গাছের কথা

জগদীশচন্দ্র বসু রচিত 'গাছের কথা' প্রবন্ধের সম্পূর্ণ অনুশীলনীর প্রশ্নোত্তর, ব্যাকরণ ও সারাংশ | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 28 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🌱 গাছের কথা

জগদীশচন্দ্র বসু প্রবন্ধ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • পঞ্চম পাঠ

উদ্ভিদ বিজ্ঞান বীজের অঙ্কুরোদ্গম গাছের প্রাণ

জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭)

বিশিষ্ট বিজ্ঞানসাধক, পদার্থবিদ এবং জীববিজ্ঞানী। জন্ম অধুনা বাংলাদেশের বিক্রমপুরে। তিনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সাহায্যে দেখিয়েছিলেন যে, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে এবং তারা মানুষের মতোই অনুভূতিসম্পন্ন। তাঁর লেখা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুলি 'অব্যক্ত' গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। 'গাছের কথা' প্রবন্ধটি সেই অমর গ্রন্থেরই একটি অমূল্য অংশ।

১. লেখক পরিচিতি বিষয়ক প্রশ্ন

১.১ জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা একটি বইয়ের নাম লেখো।

জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হলো 'অব্যক্ত'।

১.২ জগদীশচন্দ্র বসু কী আবিষ্কার করেছিলেন?

জগদীশচন্দ্র বসু ক্রেস্কোগ্রাফ (Crescograph) যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, যার সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে গাছেরও প্রাণ আছে এবং তাদেরও মানুষের মতো অনুভূতি আছে।

২. একটি বাক্যে উত্তর দাও

৫ টি
২.১ লেখক কবে থেকে গাছদের অনেক কথা বুঝতে পারেন?

লেখক যখন থেকে গাছ, পাখি এবং কীটপতঙ্গদের ভালোবাসতে শিখেছেন, তখন থেকে তিনি গাছদের অনেক কথা বুঝতে পারেন।

২.২ 'ইহাদের মধ্যেও তাহার কিছু কিছু দেখা যায়।' কী দেখা যায়?

মানুষের মধ্যে যেমন স্বার্থত্যাগ, বন্ধুত্ব বা চুরি-ডাকাতির মতো ভালো-মন্দ গুণাবলি রয়েছে, গাছেদের মধ্যেও তার কিছু কিছু দেখা যায়।

২.৩ জীবিতের লক্ষণ কী তা লেখক অনুসরণে উল্লেখ করো।

জীবিতের প্রধান দুটি লক্ষণ হলো— তারা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং তাদের মধ্যে গতি দেখা যায় (নড়াচড়া করে)।

২.৪ 'বৃক্ষ শিশু নিরাপদে নিদ্রা যায়।' বৃক্ষশিশু কোথায় নিদ্রা যায়?

বৃক্ষশিশু বীজের কঠিন ঢাকনার ভেতরে নিরাপদে নিদ্রা যায়।

২.৫ অঙ্কুর বের হবার জন্য কী কী প্রয়োজন?

বীজ থেকে অঙ্কুর বের হবার জন্য উপযুক্ত মাটি, উত্তাপ এবং জল প্রয়োজন।

৩. নিজের ভাষায় উত্তর দাও

১০ টি
৩.১ 'আগে এসব কিছুই জানিতাম না।' কোন বিষয়টি লেখকের কাছে অজানা ছিল?

গাছেরা কথা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু তাদেরও যে একটা জীবন আছে, তারা যে আমাদের মতো আহার করে, দিন দিন বাড়ে, তাদেরও যে মানুষের মতো অভাব, দুঃখ-কষ্ট থাকে— এই সব বিষয়গুলিই আগে লেখকের কাছে অজানা ছিল।

৩.২ 'ইহাদের মধ্যেও তাহার কিছু কিছু দেখা যায়।'- কাদের কথা বলা হয়েছে? তাদের মধ্যে কী লক্ষ করা যায়?

