ধীবর-বৃত্তান্ত (কালিদাস)

মহাকবি কালিদাসের 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম্' নাটক থেকে নেওয়া 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশের সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর। তরজমা: সত্যনারায়ণ চক্রবর্তী।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত মহাকবি কালিদাসের বিখ্যাত 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশের সম্পূর্ণ পটভূমি, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. নাট্যাংশের পটভূমি ও বিষয়সংক্ষেপ

পূর্বকথা (পটভূমি): মহর্ষি কন্বের তপোবনে রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে বিবাহ করেন এবং রাজপুরীতে ফিরে যান। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি শকুন্তলার কোনো খোঁজ নেননি। স্বামীর চিন্তায় মগ্ন থাকার কারণে শকুন্তলা ঋষি দুর্বাসার আগমন টের পাননি, ফলে ক্ষুব্ধ ঋষি দুর্বাসা অভিশাপ দেন যে, যাঁর চিন্তায় সে মগ্ন, তিনি শকুন্তলাকে ভুলে যাবেন। সখীদের অনুরোধে ঋষি বলেন, রাজা কোনো স্মারকচিহ্ন (নিদর্শন) দেখলে তবেই শাপমুক্ত হবেন। দুষ্মন্তের দেওয়া আংটিটিই ছিল সেই চিহ্ন। কিন্তু শচীতীর্থে স্নান করার সময় শকুন্তলার হাত থেকে আংটিটি খুলে পড়ে যায় এবং রাজসভায় তিনি অপমানিত হন।

নাট্যাংশের বিষয়: হারানো আংটিটি ঘটনাক্রমে একটি রুই মাছের পেটে যায় এবং শক্রাবতারবাসী এক ধীবর (জেলে) মাছটি কাটার সময় সেটি পায়। আংটি বিক্রয় করতে গেলে রাজার নাম খোদাই করা থাকায় প্রহরীরা (সূচক ও জানুক) এবং রাজশ্যালক চোর সন্দেহে তাকে ধরে ফেলে। ধীবরকে তারা নানাভাবে বিদ্রূপ ও অপমান করে। ধীবর জানায় সে পেশায় জেলে এবং কোনো চুরি সে করেনি। রাজশ্যালক রাজার কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানালে রাজা আংটিটি দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েন (কারণ তাঁর প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে যায়) এবং ধীবরকে আংটির সমমূল্যের অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেন। এরপর ধীবর নির্দোষ প্রমাণিত হয় এবং সে তার পুরস্কারের অর্ধেক প্রহরীদের দিয়ে দেয়। রাজশ্যালক ধীবরকে তার "বিশিষ্ট প্রিয় বন্ধু" বলে স্বীকার করে নেন।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
ধীবরজেলে / মৎস্যজীবীশক্রাবতারএকটি তীর্থস্থানের নাম
বৃত্তান্তবিবরণ / কাহিনিস্মারকচিহ্নস্মৃতির নিদর্শন
গোসাপগুইসাপপারিতোষিকপুরস্কার / বখশিশ
বৃত্তিপেশা / জীবিকানিশপিশঅস্থিরতা বা হাত চুলকানো
বেদজ্ঞযিনি বেদ জানেনবিহ্বলআত্মহারা / অভিভূত
গাঁটকাটাপকেটমার / চোরশূলমৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তীক্ষ্ণ অস্ত্র
অনুগৃহীতকৃতজ্ঞ / বাধিতশ্যালকস্ত্রীর ভাই / শ্যালক
বাটপাড়রাহাজান / ঠগনিদর্শনপ্রমাণ / চিহ্ন

