খেয়া (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'খেয়া' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'খেয়া' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

গ্রামজীবনের চিরন্তন রূপ: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'খেয়া' কবিতায় গ্রামবাংলার চিরন্তন, শান্ত ও নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রার একটি অপরূপ চিত্র ফুটে উঠেছে। নদীর দুই তীরে অবস্থিত দুটি গ্রামের মানুষের মধ্যে গভীর আত্মীয়তা ও জানাশোনা রয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি খেয়ানৌকা সেই দুটি গ্রামের মানুষদের পারাপার করে। কেউ ঘর থেকে কাজে বের হয়, আবার কেউ কাজ সেরে ঘরে ফেরে। এই নিরবচ্ছিন্ন আনাগোনার মাধ্যমেই দুই পারের মানুষের জীবন একই সুতোয় বাঁধা পড়ে থাকে।

সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও ধ্বংস: গ্রামের শান্ত জীবনের বিপরীতে কবি বাইরের পৃথিবীর দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের চিত্র তুলে ধরেছেন। বাইরের পৃথিবীতে ক্ষমতার লোভে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়, নিত্যনতুন ইতিহাস রচিত হয় এবং রক্তপাতের মধ্য দিয়ে সোনার মুকুট অর্থাৎ রাজক্ষমতা কখনও গড়ে ওঠে, কখনও বা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় (টুটে)। সভ্যতার নতুন নতুন তৃষ্ণা ও ক্ষুধার কারণে পৃথিবীতে যেমন একদিকে সুধা বা অমৃত উঠে আসে, অন্যদিকে হলাহল বা বিষেরও সৃষ্টি হয়। বাইরের এই জগত হলো ধ্বংস, যুদ্ধ ও অশান্তির এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

খেয়ার শাশ্বত আবেদন: সভ্যতার ভাঙাগড়া এবং রাজায় রাজায় যুদ্ধের খবর নদীর তীরের এই দুই শান্ত গ্রামের মানুষের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বাইরের পৃথিবীর ধ্বংসলীলা সত্ত্বেও গ্রাম দুটি একে অপরের দিকে আপনমনে তাকিয়ে থাকে। তাদের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম 'খেয়া' নৌকাটি চিরকাল ধরে একইভাবে নদীস্রোতে পারাপার করে। সাম্রাজ্যের পতন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা এবং এই খেয়া পারাপারের স্রোত কখনো স্তব্ধ হয় না।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
খেয়াপারাপারের নৌকারক্তপ্রবাহরক্তের ধারা বা স্রোত
দ্বন্দ্বসংঘাত / কলহ / বিরোধফেনাইয়াফেনার মতো উপচে পড়া
সর্বনাশসবকিছু ধ্বংস হওয়াটুটেভেঙে যায় বা ধ্বংস হয়
ইতিহাসঅতীতের ধারাবাহিক কাহিনিহলাহলতীব্র বিষ / কালকূট
সোনার মুকুটরাজক্ষমতা বা সাম্রাজ্যের প্রতীকসুধাঅমৃত / যা পানে অমর হওয়া যায়
তৃষ্ণা ক্ষুধানতুন কিছু পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষাদোঁহা-পানেএকে অপরের দিকে

