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি। সিমার ঘনত্ব ২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি, যা তুলনায় ভারী। কেন্দ্রমন্ডলের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।
19. কেন্দ্রমন্ডলের বাইরের অংশটি কী অবস্থায় রয়েছে?
ক) ক) কঠিন
খ) খ) তরল
গ) গ) গ্যাসীয়
ঘ) ঘ) প্লাজমা
ব্যাখ্যা: কেন্দ্রমন্ডলের বাইরের অংশ (Outer Core) তরল অবস্থায় রয়েছে। অতি উচ্চ তাপমাত্রায় লোহা-নিকেল গলে যায়, কিন্তু ভেতরের কেন্দ্র (Inner Core) প্রচণ্ড চাপের কারণে কঠিন অবস্থায় থাকে। এই তরল কেন্দ্রের সঞ্চালন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে।
20. কীসের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন সম্বন্ধে জানতে পেরেছেন?
ক) ক) কৃত্রিম উপগ্রহ
খ) খ) ভূমিকম্প তরঙ্গ ও আগ্নেয়গিরির লাভা
গ) গ) দুরবিন
ঘ) ঘ) খনন যন্ত্র
ব্যাখ্যা: সরাসরি পৃথিবীর অভ্যন্তরে যাওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্প তরঙ্গের (Seismic Waves) গতিবিধি এবং আগ্নেয়গিরির লাভা পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর অভ্যন্তরে তিনটি প্রধান স্তরের সন্ধান পেয়েছেন।
21. ভূতাপ শক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
ক) ক) জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে
খ) খ) জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়
গ) গ) বায়ু দূষণ বাড়ে
ঘ) ঘ) কোন লাভ নেই
ব্যাখ্যা: ভূতাপ শক্তি ব্যবহার করলে কয়লা, খনিজ তেল ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়। এটি একটি পরিবেশবান্ধব, পুনর্নবীকরণযোগ্য এবং সাশ্রয়ী শক্তির উৎস।
22. সিমা স্তরের ঘনত্ব কত গ্রাম/ঘনসেমি?
ক) ক) ১.৫
খ) খ) ২.২
গ) গ) ২.৯
ঘ) ঘ) ৩.৫
ব্যাখ্যা: মহাসাগরীয় ভূত্বক (সিমা) প্রধানত সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম দিয়ে গঠিত এবং এর ঘনত্ব ২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি। এটি সিয়ালের (২.৭) চেয়ে বেশি এবং বেসল্ট জাতীয় আগ্নেয়শিলা দিয়ে গঠিত।
23. গুরুমন্ডলের অর্ধতরল অবস্থাকে কী বলে?
ক) ক) লাভা
খ) খ) ম্যাগমা
গ) গ) সিমা
ঘ) ঘ) কোর
ব্যাখ্যা: গুরুমন্ডলের অর্ধতরল, গলিত অবস্থাকে ম্যাগমা (Magma) বলে। যখন কোনো আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে এই ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসে তখন তাকে লাভা (Lava) বলা হয়। লাভা ঠান্ডা হয়ে আগ্নেয়শিলা গঠন করে।
24. 'জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ' লেখাটি কার লেখা?
ক) ক) চার্লস ডারউইন
খ) খ) আলফ্রেড ওয়েগনার
গ) গ) জুল ভার্ন
ঘ) ঘ) আইজ্যাক আসিমভ
ব্যাখ্যা: 'জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ' একটি বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, যার রচয়িতা হলেন জুল ভার্ন (Jules Verne)। এই গল্পে এক তরুণ তার অধ্যাপক কাকার সাথে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্র অভিযান করে।
25. কোন স্তরটির নাম 'নিফে' (NiFe)?
ক) ক) ভূত্বক
খ) খ) গুরুমন্ডল
গ) গ) কেন্দ্রমন্ডল
ঘ) ঘ) সিয়াল
ব্যাখ্যা: কেন্দ্রমন্ডলকে 'নিফে' (NiFe) বলা হয় কারণ এটি প্রধানত নিকেল (Ni) ও লোহা (Fe) দিয়ে গঠিত। এই স্তর পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং এর ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি (প্রায় ১০-১২ গ্রাম/ঘনসেমি)।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
18 টি
1. পৃথিবীর অভ্যন্তরের প্রধান তিনটি স্তরের নাম কী কী?
পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রধানত তিনটি স্তর দেখা যায়। এগুলো হল: (১) ভূত্বক (Crust) - একেবারে বাইরের অত্যন্ত পাতলা স্তর, (২) গুরুমন্ডল (Mantle) - ভূত্বকের নীচের স্তর, যা প্রায় ২,৯০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত এবং আংশিক গলিত অবস্থায় আছে, (৩) কেন্দ্রমন্ডল (Core) - পৃথিবীর কেন্দ্রের স্তর, যা প্রধানত লোহা ও নিকেল দ্বারা গঠিত এবং বহিঃকেন্দ্র তরল ও অন্তঃকেন্দ্র কঠিন অবস্থায় রয়েছে।
2. সিয়াল ও সিমার মধ্যে পার্থক্য কী?
সিয়াল (SIAL): এটি মহাদেশীয় ভূত্বকের উপরের স্তর। প্রধান উপাদান: সিলিকন (Si) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al)। হালকা (ঘনত্ব ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি)। মহাসাগরের তলায় অনুপস্থিত। সিমা (SIMA): এটি মহাসাগরীয় ভূত্বকের স্তর। প্রধান উপাদান: সিলিকন (Si) ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg)। ভারী (ঘনত্ব ২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি)। মহাসাগরের তলায় সরাসরি অবস্থান করে।
3. ভূত্বক কাকে বলে? এর গভীরতা কত?
ভূত্বক (Crust) হল পৃথিবীর সর্ববহিঃস্থ কঠিন আবরণ। এটি পৃথিবীর আয়তনের মাত্র ১% এবং ভরের ০.৪%। এর গড় গভীরতা প্রায় ৩০ কিমি। মহাদেশের নীচে এটি ৬০ কিমি পর্যন্ত গভীর হতে পারে এবং মহাসাগরের নীচে গড় গভীরতা মাত্র ৫ কিমি। ভূত্বক মূলত অক্সিজেন ও সিলিকন সমৃদ্ধ শিলা দ্বারা গঠিত।
4. গুরুমন্ডল কী?
গুরুমন্ডল (Mantle) ভূত্বকের নীচে অবস্থিত এবং প্রায় ২,৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি পুরু, ভারী ও গাঢ় রঙের শিলায় গঠিত। প্রচণ্ড তাপ ও চাপের জন্য গুরুমন্ডলের শিলাগুলি আংশিক গলিত বা অর্ধ-তরল অবস্থায় থাকে, যাকে ম্যাগমা বলে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিকম্পের উৎসস্থল এখানে অবস্থিত।
5. কেন্দ্রমন্ডল কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী?
কেন্দ্রমন্ডল (Core) পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রস্থল, ভূপৃষ্ঠ থেকে ২,৯০০ কিমি নীচে শুরু হয়ে পৃথিবীর কেন্দ্র (৬,৩৭০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি প্রধানত লোহা (Fe) ও নিকেল (Ni) দিয়ে গঠিত, তাই একে নিফে (NiFe) বলে। এটি দুই প্রকার: (১) বহিঃকেন্দ্রমন্ডল - তরল অবস্থায় থাকে, (২) অন্তঃকেন্দ্রমন্ডল - প্রচণ্ড চাপে কঠিন অবস্থায় থাকে।
6. পৃথিবীর ব্যাসার্ধ কত? মানুষের খনন কাজের তুলনায় এটি কেমন?
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দূরত্ব ৬,৩৭০ কিমি। পৃথিবীর গভীরতম প্রাকৃতিক গঠন (খনি) মাত্র ৩-৪ কিমি গভীর এবং গভীরতম কৃত্রিম গর্ত (কোলা সুপারডীপ বোরহোল) প্রায় ১২ কিমি গভীর। এই ১২ কিমি পৃথিবীর ব্যাসার্ধের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তাই সরাসরি খনন করে অভ্যন্তরীণ তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
7. পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপমাত্রা কীভাবে পরিবর্তিত হয়?
ভূপৃষ্ঠের নীচে গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। গড়ে প্রতি ৩৩ মিটার গভীরতায় ১°C হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১৫°C হলে, ৩-৪ কিমি গভীর খনির নীচে তাপমাত্রা ১০০°C-এর বেশি। কোলা সুপারডীপ বোরহোলে (১২ কিমি) তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৮০°C। কেন্দ্রমন্ডলে তাপমাত্রা প্রায় ৫,০০০°C-৬,০০০°C।
8. ভূতাপ শক্তি কাকে বলে?
