চিঠি (স্বামী বিবেকানন্দ)

বিখ্যাত যুগনায়ক ও সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'চিঠি' প্রবন্ধের (পত্রসাহিত্য) সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ রচিত 'চিঠি' (পত্রসাহিত্য)-এর সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. রচনার বিষয়সংক্ষেপ

চিঠির পটভূমি ও আহ্বান: স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই আলমোড়া থেকে তাঁর শিষ্যা মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবলকে (যিনি পরে ভগিনী নিবেদিতা নামে পরিচিত হন) এই চিঠিটি লেখেন। ভারতের নারীসমাজের শিক্ষা ও কল্যাণের জন্য একজন প্রকৃত 'সিংহী'র প্রয়োজন ছিল। স্বামীজি মনে করেন, মিস নোবলের শিক্ষা, পবিত্রতা, অসীম ভালোবাসা এবং সর্বোপরি তাঁর ধমনিতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের তেজস্বিতা তাঁকে এই মহৎ কাজের যোগ্য করে তুলেছে। তাই স্বামীজি তাঁকে ভারতে এসে এই কর্মযজ্ঞে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

ভারতের রূঢ় বাস্তব সম্পর্কে সতর্কতা: স্বামীজি কেবল আহ্বান করেই থেমে থাকেননি; তিনি মিস নোবলকে ভারতের কঠিন বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন। ভারতের ব্যাপক দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব, এবং জাতপাতের বিকট ধারণার কথা তিনি চিঠিতে তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, এখানকার জলবায়ু অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান এবং শহরের বাইরে ইউরোপীয় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের কোনো উপায় নেই। শ্বেতাঙ্গরা তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখবে এবং নেটিভরাও তাঁকে সহজে গ্রহণ করবে না। এই সমস্ত বিপদ জেনেও যদি তিনি ভারতে আসেন, তবে স্বামীজি তাঁকে আমৃত্যু সর্বতোভাবে সাহায্য করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন।

সহকর্মীদের পরিচয় ও মূল্যায়ন: মিস নোবল যাতে অন্য কারও ওপর ভরসা করে প্রতারিত না হন, সেজন্য স্বামীজি চিঠির শেষভাগে তাঁর কয়েকজন পাশ্চাত্য শিষ্যা ও সহকর্মীর চরিত্রের পরিচয় তুলে ধরেছেন। মিস মুলার সম্পর্কে তিনি জানান যে, তিনি ভালো মানুষ হলেও তাঁর মধ্যে অহংকার ও অস্থিরতা রয়েছে এবং তিনি নিজেকে আজন্ম নেত্রী মনে করেন। মিসেস সেভিয়ার অত্যন্ত স্নেহময়ী ও সেবিকা প্রকৃতির। সেভিয়ার দম্পতিকে একমাত্র ইংরেজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা এদেশীয়দের ঘৃণা করেন না। এছাড়া মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুলের (যাঁকে তিনি 'মা' বা ধীরামাতা বলতেন) নিঃস্বার্থ সেবামূলক কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন স্বামীজি।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
কল্যাণীয়াযাঁকে কল্যাণ বা মঙ্গল কামনা করে সম্বোধন করা হয়দৃঢ়সংকল্পদৃঢ় প্রতিজ্ঞা / স্থির সংকল্প
চাক্ষুষনিজের চোখে দেখাঐকান্তিকতাএকাগ্রতা / আন্তরিকতা
সিংহীতেজস্বিনী বা সাহসী নারীকেল্টিক রক্তআয়ারল্যান্ডের অধিবাসীদের রক্ত (তেজস্বিতার প্রতীক)
বিঘ্নবাধা / বিপদ / সমস্যাঅর্ধ-উলঙ্গঅর্ধনগ্ন / যার পরনে সামান্য বস্ত্র আছে
পরিবেষ্টিতঘেরা বা চারপাশ দিয়ে বেষ্টিতখামখেয়ালিযার স্বভাবের স্থিরতা নেই / অস্থিরমনা
নেত্রীযিনি নেতৃত্ব দেন (নেতা-র স্ত্রীলিঙ্গ)সর্বোপরিসকলের উপরে / প্রধানত
আমরণমৃত্যু পর্যন্তঅদ্বৈত আশ্রমউত্তরাখণ্ডের মায়াবতীতে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠের শাখা

