Chapter 3: শিলা (Rocks)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 22 SAQ | 8 Broad Questions
আগ্নেয় শিলা
পাললিক শিলা
রূপান্তরিত শিলা
শিলাচক্র
🌋
আগ্নেয় শিলা
ম্যাগমা/লাভা শীতল হলে সৃষ্ট | গ্রানাইট, ব্যাসল্ট
🪨
পাললিক শিলা
পলি জমাট বেঁধে সৃষ্ট | জীবাশ্ম থাকে
🔄
রূপান্তরিত শিলা
তাপ-চাপে পরিবর্তিত | মার্বেল, নিস
💎
খনিজ ভান্ডার
ছোটনাগপুর মালভূমি
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টি
1. পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্ট শিলার নাম কী?
ক) ক) পাললিক শিলা
খ) খ) রূপান্তরিত শিলা
গ) গ) আগ্নেয় শিলা
ঘ) ঘ) ক্যালসাইট
ব্যাখ্যা: পৃথিবী সৃষ্টির সময় উত্তপ্ত ও তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে ভূত্বকের মধ্যে ও ওপরে প্রথম যে কঠিন শিলার সৃষ্টি হয়, তা হল আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock)। পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হওয়ায় এর অপর নাম প্রাথমিক শিলা।
2. ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে কোন শিলা সৃষ্টি করে?
ক) ক) উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা
খ) খ) নিঃসারী আগ্নেয় শিলা
গ) গ) পাললিক শিলা
ঘ) ঘ) রূপান্তরিত শিলা
ব্যাখ্যা: ভূ-অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের কোনো দুর্বল ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে বেরিয়ে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে যে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে, তাকে নিঃসারী আগ্নেয় শিলা (Extrusive Igneous Rock) বলে। খুব দ্রুত জমাট বাঁধায় এর দানাগুলো খুব সূক্ষ্ম হয়। যেমন— ব্যাসল্ট, অবসিডিয়ান।
3. ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে কোন শিলা সৃষ্টি করে?
ক) ক) নিঃসারী আগ্নেয় শিলা
খ) খ) উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা
গ) গ) পাললিক শিলা
ঘ) ঘ) চুনাপাথর
ব্যাখ্যা: ভূ-অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা যখন ভূত্বকের দুর্বল ফাটল বা ছিদ্রের মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে না পেরে ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়, তখন উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা (Intrusive Igneous Rock) সৃষ্টি করে। যেমন— গ্রানাইট, ডোলেরাইট।
4. অতি ধীরে শীতল হয়ে ভূ-অভ্যন্তরের গভীরে সৃষ্ট আগ্নেয় শিলাকে কী বলে?
ক) ক) উপপাতালিক শিলা
খ) খ) পাতালিক শিলা
গ) গ) নিঃসারী শিলা
ঘ) ঘ) পাললিক শিলা
ব্যাখ্যা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের একেবারে গভীরে অতি ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বাঁধলে যে উদ্বেদী শিলা সৃষ্টি করে, তাকে পাতালিক শিলা (Plutonic Rock) বলে। অতি ধীরে শীতল হওয়ায় এর দানাগুলো বড়ো ও স্পষ্ট হয়। যেমন— গ্রানাইট।
5. ভূত্বকের ফাটল বা ছিদ্রপথে অপেক্ষাকৃত কম গভীরে সৃষ্ট উদ্বেদী শিলাকে কী বলে?
ক) ক) পাতালিক শিলা
খ) খ) উপপাতালিক শিলা
গ) গ) নিঃসারী শিলা
ঘ) ঘ) ব্যাসল্ট
ব্যাখ্যা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথে অপেক্ষাকৃত কম গভীরে ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে যে শিলা সৃষ্টি করে, তাকে উপপাতালিক শিলা (Hypabyssal Rock) বলে। যেমন— ডোলেরাইট।
6. গ্রানাইট কোন ধরনের আগ্নেয় শিলা?
ক) ক) নিঃসারী
খ) খ) উপপাতালিক
গ) গ) পাতালিক উদ্বেদী
ঘ) ঘ) পাললিক
ব্যাখ্যা: গ্রানাইট (Granite) হল পাতালিক উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা। এটি ভূ-অভ্যন্তরের গভীরে অতি ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি হয়, তাই এর দানাগুলো বড়ো (ব্যাস ১ মিমি-এর বেশি) ও স্পষ্ট হয়। গ্রানাইট কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার, মাইকা ও হর্নব্লেন্ড খনিজ দ্বারা গঠিত।
7. মহাদেশীয় ভূত্বক প্রধানত কোন শিলায় গঠিত?
ক) ক) ব্যাসল্ট
খ) খ) গ্রানাইট
গ) গ) চুনাপাথর
ঘ) ঘ) মার্বেল
ব্যাখ্যা: মহাদেশীয় ভূত্বক প্রধানত গ্রানাইট (Granite) শিলায় গঠিত। এটি হালকা সাদা, ধূসর থেকে গোলাপি রঙের, অত্যন্ত শক্ত ও ভারী। গ্রানাইটের ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব বেশি এবং এর ওপর গঠিত ভূমিরূপ সাধারণত গোলাকার হয়।
8. মহাসাগরীয় ভূত্বক প্রধানত কোন শিলায় গঠিত?
ক) ক) গ্রানাইট
খ) খ) ব্যাসল্ট
গ) গ) মার্বেল
ঘ) ঘ) বেলেপাথর
ব্যাখ্যা: মহাসাগরীয় ভূত্বক প্রধানত ব্যাসল্ট (Basalt) শিলায় গঠিত। এটি গাঢ় ধূসর থেকে কালো রঙের, অত্যন্ত ভারী ও শক্ত। খুব দ্রুত জমাট বাঁধায় এর দানাগুলো সূক্ষ্ম (ব্যাস ১ মিমি-এর কম)। ব্যাসল্ট অঞ্চলের ভূমিরূপ সাধারণত চ্যাপ্টা আকৃতির হয়।
9. কোন শিলায় জীবাশ্ম দেখা যায়?
ক) ক) আগ্নেয় শিলা
খ) খ) রূপান্তরিত শিলা
গ) গ) পাললিক শিলা
ঘ) ঘ) গ্রানাইট
ব্যাখ্যা: একমাত্র পাললিক শিলাতেই (Sedimentary Rock) জীবাশ্ম (Fossil) দেখা যায়। কারণ নদী, সমুদ্র বা হ্রদের তলায় পলি জমাট বাঁধার সময় উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ চাপা পড়ে এবং পাথরে পরিণত হয়। আগ্নেয় শিলার তীব্র তাপে জীবাশ্ম ধ্বংস হয়ে যায়।
10. কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার কোন শিলা?
ক) ক) আগ্নেয় শিলা
খ) খ) পাললিক শিলা
গ) গ) রূপান্তরিত শিলা
ঘ) ঘ) মার্বেল
ব্যাখ্যা: কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি জ্বালানি সম্পদের প্রধান ভান্ডার হল পাললিক শিলা। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সমুদ্র বা জলাভূমির তলদেশে জৈব পদার্থ চাপা পড়ে ও রূপান্তরিত হয়ে এই সম্পদগুলি সৃষ্টি হয়েছে।
11. পাললিক শিলা কীভাবে সৃষ্টি হয়?
