Chapter 7: মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশের অবনমন
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 22 SAQ | 7 Broad Questions
শিল্প বিপর্যয়
ভোপাল (MIC গ্যাস) ও চের্নোবিল
চিপকো আন্দোলন
বৃক্ষচ্ছেদন রোধে মহিলাদের সংগ্রাম
ধস ও খরা
দার্জিলিংয়ে ধস, পুরুলিয়ায় খরা
বিশ্ব উষ্ণায়ন
CFC গ্যাস ও কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
22 টিপরিবেশের অবনমন: পরিবেশের গুণগত মানের সামগ্রিক হ্রাস পাওয়াকেই পরিবেশের অবনমন বা Environmental Degradation বলা হয়।
প্রাকৃতিক কারণ (যেমন- ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি) বা মানুষের অবিবেচক কার্যাবলির (যেমন- বৃক্ষচ্ছেদন, দূষণ) ফলে পরিবেশ যখন উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের জীবনধারণের প্রতিকূল হয়ে ওঠে, তখনই পরিবেশের অবনমন ঘটে।
পরিবেশ দূষণ: প্রাকৃতিক পরিবেশে যখন বাইরে থেকে কোনো ক্ষতিকর বা অবাঞ্ছিত পদার্থ (কঠিন, তরল বা গ্যাসীয়) মিশে গিয়ে পরিবেশের স্বাভাবিক গুণমান নষ্ট করে এবং জীবজগতের ক্ষতিসাধন করে, তখন তাকে পরিবেশ দূষণ বলা হয়। যেমন- বায়ুদূষণ, জলদূষণ, শব্দদূষণ।
| পার্থক্যের বিষয় | পরিবেশের অবনমন (Degradation) | পরিবেশ দূষণ (Pollution) |
|---|---|---|
| ধারণা | এটি একটি ব্যাপক বা বিস্তৃত ধারণা। পরিবেশের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতিকে বোঝায়। | এটি অবনমনের একটি অংশ বা একটি নির্দিষ্ট কারণ মাত্র। |
| কারণ | এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই হতে পারে। | দূষণ মূলত মানুষের অবিবেচক কার্যাবলির ফলেই বেশি ঘটে। |
| সম্পর্ক | সব দূষণই পরিবেশের অবনমন ঘটায়। | সব অবনমন দূষণ নয় (যেমন- অতিরিক্ত পশুচারণে ভূমিক্ষয়)। |
| কারণসমূহ | উদাহরণ |
|---|---|
| প্রাকৃতিক কারণ | ১. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিকম্প ২. খরা, বন্যা, সুনামি ও ঘূর্ণিঝড় |
| মনুষ্যসৃষ্ট কারণ | ১. অবৈজ্ঞানিকভাবে বিপুল বৃক্ষচ্ছেদন ও কৃষিকাজ ২. অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন |
১৯৮৪ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে একটি ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয় ঘটে।
ইউনিয়ন কার্বাইড (Union Carbide) নামক কীটনাশক তৈরির কারখানার ট্যাঙ্ক লিক করে মাঝরাতে অত্যন্ত বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC) গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং অসংখ্য মানুষ অন্ধত্ব ও শ্বাসকষ্টজনিত দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন।
১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমানে ইউক্রেন) চের্নোবিল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
এই বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে মিশে যায়। এর প্রভাবে স্থানীয় বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটি, জল ও বাতাস দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় দূষণের শিকার হয়, যা আজও সেই অঞ্চলকে বসবাসের অযোগ্য করে রেখেছে।
২০১১ সালে জাপানে এক প্রবল ভূমিকম্প এবং তার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ সুনামির কারণে ফুকুশিমা দাইচি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঘটে।
সুনামির জলোচ্ছ্বাসে পরমাণু চুল্লির কুলিং সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে চুল্লিতে গলন (Meltdown) শুরু হয় এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পরিবেশে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি পরিবেশ অবনমনের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
১৯৭৩ সালে উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয় সংলগ্ন চামোলি জেলায় সুন্দরলাল বহুগুণা এবং গৌরা দেবীর নেতৃত্বে এই অহিংস পরিবেশ আন্দোলন শুরু হয়।
উদ্দেশ্য: হিন্দি 'চিপকো' শব্দের অর্থ জড়িয়ে ধরা। ঠিকাদারদের হাত থেকে অরণ্য রক্ষা করার জন্য স্থানীয় মহিলারা গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য।
নর্মদা নদীর ওপর বিশাল সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে পরিবেশকর্মী মেধা পাটেকরের নেতৃত্বে 'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন' গড়ে ওঠে।