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'চিঠি' নামক পাঠ্যাংশটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) স্বামী বিবেকানন্দ (গ) নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (ঘ) ভগিনী নিবেদিতা
উত্তর: (খ) স্বামী বিবেকানন্দ
২. স্বামীজি চিঠিটি কোথা থেকে লিখেছিলেন?
(ক) কলকাতা (খ) লন্ডন (গ) শিকাগো (ঘ) আলমোড়া
উত্তর: (ঘ) আলমোড়া
৩. চিঠিটি কত তারিখে লেখা হয়েছিল?
(ক) ২৯ জুলাই, ১৮৯৭ (খ) ২৯ জুন, ১৮৯৭ (গ) ২৯ জুলাই, ১৮৯৮ (ঘ) ১৫ আগস্ট, ১৮৯৭
উত্তর: (ক) ২৯ জুলাই, ১৮৯৭
৪. স্বামীজি চিঠিটি কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন?
(ক) মিসেস বুল (খ) মিস ম্যাকলাউড (গ) মিস নোবল (ঘ) মিস মুলার
উত্তর: (গ) মিস নোবল
৫. ভারতের নারীসমাজের জন্য কার প্রয়োজন বলে স্বামীজি মনে করতেন?
(ক) পুরুষ নেতার (খ) প্রকৃত সিংহীর (গ) শিক্ষিকার (ঘ) বিদেশি শাসকের
উত্তর: (খ) প্রকৃত সিংহীর
৬. মিস নোবলের ধমনিতে কোন্ রক্ত প্রবাহিত?
(ক) কেল্টিক রক্ত (খ) আর্য রক্ত (গ) নরম্যান রক্ত (ঘ) ফরাসি রক্ত
উত্তর: (ক) কেল্টিক রক্ত
৭. শ্বেতাঙ্গরা মিস নোবলকে কী মনে করবে বলে স্বামীজি সতর্ক করেছিলেন?
(ক) দেবী (খ) নেত্রী (গ) খামখেয়ালি (ঘ) শত্রু
উত্তর: (গ) খামখেয়ালি
৮. ভারতের জলবায়ু সম্পর্কে স্বামীজি কী বলেছেন?
(ক) নাতিশীতোষ্ণ (খ) অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান (গ) খুব শীতল (ঘ) বর্ষামুখর
উত্তর: (খ) অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান
৯. কে বেলুড় মঠ স্থাপনের কাজে অর্থসাহায্য করেছিলেন?
(ক) মিসেস বুল (খ) মিস নোবল (গ) মিস মুলার (ঘ) মিসেস সেভিয়ার
উত্তর: (গ) মিস মুলার
১০. মিস মুলারের স্বভাব সম্পর্কে স্বামীজি কী বলেছিলেন?
(ক) খুব শান্ত (খ) অস্থির ও খামখেয়ালি (গ) অত্যন্ত ধীর (ঘ) রাগী
উত্তর: (খ) অস্থির ও খামখেয়ালি
১১. রামকৃষ্ণ সংঘে 'মাদার' নামে কে পরিচিত ছিলেন?
(ক) মিসেস সেভিয়ার (খ) মিস ম্যাকলাউড (গ) ভগিনী নিবেদিতা (ঘ) মিসেস বুল
উত্তর: (ক) মিসেস সেভিয়ার
১২. মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রম কে প্রতিষ্ঠা করেন?
(ক) স্বামীজি (খ) মিস মুলার (গ) সেভিয়ার দম্পতি (ঘ) মিস নোবল
উত্তর: (গ) সেভিয়ার দম্পতি
১৩. স্বামীজি মিস ম্যাকলাউডকে কী বলে ডাকতেন?
(ক) মা (খ) ধীরামাতা (গ) জো (ঘ) মাদার
উত্তর: (গ) জো
১৪. স্বামীজি মিসেস বুলকে কী বলে সম্বোধন করতেন?
(ক) জো (খ) মাদার (গ) ধীরামাতা (ঘ) সিংহী
উত্তর: (গ) ধীরামাতা
১৫. "আমি আমরণ তোমার পাশেই থাকব" - স্বামীজি কাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?
(ক) স্টার্ডিকে (খ) মিস নোবলকে (গ) মিস মুলারকে (ঘ) মিসেস বুলকে
উত্তর: (খ) মিস নোবলকে
১৬. "তাতে এ পত্রখানিও আবশ্যক হয়ে পড়েছে" - কোন্ কারণে আবশ্যক হয়েছে?
(ক) স্টার্ডির চিঠি পেয়ে (খ) মিস মুলারের কাছ থেকে কর্মপ্রণালী জেনে (গ) নিজে অসুস্থ বলে (ঘ) টাকার প্রয়োজনে
উত্তর: (খ) মিস মুলারের কাছ থেকে কর্মপ্রণালী জেনে
১৭. "তোমার কর্মে ঝাঁপ দেওয়ার পূর্বে বিশেষভাবে চিন্তা করা কর্তব্য।" - উক্তিটি কার?
(ক) রবীন্দ্রনাথের (খ) স্বামীজির (গ) নিবেদিতার (ঘ) স্টার্ডির
উত্তর: (খ) স্বামীজির
১৮. ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে সর্বদাই কী চলে?
(ক) বরফ পড়ে (খ) বৃষ্টি হয় (গ) আগুনের হলকা চলে (ঘ) বন্যা হয়
উত্তর: (গ) আগুনের হলকা চলে
১৯. "একমাত্র এঁরাই এদেশীয়দের ঘৃণা করেন না" - কাদের কথা বলা হয়েছে?
(ক) স্টার্ডি ও তাঁর বন্ধুদের (খ) সেভিয়ার দম্পতির (গ) মিস ম্যাকলাউড ও বুলের (ঘ) মিস মুলার ও নোবলের
উত্তর: (খ) সেভিয়ার দম্পতির
২০. মিসেস বুলের স্বামীর নাম কী ছিল?
(ক) ক্যাপ্টেন জে এইচ বুল (খ) মিঃ ওলি বুল (গ) মিঃ স্টার্ডি (ঘ) মিঃ সেভিয়ার
উত্তর: (খ) মিঃ ওলি বুল