ক) ক) ম্যাগমা ঠান্ডা হয়ে
খ) খ) তাপ ও চাপে
গ) গ) পলি সঞ্চিত ও জমাট বেঁধে
ঘ) ঘ) রাসায়নিক বিক্রিয়ায়
ব্যাখ্যা: নদী, হিমবাহ, বায়ু, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত ও পরিবাহিত হয়ে বালি, পলি, কাদা সমুদ্র বা নদীর তলদেশে বছরের পর বছর স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়। ওপরের স্তরের চাপে এই পলি জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে পাললিক শিলা (Sedimentary Rock) সৃষ্টি করে। যেমন— চুনাপাথর, বেলেপাথর, কাদাপাথর।
12. তীব্র তাপ, চাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত শিলাকে কী বলে?
ক) ক) আগ্নেয় শিলা
খ) খ) পাললিক শিলা
গ) গ) রূপান্তরিত শিলা
ঘ) ঘ) প্রাথমিক শিলা
ব্যাখ্যা: আগ্নেয় ও পাললিক উভয় ধরনের শিলা ভীষণ তাপ, চাপ অথবা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলায় (Metamorphic Rock) পরিণত হয়। যেমন— চুনাপাথর থেকে মার্বেল, কয়লা থেকে গ্রাফাইট, গ্রানাইট থেকে নিস।
13. চুনাপাথর রূপান্তরিত হয়ে কোন শিলায় পরিণত হয়?
ক) ক) নিস
খ) খ) স্লেট
গ) গ) মার্বেল
ঘ) ঘ) কোয়ার্টজাইট
ব্যাখ্যা: চুনাপাথর (পাললিক শিলা) তাপ ও চাপে রূপান্তরিত হয়ে মার্বেল (Marble)-এ পরিণত হয়। মার্বেল খুবই সুন্দর, মসৃণ ও চকচকে হয়। এর রং সাদা, সবুজ, ধূসর, হলুদ, নীল বিভিন্ন রকমের হতে পারে। স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে এর প্রচুর ব্যবহার।
14. গ্রানাইট রূপান্তরিত হয়ে কোন শিলা সৃষ্টি করে?
ক) ক) মার্বেল
খ) খ) নিস
গ) গ) স্লেট
ঘ) ঘ) কোয়ার্টজাইট
ব্যাখ্যা: গ্রানাইট রূপান্তরিত হয়ে নিস (Gneiss) শিলা সৃষ্টি করে। নিস খুব শক্ত ও ক্ষয় প্রতিরোধী। এতে অনেক সময় বলয়ের আকারে খনিজগুলো একসাথে থাকে, একে ব্যান্ডেড নিস বলে। রাস্তাঘাট ও নির্মাণ কাজে এই শিলার প্রচুর ব্যবহার হয়।
15. কাদাপাথর থেকে কোন রূপান্তরিত শিলা সৃষ্টি হয়?
ক) ক) মার্বেল
খ) খ) নিস
গ) গ) স্লেট
ঘ) ঘ) কোয়ার্টজাইট
ব্যাখ্যা: কাদাপাথর (Shale) নামক পাললিক শিলা রূপান্তরিত হয়ে স্লেট (Slate) সৃষ্টি করে। স্লেট খুব মসৃণ, নীলচে-ধূসর থেকে কালো রঙের হয়। পাতলা পাতলা আকারে সহজেই ভেঙে যায়, তাই এটি ঘরের ছাদ তৈরি ও ব্ল্যাকবোর্ড হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।
16. শিলাচক্র (Rock Cycle) কী?
ক) ক) শিলার ক্ষয়
খ) খ) শিলার এক প্রকার থেকে অন্য প্রকারে আবর্তন
গ) গ) শিলার পরিবহন
ঘ) ঘ) আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত
ব্যাখ্যা: প্রকৃতিতে শিলার উৎপত্তি ও এক শিলা থেকে অন্য শিলায় রূপান্তর একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে— এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি হল শিলাচক্র (Rock Cycle)। ম্যাগমা থেকে আগ্নেয় শিলা, ক্ষয়-সঞ্চয়ে পাললিক শিলা, তাপ-চাপে রূপান্তরিত শিলা এবং পুনরায় ম্যাগমায়— এভাবে চক্র চলতে থাকে।
17. গ্রানাইট শিলায় গঠিত ভূমিরূপ কেমন হয়?
ক) ক) চ্যাপ্টা
খ) খ) গোলাকার
গ) গ) খাড়া চালি
ঘ) ঘ) গুহা
ব্যাখ্যা: গ্রানাইট শিলায় গঠিত অঞ্চলের ভূমিরূপ সাধারণত গোলাকার (Rounded/Domed) হয়। ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে এরকম ছোটো ছোটো গোলাকার টিলা দেখা যায়। অন্যদিকে ব্যাসল্টে চ্যাপ্টা, চুনাপাথরে গুহা (কাস্ট ভূমিরূপ) এবং বেলেপাথরে খাড়া চালি দেখা যায়।
18. চুনাপাথর অঞ্চলের ভূমিরূপকে কী বলা হয়?
ক) ক) পাহাড়
খ) খ) কাস্ট ভূমিরূপ
গ) গ) মালভূমি
ঘ) ঘ) সমভূমি
ব্যাখ্যা: চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে নদী বা বৃষ্টির জল মাটির সাথে চুনাপাথর দ্রবীভূত করে ভূগর্ভে নানা আকৃতির গর্ত ও গুহা সৃষ্টি করে। এই ধরনের ভূমিরূপকে কাস্ট ভূমিরূপ (Karst Topography) বলে। গুহার ছাদ থেকে ঝুলতে থাকা পাথরকে স্ট্যালাকটাইট ও মেঝে থেকে ওপরে জমা পাথরকে স্ট্যালাগমাইট বলে।
19. স্ট্যালাকটাইট ও স্ট্যালাগমাইট কী?
ক) ক) আগ্নেয় শিলা
খ) খ) চুনাপাথরের গুহার গঠন
গ) গ) রূপান্তরিত শিলা
ঘ) ঘ) খনিজ পদার্থ
ব্যাখ্যা: চুনাপাথরের গুহার ছাদ থেকে ঝুলতে থাকা বরফের মতো চুনাপাথরের স্তম্ভকে স্ট্যালাকটাইট (Stalactite) বলে। আর গুহার মেঝে থেকে ওপরের দিকে জমা হওয়া চুনাপাথরের স্তম্ভকে স্ট্যালাগমাইট (Stalagmite) বলে। এরা পরস্পর যুক্ত হয়ে চুনাপাথরের স্তম্ভ তৈরি করে।
20. ভারতের খনিজ ভান্ডার কোন অঞ্চলকে বলা হয়?
ক) ক) দাক্ষিণাত্য মালভূমি
খ) খ) ছোটনাগপুর মালভূমি
গ) গ) হিমালয়
ঘ) ঘ) থর মরুভূমি
ব্যাখ্যা: ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বিভিন্ন খনিজ সম্পদ যেমন লোহা, তামা, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, ডোলোমাইট, মাইকা প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই একে 'ভারতের খনিজ ভান্ডার' (Mineral Treasury of India) বলা হয়।
21. শিলাচূর্ণ ও জৈবপদার্থের মিশ্রিত পাতলা আবরণকে কী বলে?
