Chapter 10: দক্ষিণ আমেরিকা
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 30 SAQ | 10 Broad Questions
আমাজন নদী
পৃথিবীর বৃহত্তম নদী ও সেলভা অরণ্য
আন্দিজ পর্বত
পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতশ্রেণি
পম্পাস অঞ্চল
দক্ষিণ আমেরিকার শস্যভাণ্ডার
ব্রাজিলের কফি
ফজেন্ডায় কফি চাষে বিশ্বে প্রথম
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
40 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
30 টিদক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশটি নিরক্ষরেখার উভয় পাশে অবস্থিত হলেও এর বেশিরভাগ অংশ দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত।
অক্ষাংশ: উত্তরে ১২°২৮′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে দক্ষিণে ৫৫°৫৯′ দক্ষিণ অক্ষাংশ।
দ্রাঘিমাংশ: পূর্বে ৩৪°৫০′ পশ্চিম দ্রাঘিমা থেকে পশ্চিমে ৮১°২০′ পশ্চিম দ্রাঘিমার মধ্যে অবস্থিত (অর্থাৎ সম্পূর্ণ পশ্চিম গোলার্ধে)।
দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, মেক্সিকো এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে একত্রে লাতিন আমেরিকা বলা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের স্পেন ও পর্তুগাল থেকে মানুষ এসে এখানে বসবাস শুরু করে। এদের ভাষা পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ, যা প্রাচীন লাতিন (Latin) ভাষা থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তাই এই নামকরণ।
আন্দিজ পর্বতমালা দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে সুবিস্তৃত একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতশ্রেণি (প্রায় ৭০০০ কিমি)। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম অ্যাকোনকাগুয়া (৬৯৬০ মিটার)।
টিটিকাকা হ্রদ আন্দিজ পর্বতমালায় পেরু ও বলিভিয়া সীমান্তে অবস্থিত। প্রায় ৩৮১২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদটি পৃথিবীর উচ্চতম নৌসঞ্চারণযোগ্য হ্রদ।
ভেনেজুয়েলায় গায়ানা উচ্চভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত অরিনোকো নদীর উপনদী চুরুন নদীর গতিপথে অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত অবস্থিত। এটি পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত (উচ্চতা ৯৭৯ মিটার)।
উৎপত্তিস্থল: আন্দিজ পর্বতের মিশমি শৃঙ্গ (Mismi Peak) থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
পতনস্থল: পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে।
আমাজন এবং তার অসংখ্য উপনদী (যেমন- রিও নিগ্রো, মেদেইরা, জুরুয়া) যে বিশাল অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জল নিষ্কাশন করে, তাকেই আমাজন অববাহিকা বলে। এটি আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা (প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গ কিমি)।
দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদী অববাহিকা অঞ্চলে সারাবছর প্রচণ্ড উয়তা ও প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে যে গভীর ও দুর্ভেদ্য নিরক্ষীয় চিরসবুজ বৃষ্টি অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে, তাকেই সেলভা অরণ্য বলা হয়।
সেলভা অরণ্য পৃথিবীর মোট অরণ্যভূমির প্রায় ২০ শতাংশ অধিকার করে আছে। এই বিশাল এবং ঘন গাছপালা শালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলের প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন (O2) পরিবেশে ত্যাগ করে, যা সমগ্র পৃথিবীর প্রাণীকুলকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই একে পৃথিবীর ফুসফুস বলে।
