মিলিয়ে পড়ো (ভালোবাসা কি বৃথা যায়?)

শিবনাথ শাস্ত্রী রচিত 'ভালোবাসা কি বৃথা যায়?' গদ্যাংশের সম্পূর্ণ সারাংশ, বিষয়বস্তু ও সহজ আলোচনা | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 29 May 2026 Last Update: 31 May 2026

❤️ মিলিয়ে পড়ো
(ভালোবাসা কি বৃথা যায়?)

শিবনাথ শাস্ত্রী প্রবন্ধ / জীবনীমূলক

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

ইংরেজি শিক্ষা নারী শিক্ষা ডেভিড হেয়ার ড্রিঙ্ক ওয়াটার বিটন (বেথুন)

শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৯)

বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক, ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম নেতা, শিক্ষাবিদ এবং সাহিত্যিক। তিনি নারীশিক্ষা প্রসার ও সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রচিত 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির এক প্রামাণ্য ইতিহাস। বর্তমান গদ্যাংশটি তাঁর শিক্ষানুরাগ ও মহৎ ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।

🏫

ডেভিড হেয়ার

হিন্দু স্কুল স্থাপন, বালকদের শিক্ষা

👩‍🎓

বেথুন সাহেব

বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন, নারী শিক্ষা

🤝

সহযোগী

রামমোহন রায়, স্যার হাইড ইস্ট

❤️

মূল মন্ত্র

অকপট ভালোবাসা

গদ্যাংশের সম্পূর্ণ সারাংশ

অষ্টম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের 'মিলিয়ে পড়ো' অংশে অন্তর্গত 'ভালোবাসা কি বৃথা যায়?' গদ্যাংশটি প্রাবন্ধিক শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা। এখানে তিনি দুজন প্রাতঃস্মরণীয় ইংরেজ— ডেভিড হেয়ার এবং ড্রিঙ্ক ওয়াটার বিটন (বেথুন)-এর নিঃস্বার্থ অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

ডেভিড হেয়ার ছিলেন স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, যিনি কলকাতায় এসে ঘড়ি মেরামতের কাজ করতেন। রাজা রামমোহন রায়ের সংস্পর্শে এসে তিনি অনুভব করেন যে এদেশের বালকদের ইংরেজি শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজন। ১৮১৭ সালে তিনি হিন্দু স্কুল (বর্তমানের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) স্থাপনে প্রধান উদ্যোগ নেন। তিনি ছাত্রদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। পালকিতে করে স্কুলে যাওয়ার সময় তিনি গরিবদের বিনা মূল্যে ওষুধ দিতেন। ছাত্রদের অভিমান দূর করার জন্য তিনি নিজে গিয়ে খেলনা বা কাঠের বল কিনে দিতেন। একবার এক ছাত্রকে অন্ধকারে একা ছাড়তে না পেরে নিজে লাঠি হাতে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর এই মাতৃস্নেহের কারণে একজন বাঙালি যুবক তাঁকে 'আমাদের মাতা' বলে সম্বোধন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দিন দুর্যোগ সত্ত্বেও দশ হাজার বাঙালি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।

অন্যদিকে বেথুন সাহেব ছিলেন গভর্নর জেনারেলের আইনমন্ত্রী। তিনি এদেশের মেয়েদের শিক্ষার দুরবস্থা দেখে ব্যথিত হন এবং নারীশিক্ষার প্রসারে কলকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমানের বেথুন স্কুল ও কলেজ) স্থাপন করেন। তিনি মেয়েদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন, তাদের সঙ্গে খেলা করতেন এবং তাদের পড়াশোনায় উন্নতি দেখলে নিজের গাড়িতে করে বড়ো সাহেবদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পুরস্কৃত করতেন। তাঁর এই গভীর অনুরাগের কথা স্মরণ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চোখেও জল আসত।

প্রাবন্ধিক পরিশেষে বলেছেন, এই দুই মহামানব পেশায় বা পদে বড়ো ছিলেন বলে স্মরণীয় হননি, তাঁরা প্রাতঃস্মরণীয় হয়েছেন এদেশের মানুষের প্রতি তাঁদের অকপট ভালোবাসার গুণে। তাঁদের সেই ভালোবাসা বৃথা যায়নি; তা আজ আধুনিক শিক্ষার রূপ ধরে বাঙালির ঘরে ঘরে বিরাজ করছে।

বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য

ডেভিড হেয়ার ও বেথুন সাহেব কেন প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন?

