বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান (রাজশেখর বসু)

রাজশেখর বসু রচিত 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধের সম্পূর্ণ আলোচনা, সারাংশ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত রাজশেখর বসু রচিত 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধের লাইনভিত্তিক সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, সারাংশ, এবং পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ, Broad ও ব্যাকরণ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. প্রবন্ধের বিষয়সংক্ষেপ

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রবন্ধটি রাজশেখর বসুর লেখা একটি মূল্যবান বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধে লেখক বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার সমস্যা, তার কারণ এবং সমাধানের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

প্রবন্ধের শুরুতে লেখক বিজ্ঞান পাঠকদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। প্রথম শ্রেণি হলো যারা ইংরেজি জানে না বা অল্প জানে, তাদের জন্য মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শেখা সহজ। দ্বিতীয় শ্রেণি হলো যারা ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়েছে, তাদের বাংলা পরিভাষা শিখতে কিছুটা বাধা বা পূর্ব সংস্কার কাজ করে। লেখক জানিয়েছেন যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রধান বাধা হলো উপযুক্ত ও প্রামাণিক পারিভাষিক শব্দের অভাব। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে পরিভাষা সমিতি তৈরি করেছিল, তাদের সমবেত চেষ্টায় এই সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও তা যথেষ্ট নয়।

এছাড়াও, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাথমিক বিজ্ঞান জ্ঞানের অভাবের জন্য বাংলায় জনপ্রিয় বিজ্ঞান (Popular Science) লেখা কঠিন হয়ে পড়ে। লেখক বৈজ্ঞানিক রচনায় ভাষার আড়ষ্টতা এবং আক্ষরিক অনুবাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, পরিভাষা বাদ দিয়ে সাধারণ ভাষায় লিখলে রচনা সহজ হয় না, বরং পরিভাষা ব্যবহার করলে ভাষার সংক্ষেপ ও অর্থ সুনির্দিষ্ট হয়। লেখকের মতে, বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের ভাষা হতে হবে অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট, সেখানে কাব্যের মতো আলংকারিক ভাষা (লক্ষণা বা ব্যঞ্জনা) বর্জনীয়। সবশেষে লেখক সাময়িক পত্রপত্রিকায় অবিখ্যাত লেখকদের ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশের সমালোচনা করেছেন এবং তা প্রকাশের আগে অভিজ্ঞ লোক দিয়ে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

২. লেখক পরিচিতি

রাজশেখর বসু (১৮৮০-১৯৬০): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক, রসরচয়িতা এবং অভিধানকার রাজশেখর বসু নদিয়া জেলার বীরনগরে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি 'পরশুরাম' ছদ্মনামে রসরচনার জন্য চিরস্মরণীয়। 'গড্ডলিকা', 'কজ্জলী', 'হনুমানের স্বপ্ন' প্রভৃতি তাঁর অনন্য রসরচনা। তাঁর লেখা প্রবন্ধগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে: 'লঘুগুরু', 'বিচিন্তা', 'ভারতের খনিজ', 'কুটির শিল্প' ইত্যাদি। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি 'চলন্তিকা' নামক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। তিনি 'বাল্মীকি রামায়ণ', 'মহাভারত', 'মেঘদূত', 'হিতোপদেশের গল্প' বাংলায় অনুবাদ করেন। সাহিত্যকীর্তির জন্য তিনি 'রবীন্দ্র পুরস্কার', 'অকাদেমি পুরস্কার' এবং 'পদ্মভূষণ' উপাধিতে ভূষিত হন। কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে 'ডক্টরেট' উপাধি প্রদান করে।