আমাজন অরণ্যের পরিবেশ অত্যন্ত স্যাঁতস্যাঁতে, অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং অস্বাস্থ্যকর। এখানে গাছগুলো এত ঠাসাঠাসিভাবে জন্মায় যে ওপরে 'চাঁদোয়া' বা Canopy সৃষ্টি হয়, ফলে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। এখানে বিষাক্ত পোকামাকড় ও পরজীবী উদ্ভিদের উপদ্রব খুব বেশি।
এই দুর্ভেদ্য অরণ্যে মাটিতে চলার পথ না থাকায় বেশিরভাগ প্রাণীই গাছে বাস করে (যেমন- বানর, স্লথ, ম্যাকাও পাখি, এনাকোন্ডা সাপ)। এছাড়া এখানে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা, মাংসাশী পিরানহা মাছ এবং হিংস্র জাগুয়ার ও পিউমা দেখা যায়।
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়েতে লা-প্লাটা নদীর অববাহিকায় যে বিস্তীর্ণ নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি রয়েছে, তাকে পম্পাস অঞ্চল বলা হয়।
পম্পাস অঞ্চল সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জলবায়ু মৃদু ভাবাপন্ন। গ্রীষ্মকালে উষ্ণতা থাকে ২০°-২৪° সে. এবং শীতকালে থাকে ৮°-১০° সে.। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাঝারি (৫০-১০০ সেমি)। শীতকালে 'পম্পেরো' নামক শীতল বায়ু প্রবাহিত হয়।
পম্পাস অঞ্চলের মাটি উর্বর লোয়েস প্রকৃতির এবং জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। এখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিস্তীর্ণ জমিতে প্রচুর পরিমাণে গম (Wheat) চাষ করা হয়। গমের এই বিপুল উৎপাদনের কারণেই এই অঞ্চলকে দক্ষিণ আমেরিকার শস্যভাণ্ডার বলা হয়।
পম্পাস অঞ্চলে পশুপালনের জন্য যে বিশাল বিশাল পশুচারণ ভূমি বা গবাদি পশুর খামার (Ranch) রয়েছে, সেগুলোকে স্থানীয় ভাষায় 'এস্টেনশিয়া' বলা হয়।
পম্পাস অঞ্চলের এস্টেনশিয়া বা পশুখামারগুলোতে গবাদি পশুদের (গোরু, ভেড়া) দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য যে কর্মীরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের গুইলফার্ড বা গউচো বলা হয়।
আলফা-আলফা হলো পম্পাস অঞ্চলের একপ্রকার অত্যন্ত পুষ্টিকর ঘাস। গবাদি পশুকে দ্রুত মোটাতাজা করে মাংস ও দুধের উৎপাদন বাড়ানোর জন্যই এই ঘাস বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়।
পম্পাস অঞ্চলের পশ্চিম দিকে আন্দিজ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত করডোবা অঞ্চলটি উন্নত দুগ্ধ শিল্পের (Dairy Industry) জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রচুর দুগ্ধপ্রদানকারী গোরু পালন করা হয় এবং মাখন, পনির তৈরি হয়।
পম্পাসের পুষ্টিকর ঘাস খাইয়ে আর্জেন্টিনায় প্রচুর উন্নত জাতের গবাদি পশু পালন করা হয়। এখানে মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও হিমঘরে সংরক্ষণের উন্নত প্রযুক্তি থাকায় প্রচুর পরিমাণে গো-মাংস ও শুকরের মাংস প্যাকেটজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। তাই মাংস রপ্তানিতে এটি বিশ্বে প্রথম।
আন্দিজ পর্বতের পূর্বদিকে (বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে) অবস্থিত পাতাগোনিয়া হলো একটি শীতল মরুভূমি ও মালভূমি অঞ্চল। বৃষ্টির অভাবে এখানে বড়ো গাছ জন্মায় না, শুধু ছোট কাঁটাগাছ ও ঝোপঝাড় দেখা যায়।
দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, পেরু এবং চিলির উত্তরাংশে আটাকামা মরুভূমি অবস্থিত। এটি পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক এবং উষ্ণ মরুভূমি।
দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বদিকে অবস্থিত ব্রাজিল উচ্চভূমি প্রাচীন আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত একটি ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি। এটি খনিজ সম্পদে (লোহা, ম্যাঙ্গানিজ) অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং কফি চাষের জন্য বিখ্যাত।