ডেভিড হেয়ার ছিলেন সামান্য একজন ঘড়িওয়ালা এবং বেথুন সাহেব ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ আইনমন্ত্রী। তাঁদের আগেও অনেক ঘড়িওয়ালা বা আইনমন্ত্রী এদেশে এসেছেন, কিন্তু কেউ মনে রাখেনি। এই দুজন প্রাতঃস্মরণীয় হয়েছেন কারণ তাঁরা এদেশের সাধারণ মানুষকে এবং ছাত্রছাত্রীদের অকপটে ও নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিলেন। তাঁদের এই ভালোবাসার ফলেই বাংলায় আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল।

ডেভিড হেয়ার ছাত্রদের কতটা ভালোবাসতেন তার দুটি উদাহরণ দাও।

১. একবার এক ছাত্রের কাঠের বল অন্য ছাত্র জলে ফেলে দেওয়ায় সে কাঁদছিল। হেয়ার সাহেব তা দেখে স্থির থাকতে পারেননি। তিনি পরদিন সকালে নিজে গিয়ে নতুন কাঠের বল কিনে এনে সেই ছাত্রটিকে দিয়ে শান্ত করেছিলেন।

২. চন্দ্রশেখর দেব নামে এক ছাত্র তাঁর বাড়িতে এলে বৃষ্টি ও অন্ধকারের কারণে রাত হয়ে যায়। রাস্তায় মাতাল গোরাদের ভয় থাকায় হেয়ার সাহেব নিজে একটি বিরাট লাঠি হাতে নিয়ে ছাত্রটিকে তার বাড়ি (পটোলডাঙা) পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে তবেই নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন।

বেথুন সাহেবের নারীশিক্ষার প্রতি কেমন অনুরাগ ছিল?

বেথুন সাহেব এদেশের মহিলাদের দুরবস্থা দেখে কষ্ট পেতেন। তিনি নারীশিক্ষার জন্য কলকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তিনি মেয়েদের এতই ভালোবাসতেন যে তাদের সঙ্গে চারপায়ে ঘোড়া সেজে খেলতেন। কোনো মেয়ে একটু পড়া শিখতে পারলে তিনি আনন্দে আত্মহারা হতেন এবং নিজের গাড়িতে চাপিয়ে বড়ো সাহেবদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাদের কাপড় বা অলংকার দিয়ে পুরস্কৃত করতেন। মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলের জন্য অনেক টাকা দান করে যান।

"ভালোবাসা কি বৃথা যায়?" - প্রাবন্ধিক এই প্রশ্নের কী উত্তর দিয়েছেন?

প্রাবন্ধিক বলেছেন, ভালোবাসা কখনো বৃথা যায় না। ডেভিড হেয়ার এবং বেথুন সাহেবের ভালোবাসা আজ বৃথা যায়নি। হেয়ারের ভালোবাসা হিন্দু স্কুল এবং আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার রূপে এবং বেথুন সাহেবের ভালোবাসা নারী শিক্ষার রূপে ও বেথুন কলেজের ছাত্রীদের মাধ্যমে আজ সমগ্র বাংলায় মূর্ত হয়ে আছে। তাঁদের প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা ও চোখের জলই প্রমাণ করে যে সত্যিকারের ভালোবাসা চিরকাল অমর থাকে।

অকপট ভালোবাসার জয়

শিবনাথ শাস্ত্রীর এই প্রবন্ধ আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীতে অর্থ, ক্ষমতা বা পদমর্যাদার চেয়ে মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সেবাই মানুষকে চিরস্মরণীয় করে রাখে। হেয়ার ও বেথুন সাহেব বিদেশি হয়েও যে মাতৃস্নেহ আমাদের প্রতি দেখিয়েছিলেন, তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অক্ষয় সম্পদ।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

এই গদ্যাংশে দুজন প্রাতঃস্মরণীয় ইংরেজ— ডেভিড হেয়ার (যিনি বালকদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য হিন্দু স্কুল স্থাপন করেন) এবং ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন (যিনি নারী শিক্ষার জন্য বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন)-এর কথা বলা হয়েছে।

ডেভিড হেয়ার ছিলেন স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, যিনি পেশায় একজন ঘড়ি মেরামতকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি রামমোহন রায়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে এদেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে (যেমন হিন্দু স্কুল স্থাপন) যুগান্তকারী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

এই গদ্যাংশটি বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক ও সাহিত্যিক শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা।