লোকটা জানলই না

সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত 'লোকটা জানলই না' কবিতার সম্পূর্ণ সারাংশ, বিষয়বস্তু ও প্রশ্নোত্তর | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 29 May 2026 Last Update: 31 May 2026

💔 লোকটা জানলই না

সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

বিষয়াসক্তি হৃদয়হীনতা আলাদিনের প্রদীপ জীবনের পরিণতি

সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩)

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। তাঁকে 'পদাতিক কবি' বলা হয়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'পদাতিক' (১৯৪০)। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো অগ্নিকোণ, চিরকুট, ফুল ফুটুক, যত দূরেই যাই, কাল মধুমাস প্রভৃতি। তিনি সাধারণ মানুষের জীবন, সংগ্রাম এবং শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতায় তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও গভীর মানবতাবোধ ফুটিয়ে তুলেছেন।

💰

বুক পকেট

অর্থ ও সম্পদের প্রতি আসক্তি

❤️

আলাদিনের প্রদীপ

মানুষের হৃদয় বা মানবিকতা

🧱

দেয়াল

স্বার্থপরতা ও বিচ্ছিন্নতা

⏳

পরিণতি

শূন্যতা ও মৃত্যু

কবিতার সারাংশ

সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত 'লোকটা জানলই না' কবিতাটি আধুনিক ভোগবাদী ও বস্তুতান্ত্রিক মানুষের জীবনের এক মর্মান্তিক পরিণতি তুলে ধরেছে। কবিতায় এমন এক মানুষের কথা বলা হয়েছে, যে সারাজীবন তার 'বাঁ দিকের বুক-পকেট' অর্থাৎ টাকাপয়সা ও সম্পত্তি সামলাতেই ব্যস্ত রইল। সে এতটাই বিষয়াসক্ত ছিল যে, অর্থ উপার্জনের নেশায় সে তার নিজের জীবন, আনন্দ এবং চারপাশের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অথচ, সেই বুক-পকেটের ঠিক নিচেই ছিল তার 'হৃদয়', যাকে কবি 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। আলাদিনের প্রদীপ যেমন সব ইচ্ছে পূরণ করতে পারে, তেমনি মানুষের হৃদয়ও পারে ভালোবাসা ও মানবিকতার আলো ছড়াতে। কিন্তু লোকটা কোনোদিন সেই হৃদয়ের খোঁজ করল না। সে নিজের চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে দিল যাতে বাইরের জগতের মুক্ত হাওয়া বা সাধারণ মানুষের ছোঁয়া তাকে ছুঁতে না পারে। অবশেষে একদিন এভাবেই সম্পদের পিছনে ছুটতে ছুটতে এবং ভোগ-বিলাসের মধ্যে ('গোগ্রাসে গিলতে গিলতে') তার জীবন কখন শেষ হয়ে গেল, তা সে টেরই পেল না। অর্থাৎ, প্রকৃত জীবনের স্বাদ না পেয়েই তার ইহকাল ও পরকাল নষ্ট হয়ে গেল।

১. হাতে কলমে (কবি পরিচিতি)

১.১ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী?

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম হলো 'পদাতিক' (১৯৪০ সালে প্রকাশিত)।

১.২ তাঁর লেখা দুটি গদ্যগ্রন্থের নাম লেখো।

তাঁর লেখা দুটি গদ্যগ্রন্থের নাম হলো 'কাঁচা-পাকা' এবং 'ঢোল গোবিন্দের আত্মদর্শন'।

২. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও

৪ টি
২.১ 'বাঁদিকে বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে...'- এখানে 'বাঁদিকের বুক পকেট' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

সাধারণত বাঁ দিকের বুক পকেটেই মানুষ টাকা-পয়সা বা মানিব্যাগ রাখে। এখানে 'বাঁদিকের বুক পকেট' বলতে মানুষের অর্থ, সম্পদ, বিষয়-আশয় এবং বস্তুতান্ত্রিক জীবনের প্রতি তীব্র আসক্তিকে বোঝানো হয়েছে।

২.২ 'ইহকাল পরকাল'- এই শব্দদ্বয় এখানে কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

এখানে 'ইহকাল' বলতে বর্তমান জীবন বা বেঁচে থাকার সময়টাকে বোঝানো হয়েছে এবং 'পরকাল' বলতে ভবিষ্যৎ বা মৃত্যুর পরের জীবনকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, সারাজীবন অর্থের পিছনে ছুটে লোকটি তার বর্তমানের শান্তি এবং ভবিষ্যতের তৃপ্তি— উভয়ই নষ্ট করেছে।

২.৩ কবিতায় লোকটির দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে কী খসে পড়ল?

