ঘর (অমিয় চক্রবর্তী)

বিখ্যাত আধুনিক কবি অমিয় চক্রবর্তী রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'ঘর' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত আধুনিক যুগের বিশিষ্ট কবি অমিয় চক্রবর্তী রচিত 'ঘর' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ঘরে ফেরা: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি অমিয় চক্রবর্তী রচিত 'ঘর' কবিতাটি দীর্ঘ প্রবাস বা বিদেশ জীবন কাটিয়ে নিজের আপন ঠিকানায় বা জন্মভূমিতে ফিরে আসার এক গভীর উপলব্ধির কবিতা। পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরে, চোখের অসীম তৃষ্ণা মিটিয়ে ক্লান্ত কবি আজ নিজের শান্ত, আপন ঘরে ফিরে এসেছেন। বাড়ির জারুল গাছের বেড়া এবং কাঁকর বিছানো পথ পেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কবির মনে হয়, তাঁর সমস্ত ঘোরাঘুরির বা পৃথিবীর এখানেই যেন মধুর সমাপ্তি ঘটেছে।

বাইরের কোলাহল ও ঘরের প্রশান্তি: বাইরের জগৎ বা প্রবাস জীবনকে কবি 'অনাত্ম সংসার' বলেছেন। কারণ, সেখানে অর্থ, খ্যাতি বা ব্যস্ততা থাকলেও মনের শান্তি থাকে না; তা কেবল দূরে গর্জনের মতো শব্দ করে। আপন ঘরে ফিরে আসায় কবির মন থেকে বাইরের সংসারের সেই সমস্ত ক্লান্তিকর স্মৃতির ঢিবি বা বোঝা সম্পূর্ণ মুছে গেছে। নিজের গ্রামের মাটিতে, আপন ঘরে ভক্তিভরে প্রণাম জানিয়ে কবি যেন এক নূতন সত্তা বা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন।

স্নেহময় অভ্যর্থনা: বেড়া পার হয়ে কবি নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেন। সিঁড়ির কাছে আসতেই তিনি শুনতে পান তাঁর অত্যন্ত পরিচিত এক কচি গলার মিষ্টি আওয়াজ। সন্ধেবেলার সেই আবছা অন্ধকারে তিনি দেখেন, গাছের আড়ালে কেউ একজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি আলো হাতে নিয়ে। এই আলো হাতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি আসলে ঘরে ফেরার সন্ধ্যায় প্রিয়জনের স্নেহময় প্রতীক্ষা এবং পথ দেখানোর এক অসামান্য প্রতীক। কবিতাটি প্রবাসের ক্লান্তি শেষে নিজের আপন ঘরের চিরন্তন শান্তি ও তৃপ্তিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
জারুলএকপ্রকার মাঝারি বা বড়ো গাছঅনাত্মযা নিজের বা আপন নয় এমন / বাইরের
কাঁকরছোটো ছোটো পাথর বা ইটের টুকরোগরজায়গর্জন করে বা সশব্দে কোলাহল করে
তৃষ্ণাতীব্র আকাঙ্ক্ষা বা পিয়াসঢিবিস্তূপ বা উঁচু জায়গা (এখানে স্মৃতির বোঝা)
প্রণামভক্তিভরে মাথা নত করে নমস্কারকচি গলাশিশুর মিষ্টি কণ্ঠস্বর
সাঁঝসন্ধ্যাবেলাস্থিরঅচঞ্চল বা শান্ত

