মাসিপিসি

জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' কবিতার সম্পূর্ণ সারাংশ, বিষয়বস্তু ও প্রশ্নোত্তর | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 29 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🌅 মাসিপিসি

জয় গোস্বামী কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

রেলগাড়ি ভোররাত জীবন সংগ্রাম চালের বস্তা

জয় গোস্বামী (১৯৫৪-)

বাংলা সাহিত্যের এক খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় কবি। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কবিতার বই হলো 'প্রত্নজীব', 'উন্মাদের পাঠক্রম', 'ভুতুমভগবান', 'বজ্রবিদ্যুৎভর্তি খাতা', 'পাগলী তোমার সঙ্গে' প্রভৃতি। 'যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল' তাঁর একটি স্মরণীয় কাব্য-উপন্যাস। সাহিত্যকৃতির জন্য তিনি আনন্দ পুরস্কার ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেছেন।

👩‍🌾

মূল চরিত্র

শ্রমজীবী মাসিপিসিরা

⏰

সময়

ভোররাত (শুকতারা ও চাঁদ ওঠার সময়)

🛤️

কর্মক্ষেত্র

রেল বাজার (লালগোলা বনগাঁ লাইন)

💼

জীবিকা

চাল বিক্রি করা

কবিতার সারাংশ

জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' কবিতাটি সমাজের প্রান্তিক, খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী নারীদের এক অবিরাম জীবনসংগ্রামের করুণ চিত্র। আমরা যাদের ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি হিসেবে রূপকথায় চিনি, বাস্তবে তারা ভোররাতে সকলের ঘুমের মধ্যেই জেগে ওঠে। আকাশে তখন শুকতারা আর চাঁদ দৃশ্যমান থাকে। এই নারীরা তাদের পরিবারের অনেকগুলো ক্ষুধার্ত মুখের অন্ন সংস্থানের জন্য, একমুঠো রোজগারের আশায় ভোরের ট্রেন ধরে শহরে যায়।

তাঁদের কোলে-কাঁখে থাকে ভারী চালের বস্তা বা অন্যান্য পসরা। রেলবাজারে তাঁদের নানা বাধা ও ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়, বিশেষ করে হোমগার্ডদের রক্তচক্ষু ও হয়রানি সহ্য করতে হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের রোদ বা বৈশাখের খরতাপ—কোনো কিছুই তাঁদের এই সংগ্রামকে থামাতে পারে না। মাস বা বছরের কোনো হিসেব তাঁদের জীবনে আনন্দ বা পরিবর্তন আনে না। কবি বলতে চেয়েছেন, শত শত বছর পার হয়ে যায়, সভ্যতার অগ্রগতি হয়, কিন্তু লালগোলা বা বনগাঁ লাইনের এই মাসিপিসিদের দারিদ্র্য এবং জীবনযুদ্ধের কোনো অবসান ঘটে না। তাঁদের ক্লান্তিহীন মেহনতই এই কবিতার মূল সুর।

১. হাতে কলমে (কবি পরিচিতি)

১.১ জয় গোস্বামীর লেখা দুটি কবিতার বইয়ের নাম লেখো।

জয় গোস্বামীর লেখা দুটি কবিতার বইয়ের নাম হলো— 'প্রত্নজীব' এবং 'উন্মাদের পাঠক্রম' (অন্যান্য: ভুতুমভগবান, পাগলী তোমার সঙ্গে)।

১.২ জয় গোস্বামীর লেখা একটি উপন্যাসের নাম লেখো।

জয় গোস্বামীর লেখা একটি উপন্যাসের নাম 'সেই সব শেয়ালেরা' (বা 'সুড়ঙ্গ ও প্রতিরক্ষা')।

২. অতিসংক্ষেপে উত্তর দাও

৪ টি
২.১ 'অনেকগুলো পেট বাড়িতে...' পেট-এর আভিধানিক অর্থ কী? এখানে কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

আভিধানিক অর্থ: 'পেট'-এর আভিধানিক অর্থ হলো 'উদর' বা পাকস্থলী।

ব্যবহৃত অর্থ: এখানে 'পেট' বলতে পরিবারের 'ক্ষুধার্ত সদস্যদের' বা 'অন্নপ্রত্যাশী মানুষদের' বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

২.২ 'সাত ঝামেলা জোটায়' এখানে 'সাত' শব্দটির ব্যবহারের কারণ কী?

এখানে 'সাত' শব্দটি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। 'সাত' শব্দটি এখানে 'প্রচুর', 'বহুবিধ' বা 'নানা রকমের' ঝামেলা ও হয়রানি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

২.৩ 'মাহিনা' শব্দটি কবিতায় কী অর্থে ব্যবহৃত? শব্দটির অন্য কোন অর্থ তোমার জানা আছে?