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. স্বামী বিবেকানন্দ চিঠিটি কবে, কোথা থেকে লিখেছিলেন?
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে জুলাই উত্তরপ্রদেশের (বর্তমানে উত্তরাখণ্ড) আলমোড়া থেকে এই চিঠিটি লিখেছিলেন।
২. চিঠিটি কাকে সম্বোধন করে লেখা হয়েছিল?
উত্তর: চিঠিটি স্বামীজির অন্যতম প্রধান শিষ্যা মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবলকে (যিনি পরে ভগিনী নিবেদিতা নামে পরিচিত হন) সম্বোধন করে লেখা হয়েছিল।
৩. 'প্রকৃত সিংহী' বলতে কাকে, কেন বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'প্রকৃত সিংহী' বলতে তেজস্বিনী ও অসীম সাহসী নারী মিস নোবলকে বোঝানো হয়েছে, কারণ ভারতের অবহেলিত নারীসমাজের জাগরণের জন্য তাঁর মতো একজন যোগ্য ও সাহসী নেত্রীর প্রয়োজন ছিল।
৪. মিস নোবলের কোন কোন গুণাবলির কথা স্বামীজি উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: স্বামীজি মিস নোবলের শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, অসীম ভালোবাসা, দৃঢ়তা এবং তাঁর ধমনিতে প্রবাহিত তেজি কেল্টিক রক্তের কথা উল্লেখ করেছেন।
৫. স্বামীজির মতে মিস নোবলের ভারতে আসার পথে প্রধান বিঘ্নগুলি কী কী?
উত্তর: প্রধান বিঘ্নগুলি হলো—ভারতের চরম দুঃখ-দারিদ্র্য, কুসংস্কার, দাসত্ব, জাতপাত ও ছোঁয়াছুঁয়ির বিকট ধারণা, অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান জলবায়ু এবং ইউরোপীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব।
৬. ভারতের মানুষদের দেখে মিস নোবলের কী মনে হবে?
উত্তর: স্বামীজি বলেছেন যে ভারতে এলে মিস নোবল নিজেকে অসংখ্য অর্ধ-উলঙ্গ এবং দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত নরনারীতে পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখতে পাবেন।
৭. শ্বেতাঙ্গরা মিস নোবলকে কীভাবে দেখবে বলে স্বামীজি সতর্ক করেছিলেন?
উত্তর: স্বামীজি সতর্ক করেছিলেন যে, এখানকার শ্বেতাঙ্গরা (ইংরেজরা) নেটিভদের (ভারতীয়দের) ঘৃণা করে; তাই মিস নোবল ভারতীয়দের জন্য কাজ করতে এলে শ্বেতাঙ্গরা তাঁকে খামখেয়ালি ভাববে এবং সন্দেহের চোখে দেখবে।
৮. ভারতের জলবায়ু সম্পর্কে স্বামীজি কী বলেছেন?
উত্তর: স্বামীজি বলেছেন যে ভারতের জলবায়ু অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান। এদেশের প্রায় সব জায়গার শীতই ইউরোপের গ্রীষ্মের মতো; আর দক্ষিণাঞ্চলে তো সর্বদাই আগুনের হলকা বয়।
৯. মিস মুলার সম্পর্কে স্বামীজি মিস নোবলকে কী সাবধানবাণী দিয়েছিলেন?
উত্তর: স্বামীজি জানিয়েছিলেন যে মিস মুলার চমৎকার মহিলা হলেও তাঁর মধ্যে অহংকার ও অস্থিরতা প্রবল। তিনি নিজেকে আজন্ম নেত্রী মনে করেন, তাই তাঁর ওপর ভরসা করে ভারতে আসা মিস নোবলের পক্ষে ঠিক হবে না।
১০. সেভিয়ার দম্পতি কে এবং তাঁদের বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: ক্যাপ্টেন জে. এইচ. সেভিয়ার এবং মিসেস সেভিয়ার হলেন স্বামীজির অনুরাগী ইংরেজ দম্পতি। তাঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরাই একমাত্র ইংরেজ যাঁরা এদেশীয় বা ভারতীয়দের ঘৃণা করেন না।
