🤝 আদাব
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
গল্পের সারাংশ
'আদাব' গল্পটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এক ভয়ংকর রাতের প্রেক্ষাপটে রচিত। শহরে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ জারি হয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় ঢাকা শহর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এমন এক বিভীষিকাময় রাতে একটি উলটানো ডাস্টবিনের দুই পাশে এসে আশ্রয় নেয় প্রাণভয়ে ভীত দুটি মানুষ। উভয়েই প্রথমে অপরজনকে আততায়ী মনে করে ভয় পাচ্ছিল। অনেকক্ষণ পর তাদের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়।
তারা জানতে পারে, একজন হলো সুতাকলের মজুর (হিন্দু) এবং অপরজন নৌকার মাঝি (মুসলমান)। উভয়ের ধর্ম আলাদা হলেও তাদের আসল পরিচয় হলো— তারা উভয়েই গরিব, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। দাঙ্গার কারণে তাদের দুজনেরই রুটিরুজি বন্ধ। তারা বুঝতে পারে, এই হানাহানি বড়োলোকদের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য, আর এতে প্রাণ যায় তাদের মতো নিরীহ মানুষের।
গভীর রাতে পুলিশের টহলদারি শুরু হলে তারা পালানোর চেষ্টা করে। সুতাকলের মজুর মাঝিকে আটকাতে চায়, কারণ বাইরে মৃত্যু ওত পেতে আছে। কিন্তু মাঝি কাল ঈদের দিন ছেলেমেয়ে ও বউয়ের কাছে নতুন জামা নিয়ে যাওয়ার আশায় বুড়িগঙ্গা পেরোনোর জন্য ছুটে বেরিয়ে যায়। বিদায়বেলায় তারা পরস্পরকে 'আদাব' (নমস্কার/সালাম) জানায়, যা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা ক্ষণিকের মানবিক সম্প্রীতির শ্রেষ্ঠ প্রতীক। কিন্তু গল্পের শেষে পুলিশের রিভলবারের গুলিতে মাঝির নির্মম মৃত্যু ঘটে, যা গল্পটিকে এক চরম ট্র্যাজেডিতে পরিণত করে।
হাতে কলমে - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২)
সমরেশ বসুর ছদ্মনাম হলো 'কালকূট'।
তাঁর লেখা দুটি বিখ্যাত উপন্যাস হলো 'গঙ্গা' এবং 'বি টি রোডের ধারে'।
গল্পে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং কার্ফ্যু চলাকালীন এক বিভীষিকাময় রাতের কথা রয়েছে।
ডাস্টবিনের দুই পাশে লুকিয়ে থাকা প্রাণীদুটি হলো— একজন সুতাকলের মজুর (যে হিন্দু) এবং অপরজন নৌকার মাঝি (যে মুসলমান)।
বক্তা (সুতা-মজুর) মাঝির বগলে থাকা একটি পুঁটলির প্রতি ইঙ্গিত করে এ কথা বলেছিল। পুঁটলিতে মাঝির ছেলেমেয়েদের ঈদের নতুন জামা ছিল।
গল্পে ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা 'বুড়িগঙ্গা' নদীর প্রসঙ্গ রয়েছে।
দাঙ্গার এই ভয়ানক বিপদের মধ্যেও মাঝির তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসা অনুভব করে সুতা-মজুরের ঠোঁটের কোণে একটু স্নেহের হাসি ফুটে উঠেছিল।
৩. কয়েকটি বাক্যে উত্তর দাও
