কবিতা: অভিষেক (Ovishek)
কবিতার সারসংক্ষেপ
মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে নেওয়া 'অভিষেক' কাব্যাংশে বীর ইন্দ্রজিতের দেশপ্রেম ও বীরত্বের এক উজ্জ্বল চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রমোদকাননে স্ত্রী প্রমীলা ও সখীদের সাথে আমোদে মত্ত ইন্দ্রজিতের কাছে দেবী লক্ষ্মী তাঁর ধাত্রীमाता প্রভাসার ছদ্মবেশে উপস্থিত হন। তিনি ইন্দ্রজিৎকে তাঁর ভাই বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ এবং রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পিতা রাবণের সসৈন্য প্রস্তুতির কথা জানান।
ইন্দ্রজিৎ এই সংবাদে বিস্মিত হন, কারণ তিনি পূর্বরাত্রেই রামচন্দ্রকে বধ করেছেন। কিন্তু লক্ষ্মী জানান যে, 'মায়াবী মানব' রামচন্দ্র পুনর্জীবন লাভ করেছেন। এই সংবাদ শুনে ইন্দ্রজিতের বীরসত্তা জেগে ওঠে। তিনি বিলাস-ব্যসন ত্যাগ করে ('ছিঁড়িলা কুসুমদাম') লঙ্কার অপবাদ ঘোচাতে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হন। স্ত্রী প্রমীলার আকুল আবেদন উপেক্ষা করে তিনি পিতার কাছে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চান। রাবণ, পুত্রশোকে কাতর হলেও, ইন্দ্রজিতের বীরত্বে গর্বিত হন এবং তাঁকে পরদিন সকালে যুদ্ধের আগে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। সবশেষে, রাবণ গঙ্গাজল দিয়ে পুত্র ইন্দ্রজিৎকে লঙ্কার সেনাপতি পদে 'অভিষেক' করেন।
গুরুত্বপূর্ণ বহুবিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ)
-
"যথা বৃহন্নলারূপী কিরীটী," - 'কিরীটী' হলেন (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: (গ) অর্জুন
-
রাবণ ইন্দ্রজিৎ-কে রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করার কোন্ সময় নির্দেশ করেছিলেন? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: (গ) প্রভাতে ("প্রভাতে যুঝিও, বৎস, রাঘবের সাথে।")
-
ইন্দ্রজিতের স্ত্রীর নাম কী?
উত্তর: (খ) প্রমীলা
-
ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা হলেন -
উত্তর: (ক) দেবী লক্ষ্মী (অম্বুরাশি = সমুদ্র, সুতা = কন্যা)
-
"কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী" - 'বীরেন্দ্রকেশরী' কে?
উত্তর: (ঘ) ইন্দ্রজিৎ
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
-
"কে বধিল কবে প্রিয়ানুজে?"- 'প্রিয়ানুজ' কাকে বলা হয়েছে? (MADHYAMIK - 2024 External)
উত্তর: এখানে 'প্রিয়ানুজ' (প্রিয় অনুজ বা ছোট ভাই) বলতে ইন্দ্রজিতের প্রিয় ভাই বীরবাহুকে বোঝানো হয়েছে।
-
"যথা বৃহন্নলারূপী কিরীটী," - 'বৃহন্নলারূপী কিরীটী' কে? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: 'বৃহন্নলারূপী কিরীটী' হলেন অর্জুন। তিনি অজ্ঞাতবাসকালে বিরাট রাজার রাজ্যে বৃহন্নলা ছদ্মনামে নৃত্যশিক্ষক হিসেবে ছিলেন।
-
"আগে পূজ ইষ্টদেবে"- 'ইষ্টদেব' কে? (MADHYAMIK - 2022 External)
উত্তর: ইন্দ্রজিতের ইষ্টদেব হলেন অগ্নিদেব। রাবণ ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে যাওয়ার আগে নিকুম্ভিলা যজ্ঞের মাধ্যমে অগ্নিদেবের পূজা সম্পন্ন করতে বলেছিলেন।
-
"নাদিলা কর্তৃরদল হেরি বীরবরে," - 'কর্তৃরদল' শব্দটির অর্থ কী? (MADHYAMIK - 2024)
উত্তর: 'কর্তৃরদল' শব্দটির অর্থ হলো রাক্ষসসৈন্য বা রাক্ষসবাহিনী।
-
"জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া”- 'মহাবাহু' কে? তিনি কী জিজ্ঞাসা করলেন? (MADHYAMIK - 2022 External)
উত্তর: এখানে 'মহাবাহু' হলেন ইন্দ্রজিৎ। তিনি ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মীর (ধাত্রী প্রভাসা) কাছে বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কে তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহুকে বধ করেছে, কারণ তিনি তো পূর্বরাত্রেই রামচন্দ্রকে হত্যা করেছেন।
-
"কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজি এ ভবনে?" - বক্তা কে? তিনি কাকে 'মাতঃ' বলেছেন?