ক) ক) রেগোলিথ
খ) খ) মাটি
গ) গ) শিলা
ঘ) ঘ) খনিজ
ব্যাখ্যা: আদি শিলার ওপর শিলাচূর্ণ ও জৈবপদার্থের মিশ্রিত পাতলা আবরণ হল মাটি (Soil)। জীবকুলের আবাসস্থল এই মাটি। প্রাকৃতিক শক্তি যেমন নদী, বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহের দ্বারা শিলা ক্ষয় হয়ে সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণ (রেগোলিথ) তৈরি হয়, পরে এর সাথে জল, বায়ু, জৈবপদার্থ মিশে মাটির সৃষ্টি হয়।
22. ব্যাসল্ট শিলায় সাধারণত কোন ধরনের মাটি তৈরি হয়?
ক) ক) বেলেমাটি
খ) খ) লোহিত মৃত্তিকা
গ) গ) কৃষ্ণমৃত্তিকা
ঘ) ঘ) পলিমাটি
ব্যাখ্যা: সাধারণত ব্যাসল্ট শিলায় কৃষ্ণমৃত্তিকা (Black Soil) তৈরি হয়। এটি কার্পাস চাষের জন্য বিখ্যাত। গ্রানাইট শিলায় লোহিত মৃত্তিকা (Red Soil) এবং বেলেপাথরে বেলেমাটি (Sandy Soil) তৈরি হয়। মাটির চরিত্র অনেক ক্ষেত্রেই তার নীচের আদি শিলার ওপর নির্ভর করে।
23. কোয়ার্টজ, টোপাজ, ক্যালসাইট, হীরে— এদের মধ্যে কী ধরনের গঠন দেখা যায়?
ক) ক) আঁশ
খ) খ) কেলাস
গ) গ) স্তরীভবন
ঘ) ঘ) সূক্ষ্ম দানা
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন খনিজের সাথে দুষ্প্রাপ্য ভাবে জলের অণু সংযুক্ত হয়ে কেলাস (Crystal) গঠন করে, যা দেখতে স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল। কেলাসের গঠন চিনির দানা বা মিছরির টুকরোর মতো হয়। কোয়ার্টজ, টোপাজ, ক্যালসাইট, হীরে— এসব খনিজে কেলাসের গঠন ভালোভাবে দেখা যায়।
24. মার্বেল পাথর সম্পর্কে কোন তথ্যটি সঠিক নয়?
ক) ক) চুনাপাথরের রূপান্তরিত রূপ
খ) খ) দেখতে খুবই সুন্দর ও মসৃণ
গ) গ) অ্যাসিড সহনশীল
ঘ) ঘ) স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে ব্যবহৃত
ব্যাখ্যা: মার্বেল (Marble) অ্যাসিড সহনশীল নয়। অ্যাসিড যুক্ত দূষিত জল মার্বেলের সংস্পর্শে এলে মার্বেল দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই অ্যাসিড বৃষ্টির প্রবণতা থাকা অঞ্চলে মার্বেলের স্থাপত্য রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন। বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মার্বেল দিয়ে তৈরি।
25. চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে কী নির্মাণ করা উচিত নয়?
ক) ক) রাস্তাঘাট
খ) খ) বড় বাঁধ ও জলাধার
গ) গ) ছোটো বাড়ি
ঘ) ঘ) স্কুল
ব্যাখ্যা: চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে কোনো বড় বাঁধ, জলাধার বা বহুতল বাড়ি নির্মাণ করা উচিত নয়। কারণ নদী বা বৃষ্টির জলের সংস্পর্শে চুনাপাথর দ্রবীভূত হয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, ফলে নির্মাণ ভেঙে পড়তে পারে। এ ধরনের নির্মাণের জন্য আগ্নেয় শিলা অধ্যুষিত অঞ্চলই উপযুক্ত।
26. পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে চক্রাকারে আবর্তিত হওয়া শিলার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার নাম কী?
ক) ক) জলচক্র
খ) খ) শিলাচক্র
গ) গ) কার্বন চক্র
ঘ) ঘ) নাইট্রোজেন চক্র
ব্যাখ্যা: প্রকৃতিতে শিলার উৎপত্তি ও ধ্বংস, এক প্রকার থেকে অন্য প্রকারে রূপান্তর— সবই চক্রাকারে ঘটে। ম্যাগমা → আগ্নেয় শিলা → ক্ষয়প্রাপ্ত → পাললিক শিলা → তাপ-চাপে রূপান্তরিত শিলা → পুনরায় ম্যাগমায় গলে যাওয়া। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই শিলাচক্র (Rock Cycle) নামে পরিচিত।
27. অবসিডিয়ান কোন ধরনের আগ্নেয় শিলা?
ক) ক) উদ্বেদী
খ) খ) নিঃসারী
গ) গ) পাললিক
ঘ) ঘ) রূপান্তরিত
ব্যাখ্যা: অবসিডিয়ান (Obsidian) একটি নিঃসারী আগ্নেয় শিলা। এটি আসলে আগ্নেয় কাঁচ, যা লাভা অতি দ্রুত ঠান্ডা হয়ে কেলাস গঠনের সময় না পেয়ে কাঁচের মতো নিরেট, কালো ও চকচকে হয়ে জমাট বাঁধে।
28. আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য কোনটি?
ক) ক) জীবাশ্ম থাকে
খ) খ) স্তরে স্তরে সঞ্চিত
গ) গ) কেলাসের মতো গঠন ও অত্যন্ত কঠিন
ঘ) ঘ) সহজে ভাঙে
ব্যাখ্যা: আগ্নেয় শিলার প্রধান বৈশিষ্ট্য: শক্ত ও ভারী, ঘনত্ব খুব বেশি; কেলাসের মতো গঠন (Crystalline) দেখা যায়; উল্লম্ব দারণ (Joint) ও ফাটল (Crack) দেখা যায়; ভঙ্গুরতা কম হওয়ায় ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। জীবাশ্ম থাকে না, স্তরীভবনও সাধারণত দেখা যায় না (পাললিকের বৈশিষ্ট্য)।
29. আগ্নেয় শিলায় উল্লম্ব ফাটলকে কী বলা হয়?
ক) ক) স্তরীভবন
খ) খ) দারণ (Joint)
গ) গ) জীবাশ্ম
ঘ) ঘ) কেলাস
ব্যাখ্যা: আগ্নেয় শিলায় উল্লম্বভাবে সৃষ্ট ফাটল বা চিড়কে দারণ (Joint) বলে। অন্যদিকে পাললিক শিলায় আনুভূমিক ফাটল বা স্তরীভবন (Bedding Plane) দেখা যায়। ব্যাসল্ট শিলায় এই উল্লম্ব দারণ ও ফাটলের সংখ্যা খুব বেশি থাকে, তাই এর প্রবেশ্যতা (Permeability) যথেষ্ট বেশি।
30. জিপসাম কী ধরনের খনিজ?
ক) ক) ধাতব খনিজ
খ) খ) অধাতব খনিজ
গ) গ) জ্বালানি খনিজ
ঘ) ঘ) তেজস্ক্রিয় খনিজ
ব্যাখ্যা: জিপসাম (Gypsum) একটি অধাতব খনিজ। এর রাসায়নিক নাম ক্যালশিয়াম সালফেট (CaSO₄·2H₂O)। জিপসামযুক্ত ভূমি নরম ও হালকা হলুদ রঙের হয়। এটি সিমেন্ট, সার, প্লাস্টার অব প্যারিস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
22 টি
1. শিলা কাকে বলে? পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্ট শিলা কোনটি?
