বনভোজনের ব্যাপার

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত 'বনভোজনের ব্যাপার' গল্পের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ ও ব্যাকরণ সমাধান | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 27 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🍲 বনভোজনের ব্যাপার

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় হাস্যরসাত্মক গল্প

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ

পটলডাঙার চার মূর্তি পিকনিক বাগানবাড়ি টেনিদা

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৭-১৯৭০)

জন্ম দিনাজপুরে। তাঁর আসল নাম তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটোগল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে বীতংস, দুঃশাসন, ভোগবতী, উপনিবেশ, বৈজ্ঞানিক, শিলালিপি, লালমাটি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। শিশু ও কিশোর সাহিত্যের জগতে তাঁর অনবদ্য ও কালজয়ী সৃষ্টি হলো পটলডাঙার 'টেনিদা' চরিত্র। বর্তমান পাঠ্যটি টেনিদা ও তাঁর বন্ধুদের নিয়ে লেখা একটি হাসির গল্প।

📜

ধরন

ছোটোগল্প

👤

প্রধান চরিত্র

টেনিদা, প্যালা, ক্যাবলা, হাবুল

🚂

গন্তব্য

ক্যাবলার মামার বাড়ি

🐒

বিপত্তি

বানরের উপদ্রব

গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

পটলডাঙার চারমূর্তি—টেনিদা, ক্যাবলা, হাবুল সেন এবং প্যালা (কথক) মিলে একটি পিকনিক বা বনভোজনের পরিকল্পনা করে। চাঁদা ওঠে মাত্র দশ টাকা ছ-আনা, কিন্তু ভোজনরসিক টেনিদার মেনু ছিল পেল্লায়—বিরিয়ানি, কোর্মা, কাবাব। শেষে ক্যাবলার বাস্তব বুদ্ধিতে মেনু ঠিক হয়—খিচুড়ি, মাছের কালিয়া, আলুভাজা, আমের আচার এবং রসগোল্লা। প্যালাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজহাঁসের ডিম জোগাড় করার, যা করতে গিয়ে সে হাঁসের কামড় খেয়ে নাজেহাল হয়।

বনভোজনের দিন মার্টিন রেলে চেপে তারা ক্যাবলার মামার বাড়ির বাগানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পথে হাবুল কাদায় পিছলে পড়লে আমের আচার নষ্ট হয় এবং টেনিদা পড়ে গিয়ে রসগোল্লার হাঁড়ি কাদায় ফেলে দেয়। বাগানে পৌঁছে মাছ রাঁধতে গিয়ে প্যালা কাঁচা তেলে মাছ ফেলে মাছের কালিয়াকে 'হালুয়া' বানিয়ে ফেলে। এরপর যখন টেনিদা খিচুড়ি রান্নার ভার নিয়ে গাছতলায় ঘুমিয়ে পড়ে, তখন একদল বাঁদর এসে চাল-ডাল-আলু সব সাবাড় করে দেয়। শেষ পর্যন্ত বনভোজন আর হয়ে ওঠে না, চার বন্ধু মিলে বাগানের টক-মিষ্টি জলপাই খেয়েই খিদের জ্বালা মেটায়। এভাবেই এক চরম বিশৃঙ্খলা ও হাস্যকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গল্পটি শেষ হয়।

১ ও ২. অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

৮ টি
১.১ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের কোন বিখ্যাত চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা?

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র 'টেনিদা'-র সৃষ্টিকর্তা।

১.২ তাঁর লেখা দুটি উপন্যাসের নাম লেখো।

তাঁর লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো— উপনিবেশ এবং লালমাটি।

২.১ বনভোজনের উদ্যোগ কাদের মধ্যে দেখা গিয়েছিল?

বনভোজনের উদ্যোগ পটলডাঙার চারমূর্তি অর্থাৎ টেনিদা, ক্যাবলা, হাবুল সেন এবং প্যালা-র মধ্যে দেখা গিয়েছিল।

২.২ বনভোজনের জায়গা কোথায় ঠিক হয়েছিল?

বনভোজনের জায়গা ঠিক হয়েছিল বাগুইআটি ছাড়িয়ে আরও চারটে ইস্টিশান দূরে ক্যাবলার মামার বাগানবাড়িতে।

২.৩ বনভোজনের জায়গায় কীভাবে যাওয়া যাবে?

বনভোজনের জায়গায় শ্যামবাজার ইস্টিশান থেকে মার্টিনের রেলগাড়িতে চেপে যাওয়া যাবে।

২.৪ রাজহাঁসের ডিম আনার দায়িত্ব কে নিয়েছিল?

