পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি

জীবনানন্দ দাশ রচিত 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতার সম্পূর্ণ অনুশীলনীর প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 28 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🌾 পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি

জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

দ্বিপ্রহর বিষণ্ণতা প্রকৃতিপ্রেম

জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)

রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি। জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বরিশালে। প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর টান এবং বিষণ্ণতার সুর তাঁকে 'রূপসী বাংলার কবি' আখ্যা দিয়েছে। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে 'ঝরাপালক', 'ধূসর পাণ্ডুলিপি', 'বনলতা সেন', এবং 'রূপসী বাংলা' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১. কবি পরিচিতি

১.১ জীবনানন্দ দাশের লেখা দুটি কবিতার বইয়ের নাম লেখো।

জীবনানন্দ দাশের লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য কবিতার বইয়ের নাম হলো— 'বনলতা সেন' এবং 'রূপসী বাংলা'।

১.২ তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী?

তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম হলো 'ঝরাপালক' (১৯২৭ সালে প্রকাশিত)।

২. একটি বাক্যে উত্তর দাও

৭ টি
২.১ 'দু-পহর' শব্দের অর্থ কী?

'দু-পহর' শব্দের অর্থ হলো দ্বিপ্রহর বা দুপুরবেলা।

২.২ 'কেবল প্রান্তর জানে তাহা'- প্রান্তর কী জানে?

কবির হৃদয়ে কোন গল্প, কী কাহিনি এবং কী স্বপ্ন ঘর বেঁধেছে—তা কেবল পাড়াগাঁয়ের সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তর জানে।

২.৩ 'তাহাদের কাছে যেন এ জনমে নয় যেন ঢের যুগ ধরে কথা শিখিয়াছে এ হৃদয়'- কাদের কথা এখানে বলা হয়েছে?

এখানে নির্জন পাড়াগাঁয়ের বিস্তীর্ণ প্রান্তর এবং প্রান্তরের আকাশে ওড়া শঙ্খচিলের কথা বলা হয়েছে।

২.৪ 'জলসিড়িটির পাশে ঘাসে...'- কী দেখা যায়?

জলসিড়ি (নদী) টির পাশে ঘাসের উপর বহুদিন ধরে ছন্দহীন বুনো চালতা গাছের শাখাগুলো নুয়ে থাকতে দেখা যায়।

২.৫ 'জলে তার মুখখানা দেখা যায়...' - জলে কার মুখ দেখা যায়?

জলে নদীর পাড়ে নুয়ে পড়া বুনো চালতা গাছটির শাখা-প্রশাখার মুখ দেখা যায়।

২.৬ 'ডিঙিও ভাসিছে কার জলে...'- ডিঙিটি কেমন?

জলে ভাসমান ডিঙিটি জীর্ণ, মালিকানাহীন এবং ঝাঁঝরা-ফোঁপরা (ফাঁপা বা পুরোনো)।

২.৭ ডিঙিটি কোথায় বাঁধা রয়েছে?

মালিকহীন, জীর্ণ ডিঙিটি হিজল গাছের কাণ্ডে বাঁধা রয়েছে।

৩. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও

৪ টি
৩.১ পাড়াগাঁয়ের দ্বিপ্রহরকে কবি ভালোবাসেন কেন?

পাড়াগাঁয়ের নির্জন, নিস্তব্ধ দুপুরে এক মায়াবী ও বিষণ্ণ পরিবেশ বিরাজ করে। দুপুরের রৌদ্রে যেন স্বপ্নের এবং স্মৃতির গন্ধ মিশে থাকে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যে এক ধরনের করুণ মায়া এবং বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে, যা কবির একাকী ও সংবেদনশীল হৃদয়কে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। তাই তিনি পাড়াগাঁয়ের দ্বিপ্রহরকে ভালোবাসেন।

৩.২ 'স্বপ্নে যে-বেদনা আছে'- কবির স্বপ্নে কেন বেদনার অনুভূতি?

কবির স্বপ্নগুলো কেবল আনন্দময় নয়, সেগুলি স্মৃতির ভারে ভারাক্রান্ত। পাড়াগাঁয়ের নিস্তব্ধ দুপুরে শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার শব্দ, শালিক পাখির ডাক, ভাঙা মঠ, এবং রৌদ্রের মধ্যে নক্শাপেড়ে শাড়ি পরা মেয়েটির হলুদ পাতার মতো মিলিয়ে যাওয়া—এই সমস্ত খণ্ডচিত্র কবির মনে অতীত স্মৃতি ও হারানো দিনের হাহাকার জাগিয়ে তোলে। তাই তাঁর স্বপ্নে এক গভীর বেদনার অনুভূতি মিশে থাকে।

