📚 মিলিয়ে পড়ো
(আলাপ)
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
প্রথম ব্যক্তি
সত্যজিৎ রায় (চলচ্চিত্র পরিচালক)
দ্বিতীয় ব্যক্তি
ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ (সেতারী)
ঘটনাস্থল
দিল্লির পালাম বিমানবন্দর
তারিখ ও সময়
২১ ডিসেম্বর, সকাল ৬:৩০
গল্পের সম্পূর্ণ সারাংশ
অষ্টম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের 'মিলিয়ে পড়ো' অংশে অন্তর্গত 'আলাপ' গদ্যাংশটি একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার টুকরো স্মৃতি। ২১শে ডিসেম্বর শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট দেরির কারণে যাত্রীরা আটকে ছিলেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই কফি কর্নারে দাঁড়িয়ে আলাপ করছিলেন ভারতের দুই দিকপাল শিল্পী— একজন বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং অপরজন প্রখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ।
সত্যজিৎ রায় রাজস্থান থেকে পরবর্তী ছবির লোকেশন দেখে কলকাতায় ফিরছিলেন। অন্যদিকে, ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ ওস্তাদ আলি খাঁ সঙ্গীত সম্মেলনে যোগ দিতে কলকাতায় যাচ্ছিলেন। দীর্ঘ পনেরো বছর পর দুজনের দেখা হওয়ায় তাঁরা খুব খুশি ছিলেন।
কথোপকথনের সূত্রপাত হয় ভারতীয় সঙ্গীতের পরিধি নিয়ে। সত্যজিৎ রায় জানতে চান, বিদেশে সেতার বাজানোর সময় তাঁরা 'আলাপ' (সঙ্গীতের সূচনা পর্ব) অংশটিকে ছোটো করে দেন কি না। বিলায়েৎ খাঁ জানান, একেবারেই না। বরং জার্মানি বা ফ্রান্সের শ্রোতারা অনেক বেশি সচেতন, তাঁরা রাগ, তাল, বোল, মীড় খুব ভালো বোঝেন। এরপর আলোচনা গড়ায় রাজস্থানের লোকসঙ্গীত (Folk tune) এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের অসাধারণ বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষমতার দিকে।
এরপর জনৈক দিল্লিপ্রবাসী বাঙালি বিলায়েৎ খাঁ-কে প্রশ্ন করেন, তিনি কেন দিল্লিতে বাজান না। খাঁ সাহেব হাসিমুখে জবাব দেন যে দিল্লিতে সমঝদার (সঠিক বোদ্ধা) শ্রোতার অভাব। তাঁর মতে, নানা রাজনৈতিক ডামাডোল সত্ত্বেও কলকাতার মানুষ গান-বাজনার আসল সমঝদার। এই প্রসঙ্গে তিনি জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের (তবলাবাদক) একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন, যেখানে কলকাতার শিল্পীদের বাজনা শুনে মোরাদাবাদের এক অহংকারী শিল্পী নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়েছিলেন। পরিশেষে, কুয়াশা কেটে রোদ উঠলে এবং প্লেন ছাড়ার ঘোষণা হলে তাঁদের আলোচনা শেষ হয়।
বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য
পালাম বিমানবন্দরে বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং প্রখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ-র দেখা হয়েছিল। দুজনেই কলকাতায় ফিরছিলেন। সত্যজিৎ রায় তাঁর পরবর্তী ছবির লোকেশন দেখতে রাজস্থানে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, বিলায়েৎ খাঁ কলকাতায় ওস্তাদ আলি খাঁ সঙ্গীত সম্মেলনে সেতার বাজানোর উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন।
বক্তা হলেন প্রখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ।
সত্যজিৎ রায় যখন জিজ্ঞাসা করেন যে বিদেশে বাজানোর সময় তাঁরা সেতারের 'আলাপ' অংশটি ছোটো করেন কি না, তখন বিলায়েৎ খাঁ এই উত্তর দেন। তিনি জার্মানি ও ফ্রান্সের বিদেশি শ্রোতাদের সম্পর্কে এই কথা বলেছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বিদেশি শ্রোতারা ভারতীয় মার্গসঙ্গীত, রাগ, তাল, বোল ও মীড়ের কাজ গভীরভাবে বোঝেন এবং মর্যাদা দেন।
ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ-র মতে, দিল্লিতে গান-বাজনার সত্যিকারের সমঝদার (বোদ্ধা বা রসিক) শ্রোতার খুব অভাব ছিল। কিন্তু কলকাতার মানুষের গান-বাজনার প্রতি গভীর অনুরাগ ও জ্ঞান রয়েছে। কলকাতায় যতই রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গণ্ডগোল থাকুক না কেন, এখানকার মানুষ সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে ভোলেনি। তাই কলকাতা থেকে ডাক এলেই খাঁ সাহেবের মনে শিল্পের প্রতি সাড়া জাগত।
মোরাদাবাদের একজন নামজাদা শিল্পী একবার কলকাতায় এসে অহংকার করে বলেছিলেন যে, "কলকাতার আদমিরা বে-রস", অর্থাৎ তাদের গান-বাজনার সমঝ নেই। এই কথায় বিলায়েৎ খাঁ আঘাত পেয়েছিলেন। এর মোক্ষম জবাব দিতে তিনি অনুষ্ঠানের দিন বিখ্যাত তবলাবাদক জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষকে স্টেজে নিয়ে যান এবং তাঁকে কলকাতার একজন 'ছোটোখাটো ক্ষুদ্র শিল্পী' বলে পরিচয় করিয়ে বাজাতে বলেন। জ্ঞানবাবুর আধঘণ্টার অসাধারণ বাজনা শুনে মোরাদাবাদের সেই অহংকারী শিল্পী নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন।