প্রবন্ধ: বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান (Bangla Bhasay Biggan)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal

প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ

রাজশেখর বসুর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধটি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক রচনা। লেখক পাঠকদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন: এক, ইংরেজি না জানা সাধারণ পাঠক এবং দুই, ইংরেজি জানা বিজ্ঞান-পড়া পাঠক। তিনি দেখিয়েছেন, প্রথম শ্রেণির পাঠকদের পরিভাষা শিখতে অসুবিধা হয় না, কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকদের ইংরেজি ভাষার প্রতি পক্ষপাত ছাড়তে হয়।

প্রাবন্ধিক বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রধান বাধা হিসেবে 'পারিভাষিক শব্দের অভাব'-কে চিহ্নিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ১৯৩৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, উপযুক্ত বাংলা শব্দ না পাওয়া গেলে ইংরেজি শব্দই বাংলা বানানে চালানো উচিত।

এছাড়াও, তিনি লেখকদের রচনারীতির সমস্যার কথা বলেছেন। অনেক লেখক ইংরেজিতে ভেবে বাংলায় আক্ষরিক অনুবাদ করেন, ফলে ভাষা আড়ষ্ট ও উৎকট হয় (যেমন 'Sensitized paper'-এর অনুবাদ 'স্পর্শকাতর কাগজ')। তিনি বৈজ্ঞানিক রচনায় অলংকারের ব্যবহার (বিশেষত উপমা ও রূপক ছাড়া) বর্জন করে ভাষাকে সরল ও স্পষ্ট করার ওপর জোর দিয়েছেন। পরিশেষে, তিনি 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' প্রবাদটি উল্লেখ করে, অবিখ্যাত লেখকদের ভুল বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখা ছাপার আগে তা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)

  1. বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার একটি প্রধান বাধা হল - (MADHYAMIK - 2024)

    • (ক) বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা
    • (খ) ইংরেজির প্রতি আকর্ষণ
    • (গ) বাংলা পারিভাষিক শব্দ কম
    • (ঘ) বাংলা পারিভাষিক শব্দ বেশি

    উত্তর: (গ) বাংলা পারিভাষিক শব্দ কম

  2. কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কত সালে পরিভাষা সমিতি নিযুক্ত করেন? (MADHYAMIK - 2025)

    • (ক) ১৯৩৫ সালে
    • (খ) ১৯৩৬ সালে
    • (গ) ১৯৪৫ সালে
    • (ঘ) ১৯৪৬ সালে

    উত্তর: (খ) ১৯৩৬ সালে

  3. ছেলেবেলায় লেখককে কোন্ বাংলা জ্যামিতি পড়তে হয়েছিল?

    • (ক) ব্রহ্মমোহন মল্লিকের
    • (খ) কেশবচন্দ্র নাগের
    • (গ) রাজশেখর বসুর
    • (ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের

    উত্তর: (ক) ব্রহ্মমোহন মল্লিকের

  4. ''হিমালয় যেন পৃথিবীর মানদণ্ড''- উক্তিটি কার?

    • (ক) রবীন্দ্রনাথের
    • (খ) কালিদাসের
    • (গ) ভবভূতির
    • (ঘ) রাজশেখর বসুর

    উত্তর: (খ) কালিদাসের (এটি কাব্যের উপযুক্ত, ভূগোলের নয়)।

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

  1. অবিখ্যাত লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে কী সতর্কতা নেওয়া উচিত? (MADHYAMIK - 2024)

    উত্তর: রাজশেখর বসুর মতে, অবিখ্যাত লেখকের বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে সম্পাদকের উচিত অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে সেই লেখা যাচাই করে নেওয়া, কারণ 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' এবং ভুল লেখা সাধারণ পাঠকের পক্ষে অনিষ্টকর।

  2. "তার ফলে তাঁদের চেষ্টা অধিকতর সফল হয়েছে।" - 'তার ফলে' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? (MADHYAMIK - 2024)

    উত্তর: 'তার ফলে' বলতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নিযুক্ত পরিভাষা সমিতির সমবেত প্রচেষ্টার ফলকে বোঝানো হয়েছে। এই সমিতিতে বিভিন্ন বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্বজ্ঞ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং লেখকরা 'একযোগে কাজ' করেছিলেন বলে তাঁদের চেষ্টা সফল হয়েছিল।

  3. পরিভাষার উদ্দেশ্য কী? (MADHYAMIK - 2025)

    উত্তর: রাজশেখর বসুর মতে, পরিভাষার উদ্দেশ্য হলো ভাষার সংক্ষেপ এবং অর্থ সুনির্দিষ্ট করা।

  4. "তাতে অনেকে মুশকিলে পড়েছেন," - কিসে 'মুশকিলে' পড়ার কথা বলা হয়েছে? (MADHYAMIK - 2025)

    উত্তর: সরকার যখন রাজকার্যে ইংরেজি শব্দের বদলে ক্রমে ক্রমে দেশি পরিভাষা বা বাংলা শব্দ চালাচ্ছেন, তাতে অনেক কর্মচারী মুশকিলে পড়েছেন, কারণ তাঁদের সেই নতুন বাংলা পরিভাষাগুলি আবার করে শিখতে হচ্ছে।

  5. Sensitized paper-এর কী ধরনের অনুবাদকে লেখক 'উৎকট' বলেছেন?

    উত্তর: Sensitized paper-এর আক্ষরিক অনুবাদ 'স্পর্শকাতর কাগজ'-কে লেখক 'অতি উৎকট' বলেছেন। তাঁর মতে 'সুগ্রাহী কাগজ' লিখলে ঠিক হয়।

প্রসঙ্গ নির্দেশ করে কমবেশি ৬০টি শব্দের মধ্যে উত্তর

  1. ''এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না।''—কোন্ দোষের কথা বলা হয়েছে?