১১. মিসেস সেভিয়ারের চরিত্র কেমন ছিল?
উত্তর: মিসেস সেভিয়ার ছিলেন অত্যন্ত নারীসুলভ, শান্ত, দয়াময়ী এবং সেবিকা প্রকৃতির। তিনি রামকৃষ্ণ সংঘে 'মাদার' নামে পরিচিত ছিলেন।
১২. মিস ম্যাকলাউড কে ছিলেন?
উত্তর: মিস জোসেফাইন ম্যাকলাউড ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের পাশ্চাত্য দেশীয় প্রধান অনুরাগী ভক্তদের মধ্যে অন্যতমা, যাঁকে স্বামীজি আদর করে 'জো' বলে ডাকতেন।
১৩. মিসেস বুল কে? স্বামীজি তাঁকে কী বলতেন?
উত্তর: মিসেস সারা বুল হলেন বিখ্যাত নরওয়েবাসী বেহালাবাদক মিঃ ওলি বুলের স্ত্রী। তিনি স্বামীজির শিষ্যা ছিলেন এবং স্বামীজি তাঁকে 'মা' বা 'ধীরামাতা' বলে সম্বোধন করতেন।
১৪. মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতাদের নাম লেখো।
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দের অনুপ্রেরণায় সেভিয়ার দম্পতি (ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ও মিসেস সেভিয়ার) হিমালয়ের মায়াবতীতে এই অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
১৫. "আমি আমরণ তোমার পাশেই থাকব" - স্বামীজি এই প্রতিশ্রুতি কেন দিয়েছিলেন?
উত্তর: ভারতের সমস্ত প্রতিকূলতা ও বিপদের কথা জানানোর পর মিস নোবলকে অভয় ও সাহস জোগাতেই স্বামীজি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, মিস নোবল ভারতে এলে স্বামীজি আমৃত্যু তাঁকে সবরকম সাহায্য করবেন।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে।' - উক্তিটির বক্তা কে? তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে একথা বলেছেন? উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: বক্তা ও শ্রোতা: আলোচ্য উক্তিটির বক্তা হলেন বিখ্যাত যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি তাঁর আইরিশ শিষ্যা মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবলকে (পরবর্তীতে ভগিনী নিবেদিতা) উদ্দেশ্য করে তাঁর চিঠিতে এই কথা বলেছেন।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: স্বামী বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন যে, ভারতের পিছিয়ে পড়া এবং অবহেলিত নারীসমাজের উন্নতির জন্য একজন শিক্ষিতা, সাহসী এবং নিঃস্বার্থ নারী নেত্রীর প্রয়োজন। তিনি মিস নোবলের মধ্যে সেই সমস্ত গুণাবলি দেখতে পেয়েছিলেন। মিস নোবলের উচ্চশিক্ষা, আন্তরিকতা, পবিত্রতা, অসীম ভালোবাসা এবং যেকোনো কাজে শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার মতো তেজস্বী কেল্টিক রক্ত তাঁকে এই মহান কাজের যোগ্য করে তুলেছিল।
স্বামীজি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের নারীকল্যাণে আত্মনিয়োগ করলে মিস নোবলের জীবন সার্থক হবে এবং ভারতের ইতিহাসেও তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মিস নোবলকে ভারতের সেবায় উদ্বুদ্ধ করতেই স্বামীজি তাঁর অপার সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই উক্তিটি করেছেন।