ভূতাপ শক্তি (Geothermal Energy): পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপ ধীরে ধীরে বাইরের দিকে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের দিকে আসতে থাকে। এই তাপশক্তিকে ভূতাপ শক্তি বলে। এটি একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস। উষ্ণ প্রস্রবণ ও ভূ-গর্ভস্থ গরম জল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আইসল্যান্ড ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে এই শক্তির ব্যাপক ব্যবহার হয়।
9. ম্যাগমা ও লাভার মধ্যে পার্থক্য কী?
ম্যাগমা (Magma): ভূগর্ভে গুরুমন্ডলে অবস্থিত অর্ধ-তরল গলিত উত্তপ্ত শিলাকে ম্যাগমা বলা হয়। এটি পুরোপুরি ভূ-অভ্যন্তরে অবস্থান করে। লাভা (Lava): আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে যখন গলিত ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে লাভা বলে। লাভা বাইরে বেরিয়ে ঠান্ডা হয়ে কঠিন আগ্নেয়শিলা তৈরি করে।
10. আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প কীভাবে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তথ্য দেয়?
পৃথিবীর অভ্যন্তরে সরাসরি যাওয়া সম্ভব নয়। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে নির্গত লাভা বিজ্ঞানীদের ভূগর্ভের উপাদান ও তাপমাত্রা সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট তরঙ্গ (Seismic Waves) বিভিন্ন স্তরের ভেতর দিয়ে ভিন্ন গতিতে ও প্রতিসরিত হয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা এই তরঙ্গ পর্যালোচনা করে ভূত্বক, গুরুমন্ডল ও কেন্দ্রমন্ডলের গঠন ও চরিত্র নির্ণয় করেছেন।
11. উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot Spring) কী ও কীভাবে সৃষ্টি হয়?
উষ্ণ প্রস্রবণ হল ভূপৃষ্ঠের একটি প্রাকৃতিক ফাটল বা ছিদ্রপথ, যেখান দিয়ে ভূগর্ভের গরম জল ফুটন্ত অবস্থায় বা উষ্ণ অবস্থায় বেরিয়ে আসে। সৃষ্টির কারণ: ভূগর্ভের জল (ভৌমজল) পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপের (ভূতাপ) সংস্পর্শে এসে অত্যন্ত উত্তপ্ত হয় ও ফুটতে শুরু করে। ভূ-পৃষ্ঠতলের ফাটলের মধ্য দিয়ে সেই গরম জল বাষ্পসহ শব্দ করে বাইরে বেরিয়ে আসে।
12. পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস সংক্ষেপে কী?
আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল। তখন এটি ছিল একটি প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড। মহাকাশে তাপ বিকিরণ করে সময়ের সাথে সাথে এর উপরিভাগ আগে ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে যায় এবং কঠিন ভূত্বক (Crust) তৈরি হয়। কিন্তু পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ এখনও পুরোপুরি ঠান্ডা হয়নি এবং আংশিক তরল ও উত্তপ্ত অবস্থায় আছে। ঠিক যেমন গরম দুধের বাটিতে উপরটা ঠান্ডা হয়ে সর পড়ে কিন্তু নীচটা অনেকক্ষণ গরম থাকে।
13. মহাদেশীয় ভূত্বক ও মহাসাগরীয় ভূত্বকের পার্থক্য কী?
মহাদেশীয় ভূত্বক: পুরুত্ব বেশি (গড়ে ৩০-৬০ কিমি), প্রধানত গ্রানাইট জাতীয় শিলা। উপরের স্তর 'সিয়াল' (Si + Al), নীচের স্তর 'সিমা' (Si + Mg)। ঘনত্ব কম (২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি)। হালকা ও ভাসমান। মহাসাগরীয় ভূত্বক: পুরুত্ব কম (গড়ে ৫ কিমি), প্রধানত বেসল্ট শিলা। শুধুমাত্র 'সিমা' স্তর দিয়ে গঠিত, সিয়াল অনুপস্থিত। ঘনত্ব বেশি (২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি)। অপেক্ষাকৃত ভারী।
14. কেন্দ্রমন্ডলের বাইরের ও ভেতরের অংশের অবস্থা কী রকম?