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশটির রচয়িতা কে?
(ক) ভবভূতি (খ) ভাস (গ) কালিদাস (ঘ) শূদ্রক
উত্তর: (গ) কালিদাস
২. এই নাট্যাংশটি কোন সংস্কৃত নাটকের অংশ?
(ক) মেঘদূতম্ (খ) অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ (গ) রঘুবংশম্ (ঘ) কুমারসম্ভবম্
উত্তর: (খ) অভিজ্ঞানশকুন্তলম্
৩. শকুন্তলাকে কে অভিশাপ দিয়েছিলেন?
(ক) মহর্ষি কন্ব (খ) বিশ্বামিত্র (গ) বশিষ্ঠ (ঘ) ঋষি দুর্বাসা
উত্তর: (ঘ) ঋষি দুর্বাসা
৪. শকুন্তলার আংটিটি কোথায় খুলে পড়ে গিয়েছিল?
(ক) গঙ্গাতীর্থে (খ) শচীতীর্থে (গ) যমুনায় (ঘ) তপোবনে
উত্তর: (খ) শচীতীর্থে
৫. ধীবর কোথায় থাকত?
(ক) শক্রাবতারে (খ) হস্তিনাপুরে (গ) তপোবনে (ঘ) মগধে
উত্তর: (ক) শক্রাবতারে
৬. ধীবর কোন মাছের পেট থেকে আংটিটি পেয়েছিল?
(ক) বোয়াল (খ) ইলিশ (গ) রুই (ঘ) কাতলা
উত্তর: (গ) রুই
৭. আংটিটি কেমন ছিল?
(ক) সোনার তৈরি (খ) রুপোর (গ) মণিখচিত ও নাম খোদাই করা (ঘ) লোহার তৈরি
উত্তর: (গ) মণিখচিত ও নাম খোদাই করা
৮. "এ অবশ্যই গোসাপ-খাওয়া জেলে হবে।" - কথাটি কে বলেছিল?
(ক) জানুক (খ) সূচক (গ) শ্যালক (ঘ) রাজা
উত্তর: (ক) জানুক
৯. রক্ষী জানুকের হাত দুটো কী করার জন্য নিশপিশ করছিল?
(ক) আংটি নেওয়ার জন্য (খ) জেলেকে মারার আগে ফুলের মালা গাঁথতে (গ) টাকা গুনতে (ঘ) তরবারি ধরতে
উত্তর: (খ) জেলেকে মারার আগে ফুলের মালা গাঁথতে
১০. রাজা জেলের জন্য কী পরিমাণ অর্থ পুরস্কার দিয়েছিলেন?
(ক) আংটির মূল্যের অর্ধেক (খ) দশ স্বর্ণমুদ্রা (গ) আংটির মূল্যের সমান (ঘ) প্রচুর জমি
উত্তর: (গ) আংটির মূল্যের সমান
১১. ধীবর তার পুরস্কারের কত অংশ রক্ষীদের দিয়েছিল?
(ক) চার ভাগের এক ভাগ (খ) অর্ধেক (গ) সম্পূর্ণ (ঘ) কিছুই দেয়নি
উত্তর: (খ) অর্ধেক
১২. ধীবর রক্ষীদের টাকাটা কীসের দাম হিসেবে দিয়েছিল?
(ক) মুক্তির দাম (খ) আংটির দাম (গ) ফুলের দাম (ঘ) বন্ধুত্বের দাম
উত্তর: (গ) ফুলের দাম
১৩. "শোনো ধীবর, এখন থেকে তুমি আমার একজন বিশিষ্ট প্রিয় বন্ধু হলে।" - কে বলল?
(ক) সূচক (খ) জানুক (গ) রাজা (ঘ) রাজশ্যালক
উত্তর: (ঘ) রাজশ্যালক
১৪. বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ কখন নির্দয় হন?
(ক) যুদ্ধের সময় (খ) যজ্ঞীয় পশুবধের সময় (গ) বিচারের সময় (ঘ) চোর ধরলে
উত্তর: (খ) যজ্ঞীয় পশুবধের সময়
১৫. "এ কি যা-তা অনুগ্রহ!" - বক্তা কে?
(ক) সূচক (খ) জানুক (গ) শ্যালক (ঘ) ধীবর
উত্তর: (ক) সূচক
১৬. কার অনুরোধে ঋষি দুর্বাসা শাপমুক্তির উপায় বলেন?
(ক) অনসূয়ার (খ) প্রিয়ংবদার (গ) শকুন্তলার (ঘ) কন্বের
উত্তর: (খ) প্রিয়ংবদার
১৭. ধীবর কী কী উপায়ে মাছ ধরত?
(ক) জাল ও বড়শি দিয়ে (খ) তীর দিয়ে (গ) বিষ দিয়ে (ঘ) হাতে ধরে
উত্তর: (ক) জাল ও বড়শি দিয়ে
১৮. রাজশ্যালক জেলের পেশাকে বিদ্রূপ করে কী বলেছিলেন?
(ক) ঘৃণ্য (খ) পবিত্র (গ) জঘন্য (ঘ) রাজকীয়
উত্তর: (খ) পবিত্র
১৯. আংটিটি দেখে রাজার কেমন অবস্থা হয়েছিল?
(ক) রাগান্বিত (খ) খুশি (গ) বিহ্বল (ঘ) উদাসীন
উত্তর: (গ) বিহ্বল
২০. "এই জেলে যমের বাড়ি গিয়ে আবার ফিরে এল।" - কারণ কী?
(ক) সে মরে বেঁচেছে (খ) তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে (গ) সে খুব চালাক (ঘ) সে পালিয়েছিল
উত্তর: (খ) তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. ঋষি দুর্বাসা শকুন্তলাকে কী অভিশাপ দিয়েছিলেন?
উত্তর: ঋষি দুর্বাসা শকুন্তলাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, যাঁর চিন্তায় মগ্ন থাকার জন্য শকুন্তলা তাঁর আগমন টের পায়নি, সেই ব্যক্তি শকুন্তলাকে সম্পূর্ণ ভুলে যাবেন।
২. অভিশাপ মোচনের উপায় হিসেবে ঋষি দুর্বাসা কী বলেছিলেন?
উত্তর: সখী প্রিয়ংবদার অনুরোধে ঋষি বলেছিলেন, স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাজা দুষ্মন্তের দেওয়া কোনো নিদর্শন (আংটি) দেখাতে পারলে তবেই অভিশাপের প্রভাব দূর হবে।
