🐦 একটি চড়ুই পাখি
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ
১. কবি পরিচিতি থেকে প্রশ্নোত্তর
কবি তারাপদ রায় ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো— 'তোমার প্রতিমা' এবং 'জলের মতো কবিতা'।
২. একটি বাক্যে উত্তর লেখো
৪ টিকবিতায় চড়ুই পাখিটিকে কবির নিজের ঘরেই বাসা বাঁধতে দেখা যায়।
চড়ুই পাখি এখান-সেখান থেকে বাসা বাঁধার জন্য এ-বাড়ির খড়কুটো এবং ও-বাড়ির ধান সংগ্রহ করে আনে।
কবির ঘরের জানলা, দোর (দরজা), টেবিলে রাখা ফুলদানি এবং বই-খাতা চড়ুই পাখিটির চোখে পড়ে।
ইচ্ছে হলেই চড়ুই-পাখি এ-পাড়ায় বা ও-পাড়ায় থাকা পালেদের বা বোসেদের বাড়িতে চলে যেতে পারে।
৩. কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো
১০ টিচড়ুই পাখিকে এখানে 'চতুর' বা চালাক বলা হয়েছে কারণ, সে বুঝতে পেরেছে যে কবির ঘরটি অত্যন্ত নির্জন এবং নিরাপদ। এই ঘরে অন্য কোনো কোলাহল বা উপদ্রব নেই। তাই অত্যন্ত নিশ্চিন্তে সে এখানে নিজের জন্য খড়কুটো দিয়ে আরামদায়ক একটি বাসা তৈরি করে নিয়েছে এবং সুযোগ বুঝে নিজের অধিকার বিস্তার করতে চাইছে।
তারাপদ রায় তাঁর এই কবিতায় খুব সাধারণ অথচ জীবন্ত কয়েকটি চিত্রকল্প (Imagery) ব্যবহার করেছেন:
- কাজের চিত্র: "এ বাড়ির খড় কুটো, ও বাড়ির ধান ছড়ায়"— এর মাধ্যমে পাখিটির ব্যস্ত জীবনের ছবি ফুটে ওঠে।
- দৃষ্টিনন্দন চিত্র: "টেবিলে ফুলদানি, বই-খাতা"— এটি একটি নির্জন ও গোছানো ঘরের প্রশান্তির ছবি তৈরি করে।
- সন্ধ্যা ও নির্জনতার চিত্র: "অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরে" এবং "রাত্রির নির্জন ঘরে"— এই চিত্রকল্পগুলির মাধ্যমে একটি বিষণ্ণ ও নিঃসঙ্গ পরিবেশের রূপ ফুটে উঠেছে।
কবি মনে করেন যে, চড়ুই পাখিটি কৌতূহলী চোখে কবির ঘরের জানলা, দরজা, ফুলদানি, বই-খাতা সব কিছু দেখে আর ভাবে— এই একা মানুষটি যদি কোনোদিন এই ঘর ছেড়ে চলে যায়, তবে ঈশ্বরের কৃপায় এই গোটা ঘরের মালিকানা শুধু তারই হবে। তখন এই ঘরে আর কেউ তার অধিকারে ভাগ বসাতে আসবে না।
কার্নিশে বসে চড়ুই পাখিটি কবির দিকে তাচ্ছিল্য বা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকায়। কবির মনে হয় পাখিটি যেন মজায় ভাবছে— সে নিতান্ত মায়ার টানে এই বাজে বা সাধারণ ঘরে পড়ে আছে। তার তো যাওয়ার জায়গার কোনো অভাব নেই! ইচ্ছে করলেই সে আজই উড়ে গিয়ে এ-পাড়ার বা ও-পাড়ার কোনো ধনী পরিবারের (পালেদের বা বোসেদের) আরামদায়ক বাড়িতে আশ্রয় নিতে পারে।
কবিতাটিতে চড়ুই পাখিটি কেবল একটি পাখি নয়, বরং কবির নির্জন জীবনের এক পরম সঙ্গী। পাখিটির খড়কুটো আনা, কিচিমিচি গান গাওয়া কবির নিঃসঙ্গ ঘরে প্রাণের স্পন্দন জাগায়। কবি কখনো ভাবেন পাখিটি তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে চায়, আবার কখনো ভাবেন পাখিটি তাঁকে তাচ্ছিল্য করে অন্য কোথাও চলে যেতে পারে। কিন্তু সবশেষে কবি উপলব্ধি করেন, পাখিটি দয়া করেই থেকে যায়, যার ফলে রাতের অন্ধকারে দুটি নিঃসঙ্গ প্রাণ একে অপরের সাহচর্য লাভ করে।
