পালামৌ (সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'পালামৌ' ভ্রমণকাহিনির সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রখ্যাত সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'পালামৌ' ভ্রমণকাহিনির সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. রচনার বিষয়সংক্ষেপ

পালামৌ সম্পর্কে পূর্বধারণা ও বাস্তব: লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেকালে ইংরেজি পত্রিকা 'হরকরা'-তে পালামৌয়ের কথা পড়ে ভাবতেন যে এটি সাহেবদের দ্বারা পরিপূর্ণ একটি সুখের ও প্রবল শহর। কিন্তু রাঁচি থেকে পালামৌ যাত্রার সময় তিনি জানতে পারেন, পালামৌ কোনো শহর বা নগর নয়, এমনকী গণ্ডগ্রামও নয়; এটি পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা একটি বিশাল পরগনা মাত্র। দূর থেকে পালামৌকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল যেন মর্ত্যে মেঘ করেছে। আরও কাছে গেলে তামার রঙের মতো জঙ্গল ও নিবিড় অরণ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পাহাড়ের বৈচিত্র্য ও প্রতিধ্বনি: পালামৌতে অসংখ্য পাহাড় নদীর তরঙ্গের মতো অবস্থান করছে। লাতেহার গ্রামের কাছে একটি অর্ধপাহাড় ছিল, যার মাটিতে স্তরে স্তরে নুড়ি ও কালো পাথর দেখা যেত। একদিন লেখকের পোষা ফরাসিস কুকুর (poodle) তাঁবুতে চলে গেলে, লেখক চিৎকার করে ডাকেন। তখন তিনি লক্ষ করেন যে, তাঁর চিৎকার পাহাড়ের নির্দিষ্ট পাথরের স্তরে লেগে অত্যাশ্চর্যভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে পাথরের স্তরগুলি শব্দ পরিবাহী (sound conductor)। এছাড়া একটি একশিলা বা নিরেট পাথরের পাহাড়ে ফাটলের মধ্যে একটি অশ্বত্থ গাছ জন্মাতে দেখে লেখক প্রথমে তাকে 'শোষক' ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি বোঝেন যে গাছটি তার কঠিন পাষাণের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

জঙ্গলের রূপ ও কোলবালক: পালামৌয়ের জঙ্গলে ঢোকার পর লেখক দেখেন, সেখানকার শাল গাছগুলি কাব্যের বর্ণনার মতো বিশাল নয়, বরং দেশি কদম্ব গাছের মতোই ছোটো। জঙ্গলের মধ্যে গৃহপালিত পশুদের গলায় বাঁধা 'কাষ্ঠঘণ্টা' বা কাঠের ঘণ্টার শব্দ শুনে লেখকের মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায়। এরপর তিনি একটি পরিষ্কার প্রান্তরে পৌঁছান, যেখানে কিছু কৃষ্ণবর্ণের কোলবালক মহিষ চরাচ্ছিল। তাদের গলায় পুঁতির সাতনরী হার, ধুকধুকির বদলে গোল আয়না, কানে বনফুল এবং পরনে ধড়া ছিল। কেউ মহিষের পিঠে শুয়ে, কেউ বা নেচে নেচে মহিষ চরাচ্ছিল। তাদের এই সরল ও অপরূপ সাজ দেখে লেখকের মনে হয়েছিল যেন তারা একেকজন 'কৃষ্ণঠাকুর'।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
হরকরাসেকালের একটি ইংরেজি পত্রিকা / বার্তাবাহকতাম্রাভতামার মতো লালচে রং যার
গণ্ডগ্রামবড়ো গ্রাম বা বর্ধিষ্ণু গ্রামকর্ষিতচাষ করা হয়েছে এমন
আহ্লাদআনন্দ / খুশিঅবনীর অন্তরাগ্নিপৃথিবীর ভেতরের বা গর্ভের আগুন
অবতরণপালকি বা গাড়ি থেকে নীচে নামাএকশিলাএকটিমাত্র পাথর বা শিলা দিয়ে তৈরি
নেমোকহারামঅকৃতজ্ঞ / বেইমানকাষ্ঠঘণ্টাপশুর গলায় বাঁধা কাঠের তৈরি ঘণ্টা
সাতনরীসাত লহরি হার / সাতটি সুতোয় গাঁথা হারধুকধুকিগলার লকেট বা পদক
প্রান্তরবিস্তীর্ণ খোলা মাঠকান্তিসৌন্দর্য / দীপ্তি / শরীরের রং