ব্রাজিল উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন তিনটি প্রধান নদী— পারানা, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ে নদী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই মিলিত প্রবাহকেই লা-প্লাটা নদী বলা হয়, যা আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে।
ব্রাজিল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কফি উৎপাদক দেশ। ব্রাজিলের সাও পাওলো অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল বিশাল কফি বাগানগুলিকে স্থানীয় ভাষায় ফাজেন্ডা বলা হয়।
নিরক্ষীয় অঞ্চলের উভয় পাশে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত এলাকায় যে লম্বা ঘাসের প্রান্তর বা সাভানা তৃণভূমি সৃষ্টি হয়েছে, তা দক্ষিণ আমেরিকায় দুটি নামে পরিচিত:
১) উত্তরে অরিনোকো অববাহিকায়— ল্যানোস (Llanos)
২) দক্ষিণে ব্রাজিল উচ্চভূমিতে— ক্যাম্পোস (Campos)।
আমাজন নদীর মোহনা অত্যন্ত চওড়া। আটলান্টিক মহাসাগরের মোহনায় প্রবল সমুদ্রস্রোত এবং শক্তিশালী জোয়ার-ভাটার কারণে নদীর বয়ে আনা পলি মোহনায় জমতে পারে না, স্রোতের টানে গভীর সমুদ্রে ভেসে যায়। তাই এখানে কোনো ব-দ্বীপ নেই।
দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে অবস্থিত চুকুইকামাটা হলো পৃথিবীর বৃহত্তম তামার (Copper) খনি। এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে তামা উত্তোলন করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
লামা হলো দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী উট প্রজাতির এক ধরনের লোমশ প্রাণী। দুর্গম পাহাড়ি পথে মালপত্র বহনের জন্য এদের ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। এদের লোম থেকে পশমও তৈরি হয়।
সেলভা অরণ্য অত্যন্ত ঘন, দুর্ভেদ্য এবং মাটি সবসময় স্যাঁতস্যাঁতে ও কর্দমাক্ত থাকে। এই বিষাক্ত পরিবেশ ও দুর্গম জঙ্গলের কারণে সড়কপথ বা রেলপথ নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব, তাই এখানকার পরিবহন ব্যবস্থা মূলত নদীপথের ওপর নির্ভরশীল।
কৃষিজাত ও পশুজাত কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে পম্পাস অঞ্চলে প্রধানত দুটি শিল্পের খুব উন্নতি হয়েছে:
১) মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকিং শিল্প (বুয়েনস এয়ার্স)
২) দুগ্ধ বা ডেয়ারি শিল্প (মাখন, পনির তৈরি - করডোবা অঞ্চল)।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
10 টিপ্রধান ভূপ্রাকৃতিক বিভাগ:
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশকে প্রধানত চারটি ভূপ্রাকৃতিক ভাগে ভাগ করা যায়:
১) পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল (আন্দিজ)
২) পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চল (গায়ানা ও ব্রাজিল উচ্চভূমি)
৩) মধ্যভাগের বিশাল সমভূমি অঞ্চল (আমাজন, লা-প্লাটা, অরিনোকো অববাহিকা)
৪) পশ্চিমের সংকীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি।
পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল (Andes Mountains):
- অবস্থান ও বিস্তার: মহাদেশের পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৭০০০ কিমি জুড়ে আন্দিজ পর্বতমালা অবস্থিত। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতশ্রেণি।
- প্রকৃতি ও সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: এটি একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ের অংশ হওয়ায় এখানে অসংখ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরি (কোটোপ্যাক্সি, চিম্বোরাজো) রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অ্যাকোনকাগুয়া (৬৯৬০ মিটার)।