কেন্দ্রমন্ডল (Core) দুটি অংশে বিভক্ত। (১) বহিঃকেন্দ্রমন্ডল (Outer Core): এটি তরল অবস্থায় আছে। কারণ সেখানে তাপমাত্রা এত বেশি যে লোহা-নিকেল গলিত অবস্থায় থাকে। এই তরল ধাতব সঞ্চালন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। (২) অন্তঃকেন্দ্রমন্ডল (Inner Core): এটি কঠিন অবস্থায় আছে। কারণ সেখানে চাপ এত প্রবল (৩০ লক্ষ বায়ুমন্ডলীয় চাপের বেশি) যে প্রচণ্ড তাপেও লোহা-নিকেল কঠিন হয়ে যায়।
15. ভূত্বকের রাসায়নিক গঠন কেমন?
ভূত্বক (Crust) নানা রাসায়নিক উপাদান দ্বারা গঠিত। এর মধ্যে অক্সিজেন হল প্রধান উপাদান, যা ভূত্বকের প্রায় ৪৭% গঠন করে। দ্বিতীয় প্রধান উপাদান হল সিলিকন। এছাড়াও অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম প্রভৃতি আছে। বায়ুমন্ডলের চেয়ে অনেক বেশি অক্সিজেন বিভিন্ন অক্সাইড হিসেবে ভূত্বকে আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
16. মানুষ কি কখনো সরাসরি পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেতে পেরেছে?
না, মানুষ কখনো পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেতে পারেনি এবং যাওয়া সম্ভবও নয়। কারণ: (১) তাপমাত্রা প্রতি ৩৩ মিটারে ১°C বাড়তে বাড়তে কেন্দ্রে ৫,০০০-৬,০০০°C হয়, (২) প্রচণ্ড চাপে সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, (৩) পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬,৩৭০ কিমি, অথচ খনন ক্ষমতা মাত্র ১২ কিমি। আগ্নেয়গিরির লাভা ও ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা অভ্যন্তরের চিত্র তৈরি করেছেন।
17. আইসল্যান্ডে ভূতাপ শক্তির ব্যবহার কীভাবে হয়?
আইসল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয় অঞ্চল, এখানে ভূতাপ সহজলভ্য। তারা ভূগর্ভস্থ গরম জল ও বাষ্প ব্যবহার করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালায়। বর্তমানে আইসল্যান্ড তাদের দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩০% ভূতাপ শক্তি থেকে পূরণ করে। এছাড়া ঘর গরম করা (হিটিং), গ্রিনহাউস চাষ এবং মাছ চাষের জন্যও এই তাপ ব্যবহৃত হয়।
18. সমগ্র পৃথিবীর নিরিখে ভূত্বককে কিসের সাথে তুলনা করা হয়?
সমগ্র পৃথিবীর তুলনায় ভূত্বক অত্যন্ত পাতলা। একে একটি কাটা আপেলের খোসার সাথে তুলনা করা যায়। আপেলের খোসা যেমন সম্পূর্ণ আপেলের তুলনায় খুবই পাতলা, তেমনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধের তুলনায় ভূত্বকের গড় ৩০ কিমি গভীরতাও নগণ্য। একটি বড় আপেলের খোসার পুরুত্বই ভূত্বকের পুরুত্ব বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
7 টি
1. পৃথিবীর অভ্যন্তরের স্তরবিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো। ভূত্বক, গুরুমন্ডল ও কেন্দ্রমন্ডলের বৈশিষ্ট্যগুলি টেবিলের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন
ভূমিকম্প তরঙ্গ ও আগ্নেয়গিরির লাভা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরে তিনটি প্রধান স্তরের সন্ধান পেয়েছেন। উপর থেকে নীচে এগুলো হল - ভূত্বক, গুরুমন্ডল ও কেন্দ্রমন্ডল।
