আকাশে সাতটি তারা (জীবনানন্দ দাশ)

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

পল্লিসন্ধ্যার অপরূপ রূপ: রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতায় গ্রামবাংলার এক মায়াময় শান্ত সন্ধ্যার অনবদ্য চিত্র তুলে ধরেছেন। সূর্যাস্তের পর আকাশে যখন সপ্তর্ষি মণ্ডল (সাতটি তারা) ফুটে ওঠে, কবি তখন ঘাসের ওপর বসে থাকেন। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের লাল আলোয় রঞ্জিত মেঘকে কবির মৃত মনিয়া পাখির মতো মনে হয়, যা ধীরে ধীরে গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে যায়। এরপরেই প্রকৃতিতে নেমে আসে শান্ত, অনুগত নীল সন্ধ্যা। কবি এই সন্ধ্যাকে এক 'কেশবতী কন্যা' বা একঢাল কালো চুলের অধিকারিণী রূপসীর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রকৃতির সাথে একাত্মতা: সেই রূপসী সন্ধ্যার কালো চুল যেন কবির চোখ ও মুখের ওপর আলতো করে ভেসে বেড়ায়। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন মোহময় রূপ বা এমন স্নিগ্ধ গন্ধ দেখা যায় না। সেই চুলের স্পর্শ যেন হিজল, কাঁঠাল ও জাম গাছের পাতায় পাতায় অবিরত ঝরে পড়ে এবং প্রকৃতিকে এক স্নিগ্ধ অন্ধকারে ঢেকে দেয়।

বাংলার আসল প্রাণ: কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে (ষট্‌ক) কবি দেখিয়েছেন যে, বাংলার আসল সৌন্দর্য কোনো আড়ম্বরপূর্ণ জিনিসের মধ্যে নেই; তা লুকিয়ে আছে পল্লির অতি সাধারণ ও তুচ্ছ উপাদানের মাঝে। নরম ধানের গন্ধ, কলমী লতার ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, শর ঘাস, পুকুরের জল, চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু গন্ধ, চালধোয়া কিশোরীর ভিজে ঠান্ডা হাত, কিশোরের পায়ে মাড়ানো মুথাঘাস এবং মাটিতে পড়ে থাকা লাল বটফলের ব্যথিত গন্ধ—এই সবকিছুর ক্লান্ত নীরবতার মাঝেই কবি বাংলার শাশ্বত প্রাণ বা আত্মাকে খুঁজে পান। আকাশে সাতটি তারা ফুটলেই কবি তাঁর এই নিবিড় উপলব্ধি টের পান।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
সাতটি তারাসপ্তর্ষিমণ্ডল (সাতটি নক্ষত্রের সমষ্টি)মনিয়াএকপ্রকার ছোট্ট সুন্দর পাখি
কামরাঙা-লালকামরাঙা ফলের মতো লালচে রংকেশবতীযার মাথায় একঢাল ঘন কালো চুল আছে
গঙ্গাসাগরগঙ্গা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনাবিন্যাসসাজানো বা গোছানো (চুলের বিন্যাস)
অনুগতবাধ্য / বশংবদ / শান্তঘ্রাণগন্ধ / সুবাস
অবিরতএকটানা / বিরামহীনশরজলাভূমিতে জন্ম নেওয়া একপ্রকার খাগড়া বা ঘাস
স্নিগ্ধকোমল / আরামদায়ক / শান্তমুথাঘাসএকপ্রকার সুগন্ধি আগাছা বা ঘাস
ব্যথিত গন্ধবেদনাদায়ক বা পিষ্ট হওয়ার গন্ধক্লান্ত নীরবতাঅবসন্ন নিস্তব্ধতা

