Chapter 11: ওশিয়ানিয়া (Oceania)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 30 SAQ | 10 Broad Questions
অস্ট্রেলিয়া
ওশিয়ানিয়ার বৃহত্তম দেশ
প্রবাল প্রাচীর
বিশ্বের দীর্ঘতম গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ
ডাউনস ও মেরিনো
তৃণভূমি এবং বিশ্ববিখ্যাত উল
আর্টেজীয় কূপ
পাম্প ছাড়াই জল ওঠে এমন কূপ
ওশিয়ানিয়ার ৪টি প্রধান আঞ্চলিক বিভাগ
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলির সুন্দর বিভাজন
| বিভাগের নাম | নামের অর্থ | অবস্থান ও অন্তর্ভুক্ত দেশ/দ্বীপসমূহ |
|---|---|---|
| অস্ট্রেলেশিয়া (Australasia) | অস্ট্রেল = দক্ষিণ, অর্থাৎ এশিয়ার দক্ষিণে | এটি ওশিয়ানিয়ার বৃহত্তম অংশ। এশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত। |
| মেলানেশিয়া (Melanesia) | মেলান = কালো, নেশিয়া = দ্বীপ | এখানকার অধিবাসীদের গায়ের রং কালো বলে এই নাম। যেমন— নিউগিনি, ফিজি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ। |
| মাইক্রোনেশিয়া (Micronesia) | মাইক্রো = ছোট বা ক্ষুদ্র | প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট দ্বীপ। যেমন— মার্শাল, মারিয়ানা, ক্যারোলিন। |
| পলিনেশিয়া (Polynesia) | পলি = বহু | প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যভাগে ছড়িয়ে থাকা বহু দ্বীপের সমষ্টি। যেমন— হাওয়াই, সামোয়া, তাহিতি, টোঙ্গা। |
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
40 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
30 টিপ্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ছোট-বড়ো প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি দ্বীপ নিয়ে একত্রে যে মহাদেশটি গঠিত হয়েছে, তাকেই ওশিয়ানিয়া মহাদেশ বলা হয়। এটি পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম মহাদেশ।
ওশিয়ানিয়া একটি দ্বীপময় মহাদেশ। এর সবচেয়ে বড়ো দেশ অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ অংশই উষ্ণ ও রুক্ষ মরুভূমি। পানীয় জলের তীব্র অভাব, দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং অনেক দ্বীপে জীবনযাত্রার প্রতিকূল পরিবেশের জন্যই এখানকার মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে ৩ কোটি।
ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্বীপের প্রকৃতি অনুযায়ী ওশিয়ানিয়াকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়: ১) অস্ট্রেলেশিয়া (Australasia), ২) মেলানেশিয়া (Melanesia), ৩) মাইক্রোনেশিয়া (Micronesia), এবং ৪) পলিনেশিয়া (Polynesia)।
অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে প্রবাল কিটের মৃতদেহ জমে জমে প্রায় ২০০০ কিমি দীর্ঘ একটি প্রাচীর বা দেওয়াল তৈরি হয়েছে। এটিই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ নামে পরিচিত, যা পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রবাল প্রাচীর।
অস্ট্রেলিয়ার মধ্যভাগের সমভূমিতে মাটির নীচে বাটির মতো একটি অপ্রবেশ্য শিলাস্তরের মাঝে একটি প্রবেশ্য শিলাস্তর অবস্থান করে। এই অংশে গর্ত খুঁড়লে জলের প্রবল চাপে পাম্প ছাড়াই ভূগর্ভস্থ জল ফোয়ারার মতো আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে। একেই আর্টেজীয় কূপ বলে।