উত্তর: বক্তা হলেন ইন্দ্রজিৎ। তিনি তাঁর ধাত্রীमाता প্রভাসার ছদ্মবেশে আসা দেবী লক্ষ্মীকে 'মাতঃ' বলে সম্বোধন করেছেন।
-
"হায়! পুত্র, মায়াবী মানব সীতাপতি" - বক্তা কে? 'মায়াবী মানব' কাকে বলা হয়েছে?
উত্তর: বক্তা হলেন ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মী। তিনি রামচন্দ্রকে ('সীতাপতি') 'মায়াবী মানব' বলেছেন, কারণ ইন্দ্রজিতের শরে নিহত হয়েও তিনি পুনরায় বেঁচে উঠেছেন।
প্রসঙ্গ নির্দেশ করে কমবেশি ৬০টি শব্দের মধ্যে উত্তর
-
"এ অদ্ভুত বারতা, জননি কোথায় পাইলে তুমি," - 'জননি' কে? তাঁর কোন্ বার্তাকে 'অদ্ভুত' বলা হয়েছে? (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: ইন্দ্রজিৎ তাঁর ধাত্রীमाता প্রভাসার ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মীকে 'জননি' বলে সম্বোধন করেছেন।
তাঁর কাছে 'অদ্ভুত' বার্তাটি হলো—ভাই বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ এবং রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পিতা রাবণের সসৈন্যে প্রস্তুতির খবর। এই বার্তা ইন্দ্রজিতের কাছে অদ্ভুত, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে তিনি আগের রাতেই রামচন্দ্রকে বধ করেছেন। তাই মৃত রামচন্দ্রের পক্ষে বীরবাহুকে হত্যা করা বা রাবণের পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া—দুটি ঘটনাই তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য বা 'অদ্ভুত' মনে হয়েছে। -
"কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে শিলা জলে" - বক্তা কে? তাঁর একথা বলার কারণ কী? (MADHYAMIK - 2022)
উত্তর: উক্তিটির বক্তা হলেন লঙ্কেশ্বর রাবণ।
পুত্র ইন্দ্রজিৎ রামচন্দ্রকে বধ করার অনুমতি চাইলে রাবণ এই উক্তি করেন। তাঁর বলার কারণ হলো, রামচন্দ্র কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি 'মায়াবী'। ইন্দ্রজিতের শরে নিহত হয়েও তিনি পুনর্জীবন লাভ করেছেন। মৃত মানুষের এভাবে বেঁচে ওঠাটা যেমন অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য, ঠিক তেমনই শিলা বা পাথরের জলে ভাসাটাও প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ ও অস্বাভাবিক। এই অবিশ্বাস্য ঘটনাকে বোঝাতেই রাবণ আক্ষেপের সুরে একথা বলেছেন। -
"ধিক্ মোরে!"- কে কেন নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন? (MADHYAMIK - 2024 External)
উত্তর: উক্তিটি করেছেন লঙ্কাপতি রাবণের পুত্র, বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ।
যখন তিনি ধাত্রীর মুখে শুনলেন যে, শত্রুদল ('বৈরিদল') স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে এবং তাঁর ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন, তখন তিনি নিজে প্রমোদকাননে 'বামাদল মাঝে' (নারীদের মাঝে) আমোদ-প্রমোদে মত্ত ছিলেন। একজন বীর ও রক্ষঃকুল-চূড়ামণি হয়ে দেশের এই ঘোর সংকটের দিনে তাঁর এই বিলাস-ব্যসনকে তিনি চরম লজ্জাজনক ও কাপুরুষোচিত বলে মনে করেছেন। এই আত্মগ্লানি থেকেই তিনি নিজেকে ধিক্কার জানিয়েছেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions)
-
"নমি পুত্র পিতার চরণে, করযোড়ে কহিলা" - পিতা ও পুত্রের পরিচয় দাও। কবিতা অবলম্বনে পিতা-পুত্রের কথোপকথন সংক্ষেপে লেখো। (MADHYAMIK - 2025)
উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশে 'পিতা' হলেন লঙ্কাধিপতি রাবণ এবং 'পুত্র' হলেন তাঁর সুযোগ্য, বীরশ্রেষ্ঠ সন্তান ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ।
পিতা-পুত্রের কথোপকথন:
বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ইন্দ্রজিৎ ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত হয়ে প্রমোদকানন ত্যাগ করেন এবং যুদ্ধসাজে সেজে পিতা রাবণের কাছে আসেন। তিনি পিতাকে প্রণাম করে বিস্ময়ের সাথে জানান যে রামচন্দ্র যদি তাঁর শরে পূর্বেই নিহত হয়ে থাকেন, তবে এই 'অদ্ভুত' ঘটনা কীভাবে ঘটল? তিনি রাবণের কাছে অবিলম্বে যুদ্ধে গিয়ে শত্রুকুলকে সমূলে বিনাশ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, পুত্র ইন্দ্রজিৎ জীবিত থাকতে পিতা রাবণ নিজে যুদ্ধে গেলে তা সমগ্র রাক্ষসকুলের জন্য 'কলঙ্ক'-এর বিষয় হবে এবং দেবতারাও তা দেখে উপহাস করবেন।
