প্রলয়োল্লাস (কাজী নজরুল ইসলাম)

কাজী নজরুল ইসলাম রচিত 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, সারাংশ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার লাইনভিত্তিক সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, সারাংশ, এবং পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ, Broad ও ব্যাকরণ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

প্রলয়োল্লাস কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নিবীণা' (১৯২২) থেকে নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় কবি ব্রিটিশ পরাধীনতার অন্ধকার দূর করে এক নতুন, স্বাধীন এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। 'প্রলয়' মানে ধ্বংস আর 'উল্লাস' মানে আনন্দ; অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেই নতুন সৃষ্টির আনন্দ লুকিয়ে আছে, এটাই কবিতার মূল সুর।

কবিতার শুরুতে কবি দেশের যুবসমাজকে 'জয়ধ্বনি' বা জয়ের উল্লাস করতে বলেছেন। কালবোশেখির ঝড়ের মতো নবযৌবনের প্রতীক 'নূতনের কেতন' উড়ছে। ধ্বংসের দেবতা মহাকাল আজ চণ্ড বা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আসছেন পরাধীনতার বন্ধন এবং সমাজের জরাজীর্ণতাকে ধ্বংস করতে। মহাকালের রথের চাকায় নীল আকাশ কেঁপে উঠছে, তারা থেকে উল্কা ছুটছে। এই ধ্বংসলীলা দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ এই প্রলয় হলো নতুন সৃষ্টির বেদনা।

পরাধীন দেশের মানুষ যখন অন্ধকারে ডুবে আছে, দেবতারা যখন বন্দি, তখন এই ধ্বংসের দেবতার আগমনেই নতুন ভোরের আলো ফুটবে। তিনি কেবল ধ্বংস করতেই জানেন না, তিনি 'জীবনহারা অ-সুন্দরে' ধ্বংস করে আবার নতুন করে চিরসুন্দরকে গড়তেও জানেন। তাই কবি দেশের বধূদের প্রদীপ তুলে ধরে এই প্রলয়ঙ্কর অথচ সুন্দর নতুন যুগকে বরণ করে নিতে বলেছেন।

২. কবি পরিচিতি

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬): বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের 'বিদ্রোহী কবি' নামে পরিচিত। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে 'বিজলী' পত্রিকায় তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশিত হলে সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কবি তাঁর লেখায় কেবল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, সমাজের সমস্ত অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর গান ও কবিতা চিরকাল বাঙালিকে উদ্দীপিত করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে- 'অগ্নিবীণা', 'বিষের বাঁশি', 'সাম্যবাদী', 'সর্বহারা', 'ফণীমনসা', 'প্রলয়শিখা', 'ছায়ানট', 'চক্রবাক' প্রভৃতি। আলোচ্য 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি তাঁর 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা।

