সিন্ধুতীরে (সৈয়দ আলাওল)

সৈয়দ আলাওল রচিত 'পদ্মাবতী' কাব্যের অন্তর্গত 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশের সম্পূর্ণ আলোচনা, সারাংশ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত মধ্যযুগের কবি সৈয়দ আলাওল রচিত 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশের লাইনভিত্তিক সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, সারাংশ, এবং পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ, Broad ও ব্যাকরণ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কাব্যাংশের পটভূমি ও বিষয়সংক্ষেপ

পূর্বকথা (পটভূমি): মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওল রচিত 'পদ্মাবতী' কাব্যের ৩৫তম খণ্ড 'পদ্মা-সমুদ্রখণ্ড' থেকে আলোচ্য 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশটি গৃহীত হয়েছে। কাব্যের মূল কাহিনি অনুযায়ী, চিতোরের রানা রত্নসেন সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতীকে বিবাহ করে দেশে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে সমুদ্রদেবতা ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে রত্নসেনের কাছে তাঁর সর্বস্ব ভিক্ষা চান। রত্নসেন তা প্রত্যাখ্যান করলে সমুদ্রদেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের জাহাজ ডুবিয়ে দেন। একটি কাঠের ভেলায় (মাঞ্জস) পদ্মাবতী এবং তাঁর চার সখী ভাসতে ভাসতে এক অজানা সমুদ্রতীরে এসে পৌঁছান।

কাব্যাংশের বিষয়: সমুদ্রের তীরে যেখানে পদ্মাবতীর ভেলাটি এসে পৌঁছায়, সেটি ছিল এক দিব্য পুরী বা স্বর্গীয় স্থান। সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট ছিল না, শুধু সত্য ও ধর্মের বাস। সেই দেশের সমুদ্র-রাজার কন্যার নামও ছিল পদ্মা। তিনি সমুদ্রতীরে পর্বতের পাশে এক মনোরম ফুলে ফলে ভরা উদ্যান এবং প্রাসাদ (টঙ্গি) তৈরি করেছিলেন। একদিন ভোরে সখীদের নিয়ে সেই উদ্যানে এসে সমুদ্রকন্যা পদ্মা দেখতে পান যে একটি ভেলা পড়ে আছে এবং তার ভেতরে এক অসামান্য রূপবতী কন্যা (পদ্মাবতী) ও তাঁর চার সখী অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে।

পদ্মাবতীর রূপ দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মা অবাক হয়ে যান এবং তাঁকে ইন্দ্রের অভিশাপে স্বর্গভ্রষ্ট কোনো অপ্সরা (বিদ্যাধরী) বলে মনে করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে সমুদ্রের ঝড়ে জাহাজ ডুবে এঁদের এই দুর্দশা হয়েছে। পদ্মাবতীকে দেখে তাঁর মনে গভীর স্নেহের সঞ্চার হয়। তিনি ঈশ্বরকে স্মরণ করে সখীদের নির্দেশ দেন এই মুমূর্ষু কন্যাদের প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে আগুন জ্বেলে সেঁক দিতে এবং তন্ত্র-মন্ত্র ও মহৌষধির সাহায্যে চিকিৎসা করতে। সমুদ্রকন্যা পদ্মা এবং তাঁর সখীদের চার দণ্ড (প্রায় ৯৬ মিনিট) ধরে করা অক্লান্ত সেবার ফলে অবশেষে পদ্মাবতী ও তাঁর চার সখী জ্ঞান ফিরে পান।

২. কবি পরিচিতি

সৈয়দ আলাওল (আনুমানিক ১৬০৭ - ১৬৮০ খ্রিঃ): সপ্তদশ শতাব্দীতে বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার জালালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে অন্যতম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ মুসলমান কবি হলেন সৈয়দ আলাওল। যৌবনে জলদস্যুদের হাতে পড়ে তিনি আরাকানে নীত হন এবং পরে ঘটনাচক্রে আরাকানরাজের অশ্বারোহী সৈন্যদলে নিযুক্ত হন। তাঁর পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে আরাকান রাজসভার প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুর তাঁকে সম্মান দেন। মাগন ঠাকুরের অনুরোধেই তিনি হিন্দি কবি মালিক মহম্মদ জায়সীর 'পদুমাবৎ' কাব্য অবলম্বনে তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'পদ্মাবতী' রচনা করেন। এছাড়াও তিনি 'সয়ফুলমুলুক বাদিওজ্জমাল', 'সপ্তপয়কর', 'তোহফা', 'দারাসেকেন্দরনামা', 'সতীময়না ও লোরচন্দ্রাণী' প্রভৃতি গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনা করেন।

৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
মাঞ্জসভেলা / নৌকা / ডিঙিবিদ্যাধরিস্বর্গীয় অপ্সরী বা গায়িকা
টঙ্গিউঁচুতে তৈরি ঘর / প্রাসাদ / মাচাবাওবাতাস / ঝড়ো হাওয়া
দিব্য পুরীস্বর্গীয় সুন্দর নগরীচিকিৎসিমুচিকিৎসা করব / সারিয়ে তুলব
সুতাকন্যা / মেয়েমোহন্তমহৎ ব্যক্তি / শ্রেষ্ঠ মানুষ
অতিরেকপ্রচুর / আধিক্যআরতিইচ্ছা / প্রার্থনা / অনুরোধ
রম্ভা জিনিস্বর্গের অপ্সরী রম্ভাকেও হার মানায়নিরঞ্জনঈশ্বর / সৃষ্টিকর্তা
নিপতিতাপড়ে আছে এমন (স্ত্রীলিঙ্গ)দন্ড চারিচার দণ্ড সময় (১ দণ্ড = ২৪ মিনিট)
পোতলিপুতুল / পুত্তলিকাবাহুরকফিরে আসুক