| বৈশিষ্ট্য | ভূত্বক (Crust) | গুরুমন্ডল (Mantle) | কেন্দ্রমন্ডল (Core) |
| অবস্থান | সর্ববহিঃস্থ স্তর | ভূত্বকের নীচে | ২,৯০০ কিমি থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত |
| বিস্তার | ৫-৬০ কিমি (গড় ৩০ কিমি) | প্রায় ২,৯০০ কিমি | প্রায় ৩,৪৭০ কিমি |
| প্রধান উপাদান | সিয়াল (Si+Al) ও সিমা (Si+Mg) | সিলিকেট খনিজ | লোহা (Fe) ও নিকেল (Ni) — নিফে |
| গড় ঘনত্ব | ২.৭-২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি | ৩.৩-৫.৫ গ্রাম/ঘনসেমি | ১০-১২ গ্রাম/ঘনসেমি |
| অবস্থা | কঠিন | আংশিক গলিত/অর্ধতরল (ম্যাগমা) | বহিঃকেন্দ্র তরল, অন্তঃকেন্দ্র কঠিন |
| তাপমাত্রা | ১৫°C - ৪০০°C | ৪০০°C - ৩,০০০°C | ৩,০০০°C - ৬,০০০°C |
| আয়তনের ভাগ | প্রায় ১% | প্রায় ৮৪% | প্রায় ১৫% |
| অন্য নাম/বৈশিষ্ট্য | শিলামন্ডল | মেসোস্ফিয়ার, অ্যাথেনোস্ফিয়ার | নিফে, ব্যারিস্ফিয়ার |
প্রধান বৈশিষ্ট্যসূহ:
- ভূত্বক: অত্যন্ত পাতলা, সিয়াল (হালকা, মহাদেশীয়) এবং সিমা (ভারী, মহাসাগরীয়) অংশে বিভক্ত। সমুদ্রতলে সিয়াল অনুপস্থিত।
- গুরুমন্ডল: পৃথিবীর সর্বাধিক আয়তন (৮৪%) এই স্তরে। প্রচণ্ড তাপে পাথর ম্যাগমায় পরিণত — যা লাভা হিসাবে নির্গত হয়।
- কেন্দ্রমন্ডল: বাইরের তরল অংশের সঞ্চালনে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি। প্রচণ্ড চাপে অভ্যন্তর কঠিন।
2. সিয়াল ও সিমা স্তরের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যগুলি কী কী? চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো। ভূত্বকে এদের বিন্যাস কেমন?
সিয়াল (SIAL) ও সিমা (SIMA)
ভূত্বক প্রধানত দুটি ভিন্ন রাসায়নিক ও ভৌত সংস্তর দ্বারা গঠিত — উপরের পাতলা সিয়াল এবং নীচের ভারী সিমা।
| তুলনার বিষয় | সিয়াল (SIAL) | সিমা (SIMA) |
| নামের উৎপত্তি | Si (সিলিকন) + Al (অ্যালুমিনিয়াম) | Si (সিলিকন) + Mg (ম্যাগনেসিয়াম) |
| প্রধান খনিজ | গ্রানাইট, রায়োলাইট | বেসল্ট, গ্যাব্রো |
| ঘনত্ব | ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি (হালকা) | ২.৯ গ্রাম/ঘনসেমি (ভারী) |
| অবস্থান | মহাদেশের নীচে উপরের দিকে | সিয়ালের নীচে এবং মহাসাগরের তলায় |
| পুরুত্ব | ২০-৩০ কিমি | ৫-১০ কিমি (মহাসাগরতলে বেশি) |
| মহাসাগরে উপস্থিতি | অনুপস্থিত | উপস্থিত (মহাসাগরের তলায় সরাসরি) |
| ভাসমান বৈশিষ্ট্য | সিমার উপর ভাসমান অবস্থায় আছে | গুরুমন্ডলের উপর অবস্থিত |
| রঙ | হালকা রঙের | গাঢ় রঙের |
বিন্যাস:
মহাদেশগুলির ক্ষেত্রে উপরিভাগে হালকা সিয়াল থাকলেও, গভীর মহাসমুদ্রের তলায় সিয়াল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেখানে সরাসরি সিমা স্তরের উপর জলরাশি রয়েছে। অর্থাৎ, মহাদেশীয় অঞ্চলে 'সিয়াল সিমার উপর ভাসমান', আর মহাসাগরীয় অঞ্চলে 'জল সিমার উপর ভাসমান'। এটি 'আইসোস্ট্যাসি' তত্ত্বের মূল ভিত্তি।
3. পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে মানুষ কীভাবে জানতে পারে? আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প ও ভূতাপ শক্তির ভূমিকা আলোচনা করো।
কীভাবে জানা যায়?
