ছন্নছাড়া

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত 'ছন্নছাড়া' কবিতার সম্পূর্ণ সারাংশ, হাতে-কলমে প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ সমাধান | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 28 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🚕 ছন্নছাড়া

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত আধুনিক কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • চতুর্থ পাঠ

নাগরিক জীবন বেকার যুবক প্রাণের জয়গান প্রকৃতির জাগরণ

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬)

জন্ম অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত নোয়াখালিতে। বিচিত্র কর্ম-অভিজ্ঞতার সাক্ষী এই লেখকের উল্লেখযোগ্য গল্প-উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে বেদে, বিবাহের চেয়ে বড়, প্রাচীর ও প্রান্তর, সারেঙ প্রভৃতি। 'অমাবস্যা', 'আমরা', 'প্রিয়া ও পৃথিবী' তাঁর রচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। 'কল্লোল' পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এই লেখক-কবি কল্লোলযুগ, কবি শ্রীরামকৃষ্ণ, পরমপুরুষ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ প্রভৃতি স্মরণীয় প্রবন্ধ গ্রন্থের প্রণেতা।

১. কবি পরিচিতি থেকে প্রশ্নোত্তর

১.১ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখা দুটি বইয়ের নাম লেখো।

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখা দুটি বই হলো— 'বেদে' (উপন্যাস) এবং 'কল্লোলযুগ' (প্রবন্ধ গ্রন্থ)।

১.২ তিনি কোন পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন?

তিনি 'কল্লোল' পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

২. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর একটি বাক্যে লেখো

১০ টি
২.১ কবি প্রথমে গাছটিকে কেমন অবস্থায় দেখেছিলেন?

কবি প্রথমে গাছটিকে একটি রুক্ষ, পাতা-ছাল-বাকলহীন শুকনো কাঠির কঙ্কাল অর্থাৎ প্রেতচ্ছায়ার মতো অবস্থায় দেখেছিলেন।

২.২ 'ড্রাইভার বললে, ওদিকে যাব না।' ওদিকে না যেতে চাওয়ার কারণ কী?

ওদিকে গলির মোড়ে ছন্নছাড়া বেকার ছোকরারা আড্ডা দিচ্ছিল এবং তারা গাড়ি থামিয়ে লিফট বা হাওয়া খেতে চাইতে পারে, এই ভয়ে ড্রাইভার ওদিকে যেতে চায়নি।

২.৩ 'তাই এখন পথে এসে দাঁড়িয়েছে সড়কের মাঝখানে।' -সড়কের মাঝখানে, পথে এসে দাঁড়ানোর কারণ কী?

মধ্যবিত্ত বাড়ির একচিলতে যে রকে বসে যুবকেরা আড্ডা দিত, তা লোপাট হয়ে যাওয়ায় তারা নিরুপায় হয়ে এখন সড়কের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

২.৪ 'আমি বললুম, না ওখান দিয়েই যাব।' -কবির 'ওখান' দিয়েই যেতে চাওয়ার কারণ কী?

কবির ওখান দিয়ে যাওয়ার কারণ হলো, তাঁর একটি জরুরি দরকার ছিল এবং ওই পথটি ছিল তাঁর যাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ বা 'শর্টকাট'।

২.৫ 'ওই দেখতে পাচ্ছেন না ভিড়?' ওখানে কীসের ভিড়?

রাস্তায় একটি নিরীহ বেওয়ারিশ ভিখিরি গাড়ি চাপা পড়ে রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়েছিল, তাকে ঘিরেই সেখানে ভিড় জমেছিল।

২.৬ 'কে সে লোক?'-'লোক' টির পরিচয় দাও।

গাড়ি চাপা পড়া লোকটি ছিল একজন বেওয়ারিশ ভিখিরি, যার মাথা গোঁজার কোনো ছাদ বা আপনজন কেউ ছিল না।

২.৭ 'চেঁচিয়ে উঠল সমস্বরে .'-কী বলে তারা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল?

ছন্নছাড়া যুবকেরা রক্তাক্ত ভিখিরিটিকে তুলে ধরে আনন্দে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠেছিল— "প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে।"

২.৮ 'আমি নেমে পড়লুম তাড়াতাড়ি'- কবি তাড়াতাড়ি নেমে পড়লেন কেন?

