নিরুদ্দেশ (প্রেমেন্দ্র মিত্র)

বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'নিরুদ্দেশ' গল্পের সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত 'নিরুদ্দেশ' গল্পের সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপনের রসিকতা: শীতের এক মেঘলা ও অস্বস্তিকর দিনে কথক খবরের কাগজে নিরুদ্দেশের সাত-সাতটি বিজ্ঞাপন দেখে বন্ধু সোমেশের কাছে মজা করছিলেন। কথক বলছিলেন যে, নিরুদ্দেশ হওয়া বেশিরভাগ ছেলেই বাবা-মায়ের আদরের হয়। সামান্য বকাঝকা খেয়ে তারা বাড়ি ছাড়ে এবং পরে বাবার দেওয়া খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন ও মায়ের কান্নার কথা পড়ে বীরদর্পে বাড়ি ফিরে আসে। কথকের মতে এই বিজ্ঞাপনগুলো এক ধরনের প্রহসন মাত্র। কিন্তু সোমেশ এই কথায় মজা না পেয়ে একটি গম্ভীর ও মর্মান্তিক গল্প শোনায়, যা নিরুদ্দেশের অন্য এক ট্র্যাজিক দিক তুলে ধরে।

শোভনের বাড়ি ছাড়া ও নিরুদ্দেশ: সোমেশ গল্প বলে শোভন নামের একটি ছেলের। শোভনের বাবা ছিলেন বদরাগী ও একগুঁয়ে জমিদার। একদিন সামান্য কারণে রেগে গিয়ে তিনি শোভনকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। অভিমানী শোভন সত্যি সত্যিই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দিন যায়, মাস যায়, কিন্তু শোভন ফেরে না। তার মা কান্নাকাটি শুরু করলে, একগুঁয়ে বাবা প্রথমদিকে পাত্তা না দিলেও পরে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেন। প্রথমে অভিমানী, তারপর কাতর এবং শেষে পাগলপ্রায় হয়ে তিনি বিজ্ঞাপন দেন, কিন্তু শোভন ফেরে না।

শোভনের প্রত্যাবর্তন ও নির্মম পরিণতি: দীর্ঘ দুই বছর পর শোভন যখন বুঝতে পারে যে তার বাবা সত্যিই অনুতপ্ত এবং তার মা তাকে না দেখে বাঁচবে না, তখন সে বাড়ি ফেরে। কিন্তু সে দেখে যে তার বাবা সম্পূর্ণ বদলে গেছেন। তিনি শোভনকে চিনতে অস্বীকার করেন এবং তাকে দূর করে দেন। শোভন অবাক হয়ে যায়। পরে সে জানতে পারে যে, শোভনের মা মৃত্যুশয্যায় এবং তিনি তার ছেলেকে দেখার জন্য ছটফট করছেন। নায়েবমশাই শোভনকে টাকার লোভ দেখিয়ে অনুরোধ করেন সে যেন মুমূর্ষু মায়ের কাছে শোভন সেজে যায়, কারণ তার চেহারা অনেকটা শোভনের মতো। এই ঘটনা শোভনের কাছে চরম মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়ায়। গল্প শেষে কথক বুঝতে পারেন যে, সোমেশই হলো সেই হতভাগ্য শোভন।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
নিরুদ্দেশযার উদ্দেশ্য বা ঠিকানা জানা নেই / নিখোঁজঅস্বস্তিকরযাতে স্বস্তি বা আরাম নেই
ম্লানমলিন / ফ্যাকাসেস্তব্ধতানিস্তব্ধতা / নীরবতা
গুণধরযে গুণের অধিকারী (এখানে ব্যঙ্গার্থে)পেড়াপিড়িবারবার অনুরোধ বা জেদ
উদাসীনযার কোনো কিছুতে আগ্রহ নেই / নিস্পৃহকুণ্ডলীপাক বা গোলাকার রূপ (ধোঁয়ার)
মুমূর্ষুযে মরতে বসেছে / মরণাপন্নসাদৃশ্যমিল / একই রকম দেখতে
নিষ্প্রভযার প্রভা বা আলো নেই / ম্লানসান্ত্বনাআশ্বাস / দুঃখ কমানোর কথা
নায়েবমশাইজমিদারের প্রধান কর্মচারী বা ম্যানেজারতাড়ানোটের গোছা বা বান্ডিল