কবিতায় লোকটির দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে তার মূল্যবান 'জীবন' খসে পড়ল।

২.৪ 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' আসলে কী? তাকে এরকম বলার কারণ বুঝিয়ে দাও?

কী: 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' আসলে মানুষের 'হৃদয়' বা 'মন'।

কারণ: রূপকথার আলাদিনের প্রদীপ ঘষলে যেমন দৈত্য এসে সব ইচ্ছে পূরণ করে এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে, তেমনি মানুষের হৃদয়ও হলো এক ঐশ্বরিক ক্ষমতার উৎস। হৃদয়ের সাহায্যে মানুষ ভালোবাসা, দয়া, মায়া ও মানবিকতার অসীম আনন্দ লাভ করতে পারে এবং অপরকে আপন করে নিতে পারে। তাই হৃদয়কে 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' বলা হয়েছে।

৩. কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো

৪ টি
৩.১ 'লোকটা জানলই না' পঙ্ক্তিটি দুবার কবিতায় আছে। একই পঙ্ক্তিটি একাধিকবার ব্যবহারের কারণ কী?

কবিতায় 'লোকটা জানলই না' পঙ্ক্তিটি দুবার ব্যবহার করে কবি লোকটির চরম অজ্ঞতা, ব্যর্থতা এবং জীবনের ট্রাজেডিকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

প্রথমবার বলা হয়েছে, লোকটি জানল না যে তার পকেটের ঠিক নিচেই আছে প্রেম-ভালোবাসায় পূর্ণ এক অমূল্য হৃদয়। দ্বিতীয়বার বলা হয়েছে, বিষয়-সম্পত্তির পিছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে তার অমূল্য জীবন শেষ হয়ে মৃত্যু ঘনিয়ে এল, তা সে জানতেই পারল না। এই পঙ্ক্তির পুনরাবৃত্তি কবিতার মূল সুর এবং আক্ষেপকে আরও জোরালো করেছে।

৩.২ কবি 'হায়-হায়' কোন প্রসঙ্গে বলেছেন? কেন বলেছেন?

প্রসঙ্গ: লোকটি সারা জীবন বাঁ দিকের বুক-পকেট অর্থাৎ টাকাপয়সা ও সম্পদ সামলাতে গিয়ে নিজের ইহকাল ও পরকাল দুটোই নষ্ট করল, এই প্রসঙ্গে কবি 'হায়-হায়' বলেছেন।

কারণ: কবি এই কথাটি গভীর আক্ষেপ ও দুঃখ প্রকাশ করতে বলেছেন। মানুষ জীবন পায় আনন্দ, মানবিকতা ও ভালোবাসার স্বাদ উপভোগ করার জন্য। কিন্তু যখন সে সব কিছু ভুলে কেবল সম্পদের পিছনে ছুটে নিজের জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়, তখন তা দেখে একজন সংবেদনশীল কবির মনে চরম হতাশা ও খেদের সৃষ্টি হয়।

৩.৩ কবিতাটির নামকরণ যদি হতো 'হৃদয়' বা 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' তাহলে তা কতটা সার্থক হতো?

কবিতাটির নামকরণ 'হৃদয়' বা 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' হলে তা খুব একটা সার্থক হতো না। কারণ, এই শব্দ দুটি কবিতার একটি বিশেষ দিক (মানবিকতা বা ভালোবাসার সম্ভাবনা) নির্দেশ করে মাত্র।

কিন্তু এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু কেবল হৃদয়ের মহিমা নয়, বরং এক আত্মকেন্দ্রিক, বস্তুতান্ত্রিক মানুষের চরম অজ্ঞতা এবং ব্যর্থতা। সারা জীবন সম্পদের পিছনে ছুটে সে যে জীবনের আসল মানে খুঁজে পেল না, এই ট্রাজেডিই কবিতার মূল কথা। তাই 'লোকটা জানলই না' নামকরণটিই তার অজ্ঞতা ও জীবনের চরম করুণ পরিণতিকে সবচেয়ে সার্থকভাবে প্রকাশ করেছে।

৩.৪ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখার যে ধরন তোমার চোখে পড়েছে তা নিয়ে বন্ধুকে একটি চিঠি লেখো।

উত্তর (নমুনা চিঠি):

