ব্যথার বাঁশি (জসীমউদ্দীন)

বিখ্যাত পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'ব্যথার বাঁশি' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত 'ব্যথার বাঁশি' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার পটভূমি ও বিষয়সংক্ষেপ

উৎস ও পটভূমি: পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের লেখা 'নকশীকাঁথার মাঠ' একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় শোককাব্য। এই কাব্যের মূল উপজীব্য হলো গ্রামের সাধারণ ছেলে রূপাই এবং মেয়ে সাজুর গভীর প্রেম ও করুন বিরহের কাহিনি। 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশটি এই বিখ্যাত শোককাব্য থেকেই সংগৃহীত হয়েছে।

শহুরে মানুষের অজ্ঞতা ও পল্লির বেদনা: কবিতায় কবি বলেছেন যে, মাঠের সাধারণ রাখালদের বুকের গভীর বেদনা শহুরে বা শিক্ষিত সমাজ কখনোই বুঝতে পারে না। শহুরে বা অভিজাত মানুষদের দুঃখ-কষ্ট বইয়ের পাতায় (কেতাবে) লেখা থাকে, যা পড়লেই সহজে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু রাখালদের সেই না-বলা ব্যথা, যা কেবল তাদের অবুঝ বাঁশির সুরে বাজে, তা কবি কী করে অন্যদের বোঝাবেন তা নিয়ে সংশয়ে আছেন। যুগে যুগে দেশের কবি-সাহিত্যিকরা কেবল ভগবান বা রাজা-বাদশাদের সুখ-দুঃখের কথাই কাব্যে তুলে ধরেছেন। পল্লির কোলে অবহেলিত এই ভাইবোনদের চিরন্তন ব্যথা কেউই মুখের ভাষায় লিখে রাখেনি। তাই পল্লির এই অব্যক্ত ব্যথা শোনার জন্য কবি মাটির বুকেই কান পেতে থাকেন।

রূপাইয়ের বাঁশি ও অব্যক্ত যন্ত্রণা: কবিতার মূল চরিত্র হলো রূপাই, যে একজন বিরহী রাখাল। তার বুকের ভেতর প্রিয়জন হারানোর গভীর যন্ত্রণা দোল দিচ্ছে। কবি একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন—একটি বন্য পাখি (বন-বিহগ) যার বুকে শিকারির তির (ব্যাধের শায়ক) বিঁধেছে, সে যেমন কোনো ভাষায় কাঁদতে পারে না, তার যন্ত্রণা কেবল সে নিজেই বোঝে; ঠিক তেমনি রূপাইয়ের বুকেও বিরহের তীব্র যন্ত্রণা। রূপাই যখন তার বুকের সেই গভীর ব্যথা আর নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারে না, তখন সে তার মনের মতন করে বাঁশি বাজায়। তার বুকের সমস্ত অব্যক্ত ব্যথা ও হাহাকার তখন সেই বাঁশির করুণ সুরে ঝরে পড়ে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
কেতাববই / পুস্তকবোলকথা / ভাষা / সুর
বে-বুঝঅবুঝ / যা সহজে বোঝা যায় নাবন-বিহগবনের পাখি
অনন্তকালচিরকাল / অসীম সময়ব্যাধশিকারি
নির্বাসিতবাসভূমি থেকে বিতাড়িত / বিচ্ছিন্নশায়কতির / বাণ
বিরহিয়াবিরহী / প্রিয়জনের সাথে বিচ্ছেদ ঘটেছে যাররূপাইকবিতার প্রধান চরিত্র (রাখাল)
টুকে রাখালিখে রাখা / নোট করে রাখাশোককাব্যবিয়োগান্তক বা করুণ রসের কাব্য