ক্যাঙারু, হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস (স্তন্যপায়ী কিন্তু ডিম পাড়ে), কোয়ালা (গাছে থাকা ছোট্ট ভাল্লুক), এমু (উটপাখির মতো দৌড়ায়), এবং কিউই (ডানাহীন পাখি) হলো এখানকার অদ্ভুত প্রাণী।
অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত সুউচ্চ পর্বতমালাটিকে গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ বলা হয়। এটি অস্ট্রেলিয়ার পূর্বদিকের উর্বর উপকূলীয় সমভূমিকে পশ্চিমের রুক্ষ মালভূমি থেকে আলাদা বা বিভক্ত (Divide) করেছে।
মারে নদীর উৎপত্তি: গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের মাউন্ট কসিয়াস্কো শৃঙ্গের কাছ থেকে।
ডার্লিং নদীর উৎপত্তি: গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের উত্তর অংশ (নিউ ইংল্যান্ড রেঞ্জ) থেকে উৎপন্ন হয়ে পরে এটি মারে নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।
মারে-ডার্লিং অববাহিকাটি গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। পূর্বদিক থেকে আসা জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতে বাধা পেয়ে পূর্ব ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, কিন্তু পশ্চিম ঢালে পৌঁছলে তাতে জলীয়বাষ্প থাকে না। তাই এটি একটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (Rain Shadow Area), ফলে এখানে বৃষ্টিপাত বেশ কম হয় (২৫-৭৫ সেমি)।
অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় কম বৃষ্টিপাত এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর কারণে যে বিস্তীর্ণ, সবুজ এবং নরম নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে, তাকেই 'ডাউনস' বলা হয়। এটি মেষপালনের জন্য আদর্শ।
অস্ট্রেলিয়ার ডাউনস তৃণভূমিতে প্রচুর পরিমাণে মেরিনো জাতের ভেড়া পালন করা হয়। এই ভেড়ার লোম বা উল (Wool) অত্যন্ত উন্নত মানের, সূক্ষ্ম এবং উষ্ণ। মেরিনো উল উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে।
অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় পশুপালনের জন্য হাজার হাজার হেক্টর জমি নিয়ে তৈরি বিশাল পশুখামার বা 'শিপ স্টেশন' (Sheep Station) গুলোতে যে দক্ষ শ্রমিকরা কাজ করে, তাদের স্থানীয় ভাষায় জ্যাকারু বলা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকার পশ্চিম দিকে অবস্থিত ব্রোকেন হিল একটি অত্যন্ত খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই খনি থেকে প্রচুর পরিমাণে রুপো (Silver), সিসা এবং দস্তা উত্তোলিত হয়। রুপোর প্রাচুর্যের জন্যই একে 'রুপোর শহর' (Silver City) বলা হয়।
এখানকার প্রধান ফসল হলো গম (Wheat)। এছাড়া এখানে যব, ওট, এবং নদীর তীরে ফলের বাগানে প্রচুর আপেল, আঙুর, কমলালেবু ও ন্যাসপাতি চাষ করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের অ্যাবোরিজিন (Aborigines) বলা হয়। এরা মূলত শিকারি এবং সংগ্রাহক ছিল। শিকারের জন্য তারা 'বুমেরাং' (Boomerang) নামক এক বিশেষ ধরনের বাঁকানো অস্ত্র ব্যবহার করত।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মাইক্রোনেশিয়ার কাছে অবস্থিত মারিয়ানা খাত হলো পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রখাত (গভীরতা প্রায় ১১,০৩৪ মিটার)। এর গভীরতা এত বেশি যে সমগ্র মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতকে এর মধ্যে ডুবিয়ে দিলেও তার মাথায় জল থাকবে।
