মিলিয়ে পড়ো (স্বাদেশিকতা)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'মিলিয়ে পড়ো' (স্বাদেশিকতা) গদ্যাংশের সম্পূর্ণ সারাংশ, বিষয়বস্তু ও সহজ আলোচনা | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 28 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🇮🇳 মিলিয়ে পড়ো
(স্বাদেশিকতা)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মৃতিচারণ / আত্মজীবনীমূলক

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

স্বদেশি আন্দোলন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর গুপ্তসভা সর্বজনীন পোশাক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তাঁর 'জীবনস্মৃতি' ও 'ছেলেবেলা' গ্রন্থগুলিতে তাঁর বাল্য ও যৌবনের নানান ঘটনা, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ এবং সমকালীন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। 'স্বাদেশিকতা' অংশটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারই একটি খণ্ডচিত্র।

🏛️

সভার স্থান

কলকাতার এক গলির পোড়ো বাড়ি

👤

সভাপতি

বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বসু

💡

উদ্যোক্তা

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

🧥

বিশেষত্ব

জাতীয় পোশাকের উদ্ভাবন

গদ্যাংশের সম্পূর্ণ সারাংশ

অষ্টম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের 'মিলিয়ে পড়ো' অংশে অন্তর্গত 'স্বাদেশিকতা' গদ্যাংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ। এখানে তিনি তাঁর যৌবনকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের (তাঁর জ্যোতিদাদা) উদ্যোগে গঠিত একটি গুপ্ত স্বদেশি সভার কথা বর্ণনা করেছেন।

কলকাতার একটি গলির ভেতর এক পোড়ো বাড়িতে এই গুপ্ত সভার অধিবেশন বসত। সভার সভাপতি ছিলেন বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বসু। এই সভার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর গোপনীয়তা— বন্ধ দরজা, অন্ধকার ঘর, ফিসফিস করে কথা বলা এবং ঋকমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ। যদিও তাঁদের কাজে ব্রিটিশ সরকারের ভয়ের কিছু ছিল না, তবুও তরুণদের মনে বীরত্ব ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার জন্যই এই গোপনীয়তার 'খেয়ালি' পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। লেখক বলেছেন যে, দেশের পরাধীন অবস্থায় যুবকদের মধ্যে যে চাপা উত্তেজনা থাকে, তাকে সঠিক পথে পরিচালিত না করলে তা বিষম বিকার বা ট্রাজেডিতে পরিণত হতে পারত। তাঁদের এই সভা গান, আলোচনা ও কল্পনার মাধ্যমে সেই উত্তেজনাকে প্রশমিত করত।

গদ্যাংশের দ্বিতীয় অংশে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অভিনব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তিনি ভারতবর্ষের জন্য একটি 'সর্বজনীন পরিচ্ছদ' (National Dress) তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। ধুতিকে কাজের অনুপযোগী এবং পায়জামাকে বিজাতীয় মনে করে তিনি এই দুয়ের সংমিশ্রণে একটি আজব পোশাক তৈরি করেছিলেন— পায়জামার ওপর পাট করা কাপড়ের কৃত্রিম মালকোঁচা এবং মাথায় সোলার টুপি ও পাগড়ির মিশ্রণ। এই অদ্ভুত পোশাক পরে তিনি অম্লানবদনে কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। লোকের হাসাহাসি বা বিস্ময়কে তিনি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করতেন না। রবীন্দ্রনাথ সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন যে, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার মতো মানুষ হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু দেশের মঙ্গলের জন্য এমন অদ্ভুত পোশাক পরে লোকসমাজে বেরোনোর সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে।

বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য

গুপ্তসভার পরিবেশ কেমন ছিল এবং কেন তা রোমহর্ষক মনে হতো?