বাঁধ নির্মাণের ফলে বিস্তীর্ণ বনভূমি ও উর্বর কৃষিজমি জলের তলায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং স্থানীয় হাজার হাজার আদিবাসীর বাসস্থানের অধিকার ও পুনর্বাসনের দাবিতেই এই দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল।
সাইলেন্ট ভ্যালি (Silent Valley) কেরল রাজ্যে অবস্থিত একটি গভীর এবং অতি প্রাচীন চিরসবুজ বৃষ্টি অরণ্য, যা বিরল জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার।
এখানে কুন্তি নদীর ওপর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করা হলে, স্থানীয় মানুষ এবং পরিবেশবাদীরা প্রবল আন্দোলন শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত অরণ্যের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকার প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং সাইলেন্ট ভ্যালি রক্ষা পায়।
কৃষিজ উৎপাদন বাড়াতে মানুষ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে:
১) বনজঙ্গল কেটে কৃষিজমি তৈরি করায় বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে।
২) অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং জলদূষণ ঘটছে।
৩) ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত তুলে নেওয়ায় জলস্তর নীচে নেমে যাচ্ছে।
৪) উচ্চফলনশীল বীজের ক্রমাগত ব্যবহারে ফসলের জিনগত ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।
রামসর সাইট: পূর্ব কলকাতার জলাভূমি শহরের দূষিত জলকে প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধন করে এবং এখানে প্রচুর মাছ চাষ হয়। এর অনন্য বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্বের জন্যই আন্তর্জাতিক স্তরে একে 'রামসর সাইট' (Ramsar Site) স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সমস্যা: বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়নের চাপে মাটি ফেলে জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল আবাসন তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে এই প্রাকৃতিক ফিল্টারটি ধ্বংসের মুখে।
দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে পরিবেশ অবনমন ও ধস (Landslide) নামার প্রধান কারণগুলি হলো:
১) অপরিকল্পিতভাবে বনভূমি কেটে চা বাগান, পর্যটন কেন্দ্র ও বহুতল হোটেল নির্মাণ।
২) পাহাড়ের ঢাল কেটে ডিনামাইট ফাটিয়ে রাস্তাঘাট ও পরিকাঠামো তৈরি করা, যা মাটির বাঁধন আলগা করে দেয়।
ফলে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি হলেই আলগা মাটি ও পাথর নিয়ে পাহাড়ে ধস নামে।
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় খরার প্রধান কারণ হলো ব্যাপক হারে বৃক্ষচ্ছেদন।
বনভূমি ধ্বংসের ফলে ওই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মাটির জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং প্রবল মৃত্তিকা ক্ষয় হচ্ছে। ফলে শুষ্ক মরশুম এলেই জলাভাব ও খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং কৃষিকাজ ব্যাহত হয়।
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, কিন্তু মানুষের হস্তক্ষেপে এটি বিপর্যস্ত:
১) বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে অনেক দ্বীপ (যেমন- লোহাচরা) জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে।
২) জঙ্গল কেটে কৃষিজমি ও বসতি স্থাপনের ফলে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হচ্ছে।
৩) সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে মাটিতে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চাষবাসের ক্ষতি হচ্ছে এবং বাঘের মতো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।
গঙ্গা বা হুগলি নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা পাটকল, কাগজকল, চর্মশিল্প, রাসায়নিক কারখানা এবং বিভিন্ন ছোট-বড়ো শিল্প কারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ও দূষিত জল সরাসরি নদীতে এসে মিশছে।
এর ফলে গঙ্গার জল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, নদীর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে।
পরিবেশ অবনমনের ফলে সৃষ্ট দুটি প্রধান বিশ্বব্যাপী সমস্যা হলো:
১) বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে।
২) জলবায়ুর পরিবর্তন (Climate Change): খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা বৃদ্ধি এবং ঋতুচক্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে।
মানুষের কার্যাবলিকে প্রকৃতি ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়:
| কাজের ক্ষেত্র | উদাহরণ |
|---|---|
| প্রকৃতি নির্ভর কাজ | কৃষিকাজ, পশুপালন, মৎস্যশিকার, বনজ সম্পদ সংগ্রহ। |
| প্রযুক্তি নির্ভর কাজ | শিল্পকারখানা তৈরি, রাস্তাঘাট, বাঁধ নির্মাণ, খনিজ উত্তোলন। |
| সেবামূলক কাজ | শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাঙ্কিং। |
অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবের পর কলকারখানায় বিপুল উৎপাদনের জন্য প্রচুর কাঁচামালের প্রয়োজন হয়।
এর ফলে ব্যাপক হারে বনজঙ্গল কাটা শুরু হয়, খনি থেকে কয়লা ও খনিজ তেল দেদার উত্তোলন ও পোড়ানো শুরু হয়। কলকারখানার ধোঁয়া বায়ুদূষণ এবং তরল বর্জ্য নদীকে দূষিত করতে থাকে। এভাবেই শিল্পবিপ্লব পরিবেশের অবনমনকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করেছে।
পরিবেশের অবনমনের ফলে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের বাসযোগ্য পরিবেশ (Habitat) ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
অরণ্য ছেদন, দূষণ ও চোরাশিকারের কারণে অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী (যেমন- ডোডো পাখি, প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন) পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিলুপ্তির মুখে। এর ফলে পৃথিবীর মূল্যবান জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
পরিবেশ দূষণ রোধে ক্ষুদ্র স্তরে আমাদের করণীয়:
১) প্লাস্টিক বর্জন: প্লাস্টিক, পলিথিন ও নাইলনের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
২) গাছ লাগানো: বাড়ির আশেপাশে বা ফাঁকা জায়গায় প্রচুর গাছ লাগানো।
৩) বিদ্যুৎ সাশ্রয়: জল ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করা, অপ্রয়োজনে আলো-পাখা বন্ধ রাখা।
৪) দূষণ কমানো: ফ্রিজ, এসি ও সুগন্ধির ব্যবহার কমানো এবং যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলা।
কথাটির অর্থ হলো, অবনমন একটি ব্যাপক ধারণা। পরিবেশের গুণমান নষ্ট হওয়ার যে কোনো প্রক্রিয়াই হলো অবনমন।
জল, বায়ু বা মাটিতে বিষাক্ত কিছু মিশলে তাকে দূষণ বলে, যা অবনমনের একটি কারণ মাত্র। সুতরাং সব দূষণই অবনমন ঘটায়। কিন্তু অতিরিক্ত পশুপালনের ফলে ঘাস নষ্ট হওয়া বা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের ফলে যে ক্ষতি (অবনমন) হয়, তাতে কোনো বিষাক্ত পদার্থ মেশে না, তাই তাকে দূষণ বলা যায় না।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
7 টিসভ্যতার বিবর্তন ও পরিবেশে তার প্রভাব:
পৃথিবীতে আবির্ভাবের পর থেকে মানুষের কাজকর্ম ধাপে ধাপে পরিবেশের অবনমন ঘটিয়েছে। একে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:
- প্রথম পর্যায় (যাযাবর জীবন): সভ্যতার শুরুতে মানুষ যাযাবর ছিল। তারা পশুপাখি শিকার করে এবং বনজঙ্গল থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে জীবন কাটাত। প্রকৃতির সাথেই তারা মানিয়ে নিত। এই সময় মানুষের দ্বারা পরিবেশের কোনো ক্ষতি বা অবনমন হয়নি।
- দ্বিতীয় পর্যায় (কৃষিবিপ্লব): মানুষ যখন কৃষিকাজ ও পশুপালন শিখল, তখন তারা বনজঙ্গল পুড়িয়ে ও কেটে কৃষিজমি তৈরি করতে শুরু করল। তারা নদীর তীরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করল। এই পর্যায়ে পরিবেশের ওপর মানুষের সামান্য প্রভাব পড়তে শুরু করে, তবে তা প্রকৃতির স্বনিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যেই ছিল।
- তৃতীয় পর্যায় (শিল্পবিপ্লব ও নগরায়ন): অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষের লোভ ও চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। কলকারখানা চালানো ও উন্নত জীবনযাপনের জন্য ব্যাপক খনিজ সম্পদ উত্তোলন, যথেচ্ছ বনভূমি ধ্বংস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, খনিজ তেল) দহন শুরু হয়। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে এই পর্যায়েই পরিবেশের ব্যাপক ও অপূরণীয় অবনমন শুরু হয়েছে।
পরিবেশ অবনমনের কারণসমূহ:
পরিবেশের অবনমন মূলত দুটি কারণে ঘটে থাকে— প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট। তবে বর্তমানে মানুষের কার্যকলাপই প্রধান দায়ী।
১. প্রাকৃতিক কারণ:
- ভৌগোলিক বিপর্যয়: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং সুনামির ফলে বিপুল পরিমাণে গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও মানুষের ক্ষতি হয়, যা পরিবেশের অবনমন ঘটায়।