৪. কবিতার লাইনভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা

কন্যারে ফেলিল যথা
জলের মাঝারে তথা
দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার।
অতি মনোহর দেশ
নাহি তথা দুঃখ ক্লেশ
সত্য ধর্ম সদা সদাচার ।।
ব্যাখ্যা: সমুদ্রের ঢেউ এসে রত্নসেনের স্ত্রী পদ্মাবতীকে (কন্যাকে) যেখানে ফেলে দিল, সেটি সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত এক স্বর্গীয় সুন্দর নগরী বা দিব্য পুরী। সেই দেশটি অত্যন্ত মনোরম। সেখানে কোনো দুঃখ বা কষ্ট নেই, সেখানে সর্বদা সত্য, ধর্ম এবং সৎ আচরণ বিরাজ করে।
সমুদ্রনৃপতি সুতা
পদ্মা নামে গুণযুতা
সিন্ধুতীরে দেখি দিব্যস্থান।
উপরে পর্বত এক
ফল ফুলে অতিরেক
তার পাশে রচিল উদ্যান।।
ব্যাখ্যা: সমুদ্র-রাজার এক গুণবতী কন্যা (সুতা) ছিলেন, যাঁর নাম পদ্মা (সমুদ্রকন্যা পদ্মা)। তিনি সমুদ্রের তীরে একটি সুন্দর বা স্বর্গীয় স্থান দেখে, সেখানে থাকা ফল-ফুলে ভরা একটি পর্বতের পাশে নিজের জন্য এক মনোরম বাগান বা উদ্যান তৈরি করেছিলেন।
নানা পুষ্প মনোহর
সুগন্ধি সৌরভতর
নানা ফল বৃক্ষ সুলক্ষণ।
তাহাতে বিচিত্র টঙ্গি
হেমরত্বে নানা রঙ্গি
তথা কন্যা থাকে সর্বক্ষণ।।
ব্যাখ্যা: সেই বাগানে সুগন্ধ ছড়ানো নানা রকম সুন্দর সুন্দর ফুল এবং সুলক্ষণযুক্ত ফলের গাছ ছিল। সেই বাগানের ভেতরে সোনা ও রত্ন দিয়ে সাজানো নানা রঙের একটি বিচিত্র ও উঁচু প্রাসাদ বা মাচা (টঙ্গি) ছিল, যেখানে সমুদ্রকন্যা পদ্মা সবসময় থাকতেন।
পিতৃপুরে ছিল নিশি
নানাসুখে খেলি হাসি
যদি হৈল সময় প্রত্যুষ।
সখীগণ করি সঙ্গে
আসিতে উদ্যানে রঙ্গে
সিন্ধুতীরে রহিছে মাঞ্জস।
ব্যাখ্যা: আগের দিন রাতে সমুদ্রকন্যা পদ্মা তাঁর পিতৃগৃহে (সমুদ্ররাজার প্রাসাদে) হাসিখুশি ও নানা সুখে সময় কাটিয়েছিলেন। এরপর যখন ভোর বা সকাল (প্রত্যুষ) হলো, তখন সখীদের সঙ্গে নিয়ে আনন্দে বাগানে আসতে গিয়ে তিনি দেখলেন যে সমুদ্রের তীরে একটি ভেলা (মাঞ্জস) পড়ে আছে।
মনেতে কৌতুক বাসি
তুরিত গমনে আসি
দেখে চারি সখী চারিভিত।
মধ্যেতে যে কন্যাখানি
রূপে অতি রম্ভা জিনি
নিপতিতা চেতন রহিত।
ব্যাখ্যা: ভেলাটি দেখে মনে কৌতূহল জাগায় সমুদ্রকন্যা পদ্মা দ্রুতপায়ে (তুরিত গমনে) সেখানে এলেন। এসে তিনি দেখলেন যে ভেলার চারদিকে চারজন সখী পড়ে আছে এবং তাদের মাঝখানে এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা পড়ে আছে। মাঝখানের কন্যাটির রূপ স্বর্গের অপ্সরী রম্ভাকেও হার মানায়। কিন্তু সে অজ্ঞান বা চেতনাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। (এই কন্যাটি হলেন চিতোরের রানি পদ্মাবতী)।
দেখিয়া রূপের কলা
বিস্মিত হইল বালা
অনুমান করে নিজ চিতে।
ইন্দ্রশাপে বিদ্যাধরি
কিবা স্বর্গভ্রষ্ট করি
অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।।
ব্যাখ্যা: অজ্ঞান কন্যাটির (পদ্মাবতীর) অপরূপ রূপ ও সৌন্দর্য দেখে বালা বা সমুদ্রকন্যা পদ্মা বিস্মিত হলেন। তিনি নিজের মনে অনুমান করলেন যে, হয়তো দেবরাজ ইন্দ্রের কোনো অভিশাপে স্বর্গের অপ্সরী বা বিদ্যাধরী স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে আজ মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
বেকত দেখিয়ে আঁখি
তেন স-বসন সাক্ষী
বেথানিত হৈছে কেশ বেশ।
বুঝি সমুদ্রের নাও
ভাঙ্গিল প্রবল বাও
মোহিত পাইয়া সিন্ধু-ক্লেশ।।
ব্যাখ্যা: কন্যাটির আধবোজা (বেকত) চোখ এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সে চরম দুর্দশার শিকার। তার চুল ও জামাকাপড় এলোমেলো (বেথানিত) হয়ে আছে। সমুদ্রকন্যা পদ্মা পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারলেন যে, সমুদ্রের প্রবল বাতাসে (বাও) এদের নৌকা বা জাহাজ ভেঙে গেছে এবং সমুদ্রের সেই নিদারুণ কষ্টের (সিন্ধু-ক্লেশ) কারণেই এরা আজ অচৈতন্য বা মোহিত হয়ে আছে।
চিত্রের পোতলি সমা
নিপতিত মনোরমা
কিঞ্চিৎ আছয় মাত্র শ্বাস।
অতি স্নেহ ভাবি মনে
বলে পদ্মা ততক্ষণে
বিধি মোরে না কর নৈরাশ।।
ব্যাখ্যা: সেই মনোরমা বা সুন্দরী কন্যাটি ছবির পুতুলের (চিত্রের পোতলি) মতো মাটিতে পড়ে আছে, তার শরীরে শুধু সামান্য একটু শ্বাস-প্রশ্বাস বইছে। এই মুমূর্ষু অবস্থা দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মার মনে গভীর স্নেহের সঞ্চার হলো। তিনি তখনই বিধাতা বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন, "হে বিধাতা, এদের বাঁচানোর যে ইচ্ছা আমার মনে জেগেছে, তাতে তুমি আমাকে নিরাশ কোরো না।"
পিতার পুণ্যের ফলে
মোহর ভাগ্যের বলে
বাহুরক কন্যার জীবন।
চিকিৎসিমু প্রাণপণ
কৃপা কর নিরঞ্জন
দুখিনীরে করিয়া স্মরণ।।
ব্যাখ্যা: সমুদ্রকন্যা পদ্মা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে বললেন, "আমার পিতার পুণ্যকাজের ফলে এবং আমার নিজের ভাগ্যের জোরে এই অজ্ঞান কন্যাটির জীবন যেন ফিরে আসে (বাহুরক)। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে এদের চিকিৎসা করব। হে সৃষ্টিকর্তা নিরঞ্জন, এই দুঃখিনীকে স্মরণ করে আপনি কৃপা করুন।"
সখী সবে আজ্ঞা দিল
উদ্যানের মাঝে নিল
পঞ্চজনে বসনে ঢাকিয়া।
অগ্নি জ্বালি ছেকে গাও
কেহ শিরে কেহ পাও
তন্ত্রে মন্ত্রে মহৌষধি দিয়া ।
ব্যাখ্যা: এরপর পদ্মা তাঁর সখীদের নির্দেশ দিলেন অজ্ঞান পাঁচজনকে (পদ্মাবতী ও তাঁর চার সখী) কাপড় দিয়ে ঢেকে সাবধানে বাগানের ভেতরে নিয়ে আসতে। সেখানে আগুন জ্বেলে তাদের শরীর সেঁক দেওয়া হতে লাগল। কেউ মাথায়, কেউ পায়ে সেঁক দিতে লাগল এবং সাথে সাথে তন্ত্র-মন্ত্র ও মহৌষধির সাহায্যে তাদের চিকিৎসা শুরু হলো।
দন্ড চারি এই মতে
বহু যত্নে চিকিৎসিতে
পঞ্চকন্যা পাইলা চেতন।
শ্রীযুত মাগন গুণী
মোহন্ত আরতি শুনি
হীন আলাওল সুরচন।।
ব্যাখ্যা: এইভাবে চার দণ্ড সময় ধরে (প্রায় ৯৬ মিনিট) বহুরকম যত্নে চিকিৎসা করার পর, সেই পাঁচজন কন্যা (পদ্মাবতী ও তাঁর সখীরা) জ্ঞান বা চেতনা ফিরে পেলেন। কাব্যাংশের শেষে কবি আলাওল তাঁর পৃষ্ঠপোষক, গুণী ও মহৎ ব্যক্তি (মোহন্ত) শ্রীযুত মাগন ঠাকুরের ইচ্ছা বা অনুরোধ (আরতি) শুনে এই সুন্দর কাব্যটি রচনা করেছেন বলে বিনয়ের সঙ্গে (নিজেকে 'হীন' বলে) উল্লেখ করেছেন।

