চন্দ্রগুপ্ত

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত 'চন্দ্রগুপ্ত' নাট্যাংশের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ ও ব্যাকরণ সমাধান | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 27 May 2026 Last Update: 31 May 2026

⚔️ চন্দ্রগুপ্ত (নাট্যাংশ)

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ঐতিহাসিক নাটক

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • প্রথম পাঠ

রাজত্ব বীরত্ব ইতিহাস গ্রিক সাম্রাজ্য

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩)

প্রখ্যাত বাঙালি কবি, নাট্যকার ও সুরকার। তিনি ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে এম. এ. পাশ করেন এবং পরে কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য বিলেতে (ইংল্যান্ড) যান। সেখানে তিনি পাশ্চাত্য সংগীত শেখেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক নাটকগুলি হলো—চন্দ্রগুপ্ত, সাজাহান, মেবার পতন, প্রতাপসিংহ, নূরজাহান প্রভৃতি। দেশাত্মবোধক ও হাসির গান রচনায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। বর্তমান পাঠ্যটি তাঁর 'চন্দ্রগুপ্ত' নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে গৃহীত।

📜

ধরন

নাট্যাংশ (ঐতিহাসিক)

👤

রচয়িতা

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

📚

উৎস

চন্দ্রগুপ্ত নাটক (১ম অঙ্ক, ১ম দৃশ্য)

🗺️

ঘটনাস্থল

সিন্ধু-নদতট (সন্ধ্যাবেলা)

নাট্যাংশের বিষয়সংক্ষেপ

প্রেক্ষাপট ও ঘটনা: গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার (আলেকজান্ডার) অর্ধেক এশিয়া জয় করে ভারতের সিন্ধু নদতটে এসে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে সেনাপতি সেলুকসের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি ভারত-প্রকৃতির অপরূপ বৈচিত্র্য এবং ভারতবাসীদের বীরত্বের (বিশেষত রাজা পুরুর) ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এমন সময় গ্রিক সেনাপতি আন্টিগোনস মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি করে নিয়ে আসেন। চন্দ্রগুপ্ত নির্দ্বিধায় জানান যে, তিনি গ্রিকদের যুদ্ধকৌশল শিখছিলেন যাতে তিনি তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই নন্দের কাছ থেকে হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারেন। তাঁর এই নির্ভীকতা ও সত্যবাদিতায় সম্রাট সেকেন্দার মুগ্ধ হন। এমনকি আন্টিগোনস যখন সেলুকসকে আক্রমণ করে, চন্দ্রগুপ্ত বীরত্বের সঙ্গে সেলুকসকে রক্ষা করেন। পরিশেষে, সেকেন্দার চন্দ্রগুপ্তের শৌর্য ও স্পষ্টবাদিতায় প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বিনাশর্তে মুক্ত করেন এবং ভবিষদ্বাণী করেন যে সে একদিন দুর্জয় দিগ্বিজয়ী হবে।

১ ও ২. অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

৭ টি
১.১ দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য কোথায় গিয়েছিলেন?

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য বিলেত (ইংল্যান্ড) গিয়েছিলেন।

১.২ তাঁর রচিত দুটি নাটকের নাম লেখো।

তাঁর রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য নাটক হলো— সাজাহান এবং প্রতাপসিংহ।

২.১ নাট্যাংশটির ঘটনাস্থল ও সময় নির্দেশ করো।

নাট্যাংশটির ঘটনাস্থল হলো সিন্ধু-নদতট এবং সময় হলো সন্ধ্যাবেলা।

২.২ নাট্যাংশে উল্লিখিত \'হেলেন\' চরিত্রের পরিচয় দাও।

নাট্যাংশে উল্লিখিত \'হেলেন\' হলেন গ্রিক সেনাপতি সেলুকস-এর কন্যা।

২.৩ \'রাজার প্রতি রাজার আচরণ।\' — উদ্ধৃতাংশের বক্তা কে?

উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন ভারতীয় বীর রাজা পুরু।

২.৪ \'জগতে একটা কীর্তি রেখে যেতে চাই\'— বক্তা কীভাবে এই কীর্তি রেখে যেতে চান?