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'নিরুদ্দেশ' গল্পটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (গ) প্রেমেন্দ্র মিত্র (ঘ) শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (গ) প্রেমেন্দ্র মিত্র
২. দিনের আবহাওয়া কেমন ছিল?
(ক) খুব রোদ (খ) প্রবল ঝড়-বৃষ্টি (গ) শীতের দিনে বাদলার মতো অস্বস্তিকর (ঘ) সুন্দর ও মনোরম
উত্তর: (গ) শীতের দিনে বাদলার মতো অস্বস্তিকর
৩. কথক খবরের কাগজে একসঙ্গে কয়টি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেখেছিলেন?
(ক) তিনটি (খ) পাঁচটি (গ) সাতটি (ঘ) দশটি
উত্তর: (গ) সাতটি
৪. কথকের বন্ধু সোমেশ কী করছিল?
(ক) চা খাচ্ছিল (খ) বই পড়ছিল (গ) উদাসীনভাবে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছিল (ঘ) ঘুমাচ্ছিল
উত্তর: (গ) উদাসীনভাবে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছিল
৫. কথকের মতে নিরুদ্দেশ হওয়া ছেলেরা কেমন হয়?
(ক) খুব ভালো (খ) অত্যন্ত রাগী (গ) বাবা-মায়ের আদরের ও অভিমানী (ঘ) খুব গরিব
উত্তর: (গ) বাবা-মায়ের আদরের ও অভিমানী
৬. সোমেশ যে গল্পটি শুনিয়েছিল, তার প্রধান চরিত্রের নাম কী?
(ক) রমেশ (খ) সুকুমার (গ) শোভন (ঘ) তপন
উত্তর: (গ) শোভন
৭. শোভন কেন বাড়ি ছেড়েছিল?
(ক) বাবার ওপর রাগ করে (খ) মায়ের ওপর রাগ করে (গ) পরীক্ষায় ফেল করে (ঘ) চুরি করে
উত্তর: (ক) বাবার ওপর রাগ করে
৮. শোভনের বাবা কেমন প্রকৃতির লোক ছিলেন?
(ক) খুব শান্ত (খ) বদরাগী ও একগুঁয়ে (গ) খুব কৃপণ (ঘ) খুব দয়ালু
উত্তর: (খ) বদরাগী ও একগুঁয়ে
৯. শোভনের বাবা খবরের কাগজে কীসের বিজ্ঞাপন দিতেন?
(ক) চাকরির (খ) নিরুদ্দেশের (গ) বাড়ি বিক্রির (ঘ) বিয়ের
উত্তর: (খ) নিরুদ্দেশের
১০. শোভন কত বছর পর বাড়ি ফিরেছিল?
(ক) এক বছর (খ) দুই বছর (গ) তিন বছর (ঘ) পাঁচ বছর
উত্তর: (খ) দুই বছর
১১. শোভন বাড়ি ফিরে তার বাবাকে কেমন দেখেছিল?
(ক) খুব বুড়ো ও দুর্বল (খ) আগের মতোই বদরাগী (গ) খুব হাসিখুশি (ঘ) রোগাটে
উত্তর: (ক) খুব বুড়ো ও দুর্বল
১২. শোভনকে দেখে তার বাবা কী বলেছিলেন?
(ক) তুই ফিরেছিস! (খ) কে? (গ) ভেতরে আয়। (ঘ) তুই আবার এসেছিস?
উত্তর: (খ) কে?
১৩. শোভনের বাবার সঙ্গে কার সাদৃশ্য ছিল?
(ক) শোভনের মায়ের (খ) নায়েবমশাইয়ের (গ) একজন কর্মচারীর (ঘ) আর একটি নিরুদ্দেশ ছেলের
উত্তর: (ঘ) আর একটি নিরুদ্দেশ ছেলের
১৪. নায়েবমশাই শোভনকে কী বলেছিলেন?
(ক) চলে যেতে (খ) বসতে (গ) খেতে (ঘ) মারতে
উত্তর: (ক) চলে যেতে
১৫. শোভনের মায়ের কী অবস্থা ছিল?
(ক) তিনি সুস্থ ছিলেন (খ) তিনি মুমূর্ষু ছিলেন (গ) তিনি বাইরে গিয়েছিলেন (ঘ) তিনি ঘুমাচ্ছিলেন
উত্তর: (খ) তিনি মুমূর্ষু ছিলেন
১৬. মুমূর্ষু মায়ের সান্ত্বনার জন্য নায়েবমশাই শোভনকে কী করতে অনুরোধ করেছিলেন?
(ক) ডাক্তার ডাকতে (খ) ওষুধ আনতে (গ) হারানো ছেলে সেজে দেখা দিতে (ঘ) গান গাইতে
উত্তর: (গ) হারানো ছেলে সেজে দেখা দিতে
১৭. নায়েবমশাই শোভনের হাতে কী গুঁজে দিয়েছিলেন?
(ক) চিঠি (খ) ছবি (গ) নোটের তাড়া (ঘ) খাবার
উত্তর: (গ) নোটের তাড়া
১৮. শোভনের গল্পটি আসলে কার জীবনের গল্প?
(ক) কথকের (খ) নায়েবমশাইয়ের (গ) সোমেশের (ঘ) শোভনের বাবার
উত্তর: (গ) সোমেশের
১৯. " অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা কী হয় জান তো?" - বক্তা কে?
(ক) সোমেশ (খ) কথক (গ) শোভন (ঘ) নায়েবমশাই
উত্তর: (খ) কথক
২০. 'মুমূর্ষু' শব্দের অর্থ কী?
(ক) মৃত (খ) মরণাপন্ন (গ) অসুস্থ (ঘ) অজ্ঞান
উত্তর: (খ) মরণাপন্ন

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'দিনটা ভারী বিশ্রী।' - দিনটা বিশ্রী কেন?
উত্তর: দিনটি ছিল শীতকালের। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল এবং বৃষ্টির মতো অস্বস্তিকর আবহাওয়া ছিল, যা চারপাশের পরিবেশকে মৃতের মতো অসাড় করে তুলেছিল। তাই দিনটিকে বিশ্রী বলা হয়েছে।
২. খবরের কাগজে কথক কী দেখেছিলেন?
উত্তর: খবরের কাগজে কথক একসঙ্গে সাত-সাতটি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেখেছিলেন, যা তাঁর কাছে অত্যন্ত আশ্চর্য এবং কৌতূহলোদ্দীপক বলে মনে হয়েছিল।
৩. কথকের মতে নিরুদ্দেশ হওয়া ছেলেরা সাধারণত কেমন হয়?
উত্তর: কথকের মতে, নিরুদ্দেশ হওয়া ছেলেরা সাধারণত বাবা-মায়ের আদরের এবং অভিমানী হয়। সামান্য বকাঝকা খেয়ে তারা বাড়ি ছাড়ে এবং পরে আবার ফিরে আসে।
৪. সোমেশ কথকের কথায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল?
উত্তর: কথক যখন নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন নিয়ে মজা করছিলেন, তখন সোমেশ কোনো কৌতূহল বা হাসি প্রকাশ করেনি। সে সম্পূর্ণ উদাসীনভাবে শুধু সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছিল।
৫. শোভন কেন নিরুদ্দেশ হয়েছিল?
উত্তর: শোভনের বাবা ছিলেন বদরাগী ও একগুঁয়ে। একদিন সামান্য কারণে তিনি শোভনকে খুব বকাঝকা করেন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। অভিমানে শোভন সত্যি সত্যিই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
৬. শোভন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর তার বাবার অবস্থা কেমন হয়েছিল?
উত্তর: প্রথমদিকে শোভনের বাবা একগুঁয়েমি করে কোনো খোঁজ করেননি। কিন্তু সময় পেরোনোর সাথে সাথে এবং স্ত্রীর কান্নাকাটিতে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন এবং খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেন।
৭. শোভন কেন বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
উত্তর: দীর্ঘ দুই বছর পর শোভন বুঝতে পেরেছিল যে তার বাবা সত্যিই অনুতপ্ত এবং তার মা তাকে না দেখে আর বাঁচবেন না। বাবা-মায়ের এই কষ্টের কথা ভেবেই সে বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।
৮. বাড়ি ফিরে শোভন তার বাবাকে কেমন দেখেছিল?
উত্তর: বাড়ি ফিরে শোভন দেখেছিল যে তার বাবা সম্পূর্ণ বদলে গেছেন। তিনি আগের মতো বদরাগী নেই, বরং অনেক বুড়ো, দুর্বল এবং রুগ্ন হয়ে পড়েছেন।
৯. শোভনের বাবা শোভনকে দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?
উত্তর: শোভনকে দেখে তার বাবা তাকে চিনতে অস্বীকার করেন। তিনি কম্পিত স্বরে জিজ্ঞাসা করেন, "কে?" এবং নায়েবমশাইকে বলেন তাকে চলে যেতে দিতে।
১০. শোভনের বাবার এমন আচরণের কারণ কী ছিল?
উত্তর: শোভনের বাবার এমন আচরণের কারণ ছিল যে, এর আগে শোভনের মতো দেখতে অন্য ছেলেরাও নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেখে টাকা বা সম্পত্তির লোভে তার কাছে এসেছিল। তাই তিনি আসল শোভনকেও নকল ভেবেছিলেন।
১১. শোভনের মায়ের কী অবস্থা ছিল?
উত্তর: শোভনের মা তখন মৃত্যুশয্যায় এবং মুমূর্ষু অবস্থায় ছিলেন। তিনি তার হারানো ছেলেকে দেখার আশায় মৃত্যুতেও শান্তি পাচ্ছিলেন না।
১২. নায়েবমশাই শোভনকে কী করতে অনুরোধ করেছিলেন?
উত্তর: মুমূর্ষু মায়ের শেষ সান্ত্বনার জন্য নায়েবমশাই শোভনকে অনুরোধ করেছিলেন, সে যেন হারানো ছেলে সেজে একবার তার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, কারণ তার চেহারা অনেকটা শোভনের মতো।
১৩. নায়েবমশাই শোভনের হাতে কী দিয়েছিলেন এবং কেন?
উত্তর: নায়েবমশাই শোভনের হাতে অনেকগুলো টাকার নোটের তাড়া গুঁজে দিয়েছিলেন। এটি ছিল মুমূর্ষু মায়ের কাছে নকল ছেলে সেজে যাওয়ার পারিশ্রমিক বা ঘুষ।
১৪. গল্প শেষে কথক কী বুঝতে পেরেছিলেন?
উত্তর: গল্প শেষে কথক বুঝতে পেরেছিলেন যে, সোমেশ কোনো কাল্পনিক গল্প বলেনি। সোমেশ নিজেই হলো সেই হতভাগ্য শোভন, যে নিজের বাড়িতে ফিরেও নিজের পরিচয় ফিরে পায়নি।
১৫. 'নিরুদ্দেশ' গল্পে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের কোন্ দিকটি ফুটে উঠেছে?
উত্তর: গল্পে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের একটি ট্র্যাজিক বা মর্মান্তিক দিক ফুটে উঠেছে, যেখানে হারানো ছেলে বাড়ি ফিরে এলেও বাবা-মা তাকে চিনতে পারে না এবং তাকে নকল ছেলে ভেবে দূর করে দেয়।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'নিরুদ্দেশ' গল্পে শোভনের বাড়ি ফেরা এবং তার পরবর্তী নির্মম পরিণতির বর্ণনা দাও।

উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'নিরুদ্দেশ' গল্পে শোভন ছিল এক অভিমানী ছেলে, যে বাবার বকুনি খেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। দীর্ঘ দুই বছর পর, বাবা-মায়ের বিজ্ঞাপন এবং তাদের কষ্টের কথা বুঝতে পেরে সে অনুতপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু বাড়ি ফিরে সে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।

শোভন দেখেছিল তার বাবা অনেক বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো আঘাত সে তখন পায়, যখন তার বাবা তাকে চিনতে অস্বীকার করেন। এর কারণ ছিল, শোভন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে অনেক প্রতারক ছেলে শোভন সেজে টাকা বা সম্পত্তির লোভে তাদের বাড়িতে এসেছিল। তাই আসল শোভন ফিরে এলেও তার বাবা তাকে প্রতারক ভেবে দূর করে দেন।
পরিস্থিতি আরও মর্মান্তিক হয় যখন নায়েবমশাই শোভনকে জানান যে তার মা মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুশয্যায়। মায়ের শেষ সান্ত্বনার জন্য নায়েবমশাই শোভনকেই টাকার লোভ দেখিয়ে 'নকল শোভন' সেজে মায়ের সামনে যেতে অনুরোধ করেন। নিজের বাড়িতে এসে নিজের মায়ের কাছেই নকল ছেলে সাজার এই প্রস্তাব শোভনের কাছে চরম ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়। সে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় এবং এই নির্মম পরিণতি তাকে চিরকালের জন্য নিরুদ্দেশ হতে বাধ্য করে।

২. "अधिकांश ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা কী হয় জান তো?" - বক্তা কে? নিরুদ্দেশ সম্পর্কে বক্তার ধারণা কী ছিল এবং সোমেশের গল্পের পর সেই ধারণার কী পরিবর্তন ঘটে?