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'খেয়া' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) কাজী নজরুল ইসলাম (খ) জীবনানন্দ দাশ (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঘ) সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
উত্তর: (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. 'খেয়া' কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন্ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
(ক) গীতাঞ্জলি (খ) সোনার তরী (গ) মানসী (ঘ) চৈতালি
উত্তর: (ঘ) চৈতালি
৩. খেয়ানৌকা কোথায় পারাপার করে?
(ক) নদীস্রোতে (খ) মাঝসমুদ্রে (গ) হ্রদে (ঘ) খালে
উত্তর: (ক) নদীস্রোতে
৪. খেয়ানৌকা দিয়ে কে ঘরে যায় এবং কে কোথা থেকে আসে?
(ক) গ্রাম হতে (খ) শহর হতে (গ) ঘর হতে (ঘ) নদী হতে
উত্তর: (গ) ঘর হতে
৫. দুই তীরে যে দুই গ্রাম আছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন?
(ক) শত্রুতার (খ) জানাশোনা (গ) অচেনা (ঘ) দূরত্বের
উত্তর: (খ) জানাশোনা
৬. দুই গ্রামের মধ্যে আনাগোনা কখন চলে?
(ক) সকাল হতে সন্ধ্যা (খ) দুপুর হতে রাত (গ) কেবল ভোরে (ঘ) কেবল সন্ধ্যায়
উত্তর: (ক) সকাল হতে সন্ধ্যা
৭. পৃথিবীতে কীসের অন্ত নেই?
(ক) দ্বন্দ্ব ও সর্বনাশের (খ) শান্তির (গ) আনন্দের (ঘ) মৈত্রীর
উত্তর: (ক) দ্বন্দ্ব ও সর্বনাশের
৮. নূতন নূতন কী গড়ে ওঠে?
(ক) শহর (খ) ইতিহাস (গ) সভ্যতা (ঘ) সাম্রাজ্য
উত্তর: (খ) ইতিহাস
৯. কীসের মাঝে সোনার মুকুট ফেনাইয়া ওঠে?
(ক) নদীপ্রবাহের (খ) সমুদ্রের (গ) রক্তপ্রবাহের (ঘ) বায়ুপ্রবাহের
উত্তর: (গ) রক্তপ্রবাহের
১০. 'সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!' - 'টুটে' শব্দের অর্থ কী?
(ক) গঠিত হয় (খ) জ্বলে ওঠে (গ) ভেঙে যায় বা ধ্বংস হয় (ঘ) উজ্জ্বল হয়
উত্তর: (গ) ভেঙে যায় বা ধ্বংস হয়
১১. 'সোনার মুকুট' কবিতায় কীসের প্রতীক?
(ক) রাজক্ষমতা বা সাম্রাজ্যের (খ) শান্তির (গ) সৌন্দর্যের (ঘ) অহংকারের
উত্তর: (ক) রাজক্ষমতা বা সাম্রাজ্যের
১২. সভ্যতার নব নব কী জাগে?
(ক) আশা (খ) তৃষ্ণা ক্ষুধা (গ) স্বপ্ন (ঘ) হতাশা
উত্তর: (খ) তৃষ্ণা ক্ষুধা
১৩. সভ্যতার তৃষ্ণা ও ক্ষুধায় কী কী ওঠে?
(ক) সোনা ও রুপো (খ) হলাহল ও সুধা (গ) আনন্দ ও বিষাদ (ঘ) জীবন ও মৃত্যু
উত্তর: (খ) হলাহল ও সুধা
১৪. 'হলাহল' শব্দের অর্থ কী?
(ক) অমৃত (খ) মধু (গ) বিষ (ঘ) সুবাস
উত্তর: (গ) বিষ
১৫. 'সুধা' শব্দের বিপরীত শব্দ কবিতায় কোনটি ব্যবহৃত হয়েছে?
(ক) গরল (খ) হলাহল (গ) জল (ঘ) রক্ত
উত্তর: (খ) হলাহল
১৬. দুই তীরে দুই গ্রাম কার পানে চেয়ে আছে?
(ক) আকাশের পানে (খ) দোঁহা-পানে (একে অপরের দিকে) (গ) নদীর পানে (ঘ) খেয়ার পানে
উত্তর: (খ) দোঁহা-পানে (একে অপরের দিকে)
১৭. 'দোঁহা-পানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম' - কেন চেয়ে আছে?
(ক) শত্রুতার কারণে (খ) গভীর আত্মীয়তা ও নির্ভরতার কারণে (গ) ভয় পেয়ে (ঘ) কৌতূহলে
উত্তর: (খ) গভীর আত্মীয়তা ও নির্ভরতার কারণে
১৮. এই খেয়া চিরদিন কোথায় চলে?
(ক) সমুদ্রস্রোতে (খ) নদীস্রোতে (গ) হাওয়ায় (ঘ) মনে
উত্তর: (খ) নদীস্রোতে
১৯. 'কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে' - পঙ্‌ক্তিটি কবিতায় কতবার ব্যবহৃত হয়েছে?
(ক) একবার (খ) দুইবার (গ) তিনবার (ঘ) চারবার
উত্তর: (খ) দুইবার
২০. 'খেয়া' কবিতাটি কী ছন্দে রচিত?
(ক) মাত্রাবৃত্ত (খ) স্বরবৃত্ত (গ) অক্ষরবৃত্ত বা পয়ার (ঘ) গদ্যছন্দ
উত্তর: (গ) অক্ষরবৃত্ত বা পয়ার

