এই তার পরিচয় (কবিতা সিংহ)

আধুনিক যুগের বিশিষ্ট নারীবাদী কবি কবিতা সিংহ রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'এই তার পরিচয়' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত আধুনিক যুগের বিশিষ্ট নারীবাদী কবি কবিতা সিংহ রচিত 'এই তার পরিচয়' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ ও মূলভাব

সমাজের নিষ্ঠুরতা ও নারীর বিপন্নতা: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রতিবাদী ও নারীবাদী কবি কবিতা সিংহ রচিত 'এই তার পরিচয়' কবিতাটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লাঞ্ছনার শিকার এক অদম্য নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর আখ্যান। সমাজ ভেবেছিল যে মেয়েটির হাঁটু এবং বুকের পাঁজর ভেঙে গেছে, জলে যার শবদেহ উলটানো অবস্থায় ভাসছে, সে আর কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না। দুর্নাম বা কুৎসা রটনাকারী তুচ্ছ পুঁটি মাছেরা তার চোখ খুঁটে খাবে এবং সমাজ ভেবেছিল যে বজ্রপাতে তার আত্মসম্মানের শিরদাঁড়া চিরতরে ভেঙে গেছে। সমাজ তাকে কেবল দুঃখ, যাতনা আর শোক উপহার দিয়েছিল।

শোকের দহনে পরিশুদ্ধি: কিন্তু সমাজের দেওয়া এই নির্মম শোক ও যাতনা মেয়েটিকে শেষ করতে পারেনি, বরং তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। শোক তার ভেতরের দুর্বলতা (রক্তের কমজোর কণিকা), বিষাদ, নীল কষ্ট এবং মিথ্যা অহংকারকে খেয়ে ফেলেছে। সে এখন এমনভাবে বদলে গেছে যে, কীটদষ্ট পুরোনো পুঁথির মতো তার বাইরের জৌলুস নষ্ট হয়ে গেলেও সে ভেতরে অনেক বেশি পরিপক্ব হয়েছে। এমনকী, যে ভাস্কর বা সমাজ তাকে নরম কাদার মতন গড়েছিল, সেও তাকে আর চিনতে পারে না; কারণ তার মধ্যে আর আগের সেই আনকোরা ভাব বা চাকচিক্য (পালিশ) অবশিষ্ট নেই।

দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠা: এত ঝড়ঝাপটার পরেও মেয়েটি হার মানেনি। সে মাথা উঁচু করে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে, কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায়নি। সে এখন আর পুজো করার কোনো জড় 'মূর্তি' বা 'প্রতিমা' নয়। সে এখন পৃথিবীর বুকে এক কঠিন 'পৃথিবী-পাথর'-এ পরিণত হয়েছে। বেদনার কারুকাজ এবং শোকের কর্ণিক দিয়ে সে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে। সমস্ত লাঞ্ছনা ও বাধাকে জয় করে সে আজ নারীত্বের এক অদম্য, জ্বলন্ত ও অনুপ্রেরণাদায়ী 'দৃষ্টান্ত' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
শবমৃতদেহ / লাশউদোল উপুড়আবরণহীন অবস্থায় উলটানো বা মুখ নীচের দিকে রাখা
শিরদাঁড়ামেরুদণ্ড / আত্মসম্মানের প্রতীকপুঁটিএকপ্রকার ছোটো মাছ (এখানে তুচ্ছ নিন্দুক)
যাতনাকষ্ট / তীব্র যন্ত্রণাকমজোরদুর্বল / শক্তিহীন
অহমিকাঅহংকার / গর্বকীটদষ্টকীট বা পোকায় কাটা
জলুশজৌলুস / চাকচিক্য / উজ্জ্বলতাভাস্করযিনি মূর্তি গড়েন / শিল্পী / সমাজ
আনকোরাএকেবারে নতুন / অব্যবহৃতকর্ণিকরাজমিস্ত্রিদের ইট-বালি গাঁথার হাতিয়ার (করনি)
দৃষ্টান্তউদাহরণ / আদর্শকারুকর্মশিল্পের কাজ বা কারুকাজ

