জন্মভূমি আজ (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

বিখ্যাত আধুনিক কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'জন্মভূমি আজ' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত আধুনিক যুগের বিশিষ্ট কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'জন্মভূমি আজ' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ ও মূলভাব

স্বদেশের সংকটময় অবস্থা: কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'জন্মভূমি আজ' কবিতাটি সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের এক মর্মস্পর্শী দলিল। কবিতার শুরুতেই কবি পাঠককে মাটি এবং মানুষের দিকে তাকাতে বলেছেন। দেশজুড়ে এক গভীর সংকট চলছে, তাই কবি বলেছেন যে 'এখনও রাত শেষ হয়নি'। মানুষের বুকের ওপর অন্ধকার যেন এক কঠিন পাথরের মতো চেপে আছে, যার ভারে মানুষ স্বাধীনভাবে নিশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছে না। মাথার ওপরের কালো আকাশকে কবি বাঘের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা থাবা উঁচিয়ে মানুষকে আক্রমণ করতে প্রস্তুত।

প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের আহ্বান: এই ভয়ংকর অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ না করে কবি মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বুকের ওপরের সেই জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে দিয়ে, আকাশের ভয়ংকরকে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় জানিয়ে দিতে হবে যে—"তুমি ভয় পাওনি"। অর্থাৎ শোষক ও অশুভ শক্তির সামনে মাথা নত না করে নির্ভীক চিত্তে প্রতিবাদ করতে হবে।

সৃজনশীলতা ও ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা: কবি সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যদি সৃষ্টিশীল কাজ বা 'ফসল ফলাতে' না জানে এবং 'বৃষ্টি আনার মন্ত্র' অর্থাৎ নতুন কিছু গড়ার ক্ষমতা ভুলে যায়, তবে দেশের মাটি আগুনের মতো উত্তপ্ত হবে এবং স্বদেশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। যে মানুষের নিজের কণ্ঠস্বর বা 'গান গাইতে' জানার ক্ষমতা নেই, সংকটের সময় (প্রলয়) সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়। তাই কবি সবশেষে জন্মভূমির মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন, যে মাটি নতুন সৃষ্টির প্রতীক্ষায় আছে। আর সেই সঙ্গে তিনি একে অপরের 'হাত ধরতে' বলেছেন, কারণ বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো আজ এক হয়ে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের ভাষায় কিছু বলতে চায়।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
জন্মভূমিমাতৃভূমি / স্বদেশমরুভূমিবালুকাময় ও রুক্ষ প্রান্তর
কঠিনশক্ত / নিরেট / যা ভাঙা যায় নাপ্রলয়ধ্বংস / মহাবিপদ / বিপর্যয়
থাবা উঁচিয়েআক্রমণ করার ভঙ্গিতেপ্রতীক্ষাঅপেক্ষা / আশাপথ চেয়ে থাকা
ভয়ংকরভীষণ / ভীতিকরবোবাযে কথা বলতে পারে না / বাকশক্তিহীন
ফসল ফলানোনতুন সৃষ্টি করা / কৃষিকাজঅন্ধকারআঁধার (শোষণ ও পরাধীনতার প্রতীক)
মন্ত্রজাদুকরী শব্দ / পদ্ধতি বা গুপ্তবিদ্যাস্বদেশনিজের দেশ