বক্তা গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার শৌখিন দিগ্বিজয়ের মাধ্যমে জগতে এক বিশাল কীর্তি রেখে যেতে চান।

২.৫ \'সম্রাট, আমায় বধ না করে বন্দি করতে পারবেন না।\' বক্তাকে \'বন্দি\' করার প্রসঙ্গ এসেছে কেন?

বক্তা চন্দ্রগুপ্তকে শত্রুর গুপ্তচর সন্দেহে সম্রাট সেকেন্দার বন্দি করার নির্দেশ দেওয়ায় এই প্রসঙ্গটি এসেছে।

৩. সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

৫ টি
৩.১ \'কী বিচিত্র এই দেশ!\' বক্তার চোখে এই দেশের বৈচিত্র্য কীভাবে ধরা পড়েছে?

গ্রিক সম্রাট সেকেন্দারের চোখে ভারতের বৈচিত্র্য অপূর্ব। এ দেশে দিনে প্রচণ্ড সূর্য আকাশ পুড়িয়ে দেয়, আবার রাতে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় তা স্নান করে। প্রকাণ্ড দৈত্যের মতো মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, অভ্রভেদী নীল হিমাদ্রি, উদ্দাম নদনদী এবং মরুভূমির তপ্ত বালুরাশির স্বেচ্ছাচার—সব মিলিয়ে ভারতের প্রকৃতি এক অনন্য বৈচিত্র্যে ভরপুর।

৩.২ ভাবলাম- এ একটা জাতি বটে!\' বক্তা কে? তাঁর এমন ভাবনার কারণ কী?

বক্তা হলেন গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার। বন্দি রাজা পুরুকে যখন সেকেন্দার জিজ্ঞাসা করেন তিনি কেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন, তখন পুরু নির্ভীকভাবে উত্তর দেন, \'রাজার প্রতি রাজার আচরণ\'। একজন বন্দি রাজার এমন আত্মসম্মানবোধ ও বীরত্ব দেখেই সেকেন্দারের মনে ভারতবাসী সম্পর্কে এই উচ্চ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল।

৩.৩ \'এ দিগ্বিজয় অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছেন কেন সম্রাট?\' এ প্রশ্নের উত্তরে সম্রাট কী জানালেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে সম্রাট সেকেন্দার জানালেন যে, দিগ্বিজয় সম্পূর্ণ করতে হলে তাঁর নতুন গ্রিক সৈন্য প্রয়োজন। কারণ, মাসিডন থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যুদ্ধ করতে করতে তাঁর সৈন্যবাহিনী ক্লান্ত, এবং শতদ্রু নদীর তীরে এসে তারা প্রথম প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছে।

৩.৪ \'ভারতবাসী মিথ্যা কথা বলতে এখনও শিখে নাই।\' বক্তা কে? কোন সত্য সে উচ্চারণ করেছে?

বক্তা হলেন মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্ত। আন্টিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তচর সন্দেহে ধরে আনলে, সম্রাট সেকেন্দার তাকে প্রশ্ন করেন সে তালপাতায় কী লিখছিল। এর উত্তরে চন্দ্রগুপ্ত নির্ভয়ে ও সত্য উচ্চারণে জানান যে, তিনি মাসাধিককাল ধরে গ্রিকদের ব্যূহ রচনা-প্রণালী ও সামরিক নিয়ম শিখছিলেন।

৩.৫ \'আমার ইচ্ছা হলো যে দেখে আসি...\'- বক্তার মনে কোন ইচ্ছে জেগে উঠেছিল? তার পরিণতিই বা কী হয়েছিল?

