🐪 অদ্ভুত আতিথেয়তা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • প্রথম পাঠ
গদ্যাংশ
অদ্ভুত আতিথেয়তা
লেখক
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
উৎস
আখ্যানমঞ্জুরী
পাঠ
প্রথম পাঠ (সাহিত্য মেলা)
গল্পের সারাংশ ও মূলভাব
সারমর্ম: 'অদ্ভুত আতিথেয়তা' গল্পটি আরব ও মুর জাতির সংঘর্ষের পটভূমিতে রচিত। একবার এক মুর সেনাপতি পথ ভুলে বিপক্ষ আরব সেনাপতির শিবিরে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আরব সেনাপতি তাঁকে আশ্রয় দেন ও তাঁর সেবা-যত্ন করেন। কিন্তু কথোপকথনের সময় আরব সেনাপতি বুঝতে পারেন যে, এই মুর সেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। এই নিদারুণ সত্য জেনেও আরব সেনাপতি অতিথির কোনো ক্ষতি করেন না, কারণ আরবদের জাতীয় ধর্ম হলো অতিথির প্রাণরক্ষা করা।
কেন্দ্রীয় দর্শন: পরদিন ভোরে তিনি মুর সেনাপতিকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি দ্রুতগামী ঘোড়া দেন এবং তাঁকে জানান যে সূর্যোদয়ের পরই তিনি প্রতিশোধ নিতে তাঁর পিছু নেবেন। মুর সেনাপতি নির্বিঘ্নে নিজের শিবিরে ফিরে যান। এই গল্পে আরব জাতির আতিথেয়তার মহান আদর্শ এবং একই সঙ্গে পিতৃভক্তি ও শত্রুতাসাধনের এক অদ্ভুত কিন্তু মহৎ দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
১. একটি বাক্যে উত্তর দাও
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন।
তাঁর রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হলো— 'বর্ণপরিচয়' এবং 'সীতার বনবাস'।
২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও
৫ টি\'অদ্ভুত আতিথেয়তা\' গল্পে আরব সেনাপতি এবং মুর সেনাপতির প্রসঙ্গ রয়েছে।
উদ্ধৃতাংশে \'তিনি\' বলতে প্রাণভয়ে পলায়নরত ক্লান্ত মুর সেনাপতির কথা বোঝানো হয়েছে।
\'উভয় সেনাপতি\' বলতে এখানে আশ্রয়দাতা আরব সেনাপতি এবং তাঁর অতিথি মুর সেনাপতিকে বোঝানো হয়েছে।
বক্তা (আরব সেনাপতি) বলেছেন যে, মুর সেনাপতি যদি দ্রুতগামী ঘোড়ায় চেপে তাঁর নিজের শিবিরের দিকে পালিয়ে যান এবং আরব সেনাপতি পিছু নিলেও তাঁকে ছুঁতে না পারেন, তবেই উভয়ের প্রাণরক্ষার সম্ভাবনা রয়েছে।
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি (মুর সেনাপতি) হলেন বক্তার (আরব সেনাপতির) পিতার হত্যাকারী; সূর্যোদয় হলেই আরব সেনাপতি প্রতিশোধ নিতে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করবেন, তাই তাঁকে অবিলম্বে পালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. নীচের প্রশ্নগুলির কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো
৫ টিএখানে আরব সেনাদের তাড়া খেয়ে পলায়নরত মুর সেনাপতির কথা বলা হয়েছে।
পরিণতি: দিকভুল করার কারণে মুর সেনাপতি নিজের শিবিরের পথ হারিয়ে ফেলেন এবং বিপক্ষ আরবদের শিবির সন্নিবেশ স্থানে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে অত্যন্ত ক্লান্ত অবস্থায় তিনি এক আরব সেনাপতির তাঁবুতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
আরবদের আতিথেয়তার মহান আদর্শ গল্পে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মুর সেনাপতি ছিলেন আরবদের ঘোরতর শত্রু। তবুও তিনি যখন ক্লান্ত ও পথশ্রান্ত হয়ে আরব সেনাপতির শিবিরে আশ্রয় চাইলেন, তখন আরব সেনাপতি বিন্দুমাত্র শত্রুতা না দেখিয়ে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং আহার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন। এমনকি মুর সেনাপতিকে নিজের পিতার হত্যাকারী জেনেও রাতে তাঁর কোনো অনিষ্ট করেননি।