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'খেয়ানৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে' - খেয়ানৌকা কী কাজ করে?
উত্তর: খেয়ানৌকা নদীর দুই তীরে অবস্থিত দুটি গ্রামের মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং তাদের এপার-ওপার পারাপার করার কাজ করে।
২. নদীর দুই তীরের গ্রাম দুটির মধ্যে সম্পর্ক কেমন?
উত্তর: নদীর দুই তীরে অবস্থিত গ্রাম দুটির মধ্যে গভীর আত্মীয়তা ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, কবিতায় একেই বলা হয়েছে 'আছে জানাশোনা'।
৩. 'সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা' - কারা আনাগোনা করে?
উত্তর: নদীর দুই তীরে অবস্থিত দুই গ্রামের সাধারণ মানুষেরা জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেয়ানৌকায় পারাপার করে বা আনাগোনা করে।
৪. 'পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ' - বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: গ্রামের শান্ত জীবনের বাইরে বৃহত্তর পৃথিবীতে যে প্রতিনিয়ত রাজায় রাজায় যুদ্ধ, ক্ষমতার লড়াই, রক্তপাত এবং সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে, তাকেই কবি দ্বন্দ্ব ও সর্বনাশ বলেছেন।
৫. 'নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস' - কীভাবে ইতিহাস গড়ে ওঠে?
উত্তর: পৃথিবীতে ক্ষমতার হাতবদলের কারণে পুরোনো সাম্রাজ্য ধ্বংস হয় এবং নতুন শক্তির উত্থান ঘটে, এভাবেই রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিত্যনতুন ইতিহাস গড়ে ওঠে।
৬. 'রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে' - কী ফেনাইয়া ওঠে?
উত্তর: যুদ্ধে সাধারণ মানুষের রক্তপাতের বা রক্তপ্রবাহের মাঝে ক্ষমতার লোভ এবং অহংকারের প্রতীক 'সোনার মুকুট' ফেনার মতো উপচে ওঠে বা ফেনাইয়া ওঠে।
৭. 'সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!' - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: সোনার মুকুট হলো রাজক্ষমতা ও সাম্রাজ্যের প্রতীক। যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদলে পৃথিবীতে নতুন সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে (ফুটে) এবং পুরোনো সাম্রাজ্য ধ্বংস হয় বা ভেঙে পড়ে (টুটে)।
৮. 'সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা' - তৃষ্ণা ও ক্ষুধা বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: মানুষের মনে অজানাকে জানার, নতুন কিছু পাওয়ার বা ভোগদখলের যে অন্তহীন লালসা ও আকাঙ্ক্ষা, তাকেই সভ্যতার নব নব তৃষ্ণা ও ক্ষুধা বলা হয়েছে।
৯. সভ্যতার তৃষ্ণা ও ক্ষুধার ফলে কী উঠে আসে?
উত্তর: সভ্যতার অন্তহীন তৃষ্ণা ও ক্ষুধার ফলে পৃথিবীতে কখনো ধ্বংসাত্মক বা ক্ষতিকর দিক অর্থাৎ 'হলাহল' (বিষ) উঠে আসে, আবার কখনো কল্যাণকর দিক অর্থাৎ 'সুধা' (অমৃত)-র সৃষ্টি হয়।
১০. 'শুধু হেথা দুই তীরে' - এখানে কোন দুই তীরের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে বৃহত্তর পৃথিবীর কোলাহল ও রক্তপাতের বাইরে অবস্থিত গ্রামীণ নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা শান্ত ও নিস্তরঙ্গ গ্রাম দুটির কথা বলা হয়েছে।
১১. 'দোঁহা-পানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম' - এর তাৎপর্য কী?
উত্তর: এর তাৎপর্য হলো, বাইরের পৃথিবীতে যতই ক্ষমতার লড়াই বা সর্বনাশ হোক না কেন, গ্রাম দুটির সাধারণ মানুষ একে অপরের প্রতি গভীর নির্ভরতা ও ভালোবাসা নিয়ে চিরকাল পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে।
১২. 'এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে' - খেয়া চিরদিন চলে কেন?
উত্তর: রাজবংশ বা সাম্রাজ্যের পতন হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বা বেঁচে থাকার তাগিদ কখনো শেষ হয় না। তাই তাদের পারাপারের খেয়া চিরকাল ধরেই নদীস্রোতে বহমান থাকে।
১৩. 'কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে' - পঙ্‌ক্তিটির মধ্য দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: এই পঙ্‌ক্তিটির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রবাহ এবং মানবজীবনের চিরন্তন যাওয়া-আসার শাশ্বত রূপটি ফুটে উঠেছে।
১৪. 'হলাহল' ও 'সুধা' - এই শব্দদুটি কোন্ পৌরাণিক ঘটনার কথা স্মরণ করায়?
উত্তর: শব্দদুটি হিন্দু পুরাণে বর্ণিত 'সমুদ্রমন্থন'-এর ঘটনার কথা স্মরণ করায়, যেখানে দেবতা ও অসুরদের মন্থনের ফলে প্রথমে তীব্র বিষ (হলাহল) এবং পরে অমৃত (সুধা) উঠেছিল।
১৫. 'খেয়া' কবিতাটির মূল ভাব কী?
উত্তর: কবিতাটির মূল ভাব হলো, সভ্যতার উত্থান-পতন, যুদ্ধ ও ধ্বংসলীলার চেয়ে সাধারণ মানুষের শান্ত, নীরব ও প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা অনেক বেশি শাশ্বত এবং চিরন্তন।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'খেয়া' কবিতায় গ্রামজীবনের চিরন্তন রূপটি কীভাবে ধরা পড়েছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'খেয়া' কবিতায় গ্রামবাংলার অত্যন্ত সাধারণ অথচ শাশ্বত জীবনের এক স্নিগ্ধ চিত্র ধরা পড়েছে।

