গাঁয়ের বধূ

সলিল চৌধুরী রচিত কালজয়ী গান 'গাঁয়ের বধূ'-র সম্পূর্ণ সারাংশ, শব্দার্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 28 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🌾 গাঁয়ের বধূ

সলিল চৌধুরী আধুনিক গান

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • চতুর্থ পাঠ

গ্রাম্য জীবন মন্বন্তর (১৯৪৩) হাহাকার কিষাণ-কিষাণী

সলিল চৌধুরী (১৯২৩-১৯৯৫)

বিখ্যাত গীতিকার, সুরকার, কবি এবং নাট্যকার। চলচ্চিত্র-সংগীতের দুনিয়াতেও তিনি অসামান্য সাফল্য পেয়েছিলেন। কাজ করেছেন বাংলা, হিন্দি ও মালয়ালম ছবিতে। পেয়েছেন 'ফিল্মফেয়ার' পুরস্কার (১৯৫৮) এবং 'সংগীত নাটক আকাদেমি' পুরস্কার (১৯৮৮)। এই 'গাঁয়ের বধূ' গানটি কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং গণনাট্য (IPTA) আন্দোলনের এক অমর সৃষ্টি হিসেবে পরিগণিত হয়।

গানের মূল পাঠ (Lyrics)

কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো
রূপকথা নয় সে নয়
জীবনের মধুমাসের কুসুম-ছিঁড়ে-গাঁথা মালা
শিশির-ভেজা কাহিনি শোনাই শোনো।
একটুখানি শ্যামল-ঘেরা কুটিরে তার স্বপ্ন শত শত
দেখা দিত ধানের শিষের ইশারাতে
দিবাশেষে কিষাণ যখন আসত ফিরে
ঘি মউ মউ আম-কাঁঠালের পিঁড়িটিতে বসত তখন,
সবখানি মন উজাড় করে দিত তারে কিষাণী
সেই কাহিনি শোনাই শোনো।
ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঢাকা গ্রামখানি কোন মায়াভরে
শ্রান্তজনে হাতছানিতে ডাকত কাছে আদর করে সোহাগ ভরে
নীল শালুকে দোলন দিয়ে রং ফানুসে ভেসে
ঘুমপরি সে ঘুম পাড়াত এসে কখন জাদু করে
ভোমরা যেত গুনগুনিয়ে ফোটা ফুলের পাশে।
আকাশে বাতাসে সেথায় ছিল পাকা ধানের বাসে বাসে
সবার নিমন্ত্রণ।
সেখানে বারো মাসে তেরো পাবন আষাঢ় শ্রাবণ কি বৈশাখে
গাঁয়ের বধূর শাঁখের ডাকে লক্ষ্মী এসে ভরে দিত
গোলা সবার ঘরে ঘরে।
হায়রে কখন এল শমন অনাহারের বেশেতে
সেই কাহিনি শোনাই শোনো।
ডাকিনী যোগিনী এল শত নাগিনী
এল পিশাচেরা এল রে।
শত পাকে বাঁধিয়া নাচে তাথা তাথিয়া
নাচে তাথা তাথিয়া নাচে রে।
কুটিলের মন্ত্রে শোষণের যন্ত্রে
গেল প্রাণ শত প্রাণ গেল রে।
মায়ার কুটিরে নিল রস লুটি রে
মরুর রসনা এল রে।
হায় সেই মায়া-ঘেরা সন্ধ্যা
ডেকে যেত কত নিশিগন্ধা
হায় বধূ সুন্দরী কোথায় তোমার সেই
মধুর জীবন মধুছন্দা।
হায় সেই সোনাভরা প্রান্তর
সোনালি স্বপনভরা অন্তর
হায় সেই কিষাণের কিষাণীর জীবনের
ব্যথার পাষাণ আমি বহিরে।
আজও যদি তুমি কোনো গাঁয়ে দেখো
ভাঙা কুটিরের সারি।
জেনো সেইখানে সে গাঁয়ের বধূর
আশা-স্বপনের সমাধি।।

সারাংশ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

📖 ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Background)

সলিল চৌধুরীর রচিত 'গাঁয়ের বধূ' নিছক কোনো কল্পনার গান নয়, এটি ১৯৪৩ সালের (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) ভয়ংকর 'তেতাল্লিশের মন্বন্তর' বা বাংলার দুর্ভিক্ষের এক জ্বলন্ত দলিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং দেশীয় মজুতদারদের কৃত্রিম অন্নসংকটের ফলে অবিভক্ত বাংলার প্রায় তিরিশ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। শস্যশ্যামলা গ্রামগুলো কীভাবে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, সেই নির্মম সত্যই এই গানে ধরা পড়েছে।