৩. কবিতার লাইনভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ব্যাখ্যা: কবি দেশের সাধারণ মানুষ এবং স্বাধীনতাকামী যুবসমাজকে সম্বোধন করে জয়ের আনন্দধ্বনি বা 'জয়ধ্বনি' করতে বলেছেন। আকাশে কালবোশেখির ঝড়ের মতো নতুন যুগের বা পরাধীনতা থেকে মুক্তির নিশান বা পতাকা (কেতন) উড়ছে। এই ঝড় পুরানো জঞ্জাল উড়িয়ে দিয়ে নতুনত্ব আনবে, তাই কবি উল্লাস করতে বলেছেন।
আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল,
সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!
ব্যাখ্যা: যিনি এখনও আসেননি (অনাগত), সেই ধ্বংসের নেশায় পাগল দেবতা (মহাদেব বা নটরাজ) এবার আসছেন। তিনি সমুদ্রপারের (আন্দামানের সেলুলার জেলের প্রতীক) বন্দিশালার বড়ো দরজা (সিংহদ্বার) এবং তার শিকল বা খিল (আগল) ধমক দিয়ে বা প্রবল শক্তিতে ভেঙে ফেলছেন।
মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে
মহাকালের চণ্ড-রূপে
ধূম্র-ধূপে
বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!
ব্যাখ্যা: পরাধীন ভারতের অন্ধকার ও মৃত্যুসম কারাগারগুলিতে (অন্ধকূপ) মহাকাল বা শিব তাঁর চণ্ড বা ভয়ংকর বিনাশী রূপ নিয়ে আসছেন। যজ্ঞের ধোঁয়ার মতো (ধূম্র-ধূপ) অন্ধকার পরিবেশে তিনি বজ্রের আগুনের মশাল জ্বেলে ভয়ংকর রূপে অবতীর্ণ হচ্ছেন।
ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ব্যাখ্যা: ধ্বংসের এই ভয়ংকর দেবতা আজ নিজের শক্তিতে হাসছেন। তাঁর এই ধ্বংসের হাসিতে লুকিয়ে আছে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। তাই কবি আবার সবাইকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপটা মেরে গগন দুলায়
সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার চামর চুলায়!
ব্যাখ্যা: মহাকালের তামাটে বা পিঙ্গল রঙের (ঝামর) চুলের ঝাপটায় যেন আকাশ (গগন) কেঁপে উঠছে। আর আকাশপথে ছুটে চলা ভয়ংকর অগ্নুৎপাতকারী (জ্বালামুখী) ধূমকেতু যেন তার জন্য চামর (চামরী গাইয়ের লেজ দিয়ে তৈরি পাখা) দোলাচ্ছে। অর্থাৎ, প্রকৃতিও তাঁর ধ্বংসলীলায় সঙ্গী হয়েছে।
বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
দোদুল দোলে!
ব্যাখ্যা: বিশ্বের পালনকর্তা বা মহাকালের বুকের কাছে রক্তমাখা তলোয়ার বা খড়্গ (কৃপাণ) দুলছে। এই রক্তমাখা তলোয়ার অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসক ও সমাজের জঞ্জাল বিনাশের প্রতীক।
অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর
ওরে ওই স্তব্ধ চরাচর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ব্যাখ্যা: তাঁর আগমনের ভয়ংকর উচ্চ শব্দে বা কোলাহলে (অট্টরোলের হট্টগোলে) সমগ্র পৃথিবী বা চরাচর ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই ভয়ংকর মুহূর্তটি আসলে শুভ, তাই কবি জয়ধ্বনি করতে বলছেন।
দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!
ব্যাখ্যা: মহাকালের জ্বলন্ত দৃষ্টিতে (নয়নকটাক্ষে) যেন দ্বাদশ রবির (পৌরাণিক মতে ১২টি সূর্যের) ভয়ংকর আগুনের জ্বালা লুকিয়ে আছে। আর তাঁর তামাটে (পিঙ্গল) ও এলোমেলো (ত্রস্ত) জটার মধ্যে দিগন্তের সমস্ত অসহায় মানুষের কান্না যেন আশ্রয় পেয়েছে বা লুটিয়ে আছে।
বিন্দু তাহার নয়নজলে
সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে
কপোলতলে!
ব্যাখ্যা: মহাকালের গাল বা কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক বিন্দু চোখের জলেই যেন পৃথিবীর সাতটি মহাসমুদ্রের (সপ্ত মহাসিন্ধু) ঢেউ দুলছে। অর্থাৎ, তাঁর বেদনার গভীরতা সমুদ্রের চেয়েও বিশাল।
বিশ্বমায়ের আসন তারই বিপুল বাহুর পর
হাঁকে ওই 'জয় প্রলয়ঙ্কর!'
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর !!
ব্যাখ্যা: এই ধ্বংসের দেবতা প্রলয়ঙ্কল হলেও, তাঁর বিশাল বাহুর বা শক্তির উপরেই ভারতমাতা বা বিশ্বমায়ের মুক্তির আসন পাতা রয়েছে। তাই চারদিক থেকে 'জয় প্রলয়ঙ্কর' ডাক বা হাঁক উঠছে এবং কবি সবাইকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
মাভৈঃ মাভৈঃ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে
জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে!
ব্যাখ্যা: 'মাভৈঃ' মানে ভয় পেয়ো না। কবি ভয় না পেতে বলেছেন, কারণ জগৎ জুড়ে যে প্রলয় বা ধ্বংস আসছে, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন প্রাণ। সমাজে যারা জরাজীর্ণ, মুমূর্ষু এবং পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, এই বিনাশের মাধ্যমেই তাদের মুক্তি ঘটবে।
এবার মহানিশার শেষে
আসবে ঊষা অরুণ হেসে
করুণ বেশে!
ব্যাখ্যা: পরাধীনতার গভীর অন্ধকার রাত (মহানিশা) এবার শেষ হবে। আর সেই রাতের শেষে করুণ বা স্নিগ্ধ বেশে নতুন সকালের লাল সূর্য (অরুণ) হাসতে হাসতে উদয় হবে। এটি স্বাধীনতার নতুন ভোরের প্রতীক।
দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর
আলো তার ভরবে এবার ঘর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর !!
ব্যাখ্যা: মহাদেব বা দিগম্বরের মাথার জটায় যেমন ছোটো চাঁদের আলো বা কিরণ (কর) হাসে এবং স্নিগ্ধতা ছড়ায়, ঠিক তেমনি এই প্রলয়ের পর নতুন চাঁদের আলোয় পরাধীন ভারতের প্রতিটি ঘর ভরে উঠবে।
ওই সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িৎ চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্রগানে ঝড়-তুফানে!
ব্যাখ্যা: মহাকাল রূপী রথের চালক বা সারথি তাঁর রক্তের মতো লাল ও বিদ্যুতের মতো দ্রুত চাবুক ঘোড়াগুলোর গায়ে মারছেন। এর ফলে ঘোড়ার ডাক (হ্রেষা) বজ্রের গানের মতো ঝড়-তুফান সৃষ্টি করে বেজে (রণিয়ে) উঠছে।
ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!
গগনতলের নীল খিলানে!
ব্যাখ্যা: মহাকালের রথের ঘোড়াগুলোর ক্ষুরের দাপটে আকাশের নীল খিলান বা গম্বুজে থাকা তারাগুলো থেকে যেন উল্কাপাত ঘটছে। অর্থাৎ, তাঁর আগমনে গোটা মহাকাশ আলোড়িত হচ্ছে।
অন্ধ কারার বন্ধ কূপে
দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে
পাষাণ-স্তূপে!
ব্যাখ্যা: পরাধীন ভারতের অন্ধকার কারাগারের বদ্ধ ঘরে, জেলের পাথরের স্তূপে বা বেদিতে (যজ্ঞ-যুপে) ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান বা বিপ্লবীরা (দেবতারা) বলিদানের জন্য বন্দি হয়ে আছেন।
এই তো রে তার আসার সময় ওই রথঘর্ঘর-
শোনা যায় ওই রথঘর্ঘর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ব্যাখ্যা: সেই বন্দি দেবতাদের মুক্ত করতেই মহাকালের আসার সময় হয়েছে এবং তাঁর রথের চাকার ভয়ংকর শব্দ (রথঘর্ঘর) শোনা যাচ্ছে। তাই কবি সবাইকে জয়ের উল্লাস করতে বলেছেন।
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? - প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন - জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!
ব্যাখ্যা: কবি প্রশ্ন করছেন যে ধ্বংস দেখে কেন ভয় পাচ্ছিস? এই ধ্বংস বা প্রলয় আসলে নতুন সৃষ্টির বেদনা বা প্রসববেদনার মতো। নবীন বা নতুন শক্তি আসছে সমাজে থাকা প্রাণহীন এবং অসুন্দর বা খারাপ জিনিসগুলোকে কেটে বা ছেদন করে বাদ দিতে।
তাই সে এমন কেশে বেশে
প্রলয় বয়েও আসছে হেসে
মধুর হেসে।
ব্যাখ্যা: নবীন বা ধ্বংসের দেবতা এই কারণেই এমন ভয়ংকর রূপ বা বেশ ধরে আসছেন। তিনি প্রলয় বা ধ্বংস বয়ে আনলেও, নতুন সৃষ্টির আনন্দে তাঁর মুখে রয়েছে মধুর হাসি।
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর !!
ব্যাখ্যা: তিনি কেবল ধ্বংস করতেই জানেন না, তিনি পুরানো জঞ্জাল ভেঙে আবার নতুন করে চিরস্থায়ী সুন্দর সমাজ গড়তেও জানেন। তাই কবি জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ব্যাখ্যা: ভাঙা এবং গড়া—এই দুটোই মহাকালের খেলা মাত্র। তাই এই ভাঙন বা ধ্বংস দেখে ভয় (ডর) পাওয়ার কিছু নেই।
বধূরা প্রদীপ তুলে ধর।
কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর !!
ব্যাখ্যা: কবি দেশের বধূদের বা নারীদের প্রদীপ তুলে ধরে এই প্রলয়ঙ্কর অথচ সুন্দর নতুন যুগকে বরণ করে নিতে বলেছেন। কারণ, ভয়ংকর কাল বা ধ্বংসের বেশেই আসলে সেই সুন্দর ও স্বাধীন ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে আসছে। তাই জয়ধ্বনি করে তাকে স্বাগত জানানোই আমাদের কর্তব্য।