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'এই তার পরিচয়' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) বেগম রোকেয়া (খ) কবিতা সিংহ (গ) নবনীতা দেব সেন (ঘ) মহাশ্বেতা দেবী
উত্তর: (খ) কবিতা সিংহ
২. "ভেবেছিল আর..." কী করবে না?
(ক) বাঁচবে না (খ) উঠবে না (গ) কাঁদবে না (ঘ) হাসবে না
উত্তর: (খ) উঠবে না
৩. তার কী ভেঙে গেছে বলে সমাজ ভেবেছিল?
(ক) হাত ও পা (খ) হাঁটু ও বুকের পাঁজর (গ) মাথা ও বুক (ঘ) চোখ ও কান
উত্তর: (খ) হাঁটু ও বুকের পাঁজর
৪. তার শব কোথায় ভাসছে?
(ক) সমুদ্রে (খ) নদীতে (গ) জলে (ঘ) পুকুরে
উত্তর: (গ) জলে
৫. শব কীভাবে ভাসছে?
(ক) সোজা হয়ে (খ) চিত হয়ে (গ) উদোল উপুড় (ঘ) কাত হয়ে
উত্তর: (গ) উদোল উপুড়
৬. 'দুর্নামের ঝাঁক ঝাঁক পুঁটি' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
(ক) মাছদের (খ) তুচ্ছ নিন্দুক বা কুৎসা রটনাকারীদের (গ) বন্ধুদের (ঘ) প্রতিবেশীদের
উত্তর: (খ) তুচ্ছ নিন্দুক বা কুৎসা রটনাকারীদের
৭. পুঁটিমাছেরা খুলে কী খাবে বলে ভাবা হয়েছিল?
(ক) কান (খ) নাক (গ) চোখ (ঘ) হাত
উত্তর: (গ) চোখ
৮. কীসে তার শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে বলে ভাবা হয়েছিল?
(ক) অপমানে (খ) বজ্রপাতে (গ) আঘাতে (ঘ) শোকে
উত্তর: (খ) বজ্রপাতে
৯. সমাজ তাকে কী কী দিয়েছে?
(ক) অর্থ ও সম্মান (খ) দুঃখ, যাতনা আর শোক (গ) আনন্দ ও হাসি (ঘ) ভালোবাসা
উত্তর: (খ) দুঃখ, যাতনা আর শোক
১০. শোক তার রক্তের কোন্ কণিকা খেয়ে গেছে?
(ক) লাল কণিকা (খ) শ্বেত কণিকা (গ) কমজোর কণিকা (ঘ) সতেজ কণিকা
উত্তর: (গ) কমজোর কণিকা
১১. নারীটির কী কী শোক খেয়ে গেছে?
(ক) সব বিষ, সব নীল, সব অহমিকা (খ) সব রাগ (গ) সব স্বপ্ন (ঘ) সব দুঃখ
উত্তর: (ক) সব বিষ, সব নীল, সব অহমিকা
১২. তার জলুশ কীসের মতন ছিদ্র করে নিয়েছে?
(ক) পুরানো কাপড়ের মতন (খ) কীটদষ্ট পুঁথির মতন (গ) শুকনো পাতার মতন (ঘ) ভাঙা দেওয়ালের মতন
উত্তর: (খ) কীটদষ্ট পুঁথির মতন
১৩. কে তাকে চিনতে পারে না?
(ক) তার বাবা (খ) সমাজ (গ) তাহার ভাস্কর (ঘ) তার বন্ধু
উত্তর: (গ) তাহার ভাস্কর
১৪. তার মধ্যে এখন আর কী নেই?
(ক) আনকোরা ভাব ও পালিশ (খ) রাগ (গ) দুঃখ (ঘ) জ্ঞান
উত্তর: (ক) আনকোরা ভাব ও পালিশ
১৫. সে কীভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে?
(ক) দুর্বলভাবে (খ) হেলান দিয়ে (গ) খাড়া হয়ে (ঘ) বসে আছে
উত্তর: (গ) খাড়া হয়ে
১৬. সে কখনও কী করেনি?
(ক) কাঁদেনি (খ) ঝোঁকেনি (গ) হাসেনি (ঘ) লড়াই করেনি
উত্তর: (খ) ঝোঁকেনি
১৭. এখন সে কী নয়?
(ক) মানুষ নয় (খ) নারী নয় (গ) মূর্তি বা প্রতিমা নয় (ঘ) দেবী নয়
উত্তর: (গ) মূর্তি বা প্রতিমা নয়
১৮. এখন সে পৃথিবীর কীসে পরিণত হয়েছে?
(ক) পৃথিবী-মাটি (খ) পৃথিবী-পাথর (গ) পৃথিবী-গাছ (ঘ) পৃথিবী-জল
উত্তর: (খ) পৃথিবী-পাথর
১৯. সে নিজেকে কার কারুকর্মে গড়ে তুলেছে?
(ক) আনন্দের (খ) বেদনার (গ) হাসির (ঘ) শিল্পীর
উত্তর: (খ) বেদনার
২০. এখন সে কেমন নারী হয়ে উঠেছে?
(ক) সাধারণ (খ) অসহায় (গ) এক দৃষ্টান্তের মতো (ঘ) দুর্বল
উত্তর: (গ) এক দৃষ্টান্তের মতো