এখানে উদ্ভিদ বা গাছেদের কথা বলা হয়েছে।

মানুষের মতো গাছেদের মধ্যেও জীবনধারণের ব্যস্ততা রয়েছে। মানুষের মতো গাছেদের মধ্যেও একে অপরকে সাহায্য করার প্রবৃত্তি, বন্ধুত্ব এবং স্বার্থত্যাগের মহান গুণ লক্ষ করা যায়। এমনকি, কখনো কখনো কষ্ট পড়লে গাছেদের মধ্যে চুরি-ডাকাতি করার মতো স্বভাবও দেখা যায়।

৩.৩ 'গাছের জীবন মানুষের ছায়ামাত্র।' লেখকের এমন উক্তি অবতারণার কারণ বিশ্লেষণ করো।

মানুষের জীবনের অনেক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে গাছের জীবনের অদ্ভুত মিল রয়েছে। মানুষের মতোই গাছের জন্ম-মৃত্যু, বৃদ্ধি ও আহারের প্রয়োজন আছে। অভাব, দুঃখ-কষ্ট গাছেরও আছে। মানুষের মতো তারাও বাঁচার তাগিদে সংগ্রাম করে, আবার মানুষের সেরা গুণ 'স্বার্থত্যাগ' (মা যেমন সন্তানের জন্য জীবন দেন)— গাছের মধ্যেও দেখা যায়। তাই লেখক গাছের জীবনকে মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি বা ছায়ামাত্র বলেছেন।

৩.৪ জীবনের ধর্ম কীভাবে রচনাংশটিতে আলোচিত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করো।

লেখক জানিয়েছেন যে, জীবিত বস্তু মাত্রই দুটো ধর্ম মেনে চলে— বৃদ্ধি ও গতি। মরা গাছ কেবল ক্ষয়ে যায়, কিন্তু জীবন্ত গাছ ক্রমশ বাড়ে। তাছাড়া, জীবনের আর একটি ধর্ম হলো গতি বা নড়াচড়া। যদিও গাছের গতি হঠাৎ চোখে পড়ে না, কিন্তু লতা যখন অন্য গাছকে পেঁচিয়ে ধরে ওঠে, তখন সেই গতি স্পষ্ট বোঝা যায়। অর্থাৎ, বৃদ্ধি এবং গতি— এই দুটিই হলো জীবনের মূল ধর্ম।

৩.৫ 'নানা উপায়ে গাছের বীজ ছড়াইয়া যায়।'- উপায়গুলি পাঠ্যাংশ অনুসরণে আলোচনা করো।

গাছের বীজ নানাভাবে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে:

  • পাখিদের দ্বারা: পাখিরা গাছের ফল খেয়ে উড়ে গিয়ে দূর দেশে বা জনমানবহীন দ্বীপে মলত্যাগ করলে তার সাথে বীজও ছড়িয়ে পড়ে।
  • বাতাসের সাহায্যে: শিমুল ফলের মতো অনেক বীজ রোদে ফেটে তুলোর সাহায্যে বাতাসে উড়ে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
  • ঝড়ের মাধ্যমে: প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবে ডালপালা ছিঁড়ে বীজ মাটিতে পড়ে এবং বাতাসের বেগে বহুদূরে উড়ে যায়।
৩.৬ লেখক তাঁর ছেলেবেলার কথা পাঠ্যাংশে কীভাবে স্মরণ করেছেন, তা আলোচনা করো।

বীজ কীভাবে বাতাসের সাহায্যে ছড়ায়, তা বোঝাতে গিয়ে লেখক তাঁর ছেলেবেলার একটি স্মৃতির কথা বলেছেন। ছেলেবেলায় শিমুল ফল রোদে ফেটে গেলে, তার মধ্য থেকে বীজ যখন তুলোর সঙ্গে উড়তে থাকত, তখন লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা সেই বীজ ধরার জন্য ছুটতেন। কিন্তু হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলেই বাতাস সেই তুলোসমেত বীজকে অনেক ওপরে উড়িয়ে নিয়ে যেত। এই মধুর স্মৃতির কথা তিনি পাঠ্যাংশে স্মরণ করেছেন।