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত কথাটি প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত 'নিরুদ্দেশ' গল্পের কথক তাঁর বন্ধু সোমেশকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন।

বক্তার ধারণা: কথকের ধারণা ছিল যে, খবরের কাগজে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলো আসলে এক ধরনের প্রহসন বা নাটক। তাঁর মতে, অধিকাংশ ছেলেই বাবা-মায়ের খুব আদরের হয়। তারা সামান্য বকাঝকা খেয়ে অভিমান করে বাড়ি ছাড়ে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই যখন তারা খবরের কাগজে বাবার দেওয়া বিজ্ঞাপন এবং মায়ের কান্নাকাটির কথা পড়ে, তখন তাদের অভিমান ভেঙে যায়। তারা বীরদর্পে বাড়ি ফিরে আসে এবং বাবা-মাও তাদের সানন্দে বরণ করে নেয়। নিরুদ্দেশের এই পুরো ব্যাপারটিকে কথক একটি সাময়িক রাগ-অভিমানের খেলা বলে মনে করতেন।

ধারণার পরিবর্তন: কিন্তু সোমেশ যখন শোভনের গল্পটি শোনায়, তখন কথকের এই হালকা ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে নিরুদ্দেশ সবসময় প্রহসন হয় না, এর একটি ভয়ংকর ট্র্যাজিক দিকও আছে। শোভনের মতো কোনো ছেলে যদি সত্যি অনুতপ্ত হয়ে বাড়ি ফেরে, অথচ বাবা-মা যদি তাকে চিনতে না পারে এবং তাকে প্রতারক ভেবে তাড়িয়ে দেয়, তবে তা জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। সোমেশের গল্প শুনে কথক নিরুদ্দেশের এই নির্মম সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন।

৩. 'নিরুদ্দেশ' গল্প অবলম্বনে সোমেশ বা শোভন চরিত্রটির ট্র্যাজেডি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'নিরুদ্দেশ' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো সোমেশ, যার আসল নাম ছিল শোভন। তার জীবনের পরিণতি একটি গভীর ট্র্যাজেডির দলিল।

শোভন ছিল এক অভিমানী তরুণ। বাবার রাগের বশবর্তী হয়ে বলা কথায় সে সত্যি সত্যিই বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়। কিন্তু সে পাষাণহৃদয় ছিল না। দুই বছর পর বাবা-মায়ের কষ্টের কথা উপলব্ধি করে সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু তার ট্র্যাজেডি শুরু হয় তার নিজের বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই।
যে বাবার ওপর অভিমান করে সে ঘর ছেড়েছিল, সেই বাবা তাকে চিনতেই পারেন না। কারণ, ইতিমধ্যে অনেক প্রতারক ছেলে শোভন সেজে তাকে ঠকিয়ে গেছে। ফলে আসল শোভনও তার বাবার কাছে প্রতারক সাব্যস্ত হয়। এর চেয়েও বড়ো ট্র্যাজেডি ঘটে যখন সে জানতে পারে তার মা মৃত্যুশয্যায় এবং নায়েবমশাই তাকে টাকার বিনিময়ে তার নিজের মায়ের কাছেই 'নকল ছেলে' সেজে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। নিজের বাড়িতে, নিজের বাবা-মায়ের কাছে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে না পারার এই অসহায়তা শোভনের জীবনকে চিরকালের জন্য এক অন্ধকার নিরুদ্দেশের পথে ঠেলে দেয়। সে সোমেশ নাম ধারণ করে এক উদাসীন ও নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়।

৪. "শোভনকে একটা কাজ করতে হবে।" - কোন্ কাজের কথা বলা হয়েছে? এই কাজটি শোভনের কাছে কতটা মর্মান্তিক ছিল তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: কাজের কথা: প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'নিরুদ্দেশ' গল্পে শোভন যখন দুই বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরে আসে, তখন নায়েবমশাই তাকে একটি কাজ করতে অনুরোধ করেন। কাজটি হলো, শোভনকে টাকার বিনিময়ে একজন 'হারানো ছেলে' বা 'নকল শোভন' সেজে মৃত্যুশয্যায় থাকা মুমূর্ষু কর্ত্রীর (শোভনের মায়ের) সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, যাতে তিনি তাঁর ছেলেকে দেখার শেষ সান্ত্বনাটুকু নিয়ে শান্তিতে মরতে পারেন।