- হ্রদ ও মালভূমি: দুটি পর্বতশ্রেণির মাঝখানে বলিভিয়া মালভূমি এবং পৃথিবীর উচ্চতম হ্রদ টিটিকাকা অবস্থিত।
- মরুভূমি: এই পর্বতের পশ্চিম ঢালে আটাকামা উষ্ণ মরুভূমি এবং পূর্ব ঢালে পাতাগোনিয়া শীতল মরুভূমি অবস্থিত।
আমাজন অববাহিকা ও নদী:
দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যভাগের সমভূমিতে প্রবাহিত আমাজন নদী এবং তার উপনদীগুলো মিলে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা (প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গ কিমি) গঠন করেছে।
আমাজন নদীর বৈশিষ্ট্য:
- সর্বোচ্চ জলবহন ক্ষমতা: আমাজন নদী দৈর্ঘ্যে নীল নদের পর দ্বিতীয় হলেও, অববাহিকার আয়তন এবং জলবহন ক্ষমতার দিক থেকে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম নদী। পৃথিবীর মোট নদীজলের প্রায় ২০ শতাংশ এই নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়।
- জলের প্রাচুর্য: এই নদী নিরক্ষীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এখানে সারাবছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। তাছাড়া এর প্রায় ১০০০-এর বেশি উপনদী (রিও নিগ্রো, মেদেইরা) রয়েছে, যারা প্রচুর জল মূল নদীতে বয়ে আনে।
- উৎপত্তি ও মোহনা: আন্দিজ পর্বতের মিশমি শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। মোহনা খুব চওড়া হওয়ায় এবং সমুদ্রস্রোতের কারণে এখানে কোনো ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়নি।
- নৌসঞ্চারণযোগ্য: নদীটি খুব গভীর ও চওড়া হওয়ায় মোহনা থেকে ভেতরের দিকে বহুদূর পর্যন্ত বড়ো বড়ো জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারে।
সেলভা অরণ্য কী?
আমাজন নদী অববাহিকায় সারাবছর প্রচণ্ড উয়তা ও প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে যে গভীর ও দুর্ভেদ্য নিরক্ষীয় চিরসবুজ বৃষ্টি অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে, তাকেই সেলভা বলা হয়। একে 'পৃথিবীর ফুসফুস' বলা হয় কারণ এটি বায়ুমণ্ডলে প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ করে।
পরিবেশ ও উদ্ভিদজগৎ:
- চাঁদোয়া (Canopy): রোজউড, রবার, মেহগনি, সিঙ্কোনা প্রভৃতি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এত কাছাকাছি জন্মায় যে ওপরে ডালপালা মিলে একটি আচ্ছাদন বা 'চাঁদোয়া' তৈরি করে। ফলে অরণ্যের তলদেশ সবসময় অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে ও কর্দমাক্ত থাকে।
- লতাগুল্ম: বড়ো গাছের গায়ে অসংখ্য লতা (Lianas) পেঁচিয়ে থাকে এবং পরজীবী উদ্ভিদ দেখা যায়।
প্রাণিজগৎ:
মাটিতে চলার পথ না থাকায় বেশিরভাগ প্রাণী গাছে বাস করে (বানর, স্লথ, অ্যানাকোন্ডা সাপ, ম্যাকাও পাখি, ট্যারান্টুলা মাকড়সা)। এছাড়া মাংসাশী জাগুয়ার, পিউমা এবং নদীর জলে পিরানহা মাছ ও কুমির দেখা যায়। এখানকার পরিবেশ মানুষের বসবাসের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল।
পম্পাস অঞ্চল:
দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়েতে লা-প্লাটা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত বিস্তীর্ণ, সমতল নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমিকে পম্পাস অঞ্চল বলা হয়।
কৃষিকাজের উন্নতির কারণ:
পম্পাস অঞ্চলকে 'দক্ষিণ আমেরিকার শস্যভাণ্ডার' বলা হয়। এর উন্নতির প্রধান কারণগুলি হলো:
- উর্বর মৃত্তিকা: এই অঞ্চলের মাটি অত্যন্ত উর্বর 'লোয়েস' (Loess) প্রকৃতির, যা কৃষিকাজের জন্য আদর্শ।
- অনুকূল জলবায়ু: সমুদ্রের কাছে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জলবায়ু মৃদু ভাবাপন্ন বা নাতিশীতোষ্ণ এবং বৃষ্টিপাতও পর্যাপ্ত (৫০-১০০ সেমি)।
