Chapter 6: জলবায়ু অঞ্চল (Climate Regions)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 22 SAQ | 7 Broad Questions
নিরক্ষীয় জলবায়ু
4 O'clock Rain, সেলভা অরণ্য
মৌসুমি জলবায়ু
ঋতু বৈচিত্র্য, কৃষিকাজে সমৃদ্ধ
ভূমধ্যসাগরীয়
শীতকালীন বৃষ্টি, ফলের ঝুড়ি
তুন্দ্রা জলবায়ু
ইগলু, নিশীথ সূর্য, সুমেরু প্রভা
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
22 টিকোনো একটি বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ুর প্রধান উপাদানগুলি— মূলত উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি সমধর্মী হলে, তাকে একটি জলবায়ু অঞ্চল বলা হয়।
বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে মৃত্তিকা, স্বাভাবিক উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্য, এমনকি মানুষের জীবনযাত্রায় তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। দুটি জলবায়ু অঞ্চলের মাঝে সাধারণত একটি পরিবর্তনশীল অঞ্চল (Transitional Zone) থাকে।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে, ফলে প্রচণ্ড উত্তাপে স্থলভাগের তুলনায় জলভাগ থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প বাতাসে মেশে।
এই উয় ও আর্দ্র বাতাস উর্ধ্বাকাশে উঠে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে প্রায় প্রতিদিন বিকেল ৩-৪ টের সময় কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে পরিচলন প্রক্রিয়ায় প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত ঘটায়। বিকেলের দিকে নির্দিষ্ট সময়ে এই বৃষ্টি হয় বলে একে 4 O'clock rain বা বিকেল ৪টের বৃষ্টি বলা হয়।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর গড় উষ্ণতা বেশি (২৭° সে.) থাকে এবং সারাবছরই দিন ও রাতের পরিমাণ প্রায় সমান (১২ ঘণ্টা) হয়।
তবে, সূর্যাস্তের পর রাত্রিবেলা আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে যাওয়ায় প্রচুর তাপ বিকিরণ ঘটে এবং তাপমাত্রা কিছুটা কমে গিয়ে প্রায় ২৫° সে. এ নেমে আসে, যা দিনের তুলনায় বেশ মনোরম। এই কারণেই নিরক্ষীয় অঞ্চলে রাত্রিকে ক্রান্তীয় শীতকাল (Winters of tropics) বলা হয়।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছরই অত্যধিক উষ্ণতা ও প্রচুর বৃষ্টিপাত (২০০-২৫০ সেমি) হয়। এই উয়-আর্দ্র জলবায়ু উদ্ভিদের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল।
সারাবছর পর্যাপ্ত জল ও তাপ পাওয়ায় এখানকার অরণ্যের গাছেদের কোনো নির্দিষ্ট পাতা ঝরার ঋতু থাকে না। সারাবছরই গাছে সবুজ পাতা থাকে, ফুল ফোটে এবং ফল ধরে। তাই এই অরণ্যকে চিরসবুজ অরণ্য (Evergreen forest) বলা হয়।
সেলভা (Selva) হলো দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের আমাজন নদী অববাহিকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম নিরক্ষীয় চিরসবুজ বৃষ্টি অরণ্য।
এই অরণ্যে রবার, রোজউড, ব্রাজিল নাট, আয়রন উড ইত্যাদি গাছ অত্যন্ত ঘন ও দুর্ভেদ্যভাবে জন্মায়। এখানকার জীববৈচিত্র্যও সর্বাধিক।
নিরক্ষীয় অরণ্যে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ অত্যন্ত কাছাকাছি এবং ঠাসাঠাসিভাবে জন্মায়। গাছেদের কাণ্ড দীর্ঘ ও পাতা চওড়া হয়।
সূর্যের আলো পাওয়ার প্রতিযোগিতায় গাছগুলো খুব উঁচু হয় এবং তাদের ওপরের ডালপালাগুলো পরস্পর মিলে গিয়ে একটি বিস্তীর্ণ আচ্ছাদন বা ছাতার মতো আকার ধারণ করে। অরণ্যের এই উপরিভাগকেই চাঁদোয়া বা Canopy বলা হয়। এর ফলে অরণ্যের তলদেশে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আরবসাগর ও বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে প্রচুর জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে।