৩. প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

যাদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থ বা প্রবন্ধ লেখা হয় তাদের মোটামুটি দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে।
ব্যাখ্যা: প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার আলোচনা শুরু করেছেন পাঠকদের শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে। তিনি বিজ্ঞান পাঠকদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন—প্রথমত, যারা ইংরেজি জানে না বা খুব কম জানে (যেমন অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে বা অল্পশিক্ষিত বয়স্করা); এবং দ্বিতীয়ত, যারা ইংরেজি জানে এবং ইংরেজিতেই প্রাথমিক বিজ্ঞান পড়েছে। এই দুই শ্রেণির পাঠকের বিজ্ঞান গ্রহণের ক্ষমতা ও পদ্ধতি ভিন্ন।
এই শ্রেণির পাঠক ইংরেজি ভাষার প্রভাব থেকে মুক্ত, সেজন্য বাংলা পরিভাষা আয়ত্ত করে বাংলায় বিজ্ঞান শেখা তাদের সংস্কারের বিরোধী নয়।
ব্যাখ্যা: প্রথম শ্রেণির পাঠক, যারা ইংরেজি জানে না, তাদের মনে ইংরেজি শব্দের কোনো প্রভাব বা অভ্যাস (সংস্কার) থাকে না। তাই তারা যখন বাংলা ভাষায় নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক শব্দ বা পরিভাষা শেখে, তখন তাদের মনে কোনো দ্বন্দ্ব বা বাধা সৃষ্টি হয় না। তারা সহজেই মাতৃভাষায় বিজ্ঞান গ্রহণ করতে পারে।
যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত।
ব্যাখ্যা: 'ইজার' হলো এক ধরনের ঢিলেঢালা পাজামা বা ট্রাউজার্স। প্রাবন্ধিক এখানে একটি চমৎকার উপমা ব্যবহার করেছেন। যে মানুষ সারা জীবন প্যান্ট বা ইজার পরে অভ্যস্ত, তাকে হঠাৎ ধুতি পরতে দিলে সে অস্বস্তি বোধ করবে। ঠিক তেমনি, দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক যারা সারা জীবন ইংরেজিতে বিজ্ঞান (যেমন Geometry) পড়েছে, তাদের কাছে হঠাৎ করে বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষা (যেমন সমবাহু ত্রিভুজ) কঠিন, শ্রুতিকটু এবং বুঝতে অসুবিধাজনক মনে হয়। এটি তাদের পূর্ব সংস্কারের বা অভ্যাসের বাধা।
তাঁদের উদ্যোগের এই ত্রুটি ছিল যে তাঁরা একযোগে কাজ না করে স্বতন্ত্রভাবে করেছিলেন, তার ফলে সংকলিত পরিভাষার সাম্য হয়নি...
ব্যাখ্যা: অনেক বছর আগে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কয়েকজন লেখক বিজ্ঞান বিষয়ক পরিভাষা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের প্রধান ভুল ছিল যে, তাঁরা সবাই মিলে একসঙ্গে আলোচনা করে কাজ করেননি। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করার ফলে একই ইংরেজি বৈজ্ঞানিক শব্দের জন্য বিভিন্ন জন বিভিন্ন বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করেছিলেন। এর ফলে পরিভাষায় কোনো সমতা বা সাম্য ছিল না, যা পাঠকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত।
১৯৩৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে পরিভাষাসমিতি নিযুক্ত করেছিলেন তাতে বিভিন্ন বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্বজ্ঞ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং কয়েকজন লেখক একযোগে কাজ করেছিলেন...
ব্যাখ্যা: পরিভাষা প্রণয়নের সঠিক পদ্ধতিটি লেখক এখানে তুলে ধরেছেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে পরিভাষা সমিতি তৈরি করে, তাতে বিজ্ঞান, ভাষা এবং সাহিত্যের সব দিকের বিশেষজ্ঞদের একসাথে যুক্ত করা হয়েছিল। তাঁরা সবাই মিলে একযোগে আলোচনা করে পরিভাষা তৈরি করায় সেই চেষ্টা আগের তুলনায় অনেক বেশি সফল ও প্রামাণিক হয়েছিল।
তাঁরা বিধান দিয়েছেন যে নবাগত রাসায়নিক বস্তুর ইংরেজি নামই বাংলা বানানে চলবে, যেমন অক্সিজেন, প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন।
ব্যাখ্যা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা বলেছিল যে, বিজ্ঞানের এমন কিছু আন্তর্জাতিক শব্দ আছে, বিশেষ করে নতুন আবিষ্কৃত রাসায়নিক পদার্থ বা উদ্ভিদ/প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম, যেগুলোর জোর করে বাংলা পরিভাষা বানানোর দরকার নেই। সেই ইংরেজি বা আন্তর্জাতিক শব্দগুলোকেই সরাসরি বাংলা হরফে বা বানানে লেখা উচিত, এতে বিজ্ঞান চর্চা সহজ হয়।
ইওরোপ আমেরিকায় পপুলার সায়েন্স লেখা সুসাধ্য এবং সাধারণে তা সহজেই বোঝে। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা তেমন নয়...
ব্যাখ্যা: 'পপুলার সায়েন্স' বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান হলো সাধারণ মানুষের জন্য লেখা সহজ বিজ্ঞানের বই বা প্রবন্ধ। ইউরোপ ও আমেরিকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাথমিক বিজ্ঞানের জ্ঞান আছে, তাই সেখানে পপুলার সায়েন্স লেখা সহজ। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য। তাই এখানে বিজ্ঞানের কোনো বিষয় লিখতে গেলে একদম গোড়া থেকে বুঝিয়ে না লিখলে তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় না।
বিজ্ঞান আলোচনার জন্য যে রচনাপদ্ধতি আবশ্যক তা অনেক লেখক এখনও আয়ত্ত করতে পারেননি, অনেক স্থলে তাঁদের ভাষা আড়ষ্ট এবং ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে পড়ে।
ব্যাখ্যা: লেখক বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের একটি বড়ো ত্রুটির কথা বলেছেন। অনেক লেখক বিজ্ঞানের বিষয় লিখতে গিয়ে ইংরেজিতে ভাবেন এবং শব্দে শব্দে তার বাংলা অনুবাদ (আক্ষরিক অনুবাদ) করে ফেলেন। এর ফলে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক গঠন ও সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং ভাষা আড়ষ্ট বা কৃত্রিম হয়ে পড়ে। এটি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার একটি বড়ো বাধা।
The atomic engine has not even reached the blue print stage, -'পরমাণু এঞ্জিন নীল চিত্রের অবস্থাতেও পৌঁছায়নি।' এ রকম বর্ণনা বাংলা ভাষায় প্রকৃতিবিরুদ্ধ।
ব্যাখ্যা: লেখক আক্ষরিক অনুবাদের একটি হাস্যকর উদাহরণ দিয়েছেন। ইংরেজিতে 'blue print' মানে হলো কোনো কিছুর প্রাথমিক নকশা বা পরিকল্পনা। এর আক্ষরিক বাংলা 'নীল চিত্র' করলে তা সম্পূর্ণ অর্থহীন ও বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। এর সঠিক ভাবানুবাদ হওয়া উচিত— "পরমাণু এঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি।" ভাবানুবাদ করলেই বাংলা ভাষার স্বাভাবিকতা বজায় থাকে।
পরিভাষার উদ্দেশ্য ভাষার সংক্ষেপ এবং অর্থ সুনির্দিষ্ট করা।
ব্যাখ্যা: অনেকেই মনে করেন পরিভাষা বাদ দিয়ে লিখলে লেখা সহজ হয়। কিন্তু লেখক এর বিরোধিতা করেছেন। বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বারবার বড়ো বাক্য ব্যবহার না করে একটি নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে অর্থটিকে সুনির্দিষ্ট ও সংক্ষেপ করা। যেমন, বারবার 'যেসব জন্তুর শিরদাঁড়া নেই' না লিখে একবার 'অমেরুদণ্ডী' লিখলে লেখা সংক্ষেপ ও স্পষ্ট হয়।
আমাদের আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ কথা বলেছেন অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা।
ব্যাখ্যা: লেখক ভাষার অর্থ প্রকাশের তিনটি রীতির কথা বলেছেন। 'অভিধা' হলো আভিধানিক বা সরাসরি অর্থ (যেমন- দেশ মানে স্থান)। 'লক্ষণা' হলো লক্ষণীয় বা প্রাসঙ্গিক অর্থ (যেমন- দেশের লজ্জা মানে দেশবাসীর লজ্জা)। আর 'ব্যঞ্জনা' হলো অন্তর্নিহিত বা গভীর অর্থ (যেমন- অরণ্যে রোদন মানে বনে কাঁদা নয়, বরং নিষ্ফল খেদ)। সাধারণ সাহিত্যে এই তিনটিরই ব্যবহার চলে, কিন্তু বিজ্ঞান সাহিত্যে সরাসরি ও স্পষ্ট অর্থ অর্থাৎ 'অভিধা'র ব্যবহারই বাঞ্ছনীয়।
'হিমালয় যেন পৃথিবীর মানদণ্ড'-কালিদাসের এই উক্তি কাব্যেরই উপযুক্ত, ভূগোলের নয়।
ব্যাখ্যা: মহাকবি কালিদাসের বিখ্যাত উক্তিটি কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চমৎকার, কারণ এখানে হিমালয়কে পৃথিবীর মাপকাঠি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু ভূগোলের বা বিজ্ঞানের বইয়ে এরকম আবেগপূর্ণ বা আলংকারিক ভাষার স্থান নেই। বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা হতে হবে বাস্তব, অত্যন্ত সরল এবং স্পষ্ট। বিজ্ঞান কোনো কল্পনার জায়গা নয়।
অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী এই প্রবাদটি যে কত ঠিক তার প্রমাণ আমাদের সাময়িকপত্রাদিতে মাঝে মাঝে পাওয়া যায়।
ব্যাখ্যা: লেখক প্রবন্ধের শেষে সাময়িক পত্রিকা বা ম্যাগাজিনগুলিতে অবিখ্যাত লেখকদের ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশের সমালোচনা করেছেন। অল্প জ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞান সম্পর্কে লিখতে গেলে তা সাধারণ পাঠকের জন্য ক্ষতিকারক বা অনিষ্টকর হতে পারে। যেমন- 'ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর' লেখা সম্পূর্ণ ভুল। তাই লেখকের পরামর্শ হলো, সম্পাদকের উচিত বিজ্ঞান বিষয়ক কোনো লেখা ছাপানোর আগে তা কোনো অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞকে দিয়ে যাচাই করিয়ে নেওয়া।

৪. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ৫০+ টি প্রশ্ন

১. 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটি কার লেখা?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) প্রমথ চৌধুরী (গ) রাজশেখর বসু (ঘ) সত্যেন্দ্রনাথ বসু
উত্তর: (গ) রাজশেখর বসু
২. রাজশেখর বসু কোন ছদ্মনামে রসরচনা লিখতেন?
(ক) বীরবল (খ) বনফুল (গ) পরশুরাম (ঘ) কালপেঁচা
উত্তর: (গ) পরশুরাম
৩. যাদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থ লেখা হয় তাদের কটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়?
(ক) দুটি (খ) তিনটি (গ) চারটি (ঘ) পাঁচটি
উত্তর: (ক) দুটি
৪. প্রথম শ্রেণির পাঠক কারা?
(ক) যারা খুব ভালো ইংরেজি জানে (খ) যারা ইংরেজি জানে না বা অতি অল্প জানে (গ) যারা শুধু বিজ্ঞান জানে (ঘ) যারা সংস্কৃত জানে
উত্তর: (খ) যারা ইংরেজি জানে না বা অতি অল্প জানে
৫. দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক কারা?
(ক) যারা ইংরেজি জানে না (খ) যারা ইংরেজি জানে এবং ইংরেজিতে অল্পাধিক বিজ্ঞান পড়েছে (গ) যারা নিরক্ষর (ঘ) যারা শুধু বাংলা জানে
উত্তর: (খ) যারা ইংরেজি জানে এবং ইংরেজিতে অল্পাধিক বিজ্ঞান পড়েছে
৬. প্রথম শ্রেণির পাঠকদের বিজ্ঞানের সঙ্গে কীরূপ পরিচয় থাকে?
(ক) গভীর পরিচয় (খ) পূর্ব পরিচয় নেই (গ) অনেক পরিচয় (ঘ) সম্পূর্ণ পরিচয়
উত্তর: (খ) পূর্ব পরিচয় নেই
৭. কোন গাছের দু-রকম ফুল হয় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন?
(ক) আম ও কাঁঠাল (খ) জবা ও গোলাপ (গ) লাউ ও কুমড়ো (ঘ) শিমুল ও পলাশ
উত্তর: (গ) লাউ ও কুমড়ো
৮. ছেলেবেলায় লেখককে কার বাংলা জ্যামিতি পড়তে হয়েছিল?
(ক) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর (খ) ব্রহ্মমোহন মল্লিকের (গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (ঘ) জগদীশচন্দ্র বসুর
উত্তর: (খ) ব্রহ্মমোহন মল্লিকের
৯. "যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত।" - এখানে 'ইজার' বলতে কী বোঝায়?
(ক) টুপি (খ) জামা (গ) পাজামা বা ট্রাউজার্স (ঘ) চাদর
উত্তর: (গ) পাজামা বা ট্রাউজার্স
১০. দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক যখন বাংলায় বিজ্ঞান পড়ে তখন তাকে কী দমন করতে হয়?
(ক) রাগ (খ) পূর্ব সংস্কার বা ইংরেজির প্রতি পক্ষপাত (গ) হাসি (ঘ) কান্না
উত্তর: (খ) পূর্ব সংস্কার বা ইংরেজির প্রতি পক্ষপাত
১১. বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত লেখকদের পরিভাষা রচনার মূল ত্রুটি কী ছিল?
(ক) তাঁরা পরিভাষা জানতেন না (খ) তাঁরা একযোগে কাজ না করে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করেছিলেন (গ) তাঁরা ইংরেজিতে লিখেছিলেন (ঘ) তাঁরা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেছিলেন
উত্তর: (খ) তাঁরা একযোগে কাজ না করে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করেছিলেন
১২. বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পরিভাষা স্বতন্ত্রভাবে রচনার ফল কী হয়েছিল?
(ক) কাজ দ্রুত হয়েছিল (খ) পরিভাষার সাম্য হয়নি এবং বিভিন্ন প্রতিশব্দ রচিত হয়েছিল (গ) পরিভাষা খুব ভালো হয়েছিল (ঘ) কিছুই হয়নি
উত্তর: (খ) পরিভাষার সাম্য হয়নি এবং বিভিন্ন প্রতিশব্দ রচিত হয়েছিল
১৩. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবে পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করেছিল?
(ক) ১৯৩০ সালে (খ) ১৯৩২ সালে (গ) ১৯৩৬ সালে (ঘ) ১৯৪০ সালে
উত্তর: (গ) ১৯৩৬ সালে
১৪. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতিতে কারা কাজ করেছিলেন?
(ক) শুধু বিজ্ঞানীরা (খ) শুধু সাহিত্যিকরা (গ) বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্বজ্ঞ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও লেখকরা একযোগে (ঘ) শুধু ছাত্ররা
উত্তর: (গ) বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্বজ্ঞ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও লেখকরা একযোগে
১৫. নবাগত রাসায়নিক বস্তুর নাম কীভাবে লেখা উচিত বলে সমিতি বিধান দেয়?
(ক) সংস্কৃত করে (খ) ইংরেজি নামই বাংলা বানানে (গ) ফারসি বানানে (ঘ) নতুন নাম তৈরি করে
উত্তর: (খ) ইংরেজি নামই বাংলা বানানে
১৬. প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন কী জাতীয় শব্দ?
(ক) সাহিত্যিক শব্দ (খ) রাসায়নিক বস্তুর ইংরেজি নাম (গ) ভৌগোলিক নাম (ঘ) উদ্ভিদ নাম
উত্তর: (খ) রাসায়নিক বস্তুর ইংরেজি নাম
১৭. 'ফার্ন', 'ইনসেক্টা' ইত্যাদি কোন ধরনের নাম যা বাংলায় চালানো যেতে পারে?
(ক) উদ্ভিদের দেশি নাম (খ) উদ্ভিদ ও প্রাণীর জাতিবাচক বা পরিচয়বাচক ইংরেজি নাম (গ) রোগের নাম (ঘ) যন্ত্রের নাম
উত্তর: (খ) উদ্ভিদ ও প্রাণীর জাতিবাচক বা পরিচয়বাচক ইংরেজি নাম
১৮. পাশ্চাত্য দেশের তুলনায় এদেশের জনসাধারণের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কেমন?
(ক) অনেক বেশি (খ) প্রায় সমান (গ) নগণ্য (ঘ) অত্যন্ত প্রখর
উত্তর: (গ) নগণ্য
১৯. ইওরোপ আমেরিকায় কী ধরনের বিজ্ঞান লেখা সুসাধ্য?
(ক) পপুলার সায়েন্স বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান (খ) কঠিন বিজ্ঞান (গ) রসায়ন বিজ্ঞান (ঘ) পদার্থ বিজ্ঞান
উত্তর: (ক) পপুলার সায়েন্স বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান
২০. আমাদের দেশে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা কখন সাধারণের বোধগম্য হয়?
(ক) ইংরেজিতে লিখলে (খ) প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতন গোড়া থেকে লিখলে (গ) পরিভাষা ব্যবহার না করলে (ঘ) শুধু ছবি দিলে
উত্তর: (খ) প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতন গোড়া থেকে লিখলে
২১. অনেক লেখকের বিজ্ঞান রচনার ভাষা আড়ষ্ট হওয়ার কারণ কী?
(ক) তাঁরা বাংলা জানেন না বলে (খ) তাঁরা ইংরেজিতে ভেবে ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ করেন বলে (গ) তাঁরা খুব দ্রুত লেখেন বলে (ঘ) তাঁরা পরিভাষা ব্যবহার করেন না বলে
উত্তর: (খ) তাঁরা ইংরেজিতে ভেবে ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ করেন বলে
২২. 'Sensitized paper'-এর আক্ষরিক অনুবাদ কী, যা অতি উৎকট?
(ক) সুগ্রাহী কাগজ (খ) স্পর্শকাতর কাগজ (গ) অনুভূতিশীল কাগজ (ঘ) নরম কাগজ
উত্তর: (খ) স্পর্শকাতর কাগজ
২৩. 'Sensitized paper'-এর সঠিক বাংলা অনুবাদ কী হওয়া উচিত?
(ক) স্পর্শকাতর কাগজ (খ) সুগ্রাহী কাগজ (গ) ভালো কাগজ (ঘ) সাদা কাগজ
উত্তর: (খ) সুগ্রাহী কাগজ
২৪. ইংরেজি sensitive balance-এর বাংলা কী হওয়া উচিত?
(ক) অভিমানী দাঁড়িপাল্লা (খ) সুবেদী ব্যালেন্স (গ) স্পর্শকাতর ওজন (ঘ) সুগ্রাহী তুলাদণ্ড
উত্তর: (খ) সুবেদী ব্যালেন্স (বা সুবেদী তুলাদণ্ড)
২৫. 'blue print'-এর আক্ষরিক অনুবাদ 'নীল চিত্র' করাকে লেখক কী বলেছেন?
(ক) খুব সুন্দর (খ) বাংলা ভাষায় প্রকৃতিবিরুদ্ধ (গ) যথাযথ (ঘ) বৈজ্ঞানিক