বক্তার (চন্দ্রগুপ্তের) মনে ইচ্ছে জেগেছিল যে, তিনি স্বচক্ষে দেখে আসবেন সেই গ্রিক সম্রাটের বিক্রম, যাঁর ভ্রুকুটিতে সমস্ত এশিয়া পদানত হয়েছে এবং যাঁর পরাক্রমে আর্যদের মহাবীর্যও বিচলিত। এর পরিণতি হিসেবে চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের কাছ থেকে সামরিক কৌশল শিখছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত গুপ্তচর সন্দেহে ধরা পড়েন। তবে তাঁর সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেন।

৪. প্রসঙ্গ ও তাৎপর্য আলোচনা করো

৫ টি
৪.১ \'এ শৌর্য পরাজয় করে আনন্দ আছে।\'

প্রসঙ্গ: দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত \'চন্দ্রগুপ্ত\' নাট্যাংশে সিন্ধু নদের তীরে দাঁড়িয়ে ভারতবাসীর শৌর্য ও বীরত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে সম্রাট সেকেন্দার সেনাপতি সেলুকসকে এ কথা বলেছেন।
তাৎপর্য: ভারতবাসীরা শুধু দেখতে সুন্দর নয়, তাদের দেহে বজ্রের শক্তি, বুকে বাত্যার (ঝড়ের) সাহস এবং চোখে সূর্যের দীপ্তি। এরকম এক মহৎ, নির্ভীক ও শৌর্যশালী জাতিকে যুদ্ধে পরাজিত করার মধ্যে এক প্রকৃত বীরের চরম তৃপ্তি ও অহংকার লুকিয়ে আছে। দুর্বলকে নয়, সবলকে হারানোতেই বিজয়ের প্রকৃত আনন্দ নিহিত—এ কথাই সম্রাট বোঝাতে চেয়েছেন।

৪.২ \'সম্রাট মহানুভব\'।

প্রসঙ্গ: বন্দি রাজা পুরুকে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার কথা শুনে গ্রিক সেনাপতি সেলুকস সম্রাট সেকেন্দারের উদ্দেশ্যে এই উক্তিটি করেছেন।
তাৎপর্য: সম্রাট সেকেন্দার দিগ্বিজয়ী হলেও তিনি একজন গুণগ্রাহী ও মহানুভব বীর। বন্দি রাজা পুরু যখন সেকেন্দারের কাছে নির্ভীকভাবে \'রাজার প্রতি রাজার আচরণ\' দাবি করেন, তখন সেকেন্দার অপমানিত বোধ করার বদলে পুরুর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে তার রাজ্য ফিরিয়ে দেন। সেকেন্দারের এই মহৎ গুণের প্রশংসা করতেই সেলুকস তাঁকে মহানুভব আখ্যা দিয়েছেন।

৪.৩ \'বাধা পেলাম প্রথম - সেই শতদ্রুতীরে।\'

প্রসঙ্গ: সেলুকসের প্রশ্নের উত্তরে, দিগ্বিজয় অসম্পূর্ণ রেখে ফিরে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সম্রাট সেকেন্দার এই কথাটি বলেন।
তাৎপর্য: সেকেন্দার মাসিডন থেকে শুরু করে এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূভাগ জয় করে ঝড়ের বেগে অগ্রসর হয়েছিলেন। তার বিজয়রথ কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। কিন্তু ভারতের শতদ্রু নদীর তীরে এসে তাকে প্রথম প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। ভারতীয় বীরদের পরাক্রম এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে তার সৈন্যরা আর এগোতে রাজি ছিল না। এই আক্ষেপই তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।

৪.৪ \'আমি তারই প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছি।\'

প্রসঙ্গ: সম্রাট সেকেন্দার যখন চন্দ্রগুপ্তের পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানতে চান, তখন নির্ভীক চন্দ্রগুপ্ত উপর্যুক্ত উক্তিটি করেন।
তাৎপর্য: চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন মগধের রাজা মহাপদ্মের পুত্র। কিন্তু তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত নিজের এই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং নিজের হৃত সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতেই গ্রিকদের কাছ থেকে উন্নত সামরিক কৌশল শিখতে বেরিয়েছিলেন।

৪.৫ \'যাও বীর! মুক্ত তুমি।\'