ভিখারির গায়ের রক্তের দাগ থেকে নিজের তথাকথিত ভব্যতা ও শালীনতাকে বাঁচাতে গিয়ে কবি তাড়াতাড়ি ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়েছিলেন।

২.৯ 'ফিরে আসতেই দেখি........ ফেরার পথে কবি কী দেখতে পেলেন?

ফেরার পথে কবি দেখলেন, গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শুকনো কঙ্কালসার গাছটিতে হাজার হাজার সোনালি কচি পাতা ও ফুলের গুচ্ছ গজিয়ে উঠেছে এবং সেখানে পাখিরা কলকাকলি করছে।

২.১০ 'অবিশ্বাস্য চোখে দেখলুম'- কবির চোখে অবিশ্বাসের ঘোর কেন?

যে গাছটিকে তিনি যাওয়ার সময় রুক্ষ, প্রাণহীন কঙ্কালের মতো দেখেছিলেন, ফেরার সময় সেই গাছেরই কচি পাতা, ফুল, পাখির কলতান ও স্নিগ্ধ ছায়া রূপী প্রাণের অপরূপ বিকাশ দেখে কবির চোখে অবিশ্বাসের ঘোর লেগেছিল।

৩. নির্দেশ অনুসারে প্রশ্নগুলির উত্তর দাও

১১ টি
৩.১ 'ওই পথ দিয়ে / জরুরি দরকারে যাচ্ছিলাম ট্যাক্সি করে।' - কবির যাত্রাপথের অভিজ্ঞতার বিবরণ দাও।

কবি একটি জরুরি দরকারে ট্যাক্সি করে যাচ্ছিলেন। পথটি সংক্ষিপ্ত (শর্টকাট) হওয়ায় তিনি গলির মোড়ের রাস্তাটি ধরেন। সেখানে তিনি একটি প্রাণহীন, শুকনো কঙ্কালের মতো গাছ দেখতে পান। তাঁর গাড়ির চালক ওই পথে যেতে রাজি ছিল না, কারণ রাস্তার মাঝে একদল বেকার, বাউণ্ডুলে যুবক আড্ডা দিচ্ছিল। ড্রাইভারের মতে, ওরা গাড়ি থামিয়ে লিফট বা হাওয়া খেতে চাইতে পারে। তবুও কবি সেই শর্টকাট দিয়েই যান। যুবকদের কাছাকাছি গিয়ে কবি লিফটের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা সানন্দে ট্যাক্সিতে ওঠে এবং জানায় যে একটি বেওয়ারিশ ভিখিরি গাড়ি-চাপা পড়েছে, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। রক্তমাখা ভিখিরিকে তারা পাঁজাকোলা করে ট্যাক্সিতে তোলে এবং তার দেহে 'প্রাণ আছে' জেনে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। ভিখিরির রক্ত থেকে নিজের পোশাক বাঁচাতে কবি ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়েন।

৩.২ 'গলির মোড়ে একটা গাছ দাঁড়িয়ে / গাছ না গাছের প্রেতচ্ছায়া' - একটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে বলেও কেন পরের পঙ্ক্তিতে তাকে 'গাছের প্রেতচ্ছায়া' বলা হয়েছে তা বুঝিয়ে দাও।

সাধারণত 'গাছ' বলতে আমরা সজীব, সবুজ পাতা ও ফুলে ভরা, ছায়া-প্রদানকারী এক প্রাণবন্ত রূপ বুঝি। কিন্তু গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিতে লতা, পাতা, ছাল-বাকল বা একবিন্দু সবুজের কোনো চিহ্ন ছিল না। সেটি ছিল রুক্ষ, শুষ্ক কতকগুলি কাঠির কঙ্কাল মাত্র। তার মধ্যে প্রাণের কোনো স্পন্দন ছিল না, ছিল শুধু মৃত্যুর রূপ। তাই মৃত মানুষের রূপকে যেমন প্রেত বা ভূত বলা হয়, তেমনি প্রাণহীন শুকনো গাছটিকে কবি 'গাছের প্রেতচ্ছায়া' বলেছেন।

৩.৩ 'ওই পথ দিয়ে / জরুরি দরকারে যাচ্ছিলাম ট্যাক্সি করে।' - এভাবে কবিতায় উত্তমপুরুষের রীতি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, অন্তত পাঁচটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে বুঝিয়ে দাও।