রাতের আহারের পর আরব ও মুর সেনাপতি যখন বন্ধুভাবে নিজেদের পূর্বপুরুষদের বীরত্ব ও যুদ্ধকৌশল নিয়ে গল্প করছিলেন, তখন কথার সূত্র ধরে আরব সেনাপতি জানতে পারেন যে এই মুর সেনাপতিই হলেন তাঁর পিতার হত্যাকারী। নিজের আশ্রিত অতিথিই যে তাঁর চরম শত্রু, এই মর্মান্তিক সত্যটি হঠাৎ জানতে পেরেই আরব সেনাপতির মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়।
এখানে মুর সেনাপতির মনের সন্দেহের কথা বলা হয়েছে।
কারণ: দুই সেনাপতি যখন বন্ধুভাবে গল্প করছিলেন, তখন হঠাৎ আরব সেনাপতির মুখ বিবর্ণ হয়ে যায় এবং তিনি অসুস্থতার কথা বলে সেখান থেকে চলে যান। পরে তিনি লোক মারফত মুর সেনাপতিকে খুব ভোরে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার জন্য ঘোড়া প্রস্তুত রাখার কথা জানান। আরব সেনাপতির এই আকস্মিক আচরণ পরিবর্তনই মুর সেনাপতির মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল।
আরব সেনাপতি পলায়নরত মুর সেনাপতিকে অনুসরণ করছিলেন।
কারণ: মুর সেনাপতি ছিলেন আরব সেনাপতির পিতার হত্যাকারী। আরবদের নিয়ম অনুযায়ী অতিথির কোনো ক্ষতি করা যায় না বলে রাতে তিনি প্রতিশোধ নেননি। কিন্তু মুর সেনাপতি তাঁর শিবির ত্যাগ করার পর অতিথি থাকেন না, তখন সে চরম শত্রু। তাই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই পিতৃবধের প্রতিশোধ নিতে তিনি মুর সেনাপতিকে অনুসরণ করছিলেন।
৪. প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো
৩ টিপ্রসঙ্গ: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের \'অদ্ভুত আতিথেয়তা\' গল্পে আরব সেনাপতি তাঁর আশ্রিত মুর সেনাপতিকে উদ্দেশ্য করে লোক মারফত এই কথাটি বলে পাঠিয়েছিলেন।
তাৎপর্য: কথোপকথনের মাঝে আরব সেনাপতি বুঝতে পারেন যে মুর সেনাপতিই তাঁর পিতৃহন্তা। কিন্তু আরব জাতির মহান ধর্ম অনুযায়ী আশ্রিত অতিথির কোনো ক্ষতি করা যায় না। তাই রাতের বেলা প্রতিশোধ না নিয়ে, সকালে মুর সেনাপতি যাতে নিরাপদে তাঁর শিবির ত্যাগ করতে পারেন, তার জন্য তিনি একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেন। এর মধ্যে আরব সেনাপতির কর্তব্যপরায়ণতা ও আতিথেয়তার মহান আদর্শ ফুটে উঠেছে।
প্রসঙ্গ: বিদ্যাসাগর রচিত \'অদ্ভুত আতিথেয়তা\' পাঠ্যাংশে আরব সেনাপতি মুর সেনাপতিকে ভোরে বিদায় জানানোর সময় এই কথাটি বলেছিলেন।
তাৎপর্য: আরব সেনাপতি মুর সেনাপতিকে জানিয়ে দেন যে, তিনিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। তাই এই সমগ্র আরব শিবিরের মধ্যে মুর সেনাপতির সবচেয়ে বড় শত্রু স্বয়ং তিনিই। সূর্যোদয় হলেই আরব সেনাপতি পিতৃবধের প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হবেন। এই চরম সত্যটি অতিথিকে জানিয়ে দিয়ে তাঁকে সতর্ক করে দেওয়াই ছিল এই উক্তির মূল উদ্দেশ্য।
প্রসঙ্গ: আরব সেনাপতি তাঁর চরম শত্রু মুর সেনাপতিকে নিজের তাঁবু থেকে সুরক্ষিত অবস্থায় বিদায় দেওয়ার সময় এই মহৎ উক্তিটি করেছিলেন।
তাৎপর্য: আরবদের আতিথেয়তা বিশ্ববিখ্যাত। শত্রু হলেও কেউ যদি তাদের কাছে আশ্রয় চায়, তবে তারা নিজের জীবনের বিনিময়েও সেই অতিথির সুরক্ষা দেয়। আরব সেনাপতি নিজের পিতার হত্যাকারীকে হাতের কাছে পেয়েও রাতে তাঁকে হত্যা করেননি, কারণ তখন সে তাঁর অতিথি। এই উক্তির মাধ্যমে আরব জাতির সেই মহান ও অবিচল আদর্শবোধের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।
৫. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো
১. পাঠ্য গল্পে আরব সেনাপতির আতিথেয়তার কথা রয়েছে।
২. পথভ্রান্ত ও ক্লান্ত মুর সেনাপতি যখন আরব সেনাপতির তাঁবুতে এসে পৌঁছান, তখন আরব সেনাপতি তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন। মুর সেনাপতি শত্রু হলেও তিনি তাঁকে প্রয়োজনীয় আহার, জল এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেন।