৪. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ৫০+ টি প্রশ্ন

১. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) কাজী নজরুল ইসলাম (গ) জীবনানন্দ দাশ (ঘ) সুকান্ত ভট্টাচার্য
উত্তর: (খ) কাজী নজরুল ইসলাম
২. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
(ক) বিষের বাঁশি (খ) সাম্যবাদী (গ) অগ্নিবীণা (ঘ) ফণীমনসা
উত্তর: (গ) অগ্নিবীণা
৩. 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থটি কত সালে প্রকাশিত হয়?
(ক) ১৯২১ (খ) ১৯২২ (গ) ১৯২৩ (ঘ) ১৯২৪
উত্তর: (খ) ১৯২২
৪. কবি কাদের জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?
(ক) দেবতাদের (খ) ব্রিটিশদের (গ) তোরা সব (দেশের যুবসমাজ/সাধারণ মানুষ) (ঘ) শিশুদের
উত্তর: (গ) তোরা সব (দেশের যুবসমাজ/সাধারণ মানুষ)
৫. আকাশে কীসের কেতন ওড়ে?
(ক) শান্তির (খ) নূতনের (গ) বিদ্রোহের (ঘ) কালবোশেখির
উত্তর: (খ) নূতনের
৬. 'কেতন' শব্দের অর্থ কী?
(ক) পাখি (খ) ঝড় (গ) পতাকা বা নিশান (ঘ) মেঘ
উত্তর: (গ) পতাকা বা নিশান
৭. নূতনের কেতন কখন ওড়ে?
(ক) কালবোশেখির ঝড়ে (খ) বসন্তে (গ) বর্ষায় (ঘ) হেমন্তে
উত্তর: (ক) কালবোশেখির ঝড়ে
৮. কে এবার আসছে?
(ক) দেবতা (খ) অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল (গ) নবীন (ঘ) সুন্দর
উত্তর: (খ) অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল
৯. ধমক হেনে কী ভাঙল?
(ক) মন্দির (খ) আগল (খিল বা শিকল) (গ) পাহাড় (ঘ) আকাশ
উত্তর: (খ) আগল (খিল বা শিকল)
১০. আগল কোথায় ভাঙল?
(ক) জেলের দরজায় (খ) সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে (গ) বাড়ির দরজায় (ঘ) স্বর্গে
উত্তর: (খ) সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে
১১. মহাকাল কীরূপে আসছেন?
(ক) শান্তরূপে (খ) চণ্ড-রূপে (ভয়ংকর) (গ) শিশুরূপে (ঘ) বৃদ্ধরূপে
উত্তর: (খ) চণ্ড-রূপে (ভয়ংকর)
১২. মহাকাল কোথায় মশাল জ্বেলে আসছেন?
(ক) আকাশে (খ) পাহাড়ে (গ) মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে (ঘ) সমুদ্রে
উত্তর: (গ) মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে
১৩. মহাকালের মশাল কেমন?
(ক) আগুনের (খ) বজ্রশিখার (গ) বিদ্যুতের (ঘ) নক্ষত্রের
উত্তর: (খ) বজ্রশিখার
১৪. মহাকালের চুলের রং কেমন?
(ক) কালো (খ) সাদা (গ) ঝামর (তামাটে বা পিঙ্গল) (ঘ) লাল
উত্তর: (গ) ঝামর (তামাটে বা পিঙ্গল)
১৫. মহাকালের কেশের দোলায় কী দোলে?
(ক) পাহাড় (খ) সমুদ্র (গ) গগন (আকাশ) (ঘ) পৃথিবী
উত্তর: (গ) গগন (আকাশ)
১৬. চামর কে দোলায়?
(ক) বাতাস (খ) সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু (গ) মেঘ (ঘ) চাঁদ
উত্তর: (খ) সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু
১৭. বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে কী ঝোলে?
(ক) মালা (খ) রক্ত তাহার কৃপাণ (রক্তমাখা তলোয়ার) (গ) মশাল (ঘ) চাঁদ
উত্তর: (খ) রক্ত তাহার কৃপাণ (রক্তমাখা তলোয়ার)
১৮. চরাচর কীসে স্তব্ধ?
(ক) ভয়ে (খ) অট্টরোলের হট্টগোলে (গ) বৃষ্টিতে (ঘ) বজ্রপাতে
উত্তর: (খ) অট্টরোলের হট্টগোলে
১৯. মহাকালের নয়নকটায় কীসের বহ্নিজ্বালা আছে?
(ক) আগুনের (খ) বিদ্যুতের (গ) দ্বাদশ রবির (ঘ) নক্ষত্রের
উত্তর: (গ) দ্বাদশ রবির
২০. মহাকালের ত্রস্ত জটায় কী লুটায়?
(ক) ফুল (খ) দিগন্তরের কাঁদন (গ) চাঁদ (ঘ) মেঘ
উত্তর: (খ) দিগন্তরের কাঁদন
২১. মহাকালের এক বিন্দু নয়নজলে কী দোলে?
(ক) পৃথিবী (খ) সপ্ত মহাসিন্ধু (গ) আকাশ (ঘ) পাহাড়
উত্তর: (খ) সপ্ত মহাসিন্ধু
২২. 'কপোল' শব্দের অর্থ কী?
(ক) কপাল (খ) গাল (গ) চোখ (ঘ) চিবুক
উত্তর: (খ) গাল
২৩. বিশ্বমায়ের আসন কোথায়?
(ক) পৃথিবীতে (খ) আকাশে (গ) মহাকালের বিপুল বাহুর পর (ঘ) সমুদ্রে
উত্তর: (গ) মহাকালের বিপুল বাহুর পর
২৪. চারদিক থেকে কী হাঁক উঠছে?
(ক) জয় মা (খ) জয় প্রলয়ঙ্কর (গ) জয় ভারত (ঘ) জয় শিব
উত্তর: (খ) জয় প্রলয়ঙ্কর
২৫. 'মাভৈঃ' শব্দের অর্থ কী?