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশটি কার লেখা?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) কাজী নজরুল ইসলাম (গ) জসীমউদ্দীন (ঘ) জীবনানন্দ দাশ
উত্তর: (গ) জসীমউদ্দীন
২. জসীমউদ্দীন কী নামে পরিচিত?
(ক) বিদ্রোহী কবি (খ) পল্লিকবি (গ) ছন্দের জাদুকর (ঘ) স্বভাব কবি
উত্তর: (খ) পল্লিকবি
৩. 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশটি কোন্ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
(ক) বালুচর (খ) সোজন বাদিয়ার ঘাট (গ) নকশীকাঁথার মাঠ (ঘ) ধানখেত
উত্তর: (গ) নকশীকাঁথার মাঠ
৪. কাদের বেদনা আমরা অত বুঝি না?
(ক) শহরের মানুষের (খ) রাজাদের (গ) মাঠের রাখালের (ঘ) ভগবানদের
উত্তর: (গ) মাঠের রাখালের
৫. 'আমাদের ব্যথা' কোথায় লেখা থাকে?
(ক) খবরের কাগজে (খ) কেতাবেতে (গ) মাটিতে (ঘ) আকাশে
উত্তর: (খ) কেতাবেতে
৬. কেতাবে লেখা ব্যথা কীভাবে বোঝা যায়?
(ক) শুনলেই (খ) পড়িলেই (গ) দেখলেই (ঘ) কাঁদলেই
উত্তর: (খ) পড়িলেই
৭. রাখাল তার বেদনা কীসে প্রকাশ করে?
(ক) কবিতায় (খ) গানে (গ) বে-বুঝ বাঁশিতে (ঘ) চিঠিতে
উত্তর: (গ) বে-বুঝ বাঁশিতে
৮. যাদের বেদনা অনন্তকাল বুকে রয়ে গেছে, এ দেশের কবি তাদের কী করেননি?
(ক) সম্মান জানাননি (খ) মুখের ভাষায় টুকে রাখেননি (গ) বইয়ে ছাপাননি (ঘ) গান শেখাননি
উত্তর: (খ) মুখের ভাষায় টুকে রাখেননি
৯. মাটির প্রাণের কথা শুনতে কবি কী করেন?
(ক) মাটিতে কান পেতে থাকেন (খ) মাঠে হাঁটেন (গ) বাঁশি বাজান (ঘ) গান করেন
উত্তর: (ক) মাটিতে কান পেতে থাকেন
১০. ভগবান কোথায় খেলা করেন বলে আমরা জানি?
(ক) মথুরায় (খ) বৃন্দাবনেতে (গ) স্বর্গে (ঘ) বনে
উত্তর: (খ) বৃন্দাবনেতে
১১. কথার মেলা কাদের সুখ-দুঃখ দিয়ে গড়া হয়েছে?
(ক) সাধারণ মানুষের (খ) রাখালদের (গ) রাজা-বাদশার (ঘ) কবিদের
উত্তর: (গ) রাজা-বাদশার
১২. পল্লির কোলে নির্বাসিত কারা?
(ক) রাজা-বাদশারা (খ) কবিরা (গ) ভাইবোনগুলো (ঘ) পাখিরা
উত্তর: (গ) ভাইবোনগুলো
১৩. পল্লির ভাইবোনদের কথা কতটা বোঝা যায়?
(ক) পুরোটাই (খ) একেবারেই না (গ) আধ বোঝা যায়, আধ নাহি বোঝা যায় (ঘ) কেতাবে পড়ে
উত্তর: (গ) আধ বোঝা যায়, আধ নাহি বোঝা যায়
১৪. 'বিরহিয়া' বুকে কী দোল দিচ্ছে?
(ক) আনন্দ (খ) ব্যথা (গ) ভয় (ঘ) হাসি
উত্তর: (খ) ব্যথা
১৫. কে কাঁদিতে জানে না?
(ক) রাখাল (খ) রূপাই (গ) বন-বিহগ (ঘ) ব্যাধ
উত্তর: (গ) বন-বিহগ
১৬. বন-বিহগের বুকে কী বিঁধেছে?
(ক) তীর (খ) ব্যাধের শায়ক (গ) বুলেট (ঘ) কাঁটা
উত্তর: (খ) ব্যাধের শায়ক
১৭. 'ব্যাধের শায়ক' কথাটির অর্থ কী?
(ক) শিকারির জাল (খ) শিকারির তির (গ) বন্য জানোয়ার (ঘ) শিকারির খাঁচা
উত্তর: (খ) শিকারির তির
১৮. কে মনের মতন করে বাঁশি বাজায়?
(ক) সুজন (খ) রূপাই (গ) কানাই (ঘ) সাজু
উত্তর: (খ) রূপাই
১৯. রূপাই তার বুকের ব্যথা কোথায় ঝরায়?
(ক) মাটিতে (খ) গানে (গ) বাঁশিতে (ঘ) কবিতায়
উত্তর: (গ) বাঁশিতে
২০. 'নকশীকাঁথার মাঠ' কী ধরনের কাব্য?
(ক) মহাকাব্য (খ) শোককাব্য (গ) গীতিকাব্য (ঘ) হাসির কাব্য
উত্তর: (খ) শোককাব্য