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'পালামৌ' রচনার রচয়িতা কে?
(ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (খ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (গ) সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (ঘ) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তর: (গ) সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২. লেখক সেকালের কোন্ ইংরেজি পত্রিকায় পালামৌয়ের কথা পড়তেন?
(ক) স্টেটসম্যান (খ) হরকরা (গ) ইংলিশম্যান (ঘ) ক্যালকাটা গেজেট
উত্তর: (খ) হরকরা
৩. লেখক আগে পালামৌকে কী মনে করতেন?
(ক) দুর্গম জঙ্গল (খ) প্রবল শহর (গ) একটি দ্বীপ (ঘ) গণ্ডগ্রাম
উত্তর: (খ) প্রবল শহর
৪. পালামৌ আসলে কী?
(ক) একটি পরগনা (খ) একটি জেলা (গ) একটি মহকুমা (ঘ) একটি প্রদেশ
উত্তর: (ক) একটি পরগনা
৫. লেখক কোথা থেকে পালামৌ যাচ্ছিলেন?
(ক) কলকাতা থেকে (খ) পাটনা থেকে (গ) হাজারিবাগ থেকে (ঘ) রাঁচি থেকে
উত্তর: (ঘ) রাঁচি থেকে
৬. দূর থেকে পালামৌকে দেখে লেখকের কী মনে হয়েছিল?
(ক) সমুদ্রের ঢেউ (খ) মর্ত্যে মেঘ করেছে (গ) বিশাল প্রাচীর (ঘ) সবুজ গালিচা
উত্তর: (খ) মর্ত্যে মেঘ করেছে
৭. আর একটু অগ্রসর হওয়ার পর জঙ্গলকে কেমন রঙের দেখাচ্ছিল?
(ক) শ্যামল (খ) নীলাভ (গ) তাম্রাভ (ঘ) পীতাভ
উত্তর: (গ) তাম্রাভ
৮. পালামৌয়ের অসংখ্য পাহাড়কে লেখক কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
(ক) মেঘের স্তর (খ) বিচলিত নদীর তরঙ্গ (গ) মাটির ঢিবি (ঘ) সাপের গতি
উত্তর: (খ) বিচলিত নদীর তরঙ্গ
৯. অর্ধপাহাড়টি কোন্ গ্রামের পাশে অবস্থিত ছিল?
(ক) লাতেহার (খ) ডালটনগঞ্জ (গ) হাজারিবাগ (ঘ) নেতারহাট
উত্তর: (ক) লাতেহার
১০. লেখকের পোষা কুকুরটি কোন্ জাতের ছিল?
(ক) বুলডগ (খ) ফরাসিস কুকুর (poodle) (গ) গ্রে-হাউন্ড (ঘ) দেশি
উত্তর: (খ) ফরাসিস কুকুর (poodle)
১১. একশিলা পাহাড়ের ফাটলে কিসের গাছ জন্মেছিল?
(ক) বটগাছ (খ) অশ্বত্থ গাছ (গ) শাল গাছ (ঘ) মহুয়া গাছ
উত্তর: (খ) অশ্বত্থ গাছ
১২. বনবর্ণনায় কবিরা কোন্ গাছের কথা বললেও লেখক তা দেখতে পাননি?
(ক) শাল-পলাশ (খ) তাল-হিন্তাল (গ) আম-কাঁঠাল (ঘ) সেগুন-অশ্বত্থ
উত্তর: (খ) তাল-হিন্তাল
১৩. পালামৌয়ের শালগাছগুলো আমাদের দেশের কোন্ গাছের মতো দেখতে?
(ক) বটগাছ (খ) শিরীষ গাছ (গ) কদম্ব বৃক্ষ (ঘ) নিম গাছ
উত্তর: (গ) কদম্ব বৃক্ষ
১৪. জঙ্গলে হঠাৎ কিসের বিষণ্ণকর শব্দ শোনা গিয়েছিল?
(ক) ঢাকের (খ) মাদলের (গ) কাষ্ঠঘণ্টার (ঘ) পাখির
উত্তর: (গ) কাষ্ঠঘণ্টার
১৫. গৃহপালিত পশুর গলায় কাষ্ঠঘণ্টা কেন বাঁধা হয়?
(ক) সাজানোর জন্য (খ) পথ হারালে শব্দ শুনে খোঁজার জন্য (গ) বাঘ তাড়াতে (ঘ) অভ্যাসবশত
উত্তর: (খ) পথ হারালে শব্দ শুনে খোঁজার জন্য
১৬. গলায় কাষ্ঠঘণ্টা ঝুলিয়ে লেখকের পালকির দিকে কে তাকিয়েছিল?
(ক) গোরু (খ) ছাগল (গ) হরিণ (ঘ) মহিষ
উত্তর: (ঘ) মহিষ
১৭. ক্ষুদ্র প্রান্তরে কারা মহিষ চরাচ্ছিল?
(ক) সাঁওতালরা (খ) মুন্ডারা (গ) কোলবালকেরা (ঘ) ভিলরা
উত্তর: (গ) কোলবালকেরা
১৮. কোলবালকদের গলায় কীসের হার ছিল?
(ক) সোনার হার (খ) রুপোর চেইন (গ) পুঁতির সাতনরী (ঘ) ফুলের মালা
উত্তর: (গ) পুঁতির সাতনরী
১৯. কোলবালকেরা ধুকধুকি বা লকেটের পরিবর্তে কী পরেছিল?
(ক) পাথর (খ) গোল আরসি (আয়না) (গ) কড়ি (ঘ) পয়সা
উত্তর: (খ) গোল আরসি (আয়না)
২০. কোলবালকদের অপরূপ রূপ দেখে লেখকের কাকে মনে পড়েছিল?
(ক) শিবঠাকুরকে (খ) রামচন্দ্রকে (গ) কৃষ্ণঠাকুরকে (ঘ) কার্তিককে
উত্তর: (গ) কৃষ্ণঠাকুরকে