মর্মান্তিকতার কারণ: এই কাজটি শোভনের কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা। কারণ, শোভন কোনো প্রতারক ছিল না, সে সত্যিই ওই বাড়ির হারানো ছেলে শোভন। সে অনুতপ্ত হয়ে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে এসেছিল। কিন্তু তার বাবা তাকে চিনতে পারেননি এবং নায়েবমশাইও তাকে একজন বহিরাগত প্রতারক ভেবেছিলেন। নিজের মায়ের কাছে নিজের পরিচয় নিয়ে না গিয়ে, টাকার বিনিময়ে একজন ভাড়া করা 'নকল ছেলে' হিসেবে যাওয়ার প্রস্তাব শোভনের আত্মসম্মান ও মাতৃত্ববোধে চরম আঘাত হানে। নিজের বাড়িতে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের এই মর্মান্তিক ব্যর্থতাই তাকে চিরকালের জন্য সোমেশে রূপান্তরিত করে।

৫. 'নিরুদ্দেশ' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণের মধ্য দিয়েই রচনার মূল ভাব, বিষয়বস্তু এবং অন্তর্নিহিত ট্র্যাজেডি পাঠকের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের আলোচ্য গল্পটির নাম 'নিরুদ্দেশ'।

গল্পটি শুরু হয়েছে খবরের কাগজে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন দেখার প্রাত্যহিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কথক এই নিরুদ্দেশকে একটি সাময়িক রাগ-অভিমানের প্রহসন বলে মনে করতেন। কিন্তু বন্ধু সোমেশ শোভনের যে গল্পটি শোনায়, তা নিরুদ্দেশের এক অন্য ও ভয়ংকর দিক তুলে ধরে। শোভন বাবার ওপর অভিমান করে নিরুদ্দেশ হয়। কিন্তু দুই বছর পর সে যখন ফিরে আসে, তখন তার বাবা তাকে চিনতে পারেন না। তাকে একজন প্রতারক বা নকল ছেলে মনে করা হয়।
নিজের বাড়িতে, নিজের বাবা-মায়ের কাছে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলাটাই হলো শোভনের জীবনের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি। বাড়ি ফিরেও সে তার আসল ঠিকানা বা পরিচয় ফিরে পায়নি। এই মর্মান্তিক প্রত্যাখ্যান তাকে চিরকালের জন্য সোমেশ নাম ধারণ করে এক অনন্ত নিরুদ্দেশের পথে ঠেলে দেয়। যেহেতু শারীরিক নিরুদ্দেশ থেকে শুরু করে আত্মপরিচয় হারানোর চরম নিরুদ্দেশই গল্পের মূল উপজীব্য, তাই বলা যায় 'নিরুদ্দেশ' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক, গভীর ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • নিরুদ্দেশ = নিঃ + উদ্দেশ
  • আশ্চর্য = আ + চর্য
  • অস্বস্তিকর = অ + স্বস্তি + কর
  • উদাসীন = উৎ + আসীন
  • সান্ত্বনা = সম্ + ত্বনা

সমাস নির্ণয়

  • খবরের কাগজ: খবরের নিমিত্ত কাগজ (নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস)
  • মৃত্যুশয্যা: মৃত্যুর শয্যা (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • গুণধর: গুণ ধরে যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)
  • নিরুদ্দেশ: নাই উদ্দেশ যার (নঞর্থক বহুব্রীহি সমাস)
  • মেঘাচ্ছন্ন: মেঘ দ্বারা আচ্ছন্ন (তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • মেঘ ➜ মেঘলা
  • আশ্চর্য ➜ আশ্চর্যান্বিত
  • মৃত্যু ➜ মৃত
  • শরীর ➜ শারীরিক
  • দিন ➜ দৈনিক

নিরুদ্দেশ গল্প সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

গল্পটি বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা। গল্পের মূল চরিত্র হলো সোমেশ, যার আসল নাম ছিল শোভন।

কথকের মতে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনগুলো হলো এক ধরনের প্রহসন। তাঁর ধারণা, অভিমানী ছেলেরা রাগ করে বাড়ি ছাড়ে এবং পরে বাবার বিজ্ঞাপন পড়ে বীরদর্পে বাড়ি ফিরে আসে।

শোভনের জীবনের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি ছিল যে, সে অনুতপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পরও তার বাবা তাকে চিনতে পারেননি এবং তাকে টাকার বিনিময়ে নিজের মায়ের কাছেই নকল ছেলে সেজে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।