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'ঘর' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) জীবনানন্দ দাশ (গ) অমিয় চক্রবর্তী (ঘ) সুভাষ মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (গ) অমিয় চক্রবর্তী
২. কবি কোথায় ফিরেছেন?
(ক) বিদেশে (খ) বাড়িতে (গ) পাহাড়ে (ঘ) শহরে
উত্তর: (খ) বাড়িতে
৩. বাড়ির বেড়াটি কীসের ছিল?
(ক) বাঁশের (খ) কাঁটা তারের (গ) জারুলের (ঘ) শিমুলের
উত্তর: (গ) জারুলের
৪. দরজার কাছে কোন্ পথটি এসে থামবে?
(ক) পিচের পথ (খ) মাটির পথ (গ) ইটের পথ (ঘ) কাঁকর পথ
উত্তর: (ঘ) কাঁকর পথ
৫. "আমার পৃথিবী / এইখানে শেষ।" - কোথায় শেষ?
(ক) দরজায় / নিজের ঘরে (খ) বিদেশে (গ) রাস্তায় (ঘ) মাঠে
উত্তর: (ক) দরজায় / নিজের ঘরে
৬. কবি কীসের তৃষ্ণায় অনেক দেশ ঘুরেছেন?
(ক) অর্থের তৃষ্ণায় (খ) জ্ঞানের তৃষ্ণায় (গ) চোখের তৃষ্ণায় (ঘ) যশের তৃষ্ণায়
উত্তর: (গ) চোখের তৃষ্ণায়
৭. দূরে কী গরজায় বা গর্জন করে?
(ক) মেঘ (খ) সমুদ্র (গ) অনাত্ম সংসার (ঘ) জঙ্গল
উত্তর: (গ) অনাত্ম সংসার
৮. 'অনাত্ম' শব্দটির অর্থ কী?
(ক) পরমাত্মা (খ) যা নিজের নয় (গ) আত্মীয় (ঘ) অন্তরঙ্গ
উত্তর: (খ) যা নিজের নয়
৯. আজ কবির মনে কী নেই?
(ক) স্মৃতির ঢিবি (খ) শান্তি (গ) আনন্দ (ঘ) দুঃখ
উত্তর: (ক) স্মৃতির ঢিবি
১০. 'ঢিবি' বলতে কবিতায় কী বোঝানো হয়েছে?
(ক) পাহাড় (খ) নদীর তীর (গ) মাটি (ঘ) স্তূপ বা বোঝা
উত্তর: (ঘ) স্তূপ বা বোঝা
১১. কবি কোথায় 'নূতন' বা নতুন জীবন লাভ করতেন?
(ক) বিদেশে (খ) প্রণামে (গ) পথে (ঘ) স্কুলে
উত্তর: (খ) প্রণামে
১২. কবি কোথায় প্রণাম জানিয়েছেন?
(ক) আপন ঘরের গ্রামে (খ) মন্দিরে (গ) শহরে (ঘ) বিদেশের মাটিতে
উত্তর: (ক) আপন ঘরের গ্রামে
১৩. "বেড়া পার হল, পা, চলো।" - এখানে কে কাকে নির্দেশ দিচ্ছে?
(ক) বাবা ছেলেকে (খ) কবি নিজেকে বা নিজের পা-কে (গ) প্রতিবেশী কবিকে (ঘ) বন্ধু বন্ধুকে
উত্তর: (খ) কবি নিজেকে বা নিজের পা-কে
১৪. সিঁড়ির কাছে কীসের আওয়াজ শোনা যায়?
(ক) নদীর (খ) পাখির (গ) চেনা কচি গলার (ঘ) গাড়ির
উত্তর: (গ) চেনা কচি গলার
১৫. গাছের আড়ালে কে দাঁড়িয়ে আছে?
(ক) একজন চোর (খ) আলো নিয়ে প্রিয়জন (গ) প্রহরী (ঘ) অচেনা লোক
উত্তর: (খ) আলো নিয়ে প্রিয়জন
১৬. গাছের আড়ালে প্রিয়জন কী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
(ক) ফুল (খ) খাবার (গ) আলো (ঘ) বই
উত্তর: (গ) আলো
১৭. 'ফিরে-আসার সাঁঝ' - 'সাঁঝ' শব্দের অর্থ কী?
(ক) সকাল (খ) দুপুর (গ) রাত্রি (ঘ) সন্ধ্যা
উত্তর: (ঘ) সন্ধ্যা
১৮. কোন্ গাছটির উল্লেখ 'ঘর' কবিতায় পাওয়া যায়?
(ক) আম (খ) বট (গ) জারুল (ঘ) মেহগনি
উত্তর: (গ) জারুল
১৯. কবির পৃথিবী কোথায় শেষ হয়েছে?
(ক) নিজের ঘরের শান্তিতে (খ) বিদেশে (গ) সমুদ্রের ধারে (ঘ) কাজের জায়গায়
উত্তর: (ক) নিজের ঘরের শান্তিতে
২০. কবিতাটির মূল সুর কী?
(ক) দেশপ্রেম (খ) প্রবাসের ক্লান্তি ও আপন ঘরে ফেরার অনাবিল শান্তি (গ) প্রকৃতির রূপবর্ণনা (ঘ) বিরহ
উত্তর: (খ) প্রবাসের ক্লান্তি ও আপন ঘরে ফেরার অনাবিল শান্তি

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'বাড়ি ফিরেছি।' - কে কোথায় ফিরেছেন?
উত্তর: আধুনিক কবি অমিয় চক্রবর্তী বহু দেশ ঘুরে দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর নিজের আপন ঠিকানায় বা নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন।
২. কবির বাড়ির চারপাশের পরিবেশ কেমন ছিল?
উত্তর: কবির বাড়ির পরিবেশ ছিল শান্ত ও স্নিগ্ধ; বাড়ির চারপাশে জারুল গাছের বেড়া দেওয়া ছিল এবং একটি কাঁকর বিছানো পথ দরজার সামনে এসে থেমেছিল।
৩. 'আমার পৃথিবী / এইখানে শেষ।' - 'এইখানে' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'এইখানে' বলতে কবির নিজের ঘরের দরজা বা আপন বাড়ির আঙিনাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে এসে তাঁর সমস্ত যাত্রার মধুর সমাপ্তি ঘটেছে।
৪. কবি অনেক দেশ কীভাবে ঘুরেছেন?
উত্তর: অজানাকে জানার ও দেখার অদম্য কৌতূহল বা 'চোখের তৃষ্ণা' মেটানোর জন্যই কবি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন বা ঘুরেছেন।
৫. 'অনাত্ম সংসার দূরে গরজায়।' - 'অনাত্ম সংসার' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: 'অনাত্ম' মানে যা আপন বা নিজের নয়। এখানে বাইরের কোলাহলমুখর জগত বা প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে মানসিক শান্তি নেই।
৬. 'মনের স্মৃতির ঢিবি / আজ নেই।' - এর অর্থ কী?
উত্তর: বহু দেশ ঘোরার ফলে সঞ্চিত ক্লান্তি এবং বাইরের সংসারের স্মৃতির যে পাহাড় বা বোঝা কবির মনে জমেছিল, শান্ত আপন ঘরে ফেরার পর আজ তা সম্পূর্ণ মুছে গেছে।
৭. 'নূতন হতেম প্রণামে' - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: নিজের জন্মভূমি বা আপন ঘরের গ্রামে ফিরে ভক্তিভরে প্রণাম নিবেদনের মাধ্যমে কবি যেন জীবনের এক নতুন সজীবতা বা নতুন সত্তা লাভ করলেন।
৮. 'আপন ঘরের গ্রামে' ফিরে কবির কী অনুভূতি হয়েছে?
উত্তর: আপন ঘরের গ্রামে ফিরে কবি এক অনাবিল শান্তি ও তৃপ্তি অনুভব করেছেন। বাইরের পৃথিবীর সমস্ত গ্লানি ভুলে তিনি সেখানে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।
৯. 'বেড়া পার হল, পা, চলো।' - কে কাকে নির্দেশ দিচ্ছেন?
উত্তর: ক্লান্ত কবি নিজে নিজেকে বা নিজের পা-কে নির্দেশ দিচ্ছেন জারুলের বেড়া পার হয়ে ঘরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
১০. সিঁড়ির কাছে কীসের আওয়াজ শোনা যায়?
উত্তর: সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই কবি তাঁর অত্যন্ত পরিচিত ও আদরের কোনো শিশুর কচি গলার মিষ্টি আওয়াজ শুনতে পান।
১১. গাছের আড়ালে কে, কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে?
উত্তর: সন্ধেবেলার অন্ধকারে গাছের আড়ালে কবির কোনো প্রিয়জন বা আপনজন হাতে একটি আলো নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১২. আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি কীসের প্রতীক?
উত্তর: এই দৃশ্যটি হলো ঘরে ফেরার সন্ধ্যায় প্রিয়জনের স্নেহময় প্রতীক্ষা, আন্তরিক অভ্যর্থনা এবং বাইরের অন্ধকার থেকে ঘরের আলোয় পথ দেখানোর এক অসামান্য প্রতীক।
১৩. 'ফিরে-আসার সাঁঝ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'সাঁঝ' মানে সন্ধ্যা। এখানে দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ক্লান্ত কবির নিজের আপন ঘরে ও প্রিয়জনদের মাঝে ফিরে আসার সেই শান্তিময় সন্ধ্যাটিকে বোঝানো হয়েছে।
১৪. 'গরজায়' শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর: 'গরজায়' শব্দটির অর্থ হলো গর্জন করে বা সশব্দে কোলাহল করে। কবিতায় বাইরের দুনিয়ার যান্ত্রিক কোলাহল বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
১৫. 'ঘর' কবিতাটি কোন্ পটভূমিতে রচিত?
উত্তর: কবিতাটি দীর্ঘ প্রবাস বা বিদেশ ভ্রমণ শেষে ক্লান্ত পথিকের পরম শান্তির জায়গা, নিজের আপন ঠিকানা বা ঘরে ফিরে আসার পটভূমিতে রচিত।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'ঘর' কবিতায় কবির আপন ঘরে ফেরার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