শিলা (Rock): পৃথিবীর ভূত্বক গঠনকারী কঠিন, স্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট খনিজ পদার্থের সমষ্টিকে শিলা বলে। এটি এক বা একাধিক খনিজের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে। পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্ট শিলা হল আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock)। পৃথিবী সৃষ্টির সময় উত্তপ্ত ও তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে ভূত্বকের ভেতরে ও ওপরে প্রথম কঠিন শিলার সৃষ্টি হয়, তাই আগ্নেয় শিলাকে প্রাথমিক শিলাও বলা হয়।
2. আগ্নেয় শিলা কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী?
আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock): ম্যাগমা বা লাভা শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে যে শিলার সৃষ্টি করে। উৎপত্তি অনুসারে আগ্নেয় শিলা দুই প্রকার: (১) নিঃসারী আগ্নেয় শিলা (Extrusive): ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে বেরিয়ে এসে দ্রুত শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি। দানা সূক্ষ্ম। যেমন— ব্যাসল্ট, অবসিডিয়ান। (২) উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা (Intrusive): ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি। দানা বড়ো। এটি দুই ধরনের— (ক) পাতালিক (Plutonic): খুব গভীরে অতি ধীরে সৃষ্ট, যেমন গ্রানাইট। (খ) উপপাতালিক (Hypabyssal): অপেক্ষাকৃত কম গভীরে সৃষ্ট, যেমন ডোলেরাইট।
3. নিঃসারী ও উদ্বেদী আগ্নেয় শিলার পার্থক্য লেখো।
নিঃসারী আগ্নেয় শিলা: ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে বেরিয়ে এসে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে সৃষ্টি করে। দানা খুব সূক্ষ্ম (ব্যাস ১ মিমি-এর কম) কারণ দ্রুত জমাট বাঁধে। উদাহরণ— ব্যাসল্ট, অবসিডিয়ান। উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে সৃষ্টি করে। দানা বড়ো ও স্পষ্ট (ব্যাস ১ মিমি-এর বেশি) কারণ ধীরে জমাট বাঁধে। এটি আবার পাতালিক (গ্রানাইট) ও উপপাতালিক (ডোলেরাইট) দুই ধরনের।
4. গ্রানাইট ও ব্যাসল্টের মধ্যে পার্থক্য কী?
গ্রানাইট: উদ্বেদী পাতালিক আগ্নেয় শিলা। মহাদেশীয় ভূত্বক গঠন করে। দানা বড়ো, রং সাদা-ধূসর-গোলাপি। খনিজ: কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার, মাইকা। অত্যন্ত শক্ত, ক্ষয় প্রতিরোধী। ভূমিরূপ গোলাকার। ব্যাসল্ট: নিঃসারী আগ্নেয় শিলা। মহাসাগরীয় ভূত্বক গঠন করে। দানা সূক্ষ্ম, রং গাঢ় ধূসর-কালো। খনিজ: কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার, পাইরক্সিন। অত্যন্ত ভারী, উল্লম্ব দারণ বেশি, প্রবেশ্যতা বেশি। ভূমিরূপ চ্যাপ্টা।
5. পাললিক শিলা কীভাবে সৃষ্টি হয়? এর বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
পাললিক শিলা (Sedimentary Rock) সৃষ্টি প্রক্রিয়া: নদী, বায়ু, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা আগ্নেয় বা অন্য শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত ও পরিবাহিত হয়ে বালি, পলি, কাদা রূপে সমুদ্র বা নদীর তলদেশে স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়। ওপরের স্তরের বিপুল চাপে এই পলি জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে পাললিক শিলা সৃষ্টি করে। বৈশিষ্ট্য: (১) স্তরীভবন (Stratification) ও কাদার চিড় খাওয়া দাগ দেখা যায়, (২) একমাত্র এই শিলাতেই জীবাশ্ম থাকে, (৩) ছিদ্রতা ও ভঙ্গুরতা বেশি, (৪) প্রবেশ্যতা খুব বেশি, (৫) কয়লা-খনিজ তেল-প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার, (৬) কঠিন্য আগ্নেয় শিলা থেকে কম। যেমন— চুনাপাথর, বেলেপাথর, কাদাপাথর।
6. রূপান্তরিত শিলা কী? উদাহরণসহ শ্রেণিবিভাগ করো।
রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rock): আগ্নেয় ও পাললিক উভয় ধরনের শিলা প্রবল তাপ, বিপুল চাপ অথবা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিলায় পরিণত হয়, তাকে রূপান্তরিত শিলা বলে। উদাহরণসহ: (১) চুনাপাথর (পাললিক) → মার্বেল, (২) কাদাপাথর (পাললিক) → স্লেট, (৩) বেলেপাথর (পাললিক) → কোয়ার্টজাইট, (৪) গ্রানাইট (আগ্নেয়) → নিস, (৫) কয়লা (পাললিক) → গ্রাফাইট।
7. শিলাচক্র (Rock Cycle) বলতে কী বোঝো? প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করো।
শিলাচক্র (Rock Cycle): প্রকৃতিতে শিলার উৎপত্তি, ধ্বংস ও এক প্রকার শিলা থেকে অন্য প্রকারে রূপান্তরের সম্পূর্ণ চক্রাকার প্রক্রিয়াকে শিলাচক্র বলে। প্রক্রিয়া: (১) ম্যাগমা শীতল হয়ে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে, (২) নদী-বায়ু-হিমবাহ দ্বারা আগ্নেয় শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত, পরিবাহিত ও সঞ্চিত হয়ে পাললিক শিলা গঠন করে, (৩) আগ্নেয় বা পাললিক শিলা তাপ, চাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় রূপান্তরিত শিলা সৃষ্টি করে, (৪) এই তিন ধরনের শিলা ভূআলোড়নে ভূগর্ভে প্রবেশ করলে ম্যাগমায় গলে যায় এবং পুনরায় আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি হয়। এই চক্র নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে।
8. মাটি কীভাবে সৃষ্টি হয়? মাটির চরিত্র কিসের ওপর নির্ভর করে?