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. পালামৌ সম্পর্কে লেখক আগে কী ধারণা পোষণ করতেন?
উত্তর: ইংরেজি পত্রিকা 'হরকরা'-তে পালামৌয়ের বর্ণনা পড়ে লেখক আগে ভাবতেন যে, পালামৌ হলো সাহেবদের দ্বারা সমাকীর্ণ একটি প্রবল শহর বা সুখের স্থান।
২. বাস্তবে পালামৌ কেমন জায়গা ছিল?
উত্তর: বাস্তবে পালামৌ কোনো শহর বা গণ্ডগ্রাম ছিল না; এটি ছিল পাহাড় এবং দুর্গম জঙ্গলে পরিপূর্ণ একটি প্রকাণ্ড পরগনা মাত্র।
৩. 'মর্ত্যে মেঘ করিয়াছে' - লেখকের এমন মনে হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: রাঁচি থেকে পালামৌ যাওয়ার পথে দূর থেকে পালামৌয়ের অগণিত সবুজ পাহাড় ও জঙ্গলকে দেখে লেখকের মনে হয়েছিল যেন মর্ত্যলোকে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে।
৪. আর একটু অগ্রসর হওয়ার পর জঙ্গলকে কেমন দেখাচ্ছিল?
উত্তর: দূর থেকে মেঘের মতো মনে হলেও, চার-পাঁচ ক্রোশ অগ্রসর হওয়ার পর মেঘের ভ্রম কেটে যায় এবং জঙ্গলটিকে তাম্রাভ বা তামার মতো রঙের অরণ্য বলে মনে হতে থাকে।
৫. পালামৌ পরগনার পাহাড়গুলিকে লেখক কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: পালামৌ পরগনার অসংখ্য পাহাড়ের পর পাহাড় দেখে লেখকের মনে হয়েছিল যেন সেগুলি কোনো বিচলিত নদীর অসংখ্য তরঙ্গের মতো।
৬. লাতেহার গ্রামের পাশের অর্ধপাহাড়টির বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর: লাতেহার গ্রামের পাশের অর্ধপাহাড়টির পশ্চিম ভাগে কোনো মাটি ছিল না। ফলে পাহাড়ের ভিতরের স্তরগুলি—যেমন এক স্তরে নুড়ি, অন্য স্তরে কালো পাথর—খুব স্পষ্টভাবে দেখা যেত।
৭. পাহাড়ের গায়ে শব্দের প্রতিধ্বনি সম্পর্কে লেখক কী অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন?
উত্তর: কুকুরকে ডাকার সময় লেখক লক্ষ করেন যে, তাঁর চিৎকার পাহাড়ের নির্দিষ্ট পাথরের স্তরে লেগে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এবং স্তর উঁচু-নিচু হওয়ার সাথে সাথে শব্দও ওঠানামা করছে। অর্থাৎ পাথরের স্তরটি শব্দ পরিবাহীর কাজ করছিল।
৮. একশিলা পাহাড়টিতে জন্মানো অশ্বত্থ গাছটিকে লেখকের প্রথমে কী মনে হয়েছিল?
উত্তর: নিরেট পাথরের ফাটলে জন্মানো অশ্বত্থ গাছটিকে দেখে প্রথমে লেখকের মনে হয়েছিল যে গাছটি বড়ো 'শোষক', কারণ সে নীরস পাষাণ থেকেও রস সংগ্রহ করে বেঁচে আছে।
৯. অশ্বত্থ গাছটি সম্পর্কে পরে লেখকের কী ধারণা হয়েছিল?
উত্তর: পরে লেখকের মনে হয় যে গাছটি কোনো শোষক নয়, বরং সে তার কঠিন পাষাণের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। তাই লেখক পরে গাছটির প্রশংসা করেন।
১০. পালামৌয়ের জঙ্গলের শালগাছগুলি কেমন ছিল?
উত্তর: পালামৌয়ের শালগাছগুলি প্রকাণ্ড বা বিশাল আকারের ছিল না, বরং সেগুলির সবকটিই আমাদের দেশের সাধারণ কদম্ব বা কদম গাছের মতো আকৃতির ছিল।
১১. কাষ্ঠঘণ্টার উৎপত্তি কেন হয়েছে?
উত্তর: জঙ্গলে চড়তে গিয়ে গৃহপালিত পশুরা অনেক সময় পথ হারিয়ে ফেলে। তারা পথ হারালে যাতে ঘণ্টার শব্দ অনুসরণ করে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়, সেজন্যই কাষ্ঠঘণ্টার উৎপত্তি হয়েছে।
১২. কাষ্ঠঘণ্টার শব্দ শুনে লেখকের কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
উত্তর: দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলের মধ্যে পশুর গলার কাষ্ঠঘণ্টার একটানা শব্দ শুনে লেখকের প্রাণের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল এবং মন অবসন্ন ও বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল।
১৩. কোলবালকদের গায়ের রং ও কান্তি কেমন ছিল?
উত্তর: মহিষ চরানো কোলবালকদের গায়ের রং ছিল অত্যন্ত কালো বা কৃষ্ণবর্ণ, কিন্তু সেই কালো রঙের মধ্যেই এমন এক অপরূপ সৌন্দর্য বা কান্তি ছিল, যা লেখক আগে কখনো দেখেননি।
১৪. কোলবালকদের অলংকার বা সাজসজ্জা কেমন ছিল?
উত্তর: কোলবালকদের গলায় ছিল পুঁতির সাতনরী হার, ধুকধুকির বদলে ছিল গোল আরসি বা আয়না, কানে ছিল বনফুল এবং পরনে ছিল ধড়া।
১৫. কোলবালকদের দেখে লেখকের 'কৃষ্ণঠাকুর' মনে হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: কোলবালকদের অপরূপ কৃষ্ণবর্ণ কান্তি, গলায় হার, কানে বনফুলের সাজ এবং মাঠে মহিষ চরানো ও নৃত্যরত ভঙ্গি দেখে লেখকের পৌরাণিক রাখাল বালক 'কৃষ্ণঠাকুর'-এর কথা মনে পড়েছিল।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. রাঁচি থেকে পালামৌ যাত্রাপথে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'পালামৌ' একটি অনবদ্য ভ্রমণকাহিনি। রাঁচি থেকে পালকিতে চড়ে পালামৌ যাওয়ার সময় প্রকৃতির রূপ ও রঙের যে মায়াময় পরিবর্তন লেখকের চোখে ধরা পড়েছিল, তার বর্ণনা অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