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'জন্মভূমি আজ' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (গ) শঙ্খ ঘোষ (ঘ) সুভাষ মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (খ) বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২. কবি প্রথমে কীসের দিকে তাকাতে বলেছেন?
(ক) আকাশের দিকে (খ) নদীর দিকে (গ) মাটির দিকে (ঘ) পাহাড়ের দিকে
উত্তর: (গ) মাটির দিকে
৩. মাটির পর কবি আর কার দিকে তাকাতে বলেছেন?
(ক) মানুষের দিকে (খ) ভবিষ্যতের দিকে (গ) সমাজের দিকে (ঘ) পাখির দিকে
উত্তর: (ক) মানুষের দিকে
৪. "এখনও কী শেষ হয়নি?"
(ক) দিন (খ) রাত (গ) বছর (ঘ) খেলা
উত্তর: (খ) রাত
৫. বুকের ওপর কী চেপে বসে আছে?
(ক) পাথর (খ) ভয় (গ) অন্ধকার (ঘ) দুঃখ
উত্তর: (গ) অন্ধকার
৬. অন্ধকারকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
(ক) কালো পাহাড়ের (খ) কঠিন পাথরের (গ) বিশাল মেঘের (ঘ) গভীর নদীর
উত্তর: (খ) কঠিন পাথরের
৭. কঠিন পাথরের মতো অন্ধকার থাকায় কী হচ্ছে?
(ক) হাঁটতে পারছে না (খ) দেখতে পারছে না (গ) নিশ্বাস নিতে পারছে না (ঘ) ঘুমাতে পারছে না
উত্তর: (গ) নিশ্বাস নিতে পারছে না
৮. মাথার ওপরের আকাশ কেমন?
(ক) নীল আকাশ (খ) মেঘলা আকাশ (গ) ভয়ংকর কালো আকাশ (ঘ) ঝকঝকে আকাশ
উত্তর: (গ) ভয়ংকর কালো আকাশ
৯. কালো আকাশ কিসের মতো থাবা উঁচিয়ে আছে?
(ক) সিংহের মতো (খ) কুকুরের মতো (গ) শকুনের মতো (ঘ) বাঘের মতো
উত্তর: (ঘ) বাঘের মতো
১০. কবি পাথরটাকে কী করতে বলেছেন?
(ক) ভেঙে ফেলতে (খ) সরিয়ে দিতে (গ) তুলে নিতে (ঘ) রঙ করতে
উত্তর: (খ) সরিয়ে দিতে
১১. আকাশের ভয়ংকরকে কীভাবে কথাটি জানাতে বলা হয়েছে?
(ক) রাগী গলায় (খ) শান্ত গলায় (গ) ভয়ার্ত গলায় (ঘ) চিৎকার করে
উত্তর: (খ) শান্ত গলায়
১২. আকাশের ভয়ংকরকে কী জানাতে হবে?
(ক) আমি হেরে গেছি (খ) তুমি ভয় পাওনি (গ) আমি ফিরে যাব (ঘ) আমি কাঁদছি না
উত্তর: (খ) তুমি ভয় পাওনি
১৩. মাটি তো কিসের মতো হবেই?
(ক) বরফের মতো (খ) আগুনের মতো (গ) পাথরের মতো (ঘ) মরুভূমির মতো
উত্তর: (খ) আগুনের মতো
১৪. মাটি আগুনের মতো হবে কখন?
(ক) যদি ফসল ফলাতে না জানো (খ) যদি রোদ ওঠে (গ) যদি বৃষ্টি না হয় (ঘ) যদি নদী শুকিয়ে যায়
উত্তর: (ক) যদি ফসল ফলাতে না জানো
১৫. কীসের মন্ত্র ভুলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে?
(ক) ফসল বোনার (খ) শান্তি আনার (গ) বৃষ্টি আনার (ঘ) রোগ সারানোর
উত্তর: (গ) বৃষ্টি আনার
১৬. বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে গেলে স্বদেশ কী হবে?
(ক) মরুভূমি (খ) প্রান্তর (গ) মহাশ্মশান (ঘ) ধ্বংসস্তূপ
উত্তর: (ক) মরুভূমি
১৭. যে মানুষ গান গাইতে জানে না, প্রলয় এলে তার কী হয়?
(ক) সে পালিয়ে যায় (খ) সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায় (গ) সে বধির হয়ে যায় (ঘ) সে পাগল হয়ে যায়
উত্তর: (খ) সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়
১৮. কে প্রতীক্ষা করছে?
(ক) আকাশ (খ) মানুষ (গ) মাটি (ঘ) নদী
উত্তর: (গ) মাটি
১৯. কবি কার হাত ধরতে বলেছেন?
(ক) বন্ধুর (খ) মানুষের (গ) ভাইয়ের (ঘ) পিতার
উত্তর: (খ) মানুষের
২০. মানুষ কী করতে চায়?
(ক) গান গাইতে চায় (খ) যুদ্ধ করতে চায় (গ) কিছু বলতে চায় (ঘ) কাঁদতে চায়
উত্তর: (গ) কিছু বলতে চায়