- উন্নত প্রযুক্তি ও সমতল ভূমি: বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি হওয়ায় এখানে ট্রাক্টর ও হারভেস্টারের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিপুল পরিমাণে গম (Wheat), ভুট্টা, যব ও তুলা চাষ করা হয়।
- জলসেচ ও পরিবহন: পারানা ও উরুগুয়ে নদীর জল সেচের কাজে লাগে এবং উন্নত রেলপথ ও বন্দর (বুয়েনস এয়ার্স) কৃষিজ দ্রব্য রপ্তানিতে সাহায্য করে।
পম্পাস অঞ্চলে পশুপালন:
পম্পাস অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পশুপালন কেন্দ্র। আর্জেন্টিনা গো-মাংস রপ্তানিতে পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে।
উন্নতির কারণসমূহ:
- বিস্তীর্ণ চারণভূমি ও আলফা-আলফা ঘাস: এখানকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে পশুপালনের জন্য এস্টেনশিয়া (Estancia) বা গবাদি পশুর খামার গড়ে তোলা হয়েছে। পশুকে মোটাতাজা করার জন্য এখানে অত্যন্ত পুষ্টিকর আলফা-আলফা (Alfalfa) ঘাস চাষ করা হয়।
- ডেয়ারি শিল্পের বিকাশ: আন্দিজ পর্বতের পাদদেশে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সেখানে করডোবা (Cordoba) অঞ্চলে প্রচুর দুগ্ধপ্রদানকারী গোরু পালন করা হয় এবং উন্নত মানের মাখন, পনির বা ডেয়ারি শিল্প গড়ে উঠেছে।
- হিমঘর ও প্রক্রিয়াকরণ: বুয়েনস এয়ার্স শহরে মাংস প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেটজাত করা এবং উন্নত মানের হিমঘরে (Cold storage) সংরক্ষণ করে জাহাজে করে বিদেশে রপ্তানি করার সুব্যবস্থা রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার প্রধান নদনদী:
- আমাজন (Amazon): এটি মহাদেশের প্রধান এবং পৃথিবীর বৃহত্তম নদী। আন্দিজ পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে নিরক্ষীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে। এর বিশাল অববাহিকায় সেলভা অরণ্য অবস্থিত।
- লা-প্লাটা (La-Plata): ব্রাজিল উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন পারানা, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ে নদীর মিলিত প্রবাহ লা-প্লাটা নামে পরিচিত। এটি পম্পাস অঞ্চলের প্রাণস্বরূপ এবং কৃষিকাজে দারুণ সাহায্য করে।
- অরিনোকো (Orinoco): গায়ানা উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তরে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছে। এই নদীর অববাহিকায় ল্যানোস তৃণভূমি এবং পৃথিবীর উচ্চতম অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত অবস্থিত।
- সাও ফ্রান্সিসকো: এটি ব্রাজিল উচ্চভূমির একটি উল্লেখযোগ্য নদী যা পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে।
আমাজন নদীতে ব-দ্বীপ না থাকার কারণ:
বিশ্বের বৃহত্তম নদী হওয়া সত্ত্বেও আমাজন নদীর মোহনায় কোনো ব-দ্বীপ (Delta) গড়ে ওঠেনি। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- চওড়া মোহনা: আটলান্টিক মহাসাগরের কাছে আমাজনের মোহনা অত্যন্ত চওড়া (প্রায় ৩২০ কিমি প্রশস্ত)। তাই নদীর স্রোত বাধা পায় না।
- প্রবল সমুদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা: মোহনায় আটলান্টিক মহাসাগরের শক্তিশালী স্রোত এবং প্রবল জোয়ার-ভাটা নিয়মিত দেখা যায়। এর ফলে নদী যে পলি বয়ে আনে, তা মোহনায় জমতে না পেরে স্রোতের টানে গভীর সমুদ্রে ভেসে যায়।
- কঠিন শিলা স্তর: নদীর গতিপথের অনেক জায়গায় কঠিন আগ্নেয় শিলা থাকায় নদী খুব বেশি পলি ক্ষয় করে আনতে পারে না।
এই কারণগুলোর জন্যই আমাজনের মোহনায় পলি সঞ্চিত হয়ে ব-দ্বীপ সৃষ্টি হতে পারেনি।
পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চল:
দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বদিকে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল বরাবর দুটি প্রাচীন উচ্চভূমি অবস্থিত। আমাজন নদী এই দুটি উচ্চভূমিকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
- গায়ানা উচ্চভূমি (Guiana Highlands): এটি আমাজন নদীর উত্তরে অবস্থিত। এটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং কঠিন আগ্নেয় শিলা দ্বারা গঠিত। এখানে অরিনোকো নদী প্রবাহিত হয়েছে এবং অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত অবস্থিত।
- ব্রাজিল উচ্চভূমি (Brazilian Highlands): এটি আমাজন নদীর দক্ষিণে এবং মহাদেশের পূর্বদিকে অবস্থিত। এটিও একটি প্রাচীন ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি। এই উচ্চভূমি খনিজ সম্পদে (লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, সোনা) অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর পূর্ব ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং এখানকার উর্বর লাল মাটিতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কফি চাষ (Fazenda) হয়।
জলবায়ু ও স্বাভাবিক উদ্ভিদের বৈচিত্র্য:
বিশাল অক্ষাংশগত বিস্তৃতির কারণে দক্ষিণ আমেরিকায় জলবায়ু ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য দেখা যায়:
- নিরক্ষীয় জলবায়ু: আমাজন অববাহিকায় উয় ও আর্দ্র জলবায়ুর কারণে সেলভা (Selva) নামক চিরসবুজ বৃষ্টি অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে।
- ক্রান্তীয় জলবায়ু: নিরক্ষীয় অঞ্চলের উত্তরে ও দক্ষিণে কম বৃষ্টিপাতের কারণে ল্যানোস ও ক্যাম্পোস নামক সাভানা তৃণভূমি গড়ে উঠেছে।
- নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু: লা-প্লাটা অববাহিকায় মৃদু জলবায়ুর কারণে পম্পাস (Pampas) নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
- মরু জলবায়ু: আন্দিজের পশ্চিমে আটাকামা উষ্ণ মরুভূমি এবং পূর্বে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পাতাগোনিয়া শীতল মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে কেবল কাঁটাগাছ জন্মায়।
- ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু: মধ্য চিলিতে শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়, তাই এখানে ভূমধ্যসাগরীয় উদ্ভিদ (ওক, কর্ক, জলপাই) দেখা যায়।
সেলভা অরণ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সমস্যা:
অফুরন্ত বনজ সম্পদ (রোজউড, রবার, ব্রাজিল নাট, কুইনাইন) থাকা সত্ত্বেও সেলভা অরণ্য অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি কাজে লাগানো যায়নি। এর কারণ বা সমস্যাগুলো হলো:
- দুর্গম পরিবেশ: অরণ্যটি অত্যন্ত ঘন, অন্ধকার এবং স্যাঁতস্যাঁতে। লতাগুল্মে জঙ্গল এতই দুর্ভেদ্য যে ভেতরে প্রবেশ করা খুব কঠিন।
- বিষাক্ত প্রাণী ও রোগ: এখানে বিষাক্ত মাকড়সা, সাপ, এবং ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব থাকায় মানুষের জীবন সবসময় বিপন্ন থাকে।
- পরিবহনের অভাব: কাদা মাটি ও ঘন জঙ্গলের কারণে এখানে সড়ক বা রেলপথ নির্মাণ করা যায় না। কেবল নদীপথই একমাত্র সম্বল।
- গাছের মিশ্রণ: একই জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ (নরম ও শক্ত কাঠ) মিশে থাকায় বাণিজ্যিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো কাঠ কাটা অত্যন্ত শ্রমসাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
মনে রেখো! (Key Points)
১) পৃথিবীর ফুসফুস: আমাজনের সেলভা অরণ্য।
২) আন্দিজ পর্বত: পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা, সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অ্যাকোনকাগুয়া।
৩) অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত: পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত (ভেনেজুয়েলায় অবস্থিত)।
৪) পম্পাস অঞ্চল: আলফা-আলফা ঘাস, এস্টেনশিয়া (পশুখামার) এবং প্রচুর গম ও মাংস উৎপাদনে বিখ্যাত।