৩.৭ 'ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বীজ পাকিয়া থাকে।'- উদ্ধৃতিটির সাপেক্ষে ছকটি পূরণ করো।
বীজকোন ঋতুতে / মাসে পাকে
১. আমবৈশাখ মাসে (গ্রীষ্মকাল)
২. লিচুবৈশাখ মাসে (গ্রীষ্মকাল)
৩. ধানআশ্বিন-কার্তিক মাসে (শরৎ-হেমন্তকাল)
৪. যবআশ্বিন-কার্তিক মাসে (শরৎ-হেমন্তকাল)
৫. শিমুলফাল্গুন-চৈত্র মাসে (বসন্তকাল) [রোদে ফাটে]
৩.৮ 'পৃথিবী মাতার ন্যায় তাহাকে কোলে লইলেন।' বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে লেখকের গভীর উপলব্ধি উদ্ধৃতিটিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তা আলোচনা করো।

প্রবল ঝড়ে বীজ যখন মাতৃগাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুলো-মাটির নীচে চাপা পড়ে, তখন সে মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায় ঠিকই, কিন্তু বিধাতার দৃষ্টির বাইরে যায় না। বিশ্বপ্রকৃতি বা পৃথিবী তখন ঠিক একজন মমতাময়ী মায়ের মতো সেই ছোট্ট বীজটিকে নিজের বুকে আশ্রয় দেয়। মাটির উষ্ণতায় বীজটি বাইরের শীত ও ঝড়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা পায় এবং নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে। এর মধ্যে দিয়ে প্রকৃতির মাতৃসুলভ ও পালনকারী রূপটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

৩.৯ 'প্রত্যেক বীজ হইতে গাছ জন্মে কিনা, কেহ বলিতে পারে না।' বীজ থেকে গাছের জন্মের জন্য অত্যাবশ্যকীয় শর্তগুলি আলোচনা করো।

সব বীজ মাটিতে পড়লেই তা থেকে গাছ জন্মায় না। যদি বীজটি কোনো কঠিন পাথরের ওপর পড়ে, তবে সেখান থেকে অঙ্কুর বের হতে পারে না। একটি বীজ থেকে সার্থকভাবে গাছ জন্মানোর বা অঙ্কুরোদগমের জন্য তিনটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত বা উপাদানের প্রয়োজন— উপযুক্ত মাটি, সঠিক উত্তাপ এবং প্রয়োজনীয় জল। এই তিনটি পেলে তবেই বীজের খোলস ফাটিয়ে বৃক্ষশিশু বাইরে আসে।

৩.১০ 'তখন সব খালি-খালি লাগিত।'- কখনকার অনুভূতির কথা বলা হলো? কেন তখন সব খালি-খালি লাগত? ক্রমশ তা কীভাবে অন্য চেহারা পেল তা পাঠ্যাংশ অনুসরণে বুঝিয়ে দাও।

লেখক যখন প্রকৃতিকে চিনতে শেখেননি, সেই ছোটোবেলার অনুভূতির কথা এখানে বলা হয়েছে।

আগে লেখক যখন মাঠে বা পাহাড়ে বেড়াতে যেতেন, তখন প্রকৃতিকে তাঁর নির্জীব এবং শূন্য বলে মনে হতো, তাই সব খালি-খালি লাগত। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন তিনি গাছ, পাখি এবং কীটপতঙ্গদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে ও ভালোবাসতে শিখলেন, তখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, গাছপালাও জীবিত, তাদেরও অনুভূতি আছে, তারাও মানুষের মতো সুখ-দুঃখ ভোগ করে। এই নব উপলব্ধির পর প্রকৃতির শূন্যতা দূর হয়ে তা এক জীবন্ত ও প্রাণবন্ত চেহারায় ধরা দেয়।

৪. বাক্য পরিবর্তন করো

৪.১ আগে যখন একা মাঠে কিংবা পাহাড়ে বেড়াইতে যাইতাম, তখন সব খালি-খালি লাগিত। (সরল বাক্যে)
উত্তর: আগে একা মাঠে কিংবা পাহাড়ে বেড়াতে গেলে সব খালি-খালি লাগত।