৩.৩ প্রকৃতির কেমন ছবি কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

কবিতাটিতে গ্রামবাংলার এক রৌদ্রদগ্ধ, নির্জন এবং বিষণ্ণ দুপুরের নিখুঁত ছবি ফুটে উঠেছে। আকাশে উড়ন্ত শঙ্খচিল, ঝরে পড়া শুষ্ক পাতা, শালিকের ডাক, পুরোনো ভাঙা মঠ, জলসিড়ি নদীর পাড়ে নুয়ে পড়া বুনো চালতা গাছ এবং হিজল গাছে বাঁধা একটি ঝাঁঝরা-ফোঁপরা পরিত্যক্ত ডিঙি নৌকা—এই সমস্ত উপাদান মিলে বাংলার প্রকৃতির এক অপরূপ, উদাস ও শান্ত রূপকে তুলে ধরেছে।

৩.৪ 'কেঁদে কেঁদে ভাসিতেছে আকাশের তলে' - কবির এমন মনে হওয়ার কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?

পাড়াগাঁয়ের দুপুরের পরিবেশটি ভীষণ শান্ত ও রিক্ত। চারিদিকের উপাদানগুলো—যেমন ভাঙা মঠ, পরিত্যক্ত ডিঙি, নুয়ে থাকা বুনো চালতা গাছ—সবই যেন এক অবহেলা ও একাকিত্বের প্রতীক। কবির মনে হয়, দুপুরের এই রোদে যেন এক ভিজে বেদনার গন্ধ মিশে আছে। এই রিক্ততা ও বিষণ্ণতা সমগ্র প্রকৃতিকে গ্রাস করেছে, যার ফলে কবির মনে হয় যেন দুপুরের প্রকৃতি এক অব্যক্ত কান্নায় আকাশের তলে ভাসছে।

৪. নিজের ভাষায় উত্তর দাও

৪.১ 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি...' শীর্ষক কবিতাটি 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের কতসংখ্যক কবিতা? 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতায় কবি জীবনানন্দের কবি-মানসিকতার পরিচয় কীভাবে ধরা দিয়েছে, তা বুঝিয়ে দাও।

কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা: 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের পঁচিশ (২৫) সংখ্যক কবিতা।

কবি-মানসিকতা: জীবনানন্দ দাশ স্বভাবতই এক বিষণ্ণ ও প্রকৃতিপ্রেমী কবি। এই কবিতায় তাঁর সেই মানসিকতার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। তিনি শহুরে কোলাহল থেকে দূরে, গ্রামবাংলার এক নির্জন, রৌদ্রতপ্ত দ্বিপ্রহরকে ভালোবেসেছেন। তাঁর কল্পনায় এই দুপুর কেবল সময়ের হিসাব নয়; এটি স্বপ্ন, স্মৃতি এবং বিষাদের এক মিশ্রণ। শুষ্ক পাতা, ভাঙা মঠ, পরিত্যক্ত ডিঙি নৌকা, শঙ্খচিল বা নুয়ে থাকা বুনো চালতা গাছ—প্রকৃতির এই সাধারণ, তুচ্ছ ও অবহেলিত উপাদানগুলির মধ্যেই কবি তাঁর প্রাণের গভীরতম মায়া ও বেদনার সন্ধান পেয়েছেন। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর এমন অচ্ছেদ্য আত্মিক যোগই তাঁর কবি-মানসিকতার মূল সুর।

৪.২ কবিতাটির গঠন-প্রকৌশল আলোচনা করো।

'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতাটি একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। এটি ১৪ মাত্রার ১৪টি পঙ্ক্তিতে রচিত।

কবিতাটির দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম ৮ লাইনকে বলা হয় 'অষ্টক' (Octave) এবং শেষ ৬ লাইনকে বলা হয় 'ষট্ক' (Sestet)। অষ্টকে কবি পাড়াগাঁয়ের দুপুরের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, স্মৃতি ও বেদনার কথা তুলে ধরেছেন। আর ষট্কে তিনি একটি নির্দিষ্ট চিত্রের মাধ্যমে (জলসিড়ি নদীর পাড়ে চালতা গাছ এবং পরিত্যক্ত ডিঙি) সেই বিষণ্ণতার বাস্তব রূপ বর্ণনা করেছেন। কবিতাটিতে মহাপয়ার ছন্দের ব্যবহার দেখা যায়, যা এর সুরকে আরও ধীর, উদাস ও শান্ত করে তুলেছে।

৪.৩ 'গন্ধ লেগে আছে রৌদ্রে যেন ভিজে বেদনার'- কবিতায় কীভাবে এই অপরূপ বিষণ্ণতার স্পর্শ এসে লেগেছে, তা যথাযথ পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে আলোচনা করো।

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় দুপুরবেলা এক অদ্ভুত বিষাদের চিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়। প্রকৃতির প্রতিটি তুচ্ছ অনুষঙ্গ যেন এক প্রাচীন স্মৃতির কথা বলে, যা আনন্দদায়ক নয়, বরং কান্নায় ভেজা।

কবির মনে হয়, দুপুরের রোদে স্বপ্নের গন্ধ মিশে আছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বেদনাদায়ক—
"স্বপ্নে যে-বেদনা আছে: শুষ্ক পাতা- শালিকের স্বর,
ভাঙা মঠ..."

নকশাপেড়ে শাড়ি পরা মেয়েটির হলুদ পাতার মতো মিলিয়ে যাওয়া এক অসীম শূন্যতা তৈরি করে। এরপর নদীর পাড়ের দৃশ্যটি এই রিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দেয়—
"মালিক কোথাও নাই, কোনোদিন এই দিকে আসিবে না আর,
ঝাঁঝরা-ফোঁপরা, আহা, ডিঙিটিরে বেঁধে রেখে গিয়েছে হিজলে:"

মালিকহীন ভাঙা নৌকা, আর নুয়ে থাকা বুনো চালতা গাছ যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অবহেলার প্রতীক। এই সব টুকরো টুকরো ছবি মিলে দুপুরের রৌদ্রে এক ভিজে বেদনার গন্ধ সৃষ্টি করেছে, যা আকাশের তলে কেঁদে ভাসছে।

ব্যাকরণ ও ভাষাচর্চা

৫ নীচের শব্দগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো: পাড়াগাঁ, দু-পহর, স্বপন, জনম, ভিজে।
  • পাড়াগাঁ: পল্লীগ্রাম > পাড়াগাঁ (সমীভবন ও নাসিক্যীভবন)
  • দু-পহর: দ্বিপ্রহর > দু-পহর (স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ এবং ব্যঞ্জনলোপ)
  • স্বপন: স্বপ্ন > স্বপন (স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ)
  • জনম: জন্ম > জনম (স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ)
  • ভিজে: ভিজিয়া > ভিজে (স্বরসংগতি ও অপিনিহিতির প্রভাব)
৬ নীচের শব্দগুলির ব্যাসবাক্যসহ সমাসের নাম লেখো: শঙ্খচিল, নক্শাপেড়ে, ছন্দহীন।
  • শঙ্খচিল: শঙ্খের ন্যায় শুভ্র যে চিল = উপমান কর্মধারয় সমাস।
  • নক্শাপেড়ে: নক্শাযুক্ত পাড় যার = মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস (বা ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি)।
  • ছন্দহীন: ছন্দ দ্বারা হীন (ছন্দ থেকে হীন) = করণ তৎপুরুষ (বা অপাদান তৎপুরুষ) সমাস।
৭ নীচের বাক্যগুলিতে ক্রিয়ার কাল নির্দেশ করো:
  • ৭.১ পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি-
    ভালোবাসি = সাধারণ বর্তমান কাল (বা নিত্যবৃত্ত বর্তমান)।
  • ৭.২ রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে স্বপনের-
    লেগে আছে = পুরাঘটিত বর্তমান কাল।
  • ৭.৩ শাখাগুলো নুয়ে আছে বহুদিন ছন্দহীন বুনো চালতার:
    নুয়ে আছে = পুরাঘটিত বর্তমান কাল।
  • ৭.৪ ডিঙিও ভাসিছে কার জলে,
    ভাসিছে = ঘটমান বর্তমান কাল (সাধু রূপ)।
  • ৭.৫ কোনোদিন এইদিকে আসিবে না আর,...
    আসিবে না = সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল।
Sponsored Links

Frequently Asked Questions

কবিতাটি প্রখ্যাত প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা। এটি তাঁর বিখ্যাত 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের পঁচিশ সংখ্যক কবিতা।

কবির কাছে পাড়াগাঁয়ের দুপুর নিস্তব্ধ, নির্জন ও একাকিত্বের প্রতীক। এই দুপুরের রৌদ্রে যেন এক বিষণ্ণ ও ভিজে বেদনার গন্ধ মিশে থাকে, যা কবির মনে পুরনো স্মৃতি ও হাহাকার জাগিয়ে তোলে।

কবিতায় উল্লিখিত 'জলসিড়ি' হলো তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (অধুনা বাংলাদেশের) একটি নদীর নাম। এই নদীর পাশেই ছন্দহীন বুনো চালতা গাছটি নুয়ে ছিল।