এখানে বৃষ্টিপাত কম হলেও নদীর জল সেচের কাজে লাগিয়ে গম চাষ করা হয় এবং যে জমি কৃষির জন্য উপযুক্ত নয়, সেখানে ডাউনস তৃণভূমিতে প্রচুর ভেড়া ও গবাদি পশু পালন করা হয়। একেই মিশ্র কৃষি (Mixed Farming) বলে।
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম ভাগ একটি অতি প্রাচীন মালভূমি, যা দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। সমুদ্র থেকে বহু দূরে এবং বায়ুপ্রবাহের গতিপথের কারণে এখানে বৃষ্টিপাত প্রায় হয়ই না। তাই এটি গ্রেট ভিক্টোরিয়া, গিবসন এর মতো রুক্ষ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নিউজিল্যান্ড প্রধানত দুটি বড়ো দ্বীপ নিয়ে গঠিত— উত্তর দ্বীপ (North Island) এবং দক্ষিণ দ্বীপ (South Island)। এই দুটি দ্বীপের ঠিক মাঝখানে যে সংকীর্ণ জলভাগ রয়েছে, তাকেই কুক প্রণালী বলা হয়।
| দেশ | সর্বোচ্চ শৃঙ্গ | উচ্চতা | পর্বতমালার নাম |
|---|---|---|---|
| অস্ট্রেলিয়া | মাউন্ট কসিয়াস্কো | ২২২৮ মিটার | গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ |
| নিউজিল্যান্ড | মাউন্ট কুক | ৩৭৬৪ মিটার | সাউদার্ন আল্পস |
এই অববাহিকা খনিজ সম্পদে খুব বেশি সমৃদ্ধ না হলেও, প্রান্তবর্তী অঞ্চলে কিছু খনি রয়েছে। ব্রোকেন হিলে রুপো, সিসা, দস্তা এবং কোবার (Cobar) অঞ্চলে তামা উত্তোলিত হয়। অ্যাডিলেডের কাছে সামান্য কয়লা পাওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে (মারে-ডার্লিং অববাহিকা ও উপকূল) জলবায়ু মনোরম, নদী থাকায় জলের অভাব নেই, এবং উর্বর সমভূমিতে কৃষিকাজ, পশুপালন ও শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। তাই এখানেই জনসংখ্যার ঘনত্ব সর্বাধিক।
জারা এবং কারি হলো অস্ট্রেলিয়ায় প্রাপ্ত অত্যন্ত শক্ত কাঠের চিরহরিৎ গাছ। এই গাছগুলি পৃথিবীর অন্য কোনো মহাদেশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় না।
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, সিডনি হারবার, নিউজিল্যান্ডের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং হাওয়াই দ্বীপের আগ্নেয়গিরি দেখতে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ পর্যটক ওশিয়ানিয়ায় আসেন। পর্যটন থেকে উপার্জিত অর্থ এই দেশগুলির অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা পালন করে।
অ্যাডিলেড হলো মারে-ডার্লিং অববাহিকার সবচেয়ে বড়ো শহর এবং প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার উন্নত বন্দরের মাধ্যমে পশম, মাংস ও গম বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
ওশিয়ানিয়া মহাদেশ দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে এবং সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে, তাই ওই সময়ে সেখানে গরমকাল বা গ্রীষ্মকাল হয়।
'পলি' কথার অর্থ বহু এবং 'নেশিয়া' মানে দ্বীপ। প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যভাগে ছড়িয়ে থাকা বহু ছোট-বড়ো দ্বীপের সমষ্টিকে পলিনেশিয়া বলা হয়। হাওয়াই, সামোয়া, তাহিতি এর অন্তর্গত।
খনিজ সম্পদের অভাবে এখানে ভারী শিল্প গড়ে ওঠেনি। তবে কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভর করে পশম শিল্প, বস্ত্রবয়ন, ডেয়ারি, ময়দা, এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্প খুব উন্নতি লাভ করেছে।
আয়ার হ্রদ অস্ট্রেলিয়ার মধ্যভাগের সেন্ট্রাল লোল্যান্ডস বা গ্রেট আর্টেজিয়ান বেসিন অঞ্চলে অবস্থিত। এটি অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম হ্রদ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ মিটার নীচু (অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন স্থান)। এর জল লবণাক্ত।
গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই উপকূলীয় সমভূমিটি অত্যন্ত উর্বর। নদীগঠিত এই সমভূমিতে প্রচুর কৃষিকাজ হয় এবং এখানেই সিডনি, ব্রিসবেনের মতো বড়ো শহরগুলো অবস্থিত।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
10 টিওশিয়ানিয়া মহাদেশের আঞ্চলিক বিভাগ:
ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্বীপগুলোর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ওশিয়ানিয়াকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- অস্ট্রেলেশিয়া (Australasia): 'অস্ট্রেল' কথার অর্থ দক্ষিণ এবং 'এশিয়া' বলতে এশিয়া মহাদেশকে বোঝায়। এশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এটি ওশিয়ানিয়ার বৃহত্তম অংশ।
- মেলানেশিয়া (Melanesia): 'মেলান' মানে কালো এবং 'নেশিয়া' মানে দ্বীপ। এই দ্বীপগুলোর অধিবাসীদের গায়ের রং কালো হওয়ায় এর নাম মেলানেশিয়া। নিউগিনি, ফিজি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ এর অন্তর্গত।
- মাইক্রোনেশিয়া (Micronesia): 'মাইক্রো' কথার অর্থ ছোট বা ক্ষুদ্র। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে এটি গঠিত। যেমন— মার্শাল, মারিয়ানা, ক্যারোলিন দ্বীপপুঞ্জ।
- পলিনেশিয়া (Polynesia): 'পলি' মানে বহু। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব ভাগের অসংখ্য ছোট-বড়ো দ্বীপের সমষ্টিকে পলিনেশিয়া বলে। হাওয়াই, সামোয়া, টোঙ্গা, তাহিতি এর অন্তর্গত।
অস্ট্রেলিয়ার ভূপ্রকৃতি:
অস্ট্রেলিয়ার ভূপ্রকৃতিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১) পূর্বের উচ্চভূমি (গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ)
২) মধ্যভাগের সমভূমি (সেন্ট্রাল লোল্যান্ডস)
৩) পশ্চিমের উচ্চভূমি বা মালভূমি।
মধ্যভাগের সমভূমি (Central Lowlands):
- অবস্থান: পূর্বে গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ এবং পশ্চিমে মালভূমির ঠিক মাঝখানে এই বিস্তীর্ণ নিচু সমভূমি অবস্থিত। এটি উত্তরে গালফ অফ কার্পেন্টারিয়া থেকে দক্ষিণে মারে-ডার্লিং অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।
- আয়ার হ্রদ: এই সমভূমির মধ্যভাগে রয়েছে আয়ার হ্রদ (Lake Eyre), যা অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন স্থান এবং বৃহত্তম লবণাক্ত জলের হ্রদ।