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশটি কোন্ কাব্য থেকে সংগৃহীত?
উত্তর: 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশটি পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত অন্যতম জনপ্রিয় শোককাব্য 'নকশীকাঁথার মাঠ' থেকে সংগৃহীত।
২. নকশীকাঁথার মাঠ কাব্যে কাদের কাহিনি রচিত হয়েছে?
উত্তর: নকশীকাঁথার মাঠ কাব্যে গ্রামের সাধারণ ছেলে রূপাই এবং মেয়ে সাজুর গভীর প্রণয় ও করুন বিরহের আখ্যান রচিত হয়েছে।
৩. 'মাঠের রাখাল, বেদনা তাহার আমরা কি অত বুঝি' - 'আমরা' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: এখানে 'আমরা' বলতে শহরের শিক্ষিত, অভিজাত এবং কেতাবপড়া মানুষদের বোঝানো হয়েছে, যারা পল্লির সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের খবর রাখে না।
৪. আমাদের আর রাখালদের ব্যথার প্রকাশের পার্থক্য কী?
উত্তর: আমাদের ব্যথা বইয়ের পাতায় (কেতাবে) লেখা থাকে যা পড়ে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু রাখালদের না-বলা ব্যথা কেবল তাদের অবুঝ (বে-বুঝ) বাঁশির সুরে প্রকাশ পায়।
৫. 'এ দেশের কবি রাখে নাই যাহা মুখের ভাষায় টুকে' - এ দেশের কবিরা কী টুকে রাখেননি?
উত্তর: এ দেশের কবিরা চিরকাল রাজা-বাদশাদের কথা লিখেছেন। কিন্তু পল্লির কোলে থাকা সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষদের অনন্তকালের চাপা পড়া বেদনার কথা তাঁরা কাব্যে টুকে রাখেননি।
৬. কবি কেন মাটিতে কান পেতে থাকেন?
উত্তর: পল্লির সাধারণ মানুষ ও অবহেলিত মাটির প্রাণের অব্যক্ত কথা বা তাদের গভীরে লুকিয়ে থাকা বেদনা শোনার জন্যই কবি মাটিতে কান পেতে থাকেন।
৭. আমরা কাদের সুখ-দুঃখ দিয়ে কথার মেলা গড়েছি?
উত্তর: আমরা অর্থাৎ শহুরে কবি ও সাহিত্যিকরা যুগে যুগে কেবল রাজা-বাদশাদের সুখ-দুঃখের কথা দিয়ে কাব্যে বা সাহিত্যে কথার মেলা গড়েছি।
৮. 'যাহাদের কথা আধ বোঝা যায়, আধ নাহি বোঝা যায়' - কাদের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে পল্লির কোলে নির্বাসিত, অবহেলিত সাধারণ ভাইবোনদের বা খেটে-খাওয়া মানুষদের কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৯. 'কী করিয়া আমি দেখাইব তাহা' - কবি কী দেখাতে পারছেন না?
উত্তর: এক বিরহী রাখালের বুকের না-বলা তীব্র ব্যথা ও হাহাকারের স্বরূপ উপযুক্ত কথা বা ভাষার অভাবে কবি অন্যদের কাছে দেখাতে বা বোঝাতে পারছেন না।
১০. 'কোথা পাব সেই বোল' - 'বোল' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'বোল' শব্দের অর্থ হলো কথা, ভাষা বা প্রকাশ করার সুর।