- আবহাওয়াগত বিপর্যয়: দীর্ঘস্থায়ী খরা, বিধ্বংসী বন্যা এবং সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের ফলেও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
২. মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:
- বৃক্ষচ্ছেদন (Deforestation): কৃষিজমি, কাঠ সংগ্রহ ও বসতি স্থাপনের জন্য যথেচ্ছভাবে অরণ্য ধ্বংস করায় বাস্তুতন্ত্র বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে।
- অপরিকল্পিত কৃষিকাজ: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি ও জল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
- শিল্পায়ন ও নগরায়ন: কলকারখানার ধোঁয়া বায়ুকে এবং অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্য নদীর জলকে দূষিত করছে। জলাভূমি ভরাট করে বহুতল আবাসন তৈরি হচ্ছে।
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপুল চাহিদা মেটাতে প্রকৃতির সম্পদের যথেচ্ছ লুণ্ঠন পরিবেশ অবনমনের অন্যতম মূল কারণ।
ভারতের প্রধান পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন:
পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সচেতন মানুষ ভারতে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
- চিপকো আন্দোলন (Chipko Movement): ১৯৭৩ সালে উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয় অঞ্চলে ঠিকাদারদের দ্বারা নির্বিচারে গাছ কাটার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়। সুন্দরলাল বহুগুণা ও গৌরা দেবীর নেতৃত্বে স্থানীয় মহিলারা গাছকে জড়িয়ে ধরে (চিপকো) অহিংসভাবে বনভূমিকে রক্ষা করেছিলেন।
- নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন (Narmada Bachao Andolan): নর্মদা নদীর ওপর বিতর্কিত সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে মেধা পাটেকর ও বাবা আমতের নেতৃত্বে এই আন্দোলন হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বনভূমি ধ্বংস রোধ করা এবং বাঁধের কারণে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার আদিবাসী ও কৃষকের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
- সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন (Silent Valley Movement): কেরলের অতি প্রাচীন চিরসবুজ অরণ্য 'সাইলেন্ট ভ্যালি' তে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন হয়েছিল। এই অরণ্যের মহামূল্যবান জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য স্থানীয় মানুষ ও বিজ্ঞানীদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে সরকার প্রকল্পটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
পরিবেশ অবনমনের ফলাফল বা প্রভাব:
পরিবেশের অবনমনের ফলে সমগ্র জীবজগৎ এবং মানুষের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। এর প্রধান প্রভাবগুলি হলো:
- বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন: অরণ্য ধ্বংস ও দূষণের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বেড়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে এবং সমুদ্রের জলতল উঁচু হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে খরা ও বন্যার প্রকোপ বাড়ছে।
- জীববৈচিত্র্য হ্রাস: প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হওয়ার কারণে বহু উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি: অপরিকল্পিত নির্মাণ ও বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামছে এবং সমতলে বন্যার তীব্রতা বাড়ছে।
- জনস্বাস্থ্য সংকট: বায়ু, জল ও মাটি দূষিত হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার, চর্মরোগ এবং জলবাহিত রোগের প্রকোপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- সম্পদ হ্রাস: মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভৌমজলের স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে এবং মাটির উর্বরতা কমে গিয়ে কৃষিজ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে পরিবেশ অবনমনের চিত্র:
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মানুষের অপরিণামদর্শী কাজের জন্য পরিবেশের চরম অবনমন ঘটছে।
- পূর্ব কলকাতার জলাভূমি: শহরের দূষিত জল পরিশোধনের এই প্রাকৃতিক ফিল্টারটিকে (রামসর সাইট) মাটি ফেলে বুজিয়ে অপরিকল্পিত বহুতল আবাসন তৈরি হচ্ছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে এবং শহরের নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