৩. রাজা দুষ্মন্ত কেন শকুন্তলাকে চিনতে পারেননি?
উত্তর: ঋষি দুর্বাসার দেওয়া অভিশাপের কারণে রাজা দুষ্মন্ত তাঁর স্ত্রী শকুন্তলাকে ভুলে গিয়েছিলেন এবং চিনতে পারেননি।
৪. শকুন্তলার হাতের আংটিটি কোথায় কীভাবে হারিয়ে যায়?
উত্তর: রাজবাড়িতে যাওয়ার পথে শচীতীর্থে স্নান করার পর অঞ্জলি দেওয়ার সময় শকুন্তলার হাত থেকে আংটিটি জলে খুলে পড়ে যায়।
৫. ধীবর আংটিটি কীভাবে পেয়েছিল?
উত্তর: শক্রাবতারবাসী ধীবর একদিন একটি রুই মাছকে খণ্ড খণ্ড করে কাটার সময় সেই মাছের পেটের ভেতর থেকে মণিমুক্তায় ঝলমলে রাজার আংটিটি পেয়েছিল।
৬. রক্ষীরা ধীবরকে কেন ধরেছিল?
উত্তর: ধীবর যখন মাছের পেট থেকে পাওয়া মণিখচিত এবং রাজার নাম খোদাই করা আংটিটি বাজারে বিক্রি করতে যায়, তখন রক্ষীরা তাকে চোর সন্দেহে ধরেছিল।
৭. "যে বৃত্তি নিয়ে যে মানুষ জন্মেছে..." - কার উক্তি? বৃত্তিটি কী ছিল?
উত্তর: উক্তিটি ধীবরের। তার বৃত্তি বা পেশা ছিল জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরে সংসার চালানো।
৮. "তা তোর জীবিকা বেশ পবিত্র বলতে হয় দেখছি।" - কে, কাকে বিদ্রূপ করে এ কথা বলেছেন?
উত্তর: নগর-রক্ষায় নিযুক্ত রাজশ্যালক, ধীবরের মাছ ধরার পেশার কথা শুনে বিদ্রূপ করে এ কথা বলেছিলেন।
৯. ধীবর নিজের পেশার সপক্ষে কী যুক্তি দিয়েছিল?
উত্তর: ধীবর বলেছিল, যে পেশা নিয়ে মানুষ জন্মায় তা নিন্দনীয় হলেও ছাড়া উচিত নয়। যেমন- স্বভাবে দয়ালু বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণও যজ্ঞের জন্য পশুবধের সময় নির্দয় হয়ে থাকেন।
১০. "এর গা থেকে কাঁচা মাংসের গন্ধ আসছে।" - কে বলেছিল এবং কেন?
উত্তর: উক্তিটি রক্ষী জানুকের। ধীবর মাছ ধরত ও কাটত বলে স্বাভাবিকভাবেই তার গা থেকে আঁশটে বা কাঁচা মাংসের গন্ধ আসছিল, তাই জানুক তাকে 'গোসাপ-খাওয়া জেলে' বলে কটাক্ষ করেছিল।
১১. আংটি দেখার পর রাজা দুষ্মন্তের কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?
উত্তর: আংটিটি দেখার পর রাজার মনে তাঁর কোনো প্রিয়জনের স্মৃতি জেগে ওঠে। স্বভাবত গম্ভীর প্রকৃতির রাজা মুহূর্তের জন্য আত্মহারা বা বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন।
১২. "এই জেলে যমের বাড়ি গিয়ে আবার ফিরে এল।" - এমন মন্তব্যের কারণ কী?
উত্তর: চোর সন্দেহে ধীবরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য রক্ষীরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু রাজার বিচারে সে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পাওয়ায় রক্ষী এমন মন্তব্য করেছিল।
১৩. "এ কি যা-তা অনুগ্রহ!" - অনুগ্রহটি কী ছিল?
উত্তর: চোর সন্দেহে ধৃত জেলেকে শুধু মুক্তি দেওয়াই নয়, রাজা খুশি হয়ে তাকে আংটির সমমূল্যের অর্থ পুরস্কার দিয়েছিলেন। এই বিপুল প্রাপ্তিকেই রক্ষী সূচক অনুগ্রহ বলেছে।
১৪. ধীবর তার পুরস্কারের অর্ধেক রক্ষীদের কেন দিয়েছিল?
উত্তর: ধীবর যখন বন্দি ছিল, তখন রক্ষীরা তাকে মারার আগে পরানোর জন্য ফুলের মালা গাঁথছিল। মুক্তি পাওয়ার আনন্দে সেই ফুলের দাম হিসেবেই ধীবর তার পুরস্কারের অর্ধেক রক্ষীদের দেয়।
১৫. "শোনো ধীবর, এখন থেকে তুমি আমার একজন বিশিষ্ট প্রিয় বন্ধু হলে।" - রাজশ্যালকের এমন পরিবর্তনের কারণ কী?
উত্তর: ধীবর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় এবং রাজার কাছ থেকে বিপুল পুরস্কার পেয়েও তার অর্ধেক বিনা দ্বিধায় রক্ষীদের বিলিয়ে দেওয়ায়, তার সততা ও বদান্যতা দেখে রাজশ্যালক তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে এ কথা বলেছিলেন।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশ অবলম্বনে ধীবর চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