রাজহাঁসের ডিম আনার দায়িত্ব নিয়েছিল গল্পের কথক প্যালা।

২.৫ বনভোজনের বেশিরভাগ সামগ্রী কারা সাবাড় করেছিল?

বনভোজনের বেশিরভাগ সামগ্রী (চাল, ডাল, আলু) একদল বানর সাবাড় করেছিল।

২.৬ কোন খাবারের কারণে বনভোজন ফলভোজনে পরিণত হলো?

বাগানের গাছে পেকে থাকা টক-মিষ্টি জলপাইয়ের কারণে বনভোজন শেষ পর্যন্ত ফলভোজনে পরিণত হয়েছিল।

৩. সন্ধিবিচ্ছেদ করো

প্রদত্ত শব্দসন্ধিবিচ্ছেদ / প্রকৃতি-প্রত্যয়
মোগলাইমোগল + আই (তদ্ধিত প্রত্যয়)
রান্নারাঁধ্ + না
বৃষ্টিবৃষ্ + তি
পরীক্ষাপরি + ঈক্ষা
আবিষ্কারআবিঃ + কার

৪. ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো

শব্দপরিবর্তন প্রক্রিয়াধ্বনিতাত্ত্বিক নাম
বিচ্ছিরিবিশ্রী > বিচ্ছিরিসমীভবন ও স্বরভক্তি
প্ল্যান-ট্যানপ্ল্যান > প্ল্যান-ট্যানশব্দদ্বৈত বা অনুকার শব্দ
লিস্টিলিস্ট > লিস্টিঅন্ত্যস্বরাগম
ভদ্দরভদ্র > ভদ্দরসমীভবন / স্বরভক্তি
ইস্টুপিডস্টুপিড > ইস্টুপিডআদি স্বরাগম

৫. বিশেষ বৈশিষ্ট্যযুক্ত বাক্য

  • ৫.১ আর সে গাঁট্টা, ঠাট্টার জিনিস নয়- জুতসই লাগলে স্রেফ গালপাট্টা উড়ে যাবে।
    বৈশিষ্ট্য: এখানে 'গাঁট্টা', 'ঠাট্টা', 'গালপাট্টা' শব্দগুলির মিল বা অনুপ্রাস ব্যবহার করে ধ্বনিঝংকার ও অতিরঞ্জিত কৌতুকরস সৃষ্টি করা হয়েছে।
  • ৫.২ দ্রাক্ষাফল অতিশয় খাট্টা।
    বৈশিষ্ট্য: এটি প্রচলিত প্রবাদ (আঙুর ফল টক) -এর বিকৃত বা খণ্ডিত রূপ। এখানে হিন্দি 'খাট্টা' শব্দের প্রয়োগে হাস্যরস তৈরি হয়েছে।
  • ৫.৩ আহা-হা চৈইত্যা যাইত্যাছ কেন?
    বৈশিষ্ট্য: এই বাক্যে ঢাকাই বা পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক উপভাষার (Dialect) নিখুঁত প্রয়োগ ঘটেছে।
  • ৫.৪ এক চড়ে গালের বোম্বা উড়িয়ে দেব।
    বৈশিষ্ট্য: এখানে চরম অতিরঞ্জন (Exaggeration) এবং 'বোম্বা' (গাল বা চোয়াল অর্থে) নামক কথ্য বা স্ল্যাং শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়।

৬. ব্যাসবাক্যসহ সমাস

সমস্ত পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
বনভোজনবনে ভোজনঅধিকরণ তৎপুরুষ সমাস
দলপতিদলের পতিষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস
বেরসিকনয় রসিকনঞ তৎপুরুষ সমাস
দ্রাক্ষাফলদ্রাক্ষা নামক ফলমধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
রেলগাড়িরেলের উপর দিয়ে চলে যে গাড়িমধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস

৭. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন

মূল বাক্যনির্দেশপরিবর্তিত বাক্য
লাফিয়ে উঠে টেনিদা বাগানের দিকে ছুটল।জটিল বাক্যেটেনিদা যখন লাফিয়ে উঠল, তখন সে বাগানের দিকে ছুটল।
চোখের পলকে বানরগুলো গাছের মাথায়।জটিল বাক্যেযেই চোখের পলক পড়ল, অমনি বানরগুলো গাছের মাথায় উঠে গেল।
দুপুরবেলায় আসিস। বাবা-মেজদা অফিসে যাওয়ার পরে।সরল বাক্যেবাবা-মেজদা অফিসে যাওয়ার পর দুপুরবেলায় আসিস।
ইচ্ছে হয় নিজে বের করে নাও।জটিল বাক্যেযদি ইচ্ছে হয়, তবে নিজে বের করে নাও।
টেনিদা আর বলতে দিলে না। গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল।সরল বাক্যেটেনিদা আর বলতে না দিয়ে গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল।

