কবিতা: সিন্ধুতীরে (Sindhuture)
কবিতার সারসংক্ষেপ
সৈয়দ আলাওলের 'পদ্মাবতী' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশে সমুদ্রকন্যা পদ্মার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। সমুদ্রের মাঝে এক 'দিব্য পুরী'-তে সমুদ্রকন্যা পদ্মা বাস করতেন। সেই স্থানটি ছিল দুঃখ-কষ্টহীন এক মনোহর দেশ। একদিন সকালে পদ্মা তাঁর সখীদের নিয়ে উদ্যানে এসে সিন্ধুতীরে একটি মাঞ্জস (ভেলা) দেখতে পান।
তিনি কৌতূহলী হয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন, চারজন সখীর মাঝে এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা (সিংহলরাজকন্যা পদ্মাবতী) অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে। তার রূপ দেখে পদ্মা বিস্মিত হন এবং অনুমান করেন যে, হয়তো ইনি কোনো স্বর্গভ্রষ্ট বিদ্যাধরী অথবা সমুদ্রের ঝড়ে নৌকাডুবি হয়ে এই অবস্থা হয়েছে। পদ্মাবতীর সামান্য শ্বাস চলছিল। দয়াপরবশ হয়ে পদ্মা ঈশ্বরের কাছে তাঁর প্রাণ ভিক্ষা করেন এবং সখীদের সাহায্যে 'পঞ্চকন্যা'-কে (পদ্মাবতী ও তাঁর চার সখী) উদ্যানে নিয়ে যান। সেখানে আগুন জ্বেলে সেঁক দিয়ে এবং তন্ত্র-মন্ত্র ও মহৌষধি প্রয়োগে 'দণ্ড চারি' (চার দণ্ড বা প্রায় দেড় ঘণ্টা) চিকিৎসার পর তাঁরা পাঁচজনই চেতনা ফিরে পান।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
-
"বহু যত্নে চিকিৎসিতে পঞ্চকন্যা পাইলা চেতন।"- কতক্ষণ চিকিৎসা করা হয়েছিল? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: (খ) চার দণ্ড ("দণ্ড চারি এই মতে / বহু যত্নে চিকিৎসিতে")
-
"সিন্ধুতীরে রহিছে মাঞ্জস।" - 'মাঞ্জস' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: (খ) ভেলা
-
"সমুদ্রনৃপতি সুতা" - কে?
উত্তর: (খ) পদ্মা
-
"মধ্যেতে যে কন্যাখানি" - এখানে কোন্ কন্যার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: (খ) সিংহলকন্যা পদ্মাবতী
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
-
"সিন্ধুতীরে দেখি দিব্যস্থান।" - 'দিব্যস্থান' কেমন ছিল? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: সৈয়দ আলাওলের বর্ণনা অনুযায়ী, সমুদ্রের মাঝখানে সেই 'দিব্যস্থান' বা সুন্দর পুরীটি ছিল অত্যন্ত মনোহর। সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট ছিল না এবং সর্বত্র সত্য, ধর্ম ও সদাচার বিরাজ করত।
-
"বিস্মিত হইল বালা..." - 'বালা' কে? তিনি কী দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: এখানে 'বালা' হলেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা। তিনি সিন্ধুতীরে একটি মাঞ্জস (ভেলা) এবং তার মধ্যে রম্ভার চেয়েও সুন্দরী এক কন্যাকে (পদ্মাবতী) চার সখীসহ অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।
-
"বিধি মোরে না কর নৈরাশ।" - বক্তা কোন্ বিষয়ে নিরাশ হতে চান না?
উত্তর: বক্তা সমুদ্রকন্যা পদ্মা। তিনি সিন্ধুতীরে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকা অপরূপ সুন্দরী কন্যাকে দেখে অত্যন্ত স্নেহ অনুভব করেন। তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তাঁর চেষ্টায় এই কন্যাটির জীবনরক্ষা হয়, এই বিষয়ে ঈশ্বর যেন তাঁকে নিরাশ না করেন।
-
"পঞ্চজনে বসনে ঢাকিয়া।" - পঞ্চজন কারা?
উত্তর: 'পঞ্চজন' হলেন সমুদ্রের ভেলায় ভেসে আসা রাজকন্যা পদ্মাবতী এবং তাঁর চারজন সখী, যাঁদের সমুদ্রকন্যা পদ্মা সিন্ধুতীরে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন।
প্রসঙ্গ নির্দেশ করে কমবেশি ৬০টি শব্দের মধ্যে উত্তর
-
"পঞ্চকন্যা পাইলা চেতন।" - 'পঞ্চকন্যা' কারা? তাঁরা কীভাবে চেতনা ফিরে পেলেন?
উত্তর: সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশ অনুসারে, 'পঞ্চকন্যা' হলেন সিংহলরাজকন্যা পদ্মাবতী এবং তাঁর চারজন সখী।
সমুদ্রকন্যা পদ্মা ও তাঁর সখীরা অচৈতন্য পঞ্চকন্যাকে সিন্ধুতীর থেকে উদ্ধার করে উদ্যানের মধ্যে নিয়ে যান। সেখানে তাঁরা প্রথমে অগ্নি জ্বালিয়ে অচৈতন্য দেহগুলিতে সেঁক দেন। এরপর 'চার দণ্ড' (প্রায় দেড় ঘণ্টা) ধরে তন্ত্র-মন্ত্র ও মহৌষধি প্রয়োগ করে তাঁদের চিকিৎসা করেন। এই নিবিড় সেবার ফলেই পঞ্চকন্যা চেতনা ফিরে পান। -
"ইন্দ্রশাপে বিদ্যাধরি কিবা স্বর্গভ্রষ্ট করি / অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।" - বক্তা কে? তাঁর এমন অনুমানের কারণ কী?
উত্তর: উক্তিটির বক্তা হলেন সমুদ্রকন্যা পদ্মা।
অনুমানের কারণ: পদ্মা সিন্ধুতীরে যে কন্যাটিকে (পদ্মাবতী) অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন, তিনি ছিলেন 'রূপে অতি রম্ভা জিনি' অর্থাৎ স্বর্গের অপ্সরা রম্ভার চেয়েও সুন্দরী। তাঁর এমন অলৌকিক রূপ এবং 'বেথানিত' বা আলুলায়িত কেশ-বেশ দেখে পদ্মার মনে হয়েছিল, ইনি কোনো সাধারণ মানবী নন। হয়তো তিনি ইন্দ্রের অভিশাপে স্বর্গ থেকে ভ্রষ্ট কোনো বিদ্যাধরী, যিনি ভূমিতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
-
"পঞ্চকন্যা পাইলা চেতন।" - 'পঞ্চকন্যা' কারা? কার চেষ্টায় কীভাবে পঞ্চকন্যা চেতনা ফিরে পেল? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: মধ্যযুগের কবি সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশে 'পঞ্চকন্যা' বলতে সিংহলরাজকন্যা পদ্মাবতী এবং তাঁর চারজন সখীকে বোঝানো হয়েছে।
সমুদ্রের মাঝে এক ভয়ংকর দুর্যোগের কবলে পড়ে রাজকন্যা পদ্মাবতী ও তাঁর চার সখী চেতনা হারিয়ে একটি মাঞ্জসে (ভেলা) করে ভেসে এসেছিলেন। সমুদ্রকন্যা পদ্মা ও তাঁর সখীরা সিন্ধুতীরে তাঁদের অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করেন।
সমুদ্রকন্যা পদ্মা ছিলেন অত্যন্ত দয়াবতী। তিনি 'অতি স্নেহ ভাবি মনে' ঈশ্বরের কাছে তাঁদের প্রাণরক্ষার আবেদন জানান। এরপর তিনি ও তাঁর সখীরা মিলে অচৈতন্য পঞ্চকন্যাকে উদ্যানের মাঝে নিয়ে যান এবং কাপড়ে ঢেকে রাখেন। দ্রুত আগুন জ্বেলে ('অগ্নি জ্বালি') তাঁদের গায়ে সেঁক দিতে থাকেন। কেউ মাথায়, কেউ পায়ে সেঁক দেন। এর পাশাপাশি 'তন্ত্রে মন্ত্রে মহৌষধি' দিয়েও চিকিৎসা চলতে থাকে। এইভাবে 'দণ্ড চারি' অর্থাৎ চার দণ্ড (প্রায় দেড় ঘণ্টা) ধরে নিবিড় যত্নে চিকিৎসা করার পর পঞ্চকন্যা চেতনা ফিরে পান। -
'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশ অবলম্বনে সমুদ্রকন্যা পদ্মার চরিত্রবৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। (Important)
উত্তর: সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কাব্যাংশের প্রধান চরিত্র হলো সমুদ্রকন্যা পদ্মা। তাঁর চরিত্রের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠেছে:
১. ঐশ্বর্যময়ী: পদ্মা 'সমুদ্রনৃপতি সুতা' অর্থাৎ সমুদ্র-রাজার কন্যা। সমুদ্রের মাঝে 'দিব্য পুরী'-তে তাঁর বাস, যা 'হেমরত্বে নানা রঙ্গি' (সোনা ও রত্নে বিচিত্র) এবং ফল-ফুলে ভরা এক মনোহর উদ্যান দ্বারা সুশোভিত।
২. কৌতূহলী ও সৌন্দর্যপিপাসু: সিন্ধুতীরে মাঞ্জস দেখে তিনি 'মনেতে কৌতুক বাসি' বা কৌতূহলী হয়ে দ্রুত সেখানে যান এবং পদ্মাবতীর অলৌকিক রূপ দেখে ('দেখিয়া রূপের কলা') বিস্মিত হন।
৩. দয়াবতী ও সংবেদনশীল: অচৈতন্য পদ্মাবতীকে দেখে তাঁর মনে 'অতি স্নেহ' ভাব জাগে। তিনি ঈশ্বরের কাছে তাঁর প্রাণভিক্ষা করেন ("বিধি মোরে না কর নৈরাশ")।
৪. সেবাপরায়ণা ও চিকিৎসাকুশলী: তিনি কেবল দয়াই দেখান না, সখীদের নিয়ে অচৈতন্য পঞ্চকন্যাকে উদ্যানে এনে অগ্নি জ্বেলে সেঁক দেন এবং 'তন্ত্রে মন্ত্রে মহৌষধি দিয়া' তাঁদের চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলেন।
বস্তুত, পদ্মা চরিত্রটি ঐশ্বর্য, সৌন্দর্যবোধ, করুণা ও সেবাপরায়ণতার এক সার্থক মেলবন্ধন।