পল্লীসমাজ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'পল্লীসমাজ' উপন্যাসের অংশবিশেষের সম্পূর্ণ সারাংশ, হাতে-কলমে প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ সমাধান | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 27 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🌾 পল্লীসমাজ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস (অংশবিশেষ)

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • চতুর্থ পাঠ

কৃষক বিদ্রোহ জলনিকাশি জমিদারতন্ত্র মানবতার জয়

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)

রবীন্দ্র সমসাময়িক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। বর্ণময় জীবনের অধিকারী শরৎচন্দ্র তাঁর লেখায় জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছেন। বাংলার গ্রাম-জীবন এবং মধ্যবিত্ত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-সম্ভাবনা তাঁর গল্প-উপন্যাসে আশ্চর্য মুন্সিয়ানায় ভাষারূপ পেয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হলো— বড়দিদি, পল্লীসমাজ, দেবদাস, রামের সুমতি, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, শ্রীকান্ত প্রভৃতি। লালু, মহেশ, অভাগীর স্বর্গ তাঁর অমর ছোটোগল্প।

১. লেখক পরিচিতি থেকে প্রশ্নোত্তর

১.১ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দুটি উপন্যাসের নাম লেখো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দুটি উপন্যাস হলো— 'শ্রীকান্ত' এবং 'চরিত্রহীন'।

১.২ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দুটি ছোটো গল্পের নাম লেখো।

তাঁর লেখা দুটি ছোটোগল্প হলো— 'মহেশ' এবং 'অভাগীর স্বর্গ'।

২. নীচের প্রশ্নগুলির দু-একটি বাক্যে উত্তর লেখো

৫ টি
২.১ গোপাল সরকারের কাছে বসে রমেশ কী করছিল?

গোপাল সরকারের কাছে বসে রমেশ জমিদারির হিসাবপত্র দেখছিল।

২.২ গ্রামের একমাত্র ভরসা কী ছিল?

গ্রামের কৃষকদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা ছিল একশো বিঘার মাঠটির ফসল।

২.৩ 'বোধ করি এই কথাই হইতেছিল'- কোন কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে?

অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ফলে একশো বিঘার মাঠ জলে ডুবে যাওয়া এবং কৃষকদের ফসল বাঁচাতে জমিদারদের বাঁধ কেটে জল বের করার আবেদনের কথাই এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

২.৪ রমা আকবরকে কোথায় পাহারা দেবার জন্য পাঠিয়েছিল?

রমা লাঠিয়াল আকবরকে তার দুই ছেলেসহ দক্ষিণ ধারের জলার বাঁধ পাহারা দেবার জন্য পাঠিয়েছিল।

২.৫ 'পারবি নে কেন?' উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কোন কাজটি করতে পারবে না?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ লাঠিয়াল সর্দার আকবর ছোটোবাবু রমেশের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে মিথ্যে চোট দেখানোর অভিযোগে নালিশ বা মামলা দায়ের করতে পারবে না।

৩. নীচের প্রশ্নগুলির কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো

১০ টি
৩.১ কুড়িজন কৃষক রমেশের কাছে এসে কেঁদে পড়ল কেন?

অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ফলে গ্রামের কৃষকদের একমাত্র ভরসা একশো বিঘার মাঠ জলে ডুবে গিয়েছিল। দক্ষিণ দিকের জমিদারদের বাঁধটি না কাটলে মাঠের সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে এবং গ্রামের লোক অনাহারে মারা পড়বে। তাই অসহায় কৃষকরা রমেশের কাছে বাঁধ কেটে জল নিকাশের ব্যবস্থা করে তাদের অন্ন বাঁচানোর আকুল আবেদন জানাতে এসে কেঁদে পড়েছিল।

৩.২ রমেশ বেণীর কাছে জল বার করে দেবার হুকুম দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল কেন?

জলে ডুবে থাকা একশো বিঘার মাঠের দক্ষিণ দিকের বাঁধটি ছিল জমিদার বেণীবাবু (বড়দা), রমা এবং রমেশদের যৌথ সম্পত্তি। ওই বাঁধ কাটলেই মাঠের জল বেরিয়ে ফসল বাঁচে। কিন্তু বাঁধের গায়ে থাকা জলায় বছরে প্রায় দুশো টাকার মাছ বিক্রি হতো বলে বেণীবাবু তা আটকে রেখেছিলেন। একা রমেশের পক্ষে বাঁধ কাটার আইনি অধিকার ছিল না বলেই সে বড়দা বেণীর কাছে হুকুম চাইতে গিয়েছিল।

৩.৩ বেণী জল বার করতে চায়নি কেন?