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) কাজী নজরুল ইসলাম (গ) জীবনানন্দ দাশ (ঘ) সুকান্ত ভট্টাচার্য
উত্তর: (গ) জীবনানন্দ দাশ
২. আকাশে কয়টি তারা ফুটেছে?
(ক) পাঁচটি (খ) সাতটি (গ) দশটি (ঘ) অসংখ্য
উত্তর: (খ) সাতটি
৩. আকাশে তারা উঠলে কবি কোথায় বসে থাকেন?
(ক) ঘরের ছাদে (খ) নদীর তীরে (গ) ঘাসে (ঘ) নৌকায়
উত্তর: (গ) ঘাসে
৪. মেঘের রং কেমন ছিল?
(ক) রক্তের মতো লাল (খ) কামরাঙা-লাল (গ) নীলাভ (ঘ) গাঢ় কালো
উত্তর: (খ) কামরাঙা-লাল
৫. মেঘটিকে কিসের সাথে তুলনা করা হয়েছে?
(ক) মৃত মনিয়ার মতো (খ) আহত পাখির মতো (গ) মরা হাঁসের মতো (ঘ) রক্তজবার মতো
উত্তর: (ক) মৃত মনিয়ার মতো
৬. মেঘ কোথায় ডুবে গেছে?
(ক) পুকুরে (খ) নদীতে (গ) গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে (ঘ) দিঘিতে
উত্তর: (গ) গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে
৭. বাংলার সন্ধ্যা কেমন?
(ক) চঞ্চল (খ) শান্ত অনুগত (গ) রুদ্র (ঘ) গম্ভীর
উত্তর: (খ) শান্ত অনুগত
৮. বাংলার সন্ধ্যাকে কবি কার সাথে তুলনা করেছেন?
(ক) রূপসী কন্যার (খ) দুঃখিনী মায়ের (গ) কেশবতী কন্যার (ঘ) পরীর
উত্তর: (গ) কেশবতী কন্যার
৯. কার চুল কবির চোখের ও মুখের ওপর ভাসে?
(ক) মেঘের (খ) অন্ধকারের (গ) কেশবতী কন্যার (ঘ) বনলতা সেনের
উত্তর: (গ) কেশবতী কন্যার
১০. এ কন্যারে কে দেখেনি?
(ক) পৃথিবীর কোনো পথ (খ) আকাশ (গ) সমুদ্র (ঘ) কবি নিজে
উত্তর: (ক) পৃথিবীর কোনো পথ
১১. অজস্র চুলের চুমা কোথায় অবিরত ঝরে?
(ক) আমে, জামে (খ) হিজলে, কাঁঠালে, জামে (গ) বটে, অশ্বত্থে (ঘ) তাল-তমাল গাছে
উত্তর: (খ) হিজলে, কাঁঠালে, জামে
১২. কীসের বিন্যাসে স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে?
(ক) মেঘের বিন্যাসে (খ) তারার বিন্যাসে (গ) রূপসীর চুলের বিন্যাসে (ঘ) পাতার বিন্যাসে
উত্তর: (গ) রূপসীর চুলের বিন্যাসে
১৩. ঘ্রাণ বা গন্ধটি কীসের?
(ক) পাকা ধানের (খ) নরম ধানের (গ) চালের (ঘ) গমের
উত্তর: (খ) নরম ধানের
১৪. কাদের মৃদু ঘ্রাণের কথা বলা হয়েছে?
(ক) ইলিশ মাছের (খ) রুই-কাতলার (গ) চাঁদা-সরপুঁটিদের (ঘ) কই মাছের
উত্তর: (গ) চাঁদা-সরপুঁটিদের
১৫. কিশোরীর চালধোয়া হাতখানি কেমন?
(ক) শুষ্ক (খ) গরম (গ) ভিজে ও শীত (ঘ) নরম
উত্তর: (গ) ভিজে ও শীত
১৬. কিশোরের পায়ে-দলা ঘাসটি কী?
(ক) দূর্বাঘাস (খ) কাশঘাস (গ) মুথাঘাস (ঘ) শরঘাস
উত্তর: (গ) মুথাঘাস
১৭. লাল লাল বটফলের গন্ধটি কেমন?
(ক) মিষ্টি (খ) ব্যথিত (গ) উগ্র (ঘ) সুবাসিত
উত্তর: (খ) ব্যথিত
১৮. এই সবকিছুর মাঝে কী লুকিয়ে আছে?
(ক) বাংলার রূপ (খ) বাংলার প্রাণ (গ) রূপকথার গল্প (ঘ) কবির শৈশব
উত্তর: (খ) বাংলার প্রাণ
১৯. কবি কখন টের পান যে এটাই বাংলার প্রাণ?
(ক) সকালে (খ) দুপুরে (গ) আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে (ঘ) মাঝরাতে
উত্তর: (গ) আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে
২০. 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
(ক) বনলতা সেন (খ) রূপসী বাংলা (গ) ঝরাপালক (ঘ) মহাপৃথিবী
উত্তর: (খ) রূপসী বাংলা