উত্তর: মহাকবি কালিদাসের 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম্' নাটকের ষষ্ঠ অঙ্ক থেকে গৃহীত 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশে ধীবর চরিত্রটি একটি ছোটো কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্র। তার চরিত্রে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠেছে:

১. সততা ও সরলতা: মাছের পেট থেকে মহার্ঘ্য আংটি পাওয়ার পর সে তা লুকিয়ে রাখেনি। বিক্রির জন্য বাজারে এনে সে প্রমাণ করেছে তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। রক্ষীদের জেরার মুখে সে সহজ ও সরলভাবে আদ্যোপান্ত সত্য ঘটনা তুলে ধরেছে।
২. সাহসিকতা ও আত্মমর্যাদাবোধ: রাজশ্যালক ও প্রহরীরা তাকে চোর, গাঁটকাটা, গোসাপ-খাওয়া ইত্যাদি বলে তীব্র অপমান করলেও ধীবর ভয় পেয়ে গুটিয়ে যায়নি। বরং বিনয়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সে নিজের পেশার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, জন্মগত পেশা কখনও নিন্দনীয় হতে পারে না।
৩. তর্কবিদ্যা ও বুদ্ধিমত্তা: বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের যজ্ঞীয় পশুবধের উদাহরণ দিয়ে ধীবর বুঝিয়ে দিয়েছে যে পেশাগত নিষ্ঠুরতা মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাবকে নষ্ট করে না। এই যুক্তি তার প্রখর বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
৪. বদান্যতা ও নির্লোভ স্বভাব: রাজার কাছ থেকে আংটির সমমূল্যের বিপুল অর্থ পুরস্কার পেয়েও সে অহংকারী হয়নি। বরং যারা তাকে অপমান করেছিল, সেই রক্ষীদেরই ফুলের দাম হিসেবে পুরস্কারের অর্ধেক বিলিয়ে দিয়ে সে তার বড়ো মনের পরিচয় দিয়েছে।