যাত্রা শুরু করে দূর থেকে যখন লেখক প্রথম পালামৌয়ের পাহাড়শ্রেণি দেখেন, তখন তাঁর মনে হয়েছিল যেন মর্ত্যলোকে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। সেই অন্ধকার মেঘের মতো জঙ্গলে প্রবেশ করার তীব্র আনন্দে তিনি অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। চার-পাঁচ ক্রোশ কাছে আসার পর মেঘের ভ্রম কেটে যায় এবং পাহাড়গুলো স্পষ্ট হতে থাকে। আরও দু-এক ক্রোশ এগিয়ে যাওয়ার পর পাহাড়ের গায়ের অরণ্যকে তামার মতো বা 'তাম্রাভ' রঙের মনে হতে থাকে।
অবশেষে যখন তিনি একদম কাছাকাছি পৌঁছান, তখন দেখেন যে সেখানে কোনো চাষের খেত নেই, গ্রাম নেই, নদী বা পথ নেই—সর্বত্র শুধু নিবিড় ঘন বনের সমাহার। এরপর পালামৌয়ে প্রবেশ করে তিনি দেখেন, অসংখ্য পাহাড় পরপর সাজানো রয়েছে, যা দেখতে বিচলিত বা বিক্ষুব্ধ নদীর ঢেউয়ের মতো। প্রকৃতির এই মেঘ থেকে তাম্রাভ অরণ্য এবং পরিশেষে নদীর তরঙ্গের মতো পাহাড়ের রূপ পরিবর্তন লেখকের এই যাত্রাকে এক মায়াময় রূপ দান করেছিল।