২. মিস নোবলকে ভারতে আহ্বান করার পাশাপাশি স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে ভারতের কোন্ রূঢ় বাস্তব ও বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন?

উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ মিস নোবলকে ভারতের সেবায় আহ্বান জানালেও, তিনি তাঁকে কোনো অবাস্তব স্বপ্ন দেখাননি। তিনি খুব স্পষ্টভাবে ভারতের কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতার কথা চিঠিতে তুলে ধরেছেন।

স্বামীজি জানান যে, ভারতে এলে মিস নোবলকে অসংখ্য অর্ধ-উলঙ্গ এবং দুঃখ-দারিদ্র্যে জর্জরিত নরনারীর মাঝে কাজ করতে হবে। এখানকার সমাজ কুসংস্কার, পরাধীনতার দাসত্ব এবং জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার বিকট ধারণায় পূর্ণ। নেটিভ বা ভারতীয় অধিবাসীরা শ্বেতাঙ্গদের ভয়ে এবং ঘৃণায় এড়িয়ে চলে। অন্যদিকে, এদেশে শাসক শ্বেতাঙ্গরাও নেটিভদের চরম ঘৃণা করে। মিস নোবল ভারতীয়দের জন্য কাজ করতে এলে শ্বেতাঙ্গ সমাজ তাঁকে খামখেয়ালি বলে উপহাস করবে এবং তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখবে।
তাছাড়া ভারতের গ্রীষ্মপ্রধান ও রুক্ষ জলবায়ুর সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং শহরের বাইরে ইউরোপীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়াই জীবনযাপন করার অসীম কষ্টের কথাও স্বামীজি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, যাতে মিস নোবল এই কাজে ঝাঁপ দেওয়ার আগে ভালোভাবে মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারেন।

