প্রবন্ধ: হারিয়ে যাওয়া কালি কলম (Hariye Jaoa Kali Kolom)
প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ
শ্রীপান্থের 'হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধটি মূলত কালি-কলমের বিবর্তন এবং আধুনিক যন্ত্রযুগের আগমনে সেগুলির হারিয়ে যাওয়ার এক নস্টালজিক উপাখ্যান। লেখক তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণা করেছেন, যখন তাঁরা নিজেরাই বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম বানাতেন এবং লাউপাতা দিয়ে কড়াইয়ের তলার কালি ঘষে, তাতে হরতকী ও পোড়া আতপ চাল মিশিয়ে কালি তৈরি করতেন। কলাপাতা ছিল তাঁদের লেখার 'পাত'।
প্রাবন্ধিক কলমের সুপ্রাচীন ইতিহাসও তুলে ধরেছেন—প্রাচীন মিশর, সুমেরীয়, ফিনিসীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে জুলিয়াস সিজারের 'স্টাইলাস' (ব্রোঞ্জের শলাকা) ব্যবহারের কথা। পালকের কলম ('কুইল') থেকে ফাউন্টেন পেনের ('ঝরনা কলম') আবিষ্কারক ওয়াটারম্যানের কাহিনিও তিনি বর্ণনা করেছেন। একসময় দোয়াত-কালি-কলমে লেখা ছিল এক 'ছোটোখাটো অনুষ্ঠান'। কিন্তু ফাউন্টেন পেন এবং পরে বল-পেনের আগমনে সেইসব উপকরণ অবলুপ্তির পথে চলে যায়।
লেখক আক্ষেপ করেছেন যে, কম্পিউটার এসে কলমকেও জাদুঘরে পাঠানোর উপক্রম করেছে। তাঁর আশঙ্কা, হয়তো 'কলমের দিনও' ফুরিয়ে আসছে। তবুও তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে 'ক্যালিগ্রাফিস্ট' বা লিপি-কুশলীরা একসময় সমাদৃত হতেন এবং সত্যজিৎ রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব শেষ পর্যন্ত নিবের কলমের মান বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
-
লেখক শ্রীপান্থের ছেলেবেলায় দেখা দারোগাবাবুর কলম থাকতো - (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: (ঘ) পায়ের মোজায় গোঁজা
-
উনিশ শতকে বত্রিশ হাজার অক্ষর লেখানো যেতো - (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: (খ) বারো আনায়
-
'কঙ্কাবতী' ও 'ডমরুধর'-এর স্বনামধন্য লেখকের নাম - (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: (গ) ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
-
খাগের কলম কখন দেখা যায়? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: (খ) সরস্বতী পূজার সময়
-
শেষ পর্যন্ত নিবের কলমের মান মর্যাদা কে একমাত্র বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: (ঘ) সত্যজিৎ রায়
-
বিখ্যাত লেখক শৈলজানন্দের ফাউন্টেন পেনের সংগ্রহ ছিল- (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: (খ) দুই ডজন ("ডজন-দু'য়েক তো হবেই।")
-
"প্রাচীন সুমেরিয়ান বা ফিনিসিয়ান" ফিনিসিয়ানদের লেখনী কী ছিল? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: (ঘ) হাড় ("হয়তো ফিনিসীয় আমি, বনপ্রান্ত থেকে কুড়িয়ে নিতাম একটা হাড়- সেই আমার কলম।")
-
ফাউন্টেন পেনের বাংলা নাম 'ঝরনা কলম' কে দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়?