দক্ষিণ দিকের বাঁধের গায়ে থাকা জলায় বছরে প্রায় দুই-তিনশো টাকার মাছ বিক্রি হতো। বাঁধ কেটে দিলে মাঠের জলের সঙ্গে সেই মাছগুলোও বেরিয়ে যাবে এবং জমিদারদের আর্থিক লোকসান হবে। অত্যন্ত লোভী, স্বার্থপর এবং প্রজাদরদহীন বেণীবাবু কৃষকদের পাঁচ হাজার টাকার ফসলের চেয়ে নিজের দুশো টাকার মাছের মূল্য বেশি মনে করেছিল বলেই জল বার করতে চায়নি।

৩.৪ 'ঘৃণায়, লজ্জায়, ক্রোধে, ক্ষোভে রমেশের চোখমুখ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল' রমেশের এমন অবস্থা হয়েছিল কেন?

অসহায় কৃষকদের ধান বাঁচাতে গেলে জমিদারদের দুশো টাকার মাছ ভেসে যাবে, তাই বেণীবাবু বাঁধ কাটতে রাজি হননি। উলটে তিনি রমেশকে উপহাস করে বলেছিলেন যে, ফসল নষ্ট হলে চাষিরা জমি বন্ধক রেখে তাদের কাছেই চড়া সুদে টাকা ধার করতে বাধ্য হবে এবং সেটাই জমিদারদের লাভ। বেণীবাবুর এই নিদারুণ নিষ্ঠুরতা, নীচতা এবং অমানবিক মনোভাব দেখেই মানবদরদী রমেশের বুক ঘৃণায়, লজ্জায়, ক্রোধে ও ক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।

৩.৫ 'রমেশ বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া গেল'- রমেশের বিস্ময়ের কারণ কী ছিল?

বেণীবাবুর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে রমেশ তার বাল্যসখী রমার কাছে বাঁধ কাটার অনুমতি চাইতে গিয়েছিল। রমেশের প্রবল বিশ্বাস ছিল, যে-রমাকে সে অত্যন্ত উঁচু মনের মানুষ বলে জানত, সে কৃষকদের অন্নকষ্টের কথা ভেবে নিশ্চয়ই তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করবে না। কিন্তু রমা যখন শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে জানাল যে সে কোনোমতেই মাছের লোকসান মানতে পারবে না, তখন রমার এই অভাবনীয় নিষ্ঠুর ও বৈষয়িক রূপ দেখে রমেশ বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল।

৩.৬ রমা রমেশের অনুরোধে রাজি হয়নি কেন?

রমা ছিল অত্যন্ত বিষয়-বুদ্ধিসম্পন্না নারী। সে জানত বাঁধ কাটলে মাছ বেরিয়ে গিয়ে জমিদারদের লোকসান হবে। তার সম্পত্তির ওপর তার নাবালক ভাই যতীনেরও অধিকার ছিল, তাই অভিভাবক হিসেবে ভাইয়ের ক্ষতি করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এছাড়া, গ্রামের মানুষের প্রতি রমেশের অসীম দয়া দেখে রমা তাকে একপ্রকার পরীক্ষা করার জন্যই মুখে জেদ বজায় রেখে রমেশের অনুরোধে রাজি হয়নি।

৩.৭ 'মানুষ খাঁটি কি না, চেনা যায় শুধু টাকার সম্পর্কে' কে, কার সম্পর্কে একথা বলেছিল? সে কেন একথা বলেছিল?