১১. 'সে বন-বিহগ কাঁদিতে জানে না' - কেন সে কাঁদতে জানে না?
উত্তর: বনের পাখি (বন-বিহগ) তার স্বভাবগত কারণেই মানুষের মতো ভাষায় নিজের বেদনা প্রকাশ করে কাঁদতে বা চিৎকার করতে জানে না।
১২. বন-বিহগের বুকে ব্যাধের শায়ক বিঁধলে কী হয়?
উত্তর: বন-বিহগের বুকে শিকারির তির বা ব্যাধের শায়ক বিঁধলে, তার অন্তরের তীব্র বেদনা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, কেবল সেই অবুঝ পাখিটিই তার চরম যন্ত্রণা উপলব্ধি করে।
১৩. কে মনের মতন করে বাঁশি বাজায়?
উত্তর: কবিতার প্রধান চরিত্র, বিরহী রাখাল রূপাই তার নিজের মনের মতন করে বাঁশি বাজায়।
১৪. রূপাই বাঁশিতে কী ঝরায়?
উত্তর: যে গভীর বিরহের ব্যথা রূপাই তার বুকের মধ্যে আর চেপে রাখতে পারে না, বাঁশির করুণ সুরের মধ্য দিয়ে সে তার সেই না-বলা ব্যথাই ঝরায়।
১৫. রূপাইয়ের বাঁশিকে 'বে-বুঝ বাঁশি' বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: কারণ সেই বাঁশির সুরে কোনো স্পষ্ট কথা বা ভাষা নেই, আছে কেবল এক অবুঝ ও গভীর অব্যক্ত বেদনার প্রকাশ, যা শহুরে মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. "আমাদের ব্যথা কেতাবেতে লেখা... বে-বুঝ বাঁশিতে কেমনে দেখাব তায়?" - উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: আলোচ্য পঙ্‌ক্তিগুলি পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত 'নকশীকাঁথার মাঠ' কাব্যের অন্তর্গত 'ব্যথার বাঁশি' কবিতা থেকে গৃহীত।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: পল্লির সহজ-সরল মানুষ এবং শহুরে অভিজাত মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে। শহুরে শিক্ষিত মানুষের দুঃখ-কষ্ট, হতাশা বা আনন্দ সহজেই সাহিত্যের পাতায় বা 'কেতাব'-এ স্থান পায়। ফলে তা পড়লেই যে কেউ সহজেই তাদের বেদনার কথা বুঝতে পারে।
কিন্তু মাঠের সাধারণ রাখালদের জীবনের রূপ ভিন্ন। তারা শিক্ষিত নয়, তাই তাদের বুকের গভীর বেদনা বা বিরহের যন্ত্রণা কোনো বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। তাদের সেই অব্যক্ত বেদনা কেবল তাদের বাঁশির অবুঝ (বে-বুঝ) সুরে করুণভাবে বেজে ওঠে। বাঁশির এই সুরের কোনো ভাষা নেই, তাই শহুরে মানুষের কাছে এই সুরের মর্মার্থ পৌঁছানো কঠিন। কবি আক্ষেপ করে বলেছেন যে, রাখালদের এই ভাষা-না-থাকা গভীর বেদনাকে তিনি কীভাবে শব্দের মাধ্যমে শহুরে পাঠকদের সামনে তুলে ধরবেন, তা তিনি ভেবে পাচ্ছেন না।

