নাটক: সিরাজদ্দৌলা (Sirajuddaula)
নাটকের সারসংক্ষেপ
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশটি পলাশির যুদ্ধের ঠিক আগের মুহূর্তের এক উত্তাল দরবার কক্ষের চিত্র। নাটকের শুরুতে নবাব সিরাজদ্দৌলা ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটসকে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের হুমকির চিঠি এবং ওয়াটসের নিজের লেখা ষড়যন্ত্রের চিঠির জন্য তীব্র ভর্ৎসনা করে দরবার থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর তিনি ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-কে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাহায্য করতে না পারার জন্য লজ্জা ও অক্ষমতা প্রকাশ করেন।
এরপরই দরবারের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জগৎশেঠ, রাজবল্লভ এবং সেনাপতি মীরজাফরের সঙ্গে নবাবের তীব্র বাদানুবাদ হয়। নবাব তাঁদের বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও, বাংলার এই দুর্দিনে তাঁদের একজোট হওয়ার জন্য আবেদন করেন। তিনি বলেন, "বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।" নবাবের এই দেশপ্রেমের আবেদনে মীরজাফর, মোহনলাল, মীরমদন সকলেই পলাশির প্রান্তরে নবাবের হয়ে যুদ্ধ করার শপথ নেন।
কিন্তু নাটকের শেষে নবাবের পিসি ঘসেটি বেগমের আগমনে আবার অশুভ ইঙ্গিত ঘনিয়ে আসে। ঘসেটি বেগম সিরাজের পতন কামনা করেন। নবাব-পত্নী লুৎফা এই পরিস্থিতিতে ভীত হয়ে পড়েন। সিরাজ তখন লুৎফার কাছে তাঁর পনেরো মাসের রাজত্বের যন্ত্রণার কথা এবং পলাশির আসন্ন যুদ্ধের কথা বলেন, যা হয়তো তাঁর 'শেষ যুদ্ধ' হতে চলেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
-
"আমার এই অক্ষমতার জন্যে তোমরা আমাকে ক্ষমা করো।" - নবাব কার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন?
উত্তর: (গ) ফরাসিদের (মঁসিয়ে লা-এর কাছে)
-
"বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-" - বক্তা কে?
উত্তর: (গ) সিরাজ
-
"ওর নিশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন, ওর অঙ্গ-সঞ্চালনে ভূমিকম্প!" - কার সম্পর্কে এই উক্তি?
উত্তর: (ঘ) ঘসেটি বেগম (বক্তা: লুৎফা)
-
সিরাজদ্দৌলার দরবার থেকে কে বিতাড়িত হয়েছিলেন?
উত্তর: (খ) ওয়াটস
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
-
"I will kindle such a flame..." - কে, কাকে এই হুমকি দিয়েছিলেন?
উত্তর: ইংরেজ অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, নবাব সিরাজদ্দৌলাকে এই হুমকি দিয়েছিলেন।
-
"It is impossible to rely upon the Nabob..." - এই পত্রটি কে লিখেছিলেন?
উত্তর: এই পত্রটি ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস, কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন।
-
'পলাশি, রাক্ষসী পলাশি!' - সিরাজ পলাশিকে 'রাক্ষসী' বলেছেন কেন?
উত্তর: পলাশির প্রান্তর লাখে লাখে পলাশ ফুলের মতো রাঙা হতে চায়, তাই তার বুকে রক্তের তৃষ্ণা। এই রক্ততৃষ্ণার জন্যই সিরাজ পলাশিকে 'রাক্ষসী' বলেছেন।
-
ঘসেটি বেগম সিরাজকে কোথায় বন্দি করে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ করেন?