🌾 সারাংশ (প্রথম পর্ব): শান্তিময় গ্রাম্য জীবন

গানের শুরুতে এক অখ্যাত গ্রামের সাধারণ বধূর জীবনের গল্প বলা হয়েছে। গ্রামটি ছিল সবুজে ঘেরা, শান্ত ও মায়াময়। সেখানে পাকা ধানের গন্ধে ভরা মাঠে স্বপ্ন দেখত কৃষকেরা। দিনশেষে ক্লান্ত কিষাণ যখন ঘরে ফিরত, কিষাণী তার সমস্ত আদর ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে বরণ করে নিত। সেই গ্রামে বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকত। সন্ধ্যায় বধূর শাঁখের শব্দে যেন স্বয়ং লক্ষ্মী এসে কৃষকের ধানের গোলা ভরিয়ে দিতেন। নীল শালুক, ভোমরার গুঞ্জন আর ঘুঘুর ডাকে গ্রামটি যেন রূপকথার মতো সুন্দর ছিল।

🔥 সারাংশ (দ্বিতীয় পর্ব): মন্বন্তরের করাল গ্রাস

হঠাৎ সেই সুখের স্বর্গে 'শমন' (মৃত্যুর দেবতা যম) নেমে আসে অনাহারের বেশে। শোষক, মজুতদার এবং কালোবাজারিদের কবি 'ডাকিনী, যোগিনী, নাগিনী ও পিশাচ' বলে আখ্যাত করেছেন। এদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গ্রামের শত শত নিরীহ মানুষের প্রাণ যায়। সোনার প্রান্তর পরিণত হয় শ্মশানে। মায়াময় কুটিরের আনন্দ লুট হয়ে যায়। আজ যদি বাংলার কোনো গ্রামে ভাঙা কুটিরের সারি দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে সেখানেই লুকিয়ে আছে সেই গাঁয়ের বধূর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর জীবনের সমাধি। কবির অন্তর আজও সেই কিষাণ-কিষাণীর বেদনার ভার বহন করে চলেছে।

গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ (Word Meanings)

শব্দঅর্থ (Meaning)
মধুমাসবসন্তকাল / আনন্দ ও সুখের সময়।
কিষাণ / কিষাণীকৃষক (চাষি) এবং কৃষকের স্ত্রী।
মউ মউমনমাতানো সুগন্ধে ভরে ওঠা (যেমন- ঘিয়ের গন্ধ)।
ফানুসকাগজ দিয়ে তৈরি বেলুন যা গরম ধোঁয়ায় ওড়ে।
পাবন (পার্বণ)উৎসব, অনুষ্ঠান।
শমনমৃত্যুর দেবতা, যমরাজ।
ডাকিনী / যোগিনীডাইনি বা অশুভ আত্মা (এখানে শোষক ও কালোবাজারিদের বোঝানো হয়েছে)।
পিশাচরাক্ষস / অমানুষিক নিষ্ঠুর ব্যক্তি।
রসনাজিভ (এখানে ধ্বংসকারী বা গ্রাসকারী শক্তি অর্থে)।
নিশিগন্ধারজনীগন্ধা ফুল, যা রাতে ফোটে ও সুবাস ছড়ায়।
সমাধিকবর / যেখানে মৃত্যু বা ধ্বংসের পর স্মৃতি প্রোথিত থাকে।

গণনাট্য আন্দোলনের এক অমর সৃষ্টি

সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এই গানটি শুধু একটি গান নয়, এটি বাংলার শোষিত মানুষের এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদ। গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ কীভাবে একটি সুখী গ্রামীণ সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

গানটি বিখ্যাত সুরকার ও গীতিকার সলিল চৌধুরীর লেখা। এটি ১৯৪৩ সালের অবিভক্ত বাংলার ভয়াবহ 'তেতাল্লিশের মন্বন্তর' বা দুর্ভিক্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত, যেখানে শোষক ও মজুতদারদের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়।

গানের প্রথম অংশে একটি শান্ত, শ্যামল ও মায়াময় গ্রামের ছবি ফুটে উঠেছে। সেখানে মাঠে সোনার ধান ফলে, দিনশেষে কৃষক ঘরে ফিরলে গাঁয়ের বধূ তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়। সন্ধ্যায় শাঁখের আওয়াজে ঘরে ঘরে যেন লক্ষ্মীর শ্রী বিরাজ করে।

কবি সেইসব শোষক, কালোবাজারি, এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পিশাচ, ডাকিনী ও যোগিনী বলেছেন, যারা কৃত্রিমভাবে খাদ্যাভাব তৈরি করে গ্রামের নিরীহ কৃষকদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল এবং তাদের সুখের স্বপ্ন লুট করে নিয়েছিল।