(ক) এগিয়ে চলো (খ) ভয় পেয়ো না (গ) যুদ্ধ করো (ঘ) জয়ী হও
উত্তর: (খ) ভয় পেয়ো না
২৬. জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ কোথায় লুকানো আছে?
(ক) আকাশে (খ) ওই বিনাশে (ধ্বংসে) (গ) পাতালে (ঘ) সমুদ্রে
উত্তর: (খ) ওই বিনাশে (ধ্বংসে)
২৭. মহানিশার শেষে কে আসবে?
(ক) সকাল (খ) ঊষা অরুণ হেসে (গ) দুপুর (ঘ) বিকেল
উত্তর: (খ) ঊষা অরুণ হেসে
২৮. ঊষা অরুণ কোন বেশে আসবে?
(ক) ভয়ংকর বেশে (খ) করুণ বেশে (স্নিগ্ধ) (গ) রুদ্র বেশে (ঘ) হাসিখুশি বেশে
উত্তর: (খ) করুণ বেশে (স্নিগ্ধ)
২৯. 'দিগম্বর' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
(ক) বিষ্ণুকে (খ) ব্রহ্মাকে (গ) মহাদেব বা শিবকে (ঘ) ইন্দ্রকে
উত্তর: (গ) মহাদেব বা শিবকে
৩০. দিগম্বরের জটায় কী হাসে?
(ক) গঙ্গা (খ) শিশু-চাঁদের কর (গ) সূর্য (ঘ) তারা
উত্তর: (খ) শিশু-চাঁদের কর
৩১. কার আলোয় ঘর ভরবে?
(ক) সূর্যের আলোয় (খ) প্রদীপের আলোয় (গ) শিশু-চাঁদের আলোয় (ঘ) বিদ্যুতের আলোয়
উত্তর: (গ) শিশু-চাঁদের আলোয়
৩২. মহাকাল-সারথি কী হানে?
(ক) তলোয়ার (খ) তির (গ) রক্ত-তড়িৎ চাবুক (ঘ) লাঠি
উত্তর: (গ) রক্ত-তড়িৎ চাবুক
৩৩. 'হ্রেষা' শব্দের অর্থ কী?
(ক) সিংহের গর্জন (খ) হাতির ডাক (গ) ঘোড়ার ডাক (ঘ) মেঘের ডাক
উত্তর: (গ) ঘোড়ার ডাক
৩৪. ক্ষুরের দাপটে কী ছুটে যায়?
(ক) ধুলো (খ) উল্কা (গ) পাথর (ঘ) মেঘ
উত্তর: (খ) উল্কা
৩৫. উল্কা কোথায় ছোটে?
(ক) পৃথিবীতে (খ) নীল খিলানে (আকাশে) (গ) পাতালে (ঘ) সমুদ্রে
উত্তর: (খ) নীল খিলানে (আকাশে)
৩৬. দেবতারা কোথায় বাঁধা আছেন?
(ক) স্বর্গে (খ) যজ্ঞ-যুপে (পাষাণ-স্তূপে) (গ) পাতালে (ঘ) গাছে
উত্তর: (খ) যজ্ঞ-যুপে (পাষাণ-স্তূপে)
৩৭. যজ্ঞ-যূপ কোথায় অবস্থিত?
(ক) খোলা মাঠে (খ) অন্ধ কারার বন্ধ কূপে (গ) পাহাড়ে (ঘ) নদীর ধারে
উত্তর: (খ) অন্ধ কারার বন্ধ কূপে
৩৮. মহাকালের আসার সময় কী শোনা যায়?
(ক) ঢাকের শব্দ (খ) রথঘর্ঘর (রথের চাকার শব্দ) (গ) শাঁখের শব্দ (ঘ) বাঁশির শব্দ
উত্তর: (খ) রথঘর্ঘর (রথের চাকার শব্দ)
৩৯. ধ্বংস দেখে কবি কী করতে নিষেধ করেছেন?
(ক) কাঁদতে (খ) ভয় পেতে (গ) হাসতে (ঘ) পালাতে
উত্তর: (খ) ভয় পেতে
৪০. প্রলয় আসলে কী?
(ক) শুধু মৃত্যু (খ) নূতন সৃজন-বেদন (গ) শাস্তি (ঘ) অভিশাপ
উত্তর: (খ) নূতন সৃজন-বেদন
৪১. নবীন কেন আসছে?
(ক) জীবনহারা অ-সুন্দরে ছেদন করতে (খ) শুধু ধ্বংস করতে (গ) রাজ্য জয় করতে (ঘ) বেড়াতে
উত্তর: (ক) জীবনহারা অ-সুন্দরে ছেদন করতে
৪২. নবীন প্রলয় বয়ে এনেও কীভাবে আসছে?
(ক) রেগে (খ) কেঁদে (গ) মধুর হেসে (ঘ) গর্জন করে
উত্তর: (গ) মধুর হেসে
৪৩. চিরসুন্দর কী করতে জানে?
(ক) শুধু ভাঙতে (খ) শুধু গড়তে (গ) ভেঙে আবার গড়তে (ঘ) পালিয়ে যেতে
উত্তর: (গ) ভেঙে আবার গড়তে
৪৪. কবি কাদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন?
(ক) শিশুদের (খ) বধূদের (গ) বৃদ্ধদের (ঘ) যুবকদের
উত্তর: (খ) বধূদের
৪৫. সুন্দর এবার কোন বেশে আসছে?
(ক) রাজবেশে (খ) কাল-ভয়ংকরের বেশে (গ) ভিখারির বেশে (ঘ) সন্ন্যাসীর বেশে
উত্তর: (খ) কাল-ভয়ংকরের বেশে
৪৬. 'প্রলয়োল্লাস' শব্দের অর্থ কী?
(ক) প্রলয় ও উল্লাস (খ) ধ্বংসের আনন্দ (গ) ভয়ংকর ঝড় (ঘ) নতুন সৃষ্টি
উত্তর: (খ) ধ্বংসের আনন্দ
৪৭. কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত কবিতা কোনটি?
(ক) বিদ্রোহী (খ) মুক্তি (গ) প্রলয়োল্লাস (ঘ) আনন্দময়ীর আগমনে
উত্তর: (খ) মুক্তি
৪৮. 'কৃপাণ' শব্দের অর্থ কী?
(ক) কৃপণ (খ) খড়্গ বা তলোয়ার (গ) দয়া (ঘ) তীর
উত্তর: (খ) খড়্গ বা তলোয়ার
৪৯. 'নীল খিলান' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(ক) নীল রঙের বাড়ি (খ) গম্বুজাকৃতি নীল আকাশ (গ) সমুদ্র (ঘ) পাহাড়
উত্তর: (খ) গম্বুজাকৃতি নীল আকাশ
৫০. 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থে মোট কয়টি কবিতা আছে?
(ক) ১০টি (খ) ১১টি (গ) ১২টি (ঘ) ১৩টি
উত্তর: (গ) ১২টি (যার প্রথম কবিতা প্রলয়োল্লাস)