দাঙ্গার কারণে রাতের শহর এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে দা, লাঠি, ছুরি নিয়ে মুখোমুখি লড়াই চলছে। অন্ধকারকে আশ্রয় করে গুপ্তঘাতকেরা ওত পেতে আছে। মাঝে মাঝে মিলিটারি টহলদার গাড়ি পাক খেয়ে যাচ্ছে। বস্তিতে বস্তিতে আগুন জ্বলছে এবং মৃত্যুকাতর নারী-শিশুর চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতা ও অন্ধকারকে আরও বীভৎস করে তুলেছে।
ডাস্টবিনটা নড়ে ওঠার পর একপাশের অন্ধকার থেকে একজন লোক (সুতা-মজুর) ভয়ে ভয়ে মাথা তুলল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ডাস্টবিনের অপর পাশ থেকেও আর একটি মাথা (মাঝি) উঠে এল। উভয়েই উভয়ের দিকে স্থির ও সন্দিহান চোখে তাকিয়ে রইল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, উভয়েই উভয়কে গুপ্তঘাতক বা ভিন্ন ধর্মের লোক ভেবে আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে লাগল।
দাঙ্গার রাতে ডাস্টবিনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুতা-মজুর (হিন্দু) এবং মাঝির (মুসলমান) কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির আবহ রচিত হয়েছে। তারা বুঝতে পারে যে, ধর্ম আলাদা হলেও তাদের পরিচয় এক— তারা গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ। দাঙ্গা তাদের রুটিরুজি কেড়ে নিয়েছে। বিপদের সময় মাঝি সুতা-মজুরকে বিড়ি সাধে এবং দেশলাই জ্বালিয়ে দেয়। বিদায়বেলায় তারা পরস্পরকে ভাই সম্বোধন করে এবং 'আদাব' জানিয়ে অকৃত্রিম সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বার্তা দেয়।
গল্পের প্রেক্ষাপটটি পরাধীন ভারতের ঢাকা শহরের (১৯৪৬ সালের রায়ট বা দাঙ্গা)। ব্রিটিশ শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল। কিছু রাজনৈতিক নেতার স্বার্থপরতায় সাধারণ মানুষ একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে উঠেছিল। একই হাটে-বাজারে হাসিমুখে মেশা মানুষগুলোই সামান্য প্ররোচনায় নির্মমভাবে একে অপরকে হত্যা করতে শুরু করেছিল। গরিব মানুষ এই নিষ্ঠুরতার কারণ বুঝে উঠতে না পারায় এই দীর্ঘনিশ্বাসটি ফেলেছে।
৪. তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো
তাৎপর্য: মাঝি যখন সুতা-মজুরকে অন্ধকারে একাকী ফেলে যেতে চায়নি, তখন সুতা-মজুর সন্দেহ করে বলেছিল যে মাঝি হয়তো তার লোকজনকে ডেকে আনার জন্য যাচ্ছে। মানুষের প্রতি এই অবিশ্বাসে মাঝি অত্যন্ত আঘাত পায়। দাঙ্গার পরিবেশে মানবতা যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, তা উপলব্ধি করে মাঝির মনে তীব্র রাগ ও দুঃখের সৃষ্টি হয় এবং সে স্থান-কাল (কার্ফ্যুর বিপদ) ভুলে চেঁচিয়ে ওঠে। এটি তার নিষ্পাপ ও সৎ মনের পরিচায়ক।
তাৎপর্য: উক্তিটি মাঝির। দাঙ্গার রাতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ (হিন্দু ও মুসলিম) ডাস্টবিনের আড়ালে যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতার বন্ধন তৈরি করেছিল, তা সত্যিই অবিস্মরণীয়। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ওই চরম ঘৃণার মুহূর্তেও একজন হিন্দু মজুর এবং একজন মুসলিম মাঝি পরস্পরকে আপন ভাইয়ের মতো অনুভব করেছিল। তাই বিদায় নেওয়ার সময় মাঝি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে কথাটি বলেছিল। এটি গল্পে মানবিকতার বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত।