- আর্টেজীয় কূপ (Artesian Basin): এই নিচু সমভূমি অঞ্চলে গ্রেট আর্টেজিয়ান বেসিন অবস্থিত। এখানকার পাথরের গঠন অনেকটা বাটির মতো, যেখানে দুটি অপ্রবেশ্য শিলাস্তরের মাঝে একটি প্রবেশ্য শিলাস্তর অবস্থান করে। বৃষ্টির জল এই প্রবেশ্য স্তরে জমা হয়। সমভূমি অঞ্চলে গর্ত খুঁড়লে জলের প্রবল চাপে পাম্প ছাড়াই জল ফোয়ারার মতো বেরিয়ে আসে, একেই আর্টেজীয় কূপ বলে। এই জল এখানকার কৃষি ও পশুপালনে খুব সাহায্য করে।
নদী প্রণালী:
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মারে (Murray) এবং তার প্রধান উপনদী ডার্লিং (Darling) মিলে এই বিশাল অববাহিকা তৈরি করেছে। মারে নদী গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের মাউন্ট কসিয়াস্কো থেকে এবং ডার্লিং নদী উত্তরের নিউ ইংল্যান্ড রেঞ্জ থেকে উৎপন্ন হয়ে ওয়েন্টওয়ার্থ শহরের কাছে মারে নদীর সাথে মিলেছে। এরপর এরা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে এনকাউন্টার উপসাগরে পতিত হয়েছে। মুররুমবিজি (Murrumbidgee) হলো মারে নদীর আরেকটি বড়ো উপনদী।
জলবায়ু:
- মারে-ডার্লিং অববাহিকাটি দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্য অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ ও মনোরম প্রকৃতির।
- বৃষ্টিপাত: এই অঞ্চলটি গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে (Rain Shadow) অবস্থিত। তাই সমুদ্রের দিক থেকে আসা বায়ু পর্বতে বাধা পেয়ে পশ্চিম ঢালে (অববাহিকায়) বেশি বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে না। এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত মাঝারি থেকে কম (২৫-৭৫ সেমি)। গ্রীষ্মকাল উষ্ম এবং শীতকাল বেশ শীতল হয়।
মারে-ডার্লিং অববাহিকায় কৃষিকাজের উন্নতি:
বৃষ্টিপাত কম হওয়া সত্ত্বেও এটি অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কৃষিজ অঞ্চল। এর উন্নতির কারণগুলি হলো:
- উর্বর সমভূমি: মারে ও ডার্লিং নদীর পলি সঞ্চিত হয়ে এই অববাহিকার মাটি অত্যন্ত উর্বর হয়েছে, যা কৃষিকাজের জন্য দারুণ উপযোগী।
- উন্নত জলসেচ: বৃষ্টি কম হলেও, নদীর জলকে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে চাষের জমিতে কাজে লাগানো হয়। এছাড়া মাটির নীচের আর্টেজীয় কূপের জল সেচের কাজে অত্যন্ত সহায়ক।
- নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু: এখানকার মনোরম জলবায়ু গম (Wheat) চাষের জন্য আদর্শ। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে এখানে বিস্তীর্ণ জমিতে প্রচুর গম উৎপাদিত হয়।
- মিশ্র কৃষি ও ফলের বাগান: কৃষিজমির পাশাপাশি এখানে প্রচুর আপেল, আঙুর ও কমলালেবুর বাগান আছে। একই খামারে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষবাস ও পশুপালন (মিশ্র কৃষি) এখানকার কৃষিব্যবস্থাকে লাভজনক করেছে।
পশুপালনের উন্নতি:
মারে-ডার্লিং অববাহিকা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পশুপালন কেন্দ্র। এর কারণ হলো এখানকার ডাউনস (Downs) নামক নাতিশীতোষ্ণ তৃণভূমি। এই বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের প্রান্তর ভেড়া ও গবাদি পশু পালনের জন্য অত্যন্ত আদর্শ।
মেরিনো (Merino) ভেড়া:
ডাউনস তৃণভূমিতে প্রচুর পরিমাণে মেরিনো জাতের ভেড়া পালন করা হয়। এই ভেড়ার লোম বা উল (Wool) অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নরম এবং বিশ্ববিখ্যাত। উল এবং মাংস রপ্তানি করে অস্ট্রেলিয়া প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।
পশুখামার ও জ্যাকারু:
অস্ট্রেলিয়ায় পশুপালনের জন্য হাজার হাজার হেক্টর জমি জুড়ে বিশাল বিশাল খামার রয়েছে, যেগুলোকে 'শিপ স্টেশন' (Sheep Station) বলা হয়। এই খামারগুলোতে পশুদের যত্ন নেওয়া, উল কাটা ইত্যাদি কাজের জন্য দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়, যাদের স্থানীয় ভাষায় 'জ্যাকারু' (Jackaroos) বলা হয়।
মারে-ডার্লিং অববাহিকায় শিল্প:
এই অববাহিকা খনিজ সম্পদে খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। কেবল ব্রোকেন হিল-এ রুপো ও সিসা এবং কোবার-এ তামা পাওয়া যায়। তাই এখানে লোহা-ইস্পাতের মতো ভারী শিল্পের বিকাশ ঘটেনি।
তবে কৃষি ও পশুপালনে অত্যন্ত উন্নত হওয়ায়, কৃষি ও পশুজাত কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে এখানে শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে:
- পশম ও বস্ত্রবয়ন শিল্প: ডাউনস অঞ্চলের মেরিনো ভেড়ার উলকে কেন্দ্র করে উন্নত পশম শিল্প গড়ে উঠেছে।
- খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও ময়দা শিল্প: প্রচুর গম উৎপাদনের কারণে ময়দা শিল্প এবং বেকারি শিল্পের বিকাশ হয়েছে।
- ডেয়ারি ও মাংস শিল্প: গবাদি পশু থেকে প্রাপ্ত দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ, মাখন ও পনির তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে।
অ্যাডিলেড এবং মিলডুরা হলো এখানকার প্রধান শিল্পকেন্দ্র ও বাণিজ্য শহর।
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ:
অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে, প্রশান্ত মহাসাগরের (কোরাল সি) বুকে অবস্থিত পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রবাল প্রাচীর হলো গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। এটি প্রায় ২০০০ কিমি দীর্ঘ।
সৃষ্টির কারণ:
সমুদ্রে বসবাসকারী 'কোরাল' বা প্রবাল নামক এক প্রকার ক্ষুদ্র কিটের দেহাবশেষ বা চুনজাতীয় খোলস অগভীর সমুদ্রের তলদেশে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে স্তরে স্তরে জমা হয়ে এই বিশাল সামুদ্রিক প্রাচীরের সৃষ্টি করেছে।
গুরুত্ব:
- বাস্তুতন্ত্র: এটি সমুদ্রের এক বিশাল জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। এখানে হাজার হাজার প্রজাতির মাছ, কচ্ছপ এবং সামুদ্রিক প্রাণী বাস করে।
- পর্যটন শিল্প: এর অপূর্ব রঙিন সৌন্দর্য দেখতে সারা বিশ্ব থেকে প্রচুর মানুষ এখানে আসে (স্কুবা ডাইভিং), যা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে।
- প্রতিরক্ষা: এই প্রাচীর উপকূলকে সমুদ্রের প্রবল ঢেউ এবং সুনামির হাত থেকে অনেকাংশে রক্ষা করে।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবোরিজিন (Aborigines):
অস্ট্রেলিয়ার মূল আদিবাসীদের অ্যাবোরিজিন বলা হয়। ইউরোপীয়রা আসার আগে এরা প্রকৃতির কোলে সরল জীবনযাপন করত। এরা মূলত শিকারি এবং সংগ্রাহক ছিল। শিকার করার জন্য তারা বুমেরাং (Boomerang) নামক এক বিশেষ ধরনের বাঁকানো কাঠের অস্ত্র ব্যবহার করত, যা ছুড়লে আবার শিকারির কাছে ফিরে আসে। এদের নিজস্ব শিল্পকলা এবং সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রাচীন।
নিউজিল্যান্ডের মাওরি (Maori):
নিউজিল্যান্ডের আদিম অধিবাসীদের মাওরি বলা হয়। এরা মূলত পলিনেশিয়া থেকে নিউজিল্যান্ডে এসেছিল। এরা শারীরিকভাবে খুব শক্তিশালী এবং সাহসী যোদ্ধা ছিল। এদের নিজস্ব ভাষা, উল্কি (Tattoo) আঁকার ঐতিহ্য এবং বিশেষ যুদ্ধনৃত্য (Haka) বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বর্তমানে উভয় আদিবাসী সম্প্রদায়ই আধুনিক সভ্যতার সাথে মিলেমিশে বাস করছে।
ওশিয়ানিয়ার অনন্য জীবজন্তু:
ওশিয়ানিয়া মহাদেশ ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর অন্যান্য ভূখণ্ড থেকে বহুকাল ধরে বিচ্ছিন্ন থাকায় এখানকার প্রাণীজগত সম্পূর্ণ আলাদা ও বিচিত্র।
- মারসুপিয়াল (Marsupial): এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণী হলো ক্যাঙারু (Kangaroo) এবং ওয়ালাবি, যাদের পেটের নীচে থলি থাকে। অপরিণত বাচ্চারা এই থলিতে থেকেই বড়ো হয়।
- প্লাটিপাস (Platypus): হংসচঞ্চু বা প্লাটিপাস হলো এমন এক অদ্ভুত স্তন্যপায়ী, যার হাঁসের মতো ঠোঁট আছে, এরা ডিম পাড়ে, কিন্তু বাচ্চারা মায়ের দুধ খায়।
- কোয়ালা (Koala): দেখতে ছোটো ভাল্লুকের মতো এই প্রাণীগুলো ইউক্যালিপটাস গাছে বাস করে এবং ওই গাছের পাতাই খায়।
- পাখি: এখানকার এমু (Emu) একটি বিশাল আকারের পাখি, যা উড়তে পারে না কিন্তু উটের মতো জোরে দৌড়ায়। নিউজিল্যান্ডের কিউই (Kiwi) পাখির কোনো ডানা নেই। এছাড়াও কুকাবুরা পাখি অদ্ভুত মানুষের হাসির মতো শব্দ করে।
অসম জনসংখ্যার বন্টন:
গোটা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশটি বিশাল হলেও এর জনসংখ্যা মাত্র কয়েক কোটি এবং এই জনসংখ্যা মূলত উপকূলীয় অঞ্চলেই কেন্দ্রীভূত। ভেতরের অংশ প্রায় জনশূন্য।
দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বেশি মানুষ বাস করার কারণ:
অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব অংশে (মারে-ডার্লিং অববাহিকা ও পূর্ব উপকূলে) বাস করে। এর কারণগুলি হলো:
- মনোরম জলবায়ু: এই অঞ্চলটি নাতিশীতোষ্ণ হওয়ায় জলবায়ু মানুষের বসবাসের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক।
- জলের প্রাচুর্য: মারে-ডার্লিং নদী থাকায় এখানে পানীয় জল এবং সেচের জলের কোনো অভাব নেই।
- উর্বর সমভূমি ও কৃষি: পলিগঠিত উর্বর সমভূমিতে গম চাষ এবং ডাউনস অঞ্চলে প্রচুর মেষপালন হয়, যা মানুষের জীবনজীবিকার প্রধান উৎস।
- শিল্প ও কর্মসংস্থান: কৃষিজ সম্পদের ওপর ভিত্তি করে এখানে বহু শিল্প (দুগ্ধ, মাংস, পশম) গড়ে উঠেছে এবং সিডনি, মেলবোর্ন, অ্যাডিলেডের মতো বড়ো শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
বিপরীতদিকে, অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম ও মধ্যভাগ চরম রুক্ষ মরুভূমি হওয়ায় সেখানে জনবসতি বিরল।
মনে রেখো! (Key Points)
১) পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম মহাদেশ: ওশিয়ানিয়া (১০ হাজারেরও বেশি দ্বীপ)।
২) বিচিত্র প্রাণী: ক্যাঙারু, প্লাটিপাস (ডিম পাড়ে কিন্তু দুধ খাওয়ায়), এমু, কিউই (ডানাহীন)।
৩) মারে-ডার্লিং অববাহিকা: অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘতম নদী প্রণালী এবং প্রধান কৃষি ও পশুপালন কেন্দ্র (ডাউনস তৃণভূমি ও মেরিনো ভেড়া)।
৪) মারিয়ানা খাত: পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রখাত।