উত্তর: (খ) বাংলা ভাষায় প্রকৃতিবিরুদ্ধ
২৬. 'blue print'-এর সঠিক বাংলা অর্থ কী হওয়া উচিত?
(ক) নীল রঙের ছবি (খ) নীল কাগজ (গ) নকশা (ঘ) নীল কালি
উত্তর: (গ) নকশা
২৭. লেখক মাছিমারা নকল করতে কেন নিষেধ করেছেন?
(ক) এতে অর্থ পালটে যায় (খ) এতে বাংলা ভাষা বজায় থাকে না (গ) এতে শব্দ সংখ্যা কমে যায় (ঘ) এতে লেখা ছোটো হয়
উত্তর: (খ) এতে বাংলা ভাষা বজায় থাকে না
২৮. অনেকে মনে করেন কী বাদ দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করলে রচনা সহজ হয়?
(ক) বিশেষ্য পদ (খ) পারিভাষিক শব্দ (গ) ইংরেজি শব্দ (ঘ) অলংকার
উত্তর: (খ) পারিভাষিক শব্দ
২৯. 'আলোকতরঙ্গ'-এর বদলে 'আলোর কাঁপন' বা 'নাচন' লিখলে কী হয় না?
(ক) লেখা বড়ো হয় না (খ) কিছু মাত্র সহজ হয় না (গ) কঠিন হয় না (ঘ) সুন্দর হয় না
উত্তর: (খ) কিছু মাত্র সহজ হয় না
৩০. পরিভাষার প্রধান উদ্দেশ্য কী?
(ক) ভাষাকে কঠিন করা (খ) ভাষার সংক্ষেপ এবং অর্থ সুনির্দিষ্ট করা (গ) ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বাড়ানো (ঘ) বাংলা শব্দ কমানো
উত্তর: (খ) ভাষার সংক্ষেপ এবং অর্থ সুনির্দিষ্ট করা
৩১. সাধারণের জন্য লেখা বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভে প্রথমবার অল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দের প্রয়োগের সময় কী দেওয়া আবশ্যক?
(ক) ছবি (খ) তার ব্যাখ্যা (এবং স্থলবিশেষে ইংরেজি নাম) (গ) উচ্চারণ (ঘ) শুধু ইংরেজি নাম
উত্তর: (খ) তার ব্যাখ্যা (এবং স্থলবিশেষে ইংরেজি নাম)
৩২. আলংকারিকগণ শব্দের ক-টি অর্থের কথা বলেছেন?
(ক) দুটি (খ) তিনটি (গ) চারটি (ঘ) পাঁচটি
উত্তর: (খ) তিনটি (ত্রিবিধ)
৩৩. শব্দের ত্রিবিধ অর্থগুলি কী কী?
(ক) অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা (খ) বিশেষ্য, বিশেষণ ও সর্বনাম (গ) অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ (ঘ) রূপক, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা
উত্তর: (ক) অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা
৩৪. শব্দের শুধু আভিধানিক অর্থ প্রকাশ করে কোনটি?
(ক) লক্ষণা (খ) ব্যঞ্জনা (গ) অভিধা (ঘ) উপমা
উত্তর: (গ) অভিধা
৩৫. 'দেশের লজ্জা'- এখানে 'দেশ' শব্দের অর্থ দেশবাসী। এটি শব্দের কোন অর্থের উদাহরণ?
(ক) অভিধা (খ) লক্ষণা (গ) ব্যঞ্জনা (ঘ) রূপক
উত্তর: (খ) লক্ষণা
৩৬. 'অরণ্যে রোদন' বলতে নিষ্ফল খেদ বোঝায়। এটি কোন অর্থের উদাহরণ?
(ক) অভিধা (খ) লক্ষণা (গ) ব্যঞ্জনা (ঘ) উৎপ্রেক্ষা
উত্তর: (গ) ব্যঞ্জনা
৩৭. বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে কোন অলংকারগুলি যত কম থাকে ততই ভালো?
(ক) উপমা ও রূপক (খ) লক্ষণা, ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা ও অতিশয়োক্তি (গ) অভিধা (ঘ) ব্যাকরণ
উত্তর: (খ) লক্ষণা, ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা ও অতিশয়োক্তি
৩৮. "হিমালয় যেন পৃথিবীর মানদণ্ড" - উক্তিটি কার?
(ক) ভবভূতির (খ) রবীন্দ্রনাথের (গ) কালিদাসের (ঘ) রাজশেখর বসুর
উত্তর: (গ) কালিদাসের
৩৯. "হিমালয় যেন পৃথিবীর মানদণ্ড" - এই উক্তিটি কীসের উপযুক্ত?
(ক) ভূগোলের (খ) কাব্যের (গ) বিজ্ঞানের (ঘ) ইতিহাসের
উত্তর: (খ) কাব্যের
৪০. বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা কেমন হওয়া আবশ্যক?
(ক) আলংকারিক (খ) কঠিন ও জটিল (গ) অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট (ঘ) কাব্যিক
উত্তর: (গ) অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট
৪১. বাংলা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধাদিতে আর একটি কী দোষ প্রায় নজরে পড়ে?
(ক) বানান ভুল (খ) অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী প্রবাদের প্রমাণ বা ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য (গ) ছবি না থাকা (ঘ) লেখা খুব ছোটো হওয়া
উত্তর: (খ) অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী প্রবাদের প্রমাণ বা ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য
৪২. একটি পত্রিকায় কী লেখা ছিল যা সম্পূর্ণ ভুল?
(ক) জল স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর (খ) অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন স্বাস্থ্যকর বলে বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই... তবে ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর (গ) নাইট্রোজেন প্রয়োজন নেই (ঘ) কার্বন ডাই অক্সাইড ভালো
উত্তর: (খ) অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন স্বাস্থ্যকর বলে বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই... তবে ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর
৪৩. ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য কাদের পক্ষে অনিষ্টকর?
(ক) বিজ্ঞানীদের পক্ষে (খ) সাধারণ পাঠকের পক্ষে (গ) লেখকদের পক্ষে (ঘ) সম্পাদকের পক্ষে
উত্তর: (খ) সাধারণ পাঠকের পক্ষে
৪৪. অবিখ্যাত লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে সম্পাদকের কী করা উচিত?
(ক) নিজে পড়ে নেওয়া (খ) অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ লোককে দিয়ে যাচাই করে নেওয়া (গ) সঙ্গে সঙ্গে ছাপিয়ে দেওয়া (ঘ) ছবি যোগ করা
উত্তর: (খ) অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ লোককে দিয়ে যাচাই করে নেওয়া
৪৫. রাজশেখর বসু রচিত বিখ্যাত বাংলা অভিধানটির নাম কী?
(ক) বঙ্গীয় শব্দকোষ (খ) চলন্তিকা (গ) সংসদ অভিধান (ঘ) প্রকৃতিবাদ
উত্তর: (খ) চলন্তিকা
৪৬. রাজশেখর বসুর লেখা একটি রসরচনামূলক গ্রন্থের নাম কী?
(ক) লঘুগুরু (খ) বিচিন্তা (গ) গড্ডলিকা (ঘ) চলন্তিকা
উত্তর: (গ) গড্ডলিকা
৪৭. রাজশেখর বসুর পিতা পেশায় কী ছিলেন?
(ক) ডাক্তার (খ) শিক্ষক (গ) দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম্যানেজার (ঘ) উকিল
উত্তর: (গ) দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম্যানেজার
৪৮. 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটিতে কোন বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে?
(ক) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (খ) মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার পদ্ধতি ও সমস্যা (গ) ইংরেজি শেখার গুরুত্ব (ঘ) রসায়ন বিজ্ঞানের আবিষ্কার
উত্তর: (খ) মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার পদ্ধতি ও সমস্যা
৪৯. 'Connotation' শব্দের বাংলা অর্থ কী হিসেবে প্রবন্ধে ব্যবহৃত হয়েছে?
(ক) অর্থব্যাপ্তি (খ) আক্ষরিক অর্থ (গ) পরিভাষা (ঘ) সমার্থক শব্দ
উত্তর: (ক) অর্থব্যাপ্তি
৫০. লেখক 'sensitive' শব্দের কয়টি বাংলা অর্থভেদের কথা বলেছেন?
(ক) দুটি (খ) তিনটি (গ) চারটি (ঘ) একাধিক (অভিমানী, ব্যথাপ্রবণ, উত্তেজী ইত্যাদি)
উত্তর: (ঘ) একাধিক (অভিমানী, ব্যথাপ্রবণ, উত্তেজী ইত্যাদি)