কল্যাণীয়েষু অয়ন,

আশা করি ভালো আছিস। আজ তোকে আমাদের পাঠ্যবইয়ের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা সম্পর্কে একটা কথা বলতে চাই। ওঁর 'লোকটা জানলই না' কবিতাটা পড়ে ওঁর লেখার ধরন আমার খুব দারুণ লেগেছে।

উনি ভারী ভারী সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করেন না, বরং আমাদের রোজকার মুখের ভাষাতেই কবিতা লেখেন। যেমন 'বুক-পকেট', 'গোগ্রাসে', 'ছোটোলোক হাওয়া'—এইসব সাধারণ শব্দের মধ্যে দিয়েই উনি মানুষের জীবনের গভীরতম সত্য আর সমাজের স্বার্থপরতাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ওঁর কবিতায় কোনো ভনিতা নেই, সোজাসাপটা কথাগুলো একেবারে সোজা বুকে গিয়ে লাগে। এই ধরনের সহজ অথচ তীক্ষ্ণ লেখাই আমার খুব ভালো লেগেছে।

তোর কী মনে হয় জানাস। ভালো থাকিস।

ইতি,
তোর বন্ধু
(নিজের নাম)

ব্যাকরণ ও ভাষাচর্চা

৪ 'অথচ' শব্দটিকে ব্যাকরণের ভাষায় কী বলি? কবিতায় এই 'অথচ'- শব্দটির প্রয়োগ কবি কেন করেছেন?

ব্যাকরণের ভাষায়: 'অথচ' শব্দটিকে ব্যাকরণের ভাষায় বৈপরীত্যবাচক সংযোজক অব্যয় বলা হয়।

প্রয়োগের কারণ: কবিতায় প্রথম স্তবকে বলা হয়েছে যে লোকটি সারা জীবন টাকা-পয়সার পিছনে ছুটে জীবন নষ্ট করল। এরপরেই 'অথচ' শব্দটি ব্যবহার করে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, একটু চেষ্টা করলেই (একটু নীচে হাত দিলেই) সে তার হৃদয় বা মানবিকতার আনন্দ পেতে পারত। বস্তুতান্ত্রিকতা এবং মানবিকতার মধ্যে বৈপরীত্য বোঝাতেই এই অব্যয়টির সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে।

৫ 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' পঙ্ক্তিটিতে মোট ক'টি দল? রুদ্ধদল এবং মুক্তদলের সংখ্যাই বা কত?

'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' পঙ্ক্তিটির দল বিশ্লেষণ:

  • আ (মুক্ত) - লা (মুক্ত) - দি (রুদ্ধ) - নের (রুদ্ধ)
  • আশ্ (রুদ্ধ) - চর্ (রুদ্ধ) - জো (মুক্ত)
  • প্রো (মুক্ত) - দীপ্ (রুদ্ধ)

অর্থাৎ, মোট ৯ টি দল রয়েছে।

এর মধ্যে মুক্তদলের সংখ্যা ৪টি (আ, লা, জো, প্রো) এবং রুদ্ধদলের সংখ্যা ৫টি (দি, নের, আশ্, চর্, দীপ্)।

৬ কবিতার মধ্যে অসমাপিকা ক্রিয়ার সংখ্যা ক'টি ও কী কী?

কবিতার মধ্যে অসমাপিকা ক্রিয়া রয়েছে ৪ টি।

সেগুলি হলো: সামলাতে, সামলাতে, গিলতে, গিলতে।

হৃদয়ের সন্ধান

'লোকটা জানলই না' কবিতাটি আমাদের জীবনের এক গভীর সতর্কবাণী। ধন-সম্পদ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন, কিন্তু কেবল অর্থকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করলে মানুষ তার মানবিকতা ও প্রকৃত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। জীবনকে সুন্দর করতে হলে 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' রূপী আমাদের নিজের হৃদয়ের খোঁজ করা অত্যন্ত জরুরি।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

এই কবিতাটির কবি হলেন প্রখ্যাত বাঙালি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, যাঁকে 'পদাতিক কবি' বলা হয়।

কবিতায় 'আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ' বলতে মানুষের হৃদয় বা মানবিকতাকে বোঝানো হয়েছে, যা ভালোবাসার মাধ্যমে অসীম আনন্দ দিতে পারে।

টাকা-পয়সা ও ভোগবিলাসের পিছনে ছুটে গোগ্রাসে গিলতে গিলতে লোকটার দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে তার মূল্যবান 'জীবন' খসে পড়েছিল।