উদ্ধৃত কথাটি রমেশ, তার বাল্যসখী রমা সম্পর্কে বলেছিল।
রমেশ যখন রমার কাছে গিয়ে কৃষকদের ফসল বাঁচাতে বাঁধ কাটার অনুরোধ করে, তখন রমা সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং রমেশকে উপহাস করে বলে যে তার এতই দয়া থাকলে সে যেন ক্ষতিপূরণের টাকাটা দিয়ে দেয়। রমার মতো এক জন সম্ভ্রান্ত মেয়ের মুখে টাকার লোভে গরিবদের ভাতে মারার এই জঘন্য কথা শুনেই রমেশ চরম হতাশায় কথাটি বলেছিল।

৩.৮ 'রমা বিহ্বল হতবুদ্ধির ন্যায় ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল' রমার এমন অবস্থা হয়েছিল কেন?

রমেশ যখন রমার কাছে মাছের ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব শোনে, তখন সে রাগে ফেটে পড়ে। সে রমাকে 'হীন, নীচ ও অত্যন্ত ছোটো' বলে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে। রমেশ আরও জানায় যে, মানুষের দয়ার ওপর জুলুম করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করাই সংসারের সবচেয়ে বড়ো পাপ। রমেশের মতো শান্ত ও ভদ্র যুবকের মুখে এমন রুদ্ররূপ ও কঠোর সত্য কথা শুনে রমা কিছু বলতে না পেরে হতবুদ্ধি হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিল।

৩.৯ রমা আকবরকে ডেকে এনেছিল কেন?

রমেশ বাঁধ কাটার জেদ নিয়ে চলে যাওয়ার পর রমা লাঠিয়াল সর্দার আকবরকে ডেকে এনেছিল। আকবর ছিল রমাদের পিরপুর এস্টেটের পুরোনো লাঠিয়াল প্রজা। রমেশ যাতে জোর করে বাঁধ কাটতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে বাঁধ পাহারা দেওয়ার জন্যই রমা আকবর ও তার দুই ছেলেকে সেখানে লাঠি নিয়ে পাঠিয়েছিল।

৩.১০ 'মোরা নালিশ করতি পারব না'— কে একথা বলেছে? সে নালিশ করতে পারবে না কেন?

উদ্ধৃত কথাটি পিরপুরের লাঠিয়াল সর্দার আকবর বলেছে।
আকবর ও তার ছেলেরা রমেশকে আটকাতে গিয়ে রমেশের লাঠির ঘায়ে মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিল। কিন্তু রমেশের অসাধারণ বীরত্ব, কৃষকদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা এবং বিপক্ষের প্রতি মানবিকতা দেখে আকবর মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। রমেশ কোনো বেইমানি করেনি, সামনাসামনি বীরের মতো লড়েছে। তাই পাঁচখানা গ্রামের সর্দার আকবর নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে থানায় গিয়ে মিথ্যে জখম দেখিয়ে রমেশের বিরুদ্ধে নালিশ করতে অস্বীকার করেছিল।

৪. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো

৪ টি
৪.১ 'নইলে আর ব্যাটাদের ছোটোলোক বলেচে কেন'? বক্তা কে? এই উক্তির মধ্যে দিয়ে বক্তার চরিত্রের কী পরিচয় পাও?

উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'পল্লীসমাজ' উপন্যাসের জমিদার বেণী ঘোষাল।

বক্তার চরিত্রের পরিচয়: এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে বেণী ঘোষালের চরম অমানবিকতা, শোষক রূপ এবং নীচ মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। একশো বিঘার মাঠ জলে ডুবে গেলে কৃষকদের সারা বছরের অন্ন জুটবে না জেনেও বেণী বাঁধ কাটতে চায়নি। কারণ সে জানত, চাষিরা খেতে না পেলে তাদের জমি-জমা বন্ধক রেখে বেণীদের কাছেই চড়া সুদে টাকা ধার করতে আসবে। এতে জমিদারদেরই লাভ। গরিব কৃষকদের প্রতি তার কোনো দয়া তো ছিলই না, উলটে তাদের দুর্দশাকে পুঁজি করে সে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে চেয়েছিল। তার কাছে দরিদ্র মানুষগুলো কেবল 'ছোটোলোক' এবং শোষণের হাতিয়ার মাত্র।

৪.২ বেণী, রমা ও রমেশ - চরিত্র তিনটির তুলনামূলক আলোচনা করো। সেইসঙ্গে এই তিনটি চরিত্রের মধ্যে কোন চরিত্রটি তোমার সবথেকে ভালো লেগেছে এবং কেন তা জানাও।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পল্লীসমাজ' পাঠ্যাংশে বেণী, রমা ও রমেশ— এই তিনটি চরিত্র তৎকালীন সমাজব্যবস্থার তিনটি ভিন্ন রূপের প্রতীক।