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. কবি কাদের দিকে তাকাতে বলেছেন?
উত্তর: কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হতাশ হয়ে না পড়ে জন্মভূমির মূল শক্তি মাটি এবং মানুষের দিকে তাকাতে বলেছেন।
২. 'এখনও রাত শেষ হয়নি' - বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'রাত' বলতে এখানে দেশের সামাজিক বা রাজনৈতিক সংকট, দুর্দশা এবং অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে। সেই দুঃসময় যে এখনও কাটেনি, তা বোঝাতেই এ কথা বলা হয়েছে।
৩. বুকের ওপর অন্ধকারকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: বুকের ওপর চেপে থাকা অন্ধকারকে কবি একটি বিশাল ও 'কঠিন পাথরের' সঙ্গে তুলনা করেছেন।
৪. নিশ্বাস নিতে না পারার কারণ কী?
উত্তর: শোষণের ও বিপদের অন্ধকার একটি কঠিন পাথরের মতো মানুষের বুকের ওপর চেপে বসে আছে, যার ভারে মানুষের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে এবং তারা স্বাধীনভাবে নিশ্বাস নিতে পারছে না।
৫. মাথার ওপরের কালো আকাশকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কেন?
উত্তর: বাঘ যেমন থাবা উঁচিয়ে শিকারের ওপর আক্রমণ করতে আসে, তেমনি দেশের মাথার ওপরের কালো আকাশও যেন সর্বনাশা বিপদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত, তাই এই তুলনা।
৬. কবি পাথরটাকে কী করতে বলেছেন?
উত্তর: বুকের ওপর চেপে থাকা শোষণের কঠিন পাথরটাকে কবি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে যেভাবে হোক সরিয়ে দিতে বলেছেন।
৭. আকাশের ভয়ংকরকে শান্ত গলায় কী জানাতে হবে?
উত্তর: মাথার ওপরের ভয়ংকর কালো আকাশকে বা অশুভ শক্তিকে শান্ত ও দৃঢ় গলায় জানিয়ে দিতে হবে যে, "তুমি ভয় পাওনি"।
৮. মাটি কখন আগুনের মতো হবে?
উত্তর: মানুষ যদি তার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা ভুলে গিয়ে ফসল ফলাতে না জানে, তবে দেশের মাটি আগুনের মতো উত্তপ্ত ও রুক্ষ হয়ে উঠবে।
৯. 'ফসল ফলানো' বলতে এখানে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'ফসল ফলানো' বলতে এখানে আক্ষরিক কৃষিকাজের পাশাপাশি দেশের মানুষের সৃষ্টিশীল কাজ, কর্মোদ্যোগ বা নতুন কিছু গড়ার ক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে।
১০. স্বদেশ কখন মরুভূমি হয়ে যাবে?
উত্তর: মানুষ যদি শুষ্ক মাটিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনার বা 'বৃষ্টি আনার মন্ত্র' ভুলে যায়, তবে তার স্বদেশ ধীরে ধীরে রুক্ষ মরুভূমিতে পরিণত হবে।
১১. 'বৃষ্টি আনার মন্ত্র' কীসের প্রতীক?
উত্তর: 'বৃষ্টি আনার মন্ত্র' হলো মানুষের সৃজনশীলতা, সংঘবদ্ধতা এবং দেশের দুর্দিনে নতুন প্রাণ বা আশা ফিরিয়ে আনার শক্তির প্রতীক।
১২. প্রলয় এলে কারা বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়?
উত্তর: বিপদের সময় বা প্রলয় এলে যে মানুষ নিজের কণ্ঠে গান গাইতে বা প্রতিবাদ করতে জানে না, সে ভয় পেয়ে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।
১৩. 'গান গাওয়া' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: 'গান গাওয়া' বলতে শিল্প-সংস্কৃতির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা, ন্যায়ের পক্ষে প্রতিবাদ করা এবং বেঁচে থাকার জয়গান গাওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
১৪. কে প্রতীক্ষা করছে এবং কেন?
উত্তর: জন্মভূমির মাটি প্রতীক্ষা করছে, কারণ সে মানুষের দ্বারা সৃষ্ট নতুন ফসলের বা নতুন সৃষ্টির আশায় পথ চেয়ে আছে।
১৫. মানুষ কী চায়?
উত্তর: মানুষ একে অপরের হাত ধরতে চায় এবং এক হয়ে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের ভাষায় সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে কিছু বলতে চায়।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. "একবার মাটির দিকে তাকাও / একবার মানুষের দিকে।" - কবি কেন মাটি ও মানুষের দিকে তাকাতে বলেছেন?