মাটি (Soil) সৃষ্টি প্রক্রিয়া: নদী, বায়ু, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রতরঙ্গ, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা বহুদিন ধরে শিলা ও খনিজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণ (রেগোলিথ) তৈরি করে। এর সাথে জল, বায়ু, জৈবপদার্থ (হিউমাস) মিশে মাটির সৃষ্টি হয়। মাটির চরিত্র অনেক ক্ষেত্রেই তার নীচের আদি শিলার (Parent Rock) উপর নির্ভর করে। যেমন: ব্যাসল্ট শিলায় কৃষ্ণমৃত্তিকা, গ্রানাইট শিলায় লোহিত মৃত্তিকা, বেলেপাথরে বেলেমাটি তৈরি হয়। এছাড়া জলবায়ু, ভূমির ঢাল ও উদ্ভিদের প্রভাবেও মাটির চরিত্র ভিন্ন হয়।
9. মার্বেল শিলার বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার লেখো।
মার্বেল (Marble) হল চুনাপাথরের রূপান্তরিত রূপ। বৈশিষ্ট্য: (১) দেখতে খুবই সুন্দর, মসৃণ ও চকচকে, (২) সাদা, সবুজ, ধূসর, হলুদ, নীল— বিভিন্ন রঙের হয়, (৩) নির্দিষ্ট আকৃতিতে কেটে নেওয়া যায়, (৪) স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে প্রচুর ব্যবহার, যেমন— ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তাজমহল। সতর্কতা: অ্যাসিডযুক্ত দূষিত জল মার্বেলের সংস্পর্শে এলে মার্বেল দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তাই অ্যাসিড বৃষ্টির এলাকায় মার্বেলের স্থাপত্য সংরক্ষণ কঠিন।
10. স্লেট (Slate) কী? এর ব্যবহার কোথায় হয়?
স্লেট (Slate) হল কাদাপাথর (Shale) নামক পাললিক শিলার রূপান্তরিত রূপ। এটি খুব মসৃণ এবং নীলচে-ধূসর থেকে কালো রঙের হয়। পাতলা পাতলা আকারে সহজেই ভেঙে ফেলা যায়, এটি স্লেটির ক্লিভেজ নামক ধর্ম। এই ধর্মের জন্য স্লেট দিয়ে ঘরের ছাদ তৈরি করা হয়। এছাড়া স্কুল-কলেজের ব্ল্যাকবোর্ড (স্লেট বোর্ড) হিসেবেও স্লেট ব্যবহৃত হয়। প্রাচীনকালে লেখার কাজেও স্লেটের ব্যবহার ছিল। এটি তাপ ও তড়িৎ অপরিবাহী।
11. নিস (Gneiss) শিলা কী? এর বৈশিষ্ট্য কী?
নিস (Gneiss) হল গ্রানাইটের রূপান্তরিত রূপ। বৈশিষ্ট্য: (১) অত্যন্ত শক্ত ও ক্ষয় প্রতিরোধী শিলা, (২) এতে অনেক সময় বলয় বা ব্যান্ডের আকারে খনিজগুলো সজ্জিত থাকে— একে ব্যান্ডেড নিস বলে, (৩) খনিজ সংগ্রহের সুবিধা হয়। ব্যবহার: কঠিন ও টেকসই হওয়ায় রাস্তাঘাট নির্মাণ, বাড়ির ভিত্তি, দেওয়াল ও অন্যান্য নির্মাণ কাজে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়।
12. জীবাশ্ম (Fossil) কী? এটি কোন শিলায় পাওয়া যায়?
জীবাশ্ম (Fossil): প্রাচীনকালের উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ পলির সাথে চাপা পড়ে এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পাথরে পরিণত হয়ে যে ছাপ বা নিদর্শন রেখে যায়, তাকে জীবাশ্ম বলে। একমাত্র পাললিক শিলাতেই জীবাশ্ম দেখা যায়। কারণ আগ্নেয় শিলা তীব্র তাপে সৃষ্টি হয়, তাই সেখানে জীবাশ্ম ধ্বংস হয়ে যায়। রূপান্তরিত শিলায় তাপ ও চাপে জীবাশ্ম বিকৃত বা বিনষ্ট হয়। জীবাশ্ম থেকে প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক যুগ সম্পর্কে জানা যায়।
13. শিলার ওপর ভূমিরূপ কীভাবে নির্ভর করে? উদাহরণ দাও।
শিলার প্রকারভেদের ওপর ভূমিরূপ অনেকটাই নির্ভরশীল। উদাহরণ: (১) গ্রানাইট (আগ্নেয়) শিলায় গঠিত অঞ্চলের ভূমিরূপ সাধারণত গোলাকার হয়— যেমন ছোটনাগপুর মালভূমির টিলা। (২) ব্যাসল্ট (আগ্নেয়) শিলায় চ্যাপ্টা মাথা বিশিষ্ট টেবিলের মতো ভূমিরূপ দেখা যায়— যেমন দাক্ষিণাত্যের ডেকান ট্র্যাপ। (৩) চুনাপাথর (পাললিক) অঞ্চলে গুহা, স্ট্যালাকটাইট-স্ট্যালাগমাইট সহ কাস্ট ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়— যেমন চেরাপুঞ্জি-মৌলিনরাম অঞ্চল। (৪) বেলেপাথর (পাললিক) অঞ্চলে খাড়া চালি (Escarpment) দেখা যায়।
14. কাস্ট ভূমিরূপ (Karst Topography) কী? স্ট্যালাকটাইট ও স্ট্যালাগমাইট কাকে বলে?
কাস্ট ভূমিরূপ: চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে নদী বা বৃষ্টির জল মাটির সাথে মিশে অ্যাসিডিক হয়ে চুনাপাথরকে দ্রবীভূত করে ভূগর্ভে ছোটোবড়ো নানা গর্ত, গুহা ও ভূগর্ভস্থ নদীপথ সৃষ্টি করে। এই ধরনের ভূমিরূপকে কাস্ট ভূমিরূপ বলে। স্ট্যালাকটাইট: গুহার ছাদ থেকে বরফের মতো ঝুলতে থাকা চুনাপাথরের স্তম্ভ। স্ট্যালাগমাইট: গুহার মেঝেতে ওপরের দিকে জমা হওয়া চুনাপাথরের স্তম্ভ। এরা পরস্পর যুক্ত হয়ে চুনাপাথরের স্তম্ভ তৈরি করে।
15. ছোটনাগপুর মালভূমিকে 'ভারতের খনিজ ভান্ডার' বলা হয় কেন?
ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদ যেমন— লোহা, তামা, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, ডোলোমাইট, মাইকা, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। খনিজ প্রাচুর্যের জন্যই এই অঞ্চলকে 'ভারতের খনিজ ভান্ডার' (Mineral Treasury of India) বলা হয়। ছোটনাগপুর মালভূমির মানুষের প্রধান জীবিকা হলো খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং খনি-ভিত্তিক শিল্প। এছাড়া দাক্ষিণাত্য মালভূমিও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
16. খনিজ কীভাবে ভূমিরূপ ও মাটির ওপর প্রভাব ফেলে?
খনিজের প্রভাবে ভূমিরূপ ও মাটির চরিত্রে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়: (১) লোহা বা বক্সাইট যুক্ত ভূমি শক্ত ও লাল রঙের হয়, (২) জিপসামযুক্ত ভূমি নরম ও হালকা হলুদ রঙের, (৩) ক্যালসাইট সমৃদ্ধ অঞ্চলে চুনাপাথর ও কাস্ট ভূমিরূপ গঠিত হয়— যা যথেষ্ট ক্ষয়প্রবণ, (৪) খনিজ তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস অঞ্চল নরম ও ছিদ্রযুক্ত পাললিক শিলায় গঠিত, (৫) অতিরিক্ত খনিজযুক্ত মাটির (ল্যাটেরাইট, লাল মাটি) উর্বরতা কম— তাই চাষাবাদ ভালো হয় না।
17. আগ্নেয় শিলার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী?