উত্তর: কবি অমিয় চক্রবর্তী রচিত 'ঘর' কবিতাটিতে দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে নিজের আপন ঠিকানায় ফিরে আসার এক স্নিগ্ধ ও শান্তিময় চিত্র ফুটে উঠেছে।

কবি পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরে নিজের চোখের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। কিন্তু বাইরের সেই 'অনাত্ম' বা পরবাসের জগত তাঁকে প্রকৃত শান্তি দিতে পারেনি। বহু ঘোরাঘুরির শেষে ক্লান্ত কবি আজ তাঁর আপন ঘরে ফিরে এসেছেন। তিনি দেখেন, তাঁর বাড়ির চারপাশে চেনা জারুল গাছের বেড়া দেওয়া এবং একটি কাঁকর বিছানো পথ এসে দরজায় থেমেছে। এই পরিচিত আঙিনায় পা রাখতেই তাঁর মনে হয়, তাঁর অনন্ত যাত্রার অবসান ঘটেছে এবং তাঁর গোটা পৃথিবী যেন এখানেই সমাপ্ত হয়েছে।
বাইরের সংসারের গর্জন এবং স্মৃতির সমস্ত বোঝা মন থেকে মুছে গেছে। নিজের ঘরের গ্রামে ফিরে মাটিকে ভক্তিভরে প্রণাম জানিয়ে তিনি যেন এক নতুন জীবন লাভ করেছেন। বেড়া পার হয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতেই তিনি শুনতে পান এক চেনা কচি গলার আওয়াজ। আর দেখেন, গাছের আড়ালে তাঁর কোনো প্রিয়জন আলো হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে ফেরার এই সন্ধ্যাটি কবির কাছে পরম নির্ভরতা, আশ্রয় ও স্নেহময় অভ্যর্থনার এক অপরূপ ছবিতে পরিণত হয়েছে।

২. "আমার পৃথিবী / এইখানে শেষ।" - কবির এই উপলব্ধির কারণ কী?

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি কবি অমিয় চক্রবর্তী রচিত 'ঘর' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