৪.২ তাদের অনেক কথা বুঝিতে পারি, আগে যাহা পারিতাম না। (হ্যাঁ-সূচক বাক্যে)
উত্তর: আগে তাদের যে কথা আমার অজানা ছিল, এখন তা বুঝতে পারি।

৪.৩ ইহাদের মধ্যেও আমাদের মতো অভাব, দুঃখ-কষ্ট দেখিতে পাই। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: আমাদের যেমন অভাব ও দুঃখ-কষ্ট আছে, ইহাদের মধ্যেও তেমনি তা দেখিতে পাই।

৪.৪ তোমরা শুষ্ক গাছের ডাল সকলেই দেখিয়াছ। (না-সূচক বাক্যে)
উত্তর: তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে শুষ্ক গাছের ডাল দেখোনি।

৪.৫ প্রবল বাতাসের বেগে কোথায় উড়িয়া যায়, কে বলিতে পারে? (প্রশ্ন পরিহার করো)
উত্তর: প্রবল বাতাসের বেগে কোথায় যে উড়িয়া যায়, তা কেউ বলিতে পারে না।

৫. ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয়

সমাসবদ্ধ পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
কীটপতঙ্গকীট ও পতঙ্গদ্বন্দ্ব সমাস
স্বার্থত্যাগস্বার্থকে ত্যাগকর্ম তৎপুরুষ সমাস
বৃক্ষশিশুবৃক্ষের শিশুসম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস
বনজঙ্গলবন ও জঙ্গলসমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস
জনমানবশূন্যজন ও মানব দ্বারা শূন্যকরণ তৎপুরুষ সমাস
দিনরাত্রিদিন ও রাত্রিদ্বন্দ্ব সমাস
দেশান্তরেঅন্য দেশ (দেশান্তর)নিত্য সমাস
নিরাপদনেই (নির্) আপদ যারনঞ বহুব্রীহি সমাস

৬. কারক ও বিভক্তি নির্ণয়

৬.১ ইহাদের মধ্যে একের সহিত অপরের বন্ধুত্ব হয়।
অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি (মধ্যে + এ)।

৬.২ আর কিছুকাল পরে ইহার চিহ্নও থাকিবে না।
কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।

৬.৩ বীজ দেখিয়া গাছ কত বড়ো হইবে বলা যায় না।
কর্ম কারকে 'শূন্য' বিভক্তি।

৬.৪ মানুষের সর্বোচ্চ গুণ যে স্বার্থত্যাগ, গাছে তাহাও দেখা যায়।
অধিকরণ কারকে 'এ' বিভক্তি।

৭. সন্ধি-বিচ্ছেদ করো

৭.১ নিরাপদে: নির্ + আপদে (বা নিঃ + আপদে)

৭.২ অপেক্ষা: অপ + ঈক্ষা

৭.৩ দেশদেশান্তরে: দেশদেশ + অন্তরে

প্রকৃতির মাঝে প্রাণের সন্ধান

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর 'গাছের কথা' প্রবন্ধটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃতি নিছক জড়বস্তু নয়। গাছপালা, ফুল, লতা-পাতার মধ্যেও আমাদের মতোই একটি স্পন্দিত প্রাণ লুকিয়ে আছে। এই প্রবন্ধটি পড়ার পর প্রকৃতির প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ আরও বেড়ে যায়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'গাছের কথা' প্রবন্ধটি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা। এটি তাঁর লেখা বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন 'অব্যক্ত' গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

একটি বীজ থেকে সফলভাবে অঙ্কুরোদ্গম হয়ে গাছ জন্মানোর জন্য প্রধানত তিনটি জিনিসের প্রয়োজন হয়— উপযুক্ত মাটি, সঠিক উত্তাপ এবং প্রয়োজনীয় জল।

কারণ মানুষের মতোই গাছের জন্ম, মৃত্যু, বৃদ্ধি, আহার এবং অনুভূতি আছে। মানুষের মতো গাছের মধ্যেও স্বার্থত্যাগ, একে অপরকে সাহায্য করা এবং দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি দেখা যায়। তাই গাছের জীবন মানুষের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।