আগ্নেয় শিলার প্রধান পাঁচটি বৈশিষ্ট্য: (১) অত্যন্ত শক্ত ও ভারী, ঘনত্ব খুব বেশি, (২) কেলাসের মতো গঠন (Crystalline) দেখা যায়— খনিজ কণাগুলো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্যাসে সজ্জিত, (৩) উল্লম্ব দারণ (Joint) ও ফাটল (Crack) দেখা যায়— তাই প্রবেশ্যতা বেশি, বিশেষত ব্যাসল্টে, (৪) ভঙ্গুরতা যথেষ্ট কম হওয়ায় ক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি, (৫) কোনো প্রকার স্তরীভবন বা জীবাশ্ম থাকে না।
18. পাললিক শিলায় স্তরীভবন কেন দেখা যায়? জীবাশ্মই বা কেন থাকে?
পাললিক শিলা সৃষ্টির সময় বছরের পর বছর ধরে পলি, বালি, কাদা সমুদ্র বা নদীর তলায় স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়। প্রতিটি স্তর আলাদা সময়ে ও আলাদা পুরুত্বে জমা হয়, ফলে শিলায় স্পষ্ট স্তরীভবন (Stratification) দেখা যায়। জীবাশ্ম: পলি জমার সময় নদী বা সমুদ্রের জলাভূমিতে বসবাসকারী উদ্ভিদ ও প্রাণী পলির সাথে চাপা পড়ে এবং অক্সিজেনের অভাবে পচন বন্ধ হয়ে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পাথরে রূপান্তরিত হয়ে জীবাশ্ম (Fossil) গঠন করে। তাই একমাত্র পাললিক শিলাতেই জীবাশ্ম পাওয়া যায়।
19. চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে বড় অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয় কেন?
চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে কোনো বড় বাঁধ, জলাধার, বহুতল বাড়ি বা অতিরিক্ত রাস্তাঘাট নির্মাণ করা উচিত নয়, কারণ: (১) নদী বা বৃষ্টির জল (যা সামান্য অ্যাসিডিক) চুনাপাথরকে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দ্রবীভূত করে ফেলে, (২) চুনাপাথর দ্রবীভূত হয়ে ভূগর্ভে গর্ত ও গুহা সৃষ্টি হয়, ফলে ভূপৃষ্ঠ বসে যেতে পারে বা ধস নামতে পারে, (৩) ভিত নরম হয়ে নির্মাণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের নির্মাণের জন্য আগ্নেয় শিলা (গ্রানাইট, ব্যাসল্ট) অধ্যুষিত অঞ্চলই নিরাপদ, কারণ তা জলেও দ্রবীভূত হয় না।
20. কেলাস (Crystal) কীভাবে গঠিত হয়? উদাহরণ দাও।
বিভিন্ন খনিজের সাথে দুষ্প্রাপ্যভাবে জলের অণু সংযুক্ত হয়ে কেলাস (Crystal) গঠন করে, যা দেখতে স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল। সাধারণভাবে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টির সময় তার মধ্যে খনিজের সাথে জল থেকে যায়, যা শিলার মধ্যে শিরার মতো অবস্থান করে। শিলা ঠান্ডা হলে সেই শিরার আকারে থাকা খনিজ-জল বাষ্পীভূত হয় এবং নির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্যাসে কেলাস গঠিত হয়। কেলাসের গঠন চিনির দানা বা মিছরির টুকরোর মতো দেখতে। উদাহরণ: কোয়ার্টজ, টোপাজ, ক্যালসাইট, হীরে প্রভৃতি খনিজে কেলাস গঠন ভালোভাবে দেখা যায়।
21. রেগোলিথ (Regolith) কী? মাটির সাথে এর সম্পর্ক কী?
রেগোলিথ (Regolith): নদী, বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা শিলা বহুদিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণ তৈরি করে, তাকে রেগোলিথ বলে। এটি মাটি সৃষ্টির প্রথম ধাপ। মাটির সাথে সম্পর্ক: রেগোলিথের সাথে জল, বায়ু ও জৈবপদার্থ (হিউমাস) মিশে ধীরে ধীরে মাটি (Soil) সৃষ্টি হয়। সুতরাং রেগোলিথ হল মাটির প্রাথমিক কাঁচামাল বা মাতৃপদার্থ।
22. ভারতের খনিজ ভান্ডার নামে পরিচিত অঞ্চলটির নাম কী? সেখানে কী কী খনিজ পাওয়া যায়?
ভারতের 'খনিজ ভান্ডার' (Mineral Treasury of India) নামে পরিচিত অঞ্চলটি হল ছোটনাগপুর মালভূমি। এই অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রধান খনিজগুলি: লৌহ আকরিক (লোহা), তামা, বক্সাইট (অ্যালুমিনিয়ামের আকরিক), ম্যাঙ্গানিজ, ডোলোমাইট, মাইকা (অভ্র), চুনাপাথর এবং কয়লা। এছাড়া দামোদর উপত্যকায় প্রচুর কয়লা পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা খনিজ উত্তোলন ও খনিভিত্তিক শিল্প (যেমন লৌহ-ইস্পাত কারখানা)। দাক্ষিণাত্য মালভূমিও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ আরেকটি অঞ্চল।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
8 টি
1. আগ্নেয় শিলা কাকে বলে? উৎপত্তি অনুসারে আগ্নেয় শিলার শ্রেণিবিভাগ করো এবং প্রত্যেক প্রকারের বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণ দাও। গ্রানাইট ও ব্যাসল্টের তুলনামূলক আলোচনা করো।
আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock)
ম্যাগমা বা লাভা শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে যে শিলা সৃষ্টি করে, তাকে আগ্নেয় শিলা বলে। পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হওয়ায় একে প্রাথমিক শিলা-ও বলা হয়।
উৎপত্তি অনুসারে শ্রেণিবিভাগ:
- নিঃসারী আগ্নেয় শিলা (Extrusive): ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে এসে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে সৃষ্টি। দানা সূক্ষ্ম (১ মিমি-র কম)। যেমন— ব্যাসল্ট, অবসিডিয়ান।
- উদ্বেদী আগ্নেয় শিলা (Intrusive): ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে শীতল হয়ে সৃষ্টি। দানা বড়ো।
- পাতালিক (Plutonic): খুব গভীরে অতি ধীরে সৃষ্ট, দানা সবচেয়ে বড়ো। যেমন— গ্রানাইট।
- উপপাতালিক (Hypabyssal): কম গভীরে ফাটল বা ছিদ্রপথে সৃষ্ট। যেমন— ডোলেরাইট।
গ্রানাইট বনাম ব্যাসল্ট:
| বৈশিষ্ট্য | গ্রানাইট | ব্যাসল্ট |
| শ্রেণি | উদ্বেদী (পাতালিক) | নিঃসারী |
| অবস্থান | মহাদেশীয় ভূত্বক | মহাসাগরীয় ভূত্বক |
| দানা | বড়ো ও মোটা (১ মিমি-র বেশি) | সূক্ষ্ম (১ মিমি-র কম) |
| রং | হালকা সাদা, ধূসর, গোলাপি | গাঢ় ধূসর থেকে কালো |
| খনিজ | কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার, মাইকা | কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার, পাইরক্সিন |
| ভূমিরূপ | গোলাকার টিলা | চ্যাপ্টা (ডেকান ট্র্যাপ) |
| প্রবেশ্যতা | কম (অশুভেদ্য) | বেশি (উল্লম্ব ফাটল) |
2. পাললিক শিলা কাকে বলে? পাললিক শিলার সৃষ্টি প্রক্রিয়া, বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণসহ বিস্তারিত বর্ণনা দাও। জীবাশ্ম বলতে কী বোঝো?