কবিতায় কবি যখন নিজের জবানিতে বা 'আমি' স্বত্তায় কোনো ঘটনার বর্ণনা দেন, তখন তাকে 'উত্তমপুরুষের রীতি' বলা হয়। 'ছন্নছাড়া' কবিতায় কবি একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও বক্তা হিসেবে এই রীতি ব্যবহার করেছেন। পাঁচটি উদাহরণ হলো:

  • ১. "জরুরি দরকারে যাচ্ছিলাম ট্যাক্সি করে।"
  • ২. "আমি বললুম, না ওখান দিয়েই যাব,"
  • ৩. "ওদের কাছাকাছি হতেই মুখ বাড়িয়ে / জিজ্ঞেস করলুম,"
  • ৪. "আমি নেমে পড়লুম তাড়াতাড়ি।"
  • ৫. "অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে দেখলুম"
৩.৪ 'কারা ওরা?' - কবিতা অনুসরণে ওদের পরিচয় দাও?

'ওরা' বলতে সমাজের বেকার, বাউণ্ডুলে, উদ্দেশ্যহীন একদল ছোকরার কথা বলা হয়েছে। কবিতায় তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে যে তারা এক 'নেই রাজ্যের' বাসিন্দা। তাদের না আছে কলেজে সিট, না আছে চাকরি, কারখানায় কাজ, বা বাসে-ট্রামে জায়গা। তাদের ভিটেমাটি নেই, আইন-কানুন বা শ্লীলতা-ভদ্রতার তোয়াক্কা তারা করে না। তাদের রোখা মেজাজ, চোখা জুতো এবং ঠোকা কপাল। তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তারা শুধু এক চিলতে রক হারিয়ে এখন রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

৩.৫ 'ঘেঁষবেন না ওদের কাছে।' - এই সাবধানবাণী কে উচ্চারণ করেছেন? 'ওদের' বলতে কাদের কথা বোঝানো হয়েছে? ওদের কাছে না ঘেঁষার পরামর্শ দেওয়া হলো কেন?

এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন কবির ট্যাক্সির ড্রাইভার।

'ওদের' বলতে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেকার, উদ্দেশ্যহীন ও বাউণ্ডুলে যুবকদের বোঝানো হয়েছে।

কারণ: ড্রাইভারের মতে, ওই যুবকদের কোনো ভদ্রতা, শালীনতা বা রীতিনীতি নেই। তাদের মেজাজ রুক্ষ। তারা যেকোনো সময় গাড়ি থামিয়ে লিফট চাইতে পারে বা হাওয়া খাওয়ানোর আবদার জুড়তে পারে। সমাজের চোখে তারা উশৃঙ্খল, তাই ভদ্রলোকদের তাদের এড়িয়ে চলাই ভালো— এই ভেবেই ড্রাইভার ওদের কাছে ঘেঁষতে বারণ করেছে।

৩.৬ 'তাই এখন এসে দাঁড়িয়েছে সড়কের মাঝখানে।' - এখানে কাদের কথা বলা হয়েছে? তাদের জীবনের এমন পরিণতির কারণ কবিতায় কীভাবে ধরা পড়েছে তা নির্দেশ করো।

এখানে গলির মোড়ে আড্ডারত ছন্নছাড়া বেকার যুবকদের কথা বলা হয়েছে।

পরিণতির কারণ: সমাজ ও রাষ্ট্র এই যুবকদের সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে। তাদের জন্য কলেজে পড়ার সিট নেই, অফিসে বা কারখানায় কাজ নেই, এমনকি হাসপাতালে বেড বা খেলার মাঠও নেই। ঘরে-বাইরে কেউ তাদের প্রতি দরদ দেখায় না, সমাজের নেতারা কেবল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে ("নিজের দিকে ঝোল-টানা")। তাদের আড্ডা দেওয়ার একমাত্র জায়গা ছিল একটা মধ্যবিত্ত বাড়ির 'রক', সমাজ সেটাও কেড়ে নিয়েছে। এই বঞ্চনা, হতাশা এবং ভবিষ্যৎহীনতার কারণেই তারা আজ দিকভ্রান্ত হয়ে রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

৩.৭ 'জিজ্ঞেস করলুম / তোমাদের ট্যাক্সি লাগবে?' - প্রশ্নবাক্যটিতে প্রশ্নকর্তার কোন অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে? তাঁর এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার পর কীরূপ পরিস্থিতি তৈরি হলো?