প্রসঙ্গ: চন্দ্রগুপ্তের অসীম সাহস এবং সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট সেকেন্দার তাঁকে বন্দিদশা থেকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়ার সময় এই কথা বলেন।
তাৎপর্য: সেকেন্দার চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তচর হিসেবে বন্দি করার ভয় দেখিয়েছিলেন শুধু তার মানসিক কাঠিন্য পরীক্ষা করার জন্য। চন্দ্রগুপ্ত যখন তরবারি বের করে বলেন, বধ না করে বন্দি করতে পারবেন না, তখন তাঁর শৌর্য, সত্যনিষ্ঠা এবং আত্মমর্যাদাবোধ দেখে সেকেন্দার অত্যন্ত প্রসন্ন হন। তিনি বুঝতে পারেন এই তরুণ একদিন মহান শাসক হবে। তাই তিনি চন্দ্রগুপ্তকে বীরের সম্মান দিয়ে মুক্ত করেন।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (নিজের ভাষায় লেখো)

৫.১ নাট্যাংশটি অবলম্বনে ঐতিহাসিক নাটকের পরিবেশ সৃষ্টিতে নাট্যকারের দক্ষতার পরিচয় দাও।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত 'চন্দ্রগুপ্ত' নাট্যাংশটিতে শুরু থেকেই একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য ও পরিবেশ ফুটে উঠেছে।

প্রথমত, স্থান ও কালের বর্ণনায় সিন্ধু-নদতট এবং গ্রিক জাহাজ-শ্রেণির উল্লেখ আমাদের প্রাচীন ভারতের সেই যুগসন্ধিক্ষণে নিয়ে যায় যখন আলেকজান্ডার (সেকেন্দার) ভারত আক্রমণ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, চরিত্র চিত্রণে ঐতিহাসিক সত্যতা বজায় রাখা হয়েছে। সেকেন্দার, সেলুকস, চন্দ্রগুপ্ত, আন্টিগোনস এবং নেপথ্যে রাজা পুরুর উল্লেখ—এই প্রতিটি চরিত্রই ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে। সেকেন্দারের বীরত্ব ও মহানুভবতা, চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনচ্যুতির ইতিহাস এবং তাঁর প্রতিশোধস্পৃহা—সবই ঐতিহাসিক ঘটনা।

সংলাপের সাবলীলতা ও গাম্ভীর্য নাটকের ঐতিহাসিক আবহকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। এভাবেই নাট্যকার সুনিপুণ দক্ষতায় একটি সার্থক ঐতিহাসিক নাটকের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

৫.২ সেকেন্দারের সংলাপে ভারত-প্রকৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ কীভাবে ধরা দিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করো।

গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার ভারতভূমির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মতে, এ দেশ অত্যন্ত বিচিত্র।

দিনের বেলা প্রচণ্ড সূর্য এখানকার গাঢ় নীল আকাশকে পুড়িয়ে দেয়, আবার রাতে শুভ্র চন্দ্রমা স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় তাকে স্নান করায়। রাতের আকাশে অগণিত নক্ষত্রের আলো তাঁকে বিস্ময়াভিভূত করে। বর্ষাকালে প্রকাণ্ড দৈত্যের মতো কালো মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া তুষারাবৃত নীল হিমালয়ের স্থিরতা—সবই বিপরীতধর্মী অথচ মনোহর। বিশাল নদনদীগুলো যেমন ফেনিল উচ্ছ্বাসে ছুটে চলে, তেমনি মরুভূমির তপ্ত বালুরাশি স্বেচ্ছাচারের মতো খেলা করে। এভাবেই সেকেন্দারের মুগ্ধ বর্ণনায় ভারতের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির এক অপরূপ ছবি ফুটে উঠেছে।

৫.৪ 'সম্রাট মহানুভব।'- বক্তা কে? সম্রাটের 'মহানুভবতা'-র কীরূপ পরিচয় নাট্যাংশে পাওয়া যায়?

উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন গ্রিক সেনাপতি সেলুকস।

মহানুভবতার পরিচয়: সম্রাট সেকেন্দার ছিলেন এক অজেয় দিগ্বিজয়ী বীর। কিন্তু তাঁর মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না, বরং বীরের প্রতি বীরের সম্মান প্রদর্শনের মহৎ গুণ তাঁর ছিল। তিনি যখন ভারতীয় রাজা পুরুকে পরাজিত করে বন্দি করেন, তখন পুরুর কাছে জানতে চান তিনি কেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন। পুরু নির্ভীকভাবে "রাজার প্রতি রাজার আচরণ" দাবি করলে সেকেন্দার অত্যন্ত মুগ্ধ হন। তিনি পুরুর বীরত্বের মর্যাদা দিয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁকে তাঁর হৃত রাজ্য সসম্মানে ফিরিয়ে দেন। সম্রাটের এই গুণের প্রতি ইঙ্গিত করেই সেলুকস তাঁকে মহানুভব আখ্যা দিয়েছেন।

৫.১০ আন্টিগোনস নাটকের এই দৃশ্যে সেলুকসকে 'বিশ্বাসঘাতক' বলেছে। তোমার কি সেলুকসকে সত্যিই 'বিশ্বাসঘাতক' বলে মনে হয়? যুক্তিসহ আলোচনা করো।

না, আমার মতে সেলুকসকে কোনোভাবেই 'বিশ্বাসঘাতক' বলা যায় না।

সেলুকস ছিলেন গ্রিক সেনাপতি এবং সেকেন্দারের একজন বিশ্বস্ত অনুচর। চন্দ্রগুপ্তকে তিনি সরল মনে সামরিক শিক্ষা দিয়েছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের চেহারায় ও কথায় মুগ্ধ হয়ে সেলুকস তাঁর সঙ্গে সাধারণ সামরিক প্রথা নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি জানতেন না যে চন্দ্রগুপ্ত মগধের রাজপুত্র এবং তিনি এই জ্ঞান গুপ্তচরবৃত্তির জন্য বা অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন। যখন চন্দ্রগুপ্তের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়, তখন সেলুকস নিজেই অবাক হন এবং স্বীকার করেন যে তিনি যুবকের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেননি। সেলুকস উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্বদেশের কোনো গোপন তথ্য শত্রুর হাতে তুলে দেননি। তাই আন্টিগোনস ঈর্ষাবশত ও হঠকারী হয়ে তাঁকে 'বিশ্বাসঘাতক' বললেও, সেলুকস প্রকৃতপক্ষে একজন সৎ ও সরল সেনাপতি ছিলেন।

৫.১৩ নাট্যাংশ অবলম্বনে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দারের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের পরিচয় দাও।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'চন্দ্রগুপ্ত' নাট্যাংশে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দারের চরিত্রটি এক বীরোচিত, গুণগ্রাহী এবং মহানুভব শাসক হিসেবে ফুটে উঠেছে।

  • প্রকৃতিপ্রেমী: ভারত-প্রকৃতির অপরূপ রূপ ও বৈচিত্র্য দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন, যা তাঁর সংবেদনশীল মনের পরিচয় দেয়।
  • বীর ও শৌর্যশালী: তিনি অর্ধেক এশিয়া জয় করেছেন। তাঁর পদভরে বিশ্ব কম্পিত। তিনি বীরত্বকে সম্মান করেন এবং দুর্বল নয়, সবলকে পরাজিত করাতেই প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পান।
  • গুণগ্রাহী ও মহানুভব: পরাজিত রাজা পুরুর নির্ভীক কথায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া এবং চন্দ্রগুপ্তের সত্যবাদিতা ও সাহসে প্রসন্ন হয়ে তাঁকে মুক্ত করে দেওয়া সেকেন্দারের চরিত্রের শ্রেষ্ঠ দিক।
  • ন্যায়পরায়ণ: নিজের সেনাপতি আন্টিগোনস অন্যায়ভাবে সেলুকসকে আক্রমণ করলে তিনি তৎক্ষণাৎ আন্টিগোনসকে নির্বাসিত করেন।

এভাবেই সেকেন্দার সাহা এক আদর্শ, প্রজ্ঞাবান ও মহৎ সম্রাট হিসেবে নাটকে উদ্ভাসিত হয়েছেন।

৬. সন্ধিবিচ্ছেদ করো

শব্দসন্ধিবিচ্ছেদ
নির্বাকনিঃ + বাক
উচ্ছ্বাসেউৎ + শ্বাসে
উদ্দামউৎ + দাম
নিষ্কম্পস্বরেনিঃ + কম্পস্বরে
দিগ্বিজয়েদিক্ + বিজয়ে
উদ্ধারউৎ + হার

