📜 চিঠি
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
প্রথম চিঠি
বিদ্যাসাগরকে লেখা (ফ্রান্স থেকে)
দ্বিতীয় চিঠি
গৌরদাস বসাককে লেখা (জাহাজ থেকে)
তৃতীয় চিঠি
রাজনারায়ণ বসুকে লেখা
প্রধান বিষয়
কাব্য, বিদেশ ভ্রমণ ও বন্ধুত্ব
চিঠিগুলির বিষয়সংক্ষেপ
অষ্টম শ্রেণির 'চিঠি' গদ্যাংশে মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা তিনটি ঐতিহাসিক চিঠি সংকলিত হয়েছে:
১. বিদ্যাসাগরকে লেখা চিঠি (৩ নভেম্বর ১৮৬৪): ফ্রান্সের ভার্সাই থেকে লেখা এই চিঠিতে কবি ইউরোপের প্রচণ্ড শীতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং ভারতচন্দ্রের কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে তিনি ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান এবং জার্মান ভাষা শিখছেন। পাশাপাশি বিপদের দিনে বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম সাহায্যের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
২. গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠি: 'সীলোন' জাহাজে করে ইংল্যান্ড যাত্রার পথে লেখা এই চিঠি। এতে ভূমধ্যসাগর, মালটা, আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে যাত্রার চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। ইংল্যান্ডে গিয়ে জীবিকা ও সম্মান অর্জনের দৃঢ়সংকল্পের কথাও তিনি বন্ধুকে জানিয়েছেন।
৩. রাজনারায়ণ বসুকে লেখা চিঠি: এই চিঠিটি সম্পূর্ণ সাহিত্য-বিষয়ক। এখানে তিনি তাঁর যুগান্তকারী সৃষ্টি 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর ষষ্ঠ সর্গ শেষ করার কথা জানিয়েছেন। কাব্যটি যে সমাজে তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, এবং এটিকে যে মিলটন বা কালিদাসের লেখার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুকে লিখেছেন।
১. অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
২ টিমধুসূদন দত্ত কলকাতার হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন।
'পদ্মাবতী' নাটকে তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন।
২. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো
১০ টিমাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর প্রিয় বন্ধু গৌরদাস বসাককে 'সীলোন' (Ceylon) নামক জাহাজ থেকে চিঠিটি লিখেছিলেন।
যাত্রাপথের বিবরণ: চিঠিতে তাঁর ইংল্যান্ড যাত্রার চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর জাহাজটি একটি রূপকথার ভাসমান প্রাসাদের মতো অপূর্ব। চিঠি লেখার সময় জাহাজটি বিখ্যাত ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং উত্তর আফ্রিকার পর্বতাকীর্ণ উপকূল দেখা যাচ্ছিল। গত রবিবার তাঁরা আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং গতকাল মালটায় ছিলেন। আবহাওয়া ছিল হুগলি নদীর মতো শান্ত এবং বাংলার নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মতো মনোরম। জিব্রাল্টারে পৌঁছে তিনি চিঠিটি ডাকে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
মধুসূদনের জীবনে চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। গৌরদাস বসাককে লেখা চিঠিতে সেই স্বপ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি ইংল্যান্ডে যাচ্ছিলেন মূলত আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ব্যারিস্টার হতে। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, "আমি জীবিকানির্বাহের জন্যে যে পেশা শিখতে এসেছি তাতে মনোনিবেশ করব বলে এবং সম্মান অর্জন করব বলে দৃঢ়সংকল্প।" এই লাইনটি থেকেই তাঁর ভবিষ্যতের প্রতি লক্ষ্য ও জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার উচ্চাশার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে।
বিদেশে সমুদ্রযাত্রার জাঁকজমক ও নতুন পরিবেশের মাঝেও কবি মুহূর্তের জন্যও তাঁর জন্মভূমিকে ভোলেননি। জাহাজের শান্ত সমুদ্রকে দেখে তাঁর মনে পড়েছে দেশের হুগলি নদীটির কথা। সেখানকার আবহাওয়া তাঁর কাছে দেশের 'নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের মতো' বলে মনে হয়েছে। এছাড়াও একাকী যাত্রাপথে তিনি দেশের বন্ধুদের অভাব বোধ করেছেন; তাঁর মনে হয়েছে জাহাজে দেশের দু-চারজন লোক থাকলে ভালো একটা গোষ্ঠী গড়ে তোলা যেত। তিনি চিঠিতে বন্ধু 'হরি'-র খোঁজও নিয়েছেন, যা প্রমাণ করে দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর গভীর টান ছিল।
কোন কথা: শিশুকাল থেকে কবি যে দেশ অর্থাৎ ইংল্যান্ডের কথা ভেবে এসেছেন, আজ প্রতিটি মিনিটে তিনি সেই দেশের নিকটবর্তী হচ্ছেন- এই কথাটিই তাঁর বিশ্বাস হচ্ছে না।
অবিশ্বাস্য মনে হওয়ার কারণ: ইংল্যান্ড বা পাশ্চাত্য জীবনধারা মধুসূদন দত্তকে ছোটোবেলা থেকেই প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। ইউরোপে গিয়ে বিশ্বমানের কবি হওয়ার স্বপ্ন তিনি চিরকাল দেখেছেন। বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে শেষপর্যন্ত যখন তাঁর সেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে এবং তিনি সত্যিই ইংল্যান্ডের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছেন, তখন আবেগে ও বিস্ময়ে এই বাস্তব ঘটনাটিকে তাঁর অবিশ্বাস্য এবং 'কল্পিত কাহিনি থেকেও বিচিত্র' বলে মনে হচ্ছিল।