২. লাতেহার গ্রামের পাশের পাহাড় এবং সেখানে প্রতিধ্বনির বিষয়ে লেখকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করো।

উত্তর: 'পালামৌ' ভ্রমণকাহিনিতে লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লাতেহার গ্রামের পাশে অবস্থিত একটি অদ্ভুত 'অর্ধপাহাড়'-এর কথা বলেছেন।

পাহাড়ের বর্ণনা: এই পাহাড়টির পশ্চিম ভাগে কোনো মাটি ছিল না। ফলে পাহাড়টির ভেতরের সমস্ত পাথরের স্তরগুলি খুব স্পষ্টভাবে দেখা যেত। লেখক লক্ষ করেন, পাহাড়টি সমান্তরাল নয়; এর এক স্তরে রয়েছে নুড়ি পাথর এবং অন্য স্তরে রয়েছে কালো পাথর। স্তরগুলি কোথাও উঁচু হয়ে উঠেছে আবার কোথাও নীচু হয়ে নেমেছে।

প্রতিধ্বনির অভিজ্ঞতা: একদিন বিকেলে এই পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে থাকার সময় লেখকের পোষা ফরাসি কুকুরটি অবাধ্য হয়ে তাঁবুতে চলে যায়। লেখক রেগে গিয়ে কুকুরটিকে ডাক দেওয়ার জন্য চিৎকার করেন। তখন তিনি লক্ষ করেন যে, তাঁর গলার স্বর পাহাড়ের গায়ে লেগে অত্যাশ্চর্যভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি আরও লক্ষ করেন যে, পাহাড়ের পাথরের স্তরটি যেখানে উঠেছে বা নেমেছে, তাঁর চিৎকারের প্রতিধ্বনিও সেই স্তরের গা বেয়ে ঠিক একইভাবে ওঠানামা করছে। এই ঘটনা থেকে লেখক বুঝতে পারেন যে, পাহাড়ের ওই নির্দিষ্ট পাথরের স্তরটি আসলে একটি 'সাউন্ড কন্ডাক্টর' বা শব্দ পরিবাহী হিসেবে কাজ করছে, যা শব্দকে অনেক দূর পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যায়।