উত্তর: (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ("নামটা রবীন্দ্রনাথের দেওয়াও হতে পারে।")
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
-
"এই নেশা পেয়েছি আমি শরৎদার কাছ থেকে।”- কোন্ নেশার কথা বলা হয়েছে? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: এখানে লেখক শৈলজানন্দের ফাউন্টেন পেন বা 'ঝরনা কলম' সংগ্রহের নেশার কথা বলা হয়েছে।
-
"অনেক ধরে ধরে টাইপ-রাইটারে লিখে গেছেন মাত্র একজন।" - কার কথা বলা হয়েছে? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: এখানে লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের কথা বলা হয়েছে। (পরে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও টাইপ-রাইটার ব্যবহার করেন।)
-
"কলম তাদের কাছে আজ অস্পৃশ্য।” – কাদের কাছে অস্পৃশ্য? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: কলম আজ পকেটমারদের কাছে অস্পৃশ্য, কারণ কলম এখন অত্যন্ত 'শস্তা' এবং 'সর্বভোগ্য' (সবার কাছেই থাকে), তাই তা চুরি করে লাভ নেই।
-
"সোনার দোয়াত কলম যে সত্যই হতো;" - বক্তা সোনার দোয়াত কলমের কথা কীভাবে জেনেছিলেন? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: বক্তা শ্রীপান্থ, সুভো ঠাকুরের (সুবোধ ঠাকুর) বিখ্যাত দোয়াত সংগ্রহের প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে সোনার দোয়াত কলমের অস্তিত্বের কথা জেনেছিলেন।
-
"ইতিহাসে ঠাঁই কিন্তু তার পাকা।" - ইতিহাসে কার পাকা ঠাঁই? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: লেখক শ্রীপান্থের মতে, কম্পিউটারের যুগে কলম হারিয়ে গেলেও ইতিহাসে কলমের ঠাঁই পাকা থাকবে।
-
একসময়ে বিদেশে উন্নত ধরনের নিব বের হয়েছিল কীভাবে? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: একসময়ে বিদেশে পালকের কলম দ্রুত ভোঁতা হয়ে যেত বলে গোরুর শিং অথবা কচ্ছপের খোল কেটে উন্নত ধরনের নিব তৈরি হতো, যা বেশ টেকসই ছিল।
-
'ক্যালিগ্রাফিস্ট' কাদের বলে? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: যাঁরা ওস্তাদ কলমবাজ বা লিপি-কুশলী, অর্থাৎ যাঁরা সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখতে পারেন (যেমন পুথির লিপিকর), তাঁদের 'ক্যালিগ্রাফিস্ট' বলে।
-
"বাস, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।” – বক্তা 'ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে' গেলেন কেন? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: বক্তা শ্রীপান্থ যখন প্রথম ফাউন্টেন পেন কিনতে দোকানে যান, তখন দোকানি পার্কার, শেফার্ড, ওয়াটারম্যান, সোয়ান, পাইলট ইত্যাদি নানা ধরনের কলমের নাম ও দাম আউড়ে যাচ্ছিলেন। এত ধরনের কলমের নাম শুনে বক্তা 'ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে' গিয়েছিলেন।
প্রসঙ্গ নির্দেশ করে কমবেশি ৬০টি শব্দের মধ্যে উত্তর
-
"আমরা কালিও তৈরি করতাম নিজেরাই।" - লেখকরা কীভাবে কালি তৈরি করতেন?
উত্তর: শ্রীপান্থ জানিয়েছেন, তাঁরা কাঠের উনুনের কড়াইয়ের তলার কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে পাথরের বাটির জলে গুলতেন। কেউ কেউ তাতে হরতকী ঘষতেন বা পোড়া আতপ চাল বেটে মেশাতেন। এরপর খুন্তির লাল টকটকে গরম গোড়া সেই জলে ছ্যাঁকা দিয়ে ন্যাকড়ায় ছেঁকে নিলেই কালি তৈরি হয়ে যেত, যা মাটির দোয়াতে ঢালা হতো।
-
"কলমকে বলা হয় তলোয়ারের চেয়েও শক্তিধর।" - কথাটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: 'তলোয়ার' হলো শারীরিক বা পাশবিক শক্তির প্রতীক, যা দিয়ে ধ্বংস বা জবরদখল করা যায়। কিন্তু 'কলম' হলো জ্ঞান, যুক্তি, সৃজনশীলতা ও ভাবনার প্রতীক। কলমের লেখা মানুষের মন ও সমাজকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করতে পারে, বিপ্লব ঘটাতে পারে। তলোয়ারের জয় সাময়িক, কিন্তু কলমের শক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী। তাই কলমকে তলোয়ারের চেয়েও বেশি শক্তিধর বলা হয়।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
-
"সব মিলিয়ে লেখালেখি রীতিমতো ছোটোখাটো একটা অনুষ্ঠান।" - লেখালেখি ব্যাপারটিকে একটা ছোটোখাটো অনুষ্ঠান বলা হয়েছে কেন বুঝিয়ে লেখো। (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: শ্রীপান্থ তাঁর 'হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধে প্রাচীনকালের লেখালেখির পদ্ধতিকে 'ছোটোখাটো একটা অনুষ্ঠান' বলেছেন।