এই বায়ু প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ করে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং আকস্মিক ও প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত শুরু হয়। দীর্ঘ শুষ্ক গ্রীষ্মকালের পর হঠাৎ এই প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হওয়াকেই মৌসুমি বায়ুর বিস্ফোরণ (Burst of Monsoon) বলা হয়।
মৌসুমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের তারতম্য অনুসারে তিন ধরনের উদ্ভিদ দেখা যায়:
| বৃষ্টিপাতের পরিমাণ | উদ্ভিদের প্রকৃতি | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বেশি বৃষ্টিপাত (>২০০ সেমি) | চিরসবুজ বনভূমি | মেহগনি, শিশু, গর্জন |
| মাঝারি বৃষ্টিপাত (১০০-২০০ সেমি) | পর্ণমোচী বা পাতাঝরা বনভূমি | শাল, সেগুন, শিমুল, শিরিষ, আম |
| অল্প বৃষ্টিপাত (৫০-১০০ সেমি) | কাঁটাগাছ ও ঝোপঝাড় | বাবলা, ফণীমনসা, ক্যাকটাস |
*এছাড়া উপকূল অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ (সুন্দরী, গরান) জন্মায়।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রধান কারণ হলো বায়ুচাপ বলয়ের স্থান পরিবর্তন।
গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলে উচ্চচাপ বলয় থাকলেও, শীতকালে সূর্যের দক্ষিণায়নের ফলে উচ্চচাপ বলয়টি দক্ষিণ দিকে সরে যায়। ফলে এই অঞ্চলটি পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে আসে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হওয়ার কারণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টিপাত (২৫-১৫০ সেমি) হয়।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মনোরম, রোদঝলমলে আবহাওয়া এবং শীতকালীন বৃষ্টিপাত ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে মূল্যবান ফল, যেমন— আঙুর, জলপাই (Olive), আপেল, ন্যাসপাতি, কমলালেবু, পিচ, আখরোট, বাদাম এবং বিভিন্ন প্রজাতির লেবু উৎপাদিত হয়। বিশ্বব্যাপী ফলের বিপুল জোগানের জন্যই এই অঞ্চলকে 'ফলের ঝুড়ি' বলা হয়।
| বৈশিষ্ট্য | মৌসুমি জলবায়ু | ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু |
|---|---|---|
| বৃষ্টিপাতের সময় | প্রধানত গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয়। শীতকাল শুষ্ক থাকে। | প্রধানত শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়। গ্রীষ্মকাল শুষ্ক থাকে। |
| প্রভাবকারী বায়ু | এটি মৌসুমি বায়ু দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়। | শীতকালে পশ্চিমা বায়ু এবং গ্রীষ্মে আয়ন বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। |
সুমেরু এবং কুমেরুবৃত্ত অঞ্চলে অবস্থিত তীব্র শীতপ্রধান অঞ্চল বছরের অধিকাংশ সময় (৮-৯ মাস) পুরু বরফে ঢাকা থাকে।
গ্রীষ্মকালে বরফ গলে গেলে এই অঞ্চলে 'তুন্দ্রা' নামক এক বিশেষ ধরনের শৈবাল (Moss, Lichen) জন্মায়। এই শৈবালের নাম অনুসারেই এই অঞ্চলের জলবায়ুর নাম রাখা হয়েছে তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চল।
তুন্দ্রা অঞ্চলে দীর্ঘ শীতকালে (৮-৯ মাস) আকাশে সূর্যকে প্রায় দেখাই যায় না। এই একটানা অন্ধকার রাতে মাঝে মাঝে ২-৩ ঘণ্টার জন্য আকাশে রামধনুর মতো এক অপূর্ব সুন্দর রঙিন আলোর ছটা দেখা যায়।
এই প্রাকৃতিক আলোকচ্ছটাকে উত্তর গোলার্ধে সুমেরু প্রভা (Aurora Borealis) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে কুমেরু প্রভা (Aurora Australis) বলা হয়। চৌম্বকীয় কণার সাথে বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে এটি সৃষ্টি হয়।