৫. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ৫০+ টি প্রশ্ন

১. 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশটি কার লেখা?
(ক) ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (খ) সৈয়দ আলাওল (গ) কৃত্তিবাস ওঝা (ঘ) মালাধর বসু
উত্তর: (খ) সৈয়দ আলাওল
২. 'সিন্ধুতীরে' অংশটি কোন মূল কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
(ক) সতীময়না (খ) সিকান্দারনামা (গ) পদ্মাবতী (ঘ) তোহফা
উত্তর: (গ) পদ্মাবতী
৩. 'পদ্মাবতী' কাব্যটি কোন হিন্দি কাব্যের অনুবাদ বা ছায়াবলম্বনে রচিত?
(ক) রামচরিতমানস (খ) পদুমাবৎ (গ) দোহাবলী (ঘ) সুরসাগর
উত্তর: (খ) পদুমাবৎ
৪. 'পদুমাবৎ' কাব্যের রচয়িতা কে?
(ক) কবীর (খ) তুলসীদাস (গ) মালিক মহম্মদ জায়সী (ঘ) সুরদাস
উত্তর: (গ) মালিক মহম্মদ জায়সী
৫. 'কন্যারে ফেলিল যথা' - এখানে 'কন্যা' কে?
(ক) সমুদ্রকন্যা পদ্মা (খ) রানি পদ্মাবতী (গ) বিদ্যাধরী (ঘ) সখী
উত্তর: (খ) রানি পদ্মাবতী
৬. কন্যাকে কোথায় ফেলা হয়েছিল?
(ক) নদীর তীরে (খ) দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার (গ) পর্বতের চূড়ায় (ঘ) রাজপ্রাসাদে
উত্তর: (খ) দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার
৭. দিব্য পুরীতে কীসের অভাব ছিল?
(ক) সুখের (খ) ধর্মের (গ) দুঃখ ক্লেশের (ঘ) সত্যের
উত্তর: (গ) দুঃখ ক্লেশের
৮. দিব্য পুরীতে সদা কী থাকে?
(ক) যুদ্ধ ও বিবাদ (খ) সত্য ধর্ম সদা সদাচার (গ) অভাব ও অনটন (ঘ) শুধু বিনোদন
উত্তর: (খ) সত্য ধর্ম সদা সদাচার
৯. 'সমুদ্রনৃপতি সুতা' - সুতা শব্দের অর্থ কী?
(ক) সুতো (খ) স্ত্রী (গ) কন্যা (ঘ) মাতা
উত্তর: (গ) কন্যা
১০. সমুদ্রনৃপতির সুতার নাম কী ছিল?
(ক) পদ্মাবতী (খ) রত্নাবতী (গ) পদ্মা (ঘ) মালতী
উত্তর: (গ) পদ্মা
১১. সমুদ্রকন্যা পদ্মা কোথায় উদ্যান রচনা করেছিলেন?
(ক) পাহাড়ের চূড়ায় (খ) সিন্ধুতীরে পর্বতের পাশে (গ) নদীর তীরে (ঘ) মরুভূমিতে
উত্তর: (খ) সিন্ধুতীরে পর্বতের পাশে
১২. সেই পর্বতটি কীসে পরিপূর্ণ ছিল?
(ক) সোনা-দানায় (খ) ফল ফুলে অতিরেক (গ) পশুপাখিতে (ঘ) বরফে
উত্তর: (খ) ফল ফুলে অতিরেক
১৩. 'টঙ্গি' শব্দের অর্থ কী?
(ক) কুঁড়েঘর (খ) উঁচুতে তৈরি ঘর বা প্রাসাদ (গ) নৌকা (ঘ) রথ
উত্তর: (খ) উঁচুতে তৈরি ঘর বা প্রাসাদ
১৪. টঙ্গিটি কী দিয়ে তৈরি ছিল?
(ক) ইট পাথরে (খ) বাঁশ ও খড়ে (গ) হেমরত্বে (সোনা ও রত্নে) (ঘ) কাঠে
উত্তর: (গ) হেমরত্বে (সোনা ও রত্নে)
১৫. সমুদ্রকন্যা পদ্মা আগের নিশি (রাত) কোথায় কাটিয়েছিলেন?
(ক) উদ্যানে (খ) পিতৃপুরে (গ) সিন্ধুতীরে (ঘ) নৌকায়
উত্তর: (খ) পিতৃপুরে
১৬. কখন পদ্মা সখীদের নিয়ে উদ্যানে এসেছিলেন?
(ক) সন্ধ্যায় (খ) দুপুরে (গ) প্রত্যুষে বা ভোরে (ঘ) মাঝরাতে
উত্তর: (গ) প্রত্যুষে বা ভোরে
১৭. 'সিন্ধুতীরে রহিছে মাঞ্জস' - 'মাঞ্জস' শব্দের অর্থ কী?
(ক) মানুষ (খ) ভেলা বা নৌকা (গ) মাছ (ঘ) মুক্তো
উত্তর: (খ) ভেলা বা নৌকা
১৮. মাঞ্জস দেখে পদ্মার মনে কী হলো?
(ক) ভয় পেলেন (খ) রাগ হলো (গ) কৌতুক বা কৌতূহল জাগল (ঘ) দুঃখ পেলেন
উত্তর: (গ) কৌতুক বা কৌতূহল জাগল
১৯. ভেলার চারিভিত (চারপাশে) কারা পড়ে ছিল?
(ক) চারজন রক্ষী (খ) চারি সখী (গ) চারজন রাজা (ঘ) চারটি পাখি
উত্তর: (খ) চারি সখী
২০. মধ্যে থাকা কন্যাখানির রূপ কাকে হার মানায়?
(ক) চন্দ্রকে (খ) সূর্যকে (গ) স্বর্গের অপ্সরী রম্ভাকে (ঘ) উর্বশীকে
উত্তর: (গ) স্বর্গের অপ্সরী রম্ভাকে
২১. অচৈতন্য কন্যাকে দেখে পদ্মা কী অনুমান করেছিলেন?
(ক) সাধারণ মানুষ (খ) ইন্দ্রশাপে স্বর্গভ্রষ্ট বিদ্যাধরী (গ) দেবী লক্ষ্মী (ঘ) রাজকুমারী
উত্তর: (খ) ইন্দ্রশাপে স্বর্গভ্রষ্ট বিদ্যাধরী
২২. 'বিদ্যাধরি' শব্দের অর্থ কী?
(ক) যিনি বিদ্যা দান করেন (খ) স্বর্গের গায়িকা বা অপ্সরা (গ) দেবী সরস্বতী (ঘ) শিক্ষিকা
উত্তর: (খ) স্বর্গের গায়িকা বা অপ্সরা
২৩. 'বেকত দেখিয়ে আঁখি' - বেকত শব্দের অর্থ কী?
(ক) বন্ধ (খ) অন্ধ (গ) ব্যক্ত বা আধবোজা (ঘ) লাল
উত্তর: (গ) ব্যক্ত বা আধবোজা
২৪. অচৈতন্য কন্যার কেশ ও বেশ কেমন ছিল?
(ক) সুন্দর করে সাজানো (খ) বেথানিত (এলোমেলো) (গ) পরিপাটি (ঘ) ভিজা নয়
উত্তর: (খ) বেথানিত (এলোমেলো)
২৫. নাও বা নৌকা কীসে ভেঙেছে বলে পদ্মা বুঝতে পারলেন?
(ক) জলদস্যুর আক্রমণে (খ) প্রবল বাও (বাতাস) বা ঝড়ে (গ) পাথরে ধাক্কা লেগে (ঘ) হাঙরের আক্রমণে
উত্তর: (খ) প্রবল বাও (বাতাস) বা ঝড়ে
২৬. অচৈতন্য কন্যা কিসের সমতুল্য হয়ে পড়ে ছিল?