۴. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. "ভেবেছিল আর উঠবে না।" - কারা, কার সম্পর্কে এ কথা ভেবেছিল?
উত্তর: পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও নিন্দুকেরা একজন লাঞ্ছিতা ও বিপর্যস্ত নারীর সম্পর্কে এ কথা ভেবেছিল যে সে আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
২. নারীর শরীরের কী কী ভেঙে গেছে বলে কবিতায় উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তর: সমাজ ভেবেছিল যে অত্যাচারে ও যন্ত্রণায় নারীটির হাঁটু, বুকের পাঁজর এবং আত্মসম্মানের প্রতীক শিরদাঁড়া চিরতরে ভেঙে গেছে।
৩. 'উদোল উপুড়' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'উদোল উপুড়' বলতে আবরণহীন বা নগ্ন অবস্থায় উলটে থাকা অর্থাৎ চরম অসহায় ও লাঞ্ছিত অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে।
৪. 'দুর্নামের ঝাঁক ঝাঁক পুঁটি' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: 'পুঁটি' একটি ক্ষুদ্র মাছ। এখানে সমাজের সেইসব তুচ্ছ, হীন ও নিন্দুক মানুষদের বোঝানো হয়েছে যারা বিপন্ন নারীর দুর্নাম বা কুৎসা রটাতে ব্যস্ত থাকে।
৫. 'দুঃখ দিয়েছ তাকে, যাতনা দিয়েছ আর শোক' - কে তাকে এসব দিয়েছে?
উত্তর: এই নিষ্ঠুর ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীটিকে পদে পদে লাঞ্ছনা করে তাকে কেবল দুঃখ, যাতনা এবং গভীর শোক উপহার দিয়েছে।
৬. 'শোক খেয়ে গেছে তার রক্তের কমজোর কণিকা' - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো, সমাজের দেওয়া শোক ও যন্ত্রণা নারীটিকে শেষ করতে পারেনি, বরং তা তার ভেতরের সমস্ত দুর্বলতা বা 'কমজোর' অংশকে মুছে দিয়ে তাকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
৭. শোক নারীটির আর কী কী খেয়ে গেছে?
উত্তর: শোক নারীটির ভেতরের সমস্ত দুর্বলতার পাশাপাশি তার জীবনের বিষ বা কষ্ট, নীল যন্ত্রণা এবং সমস্ত মিথ্যে অহংকার বা 'অহমিকা' খেয়ে গেছে।
৮. 'কীটদষ্ট পুঁথির মতন তার ছিদ্র করে নিয়েছে জলুশ' - বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: পোকায় কাটা পুরোনো পুঁথির যেমন বাইরের চাকচিক্য বা জৌলুস নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি লাঞ্ছনা ও জীবনের রুক্ষতার ফলে নারীটিরও বাইরের শারীরিক সৌন্দর্য বা চাকচিক্য নষ্ট হয়ে গেছে।
৯. 'চিনতে পারে না তাকে তাহার ভাস্করও' - ভাস্কর চিনতে পারে না কেন?
উত্তর: সমাজ বা পুরুষরূপী ভাস্কর নারীটিকে নরম কাদার পুতুলের মতো যেমন সাজাতে চেয়েছিল, বর্তমানে সে তা নেই। সে এখন প্রতিবাদী ও পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে, তাই ভাস্কর তাকে আর চিনতে পারে না।
১০. 'কোথায় সে আনকোরা? কোথায় পালিশ?' - এর উত্তর কী?
উত্তর: নারীটি জীবনে প্রচুর লড়াই ও যন্ত্রণা সহ্য করেছে। তাই তার মধ্যে আগেকার সেই আনকোরা (নতুন) ভাব বা সমাজের দেওয়া কৃত্রিম চাকচিক্য বা 'পালিশ' আর অবশিষ্ট নেই।
১১. 'দাঁড়িয়ে রয়েছে তবু, খাড়া সে যে / কখনও ঝোঁকেনি' - কার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: শত বাধা, অপমান এবং মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও যে নারী অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায়নি এবং নিজের আত্মসম্মান নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে, তার কথাই বলা হয়েছে।
১২. 'এখন সে মূর্তি নয় / নয়তো প্রতিমা' - কথাটির তাৎপর্য কী?
উত্তর: নারী কোনো জড় বস্তু নয় যে তাকে ইচ্ছেমতো মূর্তির মতো গড়া যাবে বা প্রতিমার মতো সাজিয়ে পুজো করা হবে। সে এখন একজন প্রতিবাদী ও আত্মসচেতন মানুষে পরিণত হয়েছে।
১৩. 'পৃথিবী-পাথর' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: পাথরের মতো কঠিন, অটল এবং সহজে ভেঙে ফেলা যায় না এমন এক সহনশীল ও দৃঢ় মানসিকতার প্রতীকরূপেই কবি নারীকে 'পৃথিবী-পাথর' বলেছেন।
১৪. সে কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছে?
উত্তর: সে সমাজের দেওয়া বেদনার কারুকর্মে এবং তীব্র শোকের কর্ণিক (রাজমিস্ত্রিদের হাতিয়ার) দিয়ে নিজেকে তিলে তিলে কঠিন পাথরের মতো মজবুত করে গড়ে তুলেছে।
১৫. কবিতার শেষে নারীকে কীসের মতো বলা হয়েছে?
উত্তর: চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অদম্য আদর্শ হিসেবে কবিতার শেষে নারীকে একটি জীবন্ত 'দৃষ্টান্ত' বা উদাহরণের মতো বলা হয়েছে।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'এই তার পরিচয়' কবিতায় সমাজের নিষ্ঠুরতা এবং নারীজীবনের বিপন্নতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: আধুনিক নারীবাদী কবি কবিতা সিংহ তাঁর 'এই তার পরিচয়' কবিতায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্মমতা এবং নারীর অসহায় বিপন্নতার এক তীব্র প্রতিবাদী চিত্র তুলে ধরেছেন।