৩. একশিলা পাহাড়ে জন্মানো অশ্বত্থ গাছটিকে নিয়ে লেখকের চিন্তাভাবনার বিবর্তন আলোচনা করো।

উত্তর: 'পালামৌ' রচনায় লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পাহাড় ও প্রকৃতির খুঁটিনাটি খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। পালামৌয়ে তিনি এমন একটি পাহাড় দেখেছিলেন যা ছিল একশিলা, অর্থাৎ একটিমাত্র নিরেট পাথর দিয়ে তৈরি। সেই পাহাড়ে মাটি বা রসের কোনো চিহ্নমাত্র ছিল না। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, সেই নিরেট পাথরের একটি ফাটলের মধ্যে বিশাল একটি অশ্বত্থ গাছ জন্মেছিল।

প্রাথমিক ধারণা: গাছটিকে প্রথম দেখে লেখকের মনে হয়েছিল যে অশ্বত্থ গাছটি বড়োই রসিক ও 'শোষক'। এত কঠিন ও নীরস পাষাণ থেকেও সে জোর করে রস টেনে নিচ্ছে। পাষাণও যেন এই শোষক গাছটির হাত থেকে নিস্তার পায়নি।

চিন্তার বিবর্তন: কিন্তু কিছুদিন পর যখন গাছটির কথা লেখকের আবার মনে পড়ে, তখন তাঁর চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে। তিনি বুঝতে পারেন যে, সব গাছ তো আর বাংলার নরম ও রসালো মাটিতে জন্মানোর সুযোগ পায় না। অশ্বত্থ গাছটির ভাগ্যে জুটেছে কঠিন পাষাণ। সে শোষক নয়, বরং সে তার কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার অদম্য সংগ্রাম করে চলেছে। কঠিন পাষাণই তার একমাত্র অবলম্বন। এই সত্য উপলব্ধি করার পর লেখক গাছটিকে শোষক ভাবার পরিবর্তে তার জীবনীশক্তির গভীর প্রশংসা করেছেন।

৪. পালামৌয়ের বনভূমির বৈশিষ্ট্য এবং সেখানে কাষ্ঠঘণ্টার শব্দ শুনে লেখকের অনুভূতির বিবরণ দাও।

উত্তর: বনভূমির বৈশিষ্ট্য: পালামৌয়ের অরণ্যে প্রবেশ করে লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেখেছিলেন যে, সেখানকার বন অত্যন্ত দুর্গম এবং নিবিড়। সংকীর্ণ গরুর পথ বা 'গো-পথ' দিয়ে পালকিতে যাওয়ার সময় রাস্তার দু-পাশের লতাপাতা পালকি স্পর্শ করছিল। কাব্যে বর্ণিত 'শাল তাল তমাল হিন্তাল'-এর মতো বৈচিত্র্য সেখানে ছিল না, তাল বা হিন্তাল গাছ একেবারেই ছিল না। বনটি মূলত শাল গাছে ভরা ছিল, তবে শালগাছগুলি বিশাল আকারের ছিল না, বরং আমাদের দেশের সাধারণ কদম্ব বা কদম গাছের মতোই ছোটো ছিল। তবুও বনটি ছিল এতটাই ঘন ও ছেদহীন যে তা ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল।

কাষ্ঠঘণ্টার শব্দ ও অনুভূতি: এইরকম এক দুর্গম বনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় লেখক হঠাৎ একটি বিষণ্ণকর শব্দ শুনতে পান। শব্দটির নাম 'কাষ্ঠঘণ্টা'। গৃহপালিত পশু বনে পথ হারালে যাতে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়, সেজন্যই পশুর গলায় কাঠের এই ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া হতো। পালামৌয়ের সেই বিশাল, নিস্তব্ধ এবং দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলের পরিবেশে ওই কাঠের ঘণ্টার একটানা শব্দ শুনে লেখকের প্রাণের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল। বনের একাকিত্বের মাঝে ওই শব্দ লেখকের মনকে গভীরভাবে অবসন্ন ও বিষণ্ণ করে তুলেছিল।