৫. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ৪০+ টি প্রশ্ন

১. 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটির রচয়িতা কে এবং তাঁর ছদ্মনাম কী?
উত্তর: প্রবন্ধটির রচয়িতা হলেন রাজশেখর বসু এবং তাঁর বিখ্যাত ছদ্মনাম হলো 'পরশুরাম'।
২. প্রাবন্ধিক বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থের পাঠকদের কটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন?
উত্তর: প্রাবন্ধিক বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা গ্রন্থের পাঠকদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।
৩. প্রথম শ্রেণির পাঠক কারা?
উত্তর: যারা ইংরেজি ভাষা একেবারেই জানে না বা অতি অল্প জানে, অর্থাৎ অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্ক লোকরাই প্রথম শ্রেণির পাঠক।
৪. দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক কারা?
উত্তর: যারা ইংরেজি ভাষা জানে এবং ইংরেজি ভাষায় অল্পাধিক বিজ্ঞান পড়াশোনা করেছে, তারা দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠক।
৫. প্রথম শ্রেণির পাঠকদের বাংলায় বিজ্ঞান শেখা সহজ কেন?
উত্তর: কারণ এই শ্রেণির পাঠকেরা ইংরেজি ভাষার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে, তাই বাংলা পরিভাষা আয়ত্ত করে বিজ্ঞান শিখতে তাদের পূর্ব সংস্কার বা অভ্যাসে কোনো বাধা তৈরি হয় না।
৬. ছেলেবেলায় প্রাবন্ধিককে কার লেখা জ্যামিতি পড়তে হয়েছিল?
উত্তর: ছেলেবেলায় প্রাবন্ধিককে ব্রহ্মমোহন মল্লিকের লেখা বাংলা জ্যামিতি পড়তে হয়েছিল।
৭. "যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত।" - এই উপমাটির দ্বারা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যে, যারা সারা জীবন ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়ে অভ্যস্ত (ইজার পরার মতো), তাদের কাছে হঠাৎ করে বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষা (ধুতি পরার মতো) আয়ত্ত করা কঠিন ও অস্বস্তিকর মনে হয়।
৮. দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠককে বাংলায় বিজ্ঞান পড়ার সময় কী দমন করতে হয়?
উত্তর: দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠককে বাংলায় বিজ্ঞান পড়ার সময় তাদের পূর্ব সংস্কার অর্থাৎ ইংরেজির প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত বা আকর্ষণ দমন করতে হয়।
৯. বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পরিভাষা রচনার উদ্যোগে কী ত্রুটি ছিল?
উত্তর: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের লেখকরা একযোগে কাজ না করে স্বতন্ত্র বা আলাদাভাবে পরিভাষা রচনার কাজ করেছিলেন, যার ফলে পরিভাষার সাম্য বা সমতা বজায় থাকেনি।
১০. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কত সালে পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করেছিল?
উত্তর: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৬ সালে পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করেছিল।
১১. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির কাজে কারা যুক্ত ছিলেন?
উত্তর: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতিতে বিভিন্ন বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্বজ্ঞ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং কয়েকজন লেখক একযোগে যুক্ত ছিলেন।
১২. নবাগত রাসায়নিক বস্তুর নাম সম্পর্কে পরিভাষা সমিতি কী বিধান দিয়েছিল?
উত্তর: সমিতি বিধান দিয়েছিল যে নবাগত রাসায়নিক বস্তু বা পদার্থের ইংরেজি বা আন্তর্জাতিক নামই সরাসরি বাংলা বানানে লেখা চলবে।
১৩. এমন দুটি ইংরেজি শব্দের উদাহরণ দাও যা বাংলা বানানে লেখার কথা বলা হয়েছে।
উত্তর: অক্সিজেন এবং প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন।
১৪. ইউরোপ-আমেরিকায় 'পপুলার সায়েন্স' লেখা সহজ কেন?
উত্তর: কারণ ইউরোপ-আমেরিকার জনসাধারণের মধ্যে প্রাথমিক বিজ্ঞানের জ্ঞান যথেষ্ট রয়েছে, তাই তারা পপুলার সায়েন্স সহজেই বুঝতে পারে।
১৫. আমাদের দেশে জনসাধারণের জন্য বিজ্ঞান লিখতে গেলে কী সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন?
উত্তর: আমাদের দেশে জনসাধারণের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য বলে, বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা একেবারে প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতো গোড়া থেকে বুঝিয়ে না লিখলে তা তাদের বোধগম্য হবে না।
১৬. অনেক লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনার ভাষা আড়ষ্ট হয়ে পড়ে কেন?
উত্তর: অনেক লেখক তাদের বৈজ্ঞানিক বক্তব্য ইংরেজিতে ভাবেন এবং লেখার সময় তার যথাযথ আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করার চেষ্টা করেন বলেই ভাষা আড়ষ্ট ও কৃত্রিম হয়ে পড়ে।
১৭. 'Sensitized paper'-এর অনুবাদ 'স্পর্শকাতর কাগজ' লিখলে তা উৎকট হয় কেন?
উত্তর: কারণ 'স্পর্শকাতর' শব্দটি মানুষের আবেগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, জড় কাগজের ক্ষেত্রে নয়। এর সঠিক বৈজ্ঞানিক অনুবাদ হওয়া উচিত 'সুগ্রাহী কাগজ'।
১৮. 'Blue print'-এর আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ কী এবং তা কেমন শোনায়?
উত্তর: 'Blue print'-এর আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ হলো 'নীল চিত্র', যা বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং হাস্যকর শোনায়। এর সঠিক অর্থ হলো 'নকশা'।
১৯. লেখক মাছিমারা নকল করতে নিষেধ করেছেন কেন?
উত্তর: মাছিমারা নকল বা ইংরেজি বাক্যের শব্দে শব্দে আক্ষরিক অনুবাদ করলে বাক্যের অর্থ অস্পষ্ট হয় এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব গঠন ও সৌন্দর্য বজায় থাকে না।
২০. পরিভাষা ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: বৈজ্ঞানিক রচনায় পরিভাষা ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভাষার সংক্ষেপ করা এবং বৈজ্ঞানিক বিষয়টির অর্থকে সুনির্দিষ্ট করা।
২১. 'আলোকতরঙ্গ'-এর বদলে 'আলোর কাঁপন' লিখলে কী সমস্যা হয়?
উত্তর: 'আলোকতরঙ্গ' একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিভাষা। এর বদলে 'আলোর কাঁপন' লিখলে তা কিছু মাত্র সহজ হয় না, বরং বৈজ্ঞানিক গাম্ভীর্য নষ্ট হয়।
২২. অল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দ প্রথমবার প্রয়োগের সময় কী করা উচিত?
উত্তর: অল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দ প্রথমবার প্রয়োগের সময় তার সহজ ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনে ইংরেজি নামটি ব্র্যাকেটে দেওয়া আবশ্যক।
২৩. আলংকারিকগণ শব্দের কটি এবং কী কী অর্থের কথা বলেছেন?
উত্তর: আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ বা তিনটি অর্থের কথা বলেছেন— অভিধা, লক্ষণা এবং ব্যঞ্জনা।
২৪. 'অভিধা' বলতে কী বোঝায়? উদাহরণ দাও।
উত্তর: 'অভিধা' বলতে শব্দের শুধু মূল বা আভিধানিক অর্থকে বোঝায়। যেমন- 'দেশ' বলতে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা স্থানকে বোঝায়।
২৫. 'দেশের লজ্জা'- এখানে 'দেশ' শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?
উত্তর: এখানে 'দেশ' শব্দটি 'লক্ষণা' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে দেশ বলতে দেশের মাটি নয়, বরং 'দেশবাসী'কে বোঝানো হয়েছে।
২৬. 'অরণ্যে রোদন' কথাটির ব্যঞ্জনার অর্থ কী?
উত্তর: 'অরণ্যে রোদন' কথাটির আভিধানিক অর্থ বনে কাঁদা হলেও, এর ব্যঞ্জনার অর্থ হলো 'নিষ্ফল খেদ' বা বৃথা আবেদন করা।
২৭. বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে কোন ধরনের অলংকারের সার্থক প্রয়োগ চলতে পারে?
উত্তর: বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে বিষয়টি বোঝানোর জন্য উপমার কিছু প্রয়োজন হতে পারে এবং স্থলবিশেষে রূপক অলংকারও চলতে পারে।
২৮. বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে কোন অলংকারগুলি বর্জন করা উচিত?
উত্তর: বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে লক্ষণা, ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা এবং অতিশয়োক্তির মতো আবেগপূর্ণ আলংকারিক ভাষা বর্জন করাই উচিত।
২৯. "হিমালয় যেন পৃথিবীর মানদণ্ড" - কালিদাসের এই উক্তিটি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত কেন?
উত্তর: কারণ এটি একটি অতিশয়োক্তি ও কল্পনাশ্রয়ী কাব্যের ভাষা। ভূগোলে বা বিজ্ঞানে হিমালয়কে পৃথিবীর মাপকাঠি বা মানদণ্ড বলা অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক।
৩০. বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা কেমন হওয়া আবশ্যক বলে লেখক মনে করেন?
উত্তর: লেখকের মতে, বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা কাব্যের মতো জটিল না হয়ে অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক।
৩১. বাংলা সাময়িক পত্রাদিতে কোন প্রবাদের প্রমাণ মাঝে মাঝে পাওয়া যায়?
উত্তর: বাংলা সাময়িক পত্রাদিতে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' প্রবাদটির প্রমাণ পাওয়া যায়।
৩২. একটি পত্রিকায় 'ওজন গ্যাস' সম্পর্কে কী ভুল তথ্য ছাপা হয়েছিল?
উত্তর: পত্রিকাটিতে ছাপা হয়েছিল যে, অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন স্বাস্থ্যকর নয়, কিন্তু 'ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর', যা সম্পূর্ণ ভুল ও অবৈজ্ঞানিক তথ্য।
৩৩. ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য কাদের পক্ষে অনিষ্টকর?
উত্তর: ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য সাধারণ পাঠকদের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর বা অনিষ্টকর, কারণ তারা সেই ভুল তথ্যকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে পারে।
৩৪. অবিখ্যাত লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে সম্পাদকের কী করা উচিত?
উত্তর: সম্পাদকের উচিত কোনো অবিখ্যাত বা নতুন লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে তা কোনো অভিজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ লোককে দিয়ে যাচাই করিয়ে নেওয়া।
৩৫. রাজশেখর বসু রচিত বিখ্যাত অভিধানটির নাম কী?
উত্তর: রাজশেখর বসু রচিত বিখ্যাত বাংলা অভিধানটির নাম হলো 'চলন্তিকা' (১৯৩৭ সালে প্রকাশিত)।
৩৬. 'পরশুরাম' কার ছদ্মনাম এবং তিনি কী ধরনের রচনার জন্য বিখ্যাত?
উত্তর: 'পরশুরাম' হলো রাজশেখর বসুর ছদ্মনাম। তিনি বাংলা সাহিত্যে ব্যঙ্গ ও রসরচনার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
৩৭. 'Connotation' শব্দের অর্থ লেখক কী বলেছেন?
উত্তর: লেখক 'Connotation' শব্দের অর্থ বলেছেন 'অর্থব্যাপ্তি', অর্থাৎ একটি শব্দের নানা ক্ষেত্রে নানা রকম অর্থ বহন করার ক্ষমতা।
৩৮. ইংরেজি 'sensitive' শব্দের কয়েকটি ভিন্ন বাংলা অর্থ লেখো যা লেখক উল্লেখ করেছেন।
উত্তর: লেখক 'sensitive' শব্দের অর্থভেদে অভিমানী (sensitive person), ব্যথাপ্রবণ (sensitive wound), উত্তেজী, সুবেদী এবং সুগ্রাহী (sensitized paper) ইত্যাদি বাংলা শব্দের কথা বলেছেন।
৩৯. "যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে..." - 'ইজার' কী?
উত্তর: 'ইজার' হলো এক ধরনের ঢিলেঢালা পাজামা বা ট্রাউজার্স জাতীয় পোশাক।
৪০. 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটিতে লেখকের মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: মাতৃভাষায় বা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার পথে যে সকল বাধা ও ত্রুটি রয়েছে তা চিহ্নিত করা এবং সহজ, স্পষ্ট ও সঠিক পরিভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে সেই সমস্যা সমাধানের পথ নির্দেশ করাই লেখকের মূল উদ্দেশ্য।