সমাজে নারীদের যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছনা ও অবহেলার শিকার হতে হয়। কবিতায় দেখা যায় যে, সমাজ নারীটিকে চরম দুঃখ, যাতনা ও শোক দিয়ে তাকে একেবারে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছে। সমাজ ভেবেছিল যে এই অত্যাচারে তার হাঁটু ও বুকের পাঁজর ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। তার সামাজিক সম্মান ও মেরুদণ্ড (শিরদাঁড়া) যেন বজ্রপাতে চুরমার হয়ে গেছে। এমনকী, তার সম্মানকে জলে ভাসা এক উলটানো লাশের (উদোল উপুড় শব) সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এই বিপন্নতার সুযোগ নিয়ে সমাজের ছোটো ছোটো নিন্দুক বা কুৎসা রটনাকারীরা, যাদের কবি 'দুর্নামের ঝাঁক ঝাঁক পুঁটি' বলেছেন, তারা নারীটির চোখ বা ভবিষ্যৎ খুঁটে খেতে চেয়েছে। অর্থাৎ, সমাজ তাকে মানসিকভাবে ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছে। নারীর প্রতি সমাজের এই নির্মম, অবমাননাকর ও ধ্বংসাত্মক মনোভাবই কবিতার প্রথমাংশে অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে।

২. "শোক খেয়ে গেছে তার রক্তের কমজোর কণিকা" - উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। নারীটি কীভাবে শোক ও যন্ত্রণাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে?

