জেলখানার চিঠি

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রচিত 'জেলখানার চিঠি' গদ্যাংশের সম্পূর্ণ সারাংশ, প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 28 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🇮🇳 জেলখানার চিঠি

সুভাষচন্দ্র বসু পত্রসাহিত্য / প্রবন্ধ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

মান্দালয় জেল কারাসংস্কার আধ্যাত্মিকতা দর্শন ও সাহিত্য

সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫)

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও আপসহীন দেশনেতা। 'নেতাজি' নামে তিনি বিশ্ববন্দিত। ভারতবিদ্বেষী ইংরেজ অধ্যাপক ওটেনকে প্রহারের অভিযোগে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিতাড়িত হন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু। আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে তিনি ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো 'তরুণের স্বপ্ন' এবং 'An Indian Pilgrim' (ভারত পথিক)।

পাঠ পরিচিতি ও সারাংশ

প্রেক্ষাপট: 'জেলখানার চিঠি' পাঠ্যাংশটি ১৯২৫ সালের ২ মে, ব্রহ্মদেশের (বর্তমান মায়ানমার) মান্দালয় জেল থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে লেখা একটি ঐতিহাসিক চিঠি।

সারাংশ: চিঠির শুরুতেই নেতাজি জানিয়েছেন যে, দিলীপের চিঠি জেলের সেন্সরের (censor) কড়াকড়ি পার হয়ে অক্ষত অবস্থায় তাঁর হাতে আসায় তিনি আনন্দিত। জেলের অমানবিক পরিবেশে বিনা বিচারে রাজনৈতিক বন্দিদের আটকে রাখায় যে দুঃখ, তাকে তিনি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছেন যে, জেলের পরিবেশ মানুষের নৈতিক উন্নতি ঘটায় না, বরং তাকে আরও হীন করে তোলে। তাই ভবিষ্যতে ভারতের কারাশাসন প্রণালীর সংস্কার সাধন তাঁর অন্যতম কর্তব্য বলে তিনি মনে করেন। এক্ষেত্রে তিনি আমেরিকার উন্নত কারাব্যবস্থার আদর্শকে তুলে ধরেছেন, যেখানে অপরাধীকে সহানুভূতির চোখে দেখা হয় এবং তাদের মানসিক ব্যাধি সারানোর চেষ্টা করা হয়।

কারাজীবনের একাকিত্ব ও কষ্ট একজন বন্দিকে জীবনের চরম সত্য ও দর্শন অনুধাবনে সাহায্য করে। তিনি লোকমান্য তিলকের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, বন্দিদশাতেই তিলক 'গীতারহস্য' লিখেছিলেন, যদিও মান্দালয়ের এই দীর্ঘ বন্দিজীবনই তাঁর অকালমৃত্যুর কারণ হয়েছিল। জেলের খারাপ খাদ্য, ব্যায়ামের অভাব, সংগীত ও বন্ধুজনের অভাব মানুষকে অকালবার্ধক্যের দিকে ঠেলে দেয়। এত কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যেও নেতাজি দেশবাসীর প্রতি তাঁর অবিচল ভালোবাসা ও আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই এই দুঃখ, এবং বিনা কষ্টে অর্জিত সাফল্যের কোনো মূল্য নেই।

হাতে কলমে - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২)

১.১ সুভাষচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন কেন?

ভারতবিদ্বেষী এবং বাঙালির প্রতি অপমানজনক মন্তব্যকারী ইংরেজ অধ্যাপক ওটেনকে (Oaten) প্রহারের অভিযোগে সুভাষচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন।

১.২ রাসবিহারী বসুর কাছ থেকে তিনি কোন্ দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন?

রাসবিহারী বসুর কাছ থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু 'আজাদ হিন্দ ফৌজ'-এর সর্বাধিনায়কের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন।

২.১ তোমার পাঠ্য পত্রখানি কে, কোথা থেকে, কাকে লিখেছিলেন?

পাঠ্য পত্রখানি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেল থেকে, তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে লিখেছিলেন।

২.২ কোন্ ব্যাপারটিকে পত্রলেখক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে দেখার কথা বলেছেন?

বিনা বিচারে বা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কারণে দেশপ্রেমিকদের জেলে বন্দি করে রাখার যে অমানবিক ব্যাপারটি, তাকেই পত্রলেখক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে দেখার কথা বলেছেন, যাতে মনের জোর বজায় থাকে।

২.৩ বন্দিদশায় মানুষের মনে শক্তি সঞ্চারিত হয় কীভাবে?

বন্দিদশায় একটি দার্শনিক ভাব ও চিন্তাভাবনা মানুষের অন্তরে শক্তির সঞ্চার করে। নিজের অন্তরে ভেবে দেখার বিষয় খুঁজে পেলে বন্দির কষ্ট অনেক কমে যায়।

২.৪ মান্দালয় জেল কোথায় অবস্থিত?