(ক) মৃতদেহের (খ) চিত্রের পোতলি সমা (ছবির পুতুলের মতো) (গ) মূর্তির মতো (ঘ) ঘুমের ঘোরে
উত্তর: (খ) চিত্রের পোতলি সমা (ছবির পুতুলের মতো)
২৭. মুমূর্ষু কন্যাদের দেখে পদ্মার মনে কীসের উদয় হলো?
(ক) ভয় (খ) ঘৃণা (গ) অতি স্নেহ (ঘ) বিরক্তি
উত্তর: (গ) অতি স্নেহ
২৮. পদ্মা কার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন?
(ক) সমুদ্ররাজার কাছে (খ) বিধির (ঈশ্বরের) কাছে (গ) ইন্দ্রের কাছে (ঘ) সূর্যদেবের কাছে
উত্তর: (খ) বিধির (ঈশ্বরের) কাছে
২৯. পদ্মা কার পুণ্যের ফলে কন্যাদের জীবন ফিরে চেয়েছিলেন?
(ক) নিজের পুণ্যের (খ) মাতার পুণ্যের (গ) পিতার পুণ্যের (ঘ) সখীদের পুণ্যের
উত্তর: (গ) পিতার পুণ্যের
৩০. 'বাহুরক কন্যার জীবন' - 'বাহুরক' শব্দের অর্থ কী?
(ক) চলে যাক (খ) ফিরে আসুক (গ) ভালো হোক (ঘ) সুন্দর হোক
উত্তর: (খ) ফিরে আসুক
৩১. পদ্মা কাকে স্মরণ করে কৃপা করতে বলেছেন?
(ক) নিরঞ্জনকে (ঈশ্বর) (খ) দেবরাজকে (গ) মহাদেবকে (ঘ) পিতাকে
উত্তর: (ক) নিরঞ্জনকে (ঈশ্বর)
৩২. পদ্মা সখীদের কী আজ্ঞা বা নির্দেশ দিলেন?
(ক) তাদের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে (খ) তাদের বস্ত্রহীন করতে (গ) তাদের বসনে ঢাকিয়া উদ্যানের মাঝে নিতে (ঘ) তাদের ফেলে রেখে চলে যেতে
উত্তর: (গ) তাদের বসনে ঢাকিয়া উদ্যানের মাঝে নিতে
৩৩. কন্যাদের শরীরে কী দিয়ে সেঁক দেওয়া হচ্ছিল?
(ক) গরম জল দিয়ে (খ) অগ্নি জ্বালি বা আগুন জ্বেলে (গ) রোদ দিয়ে (ঘ) পাথর গরম করে
উত্তর: (খ) অগ্নি জ্বালি বা আগুন জ্বেলে
৩৪. কন্যাদের চিকিৎসায় কী প্রয়োগ করা হয়েছিল?
(ক) তন্ত্র মন্ত্র ও মহৌষধি (খ) শুধু ওষুধ (গ) শুধু মন্ত্র (ঘ) সাধারণ লতাপাতা
উত্তর: (ক) তন্ত্র মন্ত্র ও মহৌষধি
৩৫. কতক্ষণ ধরে কন্যাদের চিকিৎসা করা হয়েছিল?
(ক) এক দণ্ড (খ) দুই দণ্ড (গ) তিন দণ্ড (ঘ) দণ্ড চারি (চার দণ্ড)
উত্তর: (ঘ) দণ্ড চারি (চার দণ্ড)
৩৬. এক দণ্ড সমান কত মিনিট?
(ক) ২০ মিনিট (খ) ২৪ মিনিট (গ) ৩০ মিনিট (ঘ) ৬০ মিনিট
উত্তর: (খ) ২৪ মিনিট
৩৭. কতজন কন্যা অবশেষে চেতনা ফিরে পেয়েছিল?
(ক) তিনজন (খ) চারজন (গ) পঞ্চকন্যা (পাঁচজন) (ঘ) ছয়জন
উত্তর: (গ) পঞ্চকন্যা (পাঁচজন)
৩৮. 'শ্রীযুত মাগন গুণী' - মাগন কে ছিলেন?
(ক) আরাকান রাজসভার প্রধানমন্ত্রী (খ) কবি আলাওলের পিতা (গ) সমুদ্ররাজা (ঘ) রত্নসেন
উত্তর: (ক) আরাকান রাজসভার প্রধানমন্ত্রী
৩৯. 'মোহন্ত আরতি শুনি' - 'আরতি' শব্দের অর্থ কী?
(ক) পূজা (খ) আরতি করা (গ) ইচ্ছা বা অনুরোধ (ঘ) গান গাওয়া
উত্তর: (গ) ইচ্ছা বা অনুরোধ
৪০. কবি আলাওল নিজেকে কী বলে উল্লেখ করেছেন?
(ক) শ্রেষ্ঠ (খ) হীন বা বিনয়ী (গ) মহৎ (ঘ) গর্বিত
উত্তর: (খ) হীন বা বিনয়ী
৪১. সমুদ্রকন্যা পদ্মার চরিত্রের প্রধান গুণ কী প্রকাশ পেয়েছে?
(ক) অহংকার (খ) নিষ্ঠুরতা (গ) পরোপকার ও গভীর স্নেহ (ঘ) উদাসীনতা
উত্তর: (গ) পরোপকার ও গভীর স্নেহ
৪২. 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশটি কোন ছন্দে রচিত?
(ক) অমিত্রাক্ষর (খ) পয়ার ও ত্রিপদী (গ) মাত্রাবৃত্ত (ঘ) স্বরবৃত্ত
উত্তর: (খ) পয়ার ও ত্রিপদী
৪৩. 'সৈয়দ আলাওল' কোন যুগের কবি ছিলেন?
(ক) প্রাচীন যুগ (খ) আদি-মধ্য যুগ (গ) মধ্যযুগ (সপ্তদশ শতাব্দী) (ঘ) আধুনিক যুগ
উত্তর: (গ) মধ্যযুগ (সপ্তদশ শতাব্দী)
৪৪. পদ্মাবতীকে কীসের শিকার হতে হয়েছিল?
(ক) শত্রুর আক্রমণের (খ) সমুদ্রের ঝড়ের বা সিন্ধু-ক্লেশের (গ) মহামারির (ঘ) সাপের কামড়ের
উত্তর: (খ) সমুদ্রের ঝড়ের বা সিন্ধু-ক্লেশের
৪৫. 'সিন্ধু-ক্লেশ' শব্দের অর্থ কী?
(ক) সমুদ্রের কষ্ট বা দুর্যোগ (খ) সমুদ্রের মাছ (গ) সমুদ্রের জল (ঘ) সমুদ্রের তীর
উত্তর: (ক) সমুদ্রের কষ্ট বা দুর্যোগ
৪৬. 'বেথানিত' শব্দের অর্থ কী?
(ক) সুন্দর (খ) অগোছালো বা এলোমেলো (গ) পরিপাটি (ঘ) রঙিন
উত্তর: (খ) অগোছালো বা এলোমেলো
৪৭. 'পোতলি' শব্দের সমার্থক শব্দ কোনটি?
(ক) পুতুল (খ) নৌকা (গ) পাতা (ঘ) পোশাক
উত্তর: (ক) পুতুল
৪৮. সমুদ্রকন্যা পদ্মা পদ্মাবতীর রূপ দেখে কী হয়েছিলেন?
(ক) ক্রুদ্ধ (খ) বিস্মিত (গ) আনন্দিত (ঘ) লজ্জিত
উত্তর: (খ) বিস্মিত
৪৯. পদ্মার প্রাসাদে (টঙ্গিতে) কীসের অভাব ছিল না?
(ক) দুঃখের (খ) দারিদ্র্যের (গ) সুখ ও ঐশ্বর্যের (ঘ) বিপদের
উত্তর: (গ) সুখ ও ঐশ্বর্যের
৫০. 'পদ্মাবতী' কাব্যের মূল ভাষা কী ছিল?
(ক) অবধী (হিন্দি) (খ) ফারসি (গ) আরবি (ঘ) সংস্কৃত
উত্তর: (ক) অবধী (হিন্দি)