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬,৩৭০ কিমি, অথচ গভীরতম খনন মাত্র ১২ কিমি (কোলা সুপারডীপ বোরহোল)। তাই সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব। বিজ্ঞানীরা পরোক্ষ পদ্ধতি অবলম্বন করেন:
১. ভূমিকম্প তরঙ্গ (Seismic Waves):
ভূমিকম্পের সময় দুই ধরনের তরঙ্গ 'P' ও 'S' সৃষ্টি হয় যা পুরো পৃথিবী অতিক্রম করে। এদের গতি বিভিন্ন পদার্থে (কঠিন, তরল) বিভিন্ন রকম। 'S' তরঙ্গ তরলের মধ্যে দিয়ে যেতে পারে না। বিজ্ঞানীরা সিসমোগ্রাফে এই গতিপথের বেঁকে যাওয়া ও প্রতিসরণ নিরীক্ষণ করে দেখেছেন যে বাইরের কেন্দ্রমন্ডল তরল (S যায় না) এবং ভেতরের কেন্দ্রমন্ডল কঠিন। এই ভাবেই পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরগুলির সীমানা ও চরিত্র নির্ধারিত হয়েছে।
২. আগ্নেয়গিরি ও লাভা:
আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে নিঃসৃত লাভা ও ছাই বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা গুরুমন্ডলের উপাদান (ম্যাগমা) জানতে পারেন। বেসল্ট জাতীয় শিলা প্রমাণ করে যে সিমা (মহাসাগরীয় তল) বেসল্টেই গঠিত।
৩. ভূতাপ শক্তি ও উষ্ণ প্রস্রবণ:
উষ্ণ প্রস্রবণ ও ভূতাপীয় অঞ্চলের বাষ্প ইঙ্গিত দেয় পৃথিবীর অভ্যন্তর ক্রমশ উত্তপ্ত। বিভিন্ন খনিতে খননকালে তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়, যা থেকে জানা গেছে প্রতি ৩৩ মিটার গভীরতায় ১°C তাপ বাড়ছে।
এছাড়া গ্রহাণুপুঞ্জের গাঠনিক উপাদান নিরীক্ষণ ও পৃথিবীর মোট ঘনত্ব গণনা করেও অভ্যন্তরীণ গঠনের মডেল বানানো হয়েছে।
4. ভূতাপ শক্তি কী? এটি কিভাবে উৎপাদিত হয়? এর ব্যবহার, সুবিধা ও ভারতের প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।
ভূতাপ শক্তি (Geothermal Energy)
পৃথিবীর কেন্দ্রের অতি উচ্চ তাপ (প্রায় ৬,০০০°C) তেজস্ক্রিয় পদার্থ (ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম) ক্ষয়ের মাধ্যমে ক্রমাগত উৎপন্ন হচ্ছে। এই তাপ ধীরে ধীরে পৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ জলকে গরম করে তোলে। এই তাপশক্তিকেই ভূতাপ শক্তি বলে।
উৎপাদন পদ্ধতি:
যেসব অঞ্চলে উষ্ণ প্রস্রবণ বা গিজার আছে বা ভূত্বকের ফাটল দিয়ে গরম বাষ্প বেরোয়, সেখানে গভীর কূপ খনন করে উষ্ণ বাষ্পকে সরাসরি টারবাইন ঘোরাতে ব্যবহার করা হয়। টারবাইন জেনারেটর ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ব্যবহার ও সুবিধা:
- এটি সম্পূর্ণ পুনর্নবীকরণযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব।
- জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল) পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় দূষণ প্রায় শূন্য।
- আইসল্যান্ড তাদের বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৩০% এবং ঘর গরম করার প্রায় ৮৭% চাহিদা ভূতাপ থেকে পূরণ করে।
- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মোট উৎপাদনের নিরিখে বিশ্বের বৃহত্তম ভূতাপ বিদ্যুৎ উৎপাদক।
ভারতে ভূতাপ শক্তি:
ভারতে হিমালয় অঞ্চল (জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল), সোহানা (হরিয়ানা), ক্যাম্বে (গুজরাট), তাতাপানি (ছত্তিশগড়), এবং পুগা উপত্যকা (লাদাখ)-এ ভূতাপের সম্ভাবনা দেখা গেছে। ভারত সরকার ভূতাপ শক্তি উন্নয়নের জন্য প্রকল্প চালাচ্ছে, যদিও এখনও তা প্রাথমিক স্তরে রয়েছে।
5. কেন্দ্রমন্ডলের বৈশিষ্ট্য কেন অন্যান্য স্তরের থেকে আলাদা? পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে কেন্দ্রমন্ডলের সম্পর্ক কী?