উপলব্ধির কারণ: মানুষ স্বভাবতই অজানাকে জানতে এবং অদেখাকে দেখতে ভালোবাসে। কবিও এর ব্যতিক্রম নন। অদম্য কৌতূহল এবং 'চোখের তৃষ্ণা' মেটানোর জন্য তিনি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইয়ের সেই 'অনাত্ম' বা যান্ত্রিক পরিবেশ তাঁকে মানসিক প্রশান্তি দিতে পারেনি। অনেক ঘোরার পর ক্লান্ত কবি যখন তাঁর নিজের বাড়ির আঙিনায়, জারুলের বেড়া এবং কাঁকর বিছানো পথের শেষে নিজের দরজার সামনে এসে দাঁড়ান, তখন তিনি এক গভীর শান্তি অনুভব করেন।
তাঁর মনে হয়, বাইরের বিশাল পৃথিবী যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, মানুষের আসল তৃপ্তি ও নিরাপদ আশ্রয় লুকিয়ে থাকে তার নিজের 'ঘর'-এ। এই আপন ঘরে ফিরেই মানুষের সমস্ত যাত্রার সার্থকতা ও পূর্ণতা লাভ হয়। নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরের দুনিয়া ঘোরার আর কোনো স্পৃহা বা তৃষ্ণা কবির মনে অবশিষ্ট নেই। পরম শান্তি ও তৃপ্তির এই চরম বিন্দুতে পৌঁছানোর কারণেই কবির মনে হয়েছে যে তাঁর অনন্ত পৃথিবীর যাত্রা এখানেই শেষ হয়েছে।

৩. "অনাত্ম সংসার দূরে গরজায়।" - 'অনাত্ম সংসার' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? কেন তা দূরে গরজায়?

উত্তর: উৎস: আলোচ্য অংশটি আধুনিক কবি অমিয় চক্রবর্তীর 'ঘর' কবিতা থেকে গৃহীত।

'অনাত্ম সংসার'-এর অর্থ: 'অনাত্ম' শব্দের অর্থ হলো যা নিজের আত্মা বা সত্তার সঙ্গে যুক্ত নয়, অর্থাৎ আপন নয় এমন কিছু। এখানে 'অনাত্ম সংসার' বলতে কবি তাঁর প্রবাস জীবনের বাইরের যান্ত্রিক, স্বার্থপর এবং কোলাহলমুখর জগতকে বুঝিয়েছেন, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো আত্মীয়তা বা হৃদয়ের গভীর টান থাকে না।

দূরে গরজানোর কারণ: কবি দীর্ঘকাল সেই অনাত্ম সংসারে কাটিয়েছেন। কিন্তু আজ তিনি তাঁর নিজের শান্ত, স্নেহময় এবং নিরাপদ আশ্রয়ে (ঘরে) ফিরে এসেছেন। নিজের ঘরে ফেরার পর বাইরের জগতের সেই যান্ত্রিক কোলাহল, কর্মব্যস্ততা এবং স্বার্থের সংঘাত আর তাঁকে স্পর্শ করতে পারছে না। ঘরের অনাবিল শান্তির মধ্যে বসে কবির মনে হচ্ছে যে বাইরের সেই আপন-নয়-এমন জগতটি এখন তাঁর নাগালের অনেক বাইরে, বহু দূরে বসে কেবল নিষ্ফল গর্জন করছে। ঘরের প্রশান্তিই বাইরের সেই গর্জনকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

৪. "নূতন হতেম প্রণামে / এই / আপন ঘরের গ্রামে।" - উদ্ধৃতিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিগুলি কবি অমিয় চক্রবর্তী রচিত 'ঘর' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

অন্তর্নিহিত অর্থ: কবি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু প্রবাসের সেই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি তাঁর মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। বাইরের সেই 'অনাত্ম' জগতের স্মৃতির বোঝা বা ঢিবি বয়ে বেড়াতে বেড়াতে তিনি শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি নিজের মাতৃভূমিতে বা আপন ঘরের গ্রামে ফিরে এলেন, তখন সেই পরিচিত মাটির স্পর্শে তাঁর মনের সমস্ত ক্লান্তি ও স্মৃতির বোঝা নিমেষের মধ্যে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
নিজের জন্মভূমির মাটিকে ভক্তিভরে প্রণাম জানানোর মাধ্যমে কবি যেন তাঁর শেকড়কে ফিরে পেলেন। এই আত্মনিবেদন ও প্রণামের মধ্যে দিয়ে কবির ভেতরের সমস্ত মালিন্য দূর হয়ে গেল এবং তিনি এক অনাবিল শান্তি, পবিত্রতা ও সতেজতা অনুভব করলেন। আপন ঘরের মাটিতে পা রেখে তিনি যেন নতুন করে পুনর্জন্ম লাভ করলেন বা 'নূতন' সত্তায় উদ্ভাসিত হলেন—উদ্ধৃতিটিতে কবির এই গভীর আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির কথাই ব্যক্ত হয়েছে।