৩. স্বামী বিবেকানন্দের 'চিঠি' রচনায় তাঁর যে স্বদেশপ্রেম ও নারীজাগরণের চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ রচিত 'চিঠি' নামক পাঠ্যাংশটিতে তাঁর গভীর স্বদেশপ্রেম এবং নারীজাগরণের মহৎ আদর্শের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।

স্বদেশপ্রেম: স্বামীজি ভারতকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তাই ভারতের সাধারণ মানুষের দুঃখ, দারিদ্র্য, কুসংস্কার এবং পরাধীনতার গ্লানি তাঁকে প্রবলভাবে ব্যথিত করত। তিনি নিজের দেশের প্রকৃত অবস্থাকে বিন্দুমাত্র আড়াল না করে মিস নোবলের কাছে ভারতের অর্ধ-উলঙ্গ ও জাতপাতের কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন। এই চরম বাস্তবতার শিকার দেশবাসীকে উদ্ধার করার জন্যই তিনি বিদেশি শিষ্যার সাহায্য প্রার্থনা করেছেন।

নারীজাগরণের চিন্তা: স্বামীজি বিশ্বাস করতেন যে, কোনো দেশের প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে সে দেশের নারীসমাজের অবস্থার ওপর। ভারতের নারীসমাজ তখন ছিল অবহেলিত ও শিক্ষাবঞ্চিত। তাই তিনি বলেছেন, "ভারতের নারীসমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর—একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন।" এই দায়িত্ব তিনি মিস নোবলকে দিতে চেয়েছেন। নারীশিক্ষার বিস্তার ও নারীকল্যাণের মাধ্যমেই যে পরাধীন ভারতের মুক্তি সম্ভব, সেই যুগান্তকারী চিন্তাধারাই এই চিঠির ছত্রে ছত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

৪. স্বামীজির চিঠিতে উল্লিখিত বিভিন্ন পাশ্চাত্য অনুরাগী বা সহকর্মীদের (মিসেস সেভিয়ার, মিস ম্যাকলাউড, মিসেস বুল, মিস মুলার) চরিত্রের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা লেখো।

উত্তর: মিস নোবল যাতে ভারতে এসে অন্য কারোর ওপর নির্ভর করে প্রতারিত বা হতাশ না হন, সেজন্য স্বামীজি তাঁর চিঠিতে তাঁর কয়েকজন পাশ্চাত্য সহকর্মীর চরিত্রের স্পষ্ট বিশ্লেষণ করেছেন।

মিস মুলার: তিনি খুব ভালো মানুষ এবং স্বামীজিকে অর্থ দিয়ে সাহায্যও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে প্রবল অহংকার ও অস্থিরতা রয়েছে। তিনি নিজেকে আজন্ম নেত্রী মনে করেন, তাই তাঁর সাথে কাজ করা মিস নোবলের পক্ষে কঠিন হবে।
সেভিয়ার দম্পতি: ক্যাপ্টেন সেভিয়ার এবং মিসেস সেভিয়ার হলেন একমাত্র ইংরেজ, যাঁরা ভারতীয়দের ঘৃণা করেন না। মিসেস সেভিয়ার অত্যন্ত দয়াময়ী, নারীসুলভ এবং সেবিকা প্রকৃতির। স্বামীজি মনে করেন তাঁদের সঙ্গে মিস নোবলের কাজ করা সুবিধাজনক হবে।
মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুল: মিস জোসেফাইন ম্যাকলাউডকে স্বামীজি 'জো' বলে ডাকতেন এবং মিসেস সারা বুলকে 'মা' বা 'ধীরামাতা' বলে সম্বোধন করতেন। এঁরা দুজনেই স্বামীজির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও সেবাপরায়ণ শিষ্যা ছিলেন। স্বামীজি জানিয়েছেন যে এঁরা খুবই উপকারী এবং এঁরা মিস নোবলের কাজে বড়ো সহায়ক হবেন।