৭. ব্যাসবাক্যসহ সমাসের নাম

সমস্ত পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
দৈত্যসৈন্যদৈত্যের সৈন্যষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস
নদনদীনদ ও নদীদ্বন্দ্ব সমাস
স্নেহছায়াস্নেহরূপ ছায়ারূপক কর্মধারয় সমাস
অসম্পূর্ণনয় সম্পূর্ণনঞ তৎপুরুষ সমাস
বিজয়বার্তাবিজয়সূচক বার্তামধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
অভ্রভেদীঅভ্র ভেদ করে যেউপপদ তৎপুরুষ সমাস

৮. ক্রিয়ার কাল নির্দেশ করো

বাক্যক্রিয়াপদকাল
হেলেন সেলুকসের হস্ত ধরিয়া তাঁহার পার্শ্বে দণ্ডায়মানা (আছেন)।দণ্ডায়মানা (আছেন)পুরাঘটিত বর্তমান কাল
এই মরুভূমি স্বেচ্ছাচারের মতো তপ্ত বালুরাশি নিয়ে খেলা করছে।খেলা করছেঘটমান বর্তমান কাল
চমকিত হলাম।হলামসাধারণ অতীত কাল
আমার শিবিরে তুমি গুপ্তচর হয়ে প্রবেশ করেছ।প্রবেশ করেছপুরাঘটিত বর্তমান কাল
নির্ভয়ে তুমি তোমার রাজ্যে ফিরে যাও।ফিরে যাওঅনুজ্ঞা বর্তমান কাল

৯. কারক ও বিভক্তি নির্ণয়

বাক্যরেখাঙ্কিত শব্দকারকবিভক্তি
কী বিচিত্র এই দেশ!দেশকর্ম কারক (বা কর্তৃকারক)শূন্য (০) বিভক্তি
আমি বিস্মিত আতঙ্কে চেয়ে থাকি।আতঙ্কেকরণ কারক'এ' বিভক্তি
মদমত্ত মাতঙ্গ জঙ্গমপর্বতসম মন্থর গতিতে চলেছে।গতিতেকরণ কারক'তে' বিভক্তি
বাধা পেলাম প্রথম-সেই শতদ্রুতীরে।শতদ্রুতীরেঅধিকরণ কারক'এ' বিভক্তি
আমি যা শিখেছি তা এই পত্রে লিখে নিচ্ছিলাম।পত্রেঅধিকরণ কারক'এ' বিভক্তি

১০. দল বিশ্লেষণ করো

শব্দদল বিশ্লেষণদলের ধরন
স্থিরভাবেস্থির - ভা - বেরুদ্ধ - মুক্ত - মুক্ত
নিষ্কম্পস্বরেনিষ্ - কম্ - প - স্ব - রেরুদ্ধ - রুদ্ধ - মুক্ত - মুক্ত - মুক্ত
বিজয়বাহিনীবি - জয় - বা - হি - নীমুক্ত - রুদ্ধ - মুক্ত - মুক্ত - মুক্ত
চন্দ্রগুপ্তচন্ - দ্র - গুপ - তরুদ্ধ - মুক্ত - রুদ্ধ - মুক্ত
আর্যকুলরবিআর্ - য - কু - ল - র - বিরুদ্ধ - মুক্ত - মুক্ত - মুক্ত - মুক্ত - মুক্ত