উত্তর: ঘসেটি বেগমের অভিযোগ, সিরাজ তাঁকে ছল করে ধরে এনে 'পাপ-পুরীতে' বন্দিনী করে রেখেছেন।
প্রসঙ্গ নির্দেশ করে কমবেশি ৬০টি শব্দের মধ্যে উত্তর
-
"বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, তার শ্যামল প্রান্তরে আজ রক্তের আলপনা” - বক্তা কে? কোন্ দুর্যোগের কথা বলা হয়েছে? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: এই উক্তিটির বক্তা হলেন বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা।
এখানে 'দুর্যোগ' বলতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আসন্ন আক্রমণের কথা বলা হয়েছে। ক্লাইভের নেতৃত্বে কোম্পানির ফৌজ পলাশির প্রান্তরের দিকে এগিয়ে আসছিল। এই আসন্ন যুদ্ধ এবং মীরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভদের মতো সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতাই বাংলার আকাশে 'দুর্যোগের ঘনঘটা' রূপে আবির্ভূত হয়েছিল। -
"ওকে ওর প্রাসাদে পাঠিয়ে দিন জাঁহাপনা। ওর সঙ্গে থাকতে আমার ভয় হয়।" - বক্তা কে? তার এরকম ভয় হওয়ার কারণ কী? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: এই উক্তিটির বক্তা হলেন নবাব সিরাজদ্দৌলার পত্নী লুৎফা-উন্নিসা। 'ওকে' বলতে নবাবের পিসি ঘসেটি বেগমকে বোঝানো হয়েছে।
ঘসেটি বেগম ছিলেন সিরাজের তীব্র প্রতিহিংসাপরায়ণ। তিনি সিরাজের পতন ও মৃত্যু কামনা করতেন। তাঁর মুখে সিরাজের সর্বনাশের অভিশাপ শুনে লুৎফা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। লুৎফার মনে হয়েছিল, ঘসেটি বেগমের "নিশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন, ওর অঙ্গ-সঞ্চালনে ভূমিকম্প"। এই কারণেই তিনি ঘসেটি বেগমের সঙ্গে এক প্রাসাদে থাকতে ভয় পেয়েছিলেন। -
"তোমাদের কাছে আমি লজ্জিত।" - কে কার কাছে লজ্জিত? তাঁর লজ্জিত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো। (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-এর কাছে ('তোমাদের' বলতে ফরাসিদের কাছে) লজ্জিত।
লজ্জিত হওয়ার কারণ: ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় বাণিজ্য করলেও কখনও নবাবের সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করেনি। কিন্তু ইংরেজরা নবাবের সম্মতি না নিয়েই ফরাসিদের চন্দননগর কুঠি অধিকার করে। ফরাসিরা এর প্রতিকার চেয়ে নবাবের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র (মীরজাফর, জগৎশেঠদের বিশ্বাসঘাতকতা) এবং ইংরেজদের সঙ্গে আসন্ন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে নবাবের পক্ষে ফরাসিদের সাহায্য করা সম্ভব ছিল না। মিত্রপক্ষকে এই বিপদের দিনে সাহায্য করতে না পারার কারণেই নবাব লজ্জিত ছিলেন। -
"জানি না, আজ কার রক্ত সে চায়।" বক্তা কে? বক্তার এমন মন্তব্যের কারণ কী? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: এই উক্তিটির বক্তা নবাব সিরাজদ্দৌলা।
মন্তব্যের কারণ: পলাশির প্রান্তরে ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ আসন্ন। সিরাজ জানতেন, এই যুদ্ধে বহু রক্তপাত হবে। 'পলাশি' নামটি 'পলাশ' ফুল থেকে এসেছে, যার রঙ রক্তের মতো লাল। তাই নবাবের মনে হয়েছে, পলাশ ফুলের মতো রক্তিম হওয়ার জন্যই পলাশির প্রান্তর যেন 'রক্তের তৃষা' নিয়ে অপেক্ষা করছে। এই প্রেক্ষাপটেই সিরাজ এমন মন্তব্য করেছেন যে, তিনি জানেন না আজ পলাশির মাটি কার (ইংরেজ না বাংলার) রক্ত চায়। -
"তার সামান্য পরিচয় আজ দিয়ে রাখলাম।" - কার উদ্দেশ্যে বক্তা এই কথা বলেছেন? তিনি কী 'সামান্য পরিচয়' দিয়ে রাখলেন? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: নবাব সিরাজদ্দৌলা তাঁর সভাসদদের (বিশেষত রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, মীরজাফরদের) উদ্দেশ্যে এই কথা বলেছেন।
নবাব তাঁর সভাসদদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি নির্বোধ বা অত্যাচারী নন। তিনি সকলের ষড়যন্ত্রের খবর রাখেন। এরই 'সামান্য পরিচয়' স্বরূপ তিনি ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস-এর লেখা দুটি ষড়যন্ত্রমূলক চিঠি দরবারে প্রকাশ করেন। একটি চিঠি ছিল অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের হুমকি-পত্র এবং অন্যটি ছিল স্বয়ং ওয়াটসের লেখা, যেখানে সে চন্দননগর আক্রমণের পরামর্শ দিয়েছিল। -