  • বেণী ঘোষাল: সে হলো চিরাচরিত শোষক ও অত্যাচারী জমিদারের প্রতিমূর্তি। তার মনে বিন্দুমাত্র মানবতা বা প্রজাদরদ নেই। কৃষকের সর্বনাশের মধ্যে দিয়ে সে নিজের আর্থিক লাভ খোঁজে। সে ধূর্ত, কুটিল এবং চরম স্বার্থপর।
  • রমা: রমার চরিত্রটি অত্যন্ত জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে পূর্ণ। জমিদার বাড়ির মেয়ে হওয়ায় তার মধ্যে বৈষয়িক বুদ্ধি ও আভিজাত্যের অহংকার প্রবল। ভাইয়ের অভিভাবক হওয়ায় সে সম্পত্তির ক্ষতি করতে চায় না। কিন্তু অন্তরে সে রমেশকে শ্রদ্ধা করে। বাইরে সে কঠোর হলেও, আকবরের মুখে রমেশের বীরত্বের কথা শুনে সে মনে মনে খুশি হয় এবং রমেশের বিপদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ায় হাফ ছেড়ে বাঁচে।
  • রমেশ: রমেশ হলো নব্য শিক্ষিত, মানবতাবাদী ও আদর্শবান যুবকের প্রতীক। সম্পত্তির চেয়ে তার কাছে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। প্রজাদের অন্ন বাঁচাতে সে নিজের আত্মীয়দের বিরুদ্ধে গিয়ে লাঠি ধরতেও পিছপা হয় না। সে সাহসী, তেজস্বী এবং আপসহীন।

আমার প্রিয় চরিত্র: এই তিনটি চরিত্রের মধ্যে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে রমেশ চরিত্রটিকে। কারণ, রমেশ স্বার্থান্ধ সমাজে এক ব্যতিক্রমী আলোর মতো। সে কেবল কথায় নয়, কাজেও প্রমাণ করেছে যে দরিদ্র কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানুষের ধর্ম। তার সাহস, মানবিকতা এবং আত্মত্যাগ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

৪.৩ উপন্যাসের নামে পাঠ্যাংশটির নামকরণও 'পল্লীসমাজ' রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে নামকরণটি সুপ্রযুক্ত কিনা সে সম্পর্কে মতামত জানাও।

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আলোচ্য পাঠ্যাংশটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত 'পল্লীসমাজ' উপন্যাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ। মূল উপন্যাসের নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে 'পল্লীসমাজ' এবং তা অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত।

পাঠ্যাংশটিতে তৎকালীন বাংলার পল্লী বা গ্রামের এক নগ্ন সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে দেখা যায়, জমিদার শ্রেণির শোষণ, কৃষকদের অসহায় অবস্থা, এবং গ্রামের মানুষের প্রতি উচ্চবিত্তের চরম অবহেলা। বেণী ঘোষাল ও রমার মতো জমিদাররা কীভাবে নিজেদের সামান্য লাভের জন্য সারা গ্রামের কৃষকদের ভাতে মারতে উদ্যত হয়, তা এই পল্লি-রাজনীতিরই একটি দিক। অপরদিকে রমেশের মতো আদর্শবান মানুষের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা, আবার আকবরের মতো লাঠিয়াল প্রজাদের নিজস্ব আত্মসম্মান বোধ— এই সবকিছু মিলিয়ে গ্রামবাংলার সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি এখানে ধরা পড়েছে। যেহেতু সমগ্র কাহিনীটি একটি পল্লির সমাজব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই 'পল্লীসমাজ' নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও যুক্তিসংগত।

৪.৪ পল্লীসমাজ পাঠ্যাংশে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার কোনো নিদর্শন পেয়ে থাকলে সে সম্পর্কে আলোচনা করো। এ ধরনের ব্যবস্থার সুফল ও কুফল সম্পর্কে আলোচনা করো।