নরওয়ের উত্তরে অবস্থিত হ্যামারফেস্ট বন্দরকে (৭০°৩০' উঃ) 'নিশীথ সূর্যের দেশ' বলা হয়।
কারণ: গ্রীষ্মকালে এই তুন্দ্রা অঞ্চলে একটানা আলো থাকে। পৃথিবীর মেরু অক্ষের হেলানো অবস্থানের কারণে স্থানীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাতেও (নিশীথ রাতে) এই অঞ্চলের আকাশে সূর্যকে দিগন্ত রেখার কাছে দেখা যায়। তাই একে নিশীথ সূর্যের দেশ বলে।
| বাসস্থান | বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার |
|---|---|
| ইগলু (Igloo) | তীব্র শীতে এস্কিমোরা বরফের চাই দিয়ে একরকম গোলাকার গম্বুজ আকৃতির ঘর তৈরি করে বাস করে, একে ইগলু বলে। এর ভেতরে পশুর চামড়া বিছানো থাকে। |
| টিউপিক (Tupik) | গ্রীষ্মকালে বরফ গলে গেলে এস্কিমোরা সিল মাছের চামড়া ও হাড় দিয়ে তৈরি একধরনের অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করে, একে টিউপিক বলা হয়। |
তুন্দ্রা অঞ্চলের অধিবাসীরা যাতায়াত ও শিকারের জন্য বিশেষ যান ব্যবহার করে:
কায়াক (Kayak): সিল মাছ বা তিমি শিকারের জন্য এবং সমুদ্রে যাতায়াতের উদ্দেশ্যে সিল মাছের চামড়া ও হাড় দিয়ে তৈরি সরু নৌকাই হলো কায়াক।
স্লেজ (Sledge): বরফের ওপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য এস্কিমোরা চাকাহীন একপ্রকার গাড়ি ব্যবহার করে, যাকে কুকুর বা বলগা হরিণ (ক্যারিবু) দিয়ে টানানো হয়, এটিই হলো স্লেজ।
ভারখয়ানস্ক (Verkhoyansk) এশিয়ার সাইবেরিয়ায় তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত একটি স্থান।
এর প্রধান বিশেষত্ব হলো— এটি উত্তর গোলার্ধের অন্যতম শীতলতম স্থান। জানুয়ারি মাসে এখানকার গড় তাপমাত্রা থাকে -৫০.৬° সেন্টিগ্রেড। এখানে শীতের তীব্রতা এত বেশি যে সবকিছু জমে শক্ত হয়ে যায়।
ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায় বৃষ্টি অরণ্য বিনাশের প্রধান কারণগুলি হলো:
১) পশুচারণ ভূমি তৈরি: প্রায় ৬৫-৭০% বনভূমি কেটে গবাদি পশুর চারণক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে।
২) স্থায়ী ও বাণিজ্যিক কৃষি: ২০-২৫% এলাকায় সয়াবিন ও অন্যান্য ফসলের কৃষিকাজ হচ্ছে।
৩) কাঠশিল্প ও নগরায়ন: মূল্যবান কাঠের জন্য গাছ কাটা, খনিজ উত্তোলন এবং ট্রান্স-আমাজন হাইওয়ে নির্মাণের ফলে ২-৩% বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শুষ্ক গ্রীষ্মকাল থাকায় বাষ্পীভবন আটকানোর জন্য উদ্ভিদের বিশেষ অভিযোজন দেখা যায়:
১) গাছগুলোর পাতা বেশ পুরু এবং কাণ্ড শক্ত হয়।
২) গাছের ছাল বা বাকল খুব পুরু হয় যা শীতকালের বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে রাখে।
৩) উদ্ভিদের মূল মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে। ওক, কর্ক, জলপাই, পাইন, ল্যাভেন্ডার হলো এখানকার প্রধান উদ্ভিদ।
দুর্গম তুন্দ্রা অঞ্চলেও বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে:
১) স্পিটসবার্গেনে কয়লা, সুইডেনে লোহা, আলাস্কায় খনিজ তেলের সন্ধান মেলায় শিল্প গড়ে উঠছে।
২) সাইবেরিয়ার মারমানস্ক বন্দর থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত রেলপথ নির্মিত হয়েছে।
৩) স্নো-মোবাইল ও মোটরচালিত নৌকার ব্যবহার বেড়েছে। বরফমুক্ত অঞ্চলে গ্রিনহাউস প্রযুক্তিতে চাষবাস শুরু হয়েছে।
মূলত দুটি চরমভাবাপন্ন জলবায়ু অঞ্চলে লোকবসতি অত্যন্ত বিরল:
১) নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল: অত্যধিক উয়-আর্দ্র অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু, দুর্গম জঙ্গল এবং বিষাক্ত কীটপতঙ্গ ও রোগের (ম্যালেরিয়া) প্রাদুর্ভাবের কারণে।