৬. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ১০ টি প্রশ্ন

১. 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক বিজ্ঞান পাঠকদের যে দুটি শ্রেণির কথা বলেছেন, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর: প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার আলোচনা করতে গিয়ে বিজ্ঞান পাঠকদের দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।

প্রথম শ্রেণি: এই শ্রেণির পাঠকরা ইংরেজি ভাষা একেবারেই জানে না বা খুব সামান্য জানে। এদের মধ্যে পড়ে অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্ক মানুষেরা। বিজ্ঞানের পরিভাষা বা ইংরেজি বৈজ্ঞানিক শব্দের সঙ্গে এদের কোনো পূর্ব পরিচয় থাকে না। টাইফয়েড, আয়োডিন বা মোটর-এর মতো দু-একটি শব্দ জানলেও এদের সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকে না। এই পাঠকদের প্রধান সুবিধা হলো, এদের মনে ইংরেজি ভাষার কোনো পূর্ব সংস্কার বা প্রভাব থাকে না। তাই বাংলা ভাষায় নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক পরিভাষা শিখতে এদের কোনো বাধা বা অস্বস্তি হয় না। এরা সহজেই মাতৃভাষায় বিজ্ঞান গ্রহণ করতে পারে।

দ্বিতীয় শ্রেণি: এই শ্রেণির পাঠকরা ইংরেজি ভাষা ভালো জানে এবং ইংরেজিতেই প্রাথমিক বিজ্ঞান পড়াশোনা করেছে। এদের সমস্যা হলো পূর্ব সংস্কার। এরা যেহেতু ছোটোবেলা থেকেই ইংরেজি পরিভাষায় (যেমন- Geometry, Oxygen) বিজ্ঞান পড়ে অভ্যস্ত, তাই হঠাৎ করে বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষা (যেমন- সমবাহু ত্রিভুজ) পড়লে এদের কাছে তা শ্রুতিকটু বা কঠিন মনে হয়। প্রাবন্ধিকের চমৎকার উপমা অনুযায়ী, যে মানুষ আজীবন ইজার (প্যান্ট) পরেছে, তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা যেমন অস্বস্তিকর, দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকদের কাছে বাংলায় বিজ্ঞান পড়াও তেমনি কঠিন। তাই এদের মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিখতে গেলে ইংরেজির প্রতি পক্ষপাত দমন করে একটু বেশি চেষ্টা করতে হয়।

২. বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় পারিভাষিক শব্দ রচনার ক্ষেত্রে কী কী বাধা বা ত্রুটি ছিল এবং তা কীভাবে দূর করা সম্ভব হয়েছিল?

উত্তর: রাজশেখর বসুর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধ অনুসারে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান বাধা হলো উপযুক্ত ও প্রামাণিক পারিভাষিক শব্দের অভাব।

ত্রুটি বা বাধা: অনেক বছর আগে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাথে যুক্ত কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী লেখক বিজ্ঞান বিষয়ক পরিভাষা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রধান ত্রুটি ছিল যে, তাঁরা একযোগে বা সমবেতভাবে কাজ না করে প্রত্যেকে স্বতন্ত্র বা আলাদাভাবে কাজ করেছিলেন। এর ফলে একই ইংরেজি বৈজ্ঞানিক শব্দের জন্য বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করেছিলেন। পরিভাষায় কোনো সমতা বা সাম্য ছিল না, যা পাঠকদের বিভ্রান্ত করত।

সমাধান: এই ত্রুটি দূর করার জন্য ১৯৩৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করে। এই সমিতির বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এখানে বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্বজ্ঞ, সংস্কৃত পণ্ডিত এবং সাহিত্যিকরা একযোগে কাজ করেছিলেন। সমবেতভাবে কাজ করার ফলে তাঁদের রচিত পরিভাষা অনেক বেশি প্রামাণিক ও সফল হয়েছিল। তাঁরা এও বিধান দেন যে আন্তর্জাতিক বা নতুন রাসায়নিক বস্তুর ক্ষেত্রে জোর করে বাংলা পরিভাষা না বানিয়ে ইংরেজি নামই বাংলা বানানে চালানো উচিত (যেমন- অক্সিজেন)। এভাবেই পরিভাষা রচনার বাধা অনেকটা দূর করা সম্ভব হয়েছিল।

৩. "এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না।" - কোন্ দোষের কথা বলা হয়েছে? এই দোষ থেকে মুক্তির উপায় কী?

উত্তর: দোষের বিবরণ: প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু এখানে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে লেখকদের ভাষা ও অনুবাদজনিত ত্রুটির কথা বলেছেন। অনেক লেখক আছেন যারা বাংলায় বিজ্ঞান লেখার সময় বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি ইংরেজিতে ভাবেন এবং তারপর শব্দে শব্দে তার আক্ষরিক অনুবাদ করে বাংলায় প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। এর ফলে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক গঠনরীতি, অর্থ ও সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায় এবং ভাষা অত্যন্ত আড়ষ্ট ও কৃত্রিম হয়ে পড়ে। যেমন, 'The atomic engine has not even reached the blue print stage' -এর আক্ষরিক অনুবাদ 'পরমাণু এঞ্জিন নীল চিত্রের অবস্থাতেও পৌঁছায়নি' লিখলে তা বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ অর্থহীন ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ শোনায়। এটিই হলো সেই দোষ।

মুক্তির উপায়: এই দোষ থেকে মুক্তি পেতে হলে লেখকদের আক্ষরিক অনুবাদ বা 'মাছিমারা নকল' করা বন্ধ করতে হবে। শব্দের আক্ষরিক অর্থের চেয়ে বাক্যের মূল ভাবের দিকে নজর দিতে হবে এবং ভাবানুবাদ করতে হবে। 'Blue print'-কে নীল চিত্র না লিখে 'নকশা' লিখতে হবে, যাতে বাক্যের অর্থ "পরমাণু এঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি" দাঁড়ায়। অর্থাৎ, বাংলা ভাষার নিজস্ব গঠন ও প্রকৃতির দিকে খেয়াল রেখে সহজ ও স্বাভাবিক ভাষায় বক্তব্য প্রকাশ করলেই বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

৪. "পরিভাষার উদ্দেশ্য ভাষার সংক্ষেপ এবং অর্থ সুনির্দিষ্ট করা।" - প্রবন্ধ অবলম্বনে এই উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: তাৎপর্য বিশ্লেষণ: 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে রাজশেখর বসু বৈজ্ঞানিক রচনায় পারিভাষিক শব্দের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে এই উক্তিটি করেছেন। অনেক লেখক মনে করেন, পরিভাষা বাদ দিয়ে সাধারণ ভাষায় লিখলেই রচনা সহজ হয়। কিন্তু প্রাবন্ধিক এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল বলেছেন।

বিজ্ঞানের কোনো বিষয়কে বর্ণনা করতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট শব্দের প্রয়োজন হয় যা একটি বড়ো ধারণাকে একক শব্দে প্রকাশ করতে পারে। যেমন, যদি পরিভাষা ব্যবহার না করা হয়, তবে 'অমেরুদণ্ডী' বোঝাতে বারবার লিখতে হবে 'যেসব জন্তুর শিরদাঁড়া নেই'। এতে অনর্থক বাক্যের আকার বৃদ্ধি পাবে এবং পাঠকের পড়ার ব্যাঘাত ঘটবে। অন্যদিকে 'অমেরুদণ্ডী' বা 'আলোকতরঙ্গ'-এর মতো পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করলে ভাষার সংক্ষেপ ঘটে এবং বৈজ্ঞানিক অর্থটি পাঠকের কাছে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হয়। সাধারণ পাঠকের সুবিধার জন্য লেখক পরামর্শ দিয়েছেন যে, প্রথমবার অল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দ ব্যবহারের সময় তার সহজ ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনে ইংরেজি নামটি দেওয়া উচিত, কিন্তু পরবর্তীতে শুধু পরিভাষা ব্যবহার করলেই ভাষার গাম্ভীর্য ও সংক্ষেপ দুই-ই বজায় থাকে।

৫. আলংকারিকগণ শব্দের যে তিনটি অর্থের কথা বলেছেন তা উদাহরণসহ আলোচনা করো এবং বিজ্ঞান সাহিত্যে এদের প্রয়োগ সম্পর্কে লেখকের মত কী?