উত্তর: উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি কবি কবিতা সিংহের লেখা 'এই তার পরিচয়' কবিতা থেকে গৃহীত।

তাৎপর্য ও রূপান্তর: পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভেবেছিল যে দুঃখ, যন্ত্রণা ও শোক দিয়ে নারীটিকে চিরতরে দুর্বল ও পঙ্গু করে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার বিপরীত। আগুনের তাপে লোহা যেমন আরও শক্ত হয়, তেমনি সমাজের দেওয়া অপরিসীম শোক ও যাতনা নারীটিকে ধ্বংস করার বদলে তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
শোক তার ভেতরের সমস্ত দুর্বলতা, ভয় বা 'রক্তের কমজোর কণিকা'গুলোকে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে। তার মনের মধ্যে থাকা কষ্ট, নীল বিষাদ এবং মিথ্যে অহংকার বা 'অহমিকা' পুরোপুরি মুছে গেছে। কীটদষ্ট পুরোনো পুঁথির মতো তার বাইরের কৃত্রিম সৌন্দর্য বা 'জলুশ' নষ্ট হয়ে গেলেও, সে ভেতর থেকে ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে। সমাজের দেওয়া শোককে সে নিজের দুর্বলতার পরিবর্তে আত্মরক্ষার ঢাল ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে, যার ফলে সে আর কখনও কারও কাছে মাথা নোয়ায়নি বা 'ঝোঁকেনি'।

৩. "চিনতে পারে না তাকে তাহার ভাস্করও" - ভাস্কর কে? সে কেন চিনতে পারে না? এই উক্তির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর: ভাস্করের পরিচয়: 'ভাস্কর' হলেন সেই শিল্পী যিনি পাথর বা কাদা দিয়ে মূর্তি তৈরি করেন। এখানে 'ভাস্কর' বলতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সেই সমাজ-নির্ধারিত পুরুষদের বোঝানো হয়েছে, যারা নারীকে নিজেদের ইচ্ছামতো গড়ে তুলতে চায়।

চিনতে না পারার কারণ: সমাজ নারীকে একটি নরম কাদার পুতুল বা আজ্ঞাবহ দাসী হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত, যার গায়ে থাকে আনকোরা ভাব এবং কৃত্রিম চাকচিক্য বা 'পালিশ'। কিন্তু সমাজের অবহেলা, যন্ত্রণা ও শোক সহ্য করতে করতে নারীটি আজ সেই নরম স্বভাব হারিয়ে পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেছে। তার বাইরের জৌলুস নষ্ট হয়ে গেলেও সে প্রতিবাদী সত্তায় জেগে উঠেছে। সে আর অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায় না। তার এই নতুন, রুক্ষ ও প্রতিবাদী রূপটি সমাজের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা, তাই সমাজ বা ভাস্কর তাকে আর চিনতে পারে না।

তাৎপর্য: এই উক্তির মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, নারী কোনো জড় বস্তু বা পুরুষদের হাতের খেলনা নয়। সে যখন নিজের প্রকৃত শক্তি উপলব্ধি করে এবং ঘুরে দাঁড়ায়, তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে তার সেই স্বাধীন ও তেজোদীপ্ত রূপকে চেনা বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।

৪. "এখন সে মূর্তি নয় / নয়তো প্রতিমা" - তবে এখন সে কী? কবিতার শেষ স্তবকের আলোকে নারীর নতুন পরিচয়ের স্বরূপটি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: উৎস ও প্রসঙ্গ: উদ্ধৃত অংশটি কবিতা সিংহের 'এই তার পরিচয়' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। যুগে যুগে নারীকে যে জড় বস্তুর মতো পুজো করা হয়েছে বা খেলনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই পরিচয়ের খোলস ভেঙে তার নতুন আত্মপ্রকাশকে বোঝাতেই কবি এ কথা বলেছেন।