কেন্দ্রমন্ডলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
কেন্দ্রমন্ডল (Core) ভৌগলিক ও রাসায়নিকভাবে ভূত্বক ও গুরুমন্ডল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা:
- উপাদান: ভূত্বকে সিলিকন-অ্যালুমিনিয়াম-অক্সিজেন এবং গুরুমন্ডলে সিলিকেট খনিজ থাকলেও, কেন্দ্রমন্ডলে প্রধানত ভারী ধাতু লোহা (Fe ≈ ৮০%) ও নিকেল (Ni) রয়েছে।
- ঘনত্ব: কেন্দ্রমন্ডলের গড় ঘনত্ব ১০-১২ গ্রাম/ঘনসেমি। ভূত্বক ও গুরুমন্ডলের ঘনত্ব অনেক কম। ভূ-কেন্দ্রে চাপ এত বেশি যে একটি বস্তু ভূপৃষ্ঠের চেয়ে প্রায় ৩০ লক্ষ গুণ বেশি চাপের সম্মুখীন হয়।
- দুই স্তর: বহিঃকেন্দ্র তরল ও অন্তঃকেন্দ্র কঠিন। প্রচণ্ড তাপে লোহা গলে যায়, কিন্তু কেন্দ্রের একেবারে গভীরে অসহনীয় চাপে তা আবার জমে কঠিন হয়ে যায়।
চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে সম্পর্ক:
পৃথিবীর তরল বহিঃকেন্দ্রে (তরল লোহা) ক্রমাগত সঞ্চালন বা পরিচলন স্রোত চলে। পৃথিবীর নিজের আবর্তনের সাথে এই তরল লোহার গতিশীল প্রবাহ একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহ এবং জটিল চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে, যা 'ডায়নামো তত্ত্ব' নামে পরিচিত। এই চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীকে সৌরঝড়, মহাজাগতিক রশ্মি ও সৌরবায়ু থেকে রক্ষা করে। চৌম্বকক্ষেত্র না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ সম্ভব হত না।
6. পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সংক্রান্ত ধারণা কীভাবে 'জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ' এর মতো গল্প থেকে আলাদা? বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের পার্থক্য এখানে কী?
জুল ভার্নের কল্পনা বনাম বাস্তবতা
বিখ্যাত লেখক জুল ভার্ন ১৮৬৪ সালে 'জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ' উপন্যাস লেখেন, যেখানে নায়ক আইসল্যান্ডের একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ দিয়ে গুহাপথে পৃথিবীর কেন্দ্রে নেমে যায় এবং সেখানে সমুদ্র, ডাইনোসর ও অদ্ভুত জগৎ দেখতে পায়। এটি ছিল নিখাদ কল্পবিজ্ঞান।
বাস্তব বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা:
- তাপমাত্রা: কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ৬,০০০°C — সূর্যের পৃষ্ঠের সমান। এই তাপমাত্রায় কোনো পরিচিত ধাতু বা পদার্থ কঠিন থাকতে পারে না।
- চাপ: কেন্দ্রে চাপ প্রায় ৩৬০ গিগাপ্যাস্কেল। কোনো মানুষ বা যন্ত্র এই চাপ সহ্য করতে পারে না।
- পথ নেই: আগ্নেয় জ্বালামুখও কিছু নীচে গিয়ে বন্ধ বা অত্যন্ত সংকীর্ণ। গুরুমন্ডল ম্যাগমায় পূর্ণ, কোনো গুহা বা ফাঁপা স্থান নেই।
- অক্সিজেন: ভূগর্ভে অক্সিজেন নেই।
পার্থক্যের সারং
| বিষয় | উপন্যাস (কল্পনা) | বিজ্ঞান (বাস্তবতা) |
| কেন্দ্রের প্রকৃতি | বিশাল সমুদ্র ও প্রাণী | অতি উত্তপ্ত কঠিন লোহা-নিকেল |