৮. সমার্থক প্রবচন ও বাক্যরচনা

  • চুরি: হাতসাফাই — ভিড়ের মধ্যে পকেটমার লোকটির মানিব্যাগটি হাতসাফাই করে দিল।
  • নষ্ট হওয়া: বারোটা বেজে যাওয়া — বৃষ্টি এসে আমাদের খেলার একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিল।
  • পালানো: হাওয়া হওয়া (বা কেটে পড়া) — পুলিশের গাড়ি দেখেই চোরটা সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেল।
  • গোলমাল করে ফেলা: তালগোল পাকানো — পরীক্ষার হলে ঘাবড়ে গিয়ে ছেলেটি সব উত্তর তালগোল পাকিয়ে ফেলল।
  • লোভ দেওয়া: নোলার জল টানা — দোকানের রসগোল্লা দেখে ভোজনরসিক মানুষটির নোলার জল টানছে।
  • চুপ থাকা: স্পিকটি নট — বাবার বকুনি খেয়ে ছেলেটি একেবারে স্পিকটি নট হয়ে বসে আছে।

৯. টীকা লেখো

  • কলম্বাস: ইতালির বিখ্যাত নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস, যিনি ১৪৯২ সালে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন। গল্পে হাবুল সেনের হঠাৎ করে জলপাই আবিষ্কার করাকে ব্যঙ্গ করে কলম্বাসের আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
  • লেডিকেনি: এক ধরনের বিখ্যাত বাঙালি মিষ্টি যা ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রী 'লেডি ক্যানিং'-এর নামানুসারে তৈরি হয়েছিল।
  • বিরিয়ানি: চাল, মাংস, ঘি ও সুগন্ধি মশলা দিয়ে তৈরি এক প্রকার অত্যন্ত সুস্বাদু মোগলাই খাবার।
  • ইউরেকা: এটি একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ 'আমি পেয়েছি' (I have found it)। বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস জলের প্লবতার সূত্র আবিষ্কার করে আনন্দে এই কথাটি বলে উঠেছিলেন। গল্পে জলপাইয়ের সন্ধান পেয়ে টেনিদা আনন্দে এই শব্দটি উচ্চারণ করেছে।

১০. সংক্ষিপ্ত ও যথাযথ উত্তর দাও

৫ টি
১০.১ বনভোজনের প্রথম তালিকায় কী কী খাদ্যের উল্লেখ ছিল? তা বাতিল হলো কেন?

বনভোজনের প্রথম তালিকায় বিরিয়ানি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব (দু-রকম) এবং মাছের চপের উল্লেখ ছিল।

বাতিল হওয়ার কারণ: ক্যাবলা বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে হিসেব করে দেখিয়ে দেয় যে, এই রাজকীয় রান্নার জন্য বাবুর্চি, চাকর, মোটর লরি এবং কমপক্ষে দুশো টাকা চাঁদা প্রয়োজন। কিন্তু তাদের চারজনের চাঁদা মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে উঠেছিল মাত্র দশ টাকা ছ-আনা। অর্থের এই চরম অভাবেই প্রথম তালিকাটি বাতিল করতে হয়।

১০.২ বনভোজনের দ্বিতীয় তালিকায় কী কী খাদ্যের উল্লেখ ছিল এবং কে কী কাজের দায়িত্ব নিয়েছিল?

বনভোজনের দ্বিতীয় তালিকায় ছিল—খিচুড়ি, আলু ভাজা, পোনা মাছের কালিয়া, আমের আচার এবং রসগোল্লা ও লেডিকেনি।

দায়িত্ব বণ্টন: প্যালাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজহাঁসের ডিম আনার এবং মাছের কালিয়া রান্নার। আলু ভাজার দায়িত্ব পড়ে ক্যাবলার উপর। হাবুল সেনের দায়িত্ব ছিল তার দিদিমার ঘর থেকে আমের আচার হাতসাফাই করে আনা। আর ধারে মিষ্টি ম্যানেজ করা এবং খিচুড়ি রান্নার ভার ছিল স্বয়ং টেনিদার উপর।