প্রত্যুত্তরে, রাবণ পুত্রকে 'রাক্ষস-কুল-শেখর' ও 'রাক্ষস-কুল-ভরসা' বলে সম্বোধন করেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান যে, রামচন্দ্র 'মায়াবী'; মৃত হয়েও সে পুনর্জীবন লাভ করেছে, যেমনটা শিলাও জলে ভাসে না। কুম্ভকর্ণের মতো মহাবীরের পতনও তাঁকে শোকাহত করেছে। তাই তিনি ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে বরণ করে নির্দেশ দেন, পরদিন সকালে যুদ্ধের আগে ইষ্টদেব অগ্নিদেবের পূজার জন্য নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সম্পন্ন করতে। এভাবেই পিতা-পুত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে কাব্যাংশটি সমাপ্ত হয়। -
'অভিষেক' কাব্যাংশ অবলম্বনে ইন্দ্রজিৎ-এর চরিত্রবৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। (Important)
উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশে ইন্দ্রজিৎ এক অনন্য বীর চরিত্র। তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
১. তীব্র দেশপ্রেম ও কর্তব্যবোধ: লঙ্কার সংকট ও ভাই বীরবাহুর মৃত্যুর সংবাদ শোনামাত্র তিনি আমোদ-প্রমোদ ত্যাগ করেছেন। তাঁর "বৈরিদল বেড়ে / স্বর্ণলঙ্কা, হেথা আমি বামাদল মাঝে?" উক্তিটিতে তাঁর তীব্র দেশপ্রেম ও কর্তব্যবোধ ফুটে ওঠে।
২. অতুলনীয় বীরত্ব ও আত্মবিশ্বাস: তিনি এর আগে দুবার রামচন্দ্রকে পরাজিত করেছেন, তাই তাঁর মধ্যে কোনো শঙ্কা নেই। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে পিতাকে বলেছেন, "দেখিব এবার বীর বাঁচে কি ঔষধে!"
৩. গভীর পিতৃভক্তি ও কুলগর্ব: তিনি পিতার সম্মান রক্ষার্থে নিজে যুদ্ধযাত্রা করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, তিনি জীবিত থাকতে পিতা যুদ্ধে গেলে তা হবে রাক্ষসকুলের জন্য 'কলঙ্ক'।
৪. আত্মগ্লানি ও লজ্জা: শত্রুরা যখন লঙ্কা আক্রমণ করেছে, তখন নিজে প্রমোদকাননে থাকায় তিনি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। "ধিক্ মোরে!" বলে তিনি নিজেকে ধিক্কার জানিয়েছেন।
৫. স্ত্রীর প্রতি প্রেম: তিনি বীর হলেও হৃদয়ে কোমলতা রয়েছে। স্ত্রী প্রমীলার প্রতি তাঁর আচরণে সেই স্নিগ্ধ প্রেমের পরিচয় পাওয়া যায় ("ইন্দ্রজিতে জিতি তুমি, সতি, / বেঁধেছ যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে / সে বাঁধে?")।
বস্তুত, বীরত্ব, দেশপ্রেম, কর্তব্যবোধ ও কোমলতার এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে ইন্দ্রজিৎ চরিত্রে। -
"সাজিলা রথীন্দ্রর্ষভ বীর-আভরণে," - 'রথীন্দ্রর্ষভ' কে? তাঁর সজ্জার বর্ণনা দাও। এই সজ্জার সঙ্গে কবি কোন্ কোন্ উপমা ব্যবহার করেছেন?
উত্তর: 'রথীন্দ্রর্ষভ' (রথী + ইন্দ্র + ঋষভ, অর্থাৎ রথীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) হলেন ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ।
সজ্জার বর্ণনা: ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ইন্দ্রজিৎ যখন যুদ্ধসাজে সজ্জিত হচ্ছিলেন, তখন তাঁর সেই রূপের সঙ্গে কবি দুটি পৌরাণিক উপমা ব্যবহার করেছেন:
১. তারকাসুরকে বধ করার জন্য কার্তিক (হৈমবতীসুত) যেমন সেজেছিলেন, ইন্দ্রজিতের সজ্জাও ছিল তেমনই।
২. অথবা, কৌরবদের হাত থেকে বিরাট রাজার গোধন উদ্ধারের জন্য অর্জুন (কিরীটী) শমীবৃক্ষমূলে যেভাবে বৃহন্নলারূপ ত্যাগ করে বীরসাজে সেজেছিলেন, ইন্দ্রজিতের সজ্জাও ছিল ঠিক তেমনই।
তাঁর রথ ছিল মেঘের মতো বর্ণ ('মেঘবর্ণ'), চাকা ছিল বিদ্যুতের ছটার মতো উজ্জ্বল ('বিজলীর ছটা'), এবং ধ্বজা ছিল ইন্দ্রধনুর মতো রঙিন ('ইন্দ্রচাপরূপী')। তাঁর রথের ঘোড়াগুলি ছিল তীব্র গতিসম্পন্ন ('তুরঙ্গম বেগে আশুগতি')।