পাললিক শিলা (Sedimentary Rock)
প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তি (নদী, বায়ু, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ) দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত ও পরিবাহিত শিলাচূর্ণ, বালি, পলি, কাদা কোনো সমুদ্র, হ্রদ বা নদীর তলদেশে বছরের পর বছর স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় এবং ওপরের চাপে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যে শিলা সৃষ্টি করে, তাকে পাললিক শিলা বলে। 'পলি' থেকে পাললিক নামটি এসেছে।
বৈশিষ্ট্য:
- স্তরীভবন: বিভিন্ন সময়ে পলি জমার ফলে ভিন্ন ভিন্ন স্তর (Strata) স্পষ্ট দেখা যায়।
- জীবাশ্ম: একমাত্র এই শিলাতেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ (Fossil) সংরক্ষিত থাকে।
- প্রবেশ্যতা ও ছিদ্রতা: কণাগুলোর মধ্যে ফাঁক থাকায় জল ও তরল সহজে প্রবেশ করতে পারে।
- জ্বালানি ভান্ডার: কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উৎস।
- কঠিন্য: আগ্নেয় শিলার চেয়ে কম, ভঙ্গুরতা বেশি।
- দারণ (Joint) বা কেলাসের গঠন থাকে না, তবে কাদার চিড় (Mud crack) দেখা যায়।
উদাহরণ:
চুনাপাথর (Limestone), বেলেপাথর (Sandstone), কাদাপাথর (Shale), কংগ্লোমারেট।
জীবাশ্ম (Fossil):
প্রাচীনকালে নদী বা সমুদ্রের তলদেশে পলি জমার সময় জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ পলির নীচে চাপা পড়ে। লক্ষ লক্ষ বছর অক্সিজেনের অভাবে পচন বন্ধ থেকে সেই দেহাবশেষ পাথরে রূপান্তরিত হয়। এই পাথুরে ছাপকেই জীবাশ্ম বলে। এটি থেকে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণ ও পরিবেশের তথ্য পাওয়া যায়।
3. রূপান্তরিত শিলা কী? বিভিন্ন পাললিক ও আগ্নেয় শিলা কী কী রূপান্তরিত শিলায় পরিণত হয় তা উদাহরণসহ আলোচনা করো। মার্বেল ও স্লেটের ব্যবহার উল্লেখ করো।
রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rock)
আগ্নেয় ও পাললিক উভয় ধরনের শিলা তীব্র তাপ, বিপুল চাপ অথবা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিলায় পরিণত হয়, তাকে রূপান্তরিত শিলা বলে। এই পরিবর্তনে খনিজ পুনর্বিন্যস্ত হয়, দানাদারি ও ঘনত্ব বাড়ে।
| মূল শিলা | মূল শিলার প্রকার | রূপান্তরিত শিলা |
| চুনাপাথর | পাললিক | মার্বেল |
| কাদাপাথর | পাললিক | স্লেট |
| বেলেপাথর | পাললিক | কোয়ার্টজাইট |
| গ্রানাইট | আগ্নেয় | নিস |
| কয়লা | পাললিক | গ্রাফাইট |
মার্বেলের ব্যবহার:
ভীষণ সুন্দর, মসৃণ ও চকচকে হওয়ায় স্থাপত্যে (ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তাজমহল) এবং ভাস্কর্যে ব্যবহৃত হয়। তবে অ্যাসিড বৃষ্টিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
স্লেটের ব্যবহার:
পাতলা স্তরে সহজে ভাঙা যায় বলে ঘরের ছাদ (স্লেটি ছাদ) তৈরি এবং স্কুল-কলেজের ব্ল্যাকবোর্ডে ব্যবহৃত হয়।
4. শিলাচক্র (Rock Cycle) কী? চিত্রসহ শিলাচক্রের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বর্ণনা করো। প্রকৃতিতে এটি কীভাবে চলতে থাকে?
শিলাচক্র (Rock Cycle)
প্রকৃতিতে শিলার উৎপত্তি, ক্ষয়, ধ্বংস এবং এক প্রকার শিলা থেকে অন্য প্রকারে রূপান্তরের যে আবর্তনশীল চক্রাকার প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে, তাকে শিলাচক্র বলে।
চক্রের ধাপসমূহ:
- ম্যাগমা → আগ্নেয় শিলা: ভূগর্ভস্থ গলিত ম্যাগমা শীতল ও কঠিন হয়ে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে।
- ক্ষয়, পরিবহন ও সঞ্চয় → পাললিক শিলা: নদী, বায়ু, হিমবাহ আগ্নেয় বা রূপান্তরিত শিলাকে ক্ষয় করে, পলি সমুদ্র বা হ্রদের তলায় জমা হয়ে চাপে জমাট বেঁধে পাললিক শিলা তৈরি করে।
- তাপ, চাপ ও রাসায়নিক বিক্রিয়া → রূপান্তরিত শিলা: আগ্নেয় বা পাললিক শিলা ভূগর্ভের তীব্র তাপ, বিপুল চাপ বা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলায় পরিণত হয়।
- গলন → পুনরায় ম্যাগমা: রূপান্তরিত, পাললিক বা আগ্নেয় শিলা ভূআলোড়নে গভীরে গিয়ে প্রচণ্ড তাপে গলে পুনরায় ম্যাগমায় ফিরে যায় এবং আবার আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে।
এই চক্র নিরন্তর চলতে থাকে। এই চক্রের মাধ্যমেই খনিজ সম্পদের পুনর্বণ্টন ও ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়।
5. শিলা কীভাবে মাটিতে পরিণত হয়? মাটির চরিত্র কীভাবে আদি শিলা ও খনিজের ওপর নির্ভর করে? তিন ধরনের মাটির উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো।
শিলা থেকে মাটি সৃষ্টি
নদী, বায়ু, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রতরঙ্গ, হিমবাহ ইত্যাদি প্রাকৃতিক শক্তি বহুদিন ধরে শিলা ও খনিজকে ক্ষয় করে। প্রথমে সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণ (রেগোলিথ) তৈরি হয়। এরপর রেগোলিথের সাথে জল, বায়ু ও জৈবপদার্থ (হিউমাস) মিশে ধীরে ধীরে মাটি (Soil) গঠিত হয়।
আদি শিলা ও খনিজের প্রভাব:
- ব্যাসল্ট → কৃষ্ণমৃত্তিকা (Black Soil): দাক্ষিণাত্য মালভূমির ব্যাসল্ট শিলা থেকে কালো রঙের, আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম ও কার্পাস চাষের জন্য বিখ্যাত কৃষ্ণমৃত্তিকা সৃষ্টি হয়েছে।
- গ্রানাইট → লোহিত মৃত্তিকা (Red Soil): গ্রানাইট ও নিস শিলা থেকে লৌহ অক্সাইডের প্রভাবে লাল রঙের মাটি সৃষ্টি হয়। ছোটনাগপুর ও কর্ণাটক মালভূমিতে এটি দেখা যায়।
- বেলেপাথর → বেলেমাটি (Sandy Soil): বেলেপাথর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বালুকণাময়, হালকা ও কম উর্বর বেলেমাটি তৈরি করে। জল ধারণ ক্ষমতা কম।
- ল্যাটেরাইট মাটি: উচ্চ লৌহ ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডযুক্ত ল্যাটেরাইট মাটি অতিরিক্ত খনিজসমৃদ্ধ হওয়ায় অনুর্বর হয়।
এছাড়া জলবায়ু, ভূমির ঢাল, গাছপালা ও সময়ও মাটির চরিত্র নির্ধারণ করে।
6. ভূমিরূপ গঠনে শিলার ভূমিকা আলোচনা করো। গ্রানাইট, ব্যাসল্ট, চুনাপাথর ও বেলেপাথর কী ধরনের ভূমিরূপ গঠন করে?