১০.৩ প্যালার রাজহাঁসের ডিম আনার ঘটনাটির বর্ণনা দাও।

প্যালা রাজহাঁসের ডিম আনার জন্য তাদের পাড়ার চালাক ছেলে ভন্টাকে ধরে। ভন্টা ঘুগনি ও ফুলুরি ঘুষ খেয়ে জানায় যে, দুপুরে তার মা যখন ঘুমোবে, তখন প্যালা যেন নিজেই বাক্স থেকে ডিম বের করে নেয়। দুপুরে প্যালা গিয়ে দেখে হাঁস দুটো বাক্সে ডিমে তা দিচ্ছে। ভয়ে ভয়ে প্যালা বাক্সে হাত ঢোকানো মাত্রই একটি রাজহাঁস খটাং করে তার হাত কামড়ে ধরে। প্যালা যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে এবং হ্যাঁচকা টানে হাত ছাড়িয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড় লাগায়। শেষমেশ প্যালার রাজহাঁসের ডিম আনা আর হয়ে ওঠে না।

১০.৪ ট্রেন থেকে নেমে হাঁটতে গিয়ে তাদের কী কী বিপদ ঘটেছিল?

ট্রেন থেকে নেমে ক্যাবলার মামার বাড়ির কাঁচা ও কাদামাখা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় প্রথম বিপদটি ঘটে হাবুলের। সে কাদায় পিছলে আছাড় খায় এবং তার হাতের আমের আচারের হাঁড়িটি ভেঙে রস গড়িয়ে প্যালার গায়ে পড়ে। হাবুলকে বকাবকি করতে গিয়ে টেনিদাও কাদায় লম্বা হয়ে আছাড় খায়। এর ফলে তার হাত থেকে ছিটকে গিয়ে সাদা স্পঞ্জ রসগোল্লাগুলো কাদাভরা পচা খানায় পড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

১০.৫ 'মাছের কালিয়ার তিনটি বেজে গেল'- মাছের কালিয়া সম্পর্কে এ রকম বলার কারণ কী?

প্যালাকে মাছের কালিয়া রাঁধতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনভিজ্ঞ প্যালা কড়াইতে তেল চাপিয়ে তেল গরম হওয়ার আগেই কাঁচা তেলে মাছগুলো ঢেলে দেয়। ফলে কড়াই ভর্তি ফেনা হয়ে যায় এবং কাঁচা তেলে মাছ দেওয়ার কারণে মাছগুলো ভেঙে তালগোল পাকিয়ে 'হালুয়া'-তে পরিণত হয়। মাছের কালিয়ার এই চূড়ান্ত দুর্দশা দেখেই ক্যাবলা ওই মন্তব্যটি করেছিল।

১১. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো (রচনাধর্মী)

১১.১ এই গল্পটির নাম 'বনভোজন' না হয়ে 'বনভোজনের ব্যাপার' হলো কেন?

'বনভোজন' বলতে আমরা সাধারণত বুঝি কয়েকজন মিলে প্রকৃতির মাঝে গিয়ে একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া এবং আনন্দ করা। কিন্তু আলোচ্য গল্পে পটলডাঙার চারমূর্তির বনভোজনটি শেষ পর্যন্ত খাদ্যাভাবে এবং বাঁদরের উপদ্রবে পণ্ড হয়ে যায়।

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বনভোজনকে কেন্দ্র করে যে হুলস্থূল, বিশৃঙ্খলা এবং হাস্যকর কাণ্ডকারখানার (ব্যাপার-স্যাপার) সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই এই গল্পের মূল উপজীব্য। চাঁদা তোলা, রাজহাঁসের ডিম আনতে গিয়ে প্যালার নাজেহাল হওয়া, কাদায় পড়ে মিষ্টি নষ্ট হওয়া, মাছের কালিয়াকে হালুয়া বানানো এবং শেষে বাঁদরের হাতে খাবার তুলে দেওয়া—এই সব 'ব্যাপার' বা কাণ্ডগুলোই গল্পটিতে প্রাধান্য পেয়েছে। যেহেতু বনভোজন সফল হয়নি, বরং তার আয়োজনের বিশৃঙ্খলাই মুখ্য, তাই 'বনভোজন' না হয়ে 'বনভোজনের ব্যাপার' নামকরণটি অনেক বেশি সার্থক ও কৌতুকপূর্ণ হয়েছে।

১১.২ এই গল্পে ক'টি চরিত্রের সঙ্গে তোমার দেখা হলো? প্রত্যেকটি চরিত্র নিয়ে আলোচনা করো।

গল্পটিতে মূল চারজন চরিত্রের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে। তারা হলো পটলডাঙার চারমূর্তি—টেনিদা, প্যালা, ক্যাবলা এবং হাবুল সেন।