উত্তর: রাজশেখর বসু তাঁর প্রবন্ধে আলংকারিকদের মতে শব্দের তিনটি বা ত্রিবিধ অর্থের কথা বলেছেন— অভিধা, লক্ষণা এবং ব্যঞ্জনা।

১. অভিধা: এটি হলো শব্দের আভিধানিক বা সরাসরি সাধারণ অর্থ। যেমন 'দেশ' বলতে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা স্থানকে বোঝায়।
২. লক্ষণা: এটি হলো শব্দের আভিধানিক অর্থের পরিবর্তে প্রাসঙ্গিক বা লক্ষণীয় অর্থ। যেমন 'দেশের লজ্জা' বললে এখানে দেশ বলতে মাটিকে না বুঝিয়ে 'দেশবাসী'কে বোঝানো হয়।
৩. ব্যঞ্জনা: এটি হলো শব্দের অন্তর্নিহিত বা গভীর অর্থ, যা সরাসরি বোঝা যায় না। যেমন 'অরণ্যে রোদন' কথাটির আভিধানিক অর্থ বনে কাঁদা হলেও, এর ব্যঞ্জনার অর্থ হলো 'নিষ্ফল খেদ' বা বৃথা আবেদন।

লেখকের মত: সাধারণ সাহিত্য বা কাব্যে লক্ষণা, ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা এবং অতিশয়োক্তির মতো আলংকারিক ভাষার সার্থক প্রয়োগ চলতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান সাহিত্যে এই ধরনের আলংকারিক ভাষা বর্জন করাই উচিত। কালিদাসের "হিমালয় যেন পৃথিবীর মানদণ্ড" উক্তিটি কাব্যের জন্য চমৎকার হলেও ভূগোলের বা বিজ্ঞানের জন্য তা অচল। বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা হতে হবে অত্যন্ত সরল, স্পষ্ট এবং সরাসরি অর্থবোধক অর্থাৎ 'অভিধা' নির্ভর। প্রয়োজনে কিছু উপমা বা রূপক চলতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত অলংকার বিজ্ঞানের সত্যকে অস্পষ্ট করে দেয়।

৬. "অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী এই প্রবাদটি যে কত ঠিক তার প্রমাণ আমাদের সাময়িকপত্রাদিতে মাঝে মাঝে পাওয়া যায়।" - লেখক কেন এমন মন্তব্য করেছেন? এর প্রতিকার হিসেবে তিনি কী পরামর্শ দিয়েছেন?

উত্তর: মন্তব্যের কারণ: রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধের শেষাংশে বিজ্ঞান বিষয়ক রচনায় তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই মন্তব্যটি করেছেন। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁদের বিজ্ঞানের গভীর জ্ঞান নেই, তাঁরা সাময়িক পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে বসেন। জ্ঞানের অভাবের কারণে তাঁদের লেখায় মারাত্মক ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়। লেখক একটি পত্রিকার উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে লেখা ছিল— "অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন স্বাস্থ্যকর বলে বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই... তবে ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর।" এটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং ভুল তথ্য। এই ধরনের ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সাধারণ পাঠকদের জন্য অত্যন্ত অনিষ্টকর বা ক্ষতিকারক হতে পারে, কারণ তারা পত্রিকায় ছাপা লেখাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। তাই আধকচা জ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞান লিখতে যাওয়াকেই লেখক 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' বলেছেন।

প্রতিকার: এই সমস্যা দূর করার জন্য লেখক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো পত্রিকা সম্পাদকের উচিত অবিখ্যাত বা নতুন কোনো লেখকের বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা সরাসরি ছেপে না দিয়ে, প্রকাশের আগে তা কোনো অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞকে দিয়ে ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে কোনো ভুল তথ্য না পৌঁছায়।

৭. 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধ অবলম্বনে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার সমস্যা ও তার সমাধানের উপায়গুলি সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর: রাজশেখর বসু তাঁর প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার বেশ কয়েকটি সমস্যা এবং তার সমাধানের উপায় তুলে ধরেছেন।

সমস্যা:
১. পরিভাষার অভাব ও অসাম্য: বাংলায় উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অভাব রয়েছে এবং পূর্বে লেখকরা স্বতন্ত্রভাবে কাজ করায় পরিভাষায় সমতা ছিল না।
২. পূর্ব সংস্কার: যারা ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়ে অভ্যস্ত, বাংলায় বিজ্ঞান পড়তে গেলে তাদের পূর্ব সংস্কার বা অভ্যাসে বাধা তৈরি হয়।
৩. সাধারণের অজ্ঞতা: ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় এদেশের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য হওয়ায় পপুলার সায়েন্স লেখা কঠিন।
৪. ভাষার আড়ষ্টতা ও আক্ষরিক অনুবাদ: অনেক লেখক ইংরেজিতে ভেবে আক্ষরিক অনুবাদ করেন, ফলে ভাষা কৃত্রিম ও আড়ষ্ট হয়ে পড়ে।
৫. ভুল তথ্য পরিবেশন: সাময়িক পত্রপত্রিকায় অল্পবিদ্যা সম্পন্ন লেখকরা প্রায়ই ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করে সাধারণ পাঠকের ক্ষতি করেন।

সমাধানের উপায়:
১. পরিভাষা তৈরির জন্য বিজ্ঞান ও ভাষার বিশেষজ্ঞদের একযোগে কাজ করতে হবে (যেমন ১৯৩৬ সালের পরিভাষা সমিতি)।
২. আন্তর্জাতিক বা রাসায়নিক নাম সরাসরি বাংলা বানানে লিখতে হবে।
৩. সাধারণের জন্য বিজ্ঞান লেখার সময় একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে সহজ করে বোঝাতে হবে।
৪. আক্ষরিক অনুবাদ বর্জন করে বাংলা ভাষার প্রকৃতি অনুযায়ী ভাবানুবাদ করতে হবে এবং ভাষা হতে হবে অত্যন্ত সরল, স্পষ্ট ও অলংকার বর্জিত।
৫. সম্পাদকের উচিত বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা প্রকাশের আগে তা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে যাচাই করিয়ে নেওয়া।

৮. "আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা তেমন নয়..." - কোন অবস্থার কথা বলা হয়েছে? এমন অবস্থার কারণে বিজ্ঞান লেখকদের কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

উত্তর: অবস্থার বিবরণ: রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিক সচেতনতার তুলনা করতে গিয়ে এই কথা বলেছেন। ইউরোপ বা আমেরিকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্কুলস্তর থেকেই প্রাথমিক বিজ্ঞানের একটি সাধারণ জ্ঞান থাকে। তাই সেখানে 'পপুলার সায়েন্স' বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক কোনো প্রবন্ধ লিখলে সাধারণ মানুষ তা সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা তেমন নয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অত্যন্ত নগণ্য। বিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের প্রায় কোনো ধারণাই নেই বললেই চলে।

লেখকদের সতর্কতা: এই বাস্তব অবস্থার কারণে, যাঁরা সাধারণ মানুষের জন্য বাংলায় বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন, তাঁদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। লেখক পরামর্শ দিয়েছেন যে, এদেশের পাঠকদের জন্য বিজ্ঞান লিখতে গেলে একদম গোড়া থেকে বা প্রাথমিক পর্যায় থেকে বুঝিয়ে না লিখলে তা পাঠকদের কাছে বোধগম্য হবে না। বিষয়বস্তুকে অত্যন্ত সহজ, সরল ও স্পষ্ট ভাষায় উপস্থাপন করতে হবে। লেখকরা যদি এই বিষয়ে অবহিত না হন এবং কঠিন তাত্ত্বিক ভাষায় বিজ্ঞান লেখেন, তবে তাঁদের লেখা কখনোই এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য হবে না।