কবিতার শুরুতেই কবি দেখিয়েছেন যে একটি শান্ত নদীর দুই তীরে দুটি গ্রাম অবস্থিত। এই দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, বরং তাদের মধ্যে রয়েছে গভীর আত্মীয়তা ও জানাশোনা। তাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো একটি খেয়ানৌকা, যা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীস্রোতে পারাপার করে। গ্রামের সাধারণ মানুষেরা জীবিকা বা জীবনের তাগিদে কেউ ঘর থেকে কাজে বেরিয়ে আসে, আবার কেউ কাজ সেরে ঘরে ফিরে যায়।
বাইরের পৃথিবীতে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, কিন্তু গ্রামের এই নিরবচ্ছিন্ন শান্ত জীবনপ্রবাহে তার কোনো আঁচ পড়ে না। তারা একে অপরের দিকে (দোঁহা-পানে) স্নেহ ও নির্ভরতার চোখে তাকিয়ে থাকে। গ্রামজীবনের এই প্রাত্যহিক যাওয়া-আসা এবং পারস্পরিক ভালোবাসার সম্পর্ক চিরকাল ধরে বা আবহমানকাল ধরে অপরিবর্তিত থাকে। সভ্যতার ধ্বংসলীলার বিপরীতে গ্রামীণ জীবনের এই নিরবচ্ছিন্ন ও চিরন্তন রূপটিই কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