২. "রাজা-বাদশার সুখ-দুখ দিয়ে গড়েছি কথার মেলা।" - কবি কেন এ কথা বলেছেন? এর মাধ্যমে সাহিত্যের কোন্ দিকটি উন্মোচিত হয়েছে?

উত্তর: উৎস ও প্রসঙ্গ: উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি জসীমউদ্দীনের 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও কাব্যে সাধারণ মানুষের প্রতি কবি-সাহিত্যিকদের উপেক্ষার দিকটি তুলে ধরতেই কবি এ কথা বলেছেন।

সাহিত্যের উন্মোচিত দিক: যুগে যুগে সাহিত্য ও কাব্যে একটি নির্দিষ্ট ধারাই বজায় থেকেছে। কবি-সাহিত্যিকরা সাধারণত বৃন্দাবনে ভগবানের লীলা, পৌরাণিক দেবদেবী কিংবা সমাজের উচ্চবিত্ত 'রাজা-বাদশা'দের জাঁকজমক, প্রেম, যুদ্ধ ও সুখ-দুঃখের কাহিনি নিয়েই কাব্যের 'কথার মেলা' বা বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন।
এর বিপরীতে, পল্লির কোলে অবহেলিত যে সাধারণ মানুষ—কৃষক, রাখাল বা শ্রমিক—যাঁরা সমাজের মূল চালিকাশক্তি, তাঁদের জীবনের হাসি-কান্না, বেঁচে থাকার অনন্ত সংগ্রাম এবং বুকের চাপা পড়া বেদনাকে কবিরা কাব্যে কোনো স্থান দেননি। তাঁদের কথা চিরকাল অবহেলিতই রয়ে গেছে। সাহিত্য যে দীর্ঘদিন ধরে কেবল সমাজের উচ্চশ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে এবং প্রান্তিক মানুষকে ব্রাত্য করে রেখেছে, এই পঙ্‌ক্তিটির মাধ্যমে সাহিত্যের সেই চরম বৈষম্য ও উপেক্ষার দিকটিই উন্মোচিত হয়েছে।

৩. "ব্যাধের শায়ক বুকে বিঁধিয়াছে জানে তার বেদনাই।" - বন-বিহগের এই উপমাটি কার জন্য এবং কেন ব্যবহার করা হয়েছে?

উত্তর: উৎস ও ব্যবহার: উদ্ধৃত উপমাটি পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। এই উপমাটি কবিতার প্রধান চরিত্র, বিরহী রাখাল 'রূপাই'-এর বুকের গভীর বেদনা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

উপমার কারণ ও তাৎপর্য: বনের স্বাধীন পাখি বা বন-বিহগ মানুষের মতো কথা বলতে বা কাঁদতে জানে না। কোনো নির্দয় শিকারি বা ব্যাধের তির (শায়ক) যখন সেই অবুঝ পাখির বুকে এসে বিঁধে, তখন তার শরীর যে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে, তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা তার নেই। সেই প্রাণঘাতী কষ্ট কেবল সেই আহত পাখিটিই নীরবে অনুভব করে।
রূপাইয়ের জীবনের ট্র্যাজেডিও ঠিক এই বন-বিহগের মতোই। প্রিয়তমা সাজুর সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে রূপাইয়ের বুকেও গভীর বিরহের যন্ত্রণা তির হয়ে বিঁধেছে। কিন্তু রূপাই একজন সাধারণ, অশিক্ষিত রাখাল। তার এই না-বলা তীব্র কষ্টকে শহুরে ভাষায় প্রকাশ করার সামর্থ্য তার নেই। তার এই বাকরুদ্ধ, নিদারুণ ও মর্মান্তিক যন্ত্রণার রূপটিকে পাঠকের কাছে মূর্ত করে তুলতেই কবি এই অসামান্য ও সার্থক উপমাটির আশ্রয় নিয়েছেন।

৪. "বাজায় রূপাই বাঁশিটি বাজায় মনের মতন করে" - রূপাই কে? তার বাঁশি বাজানোর কারণ ও তাৎপর্য আলোচনা করো।

উত্তর: রূপাইয়ের পরিচয়: রূপাই হলো জসীমউদ্দীন রচিত 'নকশীকাঁথার মাঠ' নামক শোককাব্যের প্রধান চরিত্র। সে পল্লির একজন সাধারণ, সহজ-সরল এবং অত্যন্ত আবেগপ্রবণ রাখাল যুবক।

বাঁশি বাজানোর কারণ ও তাৎপর্য: রূপাইয়ের জীবনে এক গভীর ট্র্যাজেডি নেমে এসেছে। তার প্রিয়তমার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটেছে। এই বিরহের যন্ত্রণা তার বুকে ব্যাধের তিরের মতো বিঁধে আছে। রূপাই সাধারণ মানুষ হওয়ায় সে তার এই বুকফাটা কষ্টকে কোনো বইয়ের পাতায় লিখে বা মুখের কথায় প্রকাশ করতে পারে না।
মানুষ যখন তার ভেতরের কষ্টকে আর চেপে রাখতে পারে না, তখন সে মুক্তির পথ খোঁজে। রূপাইয়ের মুক্তির একমাত্র মাধ্যম হলো তার হাতের বাঁশি। যখন তার বুকের সেই অনন্তকালের বেদনা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সে তার বাঁশিটি হাতে তুলে নেয় এবং নিজের মনের মতন করে বাজাতে শুরু করে। তার যে না-বলা কষ্ট সে বুকের মধ্যে আর ধরে রাখতে পারে না, তা-ই যেন ওই বাঁশির করুণ ও মর্মান্তিক সুর হয়ে ঝরে পড়ে। এই বাঁশি বাজানো শুধু গান নয়, এটি হলো এক বিরহী আত্মার বুকফাটা হাহাকার ও মুক্তির করুণ আকুতি।