২. "যে বৃত্তি নিয়ে যে মানুষ জন্মেছে, সেই বৃত্তি নিন্দনীয় হলেও তা পরিত্যাগ করা উচিত নয়।" - উক্তিটির বক্তা কে? উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন মহাকবি কালিদাসের 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশের কেন্দ্রীয় চরিত্র, শক্রাবতারবাসী এক ধীবর বা জেলে।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: ধীবর যখন জানায় যে সে জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরে সংসার চালায়, তখন রাজশ্যালক তার পেশাকে বিদ্রূপ করে বলেন যে এটি একটি জঘন্য পেশা। এর প্রতিবাদে ধীবর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আলোচ্য উক্তিটি করে।
সমাজে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। কোনো পেশাই সম্মান বা মর্যাদার দিক থেকে ছোটো নয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য জন্মসূত্রে বা পরিস্থিতিগত কারণে মানুষ যে পেশা গ্রহণ করে, তা কখনও পরিত্যাজ্য হতে পারে না। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে ধীবর বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের অকাট্য উদাহরণ তুলে ধরেছে। একজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ স্বভাবত দয়ালু ও অহিংস হলেও, যজ্ঞের প্রয়োজনে পশুবলির সময় তিনি নির্দয় আচরণ করেন। এতে তাঁর ব্রাহ্মণ সত্তা যেমন কলঙ্কিত হয় না, ঠিক তেমনি মাছ ধরা জেলের পেশা হলেও সে মানুষ হিসেবে অসৎ বা ঘৃণ্য হতে পারে না। সমাজের চোখে পেশাটি নিচ হলেও তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাই মানুষের কর্তব্য।

৩. রাজশ্যালক ও দুই রক্ষীর ধীবরের প্রতি আচরণের কী পরিবর্তন হয়েছিল এবং কেন?

উত্তর: আচরণের পরিবর্তন: নাট্যাংশের শুরুতে রাজশ্যালক এবং রক্ষী সূচক ও জানুক ধীবরকে চোর সাব্যস্ত করে তীব্র গালিগালাজ, বিদ্রূপ ও অপমান করেছিল। তারা তাকে 'গাঁটকাটা', 'গোসাপ-খাওয়া জেলে' বলে কটাক্ষ করে এবং তাকে শকুনি বা কুকুর দিয়ে খাওয়ানোর ভয় দেখায়। কিন্তু নাট্যাংশের শেষে দেখা যায়, সেই রক্ষীরাই জেলের সাথে স্বাভাবিক আচরণ করছে এবং রাজশ্যালক ধীবরকে নিজের "বিশিষ্ট প্রিয় বন্ধু" বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

পরিবর্তনের কারণ: এই পরিবর্তনের মূলে ছিল ধীবরের সততা ও রাজার বিচার। রাজশ্যালক যখন জানতে পারেন ধীবরের বলা প্রতিটি কথা সত্য এবং স্বয়ং রাজা তাকে নির্দোষ বলে শুধু মুক্তিই দেননি, বরং আংটির সমান মূল্যের বিপুল অর্থ পুরস্কার দিয়েছেন, তখন রাজকর্মচারীদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। তারা বুঝতে পারে ধীবর সাধারণ চোর নয়, বরং সে রাজার অনুগ্রহপ্রাপ্ত একজন সৎ ব্যক্তি। এর ওপর, ধীবর নিজের পাওয়া বিশাল পুরস্কারের অর্ধেক অংশ প্রহরীদের হাতে তুলে দেওয়ায় তার মহানুভবতা ও উদারতা রাজশ্যালকের মন জয় করে নেয়। তাই ঘৃণার বদলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

৪. "এ কি যা-তা অনুগ্রহ! এ যে শূল থেকে নামিয়ে একেবারে হাতির পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হলো।" - কে, কাকে বলেছে? উক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: বক্তা ও শ্রোতা: মহাকবি কালিদাস রচিত 'ধীবর-বৃত্তান্ত' নাট্যাংশে রাজরক্ষী সূচক তার সঙ্গী জানুক ও অন্যান্যদের সামনে ধীবরের সম্পর্কে এই মন্তব্যটি করেছে।