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে কবি কী করেন?
উত্তর: সন্ধ্যায় আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে প্রকৃতির রূপমুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ শান্ত হয়ে ঘাসের ওপর বসে থাকেন।
২. মেঘটিকে কামরাঙা-লাল বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম আকাশে থাকা মেঘগুলোতে অস্তগামী সূর্যের আলো পড়লে তা পাকা কামরাঙা ফলের মতো লালচে রূপ ধারণ করে, তাই তাকে কামরাঙা-লাল বলা হয়েছে।
৩. 'মৃত মনিয়ার মতো' কে, কোথায় ডুবে গেছে?
উত্তর: অস্তগামী সূর্যের আলোয় রঞ্জিত কামরাঙা-লাল মেঘটি যেন একটি মরে যাওয়া মনিয়া পাখির মতো ধীরে ধীরে গঙ্গাসাগরের কালো ঢেউয়ে ডুবে বা বিলীন হয়ে গেছে।
৪. বাংলার নীল সন্ধ্যাকে কবি কী বলেছেন?
উত্তর: বাংলার নীল সন্ধ্যাকে কবি শান্ত ও অনুগত বলেছেন এবং একটি একঢাল কালো চুলের অধিকারিণী 'কেশবতী কন্যা'র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
৫. 'কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে' - কেশবতী কন্যা বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: এখানে কেশবতী কন্যা বলতে ঘনিয়ে আসা বাংলার মায়াময় অন্ধকার সন্ধ্যাকে বোঝানো হয়েছে, যা তার কালো চুল বা অন্ধকারের চাদর দিয়ে প্রকৃতিকে ঢেকে দেয়।
৬. 'আমার চোখের 'পরে আমার মুখের 'পরে চুল তার ভাসে' - এর অর্থ কী?
উত্তর: সন্ধ্যার অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এসে কবির চারপাশকে ঢেকে দেয়, তখন সেই কালো অন্ধকারকেই কবির মনে হয় যেন কেশবতী কন্যার ঘন কালো চুল তাঁর চোখ ও মুখের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে।
৭. 'পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো' - কেন দেখেনি?
উত্তর: কবির মতে, বাংলার সন্ধ্যার এই স্নিগ্ধ, শান্ত ও মায়াময় রূপ পৃথিবীর আর কোনো দেশের প্রকৃতিতে দেখা যায় না। তাই তিনি বলেছেন পৃথিবীর অন্য কোনো পথ এই রূপসী কন্যাকে দেখেনি।
৮. অজস্র চুলের চুমা কোথায় অবিরত ঝরে পড়ে?
উত্তর: বাংলার গ্রাম্য প্রকৃতির হিজল, কাঁঠাল ও জাম গাছের পাতার ওপর সন্ধ্যার অন্ধকারের স্পর্শকেই কবি অজস্র চুলের চুমা অবিরত ঝরে পড়ার কথা বলেছেন।
৯. 'জানি নাই এত স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে' - কোথা থেকে স্নিগ্ধ গন্ধ ঝরে?
উত্তর: ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যারূপী রূপসীর চুলের বিন্যাস অর্থাৎ অন্ধকারের চাদর থেকে এমন এক মায়াময় স্নিগ্ধ গন্ধ বা প্রশান্তি ঝরে পড়ে, যা কবি আগে জানতেন না।
১০. 'নরম ধানের গন্ধ-কলমীর ঘ্রাণ' - কোথায় পাওয়া যায়?
উত্তর: পৃথিবীর অন্য কোথাও নয়, কেবল বাংলার পথে-ঘাটে এবং জলাভূমিতেই এই নরম ধানের এবং কলমী লতার সুপরিচিত ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
১১. জলজ প্রকৃতির প্রসঙ্গে কবি কী কী অনুষঙ্গ এনেছেন?
উত্তর: জলজ প্রকৃতির বর্ণনায় কবি হাঁসের পালক, শর ঘাস, পুকুরের জল এবং চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের মৃদু ঘ্রাণের অনুষঙ্গ এনেছেন।
১২. কিশোরীর হাতখানাকে 'ভিজে' ও 'শীত' বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: গ্রামবাংলার কিশোরী মেয়েটি ঠান্ডা জলে চাল ধোয়ার কাজ করছিল, তাই তার হাতটি জলে ভিজে ছিল এবং ঠান্ডায় শীত বা হিমশীতল হয়ে ছিল।
১৩. কিশোরের পায়ে-দলা ঘাসটি কী এবং তা কী নির্দেশ করে?
উত্তর: কিশোরের পায়ে-দলা ঘাসটি হলো 'মুথাঘাস'। এটি গ্রামবাংলার অতি সাধারণ ও তুচ্ছ জিনিসের মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রাণবন্ততার নির্দেশক।
১৪. লাল বটফলের গন্ধকে 'ব্যথিত গন্ধ' বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: পাকা লাল বটফল গাছ থেকে খসে মাটিতে পড়ার পর মানুষের পায়ে বা অন্যভাবে পিষ্ট হয়ে যায়। এই পিষ্ট বা থেঁতলে যাওয়া ফলের বিষণ্ণ গন্ধকেই কবি 'ব্যথিত গন্ধ' বলেছেন।
১৫. 'এরই মাঝে বাংলার প্রাণ' - বাংলার প্রাণ কীসে আছে?
উত্তর: বাংলার প্রাণ কোনো কৃত্রিম জাঁকজমকে নেই; বরং নরম ধান, কলমী লতা, পুকুরের মাছ, চালধোয়া কিশোরীর হাত বা মুথাঘাসের মতো পল্লির অতি সাধারণ ও রোজকার জীবনের মাঝেই তা লুকিয়ে আছে।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতায় বাংলার সন্ধ্যার যে অপরূপ ও মায়াময় বর্ণনা কবি জীবনানন্দ দাশ দিয়েছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: 'রূপসী বাংলা' কাব্যের কবি জীবনানন্দ দাশ 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতায় গ্রামবাংলার এক অপূর্ব, শান্ত ও স্নিগ্ধ সন্ধ্যার চিত্র অঙ্কন করেছেন।