১১. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন

মূল বাক্যনির্দেশপরিবর্তিত বাক্য
নদতটে শিবির-সম্মুখে সেকেন্দার ও সেলুকস অস্তগামী সূর্যের দিকে চাহিয়া ছিলেন।দুটি বাক্যে ভেঙে লেখোনদতটে শিবির-সম্মুখে সেকেন্দার ও সেলুকস চাহিয়া ছিলেন। দূরে সূর্য অস্ত যাইতেছিল।
'আমার কাছে কিরূপ আচরণ প্রত্যাশা করো?'পরোক্ষ উক্তিতেবক্তা তাঁর কাছে কিরূপ আচরণ প্রত্যাশা করেন, তা জানতে চাইলেন।
জগতে একটা কীর্তি রেখে যেতে চাই।না-সূচক বাক্যেজগতে একটা কীর্তি না রেখে যেতে চাই না। (বা, কীর্তি না রেখে যাব না।)
আমি যা শিখেছি তা এই পত্রে লিখে নিচ্ছিলাম।সরল বাক্যেআমার শেখা বিষয়গুলি আমি এই পত্রে লিখে নিচ্ছিলাম।
তোমার অপরাধ তত নয়।হ্যাঁ-সূচক বাক্যেতোমার অপরাধ যৎসামান্য।
এক গৃহহীন নিরাশ্রয় হিন্দু রাজপুত্র ছাত্র হিসেবে তাঁর কাছে উপস্থিত, তাতেই তিনি ত্রস্ত।বিশেষ্য রূপ (ত্রাস)এক গৃহহীন নিরাশ্রয় হিন্দু রাজপুত্র ছাত্র হিসেবে তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ায় তিনি ত্রাস অনুভব করেন।
'কী বিচিত্র এই দেশ'!নির্দেশক বাক্যেএই দেশ অত্যন্ত বিচিত্র।
'সত্য সম্রাট'।না-সূচক বাক্যেমিথ্যা নয় সম্রাট।
এ দিগ্বিজয় অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছেন কেন সম্রাট?পরোক্ষ উক্তিতেসম্রাট এই দিগ্বিজয় অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছেন কেন, তা বক্তা জানতে চাইলেন।
'ভারতবাসী মিথ্যা কথা বলতে এখনও শিখে নাই।'হ্যাঁ-সূচক বাক্যেভারতবাসীর কাছে মিথ্যা কথা বলা এখনও অশেখা রয়ে গেছে।
আমি এরূপ বুঝি নাই।হ্যাঁ-সূচক বাক্যেআমি অন্যরূপ বুঝেছিলাম।
'সেকেন্দার সাহা এত কাপুরুষ তাহা ভাবি নাই।'বিশেষ্য রূপ (কাপুরুষতা)সেকেন্দার সাহার যে এত কাপুরুষতা আছে তাহা ভাবি নাই।
সম্রাট আমায় বধ না করে বন্দি করতে পারবেন না।যৌগিক বাক্যেসম্রাট আমায় বধ করুন তবেই বন্দি করতে পারবেন।
আমি পরীক্ষা করছিলাম মাত্র।জটিল বাক্যেআমি যা করছিলাম তা পরীক্ষা মাত্র।
'নির্ভয়ে তুমি তোমার রাজ্যে ফিরে যাও'।না-সূচক বাক্যেভয় না পেয়ে তুমি তোমার রাজ্যে ফিরে যাও।

বীরত্বের প্রতি সম্মান

'চন্দ্রগুপ্ত' নাট্যাংশটি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত বীর কখনো ছলনার আশ্রয় নেয় না। চন্দ্রগুপ্তের মতো সত্যবাদী ও নির্ভীক হলে স্বয়ং শত্রুও সমীহ করতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি, সেকেন্দারের চরিত্র থেকে আমরা শিখি—একজন ক্ষমতাবান শাসকের প্রধান অলংকার হলো তাঁর মহানুভবতা ও গুণের কদর করা।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'চন্দ্রগুপ্ত' নাট্যাংশটির রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত বাঙালি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। এটি তাঁর রচিত সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক 'চন্দ্রগুপ্ত'-এর প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে সংকলিত হয়েছে।

গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে শত্রুপক্ষের গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি করেছিলেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্তের নির্ভীকতা, সত্যবাদিতা এবং অপরিসীম আত্মমর্যাদাবোধ দেখে সেকেন্দার মুগ্ধ হন এবং তাঁকে বীরের সম্মান দিয়ে বিনাশর্তে মুক্ত করে দেন।

সম্রাট সেকেন্দার রাজা পুরুকে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দি করেছিলেন। কিন্তু পুরু যখন নির্ভীকভাবে সেকেন্দারের কাছে 'রাজার প্রতি রাজার আচরণ' দাবি করেন, তখন সেকেন্দার তাঁর বীরত্বে ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁকে তাঁর হৃত রাজ্য সসম্মানে ফিরিয়ে দেন।