এই পঙ্ক্তিটিতে কবির একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার গভীর প্রতিফলন ঘটেছে। কবির মনে হয়েছে যে, পাখিটির অন্য কোথাও যাওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে যায়নি। কবি যেন নিজের নিঃসঙ্গতাকে ঘোচানোর জন্য ওই ক্ষুদ্র পাখিটির সাহচর্যের ওপর নির্ভরশীল। পাখিটি থেকে গেছে বলে কবি মনে করছেন যে পাখিটি তাঁর প্রতি 'দয়া' করেছে। এটি কবির অসহায় ও স্নেহকাতর মানসিকতার প্রকাশ।
কবিতার ক্ষুদ্র পরিসরে চড়ুই পাখির দৈনন্দিন জীবনের একটি সুন্দর রূপরেখা ফুটে উঠেছে। সারাদিন সে বাসা বাঁধার জন্য এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে খড়কুটো ও ধান সংগ্রহ করে। সন্ধ্যা নামলে সে নিজের নির্দিষ্ট আশ্রয়ে (কবির ঘরে) ফিরে আসে। সেখানে কিচিমিচি শব্দ করে ঘর মুখর করে তোলে। কৌতূহলী চোখে ঘরের জিনিসপত্র দেখে এবং কার্নিশে বসে বিশ্রাম নেয়। এটাই তার সাদামাটা জীবনবৃত্ত।
মানুষের ব্যবহার্য নানা অদ্ভুত জিনিসপত্র দেখে ছোটো পাখিটির মনে বিস্ময় জাগে, তাই তার চোখ 'কৌতূহলী'।
তার চোখে কবির সংসারের একটি অত্যন্ত সাধারণ ও ছিমছাম চালচিত্র ধরা পড়ে। সে দেখে একটি নির্জন ঘর, যার মধ্যে রয়েছে জানলা, দরজা, পড়ার টেবিলে রাখা একটি ফুলদানি এবং কিছু বই-খাতা। এই সামান্য আসবাবপত্র ঘিরেই আবর্তিত হয় কবির একাকী সংসার।
কবিতার শেষ ছত্রে ব্যবহৃত 'একাকী' শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সারা পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কবির ঘরটি নির্জন হয়ে ওঠে। সেই নিঃসঙ্গ পরিবেশে কেবল দুটি প্রাণ জেগে থাকে— কবি নিজে এবং চড়ুই পাখিটি। 'একাকী' শব্দটি এখানে কেবল একজনের কথা বলছে না, বরং দুজনের যৌথ নিঃসঙ্গতাকে বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ, তারা দুজন মিলেই একাকীত্বের সঙ্গী, একে অপরের পরিপূরক।
কবিতাটির একটি উপযুক্ত বিকল্প নাম হতে পারে— 'নিঃসঙ্গতার সঙ্গী'।
যুক্তি: সমগ্র কবিতাটিতে কবির একাকী জীবনের কথা বলা হয়েছে। কবির এই নিঃসঙ্গ ও নির্জন ঘরে একমাত্র প্রাণের স্পন্দন হলো চড়ুই পাখিটি। পাখিটির উপস্থিতি, তার কিচিমিচি শব্দ এবং তার সঙ্গে কবির কাল্পনিক কথোপকথন— সবকিছু মিলিয়ে পাখিটি কবির নিঃসঙ্গ জীবনের পরম সঙ্গী হয়ে উঠেছে। তাই এই নামকরণটি কবিতার অন্তর্নিহিত ভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪. প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো
| সন্ধ্যা | সম্ (উপসর্গ) + ধ্যৈ (ধাতু) + অ (অঙ্) + আ (টাপ্) |
| কৌতূহলী | কৌতূহল (শব্দ) + ঈ (ইন্ প্রত্যয়) |
| দৃষ্টি | দৃশ (ধাতু) + তি (ক্তি প্রত্যয়) |