  • টেনিদা: দলের পাণ্ডা বা দলপতি। সে অত্যন্ত ভোজনরসিক, কথায় কথায় 'গাট্টা' মারার ভয় দেখায়, কিন্তু বাস্তবে সে বেশ অলস। রান্নার ভার নিয়ে সে বাঁদরকে দিয়ে পিঠ চুলকায়।
  • ক্যাবলা: দলের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও বাস্তববাদী ছেলে। সে-ই হিসেব করে টেনিদার অবাস্তব মোগলাই মেনু বাতিল করে সাধারণ মেনু তৈরি করেছিল।
  • হাবুল সেন: পূর্ববঙ্গের ছেলে, ঢাকাই ভাষায় কথা বলে। সে বনভোজনের জন্য দিদিমার ঘর থেকে আমের আচার চুরি করে এনেছিল।
  • প্যালা: গল্পের কথক। সে অত্যন্ত নিরীহ এবং দুর্বল প্রকৃতির। তাকে দিয়েই সবাই রাজহাঁসের ডিম আনা বা মাছ রান্নার মতো কাজগুলো করিয়ে নেয়, যার ফলে সে বারবার বিপদে পড়ে।
১১.৩ এ গল্পটিতে হাস্যরস সৃষ্টির জন্য ভাষার দিক থেকে লেখক নানারকম কৌশল অবলম্বন করেছেন। কী কী কৌশল তুমি খেয়াল করেছ লেখো।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এই গল্পে অনবদ্য হাস্যরস সৃষ্টি করতে ভাষার নানা কৌশল ব্যবহার করেছেন:

  • অতিরঞ্জিত বর্ণনা: লেখক ছোটো বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে হাসি তৈরি করেছেন। যেমন— "জুতসই লাগলে স্রেফ গালপাট্টা উড়ে যাবে।"
  • প্রবাদের বিকৃত ও কৌতুকপূর্ণ ব্যবহার: "দ্রাক্ষাফল অতিশয় খাট্টা" বা "চালাকি ন চলিয্যতি" ইত্যাদি প্রয়োগে অদ্ভুত হাসির উদ্রেক হয়েছে।
  • কথ্য বা স্ল্যাং শব্দের প্রয়োগ: বোম্বা (গাল), স্পিকটি নট (চুপ), ক্যাবলা, গাঁট্টা ইত্যাদি দেশজ ও কথ্য শব্দের মজাদার প্রয়োগ দেখা যায়।
  • আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার: হাবুল সেনের মুখে ঢাকাই ভাষার ("আহা-হা চৈইত্যা যাইত্যাছ কেন?") ব্যবহার চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মত ও মজাদার করেছে।
  • বিদেশি শব্দের মজাদার মিশ্রণ: ইস্টুপিড, লিস্টি, ইউরেকা প্রভৃতি ইংরেজি শব্দের সঙ্গে বাংলার মিশ্রণে লেখকের শব্দশৈলী হাস্যরসকে তীব্র করেছে।

টেনিদার অমর কীর্তি

'বনভোজনের ব্যাপার' গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই আনন্দদায়ক, তা সে বনভোজন সফল হোক বা না হোক। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে পটলডাঙার চারমূর্তির এই মজাদার কাণ্ডকারখানা বাংলা কিশোর সাহিত্যে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'বনভোজনের ব্যাপার' গল্পটির রচয়িতা প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। এই গল্পের মূল চরিত্র হলো পটলডাঙার চারমূর্তি—টেনিদা, প্যালা (কথক), ক্যাবলা এবং হাবুল সেন।

প্রথমে টেনিদার মতে বিরিয়ানি, কোর্মা, কাবাব প্রভৃতি রাজকীয় মোগলাই খাবারের মেনু ঠিক হয়েছিল। কিন্তু চাঁদা উঠেছিল মাত্র দশ টাকা ছ-আনা, যা দিয়ে ওই রান্নার বাবুর্চি বা জিনিসপত্র জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। তাই ক্যাবলার বুদ্ধিতে তা বাতিল করে খিচুড়ি ও মাছের কালিয়া ঠিক করা হয়।

বাগানে পৌঁছে প্যালা মাছ রাঁধতে গিয়ে কাঁচা তেলে মাছ ফেলে তা হালুয়া বানিয়ে ফেলে। অন্যদিকে টেনিদা খিচুড়ি রান্নার দায়িত্ব নিয়ে গাছতলায় ঘুমিয়ে পড়ে। সেই সুযোগে একদল বানর এসে চাল, ডাল, আলু সব সাবাড় করে দেয়। ফলে বনভোজন আর হয়ে ওঠে না।