    উত্তর: প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে লেখকদের ভাষারীতিগত একটি ত্রুটির কথা বলেছেন। অনেক লেখক ইংরেজিতে ভাবেন এবং তা বাংলায় আক্ষরিক অনুবাদ করার চেষ্টা করেন। এর ফলে বাংলা ভাষার স্বকীয়তা নষ্ট হয় এবং রচনা 'আড়ষ্ট' ও 'উৎকট' হয়ে পড়ে। লেখক একেই একটি বড় 'দোষ' বলে মনে করেছেন, যা বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

  2. ''বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক''—এই মন্তব্যের সাপেক্ষে লেখকের মতামত কী?

    উত্তর: লেখক রাজশেখর বসু মনে করেন, বৈজ্ঞানিক রচনায় ভাষার সরলতা ও স্পষ্টতা অপরিহার্য। এই প্রসঙ্গে তিনি শব্দের ত্রিবিধ অর্থের (অভিধা, লক্ষণা, ব্যঞ্জনা) উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, সাধারণ সাহিত্যে লক্ষণা, ব্যঞ্জনা বা অন্যান্য অলংকার (উৎপ্রেক্ষা, অতিশয়োক্তি) চললেও, বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে এগুলি বর্জন করা উচিত। বিজ্ঞানের রচনায় মূলত শব্দের 'অভিধা' বা আভিধানিক অর্থই কাম্য। প্রয়োজনে উপমা বা রূপক ব্যবহার করা গেলেও, ভাষাকে জটিল করা চলবে না।

রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)

  1. বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার সমস্যাগুলি আলোচনা করো। (MADHYAMIK - 2024)

    উত্তর: রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে একাধিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ:

    ১. **পারিভাষিক শব্দের অভাব:** বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রধান বাধা হলো উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অপ্রতুলতা। যদিও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৬ সালে পরিভাষা সমিতি গঠন করে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিল, তবুও তা যথেষ্ট নয়।

    ২. **লেখকদের রচনারীতি:** অনেক লেখকের বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনারীতি আড়ষ্ট এবং তা ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে পড়ে। তাঁরা ইংরেজিতে ভেবে বাংলায় লেখেন, ফলে বাংলা ভাষার স্বকীয়তা নষ্ট হয়। যেমন 'Sensitized paper'-এর অনুবাদ 'স্পর্শকাতর কাগজ' করা হয়, যা লেখকের মতে উৎকট।

    ৩. **পাঠক শ্রেণির সমস্যা:** এদেশের সাধারণ পাঠকের বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় কম। তাই তাঁদের জন্য গোড়া থেকে সহজ করে না লিখলে লেখা বোধগম্য হয় না।

    ৪. **ভুল তথ্যের প্রবণতা:** অনেক সময় সাময়িকপত্রগুলিতে অবিখ্যাত লেখকদের 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী' ধরনের ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশিত হয়, যা সাধারণ পাঠকের পক্ষে অত্যন্ত অনিষ্টকর।

  2. ''এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না।'' - কোন্ দোষের কথা বলা হয়েছে? কীভাবে এই দোষ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব বলে লেখক মনে করেন? (MADHYAMIK - 2025)

    উত্তর: প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে লেখকদের ভাষাগত একটি ত্রুটির কথা বলেছেন। এই 'দোষ'টি হলো ইংরেজিতে চিন্তা করে তার আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করা, যার ফলে রচনা আড়ষ্ট, উৎকট এবং বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

    মুক্তির উপায়: এই দোষ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য লেখক দুটি উপায়ের কথা বলেছেন:
    ১. **আক্ষরিক অনুবাদ বর্জন:** লেখকদের আক্ষরিক বা 'মাছিমারা নকল' বর্জন করতে হবে। যেমন, 'When sulphur burns in air the nitrogen does not take part in the reaction'-এর অনুবাদ 'যখন গন্ধক হাওয়ায় পোড়ে তখন নাইট্রোজেন প্রতিক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে না' না লিখে, 'নাইট্রোজেনের কোনো পরিবর্তন হয় না' লিখলে তা বাংলা ভাষার প্রকৃতিসম্মত হয়।
    ২. **ভাষার সরলতা ও স্পষ্টতা:** বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা অত্যন্ত সরল ও স্পষ্ট হতে হবে। সাধারণ সাহিত্যের মতো লক্ষণা, ব্যঞ্জনা বা অন্যান্য অলংকার (উপমা ও রূপক ব্যতীত) বর্জন করতে হবে, যাতে ভাষার অর্থ নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা তৈরি না হয়।