দিনের অবসানে সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম আকাশে থাকা মেঘগুলো সূর্যের আলোয় কামরাঙা ফলের মতো লাল রং ধারণ করে। তারপর তা ধীরে ধীরে মৃত মনিয়া পাখির মতো নিঃশব্দে গঙ্গাসাগরের কালো ঢেউয়ে ডুবে গিয়ে দিনের অবসান ঘটায়। আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল বা সাতটি তারা ফুটে উঠলে প্রকৃতিতে নেমে আসে শান্ত, অনুগত ও নীল সন্ধ্যা।

কবি এই সন্ধ্যাকে এক 'কেশবতী কন্যা' বা রূপসীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সন্ধ্যার অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে ঢেকে দেয়, তখন কবির মনে হয় যেন সেই কন্যার একঢাল ঘন কালো চুল তাঁর চোখ ও মুখের ওপর আলতো করে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই চুলের স্পর্শ যেন হিজল, কাঁঠাল ও জাম গাছের পাতায় পাতায় অবিরত চুম্বনের মতো ঝরে পড়ে এবং চারপাশকে স্নিগ্ধ গন্ধে ভরিয়ে দেয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশের সন্ধ্যায় এমন মায়াময় রূপ ও স্নিগ্ধতা দেখা যায় না। বাংলার এই অপরূপ সন্ধ্যায় মুগ্ধ কবি ঘাসের ওপর বসে প্রকৃতির এই অসীম প্রশান্তিকে অনুভব করেন।

২. "এরই মাঝে বাংলার প্রাণ" - 'এরই মাঝে' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? বাংলার প্রাণ কোথায় কীভাবে স্পন্দিত হচ্ছে তা কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।

উত্তর: 'এরই মাঝে'-র অর্থ: 'এরই মাঝে' বলতে কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার অতি সাধারণ, নগণ্য এবং তুচ্ছ প্রাকৃতিক উপাদান ও গ্রামীণ মানুষের রোজকার সহজ-সরল জীবনযাত্রাকে বুঝিয়েছেন।