৬. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ৪০+ টি প্রশ্ন

১. 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশটির রচয়িতা কে এবং এটি কোন মূল কাব্যের অংশ?
উত্তর: কাব্যাংশটির রচয়িতা মধ্যযুগের কবি সৈয়দ আলাওল এবং এটি তাঁর বিখ্যাত 'পদ্মাবতী' কাব্যের অংশ।
২. রানি পদ্মাবতীকে কোথায় ফেলা হয়েছিল?
উত্তর: সমুদ্রের প্রবল ঢেউ রানি পদ্মাবতী ও তাঁর সখীদের ভাসিয়ে নিয়ে সমুদ্রের মাঝখানে এক দিব্য পুরী বা স্বর্গীয় দেশে তীরে ফেলেছিল।
৩. দিব্য পুরীর পরিবেশ কেমন ছিল?
উত্তর: দিব্য পুরীটি ছিল অতি মনোহর একটি দেশ, যেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট ছিল না এবং সেখানে সর্বদা সত্য ও ধর্ম পালিত হতো।
৪. সমুদ্রনৃপতির কন্যার নাম কী ছিল?
উত্তর: সমুদ্রনৃপতি বা সমুদ্ররাজার কন্যার নাম ছিল পদ্মা।
৫. সমুদ্রকন্যা পদ্মা কোথায় উদ্যান রচনা করেছিলেন?
উত্তর: সমুদ্রকন্যা পদ্মা সিন্ধুতীরে ফল-ফুলে ভরা একটি পর্বতের পাশে তাঁর মনোরম উদ্যানটি রচনা করেছিলেন।
৬. পদ্মার উদ্যানে কী কী গাছ ছিল?
উত্তর: পদ্মার উদ্যানে সুগন্ধি ফুল এবং সুলক্ষণযুক্ত নানা রকম ফলের গাছ ছিল।
৭. 'টঙ্গি' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'টঙ্গি' বলতে পদ্মার উদ্যানে থাকা সোনা ও রত্ন দিয়ে তৈরি নানা রঙের একটি উঁচুতে অবস্থিত ঘর বা প্রাসাদকে বোঝানো হয়েছে।
৮. সমুদ্রকন্যা পদ্মা আগের রাত কোথায় কাটিয়েছিলেন?
উত্তর: সমুদ্রকন্যা পদ্মা আগের রাতটি নানা সুখে ও হাসিখুশিতে তাঁর পিতৃপুরে বা পিতার প্রাসাদে কাটিয়েছিলেন।
৯. ভোরে সখীদের সঙ্গে উদ্যানে আসার সময় পদ্মা কী দেখতে পান?
উত্তর: ভোরে সখীদের সঙ্গে উদ্যানে আসার সময় পদ্মা দেখতে পান যে সমুদ্রের তীরে একটি ভেলা বা মাঞ্জস পড়ে আছে।
১০. ভেলাটির ভেতরে পদ্মা কী দৃশ্য দেখেছিলেন?
উত্তর: ভেলাটির ভেতরে পদ্মা দেখতে পান যে চারদিকে চারজন সখী এবং তাদের মাঝখানে এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।
১১. পদ্মাবতীর রূপকে কবি কার সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: অচৈতন্য পদ্মাবতীর অপূর্ব রূপকে কবি স্বর্গের অপ্সরী রম্ভার রূপের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে তুলনা করেছেন।
১২. অচৈতন্য পদ্মাবতীকে দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মার কী অনুমান হয়েছিল?
উত্তর: পদ্মাবতীর রূপ দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মার অনুমান হয়েছিল যে, ইনি হয়তো ইন্দ্রের অভিশাপে স্বর্গভ্রষ্ট হওয়া কোনো বিদ্যাধরী বা স্বর্গের অপ্সরী।
১৩. পদ্মাবতীর চোখ ও পোশাক কেমন অবস্থায় ছিল?
উত্তর: পদ্মাবতীর চোখ আধবোজা (বেকত) ছিল এবং তাঁর পোশাক ও চুল এলোমেলো (বেথানিত) অবস্থায় ছিল।
১৪. সমুদ্রকন্যা পদ্মা নৌকো ভাঙার কারণ হিসেবে কী ভেবেছিলেন?
উত্তর: পদ্মা ভেবেছিলেন যে সমুদ্রের প্রবল বাতাস বা ঝড়ে এদের নৌকা ভেঙে গেছে এবং সমুদ্রের ক্লেশ সহ্য করেই এরা অচৈতন্য হয়ে পড়েছে।
১৫. 'চিত্রের পোতলি সমা' - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো ছবির পুতুলের মতো। অচৈতন্য পদ্মাবতীকে দেখতে ঠিক একটি সুন্দর আঁকা ছবির পুতুলের মতোই স্থির দেখাচ্ছিল।
১৬. পদ্মাবতীর শরীরে কী অবশিষ্ট ছিল?
উত্তর: মুমূর্ষু পদ্মাবতীর শরীরে শুধুমাত্র সামান্য একটু শ্বাস-প্রশ্বাস (কিঞ্চিৎ শ্বাস) অবশিষ্ট ছিল।
১৭. মুমূর্ষু কন্যাদের দেখে পদ্মার মনে কী অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল?
উত্তর: মুমূর্ষু কন্যাদের দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মার মনে গভীর স্নেহ এবং দয়ার সৃষ্টি হয়েছিল।
১৮. পদ্মা বিধাতার কাছে কী প্রার্থনা করেছিলেন?
উত্তর: পদ্মা বিধাতার কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন যে, তিনি যেন এদের বাঁচানোর চেষ্টায় পদ্মাকে নিরাশ না করেন।
১৯. কার পুণ্যের ফলে পদ্মা কন্যাদের জীবন ফিরে চেয়েছিলেন?
উত্তর: পদ্মা তাঁর নিজের ভাগ্যের জোরে এবং তাঁর ধার্মিক পিতার পুণ্যকাজের ফলে কন্যাদের জীবন ফিরে চেয়েছিলেন।
২০. 'কৃপা কর নিরঞ্জন' - এখানে নিরঞ্জন কে?
উত্তর: এখানে 'নিরঞ্জন' বলতে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাকে বোঝানো হয়েছে, যাঁর কাছে পদ্মা কৃপা প্রার্থনা করেছিলেন।
২১. পদ্মা তাঁর সখীদের কী নির্দেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: পদ্মা সখীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ওই পাঁচজনকে কাপড় দিয়ে ঢেকে সাবধানে উদ্যানের মাঝখানে নিয়ে আসতে।