প্রশ্নবাক্যটিতে প্রশ্নকর্তা অর্থাৎ কবির সাহস, কৌতূহল এবং যুবকদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। ড্রাইভারের বারণ সত্ত্বেও তিনি তাদের এড়িয়ে না গিয়ে স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে চেয়েছেন।

পরিস্থিতি: এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার পর এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ছন্নছাড়া যুবকেরা সোল্লাসে ও আনন্দে চিৎকার করে ওঠে— "পেয়ে গেছি পেয়ে গেছি"। তারা তৎক্ষণাৎ ট্যাক্সিতে উঠে পড়ে। কবি জানতে পারেন, তারা কোনো হাওয়া খেতে যাচ্ছে না, বরং রাস্তায় গাড়ি-চাপা পড়া এক মুমূর্ষু, বেওয়ারিশ ভিখিরিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা উদগ্রীব হয়ে ট্যাক্সি খুঁজছিল।

৩.৮ 'প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে।' - এই দুর্মর আশাবাদের 'তপ্ত শঙ্খধ্বনি' কবিতায় কীভাবে বিঘোষিত হয়েছে তা আলোচনা করো।

রাস্তায় গাড়ি-চাপা পড়ে থেঁতলে যাওয়া এক বেওয়ারিশ ভিখিরিকে যখন কেউ ফিরেও দেখেনি, তখন সমাজের চোখে 'বখাটে' যুবকরাই এগিয়ে আসে। রক্তমাখা ভিখিরিকে পাঁজাকোলা করে ট্যাক্সিতে তোলার সময় তারা বুঝতে পারে যে লোকটির বুকে এখনো প্রাণের স্পন্দন আছে। এই সামান্য প্রাণের অস্তিত্বটুকু তাদের আনন্দে উদ্বেলিত করে তোলে। তারা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে— "প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে।" এই আর্তচিৎকার কংক্রিটের শহরে যেন এক শঙ্খধ্বনির মতো বেজে ওঠে, যা প্রমাণ করে যে সমস্ত বাধানিষেধ ও বঞ্চনার ঊর্ধ্বে প্রাণের অধিকারই সবচেয়ে বড়ো সত্য। এই ছন্নছাড়া যুবকদের মধ্যেই যে আসল মানবতা ও প্রাণের জয়গান লুকিয়ে আছে, তা এই আশাবাদের মধ্য দিয়ে বিঘোষিত হয়েছে।

৩.৯ কবিতায় নিজের ভব্যতা ও শালীনতাকে বাঁচাতে চাওয়া মানুষটির 'ছন্নছাড়া'-দের প্রতি যে অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে তা বুঝিয়ে দাও।

কবিতায় ভব্যতা ও শালীনতা বাঁচাতে চাওয়া মানুষটি হলেন স্বয়ং কবি বা তথাকথিত ভদ্রসমাজের প্রতিনিধি। প্রথমে ছন্নছাড়াদের দেখে তাঁর মনেও ভ্রান্তি ছিল। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন ওই বেকার যুবকরা নিজেদের জামাকাপড়ের পরোয়া না করে এক রক্তাক্ত ভিখিরিকে বুকে জড়িয়ে তুলে আনল, তখন তিনি নিজের তথাকথিত 'ভব্যতা' নিয়ে লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হয়ে পড়েন। ভিখিরির রক্ত তাঁর দামি পোশাকে লেগে গেলে তাঁর ভদ্রতা নষ্ট হবে— এই ঠুনকো আত্মসম্মানবোধের কারণে তিনি ট্যাক্সি থেকে নেমে যান। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন যে, ওই ছন্নছাড়ারাই প্রকৃত মানুষ, যাদের অন্তরে মায়া, দরদ ও প্রাণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তাদের এই মানবিকতা কবির মনে এক গভীর রেখাপাত করে।