শিলা ও ভূমিরূপ
কোনো অঞ্চলের ভূমিরূপ কেমন হবে, তা মূলত সেই অঞ্চলের শিলার ধরন ও বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।
| শিলা | ভূমিরূপ | উদাহরণ | কারণ |
| গ্রানাইট | গোলাকার, ডোম আকৃতির টিলা | ছোটনাগপুর মালভূমি, রাঁচি, নেতারহাট | অতি কঠিন, ক্ষয় প্রতিরোধী; স্তরীভবন নেই বলে গোলাকারে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। |
| ব্যাসল্ট | চ্যাপ্টা টেবিল-সদৃশ পাহাড় (ডেকান ট্র্যাপ) | মহারাষ্ট্রের পঞ্চগিনি, মহাবালেশ্বর | লাভা স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে চ্যাপ্টা ভূমিরূপ গঠন করে। উল্লম্ব ফাটল থাকায় খাড়া ঢাল। |
| চুনাপাথর | কাস্ট ভূমিরূপ — গুহা, স্ট্যালাকটাইট-স্ট্যালাগমাইট, ভূগর্ভস্থ নদী | মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি-মৌলিনরাম | চুনাপাথর জলে দ্রবীভূত হয়, ফলে ভূগর্ভে গুহা ও গলিপথ তৈরি হয়। |
| বেলেপাথর | খাড়া ঢাল, চালি, স্তম্ভাকৃতি টিলা | রাজস্থানের থর মরুভূমি, মধ্য ভারতে বিন্ধ্য পর্বত | স্তরীভবনযুক্ত এবং বিভিন্ন কঠিন্যের স্তর থাকায় খাড়া ঢাল (Escarpment) গড়ে ওঠে। |
ভূমিরূপ শিলার গঠনেরই বহিঃপ্রকাশ। কোনো অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি বুঝতে হলে সেই অঞ্চলের শিলা চেনা অপরিহার্য।
7. খনিজ কী? খনিজের সাথে শিলার সম্পর্ক কী? ভারতের প্রেক্ষাপটে খনিজ সম্পদের বণ্টন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আলোচনা করো।
খনিজ (Mineral)
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংযুক্তি ও ভৌত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অজৈব কঠিন পদার্থকে খনিজ বলে। শিলা হল এক বা একাধিক খনিজের সমষ্টি। খনিজই শিলার গঠন একক।
ভারতে খনিজ বণ্টন:
- ছোটনাগপুর মালভূমি (খনিজ ভান্ডার): লোহা, তামা, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, ডোলোমাইট, মাইকা, কয়লা। এখানকার প্রধান জীবিকা খনি ও খনি-শিল্প।
- দাক্ষিণাত্য মালভূমি: লোহা, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, অভ্র, সোনা (কোলার স্বর্ণখনি)।
- উপকূলীয় অঞ্চল: খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস (মুম্বাই হাই, কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিন), মোনাজাইট বালি (কেরালা)।
- রাজস্থান ও গুজরাট: জিপসাম, মার্বেল, বেলেপাথর, তামা।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
খনিজ সম্পদ ভারতের শিল্প উন্নয়নের মূল চালিকা। লোহা-ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট, সার, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প খনিজের ওপর নির্ভরশীল। খনিজ রপ্তানি (লৌহ আকরিক, মাইকা) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান খনি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে। খনিজ উত্তোলনে মাত্রাতিরিক্ততার কারণে পরিবেশগত সমস্যাও (অরণ্য বিনাশ, ভূমিক্ষয়) প্রকট।
8. শিলা চেনার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করো। বাড়ি ও আশপাশ থেকে শিলা সংগ্রহ করে তার বৈশিষ্ট্য কীভাবে নির্ণয় করবে?
শিলা চেনার প্রয়োজনীয়তা
শিলা চেনা মানে পৃথিবীর ইতিহাস, ভূমিরূপ ও খনিজ সম্পদের হদিশ পাওয়া। নির্মাণ কাজ, কৃষি, খনিজ অনুসন্ধান ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি নির্ণয়ে শিলার ধরন জানা জরুরি।
শিলা চেনার সহজ পদ্ধতি (ক্ষেত্র সমীক্ষা):
- দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ: শিলার রং, দানা (মোটা/সূক্ষ্ম), চকচকে ভাব, মসৃণতা, আকৃতি (গোলাকার/চ্যাপ্টা/কৌণিক) খালি চোখে বা আতস কাঁচ দিয়ে দেখতে হবে।
- কঠিন্য পরীক্ষা: নখ দিয়ে আঁচড় কাটা যায় কিনা, পয়সা বা ছুরি দিয়ে দাগ কাটা যায় কিনা দেখে কঠিন্য অনুমান।
- ভারীত্ব: হাতে নিয়ে ওজন বোঝা— গ্রানাইট ভারী, চুনাপাথর তুলনায় হালকা।
- ভাঙন পরীক্ষা: সহজে ভাঙে কি না, ভাঙলে কেমন আকৃতি হয় (পাতলা স্তর/অনিয়মিত)।
- জল পরীক্ষা: জলে ডুবিয়ে বুদবুদ তোলে কিনা (ছিদ্রতা পরীক্ষা)। চুনাপাথরে অ্যাসিড ফেললে ফেনা ওঠে (রাসায়নিক পরীক্ষা)।
- আঁচড় পরীক্ষা: অমসৃণ পৃষ্ঠে ঘষে গুঁড়োর রং (Streak) পর্যবেক্ষণ।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সারণি তৈরি করে (রং, দানা, কঠিন্য, চকচকে ভাব, দাগ কাটা যায় কিনা, ভাঙন, ভারী/হালকা) শিলা চিহ্নিত করতে হবে।
মনে রেখো!
আগ্নেয় শিলা = ম্যাগমা/লাভা ঠান্ডা হয়ে সৃষ্ট (গ্রানাইট-উদ্বেদী, ব্যাসল্ট-নিঃসারী)। পাললিক শিলা = স্তরে স্তরে পলি জমে সৃষ্ট, শুধু এতেই জীবাশ্ম পাওয়া যায়। রূপান্তরিত শিলা = তাপ-চাপে পরিবর্তিত (চুনাপাথর→মার্বেল, গ্রানাইট→নিস, কাদাপাথর→স্লেট)। শিলাচক্র = এক শিলা থেকে অন্য শিলায় আবর্তন। ছোটনাগপুর = ভারতের খনিজ ভান্ডার।
PDF ডাউনলোড
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।
PDF ডাউনলোড