২২. কন্যাদের শরীর কীভাবে গরম করা হচ্ছিল?
উত্তর: উদ্যানের মাঝে আগুন জ্বেলে সখীরা অচৈতন্য কন্যাদের মাথায় এবং পায়ে সেঁক দিয়ে শরীর গরম করছিল।
২৩. সেঁক দেওয়ার পাশাপাশি কন্যাদের চিকিৎসায় আর কী কী ব্যবহার করা হয়েছিল?
উত্তর: আগুনের সেঁক দেওয়ার পাশাপাশি কন্যাদের জ্ঞান ফেরানোর জন্য তন্ত্র-মন্ত্র এবং মহৌষধি ব্যবহার করা হয়েছিল।
২৪. কতক্ষণ ধরে চিকিৎসা করা হয়েছিল?
উত্তর: চার দণ্ড (দণ্ড চারি) অর্থাৎ প্রায় ৯৬ মিনিট ধরে বহু যত্ন সহকারে কন্যাদের চিকিৎসা করা হয়েছিল।
২৫. চিকিৎসার ফল কী হয়েছিল?
উত্তর: সমুদ্রকন্যা পদ্মা এবং তাঁর সখীদের ঐকান্তিক সেবার ফলে পদ্মাবতীসহ পঞ্চকন্যা তাদের চেতনা বা জ্ঞান ফিরে পেয়েছিল।
২৬. 'শ্রীযুত মাগন গুণী' কে ছিলেন?
উত্তর: শ্রীযুত মাগন ঠাকুর ছিলেন আরাকান রাজসভার একজন গুণী প্রধানমন্ত্রী এবং কবি আলাওলের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
২৭. কবি কার অনুরোধে 'পদ্মাবতী' কাব্য রচনা করেন?
উত্তর: কবি সৈয়দ আলাওল আরাকান রাজসভার প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের অনুরোধে বা ইচ্ছায় (আরতি) 'পদ্মাবতী' কাব্য রচনা করেন।
২৮. কবি আলাওল নিজেকে 'হীন' বলেছেন কেন?
উত্তর: মধ্যযুগের কবিদের স্বভাবসুলভ বিনয় প্রকাশের জন্যই কবি আলাওল নিজেকে 'হীন' বা অধম বলে উল্লেখ করেছেন।
২৯. 'দিব্য পুরী' কোথায় অবস্থিত ছিল?
উত্তর: কাব্যে বর্ণিত 'দিব্য পুরী' বা স্বর্গীয় নগরীটি সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত ছিল।
৩০. 'বাহুরক' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'বাহুরক' একটি প্রাচীন বাংলা শব্দ, যার অর্থ হলো 'ফিরে আসুক'। পদ্মা মুমূর্ষু কন্যাদের জীবন ফিরে আসার প্রার্থনায় এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
৩১. 'সদাচার' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'সদাচার' শব্দের অর্থ হলো সৎ আচরণ বা ভালো ব্যবহার, যা দিব্য পুরীতে সর্বদা দেখা যেত।
৩২. 'মাঞ্জস' শব্দটির আধুনিক অর্থ কী?
উত্তর: 'মাঞ্জস' শব্দটির আধুনিক অর্থ হলো মান্দাস বা ভেলা, যেটিতে করে পদ্মাবতী ভেসে এসেছিলেন।
৩৩. পদ্মার বাগানের ফল ও ফুল কেমন ছিল?
উত্তর: পদ্মার বাগানের ফুলগুলি ছিল সুগন্ধি মনোহর এবং ফলের গাছগুলি ছিল সুলক্ষণযুক্ত।
৩৪. 'বিদ্যাধরি' কারা?
উত্তর: হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী বিদ্যাধরী হলেন স্বর্গের গায়িকা বা অপ্সরী, যারা নৃত্য ও গীতে পারদর্শী।
৩৫. 'মোহিত পাইয়া সিন্ধু-ক্লেশ' - 'মোহিত' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: এখানে 'মোহিত' শব্দের অর্থ হলো মুর্ছিত, অজ্ঞান বা অচেতন হওয়া।
৩৬. 'পোতলি' কী?
উত্তর: 'পোতলি' শব্দের অর্থ হলো পুত্তলিকা বা পুতুল।
৩৭. পদ্মা কীভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে পদ্মাবতীরা সমুদ্রের ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন?
উত্তর: ভেলার মধ্যে থাকা কন্যাদের এলোমেলো চুল, বিধ্বস্ত পোশাক এবং অচৈতন্য অবস্থা দেখেই পদ্মা বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা সমুদ্রের প্রবল ঝড়ের কবলে পড়েছিল।
৩৮. 'পঞ্চজনে বসনে ঢাকিয়া' - কেন তাদের বসনে বা কাপড়ে ঢাকা হয়েছিল?
উত্তর: সমুদ্রের জলে ভিজে তাদের শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল এবং নারী হিসেবে তাদের শালীনতা রক্ষার জন্যই সখীরা তাদের বসন বা কাপড় দিয়ে ঢেকে নিয়েছিল।
৩৯. 'পদ্মাবতী' কাব্যটি কোন ভাষায় রচিত হয়েছিল?
উত্তর: সৈয়দ আলাওলের 'পদ্মাবতী' কাব্যটি বাংলা ভাষায় রচিত হলেও এটি মালিক মহম্মদ জায়সীর অবধী ভাষায় লেখা 'পদুমাবৎ' কাব্যের অনুবাদ।
৪০. 'দুখিনী' বলে কাকে স্মরণ করা হয়েছে?
উত্তর: এখানে 'দুখিনী' বলতে সমুদ্রকন্যা পদ্মা নিজেকেই বুঝিয়েছেন এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন তিনি এই দুখিনীর ডাক শোনেন।

৭. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ১০ টি প্রশ্ন

১. 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশে সমুদ্রকন্যা পদ্মার চরিত্রটি কীভাবে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশে সমুদ্র-রাজার কন্যা পদ্মা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উজ্জ্বল চরিত্র। তাঁর চরিত্রে নিম্নলিখিত গুণাবলি ফুটে উঠেছে:

১. সৌন্দর্যবোধ ও রুচিশীলতা: কাব্যাংশের শুরুতেই দেখা যায়, সমুদ্রকন্যা পদ্মা সমুদ্রতীরে এক পর্বতের পাশে অত্যন্ত রুচিশীলভাবে একটি মনোরম বাগান তৈরি করেছেন, যেখানে সুগন্ধি ফুল, ফলের গাছ এবং রত্নখচিত প্রাসাদ রয়েছে। এটি তাঁর সৌন্দর্যবোধের পরিচয় দেয়।
২. সহমর্মিতা ও দয়া: সকালে সমুদ্রতীরে একটি ভেলার মধ্যে পাঁচজন মুমূর্ষু কন্যাকে পড়ে থাকতে দেখে পদ্মার মনে গভীর স্নেহের সঞ্চার হয়। অচেনা হওয়া সত্ত্বেও তাদের দুর্দশা দেখে তিনি ব্যথিত হন এবং তাদের বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।
৩. দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্ব: শুধু মায়া দেখিয়েই তিনি থেমে থাকেননি, দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন। সখীদের নির্দেশ দিয়ে ওই পাঁচজন কন্যাকে সাবধানে প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে আগুন জ্বেলে সেঁক দিতে এবং তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে চিকিৎসা করার নির্দেশ দেন। তাঁর এই নিখুঁত পরিচালনা একজন আদর্শ নেত্রীর পরিচয় বহন করে।
৪. ঈশ্বরভক্তি ও বিনয়: মুমূর্ষু কন্যাদের জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি অহংকার না করে ঈশ্বরের (নিরঞ্জন) কাছে কৃপা প্রার্থনা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে তাঁর পিতার পুণ্য এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদেই এদের জীবন ফিরে আসা সম্ভব।
সার্বিকভাবে, সমুদ্রকন্যা পদ্মা হলেন এক পরম দয়ালু, মানবিক এবং স্নেহশীলা নারী, যাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই রানি পদ্মাবতী ও তাঁর সখীরা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিলেন।

২. "কন্যারে ফেলিল যথা / জলের মাঝারে তথা / দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার।" - 'কন্যা' কে? 'দিব্য পুরী'র বর্ণনা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: 'কন্যা'র পরিচয়: সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশে উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিতে 'কন্যা' বলতে চিতোরের রানা রত্নসেনের স্ত্রী, সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতীকে বোঝানো হয়েছে, যিনি সমুদ্রের ঝড়ে জাহাজডুবির ফলে একটি ভেলায় ভাসতে ভাসতে সমুদ্রতীরে এসে পৌঁছেছিলেন।

দিব্য পুরীর বর্ণনা: রানি পদ্মাবতীর ভেলাটি ভাসতে ভাসতে সমুদ্রের মাঝে যে স্থানে এসে পৌঁছেছিল, কবি তাকে 'দিব্য পুরী' বা স্বর্গীয় নগরী বলেছেন। এই স্থানটি ছিল অতি মনোহর এবং শান্তিময়। সেখানে সাধারণ পৃথিবীর মতো কোনো দুঃখ, কষ্ট বা ক্লেশ ছিল না। সেখানকার মানুষেরা সবসময় সত্য কথা বলত এবং ধর্ম ও সদাচার মেনে চলত।
এই দিব্য পুরীর সমুদ্রতীরে একটি পর্বত ছিল, যা ফল ও ফুলে পরিপূর্ণ ছিল। সেই পর্বতের পাশেই সমুদ্ররাজার কন্যা পদ্মা একটি সুন্দর উদ্যান রচনা করেছিলেন। বাগানে নানা রকম সুগন্ধি ফুল এবং সুলক্ষণযুক্ত ফলের গাছ ছিল। উদ্যানের মাঝখানে সোনা ও রত্ন দিয়ে সাজানো নানা রঙের একটি বিচিত্র ও উঁচু প্রাসাদ (টঙ্গি) ছিল, যেখানে সমুদ্রকন্যা পদ্মা বসবাস করতেন। সব মিলিয়ে স্থানটি ছিল এক আদর্শ ও স্বর্গীয় শান্তির আশ্রয়স্থল।

৩. "ইন্দ্রশাপে বিদ্যাধরি / কিবা স্বর্গভ্রষ্ট করি / অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।।" - উক্তিটির বক্তা কে? এমন অনুমানের কারণ কী?

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন সমুদ্র-রাজার কন্যা পদ্মা, যিনি ভোরে সমুদ্রতীরে ঘুরতে এসে ভেলায় পড়ে থাকা এক অচৈতন্য কন্যাকে (রানি পদ্মাবতীকে) দেখে এই মন্তব্যটি করেছিলেন।

অনুমানের কারণ: সকালে সমুদ্রকন্যা পদ্মা তাঁর সখীদের নিয়ে যখন সমুদ্রতীরে আসেন, তখন একটি ভেলার মধ্যে চারজন সখীর মাঝখানে এক অচৈতন্য কন্যাকে পড়ে থাকতে দেখেন। সেই কন্যাটি ছিলেন রানি পদ্মাবতী। তাঁর রূপ ছিল এমনই অপরূপ যে, স্বর্গের সেরা অপ্সরী রম্ভাও যেন তাঁর কাছে হার মানে। সাধারণ মানুষের এমন অলৌকিক রূপ হতে পারে না, এই ভাবনা থেকেই পদ্মার মনে হয় যে ইনি নিশ্চয়ই স্বর্গের কোনো অপ্সরী বা বিদ্যাধরী। হিন্দু পুরাণ মতে, স্বর্গের দেবতারা বা অপ্সরীরা কোনো অপরাধ করলে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁদের অভিশাপ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাতেন। অচৈতন্য পদ্মাবতীর ঐশ্বরিক রূপ এবং সমুদ্রতীরে তাঁর এই অসহায় ও অচেতন অবস্থা দেখেই সমুদ্রকন্যা পদ্মার মনে হয়েছিল যে, ইনি হয়তো ইন্দ্রের অভিশাপেই স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে আজ মাটিতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন।

৪. "তন্ত্রে মন্ত্রে মহৌষধি দিয়া" - কাদের, কীভাবে চিকিৎসা করা হয়েছিল তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।

উত্তর: যাদের চিকিৎসা করা হয়েছিল: সমুদ্রের প্রবল ঝড়ে জাহাজডুবির ফলে একটি কাঠের ভেলায় করে ভাসতে ভাসতে অচৈতন্য অবস্থায় তীরে এসে পৌঁছানো রানি পদ্মাবতী এবং তাঁর চারজন সখীর চিকিৎসা করা হয়েছিল।

চিকিৎসার বিবরণ: সকালে সমুদ্রতীরে ভেলায় অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকা পাঁচজন কন্যাকে দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মার মনে গভীর স্নেহের সঞ্চার হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে প্রবল সামুদ্রিক ঝড়ে এদের এই দুর্দশা হয়েছে এবং এদের দেহে সামান্য শ্বাস অবশিষ্ট আছে। তিনি দ্রুত তাঁর সখীদের নির্দেশ দেন এই মুমূর্ষু কন্যাদের কাপড় দিয়ে ঢেকে সাবধানে উদ্যানের মাঝখানে নিয়ে আসতে।
উদ্যানের ভেতরে নিয়ে আসার পর তাদের বাঁচানোর জন্য শুরু হয় প্রাণপণ চেষ্টা। প্রথমে আগুন জ্বেলে তাদের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শরীরে সেঁক দেওয়া হতে থাকে। কেউ মাথায়, কেউ বা পায়ে সেঁক দিতে থাকে। এর পাশাপাশি তৎকালীন যুগের প্রথা অনুযায়ী তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ, মন্ত্রোচ্চারণ এবং মহামূল্যবান ঔষধি (মহৌষধি) প্রয়োগ করা হয়। সমুদ্রকন্যা পদ্মা এবং তাঁর সখীদের এই ঐকান্তিক সেবায় চার দণ্ড (প্রায় ৯৬ মিনিট) ধরে বহু যত্নে চিকিৎসা করার পর অবশেষে পদ্মাবতীসহ সেই পাঁচজন কন্যা তাদের চেতনা বা জ্ঞান ফিরে পান।