কবিতায় অর্থ: 'মাস মাহিনার হিসেব তো নেই'—এখানে 'মাহিনা' শব্দটি 'মাস' (Month) বা কালের হিসাব অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্য অর্থ: 'মাহিনা' শব্দটির আর একটি পরিচিত অর্থ হলো 'মাসিক বেতন' (Salary/Wage)।

২.৪ কোন শব্দ থেকে এবং কী করে 'জষ্টি' শব্দটি এসেছে?

তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ 'জ্যৈষ্ঠ' থেকে প্রাকৃত বা অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মে (সমীভবন ও স্বরভক্তি) তদ্ভব শব্দ 'জষ্টি' এসেছে। (জ্যৈষ্ঠ > জেঠ্ঠ > জষ্টি)।

৩. সংক্ষেপে উত্তর লেখো

৩ টি
৩.১ 'শুকতারাটি ছাদের ধারে, চাঁদ থামে তালগাছে'- এই পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে দিনের কোন সময়ের কথা বলা হয়েছে? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।

এই পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে রাতের শেষ ভাগ বা ভোররাতের কথা বলা হয়েছে।

যুক্তি: শুকতারা সাধারণত সূর্যোদয়ের আগে ভোরের আকাশে পূব দিকে দেখা যায়। আবার চাঁদ যখন অস্ত যাওয়ার উপক্রম করে বা তালগাছের মাথার কাছে নেমে আসে, তখন স্বভাবতই ভোরের কাছাকাছি সময় নির্দেশ করে। তাই এটি ভোররাতের চিত্র।

৩.২ 'দু একটা ফোঁটা শিশির তাকায় ঘাসের থেকে ঘাসে'- এই পঙ্ক্তিটিতে যে ছবিটি ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।

ভোররাতে যখন মাসিপিসিরা কাজের সন্ধানে বের হন, তখন ঘাসের ডগায় রাতের শিশির বিন্দু জমে থাকে। ভোরের আলো বা আবছা অন্ধকারে সেই শিশির বিন্দুগুলি মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে। কবির মনে হয় যেন শিশির বিন্দুগুলি চোখ মেলে ঘাসের পাতা থেকে অবাক হয়ে মাসিপিসিদের এই অবিরাম জীবন-সংগ্রাম দেখছে। এটি একটি সুন্দর ও স্নিগ্ধ ভোরের ছবি।

৩.৩ 'মাস মাহিনার হিসেব তো নেই' মাস মাহিনার হিসেব নেই কেন?

দরিদ্র, খেটে-খাওয়া মাসিপিসিদের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম একই রকম। মাসের পর মাস, বছর পার হয়ে গেলেও তাঁদের দারিদ্র্য বা অভাব ঘোচে না। জ্যৈষ্ঠের রোদ বা বৈশাখের তাপ কোনো কিছুই তাঁদের বিশ্রামের সুযোগ দেয় না। যেহেতু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না, তাই আলাদা করে তাঁদের কাছে মাস বা মাহিনার হিসাব রাখার কোনো প্রয়োজন বা অর্থ নেই।

৪. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো

৪ টি
৪.১ 'শতবর্ষ এগিয়ে আসে শতবর্ষ যায়'- এই পঙ্ক্তিটির মধ্যে দিয়ে কবি কী বলতে চেয়েছেন আলোচনা করো।

আলোচ্য পঙ্ক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি জয় গোস্বামী শ্রমজীবী মানুষের চিরন্তন বঞ্চনা এবং অবিরাম জীবনসংগ্রামের কথা বোঝাতে চেয়েছেন।

সময়ের নিয়মে একশো বছর পার হয়ে যায়, নতুন শতক আসে। পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন ঘটে, সভ্যতার বিকাশ হয়, কিন্তু সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তরে থাকা খেটে-খাওয়া দরিদ্র মাসিপিসিদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীতে তাঁদের পেটের দায়ে একই ভাবে ভোররাতে উঠে চালের বস্তা কাঁখে নিয়ে ছুটতে হয়। কালের পরিবর্তন হলেও শোষিত মানুষের জীবনযাত্রার যে কোনো বদল হয় না, পঙ্ক্তিটি তারই ইঙ্গিতবাহী।

৪.২ 'মাসিপিসি' কবিতায় এই মাসিপিসি কারা? তাঁদের জীবনের কোন ছবি এই কবিতায় তুমি খুঁজে পাও?