৩.১০ কবিতায় 'গাছটি' কীভাবে প্রাণের প্রতীক হয়ে উঠেছে তা আলোচনা করো।

কবিতার শুরুতে গাছটিকে একটি রুক্ষ, পাতা-লতাহীন কঙ্কাল বা প্রেতচ্ছায়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সমাজচ্যুত, রিক্ত ও হতাশ ছন্নছাড়া যুবকদের প্রতীক। কিন্তু কবিতার শেষে যখন ওই যুবকদের মধ্যে মানবিকতার চরম স্ফুরণ ঘটে— তারা মুমূর্ষু ভিখিরির প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে— তখন সেই একই গাছের রূপ বদলে যায়। ফেরার পথে কবি দেখেন, সেই মৃতপ্রায় গাছে কচি পাতা গজিয়েছে, ফুল ফুটেছে, পাখিরা গান গাইছে এবং স্নিগ্ধ ছায়া নেমে এসেছে। অর্থাৎ, শুষ্কতা ও হতাশার মাঝে যেমন মানবিকতার রূপ প্রকাশ পেয়েছে, ঠিক তেমনি গাছের এই পুনর্জাগরণ প্রমাণ করে যে 'প্রাণ' থাকলে যেকোনো রুক্ষতা বা কাঠিন্যকে ভেদ করেও নতুন জীবনের মাধুর্য বিস্তার লাভ করতে পারে। এভাবেই গাছটি প্রাণের অদম্য শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

৩.১১ 'এক ক্ষয়হীন আশা / এক মৃত্যুহীন মর্যাদা।' - 'প্রাণকে' কবির এমন অভিধায় অভিহিত করার সঙ্গত কারণ নিজের ভাষায় বিশ্লেষণ করো।

পৃথিবীর যাবতীয় ঐশ্বর্য, সম্পত্তি, আইন-কানুন বা শালীনতার চেয়ে 'প্রাণ'-এর মূল্য অনেক বেশি। ছন্নছাড়া যুবকদের কোনো সামাজিক মর্যাদা বা সম্পদ নেই, কিন্তু তাদের মধ্যে আছে প্রাণের উচ্ছ্বাস ও মানবতা। তারা যখন মুমূর্ষু ভিখিরির দেহে প্রাণ খুঁজে পায়, তখন সেই প্রাণটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। প্রাণ থাকলে তবেই বেঁচে থাকার অধিকার ও আশা থাকে। প্রাণ এমন এক শক্তি যা শুষ্ক কঙ্কালসার গাছেও নতুন ফুল ও পাতা ফোটাতে পারে। তাই প্রাণের কোনো ক্ষয় নেই, তা চিরন্তন আশার সঞ্চার করে। এই কারণেই কবি প্রাণকে 'ক্ষয়হীন আশা' এবং 'মৃত্যুহীন মর্যাদা' বলে অভিহিত করেছেন, যা সমস্ত হতাশা ও রিক্ততাকে জয় করতে পারে।

৪. দল বিভাজন করো

শব্দদল বিভাজন (Syllabic Break)দলের ধরন
এলোমেলোএ(মু)-লো(মু)-মে(মু)-লো(মু)৪টি মুক্তদল
ছন্নছাড়াছন(রু)-নো(মু)-ছা(মু)-ড়া(মু)৩টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
নৈরাজ্যেনৈ(রু)-রাজ(রু)-জে(মু)১টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল
বাসিন্দেবা(মু)-সিন(রু)-দে(মু)২টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
শালীনতাশা(মু)-লী(মু)-ন(মু)-তা(মু)৪টি মুক্তদল
আত্মীয়তাআত(রু)-তী(মু)-য়ো(মু)-তা(মু)৩টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
শঙ্খধ্বনিশং(রু)-খো(মু)-ধো(মু)-নি(মু)৩টি মুক্তদল, ১টি রুদ্ধদল
পত্রপুঞ্জেপত(রু)-ত্রো(মু)-পুন(রু)-জে(মু)২টি মুক্তদল, ২টি রুদ্ধদল

৫. ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করো

বর্তমানবৃৎ + শানচ্
ভদ্রতাভদ্র + তা
সম্ভাষণসম্ - ভাষ্ + অনট
গতিগম্ + ক্তি
ভিখিরিভিক্ষা > ভিখারি > ভিখিরি
ভব্যতাভব্য + তা
রুষ্টরুষ + ক্ত
জিজ্ঞেসজ্ঞাঁ + সন্ + অ
পিছেপশ্চাৎ > পিছে

৬. ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়ম

শব্দপরিবর্তননিয়ম
জুতোজুতা > জুতোস্বরসংগতি
বাসিন্দেবাসিন্দা > বাসিন্দেস্বরসংগতি
ক্ষেতক্ষেত্র > খেত > ক্ষেতসমীভবন / ক্ষ-এর খ-রূপে উচ্চারণ
চোখচক্ষু > চখু > চোখসমীভবন ও স্বরসংগতি
কদ্দুরকত দূর > কদ্দুরব্যঞ্জন সংগতি (প্রগত সমীভবন)
ভিখিরিভিখারি > ভিখিরিস্বরসংগতি