| প্রবেশ পথ | আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ | অসম্ভব; চাপ ও তাপে নিমেষে ধ্বংস |
| গভীরতা | ৬,৩৭০ কিমি অনায়াসে | শুধুমাত্র ১২ কিমি খনন সম্ভব হয়েছে |
| জীবন | ডাইনোসর ও দানব | এককোষী ব্যাকটেরিয়াও টিকবে না |
কল্পবিজ্ঞান আমাদের স্বপ্ন দেখায়, বাস্তব বিজ্ঞান প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে পৃথিবীকে বোঝায়। তবে জুল ভার্নের কল্পনা পরবর্তীকালে বহু বিজ্ঞানীকে অনুপ্রাণিত করেছে।
7. গরম দুধের বাটির সঙ্গে পৃথিবীর ভূত্বকের তুলনা কেন করা হয়? পৃথিবীর অভ্যন্তরে তাপের বণ্টন ও ভূত্বকের শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
গরম দুধ ও পৃথিবীর তুলনা
আমরা যদি একটি বাটিতে গরম দুধ ঢালি, কিছুক্ষণ পর দেখতে পাই উপরিতলে ঠান্ডা হয়ে সর বা ক্রিমের আস্তরণ পড়েছে। কিন্তু নীচের দুধ অনেকক্ষণ পর্যন্ত গরম থাকে। ঠিক একই ভাবে, পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয়েছিল (প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে), তা ছিল প্রচণ্ড উত্তপ্ত গ্যাসীয় ও তরল পিণ্ড। মহাকাশে তাপ বিকিরণ করে উপরের পৃষ্ঠ আগে ঠান্ডা হয়ে জমে শক্ত ভূত্বক তৈরি করে। কিন্তু নীচের অংশ এখনও অত্যন্ত উত্তপ্ত, আংশিক গলিত অবস্থায় রয়েছে।
তাপের বণ্টন ও শীতলীকরণ:
- তাপমাত্রা ক্রমবৃদ্ধি (Geothermal Gradient): ভূত্বকে প্রতি ৩৩ মিটারে ১°C করে তাপ বাড়ে। ১ কিমি গভীরে তাপমাত্রা প্রায় ৪৫°C – গরম জলের ট্যাপের মতো!
- তাপের উৎস: (ক) আদিম তাপ – পৃথিবী সৃষ্টির সময়কার অবশিষ্ট তাপ। (খ) তেজস্ক্রিয় ক্ষয় – গুরুমন্ডল ও ভূত্বকে থাকা ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, পটাশিয়াম-৪০-এর ক্রমাগত ক্ষয় থেকে তাপ উৎপন্ন হয়।
- কঠিন ভূত্বকের আস্তরণ: ভূত্বকের পুরুত্ব সমুদ্রের নীচে মাত্র ৫ কিমি, কিন্তু মহাদেশের নীচে প্রায় ৬০ কিমি। এটি একটি অন্তরক কম্বলের মতো কাজ করে এবং অভ্যন্তরের তাপকে বাইরে বার হতে বাধা দেয়।
- পরিচলন স্রোত: গুরুমন্ডলে তাপের পার্থক্যের জন্য ম্যাগমা ধীরগতির পরিচলন স্রোত তৈরি করে, যা টেকটনিক প্লেটগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
সুতরাং, গরম দুধের সরের সঙ্গে ভূত্বকের তুলনা অত্যন্ত যথার্থ। উপরিভাগ ঠান্ডা বলে আমরা নিরাপদে বসবাস করছি, কিন্তু নীচে পৃথিবীর অভ্যন্তর আজও অগ্নিগর্ভ।
মনে রেখো!
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬,৩৭০ কিমি। ভূ-ত্বকের গড় পুরুত্ব মাত্র ৩০ কিমি — অনেকটা আপেলের খোসার মতো। প্রতি ৩৩ মিটার গভীরে ১°C তাপ বাড়ে। সিয়াল (Si+Al) মহাদেশে, সিমা (Si+Mg) মহাসাগরে। কেন্দ্রমন্ডল = নিফে (Ni+Fe) — বাইরের অংশ তরল, ভেতরের অংশ কঠিন। ভূমিকম্প তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে ভূ-অভ্যন্তর জানা গেছে।
PDF ডাউনলোড
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।
PDF ডাউনলোড