৫. 'তোমাকে খোলাখুলি বলছি...' - কী খোলাখুলি বলার কথা এখানে বলা হয়েছে? স্বামীজি এই চিঠির মাধ্যমে মিস নোবলের মনে যে সাহস ও ভরসা জুগিয়েছেন তা বর্ণনা করো।

উত্তর: খোলাখুলি বলার কথা: স্বামীজি মিস নোবলকে খোলাখুলি বা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ভারতের নারীসমাজের জাগরণ ও সেবার কাজে তাঁর এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভারতের দুঃখ, কুসংস্কার এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা গোপন না করে তিনি মিস নোবলকে প্রকৃত সত্যটাই জানিয়েছেন।

সাহস ও ভরসা প্রদান: ভারতের ভয়ংকর বাধা ও প্রতিকূল পরিবেশের কথা জানানোর পর মিস নোবল যাতে ভয় না পান, সেজন্য স্বামীজি তাঁকে এক অসামান্য অভয়বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমি তোমাকে খোলাখুলি বলছি, তুমি ভারতে এলে আমি আমরণ তোমার পাশেই থাকব।" মিস নোবল ভারতের কাজে সফল হোন বা ব্যর্থ হোন, স্বামীজি একজন প্রকৃত পথপ্রদর্শকের মতো সর্বদাই তাঁর সহায় হবেন। এছাড়া তিনি মিস নোবলকে মিস মুলারের অধীনে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এবং সেভিয়ার দম্পতি ও মিসেস বুলের মতো উপকারী মানুষের সাহচর্যের ভরসা দিয়েছেন। স্বামীজির এই অকৃত্রিম ভরসাই মিস নোবলকে ভগিনী নিবেদিতা রূপে ভারতের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার সাহস জুগিয়েছিল।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • সংকল্প = সম্ + কল্প
  • উৎসর্গ = উৎ + সর্গ
  • প্রতিষ্ঠা = প্রতি + স্থা
  • প্রত্যেক = প্রতি + এক
  • অর্ধোলঙ্গ = অর্ধ + উলঙ্গ

সমাস নির্ণয়

  • নারীসমাজ: নারীদের সমাজ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • গ্রীষ্মপ্রধান: গ্রীষ্ম প্রধান যেখানে (বহুব্রীহি সমাস)
  • শ্বেতাঙ্গ: শ্বেত অঙ্গ যার (বহুব্রীহি সমাস)
  • খামখেয়ালি: খাম (অস্থির) খেয়াল যার (বহুব্রীহি সমাস)
  • অর্ধ-উলঙ্গ: অর্ধ রূপে উলঙ্গ (কর্মধারয় সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • দৃঢ় ➜ দৃঢ়তা
  • পবিত্র ➜ পবিত্রতা
  • ভারত ➜ ভারতীয়
  • সাহস ➜ সাহসী
  • প্রয়োজন ➜ প্রয়োজনীয়

চিঠি প্রবন্ধ সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই চিঠিটি প্রখ্যাত সন্ন্যাসী ও যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে আলমোড়া থেকে তাঁর ইংরেজ শিষ্যা মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবলকে (পরবর্তীতে ভগিনী নিবেদিতা) লিখেছিলেন।

স্বামীজি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের পিছিয়ে পড়া এবং অবহেলিত নারীসমাজের জাগরণ ও কল্যাণের জন্য মিস নোবলের মতো একজন শিক্ষিতা, পবিত্র এবং অসীম সাহসী 'সিংহী'র প্রয়োজন।

ভারতের কঠিন পরিস্থিতি, কুসংস্কার ও বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর স্বামীজি তাঁকে অভয় দিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি ভারতে এলে স্বামীজি আমৃত্যু তাঁর পাশে থাকবেন এবং সবরকম সাহায্য করবেন।