৫. 'পালামৌ' রচনায় কোলবালকদের যে রূপ ও সাজসজ্জার বর্ণনা আছে তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পালামৌ' রচনায় প্রকৃতি ও মানুষের এক সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে। বনের মধ্যে যেতে যেতে লেখক একটি পরিষ্কার ও রম্য প্রান্তরে পৌঁছান, যেখানে কয়েকটি কৃষ্ণবর্ণের কোলবালক মহিষ চরাচ্ছিল। এই কোলবালকদের রূপ ও সাজসজ্জা লেখককে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল।

রূপের বর্ণনা: কোলবালকদের গায়ের রং ছিল অত্যন্ত কালো। কিন্তু লেখকের মতে, সেই কুচকুচে কালো রঙের মধ্যেই এমন এক অপরূপ দীপ্তি বা 'কৃষ্ণবর্ণ কান্তি' লুকিয়ে ছিল, যা তিনি জীবনে আর কখনও দেখেননি। তাদের কালো রঙের মধ্যেও যেন এক মোহময় সৌন্দর্য ছিল।

সাজসজ্জা ও ভঙ্গি: তাদের সাজসজ্জাও ছিল প্রকৃতিঘেঁষা ও অদ্ভুত সুন্দর। প্রত্যেকের গলায় ছিল পুঁতির সাতনরী হার। বুকের ওপর লকেটের বা ধুকধুকির পরিবর্তে তারা এক একখানি গোল আরসি বা আয়না ঝুলিয়ে রেখেছিল। কানে গুঁজে রেখেছিল বুনো ফুল এবং পরনে ছিল ধড়া বা ছোটো কাপড়। মহিষ চরানোর সময় কেউ মহিষের পিঠে শুয়ে ছিল, কেউ বসে ছিল, আবার কেউ বা আনন্দে নাচছিল। অরণ্যের প্রেক্ষাপটে তাদের এই কালো রূপ, সরল সাজ এবং খেলাধুলার ভঙ্গি দেখে লেখকের মনে হয়েছিল যেন তারা একেকজন পৌরাণিক 'কৃষ্ণঠাকুর'।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • অত্যাশ্চর্য = অতি + আশ্চর্য
  • পরিষ্কার = পরিঃ + কার
  • ইত্যাদি = ইতি + আদি
  • নিস্তার = নিঃ + তার
  • আবিষ্কার = আবিঃ + কার

সমাস নির্ণয়

  • গণ্ডগ্রাম: গণ্ড যে গ্রাম (সাধারণ কর্মধারয় সমাস)
  • নেমোকহারাম: নেমোক হারাম করে যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)
  • কাষ্ঠঘণ্টা: কাষ্ঠ নির্মিত ঘণ্টা (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)
  • বনফুল: বনের ফুল (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • কৃষ্ণবর্ণ: কৃষ্ণের ন্যায় বর্ণ (উপমান কর্মধারয় সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • জঙ্গল ➜ জংলি
  • পাহাড় ➜ পাহাড়ি
  • পরিষ্কার ➜ পরিষ্কৃত
  • রস ➜ রসিক
  • নগর ➜ নাগরিক

পালামৌ প্রবন্ধ সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই রচনাটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। এটি মূলত একটি শিক্ষামূলক ও প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণকাহিনি, যেখানে লেখকের পালামৌ যাত্রার অপূর্ব অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে।

কাষ্ঠঘণ্টা হলো পশুর গলায় বাঁধার জন্য কাঠের তৈরি একপ্রকার ঘণ্টা। গৃহপালিত পশু গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেললে, এই ঘণ্টার শব্দ শুনে যাতে তাদের সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, সেজন্যই এটি ব্যবহৃত হতো।

মহিষ চরানো কোলবালকদের গলায় ছিল পুঁতির সাতনরী হার, বুকে ছিল লকেটের বদলে গোল আরসি (আয়না), কানে বনফুল এবং পরনে ছিল ধড়া বা ছোটো কাপড়। তাদের এই অপরূপ সাজ দেখে লেখকের 'কৃষ্ণঠাকুর'-এর কথা মনে পড়েছিল।