৫. 'ঘর' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল ভাববস্তু বা অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা পাঠকের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কবি অমিয় চক্রবর্তী তাঁর আলোচ্য কবিতাটির নাম রেখেছেন 'ঘর'।

সমগ্র কবিতাটি আবর্তিত হয়েছে দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ক্লান্ত পথিকের পরম আশ্রয়ের জায়গা 'ঘর'-এ ফিরে আসার গভীর অনুভূতিকে কেন্দ্র করে। মানুষের জীবনে বাইরের পৃথিবীর আকর্ষণ যতই থাক না কেন, দিনশেষে সে শান্তি খোঁজে তার নিজের ঘরেই। কবিতায় কবি চোখের তৃষ্ণায় অনেক দেশ ঘুরেছেন, কিন্তু সেই 'অনাত্ম সংসার' তাঁকে শান্তি দিতে পারেনি। নিজের বাড়ির জারুলের বেড়া আর দরজার সামনে এসেই তাঁর মনে হয়েছে যে তাঁর পৃথিবীর এখানেই মধুর সমাপ্তি।
এই আপন ঘরে ফিরেই কবির মনের সমস্ত স্মৃতির বোঝা দূর হয়েছে এবং তিনি নতুন সত্তা লাভ করেছেন। পরিশেষে, ঘরের সিঁড়ির কাছে প্রিয়জনের কচি গলার আওয়াজ এবং আলো হাতে প্রতীক্ষার দৃশ্যটি এই ঘরের স্নেহময় ও নিরাপদ পরিবেশকেই মূর্ত করে তুলেছে। যেহেতু বাইরের জগতকে ছাপিয়ে নিজের আপন 'ঘর'-এর চিরন্তন শান্তি, নির্ভরতা ও তৃপ্তিই কবিতার মূল উপজীব্য বিষয়, তাই বলা যায় 'ঘর' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • সংসার = সম্ + সার
  • তৃষ্ণা = তৃষ্ + না
  • নীরব = নিঃ + রব
  • পুনরায় = পুনঃ + আয়
  • অতীত = অতি + ইত

সমাস নির্ণয়

  • অনাত্ম: নয় আত্ম (নঞ তৎপুরুষ সমাস)
  • কাঁকরপথ: কাঁকর বিছানো পথ (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)
  • আপনঘর: আপন যে ঘর (কর্মধারয় সমাস)
  • স্মৃতি-ঢিবি: স্মৃতিরূপ ঢিবি (রূপক কর্মধারয় সমাস)
  • জারুল-বেড়া: জারুলের বেড়া (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • পৃথিবী ➜ পার্থিব
  • দেশ ➜ দেশীয়
  • আলো ➜ আলোকিত
  • স্থির ➜ স্থিরতা
  • তৃষ্ণা ➜ তৃষ্ণার্ত

ঘর কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি বিশিষ্ট আধুনিক কবি অমিয় চক্রবর্তীর লেখা। এর মূল বিষয় হলো দীর্ঘ প্রবাস জীবন বা বিশ্ব ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে নিজের আপন ঠিকানায় বা ঘরে ফিরে আসার অনাবিল শান্তি ও তৃপ্তির অনুভূতি।

'অনাত্ম সংসার' বলতে কবি বিদেশের সেই যান্ত্রিক, স্বার্থপর এবং কোলাহলমুখর জগতকে বুঝিয়েছেন, যা নিজের আপন নয় এবং যেখানে কোনো মানসিক শান্তি নেই।

গাছের আড়ালে আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি আসলে ঘরে ফেরার সন্ধ্যায় প্রিয়জনের স্নেহময় প্রতীক্ষা এবং পথ দেখানোর একটি চমৎকার প্রতীকী প্রকাশ।