৫. "পিতার পুণ্যের ফলে / মোহর ভাগ্যের বলে / বাহুরক কন্যার জীবন।" - উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: তাৎপর্য বিশ্লেষণ: উদ্ধৃত উক্তিটি সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশ থেকে গৃহীত। উক্তিটি সমুদ্র-রাজার কন্যা পদ্মার।

সকালে সমুদ্রতীরে একটি ভেলার মধ্যে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকা রানি পদ্মাবতী এবং তাঁর চার সখীকে দেখে সমুদ্রকন্যা পদ্মার হৃদয় করুণায় ভোরে ওঠে। তিনি দেখতে পান যে, ছবির পুতুলের মতো পড়ে থাকা সেই অপূর্ব সুন্দরী কন্যার শরীরে কেবল সামান্য একটু শ্বাস অবশিষ্ট আছে। এই মুমূর্ষু কন্যাদের বাঁচিয়ে তোলার জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্প নেন। কিন্তু তিনি এও জানেন যে জীবন-মৃত্যু মানুষের হাতে নেই, তা ঈশ্বরের অধীন। তাই তিনি অহংকার না করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন।
তিনি ঈশ্বরকে বলেন, তাঁর পিতা সমুদ্ররাজা অত্যন্ত ধার্মিক ও পুণ্যবান ব্যক্তি। পিতার সেই পুণ্যকর্মের ফলস্বরূপ এবং নিজের ভাগ্যের জোরে তিনি যেন এই মুমূর্ষু কন্যাদের জীবন ফিরিয়ে আনতে পারেন। 'বাহুরক' শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। নিজের কোনো ক্ষমতার বড়াই না করে পিতা ও ঈশ্বরের ওপর এই অগাধ নির্ভরতা এবং মুমূর্ষু মানুষের প্রতি এই গভীর সহমর্মিতাই এই উক্তির মূল তাৎপর্য। এটি পদ্মার চরিত্রের পবিত্রতা ও মানবিকতাকে উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলে।

৮. ব্যাকরণ ও নির্মিতি (Grammar & Composition) সিলেবাস অনুযায়ী

কারক ও অকারক সম্পর্ক

  • কন্যারে ফেলিল যথা জলের মাঝারে তথা - কর্মকারকে 'রে' বিভক্তি।
  • জলের মাঝারে তথা দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার। - সম্বন্ধ পদে 'এর' বিভক্তি।
  • তন্ত্রে মন্ত্রে মহৌষধি দিয়া। - করণ কারকে 'এ' বিভক্তি (তন্ত্র ও মন্ত্রের দ্বারা)।
  • পিতার পুণ্যের ফলে মোহর ভাগ্যের বলে - সম্বন্ধ পদে 'র' বিভক্তি।
  • অগ্নি জ্বালি ছেকে গাও - কর্মকারকে 'শূন্য' বিভক্তি।
  • সিন্ধুতীরে রহিছে মাঞ্জস। - অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

সমাস নির্ণয়

  • সমুদ্রনৃপতি: সমুদ্রের নৃপতি (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।
  • সিন্ধুতীর: সিন্ধুর তীর (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)।
  • বিদ্যাধরি: বিদ্যা ধারণ করে যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)।
  • মহৌষধি: মহা (মহৎ) যে ঔষধি (সাধারণ কর্মধারয় সমাস)।
  • স্বর্গভ্রষ্ট: স্বর্গ থেকে ভ্রষ্ট (অপাদান তৎপুরুষ সমাস)।
  • পঞ্চকন্যা: পঞ্চ (পাঁচ) কন্যার সমাহার (দ্বিগু সমাস)।

বাক্য ও বাচ্য পরিবর্তন

  • বাক্য: অতি মনোহর দেশ, নাহি তথা দুঃখ ক্লেশ। (জটিল বাক্যে)
    উত্তর: দেশটি যে অতি মনোহর, সেখানে কোনো দুঃখ ক্লেশ নেই। / যে দেশটি অতি মনোহর, সেখানে কোনো দুঃখ ক্লেশ নেই।
  • বাক্য: সখী সবে আজ্ঞা দিল, উদ্যানের মাঝে নিল। (সরল বাক্যে)
    উত্তর: সখীদের আজ্ঞা দিয়ে তাদের উদ্যানের মাঝে নেওয়া হলো।
  • বাচ্য: কন্যারে ফেলিল যথা। (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: কন্যাকে ফেলা হলো যথা।
  • বাচ্য: বিধি মোরে না কর নৈরাশ। (কর্মবাচ্যে)
    উত্তর: বিধির দ্বারা আমি যেন নৈরাশ না হই।

নির্মিতি (অনুশীলনের জন্য)

  • কাল্পনিক সংলাপ: সমুদ্রকন্যা পদ্মা এবং অচৈতন্য অবস্থা থেকে সবেমাত্র জ্ঞান ফেরা পদ্মাবতীর মধ্যে প্রথম সাক্ষাতের একটি কাল্পনিক সংলাপ রচনা করো।
  • প্রতিবেদন রচনা: "ভয়াবহ সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে পর্যটকবাহী নৌকাডুবি, স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাহসিকতায় উদ্ধার ৫ জন।" - এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন রচনা করো।
  • প্রবন্ধ রচনা: "মানবিকতা ও মানুষের ধর্ম" অথবা "প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপন্ন মানবতা"।
  • বঙ্গানুবাদ: Compassion is the greatest virtue of human life. When Padma saw the unconscious women on the sea shore, she did not think about who they were. She only saw human beings in distress. Her motherly affection and quick medical care saved five lives. This shows that humanity has no boundaries.
    (অনুবাদ: সহমর্মিতা হলো মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। পদ্মা যখন সমুদ্রের তীরে অচৈতন্য নারীদের দেখলেন, তখন তিনি ভাবেননি যে তাঁরা কে। তিনি কেবল বিপন্ন মানুষদেরই দেখেছিলেন। তাঁর মাতৃসুলভ স্নেহ এবং দ্রুত চিকিৎসায় পাঁচটি জীবন রক্ষা পেয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে মানবতার কোনো সীমানা নেই।)

সিন্ধুতীরে কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কাব্যাংশটি মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলমান কবি সৈয়দ আলাওলের লেখা এবং এটি তাঁর বিখ্যাত অনুবাদমূলক কাব্য 'পদ্মাবতী'র অন্তর্গত।

এখানে 'কন্যা' বলতে চিতোরের রানা রত্নসেনের স্ত্রী, সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতীকে বোঝানো হয়েছে, যিনি সমুদ্রের ঝড়ে জাহাজডুবির পর ভেলায় ভাসতে ভাসতে তীরে এসে পৌঁছেছিলেন।

সমুদ্র-রাজার কন্যা পদ্মা সকালে তাঁর বাগানের কাছে সমুদ্রতীরে অচৈতন্য কন্যাদের দেখতে পান। তিনি তাঁর সখীদের সাহায্যে তাদের বাগানে নিয়ে গিয়ে আগুন জ্বেলে সেঁক দিয়ে এবং তন্ত্র-মন্ত্র ও মহৌষধির সাহায্যে তাদের চিকিৎসা করে জ্ঞান ফেরান।

কবি আলাওল আরাকান রাজসভার গুণী প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের অনুরোধে বা নির্দেশে 'পদ্মাবতী' কাব্য রচনা করেন।