বাংলার প্রাণের স্পন্দন: কবিতায় কবি প্রমাণ করেছেন যে বাংলার আসল সৌন্দর্য বা প্রাণ কোনো কৃত্রিম চাকচিক্য বা জাঁকজমকের মধ্যে নেই। তা ছড়িয়ে আছে পল্লির আনাচে-কানাচে অতি পরিচিত দৃশ্য ও গন্ধের মাঝে। নরম ধানের গন্ধ, জলাভূমির কলমী লতার সুবাস, হাঁসের পালক, শর ঘাস, পুকুরের শান্ত জল এবং চাঁদা ও সরপুঁটি মাছের আঁশটে অথচ পরিচিত গন্ধের মধ্যেই বাংলার আসল রূপ লুকিয়ে আছে।
শুধু প্রকৃতি নয়, বাংলার মানুষের জীবনের ছোঁয়াও এর সঙ্গে মিশে আছে। চালধোয়া কিশোরী মেয়ের ভিজে ঠান্ডা হাত, দুরন্ত কিশোরের পায়ে মাড়ানো মুথাঘাস কিংবা গাছ থেকে মাটিতে পড়ে পিষ্ট হওয়া লাল বটফলের ক্লান্ত, ব্যথিত গন্ধ—এই সবকিছুর সম্মিলিত রূপই হলো বাংলার প্রকৃত আত্মা। এই তুচ্ছ ও প্রতিদিনের গ্রাম্য চিত্রগুলির মাঝেই কবি বাংলার শাশ্বত প্রাণের স্পন্দনকে অনুভব করেছেন, যা আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলেই তাঁর চেতনায় আরও তীব্র হয়ে ধরা দেয়।

৩. "কামরাঙা-লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো" - উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গ ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: প্রসঙ্গ: রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতা থেকে আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি গৃহীত। গোধূলিলগ্নে দিনের আলো নিভে গিয়ে যখন আকাশে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে, ঠিক সেই মুহূর্তের পশ্চিম আকাশের মেঘের অবস্থা বোঝাতেই কবি এই চমৎকার উপমাটি ব্যবহার করেছেন।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় পশ্চিম আকাশের শেষ আলো মেঘের ওপর পড়লে মেঘগুলো পাকা কামরাঙা ফলের মতো লালচে রং ধারণ করে। কিন্তু সেই রং দীর্ঘস্থায়ী হয় না। গোধূলির আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথে মেঘের সেই লাল আভা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে অন্ধকারের বুকে বিলীন হতে থাকে।
এই মিলিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটিকে কবি একটি মৃত মনিয়া পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। মনিয়া হলো লালচে রঙের একটি ছোট্ট সুন্দর পাখি। সেই পাখিটি মারা গেলে যেমন তার জীবনের স্পন্দন ও সৌন্দর্য চিরতরে হারিয়ে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি পশ্চিম আকাশের সেই লাল মেঘটিও তার উজ্জ্বল রূপ হারিয়ে গঙ্গাসাগরের অন্ধকার ঢেউয়ের বুকে নিঃশব্দে ডুবে যায়। এই উপমার মধ্য দিয়ে দিনের অবসান এবং প্রকৃতির বুকে শান্ত, করুণ এক সন্ধ্যার আগমনের বিষণ্ণ অথচ অপরূপ চিত্রটি ফুটে উঠেছে।

৪. 'কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে' - কেশবতী কন্যা কাকে বলা হয়েছে? তাকে কেশবতী কন্যা বলার সার্থকতা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: কাকে বলা হয়েছে: 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ গোধূলির পর গ্রামবাংলার বুকে নেমে আসা শান্ত, অনুগত ও নীল 'সন্ধ্যা'-কে কেশবতী কন্যা বলেছেন।

সার্থকতা: কবি জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতিকে মানবীয় রূপে (Personification) দেখতে ভালোবাসতেন। দিন শেষ হওয়ার পর যখন আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল ফুটে ওঠে, তখন ধীরে ধীরে চারপাশের প্রকৃতিতে অন্ধকার নেমে আসে। এই অন্ধকার কোনো ভয়ংকর রূপ নিয়ে আসে না, বরং তা এক শান্ত ও স্নিগ্ধ প্রশান্তি নিয়ে আসে।
কবির কল্পনায় এই ঘনিয়ে আসা অন্ধকার যেন এক রূপসী কন্যার একঢাল ঘন কালো চুল। মেঘমুক্ত আকাশে নেমে আসা এই অন্ধকার বা কালো চুল যখন কবির চোখের ও মুখের ওপর আলতো করে ভাসে, তখন কবি এক অদ্ভুত মায়াময় স্পর্শ অনুভব করেন। সেই অন্ধকারের স্নিগ্ধতা হিজল, কাঁঠাল ও জাম গাছের পাতায় পাতায় পরম স্নেহের চুম্বনের মতো ঝরে পড়ে। প্রকৃতির এই মায়াময়, শান্ত ও প্রেমময় অন্ধকার রূপকে একজন স্নেহময়ী, কালো চুলের অধিকারিণী রূপসী বা 'কেশবতী কন্যা'র সঙ্গে তুলনা করাটা কবির অসামান্য কল্পনাশক্তির পরিচয় দেয় এবং উপমাটি সম্পূর্ণরূপে সার্থক হয়েছে।