গৌরদাস বসাকের সঙ্গে মধুসূদনের অত্যন্ত গভীর ও আন্তরিক বন্ধুত্ব ছিল। চিঠির প্রতিটি ছত্রে সেই হৃদ্যতা ফুটে উঠেছে। তিনি বন্ধুকে সম্বোধন করেছেন "হে আমার প্রিয় ও পুরাতন বন্ধু" বলে। ইংল্যান্ডে পৌঁছে ঠিকানা জানালে বন্ধু যেন তাঁকে "প্রাণ উজাড় করে অনবরত পত্রাঘাত" করে, সেই দাবিও তিনি জানিয়েছেন। চিঠির শেষে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি লিখেছেন, "তোমার অকৃত্রিম ও আন্তরিক ও চির স্নেহমুগ্ধ"- যা প্রমাণ করে যে দূর দেশে গিয়েও বন্ধুর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা একটুও কমেনি।
রাজনারায়ণ বসুকে লেখা পত্রে লেখক মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সদ্যসমাপ্ত 'মেঘনাদবধ কাব্য' সম্বন্ধে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বন্ধুকে অনুরোধ করেছেন কাব্যটি পড়ার পর যেন তিনি মেঘনাদবধ সম্পর্কে তাঁর মতামত বা রায় জানান। কারণ মধুসূদনের কাছে রাজনারায়ণ বসুর সাহিত্যবোধ অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। তিনি লিখেছেন, হাজার হাজার মানুষের প্রশংসার চেয়েও রাজনারায়ণের অভিমত তাঁর কাছে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
কাব্য: এখানে মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর কথা বলা হয়েছে।
জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গ: মেঘনাদবধ কাব্যের তুমুল জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে কবি জানিয়েছেন যে, সেযুগের অনেক হিন্দু মহিলা বইটি পড়ছেন এবং পড়ে ক্রন্দন করছেন (যা সেই সময়ে বিরল ঘটনা ছিল)। অনেকেই এই কাব্যটিকে মহামতি মিলটনের কাব্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট বা কালিদাসের কাছাকাছি বলে প্রশংসা করছেন। লেখক নিজে এই কাব্যটিকে ভার্জিল, কালিদাস বা তাসো-র সমতুল্য হওয়া অসম্ভব বলে মনে করেন না। এই সমস্ত প্রসঙ্গের মধ্য দিয়ে কাব্যের অসামান্য জনপ্রিয়তাই ফুটে উঠেছে।
বন্ধুর প্রতি অনুরাগ: রাজনারায়ণ বসুকে লেখা চিঠিতে মধুসূদনের বন্ধুপ্রীতি প্রবল। তিনি রাজনারায়ণের সাহিত্য-সমালোচনার ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখতেন। তাই হাজার মানুষের জয়ধ্বনির চেয়েও বন্ধুর মতামত তাঁর কাছে মূল্যবান ছিল। চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন, "আমি অকপট ও আন্তরিকভাবে তোমার সর্বশ্রেষ্ঠ অনুরাগী।"
সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ: সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর সমর্পণও এই চিঠিতে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ছয়-সাত দিন প্রচণ্ড জ্বরে শয্যাগত থেকেও 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর ষষ্ঠ সর্গ (প্রায় ৭৫০ লাইন) রচনা শেষ করেন। চরিত্রটির সাথে তিনি এতটা একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন যে, কাব্যে মেঘনাদকে মেরে ফেলতে গিয়ে তাঁকে বাস্তবে অনেক অশ্রুপাত করতে হয়েছিল। এই ঘটনা তাঁর সৃষ্টিশীলতার ও সাহিত্যের প্রতি তীব্র আবেগের প্রমাণ দেয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ফ্রান্সের ভার্সাই শহর থেকে লেখা চিঠিটিতে মূলত ইউরোপের তীব্র শীতের অভিজ্ঞতা এবং মধুসূদনের বিদ্যাচর্চার কথা স্থান পেয়েছে। তিনি লিখেছেন যে সেখানকার শীত ভারতের শীতের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি, এবং তা বোঝাতে তিনি ভারতচন্দ্রের "বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী" পঙ্ক্তিটি স্মরণ করেছেন। এছাড়া তিনি ফ্রান্সে অলসভাবে সময় না কাটিয়ে ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান ও জার্মান ভাষা যে নিজে নিজেই রপ্ত করছেন, সে কথাও বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সগর্বে জানিয়েছেন।
মধুসূদন দত্তের জীবনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এক পরম ত্রাতা এবং অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব। বিদ্যাসাগরকে লেখা চিঠিটির শুরুতেই সেই আভাস মেলে। মধুসূদন লিখেছেন, "...যে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জলরাশি থেকে আপনি আমাদের উদ্ধার করেছেন..."। বাস্তবে, ফ্রান্সে থাকার সময় মধুসূদন চরম আর্থিক দুর্দশায় পড়েছিলেন এবং দেনার দায়ে তাঁর জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই গভীর বিপদের দিনে বিদ্যাসাগর মহাশয়ই প্রচুর অর্থ পাঠিয়ে তাঁকে সপরিবারে উদ্ধার করেন। তাই মধুসূদন তাঁর দেশে ফেলে আসা বিষয়-আশয় তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব একমাত্র বিশ্বস্ত ও মহৎ প্রাণ বিদ্যাসাগরের হাতেই নিশ্চিন্তে সমর্পণ করেছিলেন।