২) তুন্দ্রা জলবায়ু অঞ্চল: তীব্র হিমশীতল পরিবেশ, কৃষি অযোগ্য বরফাবৃত ভূমি এবং চরম প্রতিকূল জীবনযাত্রার কারণে।
মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও উর্বর মাটি থাকায় কৃষিকাজ অত্যন্ত উন্নত।
এই অঞ্চলের প্রধান কৃষিজ ফসলগুলি হলো— ধান, পাট, গম, আখ, তুলা, তৈলবীজ, চা, কফি এবং রবার। ভারত ও বাংলাদেশ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধান ও পাট উৎপাদক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
7 টিঅবস্থান:
নিরক্ষরেখার উভয় পাশে সাধারণত ৫° থেকে ১০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে এই জলবায়ু দেখা যায়। প্রধান অঞ্চল: আফ্রিকার কঙ্গো (জাইরে) অববাহিকা, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকা এবং এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ।
জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য:
- উষ্ণতা: সারাবছর সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ায় বার্ষিক গড় উষ্ণতা ২৭° সে.। তবে রাতে উষ্ণতা কমে ২৫° সে. হয় বলে একে 'ক্রান্তীয় শীতকাল' বলে। বার্ষিক উষ্ণতার প্রসর খুবই কম (২°-৩° সে.)। সারাবছর দিন-রাতের দৈর্ঘ্য সমান থাকে।
- বৃষ্টিপাত: উর্ধ্বগামী আর্দ্র বাতাস শীতল ও ঘনীভূত হয়ে পরিচলন প্রক্রিয়ায় প্রায় প্রতিদিন বিকেলে প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত ঘটায়, একে '4 O'clock rain' বলে। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২০০-২৫০ সেমি।
স্বাভাবিক উদ্ভিদ:
উষ্ণতা ও আর্দ্রতা বেশি থাকায় এখানে চিরসবুজ অরণ্য (Evergreen Forest) সৃষ্টি হয়েছে। আমাজন অববাহিকায় এটি 'সেলভা' নামে পরিচিত। এই অরণ্যের গাছগুলো দীর্ঘ, শক্ত ও পাতা চওড়া হয়। গাছগুলি এত ঠাসাঠাসিভাবে থাকে যে ওপরে চাঁদোয়া (Canopy) তৈরি হয়, ফলে অরণ্যের তলদেশ থাকে অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে। মেহগনি, রবার, রোজউড, আবলুস, পাম এই অরণ্যের প্রধান বৃক্ষ।
জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য (ঋতু বৈচিত্র্য):
মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে প্রধানত চারটি ঋতু দেখা যায়:
- শীতকাল (নভেম্বর-জানুয়ারি): গড় তাপমাত্রা ২৫° সে. থাকে। উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে, তবে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার জন্য উত্তর-পশ্চিম ভারতে তুষারপাত হয়।
- প্রাক্-মৌসুমি গ্রীষ্মকাল (মার্চ-মে): গড় তাপমাত্রা ৩০°-৩৮° সে. এর ওপরে চলে যায়। এই সময় নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।
- বর্ষাকাল (জুন-সেপ্টেম্বর): দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আকস্মিক বৃষ্টিপাত ঘটায় যাকে 'মৌসুমি বায়ুর বিস্ফোরণ' (Burst of Monsoon) বলে। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২০০-৩০০ সেমি হয়।
- শরৎকাল (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর): মৌসুমি বায়ু ফিরে যাওয়ার সময় বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের ফলে ঘূর্ণিঝড় ও বৃষ্টিপাত হয়।
কৃষিকাজ ও শিল্প:
- কৃষিকাজ: অনুকূল জলবায়ু ও উর্বর পলিমাটির জন্য এই অঞ্চল কৃষিকাজে খুব উন্নত। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধান, পাট, গম, আখ, তুলা, চা উৎপাদক অঞ্চল হলো মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল।
- খনিজ ও শিল্প: কয়লা, লোহা, খনিজ তেল প্রচুর পাওয়া যায়। পাট শিল্প, কার্পাস বয়ন শিল্প, লোহা-ইস্পাত শিল্প এবং চা শিল্প এই অঞ্চলের প্রধান বড়ো শিল্প।
ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- মৃদুভাবাপন্ন জলবায়ু: গ্রীষ্মকালে গড় উষ্ণতা ২১°-২৭° সে. এবং শীতকালে ৫°-১০° সে. থাকে। অর্থাৎ খুব বেশি গরম বা খুব বেশি শীত থাকে না।
- শুষ্ক গ্রীষ্মকাল: গ্রীষ্মকালে উচ্চচাপ বলয় থাকায় শুষ্ক আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়, যার ফলে আকাশে মেঘ থাকে না এবং বৃষ্টিপাত হয় না।
- শীতকালীন বৃষ্টিপাত: শীতকালে সূর্যের দক্ষিণায়নের ফলে এই অঞ্চল পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব বলয়ে চলে আসে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এখানে শীতকালে মাঝারি বৃষ্টিপাত (২৫-১৫০ সেমি) হয়। তাই একে 'শীতকালীন বৃষ্টিপাতের দেশ' বলা হয়।
অর্থনৈতিক পরিবেশ:
এই অঞ্চল খনিজ সম্পদে তেমন সমৃদ্ধ না হলেও, কৃষিকাজ এবং শিল্পের কারণে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত।
- ফলের চাষ: মনোরম আবহাওয়ার কারণে এখানে আঙুর, জলপাই, আপেল, কমলালেবু, পিচ ইত্যাদি ফলের বিপুল চাষ হয়। তাই এই অঞ্চলকে 'ফলের ঝুড়ি' বলা হয়।
- শিল্প: ফলের প্রাচুর্যের কারণে এখানে ফলভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠেছে। ইতালি ও ফ্রান্সে আঙুর থেকে উৎকৃষ্ট ওয়াইন এবং জলপাই থেকে অলিভ অয়েল তৈরি হয়। জ্যাম, জেলি তৈরির শিল্পও বিখ্যাত। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউডে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠেছে।
অবস্থান:
সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্তের নিকটবর্তী অঞ্চলে তুন্দ্রা জলবায়ু দেখা যায়। উত্তর আমেরিকার কানাডার উত্তরাংশ, আলাস্কা, গ্রিনল্যান্ড এবং ইউরেশিয়ার উত্তরাংশ (সাইবেরিয়া, নরওয়ে, সুইডেন) এই জলবায়ুর অন্তর্গত।
জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য:
- দীর্ঘ হিমশীতল শীতকাল: বছরের ৮-৯ মাস শীতকাল থাকে। তাপমাত্রা -২০° থেকে -৪০° সে. পর্যন্ত নেমে যায়। সাইবেরিয়ার ভারখয়ানস্কে জানুয়ারি মাসে তাপমাত্রা থাকে -৫০.৬° সে.। প্রায় অন্ধকারে থাকা এই অঞ্চলে মাঝে মাঝে রামধনুর মতো 'সুমেরু প্রভা' দেখা যায়।
- স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মকাল: মাত্র ২-৩ মাসের জন্য গ্রীষ্মকাল আসে, তখন তাপমাত্রা প্রায় ১০° সে. হয়। এই সময় আকাশে সূর্য দীর্ঘক্ষণ থাকলেও তির্যক রশ্মির কারণে বেশি তাপ পাওয়া যায় না।
- বৃষ্টিপাত: এই অঞ্চলে মূলত তুষারপাত হয়, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম (২০-৩০ সেমি)।
প্রাণিজগৎ:
তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য এখানকার প্রাণীদের গায়ে ঘন লোম এবং চামড়ার নীচে পুরু চর্বির স্তর থাকে। মেরু ভাল্লুক, মেরু শিয়াল, সিল, তিমি, সিন্ধুঘোটক (Walrus) এবং বলগা হরিণ (Caribou) এখানকার প্রধান প্রাণী।
পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা:
তুন্দ্রা অঞ্চলের চরম হিমশীতল এবং প্রতিকূল জলবায়ু আদিবাসীদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রিনল্যান্ড ও কানাডায় এস্কিমো, সাইবেরিয়ায় স্যামোয়েদ এবং ল্যাপল্যান্ডে ল্যাপ্ উপজাতির মানুষ বাস করে।
- যাযাবর জীবন ও খাদ্যাভ্যাস: তীব্র শীতে মাটি বরফে ঢাকা থাকায় কোনো কৃষিকাজ হয় না। তাই খাদ্যের সন্ধানে এরা যাযাবর জীবনযাপন করে। সিল, মেরু ভাল্লুক, বলগা হরিণ শিকার করে এবং সমুদ্রের মাছ ধরে তারা কাঁচা মাংস ও হরিণের দুধ খায়।
- পোশাক ও শিকারের অস্ত্র: ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে তারা পশুর চামড়ার তৈরি পোশাক পরে। শিকারের জন্য তারা পশুর হাড় দিয়ে তৈরি বর্শা বা 'হারপুন' ব্যবহার করে। যাতায়াতের জন্য 'স্লেজ' গাড়ি এবং সমুদ্রে 'কায়াক' নৌকা ব্যবহার করে।