"আজ আপনাদের কাছে এই ভিক্ষা যে, ..." - 'আপনাদের' বলতে বক্তা কাদের বুঝিয়েছেন? তিনি কেন, কী 'ভিক্ষা' চেয়েছেন? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: বক্তা নবাব সিরাজদ্দৌলা 'আপনাদের' বলতে তাঁর সভাসদ মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ প্রমুখকে বুঝিয়েছেন।
ভিক্ষা চাওয়ার কারণ: নবাব জানতেন যে ইংরেজদের আসন্ন আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে বাংলার স্বাধীনতা বিপন্ন। এই 'দুর্দিনে' তিনি সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে সভাসদদের একজোট করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি 'ভিক্ষা' চেয়েছেন যে, সভাসদরা যেন বাংলার এই বিপদে তাঁকে ত্যাগ না করেন এবং বাংলার মান, মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
-
'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশ অবলম্বনে সিরাজদ্দৌলার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের 'সিরাজদ্দৌলা' নাট্যাংশে নবাব সিরাজদ্দৌলার চরিত্রের একাধিক দিক ফুটে উঠেছে:
১. **দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক:** সিরাজের চরিত্রের প্রধান গুণ তাঁর দেশপ্রেম। তিনি ইংরেজদের ঔদ্ধত্য এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তাঁর কাছে, "বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি"।
২. **কঠোর শাসক ও কূটনীতিজ্ঞ:** নাটকের শুরুতে তিনি ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটসকে তার ঔদ্ধত্য ও ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে দরবার থেকে বিতাড়িত করেন। তিনি যে শত্রুদের গতিবিধির খবর রাখেন, তার প্রমাণও দেন।
৩. **সৎ ও বিনয়ী:** তিনি ফরাসি প্রতিনিধি মঁসিয়ে লা-কে সাহায্য করতে না পারায় নিজের অক্ষমতার কথা অকপটে স্বীকার করে 'লজ্জিত' বোধ করেন। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে সভাসদদের কাছে বলেন, "অন্যায় আমিও করেচি, আপনারাও করেচেন।"
৪. **আবেগপ্রবণ ও নিঃসঙ্গ:** সিরাজ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ক্ষুব্ধ হলেও, বাংলার দুর্দিনের কথা ভেবে তিনি তাঁদের কাছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য 'ভিক্ষা' চান। ঘসেটি বেগমের অভিশাপ এবং লুৎফার কাছে তাঁর আক্ষেপ ("কোনো মানুষকে শ্রদ্ধাও করতে পারি না, ভালোও বাসতে পারি না") তাঁর গভীর নিঃসঙ্গতার পরিচয় দেয়। -
"বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।" - কার, কোন্ প্রসঙ্গে এই উক্তি? এই উক্তির মাধ্যমে বক্তার কোন্ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে?
উত্তর: এই উক্তিটি বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার।
প্রসঙ্গ: পলাশির যুদ্ধের পূর্বে যখন ইংরেজরা বাংলা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নবাবের দরবারের উচ্চপদস্থ হিন্দু-মুসলমান সভাসদরা (রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, মীরজাফর) বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, তখন নবাব তাঁদের সকলকে একত্রিত করার জন্য এই আবেদন জানান। তিনি বোঝাতে চান যে, এই বিপদ শুধু নবাবের নয়, এ বিপদ সমগ্র বাংলার।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য: এই উক্তির মাধ্যমে বক্তা সিরাজদ্দৌলার নিম্নলিখিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশিত হয়:
১. **অসাম্প্রদায়িক মনোভাব:** তিনি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেননি। বাংলাকে তিনি 'মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি' বলে মনে করতেন।
২. **ঐক্যের সাধক:** তিনি জানতেন, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করতে গেলে হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। তাই তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই বাংলার জন্য লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন।
৩. **মহান দেশপ্রেম:** এই উক্তি তাঁর গভীর দেশপ্রেমের পরিচায়ক। ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি বাংলার মান, মর্যাদা ও স্বাধীনতাকেই সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।