মাসিপিসি কারা: কবিতায় 'মাসিপিসি' বলতে রূপকথার ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিদের বোঝানো হয়নি। এখানে 'মাসিপিসি' হলেন গ্রামবাংলার সেই সব বাস্তব, দরিদ্র, খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী নারী, যাঁরা সংসারের অন্ন জোগাতে প্রতিদিন লড়াই করেন।

জীবনের ছবি: কবিতায় তাঁদের এক কঠোর জীবনসংগ্রামের ছবি ফুটে উঠেছে। পরিবারের অনেকগুলো ক্ষুধার্ত মুখের অন্ন সংস্থানের জন্য তাঁরা ভোররাতে ঘুম থেকে ওঠেন। শুকতারা আকাশে থাকতে থাকতে, শিশির ভেজা পথ মাড়িয়ে তাঁরা রেল স্টেশনে পৌঁছান। কোলে-কাঁখে চালের বস্তা বা পসরা নিয়ে তাঁরা লোকাল ট্রেনে করে শহরে আসেন। সেখানে হোমগার্ড বা পুলিশের নানা হয়রানি ও লাঞ্ছনা তাঁদের সহ্য করতে হয়। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি বা ঋতুপরিবর্তন তাঁদের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না, কারণ পেটের দায়ে তাঁদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি সারা জীবন ধরে চালিয়ে যেতে হয়।

৪.৩ 'মাসিপিসি' কবিতার এই মাসিপিসিদের মতো আর কাদের কথা তুমি বলতে পারো যাঁদের ট্রেনের উপর নির্ভর করে জীবিকা অর্জন করতে হয়?

'মাসিপিসি' কবিতার চাল বিক্রেতা নারীদের মতো আমাদের চারপাশে আরও অনেক প্রান্তিক মানুষ আছেন, যাঁদের জীবিকা পুরোপুরি ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। যেমন—

  • গ্রাম থেকে শহরে আসা সবজি ও ফল বিক্রেতা।
  • লোকাল ট্রেনের হকার (যাঁরা লজেন্স, বই, খেলনা, বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করেন)।
  • দুধ বিক্রেতা বা গোয়ালা, যাঁরা ভোরবেলা ট্রেনে করে শহরে দুধ জোগান দেন।
  • শহরে কাজ করতে আসা দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি বা কারখানার শ্রমিকরা।
৪.৪ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ওরা কাজ করে' কবিতাটি তুমি পড়ে নাও। 'মাসিপিসি' কবিতার সঙ্গে 'ওরা কাজ করে' কবিতার কোন সাদৃশ্য তোমার চোখে পড়ল তা আলোচনা করো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ওরা কাজ করে' এবং জয় গোস্বামীর 'মাসিপিসি' কবিতা দুটির মূল সুর এবং চেতনার মধ্যে গভীর সাদৃশ্য রয়েছে।

সাদৃশ্য: দুটি কবিতাই সমাজের মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জয়গান গেয়েছে। 'ওরা কাজ করে' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, যুগে যুগে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়, রাজারা হারিয়ে যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা মাঠে-ঘাটে কাজ করে, তাদের কাজের কোনো শেষ নেই। ঠিক একইভাবে 'মাসিপিসি' কবিতায় দেখানো হয়েছে যে শত শত বছর কেটে গেলেও এই মাসিপিসিদের জীবনযুদ্ধের কোনো শেষ নেই। রাজায় রাজায় বদল হলেও খেটে খাওয়া মানুষের শাশ্বত শ্রমের ছবি উভয় কবিতাতেই অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অপরিবর্তিত।

৫. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো

প্রদত্ত বাক্য ও নির্দেশ পরিবর্তিত বাক্য
৫.১ ফুল ছুঁয়ে যায় চোখের পাতায়, জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে। (জটিল বাক্যে) যখন ফুল চোখের পাতায় ছুঁয়ে যায়, তখন জল ঠোঁটে ছুঁয়ে যায়।
৫.২ ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি রাত থাকতে ওঠে। (জটিল বাক্যে) যারা ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি, তারা রাত থাকতে ওঠে।
৫.৩ অনেকগুলো পেট বাড়িতে, একমুঠো রোজগার। (যৌগিক বাক্যে) বাড়িতে অনেকগুলো পেট আছে কিন্তু রোজগার মাত্র একমুঠো।

শ্রমজীবী মানুষের জয়গান

'মাসিপিসি' কবিতাটি কেবল একটি সাধারণ কবিতা নয়, এটি সমাজের খেটে-খাওয়া নারীদের প্রতি কবির এক গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য। ভোররাতের অন্ধকার চিরে এই মাসিপিসিরাই সমাজের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। শত বঞ্চনা সত্ত্বেও তাঁদের এই হার না মানা জীবন সংগ্রাম আমাদের সকলকে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেয়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'মাসিপিসি' কবিতাটি প্রখ্যাত বাঙালি কবি জয় গোস্বামীর লেখা।

কবিতায় মাসিপিসিরা হলেন শ্রমজীবী নারী, যাঁরা ভোররাতে উঠে ট্রেন ধরে শহরে যান এবং কোলে-কাঁখে করে চালের বস্তা নিয়ে বিক্রি করে জীবিকা অর্জন করেন।

এখানে 'পেট' বলতে পরিবারের ক্ষুধার্ত সদস্যদের কথা বোঝানো হয়েছে। মাসিপিসিরা তাঁদের পরিবারের এই সব ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন সংস্থানের জন্যই কঠোর পরিশ্রম করেন।