কারণ, এখনকার মতো তখন লেখা সহজসাধ্য ছিল না। লেখকদের নিজেদেরই লেখার উপকরণ যত্ন করে তৈরি করতে হতো। বাঁশের কঞ্চি বা খাগ কেটে কলম তৈরি করা, তার মুখটি সাবধানে চিরে নেওয়া ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তারপর কালি তৈরির পালা—উনুনের কালি, হরতকী, পোড়া চাল মিশিয়ে, জলে ফুটিয়ে, ছেঁকে কালি প্রস্তুত করা হতো। লেখার জন্য ছিল কলাপাতা। লেখা শুকানোর জন্য ব্যবহৃত হতো বালি। পরবর্তীকালে ব্লটিং পেপার এবং রকমারি দোয়াত-কলম এলেও সেই আয়োজন ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ। এই সমস্ত প্রস্তুতি ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণেই লেখক প্রাচীনকালের লেখালেখিকে একটি 'অনুষ্ঠান'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। -
"তাই কেটে কাগজের মতো সাইজ করে নিয়ে আমরা তাতে 'হোম-টাস্ক' করতাম।” - কিসে 'হোম-টাস্ক' করা হতো? 'হোম-টাস্ক' করার সম্পূর্ণ বিবরণ দাও। (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: লেখক শ্রীপান্থ ও তাঁর ছেলেবেলার বন্ধুরা কলাপাতা কেটে কাগজের মতো সাইজ করে তাতে 'হোম-টাস্ক' বা বাড়ির কাজ করতেন।
হোম-টাস্ক করার বিবরণ: লেখকদের শৈশবে লেখার জন্য কাগজ সহজলভ্য ছিল না। তাঁরা কলাপাতা কেটে কাগজের মাপমতো টুকরো করে নিতেন। সেই কলাপাতা ছিল তাঁদের লেখার 'পাত'। তাঁরা নিজেরাই বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম বানাতেন এবং বাড়িতেই কালি তৈরি করতেন। এই ঘরে তৈরি কালি মাটির দোয়াতে রেখে, বাঁশের কলম তাতে চুবিয়ে তাঁরা কলাপাতা-রূপী কাগজের ওপর বাড়ির কাজ বা 'হোম-টাস্ক' লিখতেন। এরপর সেই পাতাগুলি বান্ডিল করে স্কুলে নিয়ে গেলে মাস্টারমশাই তা দেখে ছিঁড়ে ফেরত দিতেন। -
"আশ্চর্য, সবই আজ অবলুপ্তির পথে।” - 'সবই'-র পরিচয় দাও। উল্লিখিত বিষয়টি কীভাবে আজ 'অবলুপ্তির পথে' আলোচনা করো। (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: শ্রীপান্থের 'হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' প্রবন্ধে 'সবই' বলতে কালি-কলমের সঙ্গে যুক্ত সেইসব উপকরণকে বোঝানো হয়েছে, যা একসময় লেখালেখির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে বাঁশের বা কঞ্চির কলম, খাগের কলম, পালকের কলম, ঘরে তৈরি কালি, কালির ট্যাবলেট বা বড়ি, রকমারি দোয়াত, কালির আধার এবং লেখা শুকানোর জন্য ব্যবহৃত ব্লটিং পেপার।
অবলুপ্তির কারণ: বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই সব উপকরণের উপযোগিতা ফুরিয়েছে। প্রথমে লুইস ওয়াটারম্যানের আবিষ্কৃত ফাউন্টেন পেন ('ঝরনা কলম') এবং পরবর্তীকালে বল-পেনের ('ডট পেন') সহজলভ্যতা দোয়াত-কলমের ব্যবহারকে প্রায় বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে 'কম্পিউটার' এসে যাওয়ায় কলমের ব্যবহারও সীমিত হয়ে পড়েছে। লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কম্পিউটার এই সমস্ত উপকরণকে 'জাদুঘরে পাঠাবে বলে যেন প্রতিজ্ঞা করেছে'। এভাবেই একদা লেখালেখির প্রধান উপকরণগুলি আজ 'অবলুপ্তির পথে' ধাবিত। -
"আমার মনে পড়ে প্রথম ফাউন্টেন কেনার কথা।" - বক্তা কোথায় ফাউন্টেন কিনতে গিয়েছিলেন? তাঁর ফাউন্টেন কেনার ঘটনাটি বিবৃত করো। (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: লেখক শ্রীপান্থ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পর কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামী দোকানে তাঁর প্রথম ফাউন্টেন পেনটি কিনতে গিয়েছিলেন।
ঘটনা: দোকানে গিয়ে পেন কেনার কথা বলতেই দোকানি লেখককে পার্কার, শেফার্ড, ওয়াটারম্যান, সোয়ান, পাইলট ইত্যাদি নানা দামি পেনের নাম ও দাম আউড়ে শোনান। লেখকের মুখের অবস্থা দেখে দোকানি তাঁর পকেটের অবস্থা বুঝতে পারেন। তখন তিনি লেখককে একটি শস্তা জাপানি 'পাইলট' পেন নেওয়ার পরামর্শ দেন। পেনটির গুণমান বোঝাতে দোকানি এক অদ্ভুত কাজ করেন। তিনি সার্কাসের খেলোয়াড়ের মতো পেনটি টেবিলের পাশে দাঁড় করানো একটি কাঠের বোর্ডের ওপর ছুড়ে মারেন। তারপর সেটি খুলে, নিবটি অক্ষত দেখিয়ে দু-এক ছত্র লিখেও দেন। সেই 'জাদু-পাইলট' পেনটিই সেদিন লেখক কিনে বাড়ি ফিরেছিলেন।