উত্তর: কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'জন্মভূমি আজ' কবিতার শুরুতেই দেশবাসীকে মাটি এবং মানুষের দিকে তাকাতে বলেছেন। এর একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে।

যেকোনো দেশ বা জন্মভূমির মূল ভিত্তি হলো তার মাটি এবং সেই মাটিতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ। যখন দেশে গভীর সামাজিক বা রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় এবং মাথার ওপর দুর্যোগের কালো আকাশ ঘনিয়ে আসে, তখন মানুষ সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই হতাশা বা ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করলে চলবে না। কবি বলেছেন, বিপদের দিনে শেকড়ের কাছে ফিরে যেতে হবে।
দেশের মাটি অনুর্বর নয়, সে মানুষের কর্মের দ্বারা নতুন ফসল ফলানোর বা নতুন সৃষ্টির 'প্রতীক্ষা' করছে। অন্যদিকে, দেশের সাধারণ মানুষ যারা একা হয়ে ভয় পাচ্ছে, তারা একে অপরের হাত ধরে সংঘবদ্ধ হতে চায় এবং প্রতিবাদী কণ্ঠে কিছু 'বলতে' চায়। মাটি ও মানুষের এই অন্তর্নিহিত শক্তি ও ঐক্যের দিকে নজর দিলেই দেশের চরম অন্ধকার কাটানো সম্ভব, তাই কবি এই আহ্বান জানিয়েছেন।

২. "অন্ধকার এখনও তোমার বুকের ওপর / কঠিন পাথরের মতো..." - অন্ধকারের এই স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। কবি এই অন্ধকার থেকে মুক্তির কী উপায় বলেছেন?

উত্তর: অন্ধকারের স্বরূপ: কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সমকালীন দেশের পরিস্থিতিকে রাতের অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই অন্ধকার শুধু প্রাকৃতিক নয়, এটি হলো রাজনৈতিক শোষণ, পরাধীনতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং গভীর হতাশার প্রতীক। এই বিপদ এতটাই ভারী ও ভয়ংকর যে তা মানুষের বুকের ওপর একটি 'কঠিন পাথরের' মতো চেপে বসে আছে। মানুষের স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়ায় মানুষ আজ স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। মাথার ওপর কালো আকাশটাও বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে আক্রমণ করতে প্রস্তুত।

মুক্তির উপায়: এই চরম শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য কবি মানুষকে সাহসী হতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, বুকের ওপরের সেই জগদ্দল পাথরকে নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সরিয়ে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, মাথার ওপরের ভয়ংকর কালো আকাশ বা অশুভ শক্তিকে শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী গলায় জানিয়ে দিতে হবে যে—'তুমি ভয় পাওনি'। শোষকের চোখে চোখ রেখে ভয়কে জয় করার মাধ্যমেই এই অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

৩. "মাটি তো আগুনের মতো হবেই / যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো" - উক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি বিশিষ্ট আধুনিক কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'জন্মভূমি আজ' কবিতা থেকে গৃহীত।

অন্তর্নিহিত অর্থ: মাটি হলো সৃষ্টির আধার। কৃষক যখন তার নিজের শ্রমে মাটিতে বীজ বোনে, তখন সেই মাটি থেকে সোনালি ফসল জন্ম নেয়। কিন্তু যদি কেউ অলস হয়ে বসে থাকে এবং ফসল ফলাতে না জানে, তবে সেই মাটি রৌদ্রে পুড়ে আগুনের মতো উত্তপ্ত ও রুক্ষ হয়ে ওঠে।
রূপক অর্থে, 'ফসল ফলানো' হলো মানুষের সৃষ্টিশীলতা ও কর্মোদ্যোগ। সমাজ বা রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার দায়িত্ব মানুষেরই। মানুষ যদি তার দেশ গড়ার কাজে বা সৃজনশীল কাজে ব্যর্থ হয়, তবে দেশের মাটি আগুনের মতো উত্তপ্ত অর্থাৎ হানাহানি ও সংকটে ভরে উঠবে। একইভাবে মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বা প্রাণ সঞ্চারের 'বৃষ্টি আনার মন্ত্র' ভুলে যায়, তবে দেশ মরুভূমির মতো প্রাণহীন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ, মানুষের কর্মহীনতা এবং সৃজনশীলতার অভাবই যে দেশের দুর্গতির মূল কারণ, কবি সেই সত্যটিই এখানে বুঝিয়েছেন।