২. "পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ / নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস" - উদ্ধৃতিটির অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'খেয়া' কবিতা থেকে গৃহীত।

অন্তর্নিহিত অর্থ: নদীর দুই তীরে অবস্থিত শান্ত গ্রাম্য জীবনের বিপরীতে কবি এই পঙ্‌ক্তি দুটির মাধ্যমে বৃহত্তর পৃথিবীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সংঘাতের চিত্র তুলে ধরেছেন। মানুষের ক্ষমতার লোভ, অহংকার এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসা পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের সৃষ্টি করে। এই যুদ্ধের পরিণতি হলো চরম রক্তপাত, ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষের সর্বনাশ।
বিজয়ীরা নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পরাজিতদের সাম্রাজ্য ধ্বংস করে। এভাবেই ক্ষমতার হাতবদলের মাধ্যমে পৃথিবীতে পুরনো ইতিহাস মুছে গিয়ে রচিত হয় নতুন নতুন ইতিহাস। এক সাম্রাজ্যের পতন এবং অন্য সাম্রাজ্যের উত্থান—সভ্যতার এই নির্মম অথচ অবিরত ভাঙাগড়ার খেলাকেই কবি এই পঙ্‌ক্তি দুটির মাধ্যমে অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ করেছেন।

৩. "রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া উঠে / সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!" - পঙ্‌ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত অংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত 'খেয়া' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: 'সোনার মুকুট' হলো রাজশক্তি, সাম্রাজ্য এবং ক্ষমতার অহংকারের চরম প্রতীক। পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে রাজায় রাজায় যে ক্ষমতার লড়াই চলে, তাতে ঝরে পড়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষের রক্ত। সেই রক্তস্রোত বা 'রক্তপ্রবাহের' ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে নতুন সাম্রাজ্য বা ফুলে-ফেঁপে ওঠে নতুন কোনো রাজার সোনার মুকুট। কিন্তু এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কালস্রোতে সেই মুকুট আবার অন্য কোনো প্রবল শক্তির দ্বারা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় (টুটে)।
অর্থাৎ, রাজক্ষমতা কখনো গড়ে ওঠে (ফুটে) আবার কখনো ধ্বংস হয় (টুটে)। নদীর জলে ফেনা যেমন সাময়িকভাবে ফুলে উঠলেও আবার মিলিয়ে যায়, তেমনি মানুষের রক্ত ঝরিয়ে অর্জিত এই ক্ষমতার সোনার মুকুটও অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। রাজায় রাজায় যুদ্ধের এই রক্তাক্ত ও অনিত্য ইতিহাসকে কবি অত্যন্ত ব্যঞ্জনাপূর্ণ ভাষায় এখানে তুলে ধরেছেন।

৪. "সভ্যতার নব নব কত তৃষ্ণা ক্ষুধা - / উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা!" - পঙ্‌ক্তিটির পৌরাণিক অনুষঙ্গ ও অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: পৌরাণিক অনুষঙ্গ: হিন্দু পুরাণে সমুদ্রমন্থনের একটি বিখ্যাত কাহিনি রয়েছে। দেবতা ও অসুররা মিলে যখন সমুদ্র মন্থন করেছিল, তখন সমুদ্রের তলদেশ থেকে প্রথমে তীব্র গরল বা বিষ (হলাহল) উঠেছিল, যা শিব পান করেছিলেন। এরপর উঠেছিল অমৃত বা সুধা।

অন্তর্নিহিত অর্থ: কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে এই সমুদ্রমন্থনের সাথে তুলনা করেছেন। মানুষের মনে নতুন কিছু জানার, পাওয়ার বা ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। একেই কবি সভ্যতার 'নব নব তৃষ্ণা ও ক্ষুধা' বলেছেন। মানুষ যখনই সভ্যতার অগ্রগতি বা নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করেছে, তখন সমুদ্রমন্থনের মতোই তার দুটি দিক প্রকট হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন মানুষের কল্যাণের জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে বিজ্ঞান ও শিল্পের অমৃত বা 'সুধা', অন্যদিকে ক্ষমতার আস্ফালন, মারণাস্ত্র এবং যুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে ধ্বংসাত্মক বিষ বা 'হলাহল'। সভ্যতার বিকাশের এই ভালো ও মন্দ, কল্যাণ ও ধ্বংসের দ্বৈত রূপটিই কবি এই পঙ্‌ক্তি দুটিতে অত্যন্ত সার্থকভাবে প্রকাশ করেছেন।