৫. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ৪০+ টি প্রশ্ন

১. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি কার লেখা এবং কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এবং এটি তাঁর বিখ্যাত 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
২. "তোরা সব জয়ধ্বনি কর!" - কবি কাদের, কেন জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?
উত্তর: কবি পরাধীন দেশের মুক্তিকামী মানুষ এবং যুবসমাজকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন, কারণ ধ্বংসের রূপ ধরে কালবোশেখির ঝড়ের মতো নূতনের বা স্বাধীনতার আগমন ঘটছে।
৩. 'নূতনের কেতন' কীভাবে ওড়ে?
উত্তর: 'নূতনের কেতন' বা নতুন যুগের নিশান কালবোশেখির ঝড়ের মতো তীব্র বেগে পুরোনো জঞ্জাল উড়িয়ে দিয়ে ওড়ে।
৪. "আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল" - 'অনাগত' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'অনাগত' বলতে সেই ভয়ংকর নটরাজ বা মহাকালকে বোঝানো হয়েছে, যিনি এখনও আসেননি কিন্তু ধ্বংসের নেশায় পাগল হয়ে এবার আসছেন।
৫. "সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!" - এখানে 'সিন্ধুপার' ও 'আগল' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'সিন্ধুপার' বলতে সমুদ্রপারের আন্দামানের সেলুলার জেলের বন্দিশালাকে এবং 'আগল' বলতে সেই জেলের দরজার খিল বা শিকলকে বোঝানো হয়েছে।
৬. মহাকাল কোথায় এবং কী জ্বেলে আসছেন?
উত্তর: মহাকাল মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে বা অন্ধকার মৃত্যুসম কারাগারে বজ্রের আগুনের মশাল (বজ্রশিখার মশাল) জ্বেলে আসছেন।
৭. 'ঝামর' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'ঝামর' শব্দের অর্থ হলো তামাটে বা পিঙ্গল বর্ণ। কবিতায় মহাকালের চুলের রং বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
৮. মহাকালের জন্য কে চামর দোলায়?
উত্তর: মহাকালের জন্য সর্বনাশী জ্বালামুখী বা অগ্নুৎপাতকারী ধূমকেতু চামর দোলায়।
৯. "রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে" - 'কৃপাণ' শব্দের অর্থ কী এবং তা কোথায় ঝোলে?
উত্তর: 'কৃপাণ' শব্দের অর্থ হলো খড়্গ বা তলোয়ার। এটি বিশ্বপাতার বা মহাকালের বুকের কাছে দোদুল দোলে।
১০. চরাচর কেন স্তব্ধ হয়ে আছে?
উত্তর: মহাকালের আগমনের ভয়ংকর অট্টরোল বা কোলাহলের কারণে ভয়ে সমগ্র চরাচর স্তব্ধ হয়ে আছে।
১১. মহাকালের নয়নকটাক্ষে কীসের জ্বালা রয়েছে?
উত্তর: মহাকালের ভয়ংকর নয়নকটাক্ষে দ্বাদশ রবির (বারোটি সূর্যের) বহ্নিজ্বালা বা আগুনের জ্বালা লুকিয়ে আছে।
১২. "দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!" - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো, দিগন্তজুড়ে থাকা পরাধীন ও শোষিত মানুষের সমস্ত হাহাকার ও কান্না মহাকালের তামাটে ও এলোমেলো জটায় এসে আশ্রয় পেয়েছে।
১৩. মহাকালের এক বিন্দু চোখের জলে কী দোলে?
উত্তর: মহাকালের গাল বেয়ে পড়া এক বিন্দু চোখের জলেই পৃথিবীর সপ্ত মহাসিন্ধু বা সাতটি মহাসমুদ্রের ঢেউ দোলে।
১৪. বিশ্বমায়ের আসন কোথায় পাতা রয়েছে?
উত্তর: প্রলয়ঙ্কর মহাকালের বিপুল বা বিশাল বাহুর উপরেই ভারতমাতা বা বিশ্বমায়ের মুক্তির আসন পাতা রয়েছে।
১৫. "মাভৈঃ মাভৈঃ!" - শব্দের অর্থ কী এবং কবি কেন একথা বলেছেন?
উত্তর: 'মাভৈঃ' শব্দের অর্থ ভয় পেয়ো না। কবি ভয় না পেতে বলেছেন কারণ এই প্রলয় বা ধ্বংসের মাধ্যমেই জরাজীর্ণতার বিনাশ হয়ে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা পাবে।
১৬. "জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে!" - কথাটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: সমাজে যারা জরাজীর্ণ ও মৃতপ্রায়, মহাকালের এই ধ্বংসলীলা বা বিনাশের মধ্যেই তাদের নতুন করে প্রাণ পাওয়ার এবং মুক্তির বীজ লুকিয়ে আছে।
১৭. "এবার মহানিশার শেষে" - কে, কোন বেশে আসবে?
উত্তর: পরাধীনতারূপী দীর্ঘ অন্ধকার রাত বা মহানিশার শেষে নতুন সকালের সূর্য (ঊষা অরুণ) হাসতে হাসতে করুণ বা স্নিগ্ধ বেশে আসবে।
১৮. 'দিগম্বর' কে এবং তাঁর জটায় কী হাসে?
উত্তর: 'দিগম্বর' হলেন মহাদেব বা শিব। তাঁর জটায় শিশু-চাঁদের কর বা ছোটো চাঁদের স্নিগ্ধ আলো হাসে।
১৯. মহাকাল-সারথি কী হানে?
উত্তর: রথের সারথি রূপী মহাকাল তাঁর ঘোড়াগুলোর গায়ে রক্ত-তড়িৎ বা রক্তের মতো লাল বিদ্যুতের চাবুক হানেন।
২০. 'হ্রেষা' কী এবং তা কীভাবে রণিয়ে ওঠে?
উত্তর: 'হ্রেষা' হলো ঘোড়ার ডাক। মহাকালের চাবুকের আঘাতে ঘোড়ার সেই ডাক বজ্রগানে এবং ঝড়-তুফানে রণিয়ে ওঠে।
২১. "উল্কা ছুটায় নীল খিলানে" - নীল খিলান বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'নীল খিলান' বলতে গম্বুজের মতো দেখতে সুবিশাল নীল আকাশকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে মহাকালের রথের ঘোড়ার ক্ষুরের দাপটে উল্কা ছোটে।
২২. "অন্ধ কারার বন্ধ কূপে" - কারা কোথায় বাঁধা আছেন?
উত্তর: অন্ধকার কারাগারের বদ্ধ ঘরে পাষাণ-স্তূপের যজ্ঞ-যুপে (বলি দেওয়ার হাড়িকাঠে) ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান বা বিপ্লবীরা (দেবতারা) বাঁধা আছেন।
২৩. "এই তো রে তার আসার সময়" - কার আসার সময় হয়েছে এবং কী শোনা যাচ্ছে?
উত্তর: বন্দি দেবতাদের মুক্ত করতে ধ্বংসের দেবতা মহাকালের আসার সময় হয়েছে এবং তাঁর রথের চাকার ভয়ংকর শব্দ (রথঘর্ঘর) শোনা যাচ্ছে।
২৪. "প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!" - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: ধ্বংস দেখেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ প্রসববেদনার মাধ্যমে যেমন নতুন প্রাণের জন্ম হয়, তেমনি এই প্রলয় বা ধ্বংসও হলো নতুন সৃষ্টির বেদনা মাত্র।
২৫. নবীন কেন আসছে?
উত্তর: নবীন শক্তি বা নতুন কাল আসছে সমাজে থাকা প্রাণহীন এবং অসুন্দর বা জঘন্য জিনিসগুলোকে কেটে বা ছেদন করে বাদ দিতে।
২৬. নবীন প্রলয় বয়ে আনলেও কীভাবে আসছে?
উত্তর: নবীন বা ধ্বংসের দেবতা প্রলয় বয়ে আনলেও, নতুন সৃষ্টির আনন্দে তাঁর মুখে মধুর হাসি লেগে আছে।
২৭. "ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!" - কে, কী গড়তে জানে?
উত্তর: ধ্বংসের দেবতা মহাকাল কেবল ধ্বংস করতেই জানেন না, তিনি পুরানো জঞ্জাল ভেঙে আবার নতুন করে চিরসুন্দর ভবিষ্যৎ সমাজ গড়তেও জানেন।
২৮. কবি বধূদের কী করতে বলেছেন?
উত্তর: কবি দেশের বধূদের বা নারীদের প্রদীপ তুলে ধরে এই প্রলয়ঙ্কর অথচ সুন্দর নতুন যুগকে বরণ করে নিতে বলেছেন।
২৯. "কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর!" - সুন্দর কেন কাল-ভয়ংকরের বেশে আসে?
উত্তর: সমাজে জমে থাকা পরাধীনতা ও জঞ্জাল ধ্বংস করার জন্য রুদ্র রূপ প্রয়োজন, তাই সুন্দর ও স্বাধীন ভবিষ্যৎ কাল-ভয়ংকরের বেশ ধরেই আসে।
৩০. 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ কে এঁকেছিলেন?
উত্তর: 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩১. 'প্রলয়োল্লাস' শব্দটি কোন কোন শব্দ নিয়ে গঠিত এবং এর অর্থ কী?
উত্তর: 'প্রলয়োল্লাস' শব্দটি 'প্রলয়' এবং 'উল্লাস' নিয়ে গঠিত। এর অর্থ হলো ধ্বংসের আনন্দ বা ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টির আনন্দ।
৩২. 'অট্টরোল' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'অট্টরোল' শব্দের অর্থ হলো কান ফাটানো প্রচণ্ড শব্দ বা ভীষণ কোলাহল।
৩৩. 'চামর' কী?
উত্তর: 'চামর' হলো চামরী গাইয়ের লেজের লোম দিয়ে তৈরি এক প্রকার পাখা, যা রাজাদের বা দেবতাদের বাতাস করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
৩৪. 'যজ্ঞ-যূপ' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: 'যজ্ঞ-যূপ' বলতে যজ্ঞের সময় পশুকে বলি দেওয়ার জন্য যে কাঠের বা পাথরের খুঁটির সাথে বাঁধা হয় (হাড়িকাঠ), তাকে বোঝায়।
৩৫. 'মুমূর্ষু' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'মুমূর্ষু' শব্দের অর্থ হলো মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা ব্যক্তি, অর্থাৎ যার মৃত্যু আসন্ন বা যে মরণাপন্ন।
৩৬. 'পিঙ্গল' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'পিঙ্গল' শব্দের অর্থ হলো ঈষৎ লাল ও হলদে রঙের মিশ্রণ, তামাটে বা কটা রং।
৩৭. 'ত্রস্ত' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'ত্রস্ত' শব্দের অর্থ হলো ভীত, সন্ত্রস্ত বা এলোমেলো।
৩৮. 'মহানিশা' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: 'মহানিশা' বলতে গভীর রাতকে বোঝায়। এখানে কবি পরাধীনতার দীর্ঘ অন্ধকার ও যন্ত্রণাদায়ক সময়কালকে মহানিশা বলেছেন।
৩৯. 'সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: আকাশে ঝাড়ুর মতো দেখতে লেজবিশিষ্ট উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে ধূমকেতু বলে, যা অগ্নুৎপাত বা অমঙ্গলের সূচক হিসেবে কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে।
৪০. কবি কাজী নজরুল ইসলামকে 'বিদ্রোহী কবি' বলা হয় কেন?
উত্তর: ব্রিটিশ পরাধীনতা এবং সমাজের যাবতীয় অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর কলমকে হাতিয়ার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন বলে তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়।