হ্যাঁ, 'পল্লীসমাজ' পাঠ্যাংশে তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা বা জমিদারতন্ত্রের স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। এখানে বেণী ঘোষাল এবং রমা হলো সেই সামন্তপ্রভুদের প্রতিনিধি, যাদের হাতে গ্রামের জমি, জলাশয় এবং সাধারণ কৃষকদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হতো। কৃষকরা বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় হাহাকার করলেও, জমিদাররা তাদের দুশো টাকার মাছের লোভে বাঁধ কাটতে রাজি হয়নি। বেণী ঘোষালের উক্তি, "তাদের পাঁচ হাজারই যাক, আর পঞ্চাশ হাজারই যাক... ও-শালাদের জন্যে দু-দুশো টাকা উড়িয়ে দিতে হবে?"— এটি সামন্ততান্ত্রিক শোষণেরই নগ্ন রূপ।

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার কুফল: এই ব্যবস্থার কুফলই বেশি। এতে সমাজের সম্পদ গুটি কয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকে। জমিদাররা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, আর সাধারণ কৃষকরা দিনরাত পরিশ্রম করেও পেট ভরে খেতে পায় না। প্রজাদের ওপর শোষণ, অত্যাচার এবং ঋণজালে আবদ্ধ করে তাদের জমি কেড়ে নেওয়া ছিল এই ব্যবস্থার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

সুফল (যদি কিছু থাকে): সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল খুবই নগণ্য। তবে কখনো কখনো রমেশের মতো শিক্ষিত ও প্রজাদরদী জমিদার থাকলে গ্রামের উন্নতি হতো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত এবং কৃষকরা বিপদে সাহায্য পেত। কিন্তু পাঠ্যাংশের বেণীবাবুর মতো শোষক জমিদারের ক্ষেত্রে এই সুফলের অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে।

৫. সন্ধি করো

বৃষ + তি = বৃষ্টি
অতি + অন্ত = অত্যন্ত
সম্ + বরণ = সংবরণ
কাঁদ্ + না = কান্না
অন্ + আত্মীয় = অনাত্মীয়
এক + অন্ত = একান্ত

৬. নীচের শব্দগুলির সন্ধি বিচ্ছেদ করো

নিরুত্তর = নিঃ + উত্তর
নমস্কার = নমঃ + কার
তারকেশ্বর = তারক + ঈশ্বর
যথার্থ = যথা + অর্থ
প্রত্যাখ্যান = প্রতি + আখ্যান
আশ্চর্য = আ + চর্য
তদবস্থা = তৎ + অবস্থা

৭. দলবিশ্লেষণ করো (Syllabic Break)

শব্দদল বিশ্লেষণদলের ধরন (মুক্ত/রুদ্ধ)
অপরাহ্ণঅ(মু)-প(মু)-রাহ(রু)-ণো(মু)৩টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
অকস্মাৎঅ(মু)-কস(রু)-মাৎ(রু)১টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল
আহ্বানআহ(রু)-বান(রু)২টি রুদ্ধদল
দক্ষিণদক(রু)-খিন(রু)২টি রুদ্ধদল
উচ্ছিষ্টউচ(রু)-ছিস(রু)-টো(মু)১টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল
উত্তপ্তউত(রু)-তপ(রু)-তো(মু)১টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল
বিস্ফারিতবিস(রু)-ফা(মু)-রি(মু)-তো(মু)৩টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
দীর্ঘশ্বাসদীর(রু)-ঘোশ(রু)-শাস(রু)৩টি রুদ্ধদল
অশ্রুপ্লাবিতঅস(রু)-স্রু(মু)-প্লা(মু)-বি(মু)-তো(মু)৪টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
হিন্দুস্থানিহিন(রু)-দুস(রু)-থা(মু)-নি(মু)২টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল
অস্বচ্ছঅস(রু)-সচ(রু)-ছো(মু)১টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল

৮. সমাসবদ্ধ পদে পরিণত করো ও সমাস নির্ণয় করো

প্রশ্ন (ব্যাসবাক্য)সমাসবদ্ধ পদসমাসের নাম
৮.১ জল ও কাদাজলকাদাদ্বন্দ্ব সমাস
৮.২ নয় আহতঅনাহতনঞ তৎপুরুষ সমাস
৮.৩ ত্রি অধিক দশত্রয়োদশমধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
৮.৪ বেগের সহিত বর্তমানসবেগসহার্থক বহুব্রীহি সমাস
৮.৫ মড়ার জন্য কান্নামড়াকান্নানিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস
৮.৬ চন্ডী পুজোর জন্য তৈরি যে মন্ডপচন্ডীমন্ডপমধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস

৯. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো

৯.১ কথাটা রমেশ বুঝিতে পারিল না। (যৌগিক বাক্যে)
রমেশ কথাটা শুনিল কিন্তু বুঝিতে পারিল না।
৯.২ এ বাড়িতে আসিয়া যখন প্রবেশ করিল তখন সন্ধ্যা হয় হয়। (সরল বাক্যে)
এ বাড়িতে প্রবেশ করার সময় সন্ধ্যা হয় হয়।
৯.৩ ওরা খাবে কি? (নির্দেশক বাক্যে)
ওদের খাওয়ার কিছু নেই।
৯.৪ বেণীর এই অত্যন্ত অপমানকর প্রশ্নের উত্তর দিবারও তাহার প্রবৃত্তি হইল না। (হ্যাঁ বাচক বাক্যে)
বেণীর এই অত্যন্ত অপমানকর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থেকে সে বিরত রহিল।
৯.৫ তুমি নীচ, অতি ছোটো। (যৌগিক বাক্যে)
তুমি নীচ এবং অতি ছোটো।
৯.৬ পথে আর এতটুকু কাদা পাবার জো নেই দিদিমা। (প্রশ্নবোধক বাক্যে)
পথে আর এতটুকু কাদা পাবার জো আছে কি দিদিমা?
৯.৭ মাসি উপরে ঠাকুরঘরে আবদ্ধ থাকায় এ সকলের কিছুই জানিতে পারেন নাই। (জটিল বাক্যে)
যেহেতু মাসি উপরে ঠাকুরঘরে আবদ্ধ ছিলেন, সেহেতু এ সকলের কিছুই জানিতে পারেন নাই।

১০. শব্দদুটিকে আলাদা অর্থে ব্যবহার করে বাক্যরচনা করো

যাত্রা:

  • গমন/ভ্রমণ: আমার পুরী যাত্রা অত্যন্ত আরামদায়ক ছিল।
  • পালাগান: কাল রাতে আমাদের গ্রামে খুব সুন্দর একটি যাত্রা হয়েছিল।

বাঁধ:

  • জল আটকানোর প্রাচীর: প্রবল বন্যায় নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রাম ভেসে গেল।
  • আবদ্ধ করা (ক্রিয়া): গরুর গলার দড়িটা খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধ।
Sponsored Links

Frequently Asked Questions

অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ফলে গ্রামের কৃষকদের একমাত্র ভরসা একশো বিঘার মাঠ জলে ডুবে গিয়েছিল। দক্ষিণ দিকের জমিদারদের বাঁধটি না কাটলে মাঠের সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে এবং গ্রামের লোক অনাহারে মারা পড়বে। তাই ফসল বাঁচাতে বাঁধ কেটে জল বের করার অনুমতি চাইতে কৃষকরা রমেশের কাছে এসেছিল।

দক্ষিণ দিকের বাঁধের গায়ে থাকা জলায় বছরে প্রায় দুই-তিনশো টাকার মাছ বিক্রি হতো। বাঁধ কেটে দিলে মাঠের জলের সঙ্গে সেই মাছগুলোও বেরিয়ে গিয়ে জমিদারদের লোকসান হবে। অত্যন্ত লোভী বেণীবাবু কৃষকদের ফসলের চেয়ে নিজের দুশো টাকার মাছের মূল্য বেশি মনে করেছিল বলেই জল বার করতে চায়নি।

রমেশ জেদ করে কৃষকদের ফসল বাঁচাতে জোর করে জমিদারদের বাঁধ কাটতে চলে যায়। রমা ছিল সম্পত্তির অভিভাবক। রমেশ যাতে বাঁধ কেটে মাছের লোকসান ঘটাতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে বাঁধ পাহারা দেওয়ার জন্য রমা তাদের পুরোনো লাঠিয়াল সর্দার আকবরকে ডেকে পাঠিয়েছিল।