৫. 'আকাশে সাতটি তারা' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণের মধ্য দিয়েই রচনার মূল ভাব ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য পাঠকের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কবি জীবনানন্দ দাশের আলোচ্য কবিতাটির নাম 'আকাশে সাতটি তারা'।

কবিতাটি মূলত একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। কবিতার শুরুতেই কবি বলেছেন যে আকাশে সাতটি তারা (সপ্তর্ষিমণ্ডল) ফুটে উঠলে তিনি ঘাসের ওপর বসেন। এই সাতটি তারা ফুটে ওঠাই হলো দিনের আলো শেষ হয়ে শান্ত, স্নিগ্ধ সন্ধ্যার আগমনের নির্দেশক বা সূচনাবিন্দু। এই তারারা ফুটে উঠলেই বাংলার প্রকৃতি এক 'কেশবতী কন্যা'র রূপ ধারণ করে এবং তার মায়াময় অন্ধকারে চারপাশ ঢেকে যায়।
কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তিতেও কবি আবার এই সাতটি তারার কথাই বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, বাংলার নরম ধান, পুকুরের জল, কলমী, মাছ, কিশোর-কিশোরী এবং বটফলের গন্ধের মাঝে লুকিয়ে থাকা 'বাংলার প্রাণ'-এর এই গভীর উপলব্ধি তিনি তখনই টের পান, যখন আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে। অর্থাৎ, এই সাতটি তারা হলো সেই জাদুকরী মুহূর্তের প্রতীক, যা কবির ভেতরের চেতনাকে জাগ্রত করে এবং তাঁকে বাংলার আসল রূপের সন্ধান দেয়। যেহেতু কবিতার শুরু ও শেষে এবং মূল উপলব্ধির কেন্দ্রে এই সাতটি তারার জাগরণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তাই বলা যায় 'আকাশে সাতটি তারা' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • নীরবতা = নিঃ + রবতা
  • বিন্যাস = বি + ন্যাস
  • শান্ত = শম + ত
  • অজস্র = ন + জস্র (বা অ + জস্র)
  • বৃষ্টি = বৃষ্ + তি

সমাস নির্ণয়

  • কামরাঙা-লাল: কামরাঙার ন্যায় লাল (উপমান কর্মধারয় সমাস)
  • কেশবতী: কেশ আছে যার (বহুব্রীহি সমাস)
  • চালধোয়া: চালকে ধোয়া (দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস)
  • গঙ্গাসাগর: গঙ্গা ও সাগর (দ্বন্দ্ব সমাস / বা গঙ্গা নামক সাগর)
  • মুথাঘাস: মুথা নামক ঘাস (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)

পদ পরিবর্তন

  • আকাশ ➜ আকাশী
  • ঘাস ➜ ঘেসো
  • ক্লান্ত ➜ ক্লান্তি
  • শান্ত ➜ শান্তি
  • লাল ➜ লালচে

আকাশে সাতটি তারা কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই কবিতাটি প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা। এটি তাঁর বিখ্যাত 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার শান্ত ও অনুগত নীল সন্ধ্যাকে এক 'কেশবতী কন্যা' বা একঢাল কালো চুলের অধিকারিণী রূপসী মেয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

কবির মতে বাংলার প্রাণ কোনো জাঁকজমকে নেই; বরং নরম ধান, কলমীর ঘ্রাণ, হাঁসের পালক, পুকুরের মাছ, চালধোয়া কিশোরীর ভিজে হাত এবং মুথাঘাসের মতো অতি সাধারণ ও তুচ্ছ জিনিসের মাঝেই তা লুকিয়ে আছে।