৬. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ১০ টি প্রশ্ন

১. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু বা মূল ব্যঞ্জনার ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত আলোচ্য কবিতাটির 'প্রলয়োল্লাস' নামকরণ বিষয়বস্তু ও ব্যঞ্জনার দিক থেকে অত্যন্ত সার্থক।

'প্রলয়োল্লাস' শব্দটি 'প্রলয়' (ধ্বংস) এবং 'উল্লাস' (আনন্দ)—এই দুটি শব্দের মিলনে তৈরি। সাধারণত ধ্বংসের মধ্যে মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি হয়, কিন্তু কবি এখানে ধ্বংসের মধ্যে আনন্দের সুর খুঁজে পেয়েছেন। পরাধীন ভারতের জরাজীর্ণ সমাজব্যবস্থা, শোষণ এবং অন্ধকারের অবসান ঘটানোর জন্য কবি মহাকাল রূপী ধ্বংসের দেবতাকে আহ্বান জানিয়েছেন। এই ভয়ংকর দেবতা তাঁর কালবোশেখির ঝড়ের মতো শক্তি দিয়ে পরাধীনতার 'আগল' বা শিকল ভেঙে ফেলবেন। তাঁর এই ধ্বংসলীলায় পৃথিবী কেঁপে উঠলেও, কবি দেশের মানুষকে ভয় পেতে বারণ করেছেন এবং 'জয়ধ্বনি' করতে বলেছেন। কারণ, এই প্রলয় হলো আসলে নতুন সৃষ্টির প্রসববেদনা। ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়েই তিনি নতুন, সুন্দর ও স্বাধীন সমাজ গড়ে তুলবেন। তাই ধ্বংসের মধ্যে নতুন সৃষ্টির যে উল্লাস বা আনন্দ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে, তার নিরিখে 'প্রলয়োল্লাস' নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক।

২. "তোরা সব জয়ধ্বনি কর!" - কবি কাদের উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানিয়েছেন? তাঁর এই আহ্বানের কারণ কী?

উত্তর: উদ্দেশ্য: কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় পরাধীন ভারতের ঘুমন্ত, শোষিত সাধারণ মানুষ এবং স্বাধীনতাকামী যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে এই 'জয়ধ্বনি' বা জয়ের উল্লাস করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আহ্বানের কারণ: পরাধীন ভারতে ব্রিটিশদের অত্যাচারে মানুষ যখন দিশেহারা এবং সমাজের বিপ্লবীরা (দেবতারা) যখন অন্ধকার কারাগারে বন্দি, তখন কবি কালবোশেখির ঝড়ের মতো এক নতুন শক্তির আগমন দেখতে পান। মহাকাল বা নটরাজ তাঁর ভয়ংকর বিনাশী রূপ নিয়ে আসছেন এই পরাধীনতা ও জরাজীর্ণ সমাজকে ধ্বংস করতে। তাঁর আগমনে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠছে, কিন্তু কবি সাধারণ মানুষকে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এই ধ্বংসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। জরাজীর্ণতার বিনাশ ঘটিয়েই তিনি নতুন, সুন্দর এবং স্বাধীন এক সমাজ গড়ে তুলবেন। তাই ধ্বংসের দেবতা প্রলয়ঙ্করকে স্বাগত জানানোর জন্য এবং আসন্ন স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপন করার জন্যই কবি বারবার জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।

৩. "আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল" - 'অনাগত' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তার আগমনের চিত্রটি কবিতা অবলম্বনে বর্ণনা করো।

উত্তর: 'অনাগত' বলতে: 'অনাগত' শব্দের অর্থ যিনি এখনও আসেননি। এখানে 'অনাগত' বলতে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনকারী, ধ্বংস ও সৃষ্টির দেবতা মহাকাল বা নটরাজকে বোঝানো হয়েছে।

আগমনের চিত্র: কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতায় মহাকালের আগমনের এক ভয়ংকর অথচ মহিমান্বিত চিত্র এঁকেছেন। তিনি প্রলয়ের নেশায় পাগল হয়ে উদ্দাম নৃত্য করতে করতে আসছেন। তাঁর হুংকারে সমুদ্রপারের জেলের (আন্দামানের সেলুলার জেল) দরজা ও শিকল ভেঙে পড়ছে। অন্ধকার কারাগারে তিনি বজ্রের মশাল জ্বেলে চণ্ড বা ভয়ংকর রূপে অবতীর্ণ হচ্ছেন। তাঁর পিঙ্গল রঙের চুলের ঝাপটায় আকাশ কেঁপে উঠছে এবং অগ্নুৎপাতকারী ধূমকেতু যেন তাঁকে বাতাস করছে। তাঁর বুকের কাছে ঝুলছে রক্তমাখা কৃপাণ বা তলোয়ার। তাঁর আগমনের অট্টরোলে সমগ্র চরাচর স্তব্ধ হয়ে গেছে। তাঁর চোখের জ্বলন্ত দৃষ্টিতে বারোটি সূর্যের আগুন জ্বলছে এবং তাঁর জটার মধ্যে দিগন্তের মানুষের কান্না লুকিয়ে আছে। তাঁর রথের চাকার ভয়ংকর শব্দে আকাশ থেকে উল্কাপাত হচ্ছে। এভাবেই এক ভয়ংকর অথচ শুভ শক্তির আগমনের চিত্র কবিতায় ফুটে উঠেছে।

৪. "ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? - প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!" - উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: তাৎপর্য বিশ্লেষণ: কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা থেকে উদ্ধৃত এই পঙ্‌ক্তিটির মধ্যে গভীর জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা লুকিয়ে আছে।