৩. এই আতিথেয়তাকে 'অদ্ভুত' আখ্যা দেওয়া হয়েছে কারণ, পৃথিবীতে সচরাচর এমন ঘটনা ঘটে না যেখানে একজন মানুষ নিজের পিতার হত্যাকারীকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দেয়। আরব সেনাপতি জানতে পেরেছিলেন যে তাঁর অতিথিই তাঁর পিতৃহন্তা। তা সত্ত্বেও তিনি আরবদের জাতীয় ধর্ম মেনে রাতে অতিথির কোনো ক্ষতি করেননি, বরং সকালে তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ঘোড়াও দিয়েছিলেন। এই চরম সংযম ও মহানুভবতার জন্যই এই আতিথেয়তাকে অদ্ভুত বলা হয়েছে।
বিদ্যাসাগরের লেখা 'অদ্ভুত আতিথেয়তা' গল্পের পরতে পরতে আরব জাতির মহান আতিথেয়তার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে। একজন ক্লান্ত ও পথহারা মুর সেনাপতি (যিনি আরবদের শত্রু) আরব শিবিরে এসে পড়লে, আরব সেনাপতি বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ না দেখিয়ে তাঁকে আশ্রয় দেন এবং যত্ন করেন।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে যখন আরব সেনাপতি জানতে পারেন যে এই অতিথিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। চরম শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও তিনি প্রতিশোধ নেননি। কারণ, আরবদের ধর্ম হলো, কেউ অতিথি হলে প্রাণ দিয়ে হলেও তাঁর রক্ষা করা। তিনি অতিথিকে সকালে একটি তেজস্বী ঘোড়া দিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন এবং জানিয়ে দেন যে শিবিরের বাইরে গেলে তবেই তিনি শত্রুতা শুরু করবেন। এই মহৎ দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে আতিথেয়তায় সত্যিই আরবদের কোনো তুলনা নেই।
৬. দল বিশ্লেষণ করে মুক্ত দল ও রুদ্ধ দল চিহ্নিত করো
| শব্দ | দল বিশ্লেষণ | দলের প্রকৃতি |
|---|---|---|
| সংগ্রাম | সং-গ্রাম | সং (রুদ্ধ), গ্রাম (রুদ্ধ) |
| অশ্বপৃষ্ঠ | অশ্-শ-পৃশ্-ঠ | অশ্ (রুদ্ধ), শ (মুক্ত), পৃশ্ (রুদ্ধ), ঠ (মুক্ত) |
| দণ্ডায়মান | দণ্-ডা-য়-মান্ | দণ্ (রুদ্ধ), ডা (মুক্ত), য় (মুক্ত), মান্ (রুদ্ধ) |
| করমর্দন | ক-র-মর্-দন্ | ক (মুক্ত), র (মুক্ত), মর্ (রুদ্ধ), দন্ (রুদ্ধ) |
| তৎক্ষণাৎ | তত্-ক্ষ-ণাৎ | তত্ (রুদ্ধ), ক্ষ (মুক্ত), ণাৎ (রুদ্ধ) |
৭. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন করো
| প্রদত্ত বাক্য | নির্দেশ | পরিবর্তিত বাক্য |
|---|---|---|
| আরবেরা তাঁহার অনুসরণে বিরত হইলে, তিনি স্বপক্ষীয় শিবিরের উদ্দেশে গমন করিতে লাগিলেন। | জটিল বাক্য | যখন আরবেরা তাঁহার অনুসরণে বিরত হইল, তখন তিনি স্বপক্ষীয় শিবিরের উদ্দেশে গমন করিতে লাগিলেন। |
| আতিথেয়তা বিষয়ে পৃথিবীতে কোনও জাতিই আবরদিগের তুল্য নহে। | ইতিবাচক বাক্য | আতিথেয়তা বিষয়ে পৃথিবীতে আবর জাতিই সর্বশ্রেষ্ঠ। |
| দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, তিনি সজ্জিত অশ্বের মুখরশ্মি ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন। | যৌগিক বক্য | তিনি দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন যে, আরব সেনাপতি সজ্জিত অশ্বের মুখরশ্মি ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন। |
| এই বিপক্ষশিবির-মধ্যে, আমা অপেক্ষা আপনকার ঘোরতর বিপক্ষ আর নাই। | প্রশ্নবোধক বাক্য | এই বিপক্ষশিবির-মধ্যে, আমা অপেক্ষা আপনকার ঘোরতর বিপক্ষ আর কেহ আছে কি? |
| তিনি নির্বিঘ্নে স্বপক্ষীয় শিবিরসন্নিবেশস্থানে উপস্থিত হইলেন। | না-সূচক বাক্য | তিনি স্বপক্ষীয় শিবিরসন্নিবেশস্থানে উপস্থিত হইতে কোনো বিঘ্ন ঘটিল না। |