নতুন পরিচয়ের স্বরূপ: সমাজ নারীকে মন্দিরের জড় 'প্রতিমা' বা সাজিয়ে রাখার 'মূর্তি' হিসেবে বন্দি করে রাখতে চেয়েছিল, যার নিজস্ব কোনো মতামত বা প্রতিবাদ নেই। কিন্তু চরম লাঞ্ছনা ও যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে নারী আজ তার সেই জড় ও আজ্ঞাবহ পরিচয় ঝেড়ে ফেলেছে। এখন সে পৃথিবীর বুকে এক কঠিন ও অটল 'পৃথিবী-পাথর'-এ পরিণত হয়েছে।
সে তার বুকফাটা বেদনাকে কারুকর্মে এবং শোককে রাজমিস্ত্রির কর্ণিক (হাতিয়ার) হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে এক নতুন ছাঁচে গড়ে তুলেছে। সে মাথা উঁচু করে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে এবং কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা ঝোঁকায়নি। এখন সে আর কেবল ভোগের বস্তু বা পূজার প্রতিমা নয়, বরং সে সমস্ত লাঞ্ছনা ও বাধাকে জয় করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক জ্বলন্ত 'দৃষ্টান্ত' বা আদর্শ নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫. 'এই তার পরিচয়' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ নামকরণের মধ্য দিয়েই রচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ও অন্তর্নিহিত দর্শন পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কবি কবিতা সিংহের আলোচ্য কবিতাটির নাম 'এই তার পরিচয়'।

সমগ্র কবিতাটিতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীর আসল 'পরিচয়' কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয়, তা দেখানো হয়েছে। সমাজ নারীকে দুর্বল ভেবেছিল। সমাজ ভেবেছিল অত্যাচার ও কুৎসার (পুঁটিমাছ) মাধ্যমে তার শিরদাঁড়া ভেঙে তাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া যাবে। কিন্তু নারী তার দুর্বলতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। সে সমাজের দেওয়া যাতনা ও শোককে শক্তিতে পরিণত করেছে।
এখন সে সমাজের তৈরি করা আনকোরা পালিশ-করা কোনো পুতুল বা ভাস্করের গড়া আজ্ঞাবহ 'প্রতিমা' নয়। সে শোক ও বেদনার হাতিয়ার দিয়ে নিজেকে কঠিন 'পৃথিবী-পাথর'-এর মতো গড়ে তুলেছে। সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এবং অন্যায়ের কাছে কখনও ঝোঁকেনি। একজন দুর্বল নারী থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অদম্য, সাহসী ও প্রতিবাদী নারীতে পরিণত হওয়াই হলো তার বর্তমান আসল পরিচয়। যেহেতু নারীর এই নতুন ও তেজোদীপ্ত আত্মপরিচয় বা 'দৃষ্টান্ত' হওয়াই কবিতার মূল সুর, তাই 'এই তার পরিচয়' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক, গভীর ও অত্যন্ত ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • দৃষ্টান্ত = দৃষ্ট + অন্ত
  • দুর্নাম = দুঃ + নাম
  • বজ্রপাত = বজ্র + পাত (সমাসবদ্ধ পদরূপেও গণ্য)
  • অহমিকা = অহম্ + ইকা
  • ভাস্কর = ভাস্ + কর

সমাস নির্ণয়

  • শিরদাঁড়া: শিরের দাঁড়া (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • কীটদষ্ট: কীট দ্বারা দষ্ট (তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস)
  • কারুকর্ম: কারু (শিল্পীর) কর্ম (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • আনকোরা: নয় কোরা (নঞ তৎপুরুষ সমাস)
  • বজ্রপাত: বজ্রের পাত (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • জল ➜ জলীয়
  • শোক ➜ শোকার্ত
  • রক্ত ➜ রক্তিম
  • পৃথিবী ➜ পার্থিব
  • মূর্তি ➜ মূর্ত

এই তার পরিচয় কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি প্রখ্যাত আধুনিক কবি কবিতা সিংহের লেখা। এর মূল বিষয়বস্তু হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অত্যাচার ও লাঞ্ছনা সহ্য করেও এক অদম্য নারীর পাথরের মতো কঠিন হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিবাদী আখ্যান।

সমাজরূপী ভাস্কর নারীটিকে আর চিনতে পারে না। কারণ সমাজ তাকে নরম পুতুলের মতো গড়তে চেয়েছিল, কিন্তু সে সমস্ত শোক ও যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে আজ প্রতিবাদী ও কঠিন পাথরে পরিণত হয়েছে।

পুঁটিমাছ যেমন খুব তুচ্ছ হয়, তেমনি সমাজের সেইসব হীন, ক্ষুদ্র ও নিন্দুক মানুষদের বোঝানো হয়েছে যারা বিপন্ন নারীর দুর্নাম বা কুৎসা রটাতে ব্যস্ত থাকে।