ব্যাকরণ (৫ - ১২)
- ৫.১ শহরে ১৪৪ ধারা আর কারফিউ অর্ডার... (সংযোজক অব্যয়)
- ৫.২ তারা গুলি ছুঁড়ছে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। (সংযোজক অব্যয়)
- ৫.৩ ...প্রতীক্ষা করতে থাকে, কিন্তু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও... (বিয়োজক অব্যয়)
- ৫.৪ তোমার মতলবডা তো ভালো মনে হইতেছে না। (আলংকারিক অব্যয়)
- ৫.৫ মাঝি এমনভাবে কথা বলে যেন সে তার কোনো আত্মীয়বন্ধুর... (সাদৃশ্যবাচক অব্যয়)
| চতুর্দিকে | চতুঃ + দিকে |
| বিভীষিকাময় | বিভীষিকা + ময় |
| নির্জীব | নিঃ + জীব |
| প্রতীক্ষা | প্রতি + ঈক্ষা |
| নিস্তব্ধতা | নিঃ + স্তব্ধতা |
| আগ্নেয়াস্ত্র | আগ্নেয় + অস্ত্র |
| চোরাগোপ্তা | যা চোরা তাই গোপ্তা (সাধারণ কর্মধারয়) |
| পথনির্দেশ | পথের নির্দেশ (সম্বন্ধ তৎপুরুষ) |
| নির্জীব | নাই জীব যার (নঞর্থক বহুব্রীহি) |
| দীর্ঘনিশ্বাস | দীর্ঘ যে নিশ্বাস (সাধারণ কর্মধারয়) |
| পোলামাইয়া | পোলা ও মাইয়া (দ্বন্দ্ব সমাস) |
- দুটো গলি: কর্তৃকারকে শূন্য (০) বিভক্তি।
- সন্দেহের দোলায় তাদের মন দুলছে: কর্মকারকে শূন্য (০) বিভক্তি।
- দু হাত দিয়ে হাঁটু দুটোকে জড়িয়ে ধরে: করণ কারকে 'দিয়ে' অনুসর্গ।
- আমাগো কথা ভাবে কেডা?: কর্তৃকারকে শূন্য (০) বিভক্তি (কেডা=কে)।
- মুহূর্তগুলি কাটে রুদ্ধ নিশ্বাসে: করণ কারকে 'এ' বিভক্তি (বা ক্রিয়াবিশেষণ)।
- হেইপারে: ওইপার > ঐপার > হেইপার (অপিনিহিতি বা স্বরাগম)।
- নারাইনগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ > নারাইনগঞ্জ (অপিনিহিতি)।
- ডাইকা: ডাকিয়া > ডাইকা (অপিনিহিতি)।
- আঙুল: অঙ্গুলি > আঙুল (নাসিক্যীভবন)।
- চান্দ: চন্দ্র > চান্দ (ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবন ও নাসিক্যীভবন)।
- ১০.১ (জটিল): যখন মিলিটারি টহলদার গাড়িটা রাত্রির নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে দিল, তখন তা ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে একটা পাক খেয়ে গেল।
- ১০.২ (না-সূচক): খানিকক্ষণ একটুও শব্দ নেই (বা কেউ কথা বলছে না)।
- ১০.৩ (প্রশ্নবোধক): পরিচয়কে স্বীকার করতে উভয়েই কি নারাজ নয়?
- ১০.৪ (যৌগিক): শোরগোলটা উঠল এবং তা দূরে মিলিয়ে গেল।
- ১০.৫ (পরোক্ষ উক্তি): মাঝি বলল যে, যেদিকে হয় সেদিকে চলো।
- ১১.১ রইল: সাধারণ অতীত কাল।
- ১১.২ দুলছে: ঘটমান বর্তমান কাল।
- ১১.৩ লাগছে: ঘটমান বর্তমান কাল।
- ১১.৪ ঠুকছে: ঘটমান বর্তমান কাল।
- ১১.৫ দিছে (দিয়েছে): পুরাঘটিত বর্তমান কাল।
- মজুর: বিদেশি শব্দ (ফারসি)।
- লীগওয়ালো: মিশ্র শব্দ (ইংরেজি 'League' + হিন্দি 'ওয়ালা')।
- পুলিশ: বিদেশি শব্দ (ইংরেজি)।
- নসিব: বিদেশি শব্দ (আরবি)।
- রাত্রি: তৎসম শব্দ।