৫. 'ব্যথার বাঁশি' কবিতায় পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের যে পল্লী-প্রীতি ও সাধারণ মানুষের প্রতি দরদ ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যে 'পল্লিকবি' নামেই সুপরিচিত। তাঁর 'নকশীকাঁথার মাঠ' কাব্যের অন্তর্গত 'ব্যথার বাঁশি' কবিতাংশে তাঁর পল্লী-প্রীতি এবং সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধের এক অপূর্ব ছবি ফুটে উঠেছে।

কবি আক্ষেপ করেছেন যে, যুগে যুগে সাহিত্যিকরা কেবল বৃন্দাবনের ভগবান কিংবা রাজা-বাদশাদের সুখ-দুঃখ নিয়েই কাব্য রচনা করেছেন। কিন্তু পল্লির কোলে অবহেলিত যে ভাইবোনরা অনন্তকাল ধরে বুকের মধ্যে গভীর বেদনা চেপে বেঁচে আছে, তাদের কথা কেউ মুখের ভাষায় টুকে রাখেনি। শহরের শিক্ষিত সমাজ বা কেতাব-পড়া মানুষেরা মাঠের রাখালের এই অব্যক্ত বেদনা বুঝতে অক্ষম।
কিন্তু জসীমউদ্দীন ছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা কবি। তাই তিনি পল্লির উপেক্ষিত মানুষের না-বলা কথা শোনার জন্য 'মাটিতে কান পেতে' থাকেন। তিনি বন-বিহগের বুকে বিঁধে থাকা শিকারির তিরের যন্ত্রণার সাথে বিরহী রাখাল রূপাইয়ের যন্ত্রণাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। রূপাইয়ের বাঁশির করুণ সুরে যে পল্লির সাধারণ মানুষের বুকফাটা হাহাকার ঝরে পড়ে, তা অনুভব করে কবি অত্যন্ত দরদের সঙ্গে তা পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন। অবহেলিত গ্রামীণ মানুষের প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সহানুভূতিই কবিতাটিকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • অনন্ত = অন্ + অন্ত
  • নির্বাসিত = নিঃ + বাসিত
  • ভগবান = ভগ + বান
  • নির্জন = নিঃ + জন
  • রূপাই = রূপ + আই

সমাস নির্ণয়

  • সুখ-দুখ: সুখ ও দুখ (দ্বন্দ্ব সমাস)
  • বন-বিহগ: বনের বিহগ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • রাজা-বাদশা: রাজা ও বাদশা (দ্বন্দ্ব সমাস)
  • অনন্তকাল: অনন্ত যে কাল (কর্মধারয় সমাস)
  • নকশীকাঁথা: নকশা করা যে কাঁথা (মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)

পদ পরিবর্তন

  • ব্যথা ➜ ব্যথিত
  • মুখ ➜ মৌখিক
  • মাটি ➜ মেটে
  • বুক ➜ বক্ষ
  • বন ➜ বন্য

ব্যথার বাঁশি কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই কবিতাটি পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের লেখা। এটি তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় শোককাব্য 'নকশীকাঁথার মাঠ'-এর একটি অংশ, যেখানে রূপাই ও সাজুর প্রণয়-বিরহের আখ্যান রচিত হয়েছে।

শহুরে মানুষের দুঃখ-কষ্ট বইয়ের পাতায় (কেতাবে) লেখা থাকে, যা পড়ে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু রাখালদের না-বলা ব্যথা কেবল তাদের অবুঝ (বে-বুঝ) বাঁশির করুণ সুরে প্রকাশ পায়।

বনের পাখির বুকে শিকারির তির বিঁধলে যেমন সে তার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, তেমনি বিরহী রাখাল রূপাইয়ের বুকের গভীর যন্ত্রণাও ভাষাহীন। এই অব্যক্ত যন্ত্রণাকে মূর্ত করতেই বন-বিহগের উপমাটি ব্যবহৃত হয়েছে।