সাধারণত 'প্রলয়' বা ধ্বংস মানুষকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে। কিন্তু কবি পরাধীন ভারতের সাধারণ মানুষকে এই ধ্বংস দেখে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন যে এই প্রলয় হলো 'নূতন সৃজন-বেদন' বা নতুন সৃষ্টির প্রসববেদনা। যেমন একজন মা প্রচণ্ড প্রসবযন্ত্রণা সহ্য করার পরই একটি নতুন সন্তানের জন্ম দেন, ঠিক তেমনি সমাজকে নতুন করে গড়তে হলে পুরোনো, পচা এবং জরাজীর্ণ সমাজব্যবস্থাকে আগে ধ্বংস করতে হয়। ব্রিটিশদের অত্যাচার, কুসংস্কার এবং পরাধীনতার অন্ধকারকে ধ্বংস না করলে স্বাধীনতার নতুন ভোর দেখা সম্ভব নয়। তাই মহাকাল বা নটরাজ যে ভয়ংকর ধ্বংসলীলা চালাচ্ছেন, তা আসলে জীবনহারা অসুন্দরকে দূর করে এক নতুন, সুন্দর এবং স্বাধীন ভারত গড়ারই প্রস্তুতি। ধ্বংসের মধ্যেই সৃষ্টির বীজ নিহিত আছে—এটাই হলো এই উক্তিটির মূল তাৎপর্য।

৫. "কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর!" - সুন্দর কেন কাল-ভয়ংকরের বেশে আসে তা কবিতা অবলম্বনে বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় 'সুন্দর' বলতে নতুন, স্বাধীন এবং জঞ্জালমুক্ত এক ভবিষ্যৎকে বোঝানো হয়েছে, যা কাল-ভয়ংকর বা রুদ্র ধ্বংসের দেবতার বেশ ধরে আসছে।

কাল-ভয়ংকরের বেশে আসার কারণ: পরাধীন ভারতে ব্রিটিশদের নির্মম অত্যাচার এবং সমাজের দীর্ঘদিনের কুসংস্কার ও জরাজীর্ণতা এমনভাবে শিকড় গেড়েছিল যে, কোনো শান্ত বা নরম পন্থায় তার সমাধান সম্ভব ছিল না। এই পচা-গলা সমাজব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য প্রয়োজন ছিল এক ভয়ংকর ধ্বংসলীলা বা প্রলয়ের। যেমন কালবোশেখির ঝড় তার ভয়ংকর রূপ দিয়ে প্রকৃতির সমস্ত শুকনো পাতা ও ধুলোবালি উড়িয়ে দিয়ে প্রকৃতিকে সতেজ ও সুন্দর করে তোলে, ঠিক তেমনি পরাধীনতার অন্ধকার দূর করতে মহাকাল তাঁর ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছেন। তাঁর রক্তমাখা তলোয়ার এবং বজ্রের মশাল জরাজীর্ণতাকে ধ্বংস করবে। আর এই ধ্বংসের বুকের ওপর দাঁড়িয়েই প্রতিষ্ঠিত হবে নতুন ও চিরসুন্দর এক সমাজ। তাই সুন্দর বা কল্যাণকর ভবিষ্যৎকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তাকে সাময়িকভাবে কাল-ভয়ংকরের রুদ্র বেশ ধারণ করতে হয়েছে।

৬. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় ধ্বংস ও সৃষ্টির যে দ্বৈত রূপ প্রকাশ পেয়েছে, তা আলোচনা করো।

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় একই সঙ্গে প্রলয় বা ধ্বংস এবং উল্লাস বা সৃষ্টির এক অসামান্য দ্বৈত রূপ প্রকাশ পেয়েছে।

ধ্বংসের রূপ: কবিতার প্রথমাংশে কবি ধ্বংসের দেবতা মহাকালের এক ভয়ংকর রূপ তুলে ধরেছেন। তিনি রক্তমাখা কৃপাণ হাতে, বজ্রের মশাল জ্বেলে এবং দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা নিয়ে আসছেন। তাঁর চুলের ঝাপটায় আকাশ কাঁপছে, রথের চাকায় উল্কা ছুটছে এবং তাঁর অট্টরোলে সমগ্র চরাচর স্তব্ধ। তিনি পরাধীনতার প্রতীক সিন্ধুপারের জেলের শিকল ভেঙে ফেলছেন এবং জীবনহারা অসুন্দরকে ছেদন করছেন। এটি হলো তাঁর রুদ্র ও ধ্বংসাত্মক রূপ।

সৃষ্টির রূপ: কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আনন্দ। কবি বলেছেন এই প্রলয় হলো 'নূতন সৃজন-বেদন'। মহানিশা বা অন্ধকারের শেষে যেমন হাসতে হাসতে নতুন ভোরের সূর্য ওঠে, তেমনি এই ধ্বংসের পরেই দিগম্বরের জটায় থাকা শিশু-চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় চারিদিক ভরে উঠবে। তিনি ভেঙে আবার চিরসুন্দরকে গড়তে জানেন। তাই ধ্বংসের ভয়ংকর রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নতুন সৃষ্টির এই আনন্দ বা উল্লাসই কবিতায় দ্বৈত রূপ হিসেবে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

৭. "অন্ধ কারার বন্ধ কূপে/ দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে/ পাষাণ-স্তূপে!" - এই পঙ্‌ক্তিগুলির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি যখন (১৯২২ সালে) রচিত হয়েছিল, তখন ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশদের পরাধীন। আলোচ্য পঙ্‌ক্তিগুলির মধ্যে সেই সময়কার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

এখানে 'অন্ধ কারা' বা 'পাষাণ-স্তূপ' বলতে ব্রিটিশদের দ্বারা নির্মিত অন্ধকার কারাগারগুলিকে, বিশেষ করে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলকে বোঝানো হয়েছে। আর 'দেবতা' বলতে কবি ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান অর্থাৎ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীদের বুঝিয়েছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য এই বিপ্লবীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাদের নির্মমভাবে অত্যাচার করত এবং ফাঁসির কাঠে ঝোলাত। 'যজ্ঞ-যূপ' বলতে যজ্ঞে পশুবলির হাড়িকাঠকে বোঝায়। এখানে বিপ্লবীদের আত্মবলিদানকেই যজ্ঞের বলিদানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, পরাধীন ভারতের অন্ধকার কারাগারে দেশপ্রেমিক বিপ্লবীরা যে নির্মমভাবে বন্দি হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন, সেই ঐতিহাসিক সত্যটিই এই পঙ্‌ক্তিগুলির মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হয়েছে।

৮. "বধূরা প্রদীপ তুলে ধর।" - বধূদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলার কারণ কী?