৪. "যে মানুষ গান গাইতে জানে না / যখন প্রলয় আসে সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।" - এই পঙ্‌ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'জন্মভূমি আজ' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: কবিতায় 'গান' হলো মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, আত্মপ্রকাশের মাধ্যম এবং প্রতিবাদের ভাষা। অন্যদিকে 'প্রলয়' হলো দেশের চরম রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকট ও ধ্বংসের সময়।
যে মানুষ শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা করে না, নিজের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে বা প্রতিবাদী কণ্ঠে 'গান গাইতে' জানে না, তার নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর থাকে না। যখন দেশে কোনো বড়ো ধরনের বিপদ বা 'প্রলয়' আসে, তখন এই মেরুদণ্ডহীন মানুষগুলো ভয়ে গুটিয়ে যায়। প্রতিবাদ করার বা সত্যকে দেখার ক্ষমতা তাদের থাকে না বলে তারা চোখ থাকতেও অন্ধ এবং মুখ থাকতেও বোবা হয়ে যায়। তাই কবি মনে করেন, দেশের ভয়ংকর বিপদের দিনে বোবা হয়ে না থেকে মানুষকে তার আত্মপ্রকাশ ও প্রতিবাদের গান গাইতে হবে।

৫. 'জন্মভূমি আজ' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল বিষয়বস্তু, সময়কাল এবং অন্তর্নিহিত আদর্শ পাঠকের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আলোচ্য কবিতাটির নাম 'জন্মভূমি আজ'।

সমগ্র কবিতাটি সমকালীন স্বদেশের রূঢ় বাস্তবতার এক অসামান্য দলিল। 'আজ' অর্থাৎ বর্তমান সময়ে জন্মভূমির অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। দেশের মাথার ওপর ভয়ংকর বাঘের মতো আকাশ থাবা উঁচিয়ে আছে এবং মানুষের বুকে পাথরের মতো অন্ধকার চেপে আছে। দেশের মানুষ শ্বাস নিতে পারছে না। কিন্তু এত বিপদের মধ্যেও কবি হতাশ নন। তিনি এই 'আজকের' জন্মভূমিকে বাঁচাতে মাটি ও মানুষের কাছেই ফিরে যেতে বলেছেন।
মানুষকে তার ভয় জয় করে পাথর সরিয়ে দিতে হবে। ফসল ফলানোর এবং বৃষ্টি আনার মন্ত্র দিয়ে এই মরুপ্রায় জন্মভূমিকে আবার সজীব করে তুলতে হবে। যেহেতু বর্তমান জন্মভূমির করুণ চিত্র এবং সেই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মানুষের করণীয় কর্তব্যের পথনির্দেশই কবিতার মূল সুর, তাই বলা যায় 'জন্মভূমি আজ' নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক, সময়োপযোগী ও অত্যন্ত ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • নিশ্বাস = নিঃ + শ্বাস
  • প্রলয় = প্র + লয়
  • অপেক্ষা = অপ + ঈক্ষা
  • আবিষ্কার = আবিঃ + কার
  • নীরব = নিঃ + রব

সমাস নির্ণয়

  • জন্মভূমি: জন্মের ভূমি (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • অন্ধকার: অন্ধ করে যে কার (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)
  • মরুভূমি: মরু নামক ভূমি (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)
  • কালোআকাশ: কালো যে আকাশ (কর্মধারয় সমাস)
  • ভয়ংকর: ভয়ংকর রূপ যার (বহুব্রীহি সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • জন্ম ➜ জাত
  • মানুষ ➜ মানসিক
  • পাথর ➜ পাথুরে
  • আকাশ ➜ আকাশী
  • ভয় ➜ ভীত

জন্মভূমি আজ কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি প্রখ্যাত আধুনিক কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। এর মূল বিষয়বস্তু হলো স্বদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষের প্রতি ঘুরে দাঁড়ানোর ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান।

বুকের ওপর চেপে থাকা শোষণের পাথরটাকে সরিয়ে দিয়ে, মাথার ওপরের ভয়ংকর কালো আকাশ বা অশুভ শক্তিকে শান্ত ও দৃঢ় গলায় জানিয়ে দিতে হবে যে—'তুমি ভয় পাওনি'।

'গান গাইতে জানা' অর্থাৎ প্রতিবাদ করতে বা আত্মপ্রকাশ করতে না জানলে, বিপদের সময় বা প্রলয়ের দিনে সেই মানুষ ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।