বাসস্থান:
- ইগলু (Igloo): শীতকালে প্রচণ্ড তুষারঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে তারা বরফের চাই কেটে গোলাকার গম্বুজ আকৃতির ঘর বানায়, একে ইগলু বলে।
- টিউপিক (Tupik): গ্রীষ্মকালে বরফ গলে গেলে তারা সিল মাছের চামড়া দিয়ে তৈরি অস্থায়ী তাঁবুতে বাস করে, একে টিউপিক বলা হয়।
নিরক্ষীয় বনাম মৌসুমি জলবায়ু
| পার্থক্যের বিষয় | নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চল | মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল |
|---|---|---|
| অবস্থান | ৫°-১০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ বরাবর অবস্থিত। | ১০°-৩০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মহাদেশের পূর্বে অবস্থিত। |
| উষ্ণতা ও ঋতু | সারাবছরই উষ্ণতা বেশি থাকে (২৭° সে.)। কোনো ঋতু পরিবর্তন হয় না। | গ্রীষ্মকাল উষ্ণ ও শীতকাল শীতল হয়। এখানে মূলত চারটি ঋতু পরিলক্ষিত হয়। |
| বৃষ্টিপাতের প্রকৃতি | সারাবছর ধরে পরিচলন প্রক্রিয়ায় (4 O'clock rain) বৃষ্টিপাত হয় (২০০-২৫০ সেমি)। | প্রধানত গ্রীষ্মকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আকস্মিক ও প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। শীতকাল শুষ্ক থাকে। |
| স্বাভাবিক উদ্ভিদ | সারাবছর বৃষ্টির জন্য ঘন ও দুর্ভেদ্য চিরসবুজ অরণ্য (সেলভা) গড়ে উঠেছে। | বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে প্রধানত পর্ণমোচী বা পাতাঝরা অরণ্য গড়ে উঠেছে। |
| জনবসতি | অস্বাস্থ্যকর জলবায়ুর কারণে এই অঞ্চল অত্যন্ত জনবিরল। | কৃষিকাজ ও অনুকূল জলবায়ুর জন্য এটি পৃথিবীর সর্বাধিক জনবহুল অঞ্চল। |
আমাজন অরণ্য বিনাশের কারণ:
পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকার বৃষ্টি অরণ্য (সেলভা) মানুষের অবিবেচক কার্যাবলির জন্য দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে:
- পশুচারণ ভূমি (৬৫-৭০%): মাংস রপ্তানির উদ্দেশ্যে গবাদি পশু পালনের জন্য বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল পুড়িয়ে তৃণভূমি বা পশুখামার তৈরি করা হচ্ছে।
- কৃষিকাজ (২০-২৫%): ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে এবং বাণিজ্যিক কৃষির (সয়াবিন চাষ) জন্য বিপুল বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে।
- নগরায়ন ও পরিবহন: ১৯৭০ সালে ট্রান্স-আমাজন হাইওয়ে নির্মাণের ফলে এই দুর্গম অরণ্যে মানুষের প্রবেশ সহজ হয়েছে। বসতি স্থাপন, শিল্প ও রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য প্রতিদিন গাছ কাটা হচ্ছে।
- কাষ্ঠশিল্প: মেহগনি, রোজউড এর মতো মূল্যবান কাঠের লোভে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে।
অরণ্য বিনাশের প্রভাব:
এর ফলে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং বহু বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যা পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশের অবক্ষয় ত্বরান্বিত করছে।
মনে রেখো! (Key Points)
১) নিরক্ষীয়: সারাবছর অত্যধিক বৃষ্টি, চিরসবুজ গাছ, চাঁদোয়া বা Canopy তৈরি হয়।
২) মৌসুমি: গ্রীষ্মকাল বৃষ্টিবহুল এবং শীতকাল শুষ্ক। এটি পৃথিবীর সর্বাধিক জনবহুল অঞ্চল।
৩) ভূমধ্যসাগরীয়: গ্রীষ্মকাল শুষ্ক এবং শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়। ফলের চাষ বিখ্যাত।
৪) তুন্দ্রা: তীব্র শীত, বরফে ঢাকা। এস্কিমোরা শীতকালে ইগলু এবং গ্রীষ্মে টিউপিক এ বাস করে।