- পুরুলিয়া জেলা: ব্যাপক হারে গাছ কাটার ফলে এই অঞ্চলে মাটির জলধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। যার কারণে এখানে প্রায়শই খরার প্রাদুর্ভাব দেখা যায় এবং কৃষিকাজ দারুণভাবে ব্যাহত হয়।
- দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল: বনভূমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিতভাবে চা বাগান, রাস্তাঘাট ও হোটেল নির্মাণের কারণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে গেছে। বর্ষাকালে এখানে প্রায়ই ভয়াবহ ধস (Landslide) নেমে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
- সুন্দরবন অঞ্চল: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি এবং ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস করার কারণে সুন্দরবনের অনেক দ্বীপ জলের তলায় চলে যাচ্ছে এবং মাটিতে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চাষবাসের ক্ষতি হচ্ছে।
পরিবেশ অবনমন রোধে আমাদের করণীয়:
বড়ো স্তরের পাশাপাশি ক্ষুদ্র বা ব্যক্তিগত স্তরেও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে:
- বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ: নিজের স্কুল, বাড়ি এবং রাস্তার ধারে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং সবুজায়নের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অকারণে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে।
- প্লাস্টিক বর্জন: পরিবেশের অন্যতম শত্রু প্লাস্টিক, নাইলন ও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং বায়োডিগ্রেডেবল (পচনশীল) বস্তুর ব্যবহার বাড়াতে হবে।
- সম্পদের অপচয় রোধ: জল ও বিদ্যুতের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। অপ্রয়োজনে আলো, পাখা বন্ধ রাখতে হবে এবং পানীয় জলের অপচয় রুখতে হবে।
- ক্ষতিকর যন্ত্রের ব্যবহার কমানো: রেফ্রিজারেটর, এসি, পারফিউম বা সেন্ট এর ব্যবহার যতটা সম্ভব কমাতে হবে, কারণ এগুলি থেকে নির্গত CFC গ্যাস ওজোন স্তর ধ্বংস করে।
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল ও নিজের এলাকায় আলোচনাসভা, পথনাটিকা বা পদযাত্রার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা (১৯৮৪):
কারণ: ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানির কীটনাশক কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে গভীর রাতে ট্যাঙ্ক থেকে বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC) গ্যাস বাতাসে লিক করে যায়।
প্রভাব: এই মারাত্মক গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রায় ২৫০০-৩০০০ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং কয়েক লক্ষ মানুষ অন্ধত্ব ও শ্বাসকষ্টের মতো স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন। এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয়।
চের্নোবিল পরমাণু বিপর্যয় (১৯৮৬):
কারণ: সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান ইউক্রেন) চের্নোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি ও মানবিক ভুলের কারণে একটি চুল্লিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
প্রভাব: প্রচুর তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্যানসার ও জেনেটিক ত্রুটি দেখা দেয়। বিস্তীর্ণ অঞ্চল চিরতরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়।
ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয় (২০১১):
কারণ: জাপানে এক প্রবল ভূমিকম্প ও সুনামির জলোচ্ছ্বাসে ফুকুশিমা দাইচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কুলিং সিস্টেম বিকল হয়ে যায়, ফলে চুল্লিতে গলন (Meltdown) শুরু হয়।
প্রভাব: এর ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ও সমুদ্রে মিশে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হয় এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মনে রেখো! (Key Points)
১) ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা (১৯৮৪): নির্গত বিষাক্ত গ্যাসটির নাম মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC)।
২) চের্নোবিল (১৯৮৬) ও ফুকুশিমা (২০১১): এই দুটি হলো ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়।
৩) চিপকো আন্দোলন: সুন্দরলাল বহুগুণার নেতৃত্বে উত্তরাখণ্ডে গাছ কাটার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন।
৪) সকল দূষণই অবনমন, কিন্তু সকল অবনমন দূষণ নয়। পরিবেশের গুণমান হ্রাসই হলো অবনমন।