৯. "ইংরেজির প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত বর্জন করে প্রীতির সহিত মাতৃভাষার পদ্ধতি আয়ত্ত করতে হয়।" - উক্তিটির আলোকে বিজ্ঞান পাঠকদের মানসিকতার বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: রাজশেখর বসুর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধ থেকে গৃহীত এই উক্তিটিতে দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠকদের মানসিকতার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকরা হলো তারা, যারা ইংরেজি ভাষা ভালো জানে এবং ইংরেজিতেই বিজ্ঞান পড়াশোনা করেছে। এরা ছোটোবেলা থেকেই Oxygen, Hydrogen, Geometry ইত্যাদি ইংরেজি বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। এই দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে এদের মনে ইংরেজি ভাষার প্রতি একটি অতিরিক্ত পক্ষপাত বা সংস্কার তৈরি হয়। এরা মনে করে বিজ্ঞান বোধহয় শুধু ইংরেজিতেই ভালো বোঝা যায়।
তাই যখন এরা মাতৃভাষায় বা বাংলায় বিজ্ঞান পড়তে যায়, তখন 'সমবাহু ত্রিভুজ' বা 'অম্লজান'-এর মতো বাংলা পরিভাষাগুলি এদের কাছে শ্রুতিকটু বা অস্বাভাবিক মনে হয় (যেমন ইজার পরা অভ্যস্ত লোকের হঠাৎ ধুতি পরলে মনে হয়)। এই মানসিক বাধাই হলো মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার অন্তরায়। প্রাবন্ধিকের মতে, এই শ্রেণির পাঠকদের যদি মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিখতে হয়, তবে প্রথমে তাদের মন থেকে ইংরেজির প্রতি এই অন্ধ মোহ বা পক্ষপাত দূর করতে হবে। তারপর নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা বা প্রীতি নিয়ে বাংলা পরিভাষা ও প্রকাশভঙ্গিকে আয়ত্ত করার চেষ্টা করতে হবে। তবেই মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সার্থক হবে।

১০. রাজশেখর বসুর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধের রচনাশৈলী ও ভাষারীতি সম্পর্কে তোমার অভিমত ব্যক্ত করো।

উত্তর: রাজশেখর বসুর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই প্রবন্ধের রচনাশৈলী ও ভাষারীতি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিপূর্ণ এবং প্রাঞ্জল।

যুক্তিপূর্ণ বিন্যাস: লেখক কোনো আবেগের বশবর্তী না হয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। প্রথমে পাঠকদের শ্রেণিবিভাগ, তারপর পরিভাষার সমস্যা ও সমাধান, এরপর অনুবাদের ত্রুটি এবং পরিশেষে বিজ্ঞান রচনার আদর্শ ভাষারীতি—পর্যায়ক্রমে তিনি বিষয়গুলিকে বিশ্লেষণ করেছেন।
সরল ও স্পষ্ট ভাষা: বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ হলেও এর ভাষা কোথাও নীরস বা দুর্বোধ্য হয়নি। লেখক নিজে যেমনটি বলেছেন যে বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক, তিনি নিজের প্রবন্ধে সেই আদর্শই মেনে চলেছেন।
চমৎকার উপমার ব্যবহার: ভাষার আড়ষ্টতা দূর করতে এবং বক্তব্যকে প্রাঞ্জল করতে লেখক চমৎকার ও সহজবোধ্য উপমা ব্যবহার করেছেন। যেমন- "যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত", কিংবা "অরণ্যে রোদন"-এর উদাহরণ। এই উপমাগুলি প্রবন্ধটিকে সাধারণ পাঠকের অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
গঠনমূলক সমালোচনা: লেখক শুধু ত্রুটিগুলি ধরিয়েই দেননি, পাশাপাশি সঠিক ভাবানুবাদের উদাহরণ (যেমন- নীল চিত্রের পরিবর্তে নকশা) এবং সম্পাদকের কর্তব্যের মতো গঠনমূলক পরামর্শও দিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, প্রাবন্ধিকের স্বচ্ছ বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম দরদ এই প্রবন্ধের রচনাশৈলীকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে।

৭. ব্যাকরণ ও নির্মিতি (Grammar & Composition) সিলেবাস অনুযায়ী

কারক ও অকারক সম্পর্ক

  • ছেলেবেলায় আমাকে ব্রহ্মমোহন মল্লিকের বাংলা জ্যামিতি পড়তে হয়েছিল। - অধিকরণ কারকে 'য়' বিভক্তি।
  • তাঁদের উদ্যোগের এই ত্রুটি ছিল... - সম্বন্ধ পদে 'দের' বিভক্তি।
  • আমাদের সরকার ক্রমে ক্রমে রাজকার্যে দেশি পরিভাষা চালাচ্ছেন। - অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।
  • ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে পড়ে। - সম্বন্ধ পদে 'র' বিভক্তি।
  • সম্পাদকের উচিত অবিখ্যাত লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনা যাচাই করা। - কর্তৃকারকে 'এর' বিভক্তি।
  • যখন গন্ধক হাওয়ায় পোড়ে... - কর্তৃকারকে 'শূন্য' বিভক্তি।

সমাস নির্ণয়

  • অল্পশিক্ষিত: অল্প শিক্ষিত যে (সাধারণ কর্মধারয় সমাস)।
  • সমবাহু: সম বাহু যার (বহুব্রীহি সমাস)।
  • ভাষাতত্ত্বজ্ঞ: ভাষাতত্ত্ব জানেন যিনি (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)।
  • আলোকতরঙ্গ: আলোকের তরঙ্গ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।
  • অমেরুদণ্ডী: মেরুদণ্ড নেই যার (নঞ বহুব্রীহি সমাস)।
  • দেশবাসী: দেশের বাসী (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।

বাক্য ও বাচ্য পরিবর্তন

  • বাক্য: যারা ইংরেজি জানে না বা অতি অল্প জানে। (সরল বাক্যে)
    উত্তর: ইংরেজি না জানা বা অতি অল্প জানা লোক।
  • বাক্য: পাশ্চাত্ত্য দেশের শিক্ষার্থীর চেয়ে তাকে বেশি চেষ্টা করতে হয় না। (অস্ত্যর্থক বাক্যে)
    উত্তর: পাশ্চাত্ত্য দেশের শিক্ষার্থীর মতোই তাকে চেষ্টা করতে হয়।
  • বাচ্য: লেখক নানা বিষয়ের পরিভাষা রচনা করেছিলেন। (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: লেখকের দ্বারা নানা বিষয়ের পরিভাষা রচিত হয়েছিল।
  • বাচ্য: এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না। (ভাববাচ্যে)
    উত্তর: এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া হবে না।

নির্মিতি (অনুশীলনের জন্য)

  • প্রবন্ধ রচনা: "মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা" অথবা "দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান"।
  • বঙ্গানুবাদ: Science has completely changed the face of the earth. We use science in our daily life. The electric light, fan, train, telephone and even the computer are the gifts of science. It has conquered time and distance. Now the world has become a global village.
    (অনুবাদ: বিজ্ঞান পৃথিবীর চেহারা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান ব্যবহার করি। বৈদ্যুতিক আলো, পাখা, ট্রেন, টেলিফোন এবং এমনকি কমপিউটারও বিজ্ঞানের দান। এটি সময় ও দূরত্বকে জয় করেছে। এখন বিশ্ব একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে।)

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রবন্ধ সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

প্রবন্ধটি প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও অভিধানকার রাজশেখর বসুর লেখা। তাঁর বিখ্যাত ছদ্মনাম হলো 'পরশুরাম', যে নামে তিনি রসরচনা লিখতেন।

উপযুক্ত ও প্রামাণিক পারিভাষিক শব্দের অভাব এবং অনেক লেখকের ইংরেজিতে ভেবে আক্ষরিক অনুবাদ করার প্রবণতাকেই লেখক প্রধান বাধা বলে মনে করেছেন।

লেখকের মতে, বৈজ্ঞানিক রচনার ভাষা কাব্যের মতো আলংকারিক না হয়ে, অত্যন্ত সরল, স্পষ্ট এবং সরাসরি অর্থবোধক হওয়া উচিত।

বিজ্ঞান বিষয়ে গভীর জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও সাময়িক পত্রিকায় অবিখ্যাত লেখকদের ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করাকেই লেখক 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' বলেছেন, যা সাধারণ পাঠকের জন্য ক্ষতিকর।