৭. সমাস নির্ণয় করো

সমস্ত পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
প্রেতচ্ছায়াপ্রেতের ছায়াসম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস
ছাল-বাকলছাল ও বাকলসমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস
ক্ষুদাহরণক্ষুদাকে হরণকর্ম তৎপুরুষ সমাস
সোল্লাসেউল্লাসের সহিত বর্তমানসহার্থক বহুব্রীহি সমাস
স্নেহার্দ্রস্নেহ দ্বারা আর্দ্রকরণ তৎপুরুষ সমাস
শঙ্খধ্বনিশঙ্খের ধ্বনিসম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস

৮. উপসর্গ আলাদা করো

প্রতিশ্রুতিপ্রতি (উপসর্গ) + শ্রুতি
বেওয়ারিশবে (উপসর্গ - ফারসি) + ওয়ারিশ
অনুসরণঅনু (উপসর্গ) + সরণ
প্রচ্ছন্নপ্র (উপসর্গ) + ছন্ন
অভি+অর্থনা (অভ্যর্থনা)অভি (উপসর্গ) + অর্থনা
অধিকারঅধি (উপসর্গ) + কার

৯. বাক্য পরিবর্তন করো

৯.১ ওই পথ দিয়ে জরুরি দরকারে যাচ্ছিলাম ট্যাক্সি করে। (জটিল বাক্যে)
যেহেতু একটি জরুরি দরকার ছিল, সেহেতু ওই পথ দিয়ে ট্যাক্সি করে যাচ্ছিলাম।
৯.২ দেখছেন না ছন্নছাড়া কটা বেকার ছোকরা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে- (যৌগিক বাক্যে)
ছন্নছাড়া কটা বেকার ছোকরা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং তারা আড্ডা দিচ্ছে, তা কি দেখছেন না?
৯.৩ কারা ওরা? (প্রশ্ন পরিহার করো)
ওদের পরিচয় জানা নেই।
৯.৪ ঘেঁষবেন না ওদের কাছে। (ইতিবাচক বাক্যে)
ওদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন।
৯.৫ একটা স্ফুলিঙ্গ-হীন ভিজে বারুদের স্তূপ। (না-সূচক বাক্যে)
এমন একটা ভিজে বারুদের স্তূপ, যার মধ্যে স্ফুলিঙ্গ নেই।
৯.৬ জিজ্ঞেস করলুম, তোমাদের ট্যাক্সি লাগবে? (পরোক্ষ উক্তিতে)
আমি তাদের ট্যাক্সি লাগবে কি না, তা জিজ্ঞেস করলুম।
৯.৭ আমরা খালি ট্যাক্সি খুঁজছি। (জটিল বাক্যে)
আমরা এমন ট্যাক্সি খুঁজছি, যা খালি।
৯.৮ দেখতে দেখতে গুচ্ছে গুচ্ছে উথলে উঠেছে ফুল (ক্রিয়ার কাল নির্দেশ করো)
পুরাঘটিত বর্তমান কাল ('উঠেছে')।
Sponsored Links

Frequently Asked Questions

কবিতায় ছন্নছাড়া বেকার যুবকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে তাদের কোনো রীতি-নীতি, আইন-কানুন বা ভদ্রতা নেই। তাদের রোখা মেজাজ, চোখা জুতো এবং ঠোকা কপাল। তারা এক 'নেই রাজ্যের' বাসিন্দা যাদের কলেজে পড়ার সুযোগ বা কারখানায় চাকরি জুটল না।

কবি জানতে পারলেন যে, ছন্নছাড়া যুবকরা হাওয়া খেতে ট্যাক্সি খুঁজছিল না, বরং রাস্তায় গাড়ি-চাপা পড়া এক বেওয়ারিশ ও মুমূর্ষু ভিখিরিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তারা মরিয়া হয়ে খালি ট্যাক্সি খুঁজছিল।

কবিতার শুরুতে যে গাছটি রুক্ষ, শুকনো কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, কবিতার শেষে মুমূর্ষু ভিখিরির প্রাণ বাঁচানোর ঘটনায় সেই গাছেই কচি পাতা ও ফুলের সমারোহ দেখা যায়, যা প্রাণে ফিরে আসার অদম্য শক্তির প্রতীক।