অন্তর্নিহিত অর্থ: প্রাচীনকালে রাজদণ্ড হিসেবে অপরাধীদের শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। অন্যদিকে, হাতির পিঠে চড়া ছিল রাজকীয় সম্মান, মর্যাদা ও বিপুল সম্পদের প্রতীক। ধীবর যখন মহার্ঘ্য আংটিসহ ধরা পড়ে, তখন রক্ষীরা নিশ্চিত ছিল যে চুরির অপরাধে ধীবরের মৃত্যুদণ্ড বা শূলে চড়া অবধারিত। এমনকি রক্ষীরা ধীবরকে পরানোর জন্য বধ্যভূমির ফুলের মালাও গাঁথছিল। কিন্তু রাজশ্যালক ফিরে এসে জানান যে ধীবর নির্দোষ এবং স্বয়ং মহারাজ খুশি হয়ে ধীবরকে আংটির সমমূল্যের বিপুল অর্থ উপহার দিয়েছেন। অর্থাৎ, যে মানুষটির একটু আগে চরম মৃত্যুভয় ছিল, সে হঠাৎ করেই রাজকীয় অনুগ্রহ ও বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে গেল। ভাগ্যের এই চরম ও নাটকীয় পরিবর্তন বোঝাতেই রক্ষী সূচক শূলদণ্ড থেকে হাতির পিঠে চড়ার প্রবাদপ্রতিম তুলনাটি ব্যবহার করেছে।

৫. ঋষি দুর্বাসার অভিশাপ কীভাবে শকুন্তলার জীবনে নেমে এল এবং কীভাবে সেই অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় পাওয়া গেল তা নাট্যাংশের পূর্বকথা অবলম্বনে লেখো।

উত্তর: অভিশাপের প্রেক্ষাপট: রাজা দুষ্মন্ত মহর্ষি কন্বের তপোবনে এসে শকুন্তলাকে বিবাহ করেন এবং রাজধানীতে ফিরে যান। কথা ছিল তিনি দূত পাঠিয়ে শকুন্তলাকে রাজপুরীতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও রাজার কোনো খবর না আসায় শকুন্তলা সর্বদা স্বামীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। একদিন মহামুনি দুর্বাসা তপোবনে এলেও অন্যমনস্ক শকুন্তলা তাঁর আগমন টের পাননি এবং তাঁকে যথাযথ অভ্যর্থনা জানাননি। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে ঋষি দুর্বাসা শকুন্তলাকে অভিশাপ দেন যে, যাঁর চিন্তায় সে এত মগ্ন, সেই ব্যক্তি শকুন্তলাকে চিরতরে ভুলে যাবেন।

মুক্তির উপায়: এই ভয়ংকর অভিশাপ শুনে শকুন্তলার সখীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সখী প্রিয়ংবদা ছুটে গিয়ে ঋষি দুর্বাসার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। প্রিয়ংবদার কাতর অনুরোধে ঋষি শান্ত হয়ে বলেন যে অভিশাপ সম্পূর্ণ ফেরানো যাবে না, তবে শকুন্তলা যদি রাজাকে কোনো স্মারকচিহ্ন বা নিদর্শন দেখাতে পারে, তবেই রাজা স্মৃতি ফিরে পাবেন এবং অভিশাপের প্রভাব দূর হবে। বিদায়কালে দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে যে নিজের নাম খোদাই করা আংটিটি পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটিই ছিল সেই শাপমুক্তির একমাত্র উপায়।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar) ১০ টি প্রশ্ন

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • মহর্ষি = মহা + ঋষি
  • অভিশাপ = অভি + শাপ
  • পূর্বাপর = পূর্ব + অপর
  • বৃত্তান্ত = বৃত্ত + অন্ত
  • মহারাজ = মহা + রাজ

সমাস নির্ণয়

  • তপোবন: তপের নিমিত্ত বন (নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস)
  • রাজশ্যালক: রাজার শ্যালক (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • মণিখচিত: মণি দ্বারা খচিত (করণ তৎপুরুষ সমাস)
  • গাঁটকাটা: গাঁট কাটে যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)
  • বেদজ্ঞ: বেদ জানেন যিনি (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)

ধীবর-বৃত্তান্ত সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এটি মহাকবি কালিদাস রচিত বিখ্যাত সংস্কৃত নাটক 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম্'-এর ষষ্ঠ অঙ্ক থেকে নেওয়া হয়েছে। বাংলায় এর তর্জমা করেছেন সত্যনারায়ণ চক্রবর্তী।

ধীবর বা জেলে একটি রুই মাছকে খণ্ড খণ্ড করে কাটার সময় সেই মাছের পেটের ভেতর থেকে রাজার নাম খোদাই করা আংটিটি পেয়েছিল।

আংটিটি দেখামাত্রই রাজা দুষ্মন্তের তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী শকুন্তলার কথা মনে পড়ে যায়। দুর্বাসার শাপমুক্তির কারণেই তাঁর স্মৃতি ফিরে আসে এবং তিনি আত্মহারা বা বিহ্বল হয়ে পড়েন।