মান্দালয় জেল বর্তমান মায়ানমার বা প্রাচীন ব্রহ্মদেশে অবস্থিত।

২.৫ ভারতীয় জেল বিষয়ে একটি পুস্তক সুভাষচন্দ্রের লেখা হয়ে ওঠেনি কেন?

বই লেখার জন্য যে প্রবল উদ্যম ও শারীরিক শক্তির প্রয়োজন, দীর্ঘ কারাবাসে স্বাস্থ্য ভেঙে যাওয়ায় সুভাষচন্দ্রের সেই সামর্থ্য ছিল না, তাই তাঁর পুস্তক লেখা হয়ে ওঠেনি।

২.৬ সুভাষচন্দ্র কেন দিলীপ রায়ের প্রেরিত বইগুলি ফেরত পাঠাতে পারেননি?

দিলীপ রায়ের পাঠানো বইগুলি জেলে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছিল এবং অন্যান্য বন্দিরাও তা পড়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল বলে সুভাষচন্দ্র তখনই বইগুলি ফেরত পাঠাতে পারেননি।

হাতে কলমে - রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (৩)

৩.১ নেতাজি ভবিষ্যতের কোন্ কর্তব্যের কথা এই চিঠিতে বলেছেন? কেন এই কর্তব্য স্থির করেছেন? কারা-শাসন প্রণালী বিষয়ে কাদের পরিবর্তে কাদের প্রণালীকে তিনি অনুসরণযোগ্য বলে মনে করেছেন?

ভবিষ্যতের কর্তব্য: নেতাজি ভবিষ্যতে ভারতের 'কারা-সংস্কার' বা কারাশাসন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করাকে নিজের অন্যতম কর্তব্য বলে স্থির করেছেন।

কারণ: তিনি নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন যে জেলের বর্তমান আবহাওয়া মানুষকে বিকৃত অমানুষ করে তোলার উপযোগী। অপরাধীদের নৈতিক উন্নতি না হয়ে তারা আরও হীন হয়ে পড়ে। তাই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

অনুসরণযোগ্য প্রণালী: নেতাজি ভারতীয় জেলে ব্রিটিশ-প্রণালীর অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে আমেরিকার ইউনাইটেড স্টেটস-এর (USA) মতো উন্নত দেশগুলির সহানুভূতিশীল ব্যবস্থাকে অনুসরণযোগ্য বলে মনে করেছেন।

৩.৪ 'পরের বেদনা সেই বুঝে শুধু যেজন ভুক্তভোগী।'- উদ্ধৃতির সমার্থক বাক্য পত্রটি থেকে খুঁজে নিয়ে লেখো। সেই বাক্যটি থেকে লেখকের কোন্ মানসিকতার পরিচয় পাও?

সমার্থক বাক্য: "আমার মনে হয় না, আমি যদি স্বয়ং কারাবাস না করতাম তাহলে একজন কারাবাসী বা অপরাধীকে ঠিক সহানুভূতির চোখে দেখতে পারতাম।"

মানসিকতার পরিচয়: এই বাক্যটি থেকে নেতাজির গভীর সহানুভূতিশীল ও মানবিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতাদের কষ্ট নয়, সমাজের সাধারণ অপরাধীদের প্রতিও সহমর্মী হয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, অপরাধপ্রবণতা একটি মানসিক ব্যাধি এবং শাস্তি নয়, বরং সহানুভূতির মাধ্যমেই তাদের সংশোধন সম্ভব। নিজে বন্দি না হলে অপরাধীদের এই যন্ত্রণা তিনি অনুধাবন করতে পারতেন না বলে অকপটে স্বীকার করেছেন।

৩.৬ 'Martyrdom' শব্দটির অর্থ কী? এই শব্দটি উল্লেখ করে বক্তা কী বক্তব্য রেখেছেন?

অর্থ: 'Martyrdom' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো 'শহিদত্ব' বা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ বা চরম দুঃখবরণ।

বক্তব্য: দিলীপকুমার রায় নেতাজির এই বিনাবিচারে কারাবাসকে 'Martyrdom' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু নেতাজি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, নিজেকে শহিদ বা আত্মোৎসর্গকারী মনে করার মতো স্পর্ধা বা আত্মম্ভরিতা তাঁর নেই। তাঁর মতে, 'Martyrdom' একটি চরম ও পরম আদর্শ, যা অর্জন করার চেষ্টা করা যায় মাত্র। এর মধ্য দিয়ে নেতাজির নিরহংকার ও আদর্শবাদী চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।

ব্যাকরণ ও ভাষাচর্চা (৪ - ৭)