৫. 'খেয়া' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ নামকরণের মধ্য দিয়েই রচনার মূল ভাব ও অন্তর্নিহিত দর্শন পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচ্য কবিতাটির নাম রাখা হয়েছে 'খেয়া'।

কবিতাটি শুরু হয়েছে নদীস্রোতে খেয়ানৌকা পারাপারের ছবি দিয়ে। নদীর দুই তীরের দুটি গ্রামের মানুষকে যুক্ত রাখার একমাত্র মাধ্যম হলো এই 'খেয়া'। কবিতায় কবি দুটি ভিন্ন জগতের বৈপরীত্য দেখিয়েছেন। একদিকে বাইরের পৃথিবীতে চলছে ক্ষমতার লড়াই, রক্তপাত, সাম্রাজ্যের পতন এবং সভ্যতার হলাহল ও সুধা ওঠার প্রবল দ্বন্দ্ব। কিন্তু এত সর্বনাশ ও ভাঙাগড়াও গ্রামবাংলার শান্ত জীবনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, তাদের ঘরে ফেরা এবং ঘর থেকে কাজে যাওয়ার চিরন্তন প্রবাহ এই খেয়া নৌকার মতোই অবিরাম চলতে থাকে।
রাজবংশ বা সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের জীবন, ভালোবাসা এবং এই পারাপারের খেয়া হলো চিরন্তন ও শাশ্বত। যেহেতু সমগ্র কবিতাটির মূল সুর এই খেয়া নৌকার পারাপার এবং মানবজীবনের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের ধারণার ওপরই প্রতিষ্ঠিত, তাই বলা যায় 'খেয়া' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক, গভীর ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

۶. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • পারাপার = পার + আপার
  • নবনব = নব + নব
  • দ্বন্দ্ব = দ্বি + অন্ধ (অথবা ব্যাকরণগতভাবে নিপাতনে সিদ্ধ) - সাধারণত সন্ধিবদ্ধ নয়, এটি শব্দ। চলুন অন্য শব্দ দেখি:
  • সর্বনাশ = সর্ব + নাশ
  • ইতিহাস = ইতি + হাস

সমাস নির্ণয়

  • নদীস্রোতে: নদীর স্রোত (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • রক্তপ্রবাহ: রক্তের প্রবাহ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • সোনামুকুট: সোনার মুকুট (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • আনাগোনা: আনা ও গোনা (দ্বন্দ্ব সমাস)
  • জানাশোনা: যা জানা তাই শোনা (কর্মধারয় সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • গ্রাম ➜ গ্রাম্য
  • পৃথিবী ➜ পার্থিব
  • ইতিহাস ➜ ঐতিহাসিক
  • রক্ত ➜ রক্তিম
  • নব ➜ নবীন

খেয়া কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই অসামান্য রূপক কবিতাটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। এটি তাঁর বিখ্যাত 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

'সোনার মুকুট' হলো রাজক্ষমতা, সাম্রাজ্য এবং অহংকারের চরম প্রতীক। যুদ্ধে রক্তপাতের মাধ্যমে এই মুকুট কখনো গড়ে ওঠে, আবার কখনো ধ্বংস হয়।

বাইরের সভ্যতায় সর্বদা ক্ষমতার লড়াই, রক্তপাত এবং ধ্বংসলীলা চলে। কিন্তু এর বিপরীতে, গ্রামজীবনে রয়েছে শান্ত, চিরন্তন ও নিরবচ্ছিন্ন পারাপারের বা মানবসম্পর্কের এক শাশ্বত রূপ।