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার শেষ দিকে কবি দেশের বধূদের বা নারীদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন। এর পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে।

বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রদীপ হলো মঙ্গল, শুভ এবং স্বাগত জানানোর প্রতীক। সন্ধ্যায় বা কোনো শুভ কাজে, বিশেষ করে নতুন কাউকে বরণ করে নেওয়ার সময় বধূরা মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলে উলুধ্বনি দেয়। কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, পরাধীন ভারতের জরাজীর্ণতা ধ্বংস করার জন্য মহাকাল বা কাল-ভয়ংকর আসছেন। তাঁর এই রুদ্র রূপ দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ এই ভয়ংকর বেশের আড়ালেই লুকিয়ে আছে নতুন, স্বাধীন এবং 'সুন্দর' এক ভবিষ্যৎ। যেহেতু এই প্রলয় আসলে নতুন সৃষ্টির প্রসববেদনা এবং এর মাধ্যমেই পরাধীনতার অন্ধকার দূর হয়ে নতুন চাঁদের আলোয় ঘর ভরে উঠবে, তাই এই আগত শুভ ভবিষ্যৎ বা 'সুন্দর'কে স্বাগত জানানোর জন্যই কবি বধূদের মঙ্গলপ্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন।

৯. "এবার মহানিশার শেষে/ আসবে ঊষা অরুণ হেসে/ করুণ বেশে!" - পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: অন্তর্নিহিত অর্থ: কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা থেকে উদ্ধৃত এই পঙ্‌ক্তিটির মধ্যে পরাধীনতার অন্ধকার দূর হয়ে স্বাধীনতার নতুন ভোরের আশা ব্যক্ত হয়েছে।

'মহানিশা' বলতে গভীর অন্ধকার রাতকে বোঝায়। এখানে এটি পরাধীন ভারতের শোষণ, বঞ্চনা ও কুসংস্কারের দীর্ঘ অন্ধকার যুগকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে 'ঊষা' হলো ভোরের আলো এবং 'অরুণ' হলো নবোদিত সূর্য। প্রকৃতির নিয়মেই যেমন অন্ধকার রাতের পর নতুন সকালের সূর্য হাসতে হাসতে উদিত হয়ে চারদিক আলোকিত করে, ঠিক তেমনি কবি বিশ্বাস করেন যে, মহাকালের প্রলয় বা ধ্বংসলীলার মাধ্যমে পরাধীনতার এই দীর্ঘ অন্ধকার রাতের (মহানিশার) অবসান ঘটবে। আর সেই ধ্বংসের পর 'করুণ' বা স্নিগ্ধ বেশে ভারতের আকাশে স্বাধীনতার নতুন সূর্য হাসতে হাসতে উদিত হবে। অর্থাৎ, ধ্বংসের ভয়ংকর রূপের পরেই যে শান্তি ও নতুন যুগের স্নিগ্ধতা আসবে, সেই আশাবাদী সুরই এখানে ধ্বনিত হয়েছে।

১০. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় কবির বিদ্রোহী ও আশাবাদী মানসিকতা কীভাবে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলা সাহিত্যের 'বিদ্রোহী কবি' বলা হয়। তাঁর 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় এই বিদ্রোহী সত্তার পাশাপাশি এক গভীর আশাবাদী মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

বিদ্রোহী মানসিকতা: কবি পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ শাসন এবং সমাজের জরাজীর্ণতাকে মেনে নেননি। তিনি এর বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তিনি শান্তিতে নয়, কালবোশেখির ঝড় এবং মহাকালের ভয়ংকর রক্তমাখা কৃপাণ বা তলোয়ারের মাধ্যমে এই পচা-গলা সমাজকে সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। সিন্ধুপারের জেলের শিকল ভেঙে ফেলা এবং জীবনহারা অসুন্দরকে ছেদন করার মধ্যে তাঁর চরম বিদ্রোহী সত্তা প্রকাশ পেয়েছে।

আশাবাদী মানসিকতা: শুধু ধ্বংসের ডাক দিয়েই কবি থেমে থাকেননি। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন এই প্রলয় আসলে নতুন সৃষ্টির বেদনা। ধ্বংসের পরেই আসবে ঊষা বা নতুন ভোর। দিগম্বরের জটায় থাকা শিশু-চাঁদের আলোয় সমাজ ভরে উঠবে। তিনি জানেন যে ধ্বংসের দেবতা 'ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!' তাই তিনি ভয় না পেয়ে বধূদের প্রদীপ তুলে ধরে সেই সুন্দরকে বরণ করে নেওয়ার যে ডাক দিয়েছেন, তা তাঁর প্রবল আশাবাদী মানসিকতারই প্রমাণ।

৭. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar) ১৫+ টি প্রশ্ন

কারক ও অকারক সম্পর্ক

  • ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়। - কর্মকারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর! - কর্মকারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপটা মেরে গগন দুলায়। - সম্বন্ধ পদে 'এর' বিভক্তি।
  • বিন্দু তাহার নয়নজলে সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে। - অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।
  • বধুরা প্রদীপ তুলে ধর। - কর্তৃকারকে 'রা' বিভক্তি।

সমাস নির্ণয়

  • প্রলয়োল্লাস: প্রলয় ও উল্লাস (দ্বন্দ্ব সমাস) অথবা প্রলয়জনিত উল্লাস (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)।
  • কালবোশেখি: কাল (ভয়ংকর) যে বোশেখি (কর্মধারয় সমাস)।
  • অন্ধকূপ: অন্ধ (অন্ধকার) যে কূপ (কর্মধারয় সমাস)।
  • বজ্রশিখা: বজ্রের শিখা (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।
  • দিগম্বর: দিক অম্বর (বস্ত্র) যার (বহুব্রীহি সমাস)।
  • চিরসুন্দর: চিরকাল ব্যাপীয়া সুন্দর (ব্যাপ্তি তৎপুরুষ সমাস)।

বাক্য ও বাচ্য পরিবর্তন

  • বাক্য: আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল। (জটিল বাক্যে)
    উত্তর: যে অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল সে এবার আসছে।
  • বাক্য: ওই রথঘর্ঘর শোনা যায়। (অস্ত্যর্থক বাক্যে)
    উত্তর: ওই রথঘর্ঘর শ্রুতিগোচর হয়।
  • বাচ্য: তোরা সব জয়ধ্বনি কর! (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: তোদের সব জয়ধ্বনি করা হোক!
  • বাচ্য: বধূরা প্রদীপ তুলে ধর। (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: বধূদের দ্বারা প্রদীপ তুলে ধরা হোক।

প্রলয়োল্লাস কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এবং এটি তাঁর বিখ্যাত 'অগ্নিবীণা' (১৯২২) কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা।

প্রলয়োল্লাস শব্দটি 'প্রলয়' (ধ্বংস) এবং 'উল্লাস' (আনন্দ) নিয়ে গঠিত। এর অর্থ হলো ধ্বংসের আনন্দ। অর্থাৎ, পুরোনোকে ধ্বংস করে নতুন সৃষ্টির যে আনন্দ, তাকেই প্রলয়োল্লাস বলা হয়েছে।

কারণ এই ধ্বংস বা প্রলয় হলো নতুন সৃষ্টির প্রসববেদনা। পরাধীনতা ও জরাজীর্ণ সমাজকে ধ্বংস না করলে নতুন, সুন্দর ও স্বাধীন সমাজ গড়া সম্ভব নয়। তাই কবি ভয় না পেয়ে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।

'কাল-ভয়ংকর' বলতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুদ্র বা ধ্বংসাত্মক সংগ্রামকে বোঝানো হয়েছে এবং 'সুন্দর' বলতে সেই সংগ্রামের পর আগত স্বাধীন, নতুন ও মঙ্গলময় ভবিষ্যৎকে বোঝানো হয়েছে।