৫. ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো
| ৫.১ চতুর চড়ুই এক ঘুরে ফিরে আমার ঘরেই বাসা বাঁধে। | সাধারণ বর্তমান কাল (বা নিত্যবৃত্ত বর্তমান) |
| ৫.২ বই-খাতা এসব আমার-ই হবে। | সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল |
| ৫.৩ আবার কার্নিশে বসে। | সাধারণ বর্তমান কাল |
| ৫.৪ এই বাজে ঘরে আছি। | সাধারণ বর্তমান কাল (ঘটমান বর্তমান অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে) |
| ৫.৫ ইচ্ছে হলে আজই যেতে পারি। | সাধারণ বর্তমান কাল |
৬. নির্দেশ অনুসারে বাক্য পরিবর্তন
| প্রদত্ত বাক্য | পরিবর্তিত বাক্য |
|---|---|
| ৬.১ অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরে যেই সে'ও ফেরে। (সরল বাক্যে) | অন্ধকার ঠোঁটে নিয়ে সন্ধ্যা ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই সে-ও ফেরে। |
| ৬.২ কখনো সে কাছাকাছি কৌতূহলী দুই চোখ মেলে অবাক দৃষ্টিতে দেখে। (বিশেষ্য রূপে) | কখনো সে কাছাকাছি দুই চোখে কৌতূহল মেলে অবাক দৃষ্টিতে দেখে। |
| ৬.৩ আমাকেই দেবেন বিধাতা। (না-সূচক বাক্যে) | বিধাতা আমাকে ছাড়া আর কাউকেই দেবেন না। |
| ৬.৪ এই বাজে ঘরে আছি নিতান্ত মায়ার শরীর আমার তাই। (জটিল বাক্যে) | যেহেতু আমার নিতান্ত মায়ার শরীর, তাই এই বাজে ঘরে আছি। |
| ৬.৫ ইচ্ছে হলে আজই যেতে পারি এ পাড়ায় ও পাড়ায় পালেদের বোসেদের বাড়ি। (জটিল বাক্যে) | যদি ইচ্ছে হয়, তবে আজই যেতে পারি এ পাড়ায় ও পাড়ায় পালেদের বোসেদের বাড়ি। |
৭. ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো
| শব্দ | ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিবর্তন | বিবরণ |
|---|---|---|
| চড়ুই | চটক > চড়ই > চড়ুই | স্বরসংগতি (বা অপিনিহিতি ও অভিশ্রুতির প্রভাব) |
| ধান | ধান্য > ধান | অপিনিহিতি জাত অভিশ্রুতি (বা সমীভবন ও ব্যঞ্জনলোপ) |
| চোখ | চক্ষু > চোক্খু > চোখ | সমীভবন ও ব্যঞ্জনলোপ |
| জানলা | জানালা > জানলা | মধ্যস্বরলোপ (মাঝখানের 'আ' কার লুপ্ত) |
| দোর | দুয়ার > দোর | অভিশ্রুতি |
| ইচ্ছে | ইচ্ছা > ইচ্ছে | স্বরসংগতি ('ই'-এর প্রভাবে 'আ' হয়ে গেল 'এ') |
| পাখি | পক্ষী > পক্খী > পাখি | সমীভবন, ব্যঞ্জনলোপ ও ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবন |
৮. 'চোখ' শব্দটিকে পৃথক অর্থে ব্যবহার করে বাক্য রচনা
| অর্থ | বাক্য রচনা |
|---|---|
| দৃষ্টি (নজর) | ছেলেটার পড়াশোনার দিকে একটু চোখ রেখো। |
| লোভ / নজর লাগা | খাবার সময় অন্যের পাতের দিকে চোখ দেওয়া ঠিক নয়। |
| লজ্জা | বড়োদের সামনে কথা বলতে তোমার একটুও চোখ ফুটল না? |
| অঙ্গবিশেষ (নেত্র) | বয়স হওয়ায় দাদু আজকাল চোখে ভালো দেখতে পান না। |
| সতর্কতা | রাস্তায় চলার সময় সবসময় কান-চোখ খোলা রাখতে হয়। |