কলকাতার এক গলির মধ্যে একটি পোড়ো বাড়িতে এই গুপ্তসভা বসত। দুপুরবেলা বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে সভার সদস্যরা সেখানে যেতেন। সভার দরজা থাকত ভেতর থেকে বন্ধ, ঘর থাকত অন্ধকার। সেখানে ঋকমন্ত্রে দীক্ষা দেওয়া হতো এবং সবাই চুপিচুপি কথা বলতেন। আসলে এই সভার কোনো কাজই রাজা বা প্রজার পক্ষে বিপজ্জনক ছিল না, কেবল এই কৃত্রিম গোপনীয়তা ও রহস্যময় পরিবেশটাই ছিল রোমহর্ষক।

"রাজ্যের মধ্যে বীরধর্মেরও পথ রাখা চাই, নহিলে মানবধর্মকে পীড়া দেওয়া হয়।" — লেখকের এই উক্তির তাৎপর্য কী?

পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকার যুবকদের জন্য কেবল 'কেরানিগিরি' বা সাধারণ চাকরির পথ খোলা রেখেছিল। কিন্তু মানুষের মনে সাহসিকতা ও বীরত্বের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থাকে, তা প্রকাশের কোনো জায়গা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, যৌবনের এই বীরত্বের আকাঙ্ক্ষাকে চেপে রাখলে তা মনের মধ্যে গুপ্ত উত্তেজনা হিসেবে জমতে থাকে এবং ভুল পথে চালিত হয়ে ভয়ানক রূপ নিতে পারে। তাই যুবকদের মনন বিকাশের জন্য বীরধর্ম পালনের সুযোগ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সর্বজনীন পরিচ্ছদ' বা জাতীয় পোশাকটি কেমন ছিল?

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের সব মানুষের জন্য একটি সাধারণ পোশাক তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন ধুতি কর্মক্ষেত্রের উপযোগী নয় এবং পায়জামা বিদেশি পোশাক। তাই তিনি আপস করে একটি পোশাক বানালেন— পায়জামার ওপর একখণ্ড কাপড় পাট করে একটি কৃত্রিম মালকোঁচা জুড়ে দিলেন। আর মাথার জন্য সোলার টুপি ও পাগড়ির সংমিশ্রণে একটি অদ্ভুত শিরোভূষণ তৈরি করলেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারিত্রিক সাহসিকতার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ কী বলেছেন?

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর উদ্ভাবিত সেই অদ্ভুত দর্শন জাতীয় পোশাক পরে নির্দ্বিধায় দিনের বেলায় কলকাতার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতেন। আত্মীয়, দারোয়ান বা কোচমানেরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেও তিনি ভ্রুক্ষেপ করতেন না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার মতো বীরপুরুষ অনেক থাকতে পারে, কিন্তু দেশের মঙ্গলের কথা ভেবে লোকলজ্জা উপেক্ষা করে এমন অদ্ভুত পোশাক পরে জনসমক্ষে বেরোনোর সাহস সত্যিই বিরল।

স্বদেশ প্রেমের অন্য রূপ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই স্মৃতিচারণ আমাদের দেখায় যে, স্বদেশ প্রেম কেবল যুদ্ধ বা বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের মানুষের জন্য একটি সাধারণ সংস্কৃতি বা পরিচ্ছদ গড়ার যে আপ্রাণ ও সাহসী চেষ্টা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর করেছিলেন, তা দেশপ্রেমের এক অসামান্য ও বিরল দৃষ্টান্ত।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

গদ্যাংশে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এবং রাজনারায়ণ বসুর সভাপতিত্বে গঠিত একটি স্বদেশি গুপ্তসভার কথা বলা হয়েছে, যা কলকাতার এক পোড়ো বাড়িতে বসত।

রবীন্দ্রনাথের জ্যোতিদাদা (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর) ভারতের সব মানুষের ব্যবহারের জন্য একটি সর্বজনীন পোশাক তৈরি করেছিলেন, কারণ তাঁর মতে ধুতি কাজের উপযোগী ছিল না এবং পায়জামা ছিল বিজাতীয়।

এই গদ্যাংশটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। এটি তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনার অংশ।