৪ নীচের বাক্যগুলির তথ্যগত অশুদ্ধি সংশোধন করো:

৪.১ অশুদ্ধ: নেতাজি মনে করতেন না যে, আমাদের সমস্ত দুঃখকষ্টের অন্তরে একটা মহত্তর উদ্দেশ্য কাজ করছে।
শুদ্ধ: নেতাজির নিঃসংশয় ধারণা ছিল যে, আমাদের সমস্ত দুঃখকষ্টের অন্তরে একটা মহত্তর উদ্দেশ্য কাজ করছে।

৪.২ অশুদ্ধ: কারাগারে বন্দি অবস্থায় নেতাজি সুভাষ গীতার আলোচনা লিখেছিলেন।
শুদ্ধ: কারাগারে বন্দি অবস্থায় লোকমান্য তিলক (বালগঙ্গাধর তিলক) গীতার আলোচনা (গীতারহস্য) লিখেছিলেন।

৪.৩ অশুদ্ধ: জেল জীবনের কষ্ট মানসিক অপেক্ষা দৈহিক বলে নেতাজি মনে করতেন।
শুদ্ধ: জেল জীবনের কষ্ট দৈহিক অপেক্ষা মানসিক বলে নেতাজি মনে করতেন।

৫ সমাসবদ্ধ পদ বেছে নিয়ে ব্যাসবাক্য সহ সমাসের নাম লেখো:
বাক্যসমাসবদ্ধ পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
৫.১ তোমার চিঠি হৃদয়তন্ত্রীকে কোমলভাবে স্পর্শ করেছে।হৃদয়তন্ত্রীহৃদয় রূপ তন্ত্রীরূপক কর্মধারয় সমাস
৫.২ সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কারণে জেলে আছি।অজ্ঞাতনয় জ্ঞাত (বা ন জ্ঞাত)নঞ্তৎপুরুষ সমাস
৫.৩ তখন আমার নিঃসংশয় ধারণা জন্মে।নিঃসংশয়নেই সংশয় যারনঞ্বহুব্রীহি সমাস
৫.৪ নূতন দণ্ডবিধির জন্যে পথ ছেড়ে দিতে হবে।দণ্ডবিধিদণ্ড বিষয়ক বিধিমধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
৫.৫ লোকমান্য তিলক কারাবাস-কালে গীতার আলোচনা লেখেন।কারাবাসকারায় (কারাগারে) বাসঅধিকরণ তৎপুরুষ সমাস
৬ শব্দগুলির ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করো:
  • পাঠক: পঠ্ + অক (ণ্বুল)
  • দর্শন: দৃশ্ + অনট্
  • দৈহিক: দেহ + ইক (ষ্ণিক)
  • আধ্যাত্মিক: অধ্যাত্ম + ইক (ষ্ণিক)
  • ভণ্ডামি: ভণ্ড + আমি (প্রত্যয়)
  • সমৃদ্ধ: সম্ - ঋধ্ + ক্ত
  • মহত্ত্ব: মহৎ + ত্ব (ভাববাচক প্রত্যয়)
  • অভিজ্ঞতা: অভি - জ্ঞা + ত + আ
৭ নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো:

৭.১ আমার পক্ষে এর উত্তর দেওয়া সুকঠিন। (না-সূচক বাক্যে)
আমার পক্ষে এর উত্তর দেওয়া সহজ নয়।

৭.২ সেই জন্যই সাধারণের কাছে মুখ দেখাতে সে লজ্জা পায়। (প্রশ্নবোধক বাক্যে)
সেই জন্যই কি সাধারণের কাছে মুখ দেখাতে সে লজ্জা পায় না?

৭.৩ লজ্জায় তারা বাড়িতে কোন সংবাদ দেয়নি। (যৌগিক বাক্যে)
তারা লজ্জা পেয়েছে এবং তাই বাড়িতে কোনো সংবাদ দেয়নি।

৭.৪ কতকগুলি অভাব আছে যা মানুষ ভিতর থেকে পূর্ণ করে তুলতে পারে। (সরল বাক্যে)
মানুষ ভিতর থেকে কতকগুলি অভাব পূর্ণ করে তুলতে পারে।

৭.৫ বিনা দুঃখ কষ্টে যা লাভ করা যায় তার কোন মূল্য আছে? (নির্দেশক বাক্যে)
বিনা দুঃখ কষ্টে যা লাভ করা যায় তার কোনো মূল্য নেই।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

পাঠ্যাংশটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে ১৯২৫ সালের ২ মে লিখেছিলেন।

চিঠিটি মায়ানমারের (ব্রহ্মদেশের) মান্দালয় জেল থেকে লেখা হয়েছিল।

মান্দালয় জেলে কারাবাস-কালে লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক গীতার আলোচনা বা 'গীতারহস্য' লিখেছিলেন।